শুধু চোখ আর পায়ের পিস্টন / আল মাহমুদ

যদি কবির কাজ হয় আশাকে জাগিয়ে তোলা তাহলে হে কীর্তিনাশিনী নদী
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নেমে এসো আমার স্রোতস্বিনী কররেখা হয়ে।
আমার হাতের ভেতর নাচুক ইলিশের ঝাঁক। হৌমাছের দীর্ঘ
নিঃশ্বাসে খুলে যাক আমার বাতায়ন। আর তুমি,
ওগো অনন্তকালের তুমি, তুমি হয়ে যাও দিগন্তে দাঁড়ানো
একটি নগ্ন তালগাছ।
যার পাতায় দোলানো বাবুইয়ের বাসা তোমার কলরব পূর্ণ স্তনযুগল
নেমে আসুক আমার পড়ার টেবিলে বেহেস্তের ফল।

কবির কাজ যদি হয় আশা। কেন তবে আমার শত মন্ত্র ও তুকতাকে
নদী হয়ে যায় একটি রেখায়িত দীর্ঘশ্বাস? ইলিশের নাওগুলো
হয়ে যাচ্ছে ছদ্মবেশী জল-ডাকাতের কুঞ্চিত ভ্রুরেখা?
সূর্যাস্তের রঙিন পানিতে কেন আর ভেসে ওঠে না কালো
শালুকের মত হৌমাছের ঝলমলে স্তন?
কেন আমার সমস্ত কররেখা জুড়ে ঘূর্ণিবায়ুর উড়ন্ত মৌতাত?

না, আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়। হাজার বছরের ওগো
খুল্লনা লহনা দেওয়ানা মদিনারা, কেন পথচারী কবির পথে
সুখের সমাধি ভেঙে হাহাকারে কবর ফাটাও।
তোমাদের দীর্ঘশ্বাস আর কোনো শপথবাক্য উচ্চারণে
আমাকে প্রলুব্ধ না করুক।

একদা আমি উচ্চারণ করতাম বটে একটি দেশের নাম। আসলে
সেটা ছিল আমাকে গর্ভধারণে সফল এক যন্ত্রণাবিদ্ধ যুবতীর
অশ্রুসিক্ত মুখচ্ছবি মাত্র।
তার শাদা কদলীকান্ডের মত উরুযুগল আঁকড়ে আমি শুনতাম
নগরবিনাশী নদীর কল্লোল।
কে এখন নদীর নাম বলে, কে জিজ্ঞাসে আমার উদ্ভবের
ভিটেমাটির আদি ঠিকানা?
না নদী, না কোনো দেশ। আমি পৃথিবীর কবি নিস্পৃহ
কালের পথিক।


আজ বুঝি কবির কাজ নয় আশা। না কোনো দেশ, না কোনো পাখির কূজন।
শুধু চলা ধাবমান মেঘের ভেলায়। হতে পারে নারী এক ছায়াতরু
সকালে বা সায়াহ্নবেলায়।

আয়ু হোক স্মৃতির দর্পণ।

আমি হাঁটি, আর স্মৃতিতে চমকিত দেখি ভবিষ্যৎ। বই,
সেখানে তো কোনো মানচিত্র বা দেশকে
দেখি না!
দেখি, পঙ্গপালের মত গ্রহচারী ক্ষুধার্ত মানুষ।
মানুষেরা খেয়ে ফেলে ঊর্ধ্বলোক, শেষহীন সমস্ত শূন্যতা।
ধর্মহীন, কর্মহীন, মাংসভুক হে মহামানব, কে জাগাবে
আশা?
না আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয় কবি চলে কবির নিয়মে
শুধু খোলা চোখ দুটি আর দুটি পায়ের পিস্টন।