কিছুদিন আগে আমার দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাবা মারা গেলেন। অফিসে বসে খবর পেলাম রাত নয়টায় মোহম্মদপুর কবরস্থানে দাফন হবে। অফিসের পর অনেক ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে ছুটে গেলাম। শোকার্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার কিছু দুর্বলতা আছে। সারাটা পথই ভাবতে ভাবতে গেছি ওখানে গিয়ে কিভাবে ব্যাপারটা মোকাবেলা করব। যেয়ে দেখি ব্যাপারটা খুবই সহজ। তখনও লাশ এসে পৌঁছায়নি। আমাদের বন্ধুমহলের অনেকেই আছে। সেখানকার মসজিদের ভিতরে এবং বাইরে দাঁড়িয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে লাশের সাথে আসা আমার বন্ধুর সাথে হাত মেলাতে গিয়েই বুঝলাম জীবন চলছে খুব স্বাভাবিক গতিতে। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। শুধু খাটিয়ায় একজন শুয়ে আছে যার ভিতর কোনো চাঞ্চল্য নেই। জানাজার পরে কবরস্থানে গিয়ে দেখি পাশাপাশি এত কাছাকাছি গায়ে গা লাগিয়ে কবরগুলো যে তার মধ্যে হাটাচলা করা বা নতুন কবর খোড়া এবং লাশ নামানো এক দুরুহ ব্যাপার। আমি গ্রামের ছেলে। ফাঁকা জায়গায় বনের মধ্যে নিঃসঙ্গ কবর দেখে অভ্যস্ত। এটা আমার কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা। কবরস্থানে টিমটিমে লাইট জ্বলছিল আর সেই স্বল্প আলোয় কবরে মাটি দিয়ে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা যখন বন্ধুরা মিলে একটা গেট টুগেদারের আমেজে নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করছিলাম তখন সবাই ভুলেই গেছি ওটা কোন এক শোকের উপলক্ষ্য ছিল। আমি শুধু ভাবছিলাম সেই ব্যক্তির কথা যাকে আমরা কিছুক্ষণ আগে মাটির নিচে রেখে এসেছি আর দুনিয়ার সমস্ত বিষয় তার কাছে অতীত হয়ে গেছে। এই মানুষটাকে ভুলে যেতে কারোরই খুব বেশি সময় লাগবে না। আর কিছুদিন পর তাকে মনে করার মতোও বেশি মানুষ থাকবে না। আমি শুধু সেই মানুষটার জায়গায় নিজেকে কল্পনার প্রয়াস পাই। যা দেখি তাতে আমার নিজের ক্ষেত্রে এর থেকে আলাদা কিছু ঘটবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
আস্তিবাদী সাহিত্যিক আল বেয়ার কামুর আউটসাইডারের নায়কের মায়ের মৃত্যুর পর দেখানো উদাসীনতার কথা আগেই বলেছি। এটা এক সময় মূল্যবোধের ধারকদের প্রচন্ডভাবে ঝাঁকি দিয়েছিল। কিন্তু এখন বাস্তব জীবনে আমরা কী করছি? আমার দাদি শাশুড়িকে কবর দিয়ে ফেরার সময় দেখেছি আমার চাচাশ্বশুর বাজারের থলে হাতে বাজার করতে বেরুচ্ছে। সেই সন্ধ্যায় অস্তগামী সূর্যের আলোয় গঞ্জের হাটে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমরা গরম গরম সিঙ্গাড়া খেয়েছি। এটাই মানুষের জীবন। কারোর জন্যই এখানে কিছুই থেমে থাকে না। আর প্রত্যেকেই শেষ পর্যন্ত তার নিজের কর্মফলই ভোগ করবে।
এই বাস্তবতায় শুধু একজন মুমিনই জানে তার দুনিয়ার জীবনের কি ভুমিকা। তার কাছে মৃত্যু একটা দরজা মাত্র যেটা দিয়ে অনন্ত জীবনে প্রবেশ করা হয়। প্রতি মুহূর্তে মানুষ সেই দরজার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। সেই দরজায় দাঁড়িয়ে জীবনের সফলতা ব্যর্থতার হিসাব হবে দুনিয়ায় করে যাওয়া তার কাজের উপর। ‘হে মানুষ, তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকেই ধাবিত হচ্ছ, আর সত্যিই তুমি তার সামনাসামনি হবে। তখন যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে তার হিসাব সহজ করা হবে। সে খুশীতে নিজ পরিজনের কাছে ফিরে যাবে। আর যার আমলনামা তার পিছন থেকে দেওয়া হবে, সে তখন মৃত্যুকেই ডাকতে থাকবে। আর এভাবেই সে জ্বলন্ত আগুনে পুড়তে থাকবে। সে দুনিয়াতে তার পরিবার পরিজনের মাঝে আনন্দেই ছিল। সে ভেবেছিল তাকে কখনও ফিরতে হবে না। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তার প্রতিপালক তার উপর দৃষ্টি রাখছিলেন’ (সুরা ইনশিকাক, আয়াত-৬-১৫)।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান