অদ্ভুত এক জনপদের কাহিনী / সায়ীদ আবুবকর

অদ্ভুত এক জনপদের মধ্য দিয়ে পথ চলতেছিলাম আমরা, যাকে
বীভৎস অন্ধকার এক, আষ্টেপৃষ্ঠে অবরোধ করে রেখেছিল, রোদপোড়া
এঁটেল মাটির মতো প্রতিবাদে ফেটে পড়া মারমুখো জনতা যেভাবে
স্বৈরাচারের উৎখাতের জন্যে অবরোধ করে রাখে রাজপথ-রেলপথ।

আমরা অন্ধের মতো চারদিকে খাঁ খাঁ অন্ধকার ছাড়া দেখতে পাচ্ছিলাম না
কিছুই। শুধু শুনতে পাচ্ছিলাম বাতাসে বাতাসে মানুষের শৈল্পিক কথাবার্তা, ঘরে ঘরে
বিষণ্ন বেদনার বাঁশি, প্রেমবাদীদের কণ্ঠে কণ্ঠে বিরহের গান; আর শুধু কানে এসে
লাগছিল নর্তকীদের পায়ের আঘাতে আর্তনাদ করে ওঠা নূপুরের আওয়াজ।

আমরা কাউকে জিজ্ঞাসা করলাম, এসবের রহস্য কী, বলবেন কি আমাদের?

সে বললো, আমরা আলোর জন্যে এইভাবে ঘরে ঘরে কবিতা আবৃত্তি করি,
বাঁশি বাজাই এইভাবে, বুকভাঙা গান গাই, আর আমাদের নর্তকীরা বিবস্ত্র হয়ে নাচে।

‘হে জনপদবাসীরা, শুনুন’ বলে ইস্রাফিলের শিঙার মতো আমরা চীৎকার করে উঠলাম।
আমাদের শহরের বৈদ্যুতিক বাল্বগুলো ধপ্ করে হঠাৎ যেভাবে একসাথে নিভে যায়
সেইভাবে সমস্ত সঙ্গীত, বাঁশির বেদনা, নূপুরের আর্তনাদ ঝম্ করে থেমে গিয়ে
গোটা জনপদটাই, মনে হলো, হয়ে পড়েছে হঠাৎ করে শাহমখদুমের অবাক মাজার।

‘হে সম্মানিত জনপদবাসীরা,’ আমরা বলে চললাম, ‘আমরা এমন এক শহরের
অধিবাসী, যেখানে রাত্রি নেমে এলে ঘরে ঘরে হারিকেন জ্বলে ওঠে, মোমবাতি, ধূপ,
বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বলে ওঠে। তখন দুদ্দাড় করে আমাদের গৃহ থেকে, সভ্যতার ফাঁকফোক
থেকে শংকিত অন্ধকাররা পালায় সেইভাবে, যেভাবে বিড়াল দেখলে পালায় ইঁদুর।

‘এ কেমন রূপকথা, কবিতা আবৃত্তি করেই আপনাদের বাসগৃহে আলো জ্বালাতে চান
আপনারা! গান গেয়ে, নৃত্য করে, বাঁশি বাজিয়ে বেহায়া অন্ধকারকে তাড়িয়ে দিতে
চান, যেরকম টিন বাজিয়ে লিচুগাছের বাদুড় তাড়ায় গাঁয়ের মানুষ। হায়, আপনারা কি
আদিম মানুষদের প্রস্তর ঘষে আগুন জ্বালানোর সেই ইতিহাসের কথাও বিস্মৃত হয়ে গেছেন?’

আমাদের কথা শুনে বিস্মিত জনপদবাসীরা হো হো করে হেসে উঠলো একসাথে।
অতঃপর সমস্বরে আদিম মানুষ আদিম মানুষ বলে আমাদের সারা গায়ে
ছুঁড়ে মারলো দলা দলা অবজ্ঞার থুথু। তারপর আগের মতোই ঘরে ঘরে চারদিকে
বেজে উঠলো বিষণ্ন সেই বেদনার বাঁশি, বিরহের গান, কবিতা আবৃত্তি আর পৈশাচিক নাচ।

খালধার রোড, যশোর
২৯.১.১৯৯৭

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান