অমরতার আলেয়া / আল মাহমুদ

সবাই বলে পার হয়ে যাও। আমি হন্তদন্ত হয়ে
অতিক্রম করেছি নদী। পরামর্শ কিংবা বলা যায়
অনুচ্চারিত দৈববাণীর ধমক আমার কর্ণকুহরে
ক্রমাগত আছড়ে পড়তে থাকে, পার হয়ে যাও।
আমি আমার ক্ষত-বিক্ষত হাঁটুর খটখটানি তুলে উল্লংঘন করি
গৌরীশৃংগ। তবু সেই দৈবাদেশ এবার শ্রবণেন্দ্রিয় থেকে
সরে গিয়ে হৃৎপিন্ডের দুলুনিতে বাজতে থাকে, পার হও! পার হও!
কেন পার হবো? কাকে পার হবো? আমার সামনে তো পার হওয়ার মতো
রয়েছে কেবল এক চির দুঃখিনী নারীর ভীত-ত্রস্ত শেষ
আবরণখানি। যা অনাবৃত করলেই বাংলাদেশের মাটি
আমি কি আমার জন্ম দুঃখিনী, জন্মদায়িনী জীবনের
বলিরেখাযুক্ত গৌরব ভূমিকে
অতিক্রম করে চলে যাবো?

সমুদ্র সাক্ষী, আমি পৃথিবীর অফুরন্ত লোনা পানির শপথ
উচ্চারণ করি- অমরতা আমার কাম্য নয়। আমি পৃথিবীর
সব পর্বতচূড়াকে লাথি মেরে ফিরে এসেছি। আমি
এক গান্ডুষে শুষে নিতে পারি ভর-যৌবনা ভাদ্রের
তরঙ্গায়িত যমুনাকে। কিন্তু আমি অতিক্রম করতে পারি না
ঐ কুন্ডলিত নাভিকে যার তলদেশ আমাকে উদগীরণ করেছে।

আকস্মিক বন্যা বানভাসি মানুষ যেমন কেবল হারিয়ে যাওয়া
মাটির তালাশেই দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য  হয়ে অপেক্ষমাণ থাকে,
আমিও নিঃশ্বাস বন্ধ করে হাত দিয়ে চেপে ধরব আমার
জন্ম-মৃত্তিকার ফাটলযুক্ত এই অফুরন্ত চরভূমিকে।
যাকে অতিক্রম করে এদেশের কোনো কবি কোনো কালে
অমরতার খাতায় নিজের নাম লিখতে চায়নি।

আমি জানি, আমার ক্ষত-বিক্ষত বিচরণশীল বন্যার পর
সদ্য শুকনো পা দু’খানি গেঁথে গেছে চরের কাদায়।
আমার পোশাক টেনে ধরেছে শ্যামাঙ্গিনী শত সহস্র
পল্লী বালার কর্মঠ বাহু। তাদের দীর্ঘ বেণী
সাপের মতো ফণা তুলেছে আমার দু’চোখের মণিতে।
আমি তাদের অতিক্রম করে কোন অমরতার
বিদ্যুতে অন্ধ হতে যাবো? দেখো, আমি দেবে যাচ্ছি
মাটির ভেতর মাটি হয়ে।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান