অমরতার আক্ষেপ / আল মাহমুদ

কতবার ভেবেছি কবির আংরাখা আমি খুলে ফেলি কিন্তু জগতের সবগুলো
চোখ আমার নগ্নতা অবলোকনে উদগ্রীব। তুমি তো জানো কবির কোনো বন্ধু হয় না।
যেমন রাজার কোনো বন্ধু থাকে না। আমি আমার পোশাক তোমার পালঙ্ক
স্পর্শ করে খুলে ফেলতে চাই। চুমকির কাজ করা এই পিরহান, দামেস্কের
দর্জির তৈরি এই কোট, রেশমের ঝলকানো এই পাজামা, একলক্ষ মুক্তো
বসানো অজগরের চামড়ার এই কটিবন্ধ আমি তোমার বিছানায় শিথিল করে
তোমার পাশে শুয়ে পড়বো। একটা জগৎ দেখার যে ক্লান্তি তা আমার নয়নে
এতদিন জমা ছিল এখন ঘুমুতে চাই।

এসো আমরা পরিত্যক্ত পৃথিবীর কথা আলোচনা করি। তুমি এখানে এই
দুঃখহীন অনুতাপহীন অভাবহীন বাসস্থানে কীভাবে থাকবে? এখানে তো কোনো
মৃত্যু বা বিনাশ নেই। অশ্রুজল বা দীর্ঘশ্বাস নেই। যেখানে শোক নেই হাহাকার নেই
ক্ষুধা বা উপোস নেই সেখানে সুখের স্বাদ আসলে কেমন তা আমি চাখতে এসেছি।

আমার কেন পৃথিবীর কথা এত মনে পড়ে। কেন মানুষের রোদন ও আক্ষেপের
দুনিয়া যা আমরা ফেলে এসেছি অনেক দূরে একটা ভেজা মাটির বিশাল
গোলাকার গ্রহে যা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে একটি তারা হয়ে জ্বলছে। তার কথা ভুলতে পারি না।

আমি কেন নেবু ফুলের গন্ধেভারী বাতাসের কথা আমার স্মৃতি থেকে মুছে
ফেলতে পারি না? নদীর তীরে জোনাকি ভরা সেই গ্রাম খড়োঘরের একটি
চালার নিচে তোমাকে প্রথম চুম্বনের সেই স্মৃতি কেন অনন্ত সুখের মধ্যে এসেও
আমাকে অশ্রুসিক্ত করতে চায়? কে জানে? আমরা তো অনন্তকালের উপযোগী
দেহাবয়ব পেয়েছি। কিন্তু কেন সেই রোগ জরজর মশা-মাছির গুঞ্জনের মধ্যে
তোমার মরদেহের ক্লান্তি স্পর্শ করার পার্থিব বাসনা এখনো আমার অমরত্বের
শরীরের নিচে গুমরিয়ে মরছে।তবে কি তুমি সেই তুমি নও?
ও বিশালাক্ষি, কাঞ্চনকান্তি, অমরযৌবনা, কেন মৃত্যুময় পৃথিবীর স্মৃতি আমাকে
এত আকুল করে রেখেছে? আমি কবি এই কি অপরাধ? ও নেবু ফুলের গন্ধ,
ও নদী তরঙ্গের ভেঙে পড়া চাঁদের স্মৃতি, ও বিলুপ্ত পৃথিবীর হাওয়া, আমার
কবিত্বকে আমার প্রিয়ার পালঙ্কে আর আমাকে তোমাদের আঁচলের হাওয়ায়
কেন ঘুম পাড়িয়ে দাও না?

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান