জুলেখার শেষ জাল / সায়ীদ আবুবকর

জুলেখা ॥
এ কেমন পাখি তুমি, ঠোঁটরাঙা পাখি, টুকটুকে আম খাও না; কী ভস্ম
খেয়ে তবে বাঁচবে এ অদৃষ্টের বনে?

ইউসুফ ॥
জিকিরের চেয়ে কোনো শ্রেষ্ঠ ফল আছে,
তাকওয়ার চেয়ে কোনো উৎকৃষ্ট আহার, জানে না অধম।

জুলেখা ॥
রূপকথা খেয়ে তুমি আছো এতকাল,
আমের কী স্বাদ, পাখি, বুঝবে কী করে?
কী করে মাটির স্বাদ নেবে বলো ডাল
মাটি না ছুঁতেই যদি পারলো শিকড়ে?
দ্যাখো, এই গাছপাকা আম কি-অপূর্ব স্বাদ আর গন্ধ মেখে নিয়ে
কি-সহজ খাদ্য হয়ে, ঝুলে আছে ক্ষুধার্ত তোমার ঠোঁটের কাছেই!
হে ভীষণ একরোখা পাখি, একবার মিষ্টি ওই কুঁচ-কালো চোখ তুলে চাও,
আর ও-আলতারাঙা ঠোঁটে ছিড়েখুঁড়ে খাও এই আম-
খেয়ে দ্যাখো কেমন আরাম।

ইউসুফ ॥ (জনান্তিকে)
হায় খোদা! আমরা এখন এই পড়েছি তো এসে
ভীষণ মাতাল এক রক্তের বয়েসে;
অন্ধ এই অন্ধকারে অধমের জন্যে যদি না-ছড়িয়ে দাও হেদায়েত,
অদক্ষ চাষীর মতো ভুল ঘাসে, ভুল আগাছায়, ভরে ফ্যালে সুউর্বরা যৌবনের খেত।

জুলেখা ॥
হে কুমার, কি-সুন্দর তোমার ও-চোখ!
কাছে এসো, উত্তাল তোমার ওই নীলনদ চোখে
ময়ূরপঙ্খি এ চোখজোড়া রেখে দুরন্ত ঢেউয়ের ঘায়ে
ডুবতে ডুবতে- ডুবতে ডুবতে- আমি ডুবে যাই।

ইউসুফ ॥
হায়, নারী, একবার ভাবো সেই বীভৎস দৃশ্যের কথা, যখন মৃত্যুর পর
জ্বলন্ত মোমের মতো গলে গলে পড়তে থাকবে দীপ্ত এই চোখ, খসে পড়া আমাদের মুখের উপর।

জুলেখা ॥
হে যুবক, তবু আজ রঙধরা দুচোখের গাঙে উঠেছে যে পাড়ভাঙা যৌবনের ঢেউ,
তার কোনো মানে নেই? সেখানে, হে অর্বাচীন আনাড়ি যুবক, জাদুকরি হাতের পরশ রাখেনি কি কেউ?
মনে রেখো, মৃত্তিকার এই গ্রহে কিছুই ফেলনা নয়, মিথ্যে নয়, অর্থহীন নয়;
অতএব কাছে এসো, এইখানে, এই বুকে, আগ্নেয়গিরির মতো যেখানে অষ্টপ্রহর জ্বলছে জন্মান্ধ জারজ হৃদয়।
কাছে এসো, আরও কাছে- মিষ্টি করে একবার চাতক এ-চোখে তুমি রাখো তো ও-চোখ-
তোমাকেই বলছি- হে সুন্দর সুকেশ যুবক,
তোমাকেই ডাকছি এই পরিপক্ব, পুণ্য, ভরা আঙ্গুরের বনে;
যা কিছু ঐশ্বর্য আমার, দেবো তোমাকেই- সর্বাঙ্গে যা আছে আর থরেথরে সাজানো যা আছে এই মনে;
প্রেম দেবো, অর্ঘ দেবো, যন্ত্রণার জলোচ্ছ্বাস, বুক ভরে দেবো তীব্র ঝড়ের আবেগ;
হে দৃপ্ত দিব্যপুরুষ, কি-সুন্দর ঝাঁকড়া তোমার কৃষ্ণ কেশদাম, যেন রুদ্র বৈশাখের ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ
জমেছে একত্রে এসে
মাথার উপর; আর ওই মত্ত করা কেশে
পড়েছে হুমড়ি খেয়ে, ভুলে সব লোকলজ্জা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভয়,
আমার হৃদয়।

