মুজিব নামা / সায়ীদ আবুবকর

সপ্তম সর্গ

গেছেন বিচ্ছিন্ন্ হয়ে সব ধরনের
যোগাযোগ থেকে। চলছে তুমুল যুদ্ধ
পাক-আর্মিদের সাথে বাঙালীর, সারা
দেশে। যে ছিলো কৃষক মাঠে, হঠাৎ সে
ভুলে গেল কৃষিকাজ; যে ছিলো নদীতে
হাতে নিয়ে খেওলা জাল, আচমকা সেও
ভুলে গেল মাছ ধরা; যে ছিলো নিমগ্ন
পাঠে, ভুলে গেল বই পড়া সেও; আর
যে ছিলো গঞ্জের হাটে বেচাকেনা নিয়ে
ব্যস্ত খুব, সেও আকস্মিক ভুলে গেল
বেচাকেনা, যখন আর্মিরা মাঝ রাতে
তুলে নিয়ে গেছে বাংলার হৃৎপিন্ড
শেখ মুজিবকে অজ্ঞাত স্থানে। যে-দেশে
মুজিবুর রহমান নেই, মিথ্যে প্রাণ
দেহে নিয়ে অর্থহীন বেঁচে থাকা সেই
দেশে। দলে দলে লোকজন ঘরদোর
ছেড়ে তাই, ফেলে রেখে পশ্চাতে স্ত্রী-পুত্র-
পরিজন, কাঁধে তুলে নিয়ে তরবারি,
ছুটে চললো রণাঙ্গনে। আওয়ামী নেতা
এম এ হান্নান, কালুর ঘাট স্বাধীন
বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে, করলেন
পাঠ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,
তারিখ ছাব্বিশে মার্চ। তারিখ ছাব্বিশে
মার্চ, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে,
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র করলেন
পাঠ বজ্রদীপ্ত কণ্ঠে বাঙালি-মেজর
জিয়াউর রহমান, একই বেতারে।
কালুর ঘাটের সে-ঘোষণা লক্ষ লক্ষ
বাঙালীকে করলো উদ্দীপ্ত মুক্তিযুদ্ধে
আর দুচোখে তাদের ঢেলে দিলো স্বপ্ন
স্বাধীন রাষ্ট্রের। অগ্নিঝরা এ ছাব্বিশে
মার্চে প্লেনে করে নিয়ে যাওয়া হলো বঙ্গ-
বন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে রাষ্ট্রদ্রোহী
আসামী হিসেবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া
ওই দিনই করলেন নিষিদ্ধ ঘোষণা
আওয়ামী লীগকে। আওয়ামী লীগের
নেতৃবৃন্দ নিলো ঠাঁই প্রতিবেশি-রাষ্ট্র
ভারতে। সেখান থেকে গেরিলাযুদ্ধের
নিতে লাগলো প্রস্তুতি। কে কবে দেখেছে
মৃত্যু এমন; মৃত্যুর উপত্যকা যেন
ছোট্ট এই দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে;
শকুনে-শেয়ালে-কাকে পথেঘাটে-হাটে-
খানাখন্দে রাত্রিদিন, করতেছে ফুর্তি
যত্রতত্র পড়ে থাকা লাশের উপর,
সারা বাংলায়। পোষা কুকুরেরা হন্যে
হয়ে পঁচা লাশখেকো প্রাণীদের সাথে
পেতেছে সখ্যতা; বিচ্ছিন্ন পা নিয়ে, কাটা
হাত নিয়ে মানুষের, কুকুরে-কুকুরে
বেঁধে গেছে কাড়াকাড়ি। বাঙালী হওয়ার
অপরাধে কত নিরীহ মানুষ এই
বাংলার, হয়ে গেল লাশ; কত নারী
পাকিস্তানী নরপশুদের কাছে, হায়,
হারালো সতিত্ব; কত শিশু পিতৃহারা
হলো; কত মা হারালো পুত্রকে। যুদ্ধের
দাবানলে পুড়তে লাগলো দাউদাউ
শহরবন্দর গ্রামগঞ্জ। পাক-আর্মিদের
যত্রতত্র হানা, সবখানে; যাকে পায়,
মারে বুভুক্ষু বুলেটে, ঘুঘুর মতন।
গাঁয়ে গাঁয়ে গড়ে তুললো তারা, সেই সাথে,
পিস-কমিটির নামে এদেশি দোসর,
যাঁরা হানাদারদের হয়ে করতে লাগলো
গোয়েন্দাগিরি। আলবদর, আল-শামস,
রাজাকার ইত্যাকার নামে গড়ে উঠলো
কসাইবাহিনী এদেশের; জাহান্নামী
এইসব হন্তারক, বাঙালী হয়েও,
কি-মহা আক্রোশে, যেন ক্ষুধার্ত করাত,
কাটতে লাগলো গলা, মারতে লাগলো
ছুরি বাঙালীর বুকে; জন্ম-কুলাঙ্গার
এ-বঙ্গের, যেন বিভীষণ, করতে লাগলো
সহায়তা হানাদারবাহিনীকে গণ-
হত্যায়, গণধর্ষণে। একদিকে পাক-
হন্তারক, সুসজ্জিত বিপুল উন্নত
মারণাস্ত্রে; অন্যদিকে পাকিস্তানী দেশ-
প্রেম আর ভ্রান্ত ইমানের বলে বলী-
য়ান এদেশি শকুন; মাঝখানে যত
নিরীহ বাঙালী, অসহায়, দিশেহারা-
দ্বিমুখী ত্রিশূল-আক্রমণে। মরে নারী,
মরে নর, মরে শিশু; লাশের দুর্গন্ধে
উঠেছে অসহ্য হয়ে বাংলার বাতাস।
প্রাণের মায়ায় ছুটতে লাগলো তল্পি-
তল্পা নিয়ে, দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশে,
বাঙালীরা। সন্তান-সন্ততি নিয়ে বুকে,
ঠাঁই নিলো তারা খোলা আকাশের নিচে-
আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, জলপাই-
গুড়ি, কুচবিহার, চব্বিশ পরগণা,
পশ্চিম দিনাজপুর, নদীয়া, মালদা
ও কোলকাতার ফুটপাতে ফুটপাতে।
মাছে-ভাতে ছিলো যে-বাঙালী, কপালের
ফেরে সে আজ কুড়ায় পরদেশে অনু-
কম্পা; হায়, গোলা ভরা ছিলো যার ধান,
বাঙালী হওয়ার দোষে সে আজ ভিক্ষার
থালা নিয়ে ঘুরে ফেরে রাস্তায় রাস্তায়
পররাষ্ট্রে! হিন্দু হওয়ার অপরাধে
ভিটেমাটি ছেড়ে লক্ষ লক্ষ নারী-নর
হলো শরণার্থী ত্রাতারূপী ভূ-ভারতে।
এমন দুর্যোগ আসেনি কখনো নেমে
বাঙালীর ভাগ্যে, এর আগে। ‘হায়, খোদা!’
আর ‘হে ঈশ্বর!’ বলে করতে লাগলো
ফরিয়াদ বাঙালি-হিন্দু ও মুসলিম
একসাথে। তাদের এ হেন দুর্দশার
কথা কে জানাবে, হায়, তাদের নেতাকে,
যে-নেতা বঙ্গের বন্ধু, সাত কোটি বাঙা-
লীর দুচোখের মণি, আত্মার আত্মীয়!

মুজিবের নামে ছুটেছে তরুণ যুবা
লাখে লাখে, যোগ দিতে মুক্তি-বাহিনীতে;
গেরিলা ট্রেনিং চলছে পশ্চিম বঙ্গে,
কর্নেল এম এ জি ওসমানী যার
সর্বাধিনায়ক। মুজিববাহিনী, মুক্তি-
বাহিনী, গণবাহিনী, কাদের বাহিনী,
মুক্তি-ফৌজ, জেড ফোর্স, কে ফোর্স এবং
এস ফোর্স নামে মুক্তিযোদ্ধা, লাখে লাখে,
নেমে পড়লো রণাঙ্গনে, হটাতে দখল-
দার পাক-বাহিনীকে। প্রতিষ্ঠিত হলো
বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস, তারিখ ৪
এপ্রিল, কর্নেল এম এ জি ওসমানী
কমান্ডার-ইন-চিফ; চিফ অব স্টাফ:
এম এ রব; ডেপুটি চিফ অব স্টাফ:
এ কে খন্দকার। ঘুরে দাঁড়ালো বাঙালী
বিপুল শক্তিতে, শত্রুর বিরু্েদ্ধ। শেখ
মুজিবের নামে উঠলো জয়ধ্বনি দিকে-
দিকে; বাংলার বাতাসে ফের বেজে উঠলো
তূর্যনাদ-‘জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!’

মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলা; ছিলো
অখ্যাত, শোনেনি নাম যার কোনোদিন
দূরের মানুষ। কী ভাগ্যের গুণে, আহা,
হয়ে উঠলো সে রাতারাতি পুণ্যপীঠ,
জগত-বিখ্যাত! তারিখ ১০ এপ্রিল,
১৯৭১; ছুটে এলো কোলকাতা থেকে
আওয়ামী নেতৃবৃন্দ, গড়তে অস্থায়ী
বাংলাদেশ সবকার এইখানে। বৈদ্য-
নাথ তলার আম্রকাননে বসে গেল
নক্ষত্রের মেলা, দীপ্ত আলোর বাজার।
পলাশীর আম্রকাননে যে-স্বাধীনতা-
সূর্য গিয়েছিল অস্ত একদিন, সেই
সূর্য আজ ফের দুই শ বছর পর
এ কাননে হলো যে উদিত মহোল্লাসে
মহামর্যাদায়। সিরাজের লুট হয়ে
যাওয়া সোনার মুকুট, সশস্ত্র বাঙালী
আনলো ছিনিয়ে যেন দস্যুদের হাত
থেকে; দিলো পরিয়ে গলায়, অতঃপর,
শেখ মুজিবের। গঠিত হলো অস্থায়ী
সরকার যুধ্যমান বাংলায়; দেয়া
হলো নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ
অস্থায়ী সরকার’, যার রাষ্ট্রপতি শেখ
মুজিবুর রহমান- বন্দী যে, পশ্চিম
পাকিস্তানে; উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ
নজরুল ইসলাম (বর্তমান ভার-
প্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি); প্রধানমন্ত্রী তাজ-
উদ্দিন আহমদ; প্রতিরক্ষামন্ত্রী
কর্নেল এম এ জি ওসমানী; অর্থ-
মন্ত্রী মনসুর আলী; পররাষ্ট্রমন্ত্রী
খন্দকার মোশতাক আহমদ (পরে
আবদুস সামাদ আজাদ; দেয়া হয়
সরিয়ে মোশতাককে; গোপন আঁতাত
তার, হয়ে যায় জানাজানি ইসলামা-
বাদের সঙ্গে; তখনই যদি, ঊনিশ শ
একাত্তরে, করা যেতো সমূলে বিনাশ
এই পাপিষ্ঠকে, পনেরো আগস্ট তবে
আসতো না বাংলায়!) কৃষক জনতা
হয়েছে হাজির হাজার হাজার; যোদ্ধা
তারা; গায়ে গেঞ্জি, লুঙ্গি পরিধানে, গামছা
শিরস্ত্র্াণ, দোনলা বন্দুক কাঁধে কাঁধে;
মুজিববাহিনী এই, হিন্দু-মুসলিম,
হয়েছে গেরিলা স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নে,
বাঁচাতে মানুষ, বাংলার সাত কোটি
বাঙালী, বর্বর পাক-বাহিনীর হাত
থেকে; দুরন্ত এ মুক্তি-ফৌজ; ভয়ঙ্কর,
কেউটের মতো; একটা ছোবলে যার
ধুলায় লুটিয়ে পড়ে দৈত্য কি দানব,
চোখের পলকে; পাক-বাহিনী যা পেয়ে
গেছে টের হাড়ে হাড়ে, ইতোমধ্যে। এই
বীর-জনতার সামনে নিলেন শপথ
অস্থায়ী সরকারের কর্ণধারগণ।
শপথবাক্য তাঁদের, করালেন পাঠ
এম ইউসুফ আলী, বীরমুক্তিযোদ্ধা,
বিশ্বস্ত সৈনিক শেখ মুজিবের। কণ্ঠে-
কণ্ঠে অতঃপর বেজে উঠলো কি-মধুর,
জাতীয় সঙ্গীত-“আমার সোনার বাংলা,
আমি তোমায় ভালবাসি।” প্রিয় বঙ্গদেশ,
মাতা জন্মভূমি, চেয়ে দেখ ভালবাসা
আমের মুকুল হয়ে ফুটেছে সুন্দর
তোমার কাননে, ফল হয়ে যা ছড়াবে
মিষ্টতা স্বর্গীয়, দেশে দেশে। খাঁচা ভাঙা
মুক্ত পাখি যেন, ফেটে পড়লো উল্লাসে
বীর-জনতা; মাতালো এ আম্রকানন
বজ্র-স্বরে-“জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!”

বৈদ্যনাথতলা হয়ে গেল আজ থেকে
মুজিবনগর। প্রাণের নেতার নামে
করলো নামকরণ এ স্থানের, কর্ণ-
ধারগণ বাংলার। হলো বাংলার
রাজধানী মুজিবনগর। প্রকম্পিত
হলো আকাশ বাতাস মুহুর্মুহু “জয়
বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!” শ্লোগানে শ্লোগানে।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘মহারণ’ পর্ব; নাম ‘সপ্তম সর্গ’।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s