সারা জীবন আমি উদ্ভট স্বপ্নের মধ্যেই পাশ ফিরে শুয়েছি। দুঃস্বপ্নের
উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে বালিশের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে সান্ত¦না খুঁজেছি।
ভেবেছি, ওটা ছিল স্বপ্ন। সম্ভবত আমি ঘুমকাতুরে লোক বলে
খোয়াবের জ্বীন আমার পিছু ছাড়তে চায় না, ঘুমের শুরুতেই
অস্বাভাবিক একটা শিরশিরানি আমার হৃৎপিন্ড থেকে নিঃসৃত হয়ে
মস্তিষ্কের সব স্বপ্নের খুপড়িতে ফোকাস ফেলে। আমি দেখি
গাছগুলো স্থান ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছে।
আর আমার পরিচিত সব মানুষ গাছের মতো স্থানু হয়ে
দাঁড়িয়ে আছে। এ ধরনের স্বপ্নে দ্রুত ঘুম টুটে যায়।
আমি বলে উঠি, এ তো স্বপ্ন। মিথ্যা প্রবোধে চৈতন্যের
ডালপালা কয়েকটা হলুদ পাতা ঝরিয়ে দেয় বটে। কিন্তু
আমি বিছানায় উঠে ঠায় বসে থাকি।
এখন এই সত্তর বছর বয়সে যেখানে ঘুমের কোনো বালাই
আমাকে আর ছুঁতে চায় না, তখন এসব কী দেখছি! এ তো কোনো
স্বপ্ন নয়। পশু, প্রকৃতি, বৃক্ষরাজি ও নদ-নদীর মাছের ঝাঁকেরা
আমার কাছে আমার কানে নাঁকিসুরে কাঁদছে কেনো?
আমি এখন আর বঞ্চিতা বুক চাপড়ানো নারীর কান্নার সাথে
প্রকৃতির রোদনধ্বনিকে আলাদা করতে পারিনা। আমি কোনো কিছুরই
প্রতিপালক তো নই। আশ্রয় বা প্রশ্রয়দাতা নই। তবু
মানুষ ও প্রকৃতির বিলাপ আমাকে দেয়াল ফুটো করার
যন্ত্রের মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে কেনো?
আমি শৈশবে দুঃস্বপ্ন দেখতাম। সে-জন্য আমার মা আমার
বাজুতে চেপ্টা কবজ বেঁধে দিয়েছিলেন।
সে-সব তো ছিলো স্বপ্নের ব্যাপার, ঘুমের প্রতিক্রিয়া।
কিন্তু দেখো, আমি দু’চোখ মেলে আছি। যা কিছু চোখে
পড়ছে সবই তো উদ্ভট আর কানফাটা বিস্ফোরকের শব্দ।
রক্তের ফোয়ারা, ছিন্ন-ভিন্ন মানুষের পিন্ড। বিশ্বাস করো,
আমি তো জেগেই আছি। স্বপ্নের ঘুন আমি আমার লাল
কলজে থেকে নখ দিয়ে খুঁটে খুঁটে দূরে ফেলে দিয়েছি। আমাকে
এই জাগ্রত পীড়ন থেকে আবার নিদ্রাচ্ছন্ন করে দেয়ার কোনো
ঘুমের বড়ি কি কেউ বাজারে ছাড়তে পারেন না? কিংবা
কোনো রুপোর মাদুলি, যা গলায় ঝুলিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকবো?
রাত্রি, ০৪/১০/২০০৪
এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান