শূন্যতাকে মানি না / আল মাহমুদ

শুধু চোখের দৃষ্টি কমে এসেছে এমন নয়। বিচরণের ক্ষমতাও এখন ক্লান্ত। অথচ
নিত্য বিচরণের ক্ষেত্র হে আমার পৃথিবী, হে আমার মহাদেশ, হে আমার
দেশ, আমার গ্রাম ও আমাদের শহর আমার পা আর উঠতে চায় না। আমার
দেহের সবচেয়ে ব্যবহৃত অঙ্গ-প্রতঙ্গের মধ্যে এ প্রাচীন পদদ্বয়
আমাকে জানান দিচ্ছে গাছের মতো কিছুকাল স্থানু হয়ে থাকতে।

বৃক্ষের স্বভাব আমি বুঝতে পারি। কিন্তু গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে
অন্তর্হিত হওয়ার বাসনাই আমার প্রবল। আমি থাকব না- এর চেয়ে
যৌক্তিক বার্তা এখন আমার মধ্যে কাজ করে না। যখন ভাবি থাকব না তখন
আড়চোখে তোমাকে দেখি। সহসা মনে হয় তুমি যেন সেই
লালগ্রহটি যা আজ সকালে সঙবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। ‘স্পিরিট’ নামক
রোবট ক্রমাগত পাঠিয়ে চলেছে মঙ্গলের ছবি। রক্তিম আভাযুক্ত
ধূসর প্রান্তর। মাঝে মাঝে নীলাভ শিলার স্তূপ।
কোমল ও কঠনে মিলিয়ে যেন হুবহু তুমি।

আকাশের কথা ভাবলে মানুষের দৃষ্টি ফিরে আসে। কিন্তু মানুষের
জ্ঞানের ধাবমানতা কোনো-না-কোনো ধূসর কংকরময় পানি শূন্য
গ্রহে গিয়ে কেন আছড়ে পড়ে? আসলে মানুষের জ্ঞান
শূন্যে ভেসে বেড়াতে চায় না। অন্তহীনতায় লুপ্ত হতে চায় না।

জ্ঞান মাত্রই আশ্রয় যাচে। ভর রেখে দাঁড়াতে চায়। যেমন
সংসারের শূন্যতার মধ্যে আমি তোমাকে ধরে আছি। তুমি
শুক্র বা মঙ্গল নও। কিন্তু কবিতার ভর রাখার এক
মায়াবী উপগ্রহ তুমি। তুমি কিংবা আস্ত একটি গ্রহ।

ঊর্ধ্বলোকের চিন্তা স্বভাবতই আমাকে ঘিরে আছে। তুমি তো
জান আমি নিঃশেষ হওয়ার , লুপ্ত হওয়ার বা মিলিয়ে যাওয়ার
যুক্তিকে অগ্রাহ্য করি। আমার আধ্যাত্মিক চেতনা আমার
অনিঃশেষ হওয়ার বিশ্বাসকে এমন দৃঢ়তর করে তুলেছে যে মাঝে মাঝে
ভাবি বুঝি বা তোমার উপর ভর না রাখলেও আমার চলে।
আমি কোনো শূন্যতাকেই মানি না। বিলুপ্তিকে মানি না। কারণ আমি
চোখের সামনে আমার অনন্তের আবাসস্থল দেখতে পাচ্ছি। সেখানে
তোমাকে ফিরে পাওয়ার বাসনাই তো আমার প্রেমের মূলশক্তি।
তুমি একটি পালংকে হেলান দিয়ে বসেছ। এই দৃশ্যের-
আর শেষ হয় না।

জানুয়ারি ০৮, ২০০৪ রাত্রি

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান