কর্পোরেট লোভ আর অসদাচারন

১.
ছোট বেলায় দেখেছি সম্ভবত পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে এক চিমটি লবণ, আধা কেজি পানি আর এক মুঠি গুড় দিয়ে খাবার স্যালাইন বানানোর প্রশিক্ষণ দিত। আধা কেজি পানি মেপে প্রতিটা বাড়িতে একটা মগ বা জগে দাগ দিয়ে দেওয়া হত যাতে পরে তারা সেই মাপ ব্যবহার করতে পারে। এভাবেই আমাদের দেশে হাজার হাজার শিশু মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। রোগের কারণ আর প্রতিকার জানার আগে ডায়েরিয়া, কলেরার মত রোগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। তখন আমাদের দেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ সেগুলোকে ‘খারাপ বাতাসের’ দোষ মনে করত। বিজ্ঞান আমাদেরকে খারাপ বাতাসের ভয় কাটিয়ে দিয়েছে। শুধু আমাদের দেশেই না, মধ্য যুগের ইউরোপ, এশিয়া এবং নব আবিষ্কৃত আমেরিকান ভূখন্ডে লাখে লাখে মানুষ মারা গেছে প্লেগে।

কিন্তু বিজ্ঞান, ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগ আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত প্রতিষ্ঠানের কল্যানে বিশ্বের বুক থেকে পোলিওসহ অনেক রোগ সর্ম্পূনভাবে বিতাড়িত হয়েছে। এখন পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে অজানা রোগে একজন রোগীও আক্রান্ত হলে সারা বিশ্বে সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে প্রতিকার বের করেন। আক্রান্ত দেশ থেকে আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রতিটা দেশের এয়ারপোর্টে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ্যভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইবোলা ভাইরাস ইত্যাদি শব্দগুলো যখন আমরা শুনেছি তখন এরকমই সব তৎপরতা দেখেছি। মিডিয়াসহ বিশ্ব কমিউনিটি মানবতার জন্য হুমকি স্বরূপ যে কোন শত্রু মোকাবেলায় এখন অনেক বেশী সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু সে হচ্ছে গল্পের একটা দিক। এর অন্য দিকও আছে।

আমাদের দেশে কয়েক বছর আগে একটা ভাইরাস নিয়ে মিডিয়া খুব সরগরম হয়ে ওঠে। সেই সময় এক নামকরা বিদেশী ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর কাছে সেই ভাইরাসজনিত রোগের ওষুধ মজুত আছে বলে সেই কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা টিভিতে দেওয়া সাক্ষাতকারে জানিয়েছিলেন। ব্যাপারটা নিয়ে মিডিয়ায় এমন আতংক ছড়ানো হয় যে, সামর্থ্যবান লোকেরা রাতারাতি সেই ওষুধ জোগাড় করতে তৎপর হয়ে ওঠে। আমিও কিছু খোঁজ খবর নিলাম। জানতে পারলাম, যে ওষুধগুলো মজুত আছে সেগুলোর মেয়াদ আছে পরের বছরের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। যখনকার কথা বলছি সেটা ছিল বছরের শেষ সময় (নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে হবে)। যে রোগের কথা বাংলাদেশের মানুষ আগে কখনও শোনেনি সেই রোগের ওষুধ মজুত ছিল সেই কোম্পানির কাছে! বিশ্বের নামকরা কোম্পানী কোটি কোটি ডলার রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে ব্যয় করে। তারা সম্ভাব্য রোগের ওষুধও বানিয়ে রাখে। তাছাড়া আমাদের দেশে নতুন হলেও সেই রোগ নাকি পৃথিবীর অনেক দেশে অনেক আগেই দেখা দিয়েছে। তথ্যগুলো অবিশ্বাস করার কোন কারন নেই। কিন্তু এদেশে সেই রোগের আতংক ছড়িয়ে পড়ল সেই ওষুধের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েকমাস আগে? আর কয়েকমাস পরেই সেই ভাইরাসের কথা মানুষ বেমালুম ভুলে গেল। মিডিয়ায় তা নিয়ে আর একটা কথাও শোনা যায়নি। কিভাবে সেই ভাইরাস এদেশে আসলো আর কিভাবে বিতাড়িত হলো সে আমরা জানতে পারলাম না। প্রশ্ন জাগে, সেই প্রায় মেয়াদোত্তীর্ন ওষুধের মজুতের সাথে সেই ভাইরাসের আতংকের কোন সম্পর্ক ছিল কি?

