শত্রুর আগমনে / সায়ীদ আবুবকর

কাগুজে বাঘই দেখে এসেছি সারা জীবন। শুধু একদিনই
জ্যান্ত বাঘ এসেছিল আমাদের গ্রামে। আমাদের
ছাতেনতলা গ্রামটি এক কালে বাঘদেরই ভিটেবাড়ি
ছিলো। যশোর-খুলনা-বাগেরহাট সুন্দরবন অঞ্চলই ছিলো
একসময়। আস্তে আস্তে সরে গেছে সুন্দরবন দক্ষিণে, সাগরের
কোলে। জঙ্গল সাবাড় করে বসতি গেড়েছে মানুষ। বাঘেরা
গ্রামান্তর হয়ে পালিয়েছে গভীর জঙ্গলে। তবু মাঝেমধ্যে ভুল করে
দু-একটি বাঘ ঢুকে পড়তো আমাদের সেই গ্রামে। তাই নিয়ে
হৈ চৈ পড়ে যেত।

আমাদের ছাতেনতলা গ্রামটি বিভক্ত ছিলো তিনটি পাড়ায়:
বিশ্বাসপাড়া, সর্দারপাড়া আর তালুকদার পাড়া। তিন পাড়াতেই
গণ্ডগোল লেগে থাকতো বারো মাস। এ পাড়ার লোকজন
সে-পাড়ার সাথে কিংবা সে-পাড়ার সাথে ও-পাড়ার লোকজন
থাকতো ঝগড়াঝাটিতেই মেতে। সাপে-নেউলে সম্পর্ক
যাকে বলে! কেউ কারো ছায়াও মাড়াতো না। একবার
সর্দারপাড়ার এক মেয়ে তো পালিয়ে গিয়েছিল তালুকদার পাড়ার এক
ছেলের সাথে। কি লঙ্কা-কাণ্ডটাই না হয়েছিল তাই নিয়ে!
থানা থেকে পুলিশ পর্যন্ত ছুটে এসেছিল থামাতে সে-মারামারি।

এমনই একটি রক্তঝরা গ্রামে একবার এক বাঘ এসেছিল।
রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আমি ক্লাস টুর ছাত্র তখন। আমার দাদী
আমাকে আঁকড়ে ধরে বুকে, থরথর করে কাঁপছিল। আমরা জানলায়
দাঁড়িয়ে দেখছিলাম সব দৃশ্য। কি লোমহর্ষক সেই দৃশ্য- ভাবলেও আজ
গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সেই দিন আর এ-পাড়া সে-পাড়া বলে
কিছুই ছিলো না। গোটা গ্রাম এক সাথে দা-কুড়াল নিয়ে বাঘটির
উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বেচারা বাঘ দা-কুড়ালের বেপরোয়া
আঘাতে লুটিয়ে পড়েছিল ধুলোয়। আনন্দে চীৎকার করে উঠৈছিলাম আমি:
“দ্যাখো, দাদী, বাঘটা খতম!” মরা সেই বাঘ দড়ি দিয়ে বেঁধে
তিন পাড়ার মানুষ ঘুরেছিল সমস্ত গ্রাম। সবাই যতটা না বাঘ দেখছিল,
তারচেয়ে বেশি দেখছিল একই বাঁশের নিচে কাঁধ দেওয়া তারিপ সর্দার,
ওসমান বিশ্বাস ও ঘেটু তালুকদারকে। আমার দাদী বলে চলেছিল, “বাঘ
এলেই এভাবে এরা এক হয়ে যেত। যখন প্রচণ্ড গণ্ডগোল চলতো
পাড়ায় পাড়ায় তখন আমরা মেয়েরা শুধু কান্নাকাটি করে বলতাম-
হে আল্লাহ , আবার একটা বাঘ পাঠাও এ গাঁয়ে।”

আজ আমি পৃথিবীর দিকে তাকাই আর ভাবি, আমাদের ছাতেনতলা গ্রামটি
কতই না আদর্শ গ্রাম ছিলো কারণ সেখানে বাঘ এলে সবাই হঠাৎ করে
ভেদাভেদ ভুলে এক হয়ে যেত আর একসাথে পরম ভ্রাতৃত্ববোধে
হাতে তুলে নিত দা-কুড়াল। আজ ইহুদিরা হায়েনার হাতে
ছিঁড়েখুঁড়ে ফেললেও হৃৎপিণ্ড আমাদের, কেউটের ফণা তুলে হিস হিস
করলেও সভ্যতার কলিজার উপর, এবং বাঘের পায়ে হামলে পড়লেও
আমাদের অরক্ষিত আঙিনায়, আমরা পৃথিবীবাসী হাঁ-করে শুধু দেখি
আর জাতিসংঘের সদর দফতরে বসে কিছু গাঁড়ল কুত্তার মতো
ঘেউ ঘেউ করে দিয়ে যায় খালি বীভৎস বিবৃতি।

১৬.৭.২০১৪ মিলন মোড়, সিরাজগঞ্জ