মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

অষ্টম সর্গ

যেন ফের সীতাকে রাবণ, নিয়ে গেছে
কুক্ষণে, অপহরণ করে! বিশ্বময়
পড়ে গেছে শোরগোল। রাষ্টনায়কেরা,
পূর্ব ও পশ্চিমে, দিচ্ছেন নিন্দাসূচক
বিবৃতি অনবরত। ভারতসম্রাজ্ঞী
ইন্দিরা বিশ্বের দরবারে বারবার
জানাচ্ছেন দাবি: দিতে হবে অবিলম্বে
মুক্তি এ মহানেতার। ছুটছেন তিনি
ক্লান্তিহীন, মুজিবের মুক্তির তদবিরে
রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে। জানেন ভারতনেত্রী,
দূরদ্রষ্টা তিনি, পন্ডিত জহরলাল
নেহেরুর যোগ্য কন্যা, ধীমান বিদূষী-
বাংলা মানে শেখ মুজিবুর রহমান;
মুজিবকে ছাড়া, স্বাধীন বাংলাদেশ
হয়ে যাবে অর্থহীন; যেমন কান্ডারি
ছাড়া নৌকা অথৈ গাঙে। অনর্গল তিনি
দিচ্ছেন বিবৃতি মিডিয়ায়: কারাগারে
যেন করা হয় এ নেতার নিরাপত্তা
নিশ্চিত; হবে না বরদাস্ত করা, যদি
মুজিবের কিছু হয়; মুজিবের কিছু
হলে, বসে থাকবে না ভারত; বিশ্বের
সব দেশ সাথে নিয়ে, দেয়া হবে দাঁত-
ভাঙা জবাব। ওদিকে অন্যতম পরা-
শক্তি সোভিয়েত ইঊনিয়ন; সোভিয়েত-
প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পডগর্নি, রুদ্র
মূর্তি তিনি ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞে, পাঠালেন
অগ্নি-বার্তা ইয়াহিয়ার উদ্দেশে: সব
সমস্যার সমাধান হতে হবে রাজ-
নৈতিকভাবে, গণহত্যার মধ্য দিয়ে
নয়। কপালে পড়লো ভাঁজ প্রেসিডেন্ট
ইয়াহিয়ার। কেবল যুক্তরাষ্ট্র-চীন
দিয়ে যাচ্ছে তাকে অন্ধ-সমর্থন, শক্তি,
সাহস। গায়ে না শক্তি পায় পালোয়ান,
না পায় অন্তরে যদি বল! কোন্ কালে
জিতেছে অন্যায় চিরতরে, পরাজিত
করে জ্বলন্ত সত্যকে? আজ যেন সত্য-
মিথ্যার লড়াই বেঁধে গেছে পাকিস্তানে;
কাঁপে ইয়াহিয়ার আত্মা আবু জেহেলের
মতো বদরপ্রান্তরে। পঁশিচে মার্চের
রাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার
পর, হয়ে উঠলো অপারেশন সার্চ-
লাইটে, এক রাতেই, বীভৎস বিধ্বস্ত
নগরী ঢাকা; এ যেন জ্যান্ত মুত্যুপুরী;
অজ¯্র ক্ষতবিক্ষত লাশ, বাঙালীর,
পড়ে আছে পথেঘাটে। খুশির বন্যায়
ভাসছে ক্যান্টনমেন্ট। যত লাশ তত
খুশী শেয়াল, কুকুর, কাক আর আর্মি
সব দেশে। টিক্কা খান, বাংলার কসাই,
জানালেন মোবারকবাদ টেলিফোনে
জেনারেল রাও ফরমান আলী আর
জেনারেল খাদিম রাজাকে। কি-আনন্দ
লোক মেরে, জানে তা খাদিম রাজা, রাও
ফরমান আলী আর জেনারেল টিক্কা
খান; অর্বাচীন সংবাদকর্মীরা করে
খালি হৈ-চৈ বিশ্ব-মিডিয়ায় হত্যাযজ্ঞ
নিয়ে! দারুণ হত্যার শিল্প কোন্ দিক
দিয়ে কম লিওনার্দোর শিল্পের চেয়ে?
দেখলো না তারা চেয়ে, কসাইয়ের কাটা
কি-নিখুঁত; একচুলও ত্রুটির সন্ধান
পাবে না এ শিল্পে কেউ কোনোদিন। এক
অফিসার এসে বললো স্যালুট দিয়ে,
“স্যার, দারুণ খবর। ধরা পড়ে গেছে।
বিশাল ঈগলটাকে ধরতে পেরেছি
আমরা; কেবল ছোটগুলো গেছে উড়ে।
তাকে কি সচক্ষে দেখবেন একবার?”
গর্জে উঠলেন টিক্কা খান মহারোষে,
“আমি তার দেখতে চাইনে মুখ। মহা-
পাপিষ্ঠ সে, ইসলামের দুশমন, বেটা
মালাউন, নয় তো কাফের। পাকিস্তান
ভাঙতে চায়- কি-স্পর্ধা! মোনাফেকটার
জিহ্বা কেটে নেবো, বক্তৃতা করার সাধ
মিটাবো জন্মের তরে। দূর হও সব!
আমার সীমানা থেকে সরাও ও নোংবা
জঞ্জাল এক্ষুণি।” বলে হাঁফাতে লাগলো
টিক্কা, যেন ক্ষিপ্ত কোনো শিকারী কুকুর।

রাওয়ালপিন্ডিতে পৌঁছেই প্রেসিডেন্ট
ইয়াহিয়া ছাব্বিশে মার্চ সন্ধ্যায় তুলে
ধরলেন জাতির সামনে, তাঁর টেলি-
ভিশনে দেওয়া বক্তৃতায়, চলমান
পরিস্থিতি; তার জন্যে দায়ী করলেন
তিনি শেখ মুজিবকে; বললেন তাঁকে,
বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী। অতঃপর
মহাক্রোধে আওয়ামীলীগকে করলেন
নিষিদ্ধ ঘোষণা। জাতির উদ্দেশে ফের
বললেন, “ধৃষ্টকে ধরে ফেলেছি আমরা;
এইবার আর সে বাঁচতে পারবে না।”

বাংলার রাখালরাজা, গণমানুষের
মুক্তিদূত শেখ মুজিবকে ততক্ষণে
নিয়ে যাওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় নির্দেশে
যমপুরী রাওয়ালপিন্ডিতে। নিয়ে, পুরে
দেওয়া হলো তাঁকে জেলের ভেতর। “ঘুঘু,
কত আর ফাঁকি দিয়ে খাবি তুই ধান;
কসাইয়ের হাতে তোর যাবে আজ জান!”
বলে ফেটে পড়লেন কদর্য হাসিতে
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া। ওদিকে ভুট্টোকে
আর্মি-প্রহরায় ঢাকা শহরের মহা-
ধ্বংসযজ্ঞের উপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া
হলো ঢাকা বিমান বন্দরে। করাচিতে
পৌঁছেই এ ভীরু-কাপুরুষ ছাড়লেন
স্বস্তির নিঃশ্বাস। ঘিরে ধরা সাংবাদিক-
দের উদ্দেশে বললেন, “সব প্রশংসা
আল্লাহর! পাাকিস্তান আজ নিরাপদ।
দুষ্টেরা খতম হয়ে গেছে। বেঁচে গেছে
পাকিস্তান সব ফাঁড়া থেকে। শুকরিয়া।”

দিন যত যায়, তত হয় মুখ কালো
ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর। ঢাকা থেকে শুধু
দুঃসংবাদই আসছে প্রত্যহ। দিশে-
হারা পাক-আর্মি মুক্তিবাহিনীর ক্রুর
আক্রমণে, যে-আর্মিরা কিনা পরিচিত
সারা বিশ্বে দুর্ধর্ষ, উন্নত প্রশিক্ষণ-
প্রাপ্ত সৈনিক হিসেবে। একটা মারে তো
দশটা পড়ে মারা। হায়, কে কবে ভাবতে
পেরেছিল, ভুখানাঙা বাঙালীরা দেবে
এমন পেঁদানি পাঞ্জাবি সিংহকে? যত
ভাবে, তত গোঙরায় শোকে-দুঃখে-ক্ষোভে
ইয়াহিয়া, আর পাতে ফাঁদ মনে মনে
আরো ভয়াবহ, ফাঁসাতে নাটের গুরু
শেখ মুজিবকে। মুজিবের হাতে গড়া
চার তরবারি এম মনসুর আলী,
তাজউদ্দিন আহমদ, কামারুজ্জামান
এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম
ভাঙতে লাগলো বুদ্ধি-প্রজ্ঞা-দেশপ্রেম-
কূটনীতি-কোপানলে একের পর এক
মানসিংহের তলোয়ার। যত ভাঙে,
ঈশা খাঁর বাংলা-আগ্রাসী আকবর
যেন, তত দ্যাখে সর্ষেফুল চোখে
আর করে চীৎকার বাঁচাও বাঁচাও
বলে গ্যাঁড়াকলে পড়া বৈদেশি সিংহ
বঙ্গের বাতাসে। পড়ে গেল হাহাকার-
হাহুতাশ পাকিস্তান-সৈনিক শিবিরে।
মেরেছিল এতকাল মহাসমারোহে
হাজার হাজার নিরীহ বাঙালী যারা
অকাতরে, আজ তারা মার খেয়ে মরে-
মরে ভূত হয়ে ঘোরে বাংলার যত
ষাঁড়াগাছে-বাঁশঝাড়ে। হানাদার পাক-
সেনা যত, শুনলেই সেক্টর কমান্ডার
মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর
খালেদ মোশাররফ, মেজর কে এম
শফিউল্লাহ, মেজর চিত্ত রঞ্জন
দত্ত, মেজর মীর শওকত আলী,
উইং কমান্ডার এম খাদেমুল
বাশার, মেজর নাজমুল হক,
মেজর কাজী নূরুজ্জামান, মেজর
আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর
আবুল মনজুর, মেজর এম এ
জলিল, মেজর আবু তাহের,
স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ খান
আর কাদেরিয়া বাহিনীর মহাত্রাস
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নাম, পাকা
কাঁঠালের মতো এসে যায় জ্বর সারা
গায়ে আর থরথর করে কাঁপতে থাকে
আতঙ্কে, যেন বা নেকড়ের ভয়ে কাঁপতে
থাকা মেষ। দেশে দেশে প্রাণের ঘাতক
পাক-হানাদারদের পাশবিকতা আর
বর্বরতার বিরুদ্ধে, গড়ে উঠছে জন-
মত; বিশ্ববিবেক পড়ছে ফেটে রোষে;
‘গণহত্যা বন্ধ করো!’ বলে বের হচ্ছে
বিক্ষুব্ধ মিছিল লন্ডনে-নিউইয়র্কে।
জর্জ হ্যারিসন, শ্রেষ্ঠ শিল্পী পৃথিবীর,
দাঁড়ালেন এসে বিধ্বস্ত বাংলার পাশে;
জাদুর গিটার নিয়ে হাতে, উঠলেন
গেয়ে অরফিয়ুসের কণ্ঠে-“বাংলাদেশ!
বাংলাদেশ!” কেঁপে উঠলো সপ্ত মহাদেশ
সেই সুরে। শেখ মুজিব ও বাংলাদেশ-
এই দুই নাম একাকার হয়ে ঘোরে
চক্রাকারে পৃথিবীর আকাশে বাতাসে
আর মুখে মুখে মানুষের। ইয়াহিয়া
পায় টের, স্বপ্নের অখ- পাকিস্তান
তাঁর, যেন তুমুল বন্যার মুখে পড়া
বালির দুর্বল বাঁধ, যে কোনো মুহূর্তে
পড়ে যাবে ধসে। বাংলার স্বাধীনতা
কী দিয়ে ঠেকাবে, হায়, যখন দুর্বার
সিংহের বাচ্চারা ভেড়া হয়ে ভ্যা ভ্যা করে
পূর্ব-পাকিস্তানে! টিক্কা খান যায়, আসে
আবদুল মোতালিব মালিক, ধরতে
যুদ্ধের হাল কঠিন হাতে; কিন্তু হায়,
যে যায় বাঘের বনে সে-ই হয় ভেড়া,
সে-ই দেখি মাংস খাওয়া ভুলে, ভোঁতা দাঁতে
ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়ে যায় ঘাস। অগ্নিশর্মা
হয়ে কাঁপতে থাকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া
ক্রোধে। পায়চারি করে সারা ঘর আর
আওড়ায় মনে মনে: ‘আগা মোহাম্মদ
ইয়াহিয়া খান, পাঞ্জাবি পাঠান আমি;
ভূ-ভারত কাঁপে যার নাম শুনে থর-
থর; কী করে ডরায় সে ভীরু, নির্জীব
বাঙালীর হুংকারে? ঝুলাবো ফাঁসিতে
তোরে, রে মুজিব; তারপর তোর লাশ
খাওয়াবো কুকুর দিয়ে-বসে বসে আমি
দেখবো তা দুই চোখে। যদি হারাতেই
হয় বাংলাকে, তার আগে বাঙালীর
কেটে দেবো সব শিকড়-বাকড়-মূল
চিরতরে; বানিয়ে শ্মশান ধু-ধু, শুধু
হাড়গোড়-খুলি নিয়ে যেখানে শৃগাল
ফুর্তিতে তাদের জাতীয় সঙ্গীত গায়,
তারপরই ফিরে আসবো রাওয়ালপিন্ডিতে।’
অতঃপর তিনি বললেন কথা ফোনে
পরীক্ষিত বন্ধু পাকিস্তানের, প্রেসিডেন্ট
নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে।
যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় ঈশ্বর পৃথিবীর,
পাশে থাকে যার, তার আর কিসে ভয়!
কথা বলতে বলতে ভাবে আর করে
পুলকিত বোধ ইয়াহিয়া। কী-দুর্ধর্ষ
জটিল বুদ্ধির দুঃসাহসী মহাবীর
এ হেনরি কিসিঞ্জার, যে কিনা প্রকাশ্যে
“কুকুরী” “ডাকিনী” বলে ইন্দিরা গান্ধীর
নিয়েছিল এক হাত, আর কি-প্রাণের
কথাই না দিয়েছিল বলে মিডিয়ায়
“ইন্ডিয়ান মাত্রই বাস্টার্ড।” স্বদেশের
মহাবিপদেও ইয়াহিয়া, সেই কথা
মনে করে হেসে ওঠে সশব্দে উল্লাসে।

কে ধরে যুদ্ধের হাল হারকিউলিসের
হাতে, দেবে যে উল্টিয়ে বাংলার গণেষ
এক ফুঁয়ে; কোথা পাই যোগ্য জেনারেল,
করে দেবে স্তব্ধ চিরতরে বাঙালীর
স্বাধীনতাসংগ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধ-
না পায় কূলকিনারা খুঁজে ইয়াহিয়া।
অবশেষে মিললো তার খোঁজ; ভাগ্যবান
তিনি; মহাবীর; লেফটেন্যান্ট জেনারেল
আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। তাঁর
কাঁধে তুলে দিয়ে মহারণাঙ্গনের
ভার, নিশ্চিন্ত হলেন যেন ইয়াহিয়া।
তারিখ ৩ ডিসেম্বর। আক্রমণ করে
বসে পকিস্তান অতর্কিতে, ইন্ডিয়াকে।
প্রত্যুত্তরে সর্ব শক্তি নিয়ে স্থলপথে
ও আকাশপথে হামলে পড়লো ইন্ডিয়া
পূর্ব-পাকিস্তানে। তার সাথে দিলো যোগ
মহোল্লাসে মৃত্যুপণ মুক্তিবাহিনীর
সশস্ত্র যোদ্ধারা। চেঙ্গিজ খানের মহা-
বাহিনীর মতো বিনা প্রতিরোধে যৌথ-
বাহিনী দখল করতে করতে সারা দেশ,
এগিয়ে চললো ঢাকা-অভিমুখে। লড়ে
মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে নির্ভীক,
পথে পথে; লেজ গুটিয়ে পালাতে থাকে
বাঙালীর খুনে দুহাত রাঙানো ঘৃণ্য
পাকিস্তানী সৈন্যরা। এদিকে মুহুর্মুহু
বিমান হামলা করে দেছে পর্যুদস্ত
পাক-বাহিনীকে। যৌথ বাহিনীর তীব্র
আক্রমণে অবশেষে হলো কূপোকাত
ইয়াহিয়ার স্বপ্নের পূর্ব-পাকিস্তান
১৬ ডিসেম্বরে। তিরানব্বই হাজার
সৈন্য নিয়ে জেনারেল নিয়াজী করলো
আত্মসমর্পণ ভারতীয় জেনারেল
অরোরা ও বাংলার মুক্তিবাহিনীর
কাছে। ভরে গেল রেসকোর্স ময়দান
ফের ‘জয় বাংলা!’ আর ‘জয় বঙ্গবন্ধু!’
শ্লোগানে শ্লোগানে। কাঁদলো বাঙালী সুখে।

ক্রোধের অনলে দগ্ধ ইয়াহিয়া খান
বসিয়েছিলেন স্পেশাল ট্রাইবুনাল
দেশদ্রোহী মুজিবের বিচারের জন্য;
বিচারক ব্রিগেডিয়ার রহিমুদ্দিন খান।
ইয়াহিয়ার ইশারায় চললো মার্শাল
কোর্টে বিচারের নামে প্রহসন। দিলো
রায় মৃত্যুদ-ের। মেটাবে মনের ঝাল
ঝুলিয়ে ফাঁসির কাষ্ঠে, ভুলবে যন্ত্রণা
রাবণের শিরোচ্ছেদে প্রেসিডেন্ট ইয়া-
হিয়া, যেন লঙ্কারাজ্যআগ্রাসী শ্রীরাম।
বিশ্বজুড়ে চললো নিন্দার ঝড় এই
রায়ে; আর সাথে সাথে বিশ্বনেতৃবৃন্দ
কড়া হুঁশিয়ারি ছুঁড়ে দিলো পাকিস্তান-
সরকারের উদ্দেশে: ‘বাংলার সাত
কোটি মানুষের নেতা শেখ মুজিবকে
দেখতে চায় সারা বিশ্ব জীবিত, অক্ষত;
নইলে কঠিন খেসারত, দিতে হবে
তাকে।’ এদিকে বিক্ষোভে-প্রতিবাদে ফেটে
পড়েছে করাচি-রাওয়ালপিন্ডি; চায়
তারা ইয়াহিয়ার পদত্যাগ। ভুট্টোর
কূটচালে কূপোকাত ইয়াহিয়া। লেজ
গুটিয়ে সে পালালো জীবন নিয়ে, ধসে
পড়া পাকিস্তানের মসনদ থেকে। ধূর্ত
সিন্ধি শেয়াল, ক্ষমতালোভী জুলফিকার
আলী ভুট্টো, হাসলো গোঁফের তলে, আর
তাঁর কদর্য পশ্চাতদেশে মেরে লাথি,
বানরের মতো এক লাফে চড়ে বসলো
মসনদে। এখন ভাবনা একটাই-
কী করে বাঁচানো যায় হাজার হাজার
পরাজিত সৈন্য, মুক্তিবাহিনীর হাত
থেকে। মুজিবকে যদি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে
মারে, মারা পড়বে তাঁর বিপুল সৈনিক
পূর্ব-পাকিস্তানে; নেবে সে এমন ঝুঁকি
কী সাহসে! সুতরাং আর কোনো রাস্তা
নেই, বের হবার। অগত্যা দিতে হলো
মুক্ত করে খাঁচার পাখিকে পৃথিবীর
বিশাল আকাশে; উড়তে উড়তে পাখি
ফিরে যাবে তাঁর বনে, স্বাধীন বাংলায়।

বললেন ভুট্টো, “হে মুজিব, আপনাকে
মুক্ত করে দিলাম আমরা। আপনার
কাছে রইলো মিনতি এই, মুসলিম
ভ্রাতা হিসেবে, সম্ভব যদি হয়, যেন
সম্পর্কের ছোট্ট সুঁতো বাঁধা থাকে দূর
থেকে, ভাইয়ে ভাইয়ে, ভুলে গিয়ে সব
রেষারেষি, সমস্ত বৈরিতা।” হায়,
এতদিন পর বুঝলেন ভুট্টো, ভ্রাতা
ছিলো বাংলার মুসলিম! ভাই হয়ে
কী করে ভাইয়ের বুকে তবে মারা গেল
এত ছুরি? না জানি বাঙালী কত লাখ
হয়ে গেছে শেষ এই রণে! খালি হয়ে
গেছে কত না মায়ের কোল! ছলছল
করে ওঠে দুটি চোখ মহান নেতার,
অশ্রুজলে। ধরা গলায় বললেন তিনি,
“ভুট্টোসাহেব, আমার সাধ্যমতো চেষ্টা
করে যাবো। তবে যাওয়ার আগে বলে
যাই: আপনারা শাস্তিতে থাকেন, এটা
আমার প্রার্থনা মুসলমান হিসেবে।”

তারিখ ৮ জানুয়ারি। সাল ঊনিশ শ
বাহাত্তর। লন্ডনের উদ্দেশে উড়াল
দিলো দুরন্ত ঈগল সোনার ডানায়,
পাকিস্তান থেকে। উড়তে উড়তে পাখি
ভাবে বারবার বাংলার এ লোককথা:
“রাখে আল্লাহ, মারে কে!” পারো না ঝুলাতে
তুমি ফাঁসির কাষ্ঠে হে জল্লাদ, যদি না
ফয়সালা হয় আসমানে। খুঁড়েছিল
কবর উল্লাসে কারাপক্ষ, সমাহিত
করবে ফাঁসির পর, সেলের পাশেই।
জল্লাদ প্রস্তুত। আসলেই পরওয়ানা,
করা হবে কার্যকর তাঁর ফাসি। ভাগ্য-
গুণে আগরতলা ষড়যন্ত্র-মামলায়
সেইবার গিয়েছিল বেঁচে; এবারও যে
বেঁচে যাবে কপালের গুণে, পেরেছিল
ভাবতে কে কবে! আঙুল কামড়ায় ভুট্টো
আর করে আফসোস মসনদে বসে।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘মুক্তি পর্ব’; নাম ‘অষ্টম সর্গ’।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s