১.
শেষমেশ এলো সেই রাত।
২.
ফলবতী নারকেলগাছে ডানা ঝাপটায় রাতের বাদুড়।
৩.
যেন পৃথিবীর প্রথম পুরুষ, থরথর তার মুঠের ভেতর পুরে নিয়ে প্রথম নারীর একখানা হাত
কাঁপছেন নীল সুখে। বুকের ভেতর তার, ইঁদুরের মতো করে হুড়মুড়
ভালবাসা প্রেম দ্বিধা কাম ভয়
এবং হৃদয়।
৪.
যেন সব হিসাব নিকাশ হয়ে গেছে শেষ। যেন তার হাতে
একতোড়া স্বর্ণের চাবি তুলে দিয়ে বলা হলো- ‘শান্তিশহর ওই, দ্যাখো জান্নাত;
একে একে ভাগ্যের সব তালা খুলে, বাধা-ভয়হীন তুমি যাও জান্নাতে।’
৫.
বোরখার দরোজা খুলেই, চোখ দুটো তার পুকুরের জল হয়ে, হয়ে গেল থির;
কি-ভীষণ উত্তেজনায়, তবু, নিষিদ্ধ সব অধিকার হাতে নিয়ে, কেঁপে কেঁপে ওঠে তার অতিষ্ঠ হাত
এবং শরীর-
এ-কি!
৬.
কোথায় হৃদয় থাকে, দেখি;
এই বলে অতঃপর তিনি অপটু দু’হাতে খুলে ফেলে পট্পট্ করে বুকের বোতাম,
দেখতে পেলেন শ্বেত বুকের থালায় কে যেন রেখেছে ছুলে আলতার মতো লাল পাকা দুটো আম।
৭.
বুঝলেন, জান্নাত বটে।
তাহলে নিকটে
নহর কোথাও কোনো আছে নিশ্চয়ই-
এই ভেবে খুলে ফেলে একটানে ভয় আর দ্বিধার সায়াও,
দেখতে পেলেন নীল গুহার নিচেয় শান্তিনহর এক করে থইথই
যৌবনজলে। শুধু নেই সে-নহরে মাঝি আর নাও।
৮.
বুকের ভেতর বসে কেবা যেন বলে,
বলে না তো, গেয়ে ওঠে নেশাধরা গান :
‘নৌকা ভাসাও, মাঝি, এ শান্তিজলে।’
তাই শুনে ছুঁড়ে ফেলে সব পরিধান,
আম খায় আর মাঝি মারে জোরে দাঁড়-
সে-আঘাতে ভেঙে পড়ে নহরের পাড়।
৯.
সব ক্ষুধা শেষ হলে, জ্বলে ওঠে আরো এক অন্তর্গত
ক্ষুধার আগুন। সে-আগুনে নয়, যেন গনগনে মাটির চুলোতে
তেতে ওঠা হাঁড়ির ভেতর, টগবগে সরিষার তেলে, পিচপিচ ইলিশের মতো
ক্রমাগত ভাজি হতে হতে
শান্তিক্লান্ত মাঝি ‘হৃদয় হৃদয়’ বলে ওঠে হাহাকার করে
বুক রেখে, হৃদয়মুলুক রেখে, যেন পৃথিবীর প্রথম নারীর বুকের ভেতরে।
১০.
অতঃপর ডুবুরির মতো ঘুটঘুটে দেহের অন্ধকারে খুঁজতে খুঁজতে তিনি হৃদয় হীরক
খুঁজে খুঁজে পান শুধু আরো অবশ অন্ধকার। তারপর নীল ক্লান্তির হেমলক
পান করে যেন, মেখে নেন শরীরের রোমকূপে-কূপে মুছে যাওয়া সভ্যতার ঘুম,
হিমালয় আর সমাধির নিজ্ঝুম।
১১.
ঘুম ঘোরে আচানক পান তিনি টের, ঘুমের ভেতর তার ঘুম ভেঙে দিয়ে কোত্থেকে ভেসে আসে
সুতীব্র হৃদয়ের ঘ্রাণ, চেতনার বাতাসে বাতাসে।
১২.
ঘুমের ভেতর তারপর ঘুম থেকে উঠে, পৃথিবীর প্রথম পুরুষ যেন, প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো
পৃথিবীর প্রথম নারীর রহস্য-আবৃত দেহের অন্ধকারে ঢুকে
অবিরত
সারাঙ্গ শুঁকে শুঁকে
বুঝতে থাকেন, কোত্থেকে ভেসে আসে
সুতীব্র ঘ্রাণ এই, সুখদ, মধুর, নিশ্বাসে নিশ্বাসে।
বায়তুলআমান, বিনোদপুর
১৯৯৫
এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান