ব্যথার বাঁশি / সায়ীদ আবুবকর

জানতে চাইলাম, সঙ্গীতকে কি হারাম করা হয়েছে?
তিনি বললেন, যে-সঙ্গীতে শরীর নাচে, আমি তার কথা বলতে পারবো না; কিন্তু যে-সঙ্গীত হৃদয় নাচায়, আমি তার সম্বন্ধে দুএকটা কথা বলতে পারবো।

তাহলে কি ধরে নেবো কিছু কিছু গান হারাম করা হয়নি?
-যে সমস্ত গান শুনে হৃদয়ের অন্ধকার আনন্দে কেউটের ফণা তুলে নাচে, আমি তাদের কথা বলতে পারবো না; কিন্তু যে সমস্ত গান আলোর ফল্গুধারা বইয়ে দেয় মনে, তাদের সম্বন্ধে দুএকটা কথা বলতে পারবো আমি।

পরিস্কার করে বলুন।
-কী হবে তার বাহির পরিষ্কার করে, ভেতরই যার ময়লা-আবর্জনায় ভরা? শোনো, আমরা একবার একটি শহরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেখানে নর্তকীরা অর্ধনগ্ন হয়ে রসের সঙ্গীত পরিবেশন করছিল। যুবক ও  যুবতীরা করতালি দিচ্ছিল সোল্লাসে, আর তারা রাত্রির অপেক্ষা করছিল, যাতে তাদের জ্বলে ওঠা শরীরকে তারা সিগারেটের মতো পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিতে পারে। নৃত্য শেষ হলে আমরা হঠাৎ তাদেরকে আহবান জানালাম এক নৈশভোজের দিকে। আমাদের আমন্ত্রণ তারা গ্রহণ করলো সাগ্রহে কারণ তারা ধরে নিয়েছিল তাদেরকে নিশ্চয়ই কড়া কোনো পানীয় উপহার দেবো আমরা, যা তাদেরকে আরো নেশাগ্রস্ত করে তুলবে। কিন্তু তারা ভ্রু কুঁচকালো তাদের জন্যে পরিবেশিত পানাহার দেখে। আমরা বললাম, বেজার হবেন না, আপনাদের জন্যে বিশেষ এক সঙ্গীতানুণ্ঠানের আয়োজন করেছি আমরা এরপর। পানাহার শেষে কান খাড়া করে বসে রইলো তারা। হঠাৎ ব্যথার বাঁশি বেজে উঠলো স্টেজে। তাদের মনে হলো মহাসাগরের ঢেউ যেন আছড়ে পড়েছে হলঘরে। তারা সব হাহুতাশ করে উঠলো শোকে।  কিন্তু বাঁশির সুর তীব্রতর হয়ে উঠতেই তারা নেচে উঠলো আনন্দে, যেভাবে হেমিলনের অদ্ভুত হৃদয় অবশ করা বাঁশি শুনে নেচে উঠেছিল সে-শহরের সমস্ত ইঁদুর। তারপর আমরা জুড়ে দিলাম একসাথে আমাদের বেদনার সঙ্গীত। শরীরের নিচে চাপা পড়া তাদের আত্মাগুলো মাথা তুলে দাঁড়ালো আলোয়। তাদের দুচোখে খেলতে লাগলো পানি। অতঃপর হেমিলনের বংশীঅলার মতো তাদের আত্ম্াগুলো নিয়ে আমরা ছুটে চললাম জ্যোৎস্নাস্নাত এক ক্রন্দনের দেশে।

৯.৯.২০১০ ঝিনাইদহ

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান