অনামাঙ্কিত হৃদয় / আল মাহমুদ

আমার জীবনতরী দুলছে। যাকে বলি মরণপয়োধি
এখন তার উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে পাল নামিয়ে ফেলেছি।
গন্তব্যে পৌছার আগেই খসে যাচ্ছে মেধা, মনন, যৌবন
ও স্মৃতি। এমনকি তোমার মুখও মনে পড়ে না।
কেবল ভাঙাচোরা কিছু বিষয় মঝেমধ্যে আকাশ ফাটা
বিদ্যুতের চমকে আমি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত দেখতে পাই।
ভাসছে আমার দুটি চোখ, ভাসছে আমার মগজের কিছু অংশ।
আর ঘাউড়া মাছের ঝাঁক ঠুকরে নিয়ে যাচ্ছে
ঐসব হলুদ পদার্থ পাতালে।

আমি আমার বাসনার পাত্রটিও ভাসিয়ে দিলাম। পাত্রের
ভেতর থেকে একটা সাপ ফণা গুটিয়ে তরঙ্গে মিলিয়ে গেল।
আমি এর নাম দিয়েছিলাম নফ্স।

কী আর অবশিষ্ট রইলো এ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।
কিন্তু আমি যেখান থেকে এসেছিলাম তারা ভিড় করে তীরে দাঁড়িয়ে
আমার শেষ দশার দশানন দেখে গালমন্দ করছে। এ সবি
আমার প্রাপ্য বৈকি।

আমি দাঁড়িপাল্লার সামনে এসে দাঁড়ালাম। কিন্তু ওজন করার
কোনো কিছুই তো আমার নেই। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে
আমার আত্মাকে বুক থেকে খুলে হাত বাড়িয়ে ঐ মানদন্ডের
ওপর রাখলাম। একটি পাখির বাচ্চার মতো মুখ খুলে
কেঁদে উঠলো আমার প্রাণ। আমি শুধু বোঝাতে চাইলাম
আমার নির্মাতাকে আমার এই কোমল ডানাওয়ালা আত্মা
উৎসর্গ করতে এসেছি। আমার কোনো ওজন নেই
না-পাপের, না-পূণ্যের। তবে জগতের অন্যতম বিলাপ
আমার কান্না। এই নাও কান্না।

পৃথিবীর উঁচু এভারেস্টের মতো দুঃখের পর্বত আমি নিয়ে এসেছি
সাহারা মরুভূমির চেয়েও বিস্তৃত আমার অনুতাপ।
আর আমার প্রেমের পরিধি হলো সীমাহীন শূন্যতার
মধ্যে ভাসমান ঐ নীহারিকাপুঞ্জ।
নারী বলতে আমি একটি মুখই স্মরণ করতে পারি;
শান্তি বলতে একটি মুখ, সহবাস বলতে সেও তো
একটি মাত্র মুখ। এমন লোকের প্রাপ্য কে নির্ধারণ করবে?
যেখানে দোজখের আগুনও আমাকে খেতে চাইছে না।
ও কৃষ্ণ গহ্বর আমাকে খেয়ে ফেল।

আমি পরিণামের একটি স্তর মাত্র।

এখন কোনো প্রশ্ন বা প্রতিভার কথা কেউ বলে না।
কিন্তু এখানে তো আমার শেষ নয়, আমার কোনো বিলয়
ঘটছে না। তাহলে আমি থাকছি কেন? আমি মাটি,
পাথর বা ছোঁয়া যায় এমন কোনো বস্তুকণা তখনও যেমন
ছিলাম না, এখনও তো নই। তাহলে আমি আছি কেন?
আমি কেন আশা করি আমি থাকবো? ভালো বা মন্দের
ব্যাপার নয়, কারণ আমি ভালো বা মন্দ কিছুই নই। তাহলে
আমি কী? আমি যতদিন তোমাদের মধ্যে ছিলাম, ততদিন
আমি স্বপ্নের কথা বলেছি, নারীর কথা বলেছি, নিসর্গ ও
নিয়মের কথা বলেছি, সর্বোপরি আমার প্রতিপালকের
কথা বলেছি।

কিন্তু আমার মত নির্মাণের অর্থের কথা তো বলিনি।
আসলে আমি জানি না আমি কী। তবে সব সময় আমি
ক্ষমার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছি। না দেখেও উবুড় হয়ে
পড়ে থেকেছি। এখন আমাকে নিয়ে আমার কোনো বেদনা
অনুভূত হচ্ছে না। চিমটি কেটে বা ছিদ্রের উপর ছিদ্র করে
আমি আর এগুবার মতো কোনো রন্ধ্র খুঁজে পাই না।
এবার আমার সমাপ্তির কথা ভাবতেই হয়।
কিন্তু সি*ড়ি খুঁজে পাচ্ছি না। হাতল খুঁজে পাচ্ছি না।
দিন ও রাতের আবর্তন বা উদয়াস্ত খুঁজে পাচ্ছি না।

০১.০৬.২০০৪

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s