ফয়েজ আহমদ ফয়েজ-এর কবিতা

অনুবাদ : সায়ীদ আবুবকর

উর্দু ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন ফয়েজ আহমদ ফয়েজ। জন্ম ১৩ ফেব্র“য়ারি ১৯১১ পাঞ্জাবে। মৃত্যু ২০ নভেম্বর ১৯৮৪। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধিত্বশীল এ কবি চারবার মনোনীত হয়েছিলেন নোবেল প্রাইজের জন্য। তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী কবি। ১৯৬২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে ‘লেনিন শান্তি পুরস্কার’ দেয়। তিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, পত্রিকার সম্পাদক ও আফ্রো-এশিয়ার সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র। পাকিস্তান সরকারের তিনি ছিলেন একজন তীব্র সমালোচক, যে কারণে কারাবরণও করতে হয় তাঁকে। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী কর্তৃক যে বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, তা মানবতাবাদী এ কবিকে মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ করে তোলে, যার প্রতিফলন ঘটেছে নিচের কবিতা দুটিতে।
দূরে থাকো আমার নিকট থেকে

বাংলাদেশ : ১

কী দিয়ে সাজাবো আমি এ হত্যার উৎসব,
নৃশংস হত্যাযজ্ঞ এই- কী দিয়ে সাজাবো বলো?
আমার ক্রন্দনরত রক্ত, হায়, কাড়বে কার মনোযোগ?

হাড্ডিসার শরীরে আমার রক্ত নেই বললেই চলে;
যতটুকুই বা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে তেলের মতো
জ্বালাতে পারবে না কোনো বাতি
এবং পানের পেয়ালাও ভরবে না জানি তাতে।
এ রুধিরে মিটবে না কোনো আগুনের খিদে,
নেভাতে পারবে না কোনো জ্বলন্ত তৃষ্ণাও।

লুটপাট হয়ে যাওয়া শরীরে আমার
বড়ই অভাব রক্তের। বরং
চলেছে সেখানে বয়ে শুধু এক ভয়াবহ বিষ।

যদি ফেঁড়ে ফ্যালো ধমনী আমার, পড়বে প্রতিটি ফোঁটা দিয়ে
বিষ, কেউটের ছোবলে যেমন ফেনা ওঠে রক্তে।
প্রতিটি ফোঁটাই হলো বহু যুগের যন্ত্রণাক্লিষ্ট আকুল আকাঙক্ষা;
প্রতিটি ফোঁটাই হলো বছরের পর বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা
জ্বলন্ত সিলমোহর।

সাবধান। আমার শরীর একটা বিষের নদী।
আমার নিকট থেকে থাকো দূরে। আমার শরীর
মরুভূমির প্রচণ্ড তাপে শুকিয়ে যাওয়া কোনো কাঠ।
তুমি যদি পোড়াও এ দেহ, দেখতে পাবে না কোনো
সাইপ্রাস বৃক্ষ কিংবা জেসমিন ফুল,
বরং দেখতে পাবে ক্যাক্টাসে কাঁটার মতো ফুটে থাকা
কেবল আমারই হাড়গোড়।
তুমি যদি একে ছুঁড়ে মারো অরণ্যের ভেতর, তাহলে তুমি যেন
সকালের সুগন্ধির পরিবর্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিলে
আমার ঝলসে যাওয়া আত্মার ধুলোকেই ।
সুতরাং দূরে থাকো আমার নিকট থেকে। কারণ আমার
পিপাসা লেগেছে খুব, রক্তের ।
বাংলাদেশ : ২

এভাবেই হয়ে উঠলো আমার দুঃখ দৃশ্যমান।
দুঃখের ধুলো, যা আমার বুকের ভেতর
বছরের পর বছর ধরে জমে স্তূপীকৃত হয়েছিল,
ফুটে উঠলো আমার চোখের সামনে।

এবং তিক্ততা এত দূর এসে গড়ালো যে,
আমার বন্ধুরা আমাকে বললো আমার দুচোখ
ধুয়ে ফেলতে, রক্ত দিয়ে।

সবকিছু হঠাৎ আটকে গেল রক্তে।
প্রত্যেকটা মুখ, প্রত্যেকটা মূর্তি চার দিকে হয়ে উঠলো লাল।
রক্ত আছড়ে পড়লো সূর্যের উপর এবং ভাসিয়ে নিয়ে গেল
এর সোনা সোনা রঙ।

আগ্নেয়গিরির মতো চন্দ্র উগরে দিলো রক্ত এবং রূপালি
আভা এর, গেল নিভে। আকাশ আনলো বয়ে এক
রক্তের সকাল। আর রাত্রি কাঁদলো শুধু রক্ত-ক্রন্দন।

বৃক্ষগুলো শক্ত হয়ে পরিণত হলো রক্তের পিলারে।
সমস্ত কুসুম ভরে নিলো চক্ষু তাদের, অশ্র“তে।
এবং প্রতিটি চাহনী মুহূর্তে হয়ে গেল যেন তীর;

সে-তীর বিদ্ধ করলো সমুদয় রক্ত-মূর্তি।
এ রক্তের নদী বয়ে চললো শহীদদের নাম ধরে
কাঁদতে কাঁদতে… দুঃখে, ক্রোধে আর ভালবেসে।

এ নদী বইতে দাও। যদি এটা শেষ হয়ে যায়,
তাহলে মৃত্যুর বর্ণে ঢাকা ঘৃণা ছাড়া থাকবে না কিছুই
আর। হে বন্ধুরা, এমনটি ঘটতে দিও না কেউ;

বরং ফিরিয়ে আনো আমার সমস্ত অশ্রু-
এ এমন এক বন্যা, যা বিশুদ্ধ করবে আমার ধুলোয় ভরা চোখ
এবং যা ধুয়ে নিয়ে যাবে আমার দুচোখ থেকে সমস্ত রক্তের দাগ।

দৈনিক নয়াদিগন্ত হতে সংগৃহিত

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান