তিনি প্রকাশিত হতে চাইলেন। ফলে সৃষ্টি হলো মহাবিশ্ব। সৃষ্টি হলো পাহাড়পর্বত, সাগর, নদী, অরণ্য, আকাশ। সৃষ্টি হলো চন্দ্র, সূর্য, নীহারিকা, ছায়াপথ, অন্ধকার, আলো। বাঘ, সিংহ, ভাল্লুক, হরিণ, গরু, ভেড়া, ছাগল, কুকুর। এমনকি আরশোলা, সাপ, কেঁচো। বিদ্যুৎগতি ফেরেস্তা, জিন। আদম, হাওয়া।
মানুষ বললো, আমরা তোমাকে দেখতে পাবো না চোখে? তিনি বললেন, চক্ষুষ্মানরা দেখতে পাবে। আমাকে শুনতে পাবে, যারা হবে কানের মালিক। যাদের নাসিকা আছে, তারা নেবে আমার সুঘ্রাণ। হৃদয়ের অধিকারী যারা, তারা তো নিবিড়ভাবে অনুভব করতে পারবে আমাকে।
এরপর তিনি রাজনীতি, রাষ্ট্র, জ্ঞানবিজ্ঞান ও ভালোমন্দ সৃষ্টি করে ছড়িয়ে দিলেন মানুষের মধ্যে। তিনি সৃষ্টি করলেন প্রেম, সৃষ্টি করলেন ঘৃণা। সৃষ্টি করলেন মধু, সৃষ্টি করলেন তিতা। দিবস ও রাত্রিকে সৃষ্টি করে বললেন, পরস্পর পরস্পরকে স্পর্শ করো তো!
তারপর কিছু মানুষ ফিরে গেল তাঁর কাছে। তিনি বললেন, তোমরা কি দেখতে পেয়েছিলে আমাকে? তাদের অধিকাংশই তাকিয়ে রইলো ফ্যালফ্যাল করে, যেন তারা জন্ম-বোবা, শোনে না কিছুই, বোঝেও না কিছু। শুধু কতিপয় লোক মুখ খুললো সানন্দে। একজন বললো, ‘আমি তো কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাত, ময়ূরের ফুলানো পেখম, রমণীর দু-স্তনের চূড়া, বর্ষার স্নিগ্ধতা, অথৈ অরণ্যের সবুজের অন্ধকার, দূর্বাঘাসে জমে থাকা ভোরের শিশির আর মহাসমুদ্রের বুকে আছড়ে আছড়ে পড়া তরঙ্গের স্তুপ দেখে বুঝতে পেরেছিলাম- এ তোমার অপরূপ রূপেরই নমুনা।’ একজন বললো, ‘আমি তো ধ্বনির ভেতর দেখতে পেয়েছিলাম তোমাকে। বসন্তের কোকিলের গান, বর্ষার মেঘের গর্জন, হেমন্তের বাতাসে দোয়েলের শিস, পাহাড়ি ঝর্ণার উদাস করা সুর, সাগরের উথলে ওঠা ঢেউয়ের সরদ আর মানুষের কণ্ঠে বাজতে থাকা অপূর্ব তোমার অমৃত বাণী আমার কর্ণকুহরে ঢুকতেই আমার সত্তার ভেতরে আমি দেখতে পেয়েছিলাম তোমাকে।’ আরেকজন বললো, ‘আমি বকুলের ঘ্রাণ নিয়ে চমকে উঠেছিলাম। আমি কাঁঠালিচাঁপার কাছে গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, কে দিলো তোমাকে এই বাস? রাতের হাস্নাহেনা আমার ঘুমের ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছিল সুবাসের মাদকতা। আমি বর্ষার কদম, প্রাতের শিউলি আর পুকুরপাড়ের লেবুফুলে নাক রেখে চোখবুজে দেখতে থাকতাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া তোমার সুঘ্রাণের আলো।’ সর্বশেষ ব্যক্তিটি বললো, ‘আমি আমার প্রথম সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে দেখতে পেয়েছিলাম তোমাকে। আমার হৃদয়ে বর্শার ফলার মতো বিঁধে থাকা এক মানবীর রক্তজবা প্রেম খুলে দিয়েছিল আমার দুচোখের দরোজা। আমি যেন সাত আসমান পার হয়ে ছুটে গিয়েছিলাম এমন কোথাও যেখানে এসে মিশে গেছে মহাকালের স্রোত। তার চারদিকে কোকিলের গান, গোলাপের আশ্চর্য সুবাস, প্রভাতের কোমল রোদ্দুর। আমি এক অরণ্যের মাটিতে হাতির পায়ের ছাপ দেখে ঠিকঠিকই বলে দিয়েছিলাম এ অরণ্যে হাতির বসবাস। আমার বন্ধুরা আমার কথার সত্যতা প্রত্যক্ষ করে বিস্মিত হয়েছিল। কিন্তু তারা অবিশ্বাসে সরিয়ে নিয়েছিল মুখ যখন তাদেরকে আমি বলেছিলাম তোমার উপস্থিতির কথা। আমি বলেছিলাম, অথৈ এ সমুদ্র আমাকে বলছে তিনি আছেন, পাহাড় আমাকে বলছে তিনি আছেন, ও আকাশ আমাকে বলছে তিনি আছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছিল, তাহলে আমরা তাঁকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? আমি বলেছিলাম, কারণ তোমাদের দুচোখের মণির উপর পর্দা পড়ে গেছে; ফলে তোমরা আর দেখতে পাবে না। তারপর, আপনি তো জানেন, হায়েনার মতো কিভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারা আমার উপর, আমাকে টুকরো টুকরো করে পুঁতে দিয়েছিল মৃত্তিকার নিচে। হায়, তারা যদি বুঝতো! তারা যদি দেখতে পেতো! তারা যদি অন্ধ না হতো জন্মান্ধদের মতো!’
৯.৯.২০১০ ঝিনাইদহ
এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান