মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

পঞ্চম সর্গ

ইয়াহিয়া নয়, সাতই মার্চের পর,
নিপতিত হলো বঙ্গবন্ধুর হাতেই
রাষ্ট্র-ক্ষমতা কার্যত। রাষ্টযন্ত্র প্রায়
পড়লো অচল হয়ে সারা দেশে। দেশ
চলে মুজিবের কথায়। মুজিব যদি
বলে চলো, লোকে চলে; থামতে বললে
লোকে থামে। সমস্ত অফিস-আদালত
রাষ্টের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি নয়, থাকে
চেয়ে মুজিবেরই হুকুমের দিকে শুধু।
রাষ্ট্রময় আর্মি, পুলিশ ও ইপিআর
হয়ে গেছে ভাগ -বাঙালী ও পাকিস্তানী-
দুই ভাগে। উর্দুভাষী আর বাংলাভাষী
কেউ কারে করে না বিশ্বাস। গেছে বেড়ে
দূরত্ব হঠাৎ করে একই রাষ্ট্রের
দুই ভাষী মানুষে মানুষে। ছিলো ভাই-
ভাই, আজ যেন জীবনের দুশমন;
ছিলো যারা পরস্পর বন্ধু, কী কারণে
শত্রু হঠাৎ, কে জানে! সাবধানে সব
করে তাই চলাফেরা, ঘরে ও বাইরে।

যেসব পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার
ছিলো পরিবার নিয়ে, চুপিচুপি তারা
পাঠাচ্ছে ফেরত তাদের সন্তান-স্ত্রীকে
স্বদেশে। বাতাসে নাক লাগিয়ে শুঁকছে
শকুন; লাশের গন্ধ যেন বারবার
কোত্থেকে আসছে ভেসে, বুঝি বা ভাগাড়
লুকিয়ে কোথাও আশপাশে। তালগাছে
কয়েকটি কাক বসে এদিক-ওদিক
তাকিয়ে কয়েকবার, দিলো তারস্বরে
জুড়ে কা-কা কা-কা! “কাকগুলো তাড়া, তাড়া”
বলে দাওয়ায় বসে করতে লাগলো
চীৎকার হারু মোল্লার বৃদ্ধ অচল মা
পরীবিবি। “গরম খবর!” বলে বৃদ্ধ
পেপারঅলা গঞ্জের হাঁটে হেঁটে হেঁটে
করতে লাগলো বিক্রি ঢাকার পেপার।

এলেন ষোলোই মার্চ ফিরে প্রেসিডেন্ট
ইয়াহিয়া খান, ঢাকা; উদ্দেশ্য, ক্ষমতা
হস্তান্তর। চললো বৈঠক বঙ্গবন্ধুর
সাথে, দফায় দফায়। শ্বাসরুদ্ধকর
পরিবেশ সারা দেশে- কী হয়, কী হয়
চলতেছে কানাঘুষা সমস্ত মহলে।
খুলছে না কেউ মুখ ফলাফল নিয়ে
বৈঠকের; না কর্তাব্যক্তিরা রাষ্ট্রের, না
আওয়ামী নেতারা। নিউজপেপারগুলো
ছাপছে ধোঁয়াটে খবর। আসলে কেউ
বলতে পারে না কিছু। ভুট্টোও এলেন
পাকিস্তান থেকে উড়ে, ঢাকার বৈঠকে
দিতে যোগ। বসলেন একসাথে ভুট্টো,
মুজিব ও ইয়াহিয়া। চললো একটানা
ত্রিমুখী বৈঠক চব্বিশে মার্চ পর্যন্ত;
হলো শেষ, ফলাফল ছাড়াই। এদিকে
গোপনে গোপনে চলছে প্রস্তুতি যেন
যুদ্ধের, বাতাসে কারা রটাচ্ছে গুজব।
যত্রতত্র দিচ্ছে হানা পাকিস্তান-আর্মি
বাঙালীর ঘরে ঘরে। চলছে তল্লাশী
সারা দেশে, আওয়ামী লীগ নেতাদের
বাড়ি বাড়ি। বড় বড় নেতারা দিচ্ছেন
গা ঢাকা নেতার নির্দেশে অথবা পাড়ি
জমাচ্ছেন ভারতে। ঢাকার রাজপথে,
কাউকে সন্দেহ হলেই, করছে গ্রেফতার
যখন তখন, ক্ষেপে ওঠা পাক-আর্মি।
মুজিবের পক্ষ নিয়ে মাওলানা ভাসানী
স্বভাবসুলভ তীক্ষ- চাঁচাছোলা কণ্ঠে
দিলেন ফতুয়া তাঁর জনসমাবেশে:
“লাকুম দীনউকুম ওল ইয়াদীন-
যার যার ধর্ম তার তার কাছে।” বুঝে
নিলো জাতি-বাঙালী ও উর্দুভাষী, দুটি
আলাদা ধর্মের মতো, ভিন্ন হয়ে গেছে।
পাগলেও বুঝি করতে পেরেছে আঁচ,
ভেঙে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে-ভেঙে যাবে বলে
চাপাগুঞ্জন সর্বত্র। ভাঙবে অথচ
আওয়াজ হবে না ইস্রাফিলের শিঙার?
নদী ভাঙে; বিচ্ছিন্ন বিধ্বস্ত তার পাড়
ধসে পড়বার আগে, হুঙ্কার ছেড়েই
তবে হুমড়ি খেয়ে পড়ে পাঁক খাওয়া বুনো
জলের ভেতর; সেই ধ্বনি বাড়ি খায়
প্রতিধ্বনি হয়ে দূর জনপদে। আজ
পাকিস্তান যেন ধ্বংসোন্মুখ সেই নদী।

প্রতিদিন প্রত্যাখাত হয়ে ফিরছেন
মুজিব স্বগৃহে, আর সক্রোধে হতাশা
মারছেন ছুঁড়ে চার দেয়ালের মাঝে:
শেষ, সব আশা শেষ। জামাল, কামাল,
হাসিনা, রেহেনা আর হাসুর মা বলে
বাড়িতে ঢুকেই তিনি করেন চীৎকার।
তোমরা প্রস্তুত হও বলে হুঁশিয়ারি দেন
রোজ। নেতারা আসেন রাতে, অন্ধকারে;
গোপন আলাপ সেরে ফিরে যান কাজে।
বডিগাড বিশ্বস্ত মোর্শেদ রাত্রিদিন
দেয়ালের মতো ঘিরে রাখে বাংলার
বিপ্লবী নেতাকে।

রাত্রি থমথম। ঢাকা
যেন আজ রাতে, ভূতের শহর। ভয়
আর আতঙ্ক বেড়াচ্ছে যেন পায়চারি
করে সব অলিগলি। বাইরে মোর্শেদ
পাহারায়। বঙ্গবন্ধু অন্দরমহলে
বিবি-কন্যা-পুত্রদের সাথে। কাঁদছেন
ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে বঙ্গমাতা; মুছছেন
দুচোখের পানি শাড়ির আঁচলে ঘন-
ঘন। মন ভারী করে বসে দুই কন্যা
মার পাশে। পুত্রগণ যেন বোবা হয়ে
চেয়ে আছে চিন্তান্বিত পিতার মুখের
দিকে। নিরবতা ভেঙে বলে উঠলেন
বঙ্গবন্ধু, “কাল সকালেই চলে যাবে
সব বত্রিশ নম্বর ছেড়ে। সাবধান,
মুখ খুলবে না কারো কাছে। সবখানে
ওঁৎ পেতে আছে দুশমন।” এতক্ষণে
কইলেন কথা বঙ্গমাতা ভগ্নকণ্ঠে:
“আপনার কী হবে? ওরা যদি আপনার
করে ফ্যালে কিছু!” বললেন হেসে মহা-
নেতা, “কিছুই হবে না। গ্রেফতার করে
রাখবে পুরে জেলে। বেশি কিছু করলে, মেরে
ফেলবে-এই তো? করে না মুজিব ভয়
মৃত্যুর। বাংলাকে এবার স্বাধীন করে
ছাড়বো। জামাল, কামাল, শুনে রাখো মন
দিয়ে-যদি আমি নাও থাকি, সংগ্রাম
চালিয়ে যাবে, কখনো কাপুরষের মতো
আত্মসমর্পণ করবে না। আল্লাহ ছাড়া
কারো কাছে নোয়াবে না শির। মুসলিম
একবারই জন্মে, একবারই মরে। হয়
বাঁচবে বাঁচার মতো, না হয় শহীদ
হয়ে যাবে এদেশের স্বাধীনতার জন্যে;
হাশরের মাঠে দেখা হবে। কী পেয়েছে
আহম্মকেরা- বাংলার জনগণ রায়
দিলো আমাদের পক্ষে; কিন্তু বাধ সাধলো
ভুট্টো আর ইয়াহিয়া। বসতে দিলো না
মসনদে। এমন শিক্ষা দিয়ে দেবো, ওরা
পালাবার জায়গা পাবে না। বাংলার
মানুষ ওদের পুঁতে ফেলবে এদেশের
মাটিতে। ভারত আমাদের পাশে আছে।
রাশিয়াও আছে। আমার মানুষজন
ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে। আমি
সিগনাল দিলেই উঠবে আগুন জ্বলে;
সে-আগুন নেভানোর শক্তি কারো নেই।
আল্লাই জানেন, কী আছে অদৃষ্টে। তবে
জেনে রাখো, স্বাধীন আমরা হবোই। সে-
স্বাধীন-বাংলাদেশে যেন হাসিনার
সন্তানের হাতে, এই দোয়া করি, শোভা
পায় একটি সুন্দর সবুজ পতাকা।”

ফুঁপিয়ে উঠলো এতক্ষণে কন্যা তাঁর,
দুচোখের মণি, শ্রীমতি হাসিনা। অশ্রু-
ছলছল চোখে তাকালেন মহানেতা
পুত্রকন্যাদের দিকে। আঁতকে উঠলো
তাঁর পিতৃহৃদয় আসন্ন বিচ্ছেদের
শোকে।-‘হায়, খোদা, কি মায়ার বন্ধনে
বেঁধেছো জীবন তুমি এ জগতে! পত্নি-
প্রেম, পুত্র-প্রেম, কন্যা-প্রেম; সেই সাথে
দেশপ্রেম দিলে ঢেলে ক্ষুদ্র এই বুকে;
কাকে ফেলে কাকে রাখি! যাকে দেই ঠেলে
দূরে, সেই যে কাঁদায়!’ এদিকে বাইরে
জুড়েছে মোর্শেদ ডাক। এসেছে নিশ্চয়
বার্তা নিয়ে কেউ। অন্দরমহল থেকে
বেরিয়ে এলেন নেতা দ্রুত। ধরেছেন
ঠিকই; স্পাই, সেনাবাহিনীর। এসেছে সে
পাগলের বেশে। বোঝার উপায় নেই।
দিনে সে সৈনিক; পাগল রাত্তিরে। কত
লোক সারা দেশে হয়ে আছে এইভাবে
তৈরি, তোমার জন্যে হে স্বাধীনতা। এই
বার্তা এনেছে সে: ‘হামলা হতে পারে কাল
রাতে, ঢাকাসহ বড় সমস্ত শহরে;
অতর্কিত হামলা, আর্মির।’ বলেই সে
কেটে পড়লো চুপচাপ। বাংলার নেতা
বঙ্গবন্ধু ডুবে রইলেন একা, পাশে
প্রহরী মোর্শেদ, মুক্তির ভাবনায়। ধু-ধু
অন্ধকার চারদিকে, নিকষ ভৌতিক
বিদঘুটে অন্ধকার, আর শুধু খাঁ খাঁ
গা শিউরে ওঠা বিপদের ঘনঘটা!

ওদিকে তখন জমেছে জমেশ আড্ডা
সেনাবাহিনীর অফিসার্স ক্লাবে। মধ্য
রাত্রি চিরে চিরে ফেটে পড়ছে বদ্ধ ঘরে
পানপেয়ালার ঠুংঠাং ধ্বনি আর
ভোদকার গন্ধ; সেইসাথে পৈশাচিক
অট্টহাসি। এ আড্ডার মধ্যমণি, মহা
সন্ত্রাসীর ত্রাস, বিশ্বের আতঙ্ক, সারা
পাকিস্তানের গৌরব জেনারেল টিক্কা
খান, যিনি ইয়াহিয়ার দক্ষিণ হস্ত
আর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের চির
অতন্দ্র প্রহরী। ঘিরে আছেন মহান
এ বীরযোদ্ধাকে ব্রিগেডিয়ার আব্দুল
কাদির খান, ব্রিগেডিয়ার আজমাল
হোসেন মালিক, ব্রিগেডিয়ার আরিফ
রাজা, ব্রিগেডিয়ার আত্তা মোহাম্মদ
খান মালিক, ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ
আসলাম, কর্নেল কে কে আফ্রিদিসহ
ডাকসাইটে যত সেনা-কর্মকর্তা। তারা
হয়েছেন সমবেত প্রিয় জন্মভূমি
পাকিস্তাান রক্ষার বৈঠকে। আলোচনা
শেষে উঠেছেন মেতে আনন্দআড্ডায়।
‘দিতে হলে দেবো প্রাণ, তবু স্বদেশের
এক ইঞ্চি জমিন দেবো না ছেড়ে কোনো
দুর্বৃত্তের হাতে;’-এ শপথে দৃঢ় তারা,
মার মার মন্ত্রে উদ্বেলিত একসাথে;
দেবেন না ছাড় এইবার দেশদ্রোহী
কোনো মুজিবপন্থীকে, যারা চুপিচুপি
করে যাচ্ছে পুণ্যভুমি পাকিস্তান ভেঙে
দু-খন্ড করার ভয়াবহ ষড়যন্ত্র;
এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেবেন ময়লা ও
আবর্জনা যত জমে আছে অস্থির এ
পূর্ব-পাকিস্তানে; মুজিবের চামচিকা
যারা এই বাংলায়, শেষ হয়ে যাবে
এইবার চিরতরে। হয় এসপার,
না হয় ওসপার। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।
রাত্রির নিকষ অন্ধকার চিরে চিরে
বাজতে লাগলো মিষ্টি সঙ্গীতের মতো
‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ!’ দেশপ্রেমে মত্ত
যত পাঞ্জাবি ও সিন্ধী সৈনিকের কানে।
মহাদুর্যোগের আশঙ্কায় কেঁপে কেঁপে
উঠতে লাগলো কলার পাতার মতো
ঢাকার রজনী আর নিষ্পাপ শিশুরা।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘বিপদের ঘনঘটা’ পর্ব ; নাম ‘পঞ্চম সর্গ’।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s