২.
সম্প্রতি প্যারাডট নামের একটা চালু প্যারাসিটামল ট্যাবলেটসহ এই গ্রুপের বায়ান্নটা কোম্পানির ওষুধ সরকার নিষিদ্ধ করেছে। পত্র-পত্রিকায় সে খবর আসলেও ঠিক কি কারণে সেগুলো নিষিদ্ধ তা কেউ স্পষ্ট করে বলেনি। একটা ওষুধ ক্ষতিকর হয়ে থাকলে তা বাজার থেকে তুলে নিতে যে প্রচার প্রচারণা এবং জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সেরকম কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। অনেকটা নীরবে নিষিদ্ধ করার কাজটা সম্পন্ন হয়েছে। এক ফার্মেসীর মালিক আমাকে বলেছে প্যারাডট খুব ভাল ওষুধ। সরকারদলীয় প্রভাবশালী এক নেতার কোম্পানির প্যারাসিটামলকে প্রতিযোগিতায় টিকাতেই এই নিষিদ্ধকরনের কাজটা করা হয়েছে। ফার্মেসী মালিকের দাবী কতটুকু সত্য তা জানা নেই। কিন্তু একটা সন্দেহ ঠিকই মাথায় ঢুকে যায়। আসল ঘটনাটা কি?

৩.
পাঠকের মনে থাকার কথা গুড়া দুধে মেলামাইন মেশানো আছে বলে একবার গুজব উঠেছিল। সম্প্রতি ম্যাগী নুডলসে ক্ষতিকর উপাদান আছে বলে গুজব উঠেছে। এসব গুজবের উৎস কি?

৪.
প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্য, প্লাস্টিকের দ্রব্যসহ অসংখ্য প্রোডাক্ট নিয়ে দেশের এবং বিদেশের বাজারে এদেশের অন্যতম বৃহত্তম ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রাণ গ্রুপ সুপরিচিত এক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ২০১৫ সালের ৩রা অক্টোবর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ICDDR,B-এর হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড লিগাল এ্যাফেয়ার্স জানান যে, প্রাণ গ্রুপের মালিকানাধীন কোম্পানি ডিউরেবল প্লাস্টিক লিমিটেড বাজারে যে Drinkit Water Purifier মেশিন বিক্রি করে সেটা ICDDR,B কতৃক পরীক্ষিত বলে যে দাবী করা হয় তা মিথ্যা। প্রাণ গ্রুপের টাকা পয়সার অভাব নেই। সেখানে শিক্ষিত ডিগ্রীধারী মানুষরাই মার্কেটিং এবং ব্রান্ডিংয়ের কাজ করে থাকে। তাদের পক্ষে এধরনের মিথ্যাচার কিভাবে সম্ভব?

৫.
সম্প্রতি বেশ কয়েকটা ব্যাংক তাদের লাখ লাখ গ্রাহকের এ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন উপায়ে কোটি কোটি টাকা কেটে নিয়ে মুনাফা করেছে। একটা নামকরা ব্যাংক স্টেটমেন্ট চার্জ হিসাবে বিশ কোটি টাকা কেটে নেওয়ার পর পত্রিকায় ব্যাপারটা ফাঁস হলে সেসব টাকা গ্রাহকের হিসাবে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছে। আরেকটা ব্যাংক সেভিংস একাউন্টের সুদ হিসাবায়ন পিছনের তারিখ থেকে পরিবর্তন (Recalculate) করে বেশ কয়েক কোটি টাকা মুনাফায় নিয়েছে। অন্য একটা প্রথম সারির ব্যাংক সরকারের নির্ধারিত এক্সাইজ ডিউটি গ্রাহক একাউন্ট থেকে দুইবার করে কেটেছে। এসব ঘটনা ফাঁস হলে বেশীরভাগ ব্যাংকই সেগুলোকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলে দাবী করেছে। দু’একটা ব্যাংক সবাইকে টাকা ফেরত দিলেও বেশীরভাগ ব্যাংকই যেসব গ্রাহক দাবী করবেন শুধু তাদেরকে টাকা ফেরত দেওয়ার নীতি গ্রহন করেছে। এভাবে প্রত্যেক একাউন্ট থেকে কর্তিত টাকার পরিমান খুব অল্প হওয়ায় বেশীরভাগ গ্রাহক ব্যাপারটা খেয়ালই করেননি। অনেকেই সামান্য টাকার জন্য ব্যাংকে গিয়ে রিফান্ড দাবী করার ঝামেলায় জাননি। যে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ সেখানে জমা রাখে তারা আসলে কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

৬.
The Economist সম্প্রতি `Dirty secret of the car industry’  শিরোনামে এক কাভার স্টোরি করেছে (The Economist, September 26th –October 2nd 2015)। জার্মান মোটর গাড়ি প্রস্তুকারী কোম্পানি ভক্সওয়াগন স্বীকার করেছে যে তারা বিশ্বব্যাপী ১১ মিলিয়ন ডিজেল-ইঞ্জিন চালিত মোটর গাড়িতে এমন একটা সফটওয়্যার ইনস্টল করেছে যা নাইট্রোজেন অক্সাইড ও অন্যন্য ক্ষতিকর উপাদান নির্গমনের মাত্রা পরীক্ষার যন্ত্রকে ফাঁকি দিতে পারে। পরীক্ষা শেষে গাড়িগুলো রাস্তায় চলা শুরু করলেই সফটওয়্যার অকার্যকর হয়ে সেগুলোর ক্ষতিকর উপাদান নির্গমন প্রতিরোধ সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সেসব গাড়ি থেকে অনুমোদিত মাত্রার চল্লিশগুণ বেশী ক্ষতিকর উপাদান নির্গমন হয়। কোম্পানির চিপ এক্সিকিউটিভ মার্টিন উইন্টারকর্ন পদত্যাগ করে এবং তারা এই কেলেংকারীর সম্ভাব্য আর্থিক ধাক্কা সামলাতে ৭৩০ কোটি ডলার আলাদা করে রাখা হয়। সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখে এই কেলেংকারী ফাঁস হওয়ার পরের চার লেনদেন দিবসে কোম্পানির শেয়ারের দাম এক তৃতীয়াংশ পড়ে যায়। ইকনোমিস্টের প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছেঃ ‘উপর দিকে (নেতৃত্ব) পরিবর্তন আর বড় অংকের জরিমানাতেই যেন বিষয়টা শেষ না হয়। কর্পোরেট ক্রাইমের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বড় অংকের জরিমানা করে শেয়ারহোল্ডারদের শাস্তি না দিয়ে তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমেরিকার সরকারী আইনজীবিদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিৎ। সাম্প্রতিক ব্যাংকিং কেলেংকারীর বেশীরভাগই নিষ্পত্তি হয়েছে অস্বচ্ছ ভাবে এবং বড় বড় অংকের জরিমানার মাধ্যমে, কোর্টরুমে নয়। এর আগে এ মাসেই ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস আমেরিকার বৃহত্তম মোটরগাড়ী প্রস্তুতকারী কোম্পানি জেনারেল মটরস্ – এর সাথে ৯০ কোটি ডলারের এক নিষ্পত্তির ঘোষণা দেয় কারন কোম্পানিটা ত্রুটিপূর্ণ ইগনিশন সুইচযুক্ত গাড়ি যার কারনে দুর্ঘটনায় ১২৪ জনের মৃত্যু এবং ২৭৫ জনের আহত হওয়ার অভিযোগ আছে সেগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে ব্যর্থ হয়। সরকারী আইনজীবিরা (নাম প্রকাশ ছাড়া) বলেছিল যে, ‘জেনারেল মটরস্ এর ম্যানেজারেরা জেনেশুনেই সম্ভাব্য প্রাণঘাতি পরিণতির কথা উপেক্ষা করেছে এবং নিরাপত্তার উপর মুনাফাকে প্রাধান্য দিয়েছে। এরপরও তারা কোন চার্জ আনেনি’।

উল্লেখিত ঘটনাগুলোর প্রভাব যেকোন সন্ত্রাস, বিশৃঙ্খলার থেকেও বেশী। অথচ সেগুলোকে অপরাধ হিসাবে দমন বা নিয়ন্ত্রন করার ক্ষেত্রে আধুনিক সব সিস্টেমই মারাত্মকভাবে দুর্বল। ইকনোমিস্টের প্রতিবেদনের উল্লেখিত অংশের শেষ কথাটা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় সাম্প্রতিক উন্নত বিশ্বের কর্পোরেট জগতে আসলে কি ঘটে গেছে। কর্পোরেট জগতে সিস্টেম এবং মুষ্টিমেয় ব্যক্তি মিলে ব্যক্তিগত অর্থ প্রতিপত্তির জন্য সাধারন মানুষের আর্থিক এবং স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তাকে কিভাবে উপেক্ষা করেছে সেগুলোর ভিতরের গল্পগুলো খুবই ভয়ংকর।

হোসেন এম জাকির

চলবে…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s