জিদের শহর / আল মাহমুদ

জিদের শহরে আছি। এ শহরে কেউ বুঝি মচকায় না কোনোদিন।
হেলে পড়ে না, কাত হয় না, চিৎ হয় না।
কেবল আকাশের দিকে মাথা তুলে গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
মৃত্যুর গর্জন কিংবা বিদ্যুতের ঝলসে ওঠা দেখে পাখিরা অন্ধকারেও ঝাঁপ দেয় যেখানে, পশুরা পালায়।
ওই তো একটা চিতল হরিণী দিগ্বিদিব জ্ঞানশূন্য হয়ে কেওড়ার কাঁটায় ঝাঁপ দিচ্ছে।
ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাপ্লুত শরীর নিয়ে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে চলে যাচ্ছে বরাহের দল।
অজগর হাঁ গুটিয়ে ডুবে যাচ্ছে মাটির ফাটলে।
কিন্তু এই জিদের শহরে দাঁড়িয়ে আছি তুমি আর আমি।
কী হতো একটু কাত হলে? একটু নুয়ে পড়লে? ঠাস ঠাস শব্দে
ছুটে আসা সীসের পিন্ড চলে যেত কানের পাশ দিয়ে
হৃৎপিন্ডের বাঁ দিকে হাই তুলে মৃত্যু
বাতাসে মিলিয়ে যেত।
কিন্তু ভেঙে গেলে তুমি। যেমন ভেঙে যায় চিরস্থায়ী সেগুনের শির।
উপচে পড়ছে রক্তের ফোয়ারা। মৃত্যু তোমাকে শুইয়ে দিয়েছে ভেঙে মুচড়ে দুমড়ে।
ও আমার প্রিয়তমা মাঙসপিন্ড, লুটিয়ে থাকো এই জিদের শহরে
এই জিঘাংসার কংক্রিট সিঁড়িতে।
হে জিদের শহর, মানুষের রক্ত এত লাল কেন?

আমি কাত, চিৎ, অবনত, অবহেলিতের একটিমাত্র মাথা।
কারো পদতলে লুটাইনি কোনোদিন। কিন্তু মচকে যেতে জানি, ঝুঁকে পড়তে জানি, সরে দাঁড়াতে জানি।
গুলি ও স্প্লিন্টারের ধাতব শব্দ কতবার আমার বুকের পাশ দিয়ে চলে গেছে। আমি কি মৃত্যুকে জানি না?

আগুন ও গন্ধকের ভেতর  আমাকে সাঁতার শিখিয়েছিল কুলটা এক নারী।
আমি বাঁচতে চাই বলে তাকে উদঘাটন করি না, তার শাড়ির বাো আমাকে মানবগন্ধী করে তুলেছে।
এখন আমি কী করি বলো? আমি সর্বপ্রাণীকে শুঁকে দেখেছি।
আল্লার কসম, মানুষের মাথার গন্ধের চেয়ে মিষ্টি গন্ধ
পাথরে, প্রান্তরে, উপত্যকায়, পশুতে,
পাশবিকতায়, সবুজে, শ্যামলিমায়, প্রকৃতিতে
বিকৃতিতে কোথাও নেই।
ও মানুষের মাথা, পাথর হয়ে যেও না, গাছ থেকে যেও না,
কংক্রিট পাষাণ হয়ে যেও না।
কাত হও, চিৎ হও, মচকে যাও। শুধু
লুটিয়ে পড়ো না।

০৪.১০.০৪

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান