মুখ ও মুখোশ থেকে বেরিয়ে / আল মাহমুদ

কতবার তোমাকে বলেছি যে দেখো আমার কোনো প্রতিযোগী নেই
আমার পরাজয়ের সম্ভাবনা যেখানে ষোল আনা সেখানে আমি
কার সাথে দৌড়াবো?
তাছাড়া আমার গতি সুনির্দিষ্ট কিন্তু আমার গন্তব্য অনিশ্চিত
কে জানে সেখানে কি আছে, পুরস্কার না তিরস্কার?
তবে সকলেই জানে আমার আরম্ভের কথা। মায়ের ওম থেকে বেরিয়েই আমার শুরু।
এ কোনো খেলা নয়, আমার পিতৃপুরুষেরাই আমাকে সতর্ক করেছিলেন।
বলেছিলেন তোমার সেখানে না পৌঁছুনের সম্ভাবনাই বেশি। তবে এ পরিশ্রম অনুল্লেখিত থাকে না।

কেউ এই পথ নারীর ভেতর রচনা করে নিয়েছে। নারী আবার
দীপ্তিমান পুরুষের ভেতর। কিন্তু আমি বেছে নিয়েছি দেশ, নিসর্গ ও প্রকৃতির ভেতর।
আমার যাত্রার উদ্যোগ মুহূর্তে যেহেতু এক নারী-
যাকে আমি মহামাতা বলে সম্বোধন করার সুযোগও পেলাম না
আমাকে আমার যাত্রাপথের রোমান্স সম্বন্ধে বলেছিলেন।
আসলে লিপ্ত হওয়ার যে পুলক তা তুমি দিন ও রাত্রির উত্থানপতনে,
বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ার দাপটে, শীতে ও গ্রীষ্মের দাবদাহে
আস্বাদন করে নিও।
তুমি যখন পুলকিত হওয়ার পথে পা বাড়াওনি তখন ধীর
অনুভব, চেতনাচেতনের আলো অন্ধকার পার হও।
এ পথে কোনো পদচিহ্ন নেই কিন্ত চতুর্দিকে বিস্ময়ের মত স্তব্ধতা।
এমনকি, একটা পাখি নিয়ে ভাবলেও এর হরিৎ পালক,
লার পা ধূসর চঞ্চুর কার্যকারণ তোমাকে তোমার গন্তব্যের
অন্ধকার অজানায় আলো ফেলবে।
পাখি বা পতঙ্গ, পত্র-পল্লব শোভিত অরণ্য, অজানা বন্য আতাফলের মাংসের
ঐশ্বর্যে খোঁজো। খোঁজো স্বচ্ছতোয়া সরোবর বা পানির ভেতরে
সচল মাছ এবং তীরের বালু ওপর চিহ্ন রেখে যাওয়া শামুকের গায়ে আঁকা উন্মুক্ত কিতাবে।
প্রকৃতির ভেতর অসংখ্য স্তনের উষ্ণতায়। শিশুর প্রসববেদনার আলোড়নে আর
প্রেমিকার দৃঢ় অঙ্গীকারে সংযুক্ত থাকার শীৎকারে তাকে
যারা পায়। তার ভাষা কি করে শেখা যায়?
আমি চলে এসেছি ষাটটি বালুচর পেরিয়ে। ঐতো সামনে নদী। চখাচখী উড়ছে।
এর বেশি আমি আর কোথায় যাব? অথচ গন্তব্যের একটি চিত্র কে আমার হৃদয়ের ওপর
রক্তের শিরার মত লিখে দিয়েছে।
আর সেই মানচিত্রে আছে কেবল এক মহা আননের সীমাহীন আভাস
আমি তো আকৃতি কল্পনা করে অভ্যস্ত, কারণ আমার দৃশ্যমান
বিষয় একদা ছিল এক অনিন্দ্যসুন্দর মানুষীর শরীর। শরীর ছাড়া
আমরা কি কিছু ভবতে পারি? কিন্তু আমি এখন যেখানে বা যে গন্তব্যে পারদের মত জমে
আছি, একে এখানে কেউ কি থাকা বলে?
এ জগতে কেবল মিশে যায় যে সেই থাকে। একেই থাকা বলে আর সবি না থাকা।

আমি একটি মুখের আকারে আর কোনো কিছু ভাবতে পারি না। কারণ
যিনি সৃজন করেন তিনি নিজের কোনো মুখ, শরীর বা হাত-পায়ের
প্রয়োজনবোধ করেন না। তাহলে গন্তব্যে পৌঁছার আগে আমার কেন একটা
পরিপাটি মুখ থাকবে? কেনো থাকবে ছয় অক্ষরের এতবড় একটা নাম। কেন থাকবে
দামেশকের দর্জির তৈরি চুমকির কাজ করা
এই বিশাল আলখেল্লা। এই পাগড়ি?
আমি মুখ ও মুখোশ থেকে দ্যাখো বেরিয়ে পড়েছি।