যেই আবর্তে গড়ে উঠি (খন্ডাংশ)

ধর্ম প্রসঙ্গে ভুলে গেলে চলবে না যে, দেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভুতি আর ধর্ম বিশ্বাস এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। বর্তমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এবং রাষ্ট্রের আনুকূল্যপ্রাপ্ত সেকুলারিস্টদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সত্য মিথ্যা যাই হোক, কুরআন এক প্রভাবশালী কিতাব। কুরআনকে ইচ্ছামত ব্যাখ্যা করে কুরআন প্রেমিক এবং কুরআন বিরোধী উভয় পক্ষই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে সন্ত্রাসবাদের শুরু কুরআনের ব্যাখ্যাকে আশ্রয় করেই। হযরত আলী (রাঃ) আর মুয়াবিয়া (রাঃ) যখন যুদ্ধের মাঠে মুখোমুখী হয়েছিলেন তখন বিশিষ্ঠ সাহাবীদের হস্তক্ষেপে আবু মুসা আশআারী (রাঃ) এবং আমর ইবনুল আসকে (রাঃ) দুই পক্ষের অছি নিয়োগ করে একটা মধ্যস্থতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই সময় রাতের অন্ধকারে যেসব সন্ত্রাসী আতর্কিত হামলা করে সেই শান্তি প্রকৃয়া নষ্ট করেছিল তাদের মধ্যে যেসব খারেজী ছিল তারা কিন্তু কঠিন পরহেজগার ছিল। তারা রাত জেগে নামাজ পড়ত। কুরআনের তিলওয়াত শুনলে অজ্ঞান হয়ে যেত। সেই খারেজীরা ফিতনা সৃষ্টি এবং হত্যার বিরূদ্ধে কুরআনের কঠোর হুশিয়ারী সম্বলিত অসংখ্য আয়াতকে উপেক্ষা করে কুরআন ঘেটে বের করেছিল যে- বিধান দাতা একমাত্র আল্লাহ (সুরা আনআমঃ আয়াত-৫৭, সুরা ইউসুফঃ আয়াত-৪০, ৬৭)। তাই ফয়সালাকারীর ভূমিকায় আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কাউকে তারা কাফের মনে করত। তারা হযরত আলী (রাঃ) এবং মুয়াবিয়া (রাঃ) উভয়কে কাফের বলে ফতোয়া দিয়েছিল। তাদের সন্ত্রাসী হামলার ফলে অনেক মুসলমানের প্রানহানী হয়েছিল। প্রানহানীর এবং গালাগালির ক্ষেত্রে তারা বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীদেরকে পর্যন্ত ছাড় দেয়নি। তালহা (রাঃ), যুবাইর (রাঃ), আয়িশা (রাঃ) সহ জামাল যুদ্ধে অংশ নেওয়া সব সাহাবীকে তারা কঠিন গুনাহগার মনে করত।

কিছুদিন আগে রুবায়েত ফেরদৌসের উপস্থাপনায় আরটিভির এক টক শোতে শাহরিয়ার কবির ইসলামী ফাউন্ডেশন অনুদিত কুরআন শরিফের একটা কপি নিয়ে এসেছিলেন। টক শোতে অংশ নেওয়া এক আলেমকে তিনি সেই কুরআন থেকে ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্থি নেই’ সেটা প্রমান করার চেষ্টা করছিলেন। দ্বীনের ব্যাপারে জবরদস্তির উদাহরন দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন- গত মাসে বগুড়ায় জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের তের জন কর্মীকে মসজিদে এনে তওবা করিয়েছে এবং তাদের বিরূদ্ধে মামলা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এই কাজটা করে থাকলে তা ঠিক করেনি। আর তার জন্য মামলা হওয়াটাই যথার্থ কাজ হয়েছে। আমরা এর বিচারটাও দেখতে চাই। কিন্তু বিষয়টার আলোচনা এখানেই শেষ করা সম্ভব হয় না। শাহরিয়ার কবির কুরআনের এক বা দুইটা আয়াত দেখিয়ে যখন জামায়াতের কোন কাজের সমালোচনা করেন তখন জামায়াতেরও সুযোগ সৃষ্টি হয় কুরআনের অন্য অনেক আয়াত দিয়ে তাদের অনেক কাজের বৈধ্যতা প্রমান করার। শাহরিয়ার কবির কুরআনকে একেবারে অগ্রহনযোগ্য কিতাব মনে করলে অন্য কথা। কিন্তু তার দেখানো কুরআনের কিছু অংশকে গ্রহন করতে হলে জামায়াত বা অন্য যে কোন ধর্মীয় গোষ্ঠী সেই একই কুরআনের যে বৃহৎ অংশকে অনুসরন করে আমাদের জন্য সেগুলোও মেনে নেওয়ার যুক্তিগত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়।

ইসলামকে উগ্র এবং চরমপন্থী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে আমাদের মৌলবাদী আর সেকুলারিস্ট উভয় দলেরই প্রায় একই রকম ভূমিকা আছে। এটা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমে শিক্ষাপ্রাপ্ত বৃটিশ আমেরিকান লেখিকা Lesley Hazleton. ২০১১ সালের ১৯ শে ফেব্রুয়ারী Young Muslim Association আয়োজিত এবং Islamic Center of America তে অনুষ্ঠিত রাসুলুল্লাহর (সাঃ) জন্মদিবস উদযাপন অনুষ্ঠানের Key Note Speaker হিসাবে তাঁর বক্তৃতায় কুরআন থেকে প্রসঙ্গ বর্হিভিূত এবং খন্ডিত রেফারেন্স দেওয়ার প্রবনতা এবং পরিনতি সম্পর্কে তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেনঃ

Reading the quran is far easier said than done. So instead of it actually been read, it’s ususally simply quoted. And I do mean simply. As for the flood of quotation from the Bible, the quranic quotations tend to be highly selective and out of context. In other words, they are not really quotations at all. They are misquotations. And it’s not only non Muslims who do this. What particularly interests me is that the people who use the quran this way are both Muslims and non Muslims. That is conservative Muslims and conservative Islamophobs. Both groups use what I call the highlighter version of the quran. Fitting each other the same out of context quotes, reinforcing each other’s prejudices and extremism to the extent of the highliter version often includes phrases that simply are there. Phrases that meet preconcieved expectations but aren’t the reality. So fundamental Muslims and non Muslim coservatives are basically partners in the sterotyping Islam as violent and extremist. (প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের বক্তৃতার পুরোটা শুনতে পাবেন এখানে।)

সুতরাং ইসলামের নামে সন্ত্রাস কায়েম করা আর মুক্ত চিন্তার নামে ধর্মকে অস্বীকার করা, যে উদ্দেশ্যেই হোক কুরআনের আয়াতের সুবিধাজনক ব্যাখ্যা করা সম্ভব। একারনেরই কুরআনের বহু জায়গায় বলা হয়েছে এই কিতাব সেই সব বিশ্বাসীদের জন্য উপকারী যারা সরল সহজ পথের সন্ধান করে। আমাদের ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিবিদ এবং সেকুলার, নাস্তিকসহ সকল পক্ষকে বুঝতে হবে ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যান নিশ্চিত করতে। মানবতার দোহাই দিয়ে সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য নয়।

হোসেন এম জাকির

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান