ভেঙে যেয়ো না মা আমার / আল মাহমুদ

যেসব শিশুদের আমি একদা হাসতে খেলতে এবং হাঁটতে শিখিয়েছিলাম
এখন তারা আমার পঙ্গুত্ব চোখের নিষ্প্রভতা এবং
নিশ্চল নৈরশ্য নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করছে।
আড়ালে নয় আমার সামনে। আমি ভাবি এটাই জগতের নিয়ম কিনা
আমি অবশ্য এতে কোনো চাঞ্চল্য অনুভব করি না, না-বেদনা না-দুঃখ।
কারণ আমি কালকে অতিক্রম করে আসা একটি নিভে যাওয়া
ধুমকেতু মাত্র, যেন তেজ হারিয়ে একটা শিলাপাথর। পৃথিবীর
গ্রানিটে শব্দ করে নিস্তব্ধতায় মগ্ন।

শুধু মানুষের শিশুদের যে হাঁটতে শেখাতে হয় এটা একটা
আশ্চর্য ব্যাপার। আর সব প্রাণী সয়ম্ভর, গর্ভ থেকে
নেমেই অনায়াস কর্ম-চঞ্চল। সাপের শিশু মায়ের মতো ফণা ধরছে
মায়ের মতোই বীষ সঞ্চারিণী, বাঘের শিশু হিংস্র, ঈগলের
বাচ্চা টেনে ছিঁড়ে কেড়ে রক্তাক্ত উড়ালে উড়ে যায়।
পেছনে লুটায় জগৎ।
কিন্তু আমার শিশুরা প্রথম আমার আঙুল ধরে অতি কষ্টে
দাঁড়িয়েছিল। আমার হাঁটু আঁকড়ে মুখ তুলে দেখেছিল
পিতাকে। তারপর কোমর, তারপর বুক। এখন এদের মাথা
আমার সমান। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।
হুইল চেয়ারে এঁটে বসছে কোমর, যা একদা শক্ত চামড়ার
বেল্টে বাঁধা থেকে হিমালয় ডিঙাতে চাইতো।

আমি কী দেবে যাচ্ছি?

আমি কী বলব ধরণী দ্বিধা হও? না। এবং
আমি দ্বিধাবিভক্ত পৃথিবীকে আমার কম্পমান হাত দিয়ে
বুকে জড়িয়ে ধরতে চাই। বলতে চাই ভেঙো না ।
ভেঙে যেয়ো না মা আমার।

শুধু মানুষের বাচ্চাকেই হাঁটাতে হয়। মুখের ভেতর পুরে
দিতে হয় মাতৃস্তন, যতক্ষণ সে মাংসাশী না হয়ে ওঠে।

৭/ ১১/ ০৪

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান