রাত্রি দ্বিপ্রহর। ঘুমহারা আমি এক প্রেমপোড়া কবি। অস্বস্তিতে হাঁটতেছিলাম একা
মৃত শালিখার পাড়ে। জ্যোৎস্নার প্লাবনে, যাচ্ছিল ভেসে চারিদিক। থৈথৈ জ্যোৎস্নাতে
দানব-আকার বটগাছ এক, ঘুমন্ত দাঁড়িয়ে ছিলো। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ স্বপ্নের মতো দেখা
শুভ্র সেই বটের ছায়ায়, তিন পাগলের সাথে।
কী এক ধেয়ানে
ডুবে ছিলো তিনটি পাগল, মাথা রেখে চুপচাপ দু-হাঁটুর মাঝখানে।
ঝড় কিংবা ভূমিকম্প কিংবা যুদ্ধবিগ্রহের পর
ধ্বংসস্তূপ বুকে নিয়ে পড়ে থাকে যেভাবে বিধ্বস্ত জনপদ, ভাঙা বুক নিয়ে
পড়ে ছিলো তারাও তেমন, জ্যোৎস্না ধোয়া আকাশের নিচে, যেন তিনটি জীবন্ত প্রস্তর।
সুষুপ্ত রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে খুকখুক ইচ্ছাকৃত কেশে উঠলাম আমি।
সে-শব্দে ঝপাং করে উচ্ছল নদীর পাড় ভাঙার মতন ভেঙে পড়লো ধেয়ান তাদের।
হাঁটু থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তারা। দেখে মনে হলো
তিন দরবেশ। কি-ভীষণ চিন্তার ভেতর এক, ডুবে ছিলো তিনজনই, মৎস্যের টোপ হয়ে
ডুবে থাকে বড়শি যেমন অথই পানিতে। কর জোড় করে বললাম, ‘মাফ করবেন, আমি এক কবি;
জানতে পারি কি, এত রাতে নির্জন নদীর পাড়ে এই, বটের তলায়, ঘুমহীন ক্যানো
বসে আছেন আপনারা, এইভাবে?’
প্রেম তাদেরকে এমন জাগিয়ে রাখে সারা রাত, তারা বললেন। প্রেম বরই কিংবা পেয়ারার
অন্তর খাওয়া পোকার মতন কুরে কুরে খায় হৃদয় তাদের, সুখ খায় স্বস্তি খায় সমস্ত সত্তার।
‘কে সে, যে এমন উন্মত্ততার কারণ আপনার, হে প্রেমিক?’ প্রথম জনের জড়বৎ হাতে
মৃদু নাড়া দিয়ে বললাম।
‘আগুনের মতো এক মেয়ে, মৃত্তিকার মেয়ে এক’, কি-শুকনো হেসে তিনি বললেন,
‘সুলতানা নওরোজ নাম।’
‘কে সে?’- দ্বিতীয় জনকে বলতেই, বললেন তিনি, ‘কী কবো হে তার কথা-
অমর্ত্যলোকবাসিনী সে এক অস্পৃশ্য হুর,
যার একটি আঙুল পাওয়ার ভেতর জীবনের যাবতীয় কামিয়াবি, পৃথিবীর সমুদয় সফলতা
হারায় অস্তিত্ব তার, যেমন নিখোঁজ হয়ে যায় সমুদ্রের ভেতর রাখলে সহস্র পুকুর।’
অতঃপর বললেন তৃতীয় প্রেমিক, ‘অনিন্দ্য সুন্দরী সেই হুর আর মৃত্তিকার মেয়ের শপথ,
অপূর্ব ছুরতে এরকম সৃষ্টি করেছেন যিনি, সুমহান সেই সত্তার-ই প্রেম
বিপদগ্রস্ত এমন করেছে আমাকে; মাতাল করেছে, নির্গৃহ, নির্ঘুম, বাউল, ভিখারি প্রেম।’
এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান