ইতিহাস-বিন্যাসের পথে / আহসান হাবীব

এখন হৃদয়ে ডাক বসন্তের-
স্তব্ধবাক্ পাখিরা মুখর।
সময়ের ক্লান্তি ঝেড়ে অনায়াসে এখানে এখন
অশেষ তৃষ্ণার ঢেউ পাখা মেলে।
ভাঙা হাটে নগরে বন্দরে
রাত্রির পাহারা আর মৃত্যুকে এড়িয়ে সেই ঢেউ
এতদিন এখানে এখন
বিশাল সমুদ্র এক-
এখন জোয়ার।

এখন জোয়ার আর ঘাটে বাঁধা সাম্পানের মাঝি
তুলেছে নতুন পাল
পালে তার মৃদঙ্গের সুর
হাওয়ায় হাওয়ায় সুর বসন্তবাহার-
এখন হৃদয়ের ডাক বসন্তের।

আঠারোশো সাতান্ন’র ঝড়ে-
এই পাখি, এই পাখার ঢেউ
এই হাওয়া, এই সুর, এই সমুদ্র-স্বপ্ননে
প্রাণ ঢেলে
একান্ত প্রাণের আর্তি ঢেলে অবশেষে
নিঃশেষে হারিয়ে গেলো দূরে যারা
তা’রা গেলো একটি আবেগ অনির্বাণ
অমর্ত্য তৃষ্ণার জ্বালা রেখে গেলো
প্রাণে প্রাণে।
বহ্নিমান সেই প্রাণ।
যুগ থেকে যুগে
কী আবেগে
নিথর নদীর বুকে
পাল তুলে এগিয়েছে
ঘুরেছে তুলেছে মৃদু কলধ্বনি মাঝে মাঝে,
জীবনের সওদাগর।
আশায় বেঁধেছে বুক; জেনেছে সে
দূরে নয় ইতিহাস-নগরীর নতুন বন্দর।

তবুও অনেক ঝড় বয়ে গেছে-
রক্তের অক্ষরে পথে স্বক্ষরিত বহু ইতিহাস;
আর সেই ইতিহাস-বিন্যাসের পথে
অন্ধকারে মুখ রেখে কান্নায় ভেঙেছে বহু বুক।

তবুও তবুও সেই মৃতপ্রায় নদীটির বুকে
টলেনি হাতের হাল
নৈরাশ্য ঢালেনি পথে কুয়াশার মেঘ।
ক্ষীণস্রোত সে নদী তবুও

দুর্মর পিপাসা নিয়ে বুকে সমুদ্রের
বয়ে গেছে।
দুই তীরে অক্ষয় মিনার
ঐতিহ্যের
করে গেছে রচনা তবুও।

সেই প্রাণ, সেই আবেগ, সেই অমর্ত্য শিখা
অতঃপর একদিন সমুদ্রের সেই অভিসারে
ধন্য হলো
এবং সহসা
জনারণ্যে আলোর জোয়ার
বয়ে গেলো। সমুদ্রে জোয়ার এলো
খোলা পালে দিগন্তের ইশারা চঞ্চল।

বন্দরে নিঃশেষ রাত; এখন সকাল,
ক্লান্তমুখে সকালের সূর্যের মহিমা।
এবং হৃদয়ে ডাক বসন্তের-
স্তব্ধবাক্ পাখিরা মুখর।