ইউসুফ ॥
এই কেশ শীঘ্রই নিশ্চক্ষু কবরের ক্ষুধার্ত ধুলোয়
খসে খসে পড়বে যখন, কেমন লাগবে দেখতে
সেই কেশদাম? শোনো, হে সম্ভ্রান্ত ঘরের সোনালি বধূ,
যৌবনের উন্মত্ত ঝলসানো আলোয় দুচোখে যা দেখছো সবই
নফসের ধোঁকা; ও-চোখের ধুলো সরে গেলে
বুঝতে পারবে, হে দিগ্ভ্রান্ত নারী, অশ্বের উপর নয়,
সওয়ার হয়ে আছো তুমি গাধার উপর।

জুলেখা ॥
আমার কী দোষ বলো, হে সুন্দর রোদেলা পুরুষ,
তোমার ও-মুখ যেন পূর্ণিমার পরিপূর্ণ চাঁদ; ও-মুখ দেখলে, হায়, থাকে কার হুঁশ,
মাথা থাকে ঠিক?
হয়তো এ মর্ত্যলোকের সমস্তই স্বপ্ন আর মিথ্যে-মরীচিকা;
কিন্তু ও-চাঁদমুখে জ্বলছে যে সুনির্মল সুকান্তির শিখা,
সেও কে অলীক?

ইউসুফ ॥
এই মুখ একদিন হয়ে যাবে কবরের মাটির খোরাক।
পচে ওঠা সেই মুখে, সদলে আসবে দিতে হানা
অনাহারী হিংস্র যত অন্ধ কালকীট;
অতঃপর তুমি আমি সকলেই হয়ে যাবো কীটদের নিশীথের থানা।

জুলেখা ॥
যাই, যাবো; তবু আজ একবার, শুধু একবার
হতে চাই, ইউসুফ, মান্না-সালওয়ার মতো তোমার আহার।
হে আমার আজন্ম স্বপ্নের সুন্দর পুরুষ, কাছে এসো, আরও কাছে,
সিংহের মতো এসো, ছোঁও আমাকে-

ইউসুফ ॥
এ কেমন জানাও আহ্বান, নারী? অথচ তোমার স্বামী,
মহামান্য আজিজ, আমার মনিব, আমাকে দিয়েছেন আশ্রয়;
কী করে করতে বলো বিশ্বাসঘাতকতা তার সাথে? আমি কি বিশ্বস্ত
হবো না একটি কুকুরের মতোও? হবো না একজন অনুগত,
কৃতজ্ঞ গোলাম? আর যারা কৃতজ্ঞ হয় না, তারা তো সফলকাম
হয় না কখনও।

জুলেখা ॥
হায়, মূর্খ! আদিম নিভৃতে আর বোবা অন্ধকারে আমাদের দুটি পরিচয় :
বর নয়, বধূ নয়, ভ্রাতা নয়, ভগ্নি নয়, প্রভু-ক্রীতদাসী নয়,
নয় রে মনিবপত্নী এবং গোলাম
দিবসরাত্রির মতো অনিবার্য দুটি নাম
অনিঃশেষ, অনশ্বর-
নারী আর নর।

ইউসুফ ॥
সে তো এক শিকড়বিহীন জান্তব জীবন!
কিন্তু এ সুসভ্য নশ্বর নগরে, আমাদের আছে এক সামাজিক মন
দুর্লঙ্ঘ নিয়ম আর সংস্কারে বাধা; তুমি তা, হে বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্টা নারী,
ভাঙতে হয়তো পারো, আমরা কি পারি,
অন্তরে যাদের আছে ভয়, হাবিয়ার?
তুমি যাকে আলো বলো আমরা তো তাকে বলি অন্ধকার;
তুমি যাকে প্রেম বলো আমরা তো তাকে বলে থাকি জেনা;
খোদার কসম, আর পিতা ইয়াকুবের বুজুর্গির কসম,
নষ্ট নীল নিষিদ্ধের কাছে ইউসুফ কোনোদিন মাথা নোয়াবে না।
(ঝড়ের গতিতে তিনি ছুটে যান দরোজার দিকে)

জুলেখা ॥
দাঁড়াও, যুবক, যেয়ো না হে- শোনো শেষ কথা-
তবু চলে গেল- জুলেখা, তোমার দেখলে তো মূর্খতা?
মাকড়সার জাল পেতে ধরতে তুমি চেয়েছিলে খোদার কেশরী!
বলো, কোথায় সে জাল আছে, সেই জাল পেতে আমি ওকে ফের ধরি;
তারপর পুরে রাখি অন্ধ এই হৃদয়ের সোনার খাঁচায়;
সে-খাঁচাও ভেঙে যদি পালিয়ে সে যায়,
তারপরও ছেড়ে আমি দেবো না তা হাল-
শেষ ধরা ধরার জন্যে, অরণ্যে অরণ্যে পেতে যাবো জাল।

ফৌজদারহাট
৩.৭.২০০১

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান