জাহরা ভাদুগড়ী / আল মাহমুদ

মাঝে মাঝে মেয়েটার কথা মনে পড়ে। এসেই বলতো, আমি জাহরা বানু। তিতাস পাড়ে বাড়ি। ঘন ঘন কলিংবেল চেপে সে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিত। কেউ দরজা খুলে দিলে হাসত, আমি জাহরা। স্যারকে কবিতা শোনাতে এসেছি। আমি পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। হাসতাম। মৃদু হাসতাম। হাতের ইঙ্গিতে বলতাম, ভেতরে এসো। লম্বায় তালগাছের মতো সটান। এলো খোঁপা বাঁধা। দেখতে শীর্ণকায় কিন্তু তার স্বাস্থের দীপ্তি ছিটকে পড়তো চোখ থেকে। ভ্রু জোড়া তুলির টানের মতো নিখুঁত। ললাটে বিদ্যুৎ বিভা। কাঁধে ঝোলানো একটা খদ্দরের লম্বা ব্যাগ। ধুলোমলিন স্যান্ডেল ভরা-পা। অসমান নোখ। দাঁতগুলো মুক্তোর মতো সাদা। ঝমঝমিয়ে হাসির শব্দ তুলে সে এসে বৈঠকখানায় পা  ভাঁজ করে বসে পড়তো। আমি পীড়াপীড়ি করলেও সোফায় বসত না। মেঝেয় ছড়িয়ে দিত কবিতার আয়োজন। আমি তার পাশেই সোফায় বসতাম। তার কাঁধ দেখতাম। হেসে বলতাম, জাহরা এবার কতদিন পরে এলে?
কোত্থেকে এলে বল তো?
মেয়েটার ছোট্ট উত্তর, ‘দেশ থেকে স্যার’। দেশ বলতে জাহরা বানু কি বোঝাতো তা আমি জানি।
আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত এক স্রোতস্বিনী। নদীর পাড়ে হিজল, তাল ও তমালের ছায়ার নিচে কয়েকটা কুঁড়েঘর। ছন, শন ও পাটের দড়িতে দাঁড় করানো অস্থায়ী মানুষের বাসা। বাবুইয়ের বাসার দক্ষতাটুকুও নেই এসব ঘরবাড়িতে। জাহরার দেশ।

জাহরা উত্তেজনায়, লজ্জায়, লাবণ্যে বাঁকা হয়ে আছে। ঝুলি থেকে টেনে বের করেছে লাল একটা মোটা খাতা। ‘অনেকগুলো কবিতা লিখেছি স্যার। আপনাকে শোনাবো বলে এতদূর এসেছি’। জাহরার এতদূর শব্দটার মধ্যে ট্রেনের হুইসেল। একটা ইঞ্জিনের নৌকার ছলছল শব্দ, আর শিমরাইল বাজারের পাশ দিয়ে, তরমুজের ক্ষেত পেরিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা।

জাহরা পড়তে শুরু করল-
আমার চোখ তার খাতার দিকে। তার মুখ, বাহু ও শরীরের দিকে। জাহরা উত্তেজনায় কাঁপছে। তার এলোমেলো অক্ষরের মতো ডানা মেলে হাঁফাচ্ছে। খাতায় যত না অক্ষর তার চে’ বেশি আবেগ। আগুন। শিখা। আবেগে উদোম হয়ে যাচ্ছে তার আঁচল। অপুষ্ট বুক দু’টি ঘামে ভিজে থির থির করছে। বুক সামলাতে গিয়ে নাভি উদোম। গর্ত। যা আমাদের গ্রামের বাড়ির পাতকুয়ার ঠান্ডা পানির বালতি আমার মাথায় উপুড় করে দিচ্ছে। জাহরা লজ্জাবতী, তার সাধ্যমতো আব্রু ঠিক করে আমাকে শোনাচ্ছে শব্দ। আমার মুখে ঠেসে ধরছে চিত্রকল্প। আমার কানের ভেতর কালো বিষাক্ত ভ্রমর।

বহুদি আমার ফ্লাটের দরজায় আর ওইভাবে ঘন ঘন বেল বেজে ওঠে না। বাড়ির ছেলেমেয়েরা বিব্রত হয়ে গেটের দিকে ছুটে আসে না। আমরা কতই তো দরজা খুলি আর লাগাই। কিন্তু কেউ বলে ওঠে না আমি জাহরা বানু ভাদুগড়ী। আমি মেয়েটার কথা ভাবি। বেঁচে-বর্তে আছে তো? বিয়েশাদী?
ভাবি জাহরা আছে। নিশ্চয়ই কোথাও আছে। হয় এ মাটির ওপর হাঁটছে কিংবা আবার মাটিতে মিশে গিয়েছে। এই মাটিতে।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান