মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

দশম সর্গ

চলেছে বাংলাদেশ কেশরের পিঠে,
সারা পৃথিবীর মহাবিস্ময়; যে দ্যাখে,
হয়ে যায় হতবাক সে-ই এর রূপে,
খ্যাতি আর গুণগানে। কে জানতো, এত
শক্তি নিয়ে এশিয়ার এক কোণে শুয়ে
আছে এক জাতি, সুউন্নত, সুপ্রাচীন,
নুহের প্রপৌত্র বঙের বংশধর!
সে-জাতি মহান নেতা শেখ মুজিবের
বলিষ্ঠ নেতৃত্বে, চিরোন্নত শির তার
ধরেছে জগতে তুলে, যেন হিমালয়।
মহাসমরের ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে,
সদর্পে গা ঝাড়া দিয়ে, ছুটেছে কেবলি
বিদ্যুদ্বেগে, অংশ নিতে বিশ্বসভ্যতার
মহাযজ্ঞে; নেতা তার দক্ষ দূরদর্শী
মহান মুজিব। পেয়েছে স্বাধীনতার
স্বাদ, বিপুল মৃত্যুর বিনিময়ে; গতি
তাই এত ক্ষিপ্র, এত দীপ্র চিত্তবল;
বাঙালীর প্রাণোচ্ছ্বাসে জগতে হঠাৎ
উজ্জীবিত কত জাতি! হয়েছে সদস্য
জাতিসংঘের। কত বড় বড় দেশ
দিয়েছে বাড়িয়ে বন্ধুত্বের হাত, পাশে
এসে দাঁড়িয়েছে বিপুল সাহায্য নিয়ে
সাগ্রহে। বাংলার কৃষক শস্যের মন্ত্রে
ভীষণ উদ্দীপ্ত; কৃষিবিপ্লব ঘটাচ্ছে
গ্রামে গ্রামে। শ্রমিকেরা হচ্ছে স্বাবলম্বী।
থাকবে না ভুখানাঙা কেউ ত্রিশ লক্ষ
শহীদের বাংলাদেশে। শেখ মুজিবের
বাংলাদেশ মানে শোষণ-বঞ্চনামুক্ত
সুফলা সাম্যের দেশ। এই ব্রত নিয়ে
স্বদেশ-নির্মাণে নিমগ্ন বঙ্গের নেতা।
বিপুল সাফল্য তাঁর, দেখে, জ্বলে মরে
গোপন শত্রুরা, আর তলে তলে পাতে
ফাঁদ, যেন বিষাক্ত কাঁকলাস। বঙ্গবন্ধু,
দয়ার সমুদ্র তিনি; কত রাজাকার
হস্তপদ ধরে, পেয়ে গেছে ক্ষমা; মিশে
গেছে অতঃপর বাঙালীর মাঝে। হায়,
কবে কালনাগ ময়ুরের দলে ভিড়ে
হয়েছে ময়ুর? কবে কোথা বিষবৃক্ষ
দ্রাক্ষাবনে জন্মে দেছে দ্রাক্ষা উপহার?
অচিরেই মহানেতা পেয়ে যান টের,
তাঁর স্বপ্ন ধুলায় মিশিয়ে দিতে বহু
জনে বুনছে বিষ-জাল, দেশে ও বিদেশে।

শাস্ত্র বলে: ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে
রক্ষা করা কঠিন অধিক।’ মহারণে
কোনো দেশ জয়ের চেয়েও, দেশ গড়া
তেমনি কঠিন; জটিল যুদ্ধ এ, ওঁৎ
পেতে রয়েছে যখন বিষধর ফণী
অগণিত, নিজ গৃহে। ভাবেন স্থপতি
নির্জনে: ‘কেবলি চায় তারা, ছিলো যারা
আরাম-আয়েশে মাচার উপর, ঝুঁকি-
হীন, যুদ্ধহীন। অথচ বিপ্লবী মুক্তি-
যোদ্ধারা, স্বর্ণসন্তান যারা বাংলার,
যারা তুচ্ছ করে প্রাণ নির্ভয়ে ঝাঁপিযে
পড়েছিল রণাঙ্গনে, চাকরিবিহীন
নিরন্ন নির্জীব অসহায় ঘুরতেছে
পথে পথে! এ দেশ-স্বাধীন, সার্বভৌম-
তাঁদেরই অর্জন; কিন্তু কী পেয়েছে তাঁরা
স্বদেশের কাছে? রাজ-কোষাগার হতে
বেতন তোলে না শেখ; কী করে বেতন
তুলে কেনাকাটা ফুর্তি করবে মুজিব
যখন বাংলার সূর্য-সন্তানেরা সব
নিঃস্ব, বেকার! করে না বাজারঘাট;
স্ত্রী-ই চালায় সংসার, যেভাবে চালাতো
রক্তাক্ত যুদ্ধের আগে। আবুল ফজল,
ভাইস-চ্যান্সেলর চট্টগ্রাম ভার্সিটির,
এসেছিলেন বাসায় একদিন; তাঁকে
নিয়ে বসলেন খেতে দুপুরের খানা।
মোটা চাউলের ভাত আর ছোট মাছ
সাজানো টেবিলে। যেন হোঁচট খেলেন
তিনি। বললেন শেখ, “প্রফেসর সা’ব,
আমি নিঃস্ব; আপনার ভাবীই আমাকে
খেতে দেয় তিনবেলা।” হায়, খোদা, কোন্
মুখে শেখ মুজিব পলান্ন দেবে মুখে,
যখন প্রাণের সূর্য-সন্তানেরা, যুদ্ধে
যাওয়া সবুজ ছেলেরা, নিরন্ন ঘুরে
বেড়ায়, বাংলার পথে পথে! খাই খাই
করছে কেবলি তারা, যারা কোনোদিন
হাতে তুলে নেয়নি বন্দুক, ঝুঁকি নিয়ে
করেনি লড়াই শত্রুর সম্মুখে। ব্যর্থ
করে দিতে চায় তারা শেখ মুজিবের
সোনার বাংলা গড়ার সোনালি স্বপ্ন।
তারাও রাখুক জেনে: কৃষক-শ্রমিক
এই বাংলার, না হচ্ছে দারিদ্র্যমুক্ত
যতদিন, শেখ মুজিবও হবে না শান্ত;
লড়াই চালিয়ে যাবে বাংলার রাখাল-
রাজা, বাঙালীর বন্ধু, বাংলার লেনিন
মেহনতি মানুষের জন্যে আজীবন।

বারবার তাঁর মনে মারে উঁকি বল-
শেভিকদের দুর্জয় বিপ্লবের কথা;
লেনিন পারেন যদি তাদেরকে নিয়ে
গড়তে শ্রমিকসাম্রাজ্য বিশ্বের বিস্ময়,
তিনিই বা কেন নয় বাঙালীকে নিয়ে?
হানাদার পাক-আর্মিদের কাছ থেকে
স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা বীরবাঙালী
রাশানদের চেয়ে কোন্ দিক দিয়ে কম?
এক বুক স্বপ্ন নিয়ে গড়ে তোলা তাঁর
বাকশাল এনে দেবে বাংলার কৃষক
ও শ্রমিকের জীবনে অর্থনৈতিক মুক্তি,
আর তারা সত্যিকার মানুষের মতো
মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে পৃথিবীতে।
পুঁজিবাদী যারা গরিবের রক্ত চুষে
যাপন করতে চায় জোঁকের জীবন;
খেটে খাওয়া বাঙালীর ঘামঝরা শস্য
যারা লুটেপুটে খেতে চায় বর্গীদের
মতো রঙিন প্রাসাদে বসে, তারা তাঁর
বিরোধিতা করবেই, তারা যেনতেন-
প্রকারেন ধ্বংস চাইবে তাঁর, চাবে মৃত্যু-
অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর তাতে
ডরায় না মুজিব; আল্লাহ ছাড়া এ জগতে,
হে মূর্খেরা, আর কারে ডরায় মুজিব?

যারা ছিলো বন্ধুজন, তাদেরকে বড়
অচেনা অচেনা মনে হয় আজ। বড়
বড় পোস্টে বসে তারা খ্যা খ্যা করে হাসে;
যত বেশি হাসে সজ্জনের হাসি, তত
বেশি মনে হয় দুর্বৃত্ত। কাছের বন্ধু
মোশতাক লেগে আছে আঁঠার মতন
সর্বক্ষণ; ঘেঁষতে দেয় না কাউকেই
আশপাশে। বড্ড বেশি সখ্যের কর্তৃত্ব
খাটাচ্ছে সে অন্য বন্ধুজনে। মহানেতা
বঙ্গবন্ধু যে-কথাই উচ্চারণ করে
মুখে, প্রকাশ্যে সে পূর্ণ সমর্থন দেয়
তাঁর অনুকূলে, উচ্চৈঃস্বরে। এত বেশি
ছলাৎ ছলাৎ ধ্বনি তার ভালবাসায়,
যা ভাবিয়ে তোলে মাঝেমধ্যে, দূরদর্শী
বাংলার নেতাকে। কিন্তু তখনই তিনি
উড়িয়ে দেন তা, অলীক কল্পনা ভেবে।
সিজারের সিংহাসন ও জীবন নিয়ে
যেভাবে ব্রুটাস কাটছিল নানা ছক
সুগোপনে; সেইভাবে বন্ধু-মোশতাকও
করতে লাগলো খেলা চুপিসারে, ধুলো
দিয়ে শেখ মুজিবের চোখে। লুকিয়ে সে
বসতে লাগলো গোপন বৈঠকে ধূর্ত
ইউ.এস.এ.-র রাষ্ট্রদূত বোস্টারের
সাথে তার নিজের বাসায়, মধ্যরাতে।
হাত-মোজা, পার মোজা আর রোরখা পরে
অভিজাত মুসলিম মহিলার বেশে
আসেন বোস্টার তার বাড়ি; অভিনয়
তার ধরে, সাধ্য কার! বলেন বোস্টার
চাপা স্বরে: ‘মুসলমানের ঘোর শত্রু
শেখ মুজিব। তোমরা জানো, সে নাস্তিক;
অচিরেই বাংলাদেশকে কম্যুনিস্ট-
কান্ট্রি বানিয়ে ফেলবে। ফিডেল ক্যাস্ট্রোর
বন্ধু সে। গণতন্ত্রের নাম্বার ওয়ান
দুশমন। সোভিয়েত ইউনিয়নের
পা চাটা গোলাম। পুরোপুরি বেইমান-
কাফের বানিয়ে ছাড়বে সে বাঙালীকে।
সুতরাং দাঁড়ান আপনি মেরুদ-
খাড়া করে। ভয় নেই; আছে যুক্তরাষ্ট্র
আপনার পাশে। প্রথমে একটা কাজ
করবেন আপনারা; শেখ মুজিবকে
রাষ্ট্রের সমস্ত কাজে অসহযোগিতা
করুন, সে যেন টের না পায়; এবং
সৃষ্টি করুন কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ; মানুষ
না-খেয়ে মরবে আর শেখ মুজিবের
বাকশাল মারা পড়বে মাঝমাঠে।’ বলে
পাতি শেয়ালের মতো হাসলো বোস্টার
খ্যা খ্যা করে। তাই শুনে ‘হ্যাঁ, চমৎকার
আইডিয়া! চমৎকার আইডিয়া!’ বলে
করতে লাগলো মোসাহেবি নপুংসক
মোশতাক, জিন্নাহ-ক্যাপ চাপিয়ে মস্তকে।
বললো বোস্টার হেসে, “আপনার কোনো
কষ্ট করা লাগবে না। কর্নেল তাহের
ও তার গু-ারা মুজিবের চামড়া ছুলে
ডুগডুগি বানাবে; আপনি কেবল কণ্ঠ
ছেড়ে দিয়ে বেশি বেশি জাতীয় সঙ্গীত
গাইতে থাকবেন। স্বাধীন বাঙালি জাতি
আপনাকে মাথায় নিয়ে নাচতে থাকবে।”
বলে হাসলো সে আরেকবার কুত্তার
মতো; ছাগলের মতো হাসলো মোশতাকও।
এ যেন ক্লাইভ আর মীর জাফরের
মধ্যে গুপ্ত আলোচনা ফের। এইভাবে
ক্লাইভও বোরখা পরে যেত মধ্যরাতে
গোপন বৈঠকে মীর জাফরের বাড়ি।
কি-অদ্ভুত মিল ক্লাইভে-বোস্টারে আর
মীর জাফর ও মোশতাকে! হে মুজিব,
যখন নিজের ঘরে বিভীষণ, লঙ্কা
তবে অরক্ষিত ফের, ভীষণ বিপদে!
রক্তাক্ত যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হউন;
কখন না আবার লক্ষণ চোরাপথে
ঢুকে, ছুঁড়ে মারে অন্যায়-শর কুক্ষণে!

এত শত্রু চারদিকে, এত দুশমন;
যুক্তরাষ্ট্র-চীন, ঠিক আগের মতোই,
ভিতরে-বাইরে করে যাচ্ছে ষড়যন্ত্র;
মুসলিম রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে জোর প্রপাগা-া
চালাচ্ছে শত্রুরা: হয়ে গেছে বাংলাদেশ
নাস্তিকের আখড়া, মুছে ফেলা হচ্ছে সব
ইসলামি নামধাম রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে।
ধর্মপ্রাণ বাংলার মুসলমানকে
করছে বিভ্রান্ত দেশি ও বিদেশি যত
কুচক্রী মহল। বাংলার মাটিতে বসে
লর্ড ক্লাইভের মতো পেতে যাচ্ছে জাল
ডেভিস ইউজিন বোস্টার, যুক্তরাষ্ট্রের
রাষ্ট্রদূত, সরকারের বিরুদ্ধে। তাঁর
স্পর্ধা অতিক্রম করে যাচ্ছে সব সীমা,
ডিপ্লোমেসির ও সৌজন্যের। বিভীষণ
ঘরের ভেতরে বসে মিলিয়েছে হাত
পরদেশআগ্রাসী রাম ও লক্ষণের
সাথে। মেঘনাদ তবে বুঝি অধর্মের
মৃত্যুফাঁদে পড়েছে আবার? “হায়, রেনু,
তুমি কও, কোন্ দিকে আমি যাবো; যেন
কারবালা চারদিকে, ইমাম হোসেন
বক্ষে নিয়ে তাঁর তৃষ্ণার্ত শিশুকে, বৃথা
‘পানি! পানি!’ বলে করছে চীৎকার বৈরি-
বাতাসে; শত্রুর ব্যূহ ভেদ করে, যেন
নির্ভীক হোসেন বারবার দুলদুল
নিয়ে, যেতে চাচ্ছে সম্মুখে, ভাগ্যের দোষে
তলিয়ে যাচ্ছে পা তাঁর অশ্বের, বালির
ভেতর; আমার সোনার বাংলাদেশ,
ত্রিশ লক্ষ শহীদের অমূল্য প্রাণের
বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ, নয়
মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর দুই লক্ষ
মাতা ও ভগ্নির ইজ্জতের বিনিময়ে
অর্জিত বাংলাদেশ-এদেশের সব
স্বপ্ন-সম্ভাবনা করে দিতে চায় ওরা
ধূলিসাৎ; আর কষ্টার্জিত আমাদের
স্বাধীনতা দিতে চায় অর্থহীন করে;
থাকতে শরীরে এক বিন্দু রক্ত-জল,
আমি তা দেবো না হতে। মুজিবকে ওরা
কাপুরুষ মনে করে? আমি বন্দুকের
সামনে দিয়েছি বক্ষ পেতে, পাকিস্তানী
জান্তারা সাহস করে নাই করে গুলি।
আমার জন্যে কবর খোঁড়া হয়েছিল;
কিন্তু করে নাই ওরা মারতে সাহস।
কী ভেবেছে আমলারা? রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে ঘুরে
ভুখানাঙা মানুষের জন্যে বাংলার,
ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে আনি আমি;
ওরা তা অফিসে বন্দী করে রাখে; পেতে
দেয় না তা এদেশের দুঃখী মানুষকে;
আমি খবর পেয়েছি, কেউ কেউ আছে,
সেসব ত্রাণসামগ্রী রাতের আঁধারে
ফেলে দিচ্ছে নদীতে ও সাগরে; উদ্দেশ্য,
আমাকে বেকায়দায় ফেলানো।” বিক্ষুব্ধ
নেতা, প্রিয় পতি তাঁর, মহান মুজিব,
বলে চলেছেন এক মনে, শুনছেন
কান পেতে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা
অশ্রুসিক্ত চোখে; হায়, কী দিয়ে দেবেন
সান্ত¡না, কী কয়ে করবেন ঠান্ডা তাঁকে,
যাচ্ছেন অস্থির হয়ে তিনি, ভেবে ভেবে।

“হাসিনার বাপ, শান্ত হোন!” এই বলে
মুছতে লাগলেন শাড়ির আঁচলে তাঁর,
ক্ষুব্ধ পতির কপাল।-“দেশে ও বিদেশে
কত না বন্ধুবান্ধব আপনার! কথা
বলুন তাদের সঙ্গে; বুদ্ধি-পরামর্শ
নেন। বাংলার মানুষকে সাথে নিয়ে
এগিয়ে চলুন। আওয়ামী লীগের ত্যাগী
নেতাদের নিকটে রাখুন। জানি, কেউ
কিছুই করতে পারবে না আপনার।”

স্ত্রীর কথা শেখ শুনলো কি শুনলো না,
গেল না তা বুঝা। গভীর ভাবনায় ডুবে
গেছে তাঁর মন। দেশি ও আন্তর্জাতিক
সুগভীর ষড়যন্ত্রে ভীষণ উদ্বিগ্ন
তিনি। প্রিয় স্ত্রীকে সে-উদ্বিগ্নতার কথা
প্রাণ খুলে বলে চলেছেন অকপটে:
“মাঝে মাঝে মনে হয়, বুঝি ভুলই করে
ফেললাম; লোকে আসে, ফেরাতে পারি না
আমি; যা চায়, দিয়ে দি। কিন্তু সবাই যে
ঠকায় আমার বাংলার মানুষকে।
ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না; সব
কর্মচারী ঘুষ খায়, সব কর্মকর্তা
ঘুষ খায়। শিক্ষিত, মেধাবী, বংশীয়-
সব শ্রেণির লোককে বসিয়ে দেখেছি
বড় বড় পদে; তারাও দুর্নীতি করে।
সাত কোটি মানুষের জন্যে আমি সাড়ে
সাত কোটি কম্বল দিলাম; আমারটা
পেলাম না খুঁজে। কী করবো বলো। সৎ-
মানুষের বড়ই অভাব সারা দেশে।
দেশের উন্নতি করতে কিছুই লাগে না,
রেনু; সততা ও দেশপ্রেমই শুধু লাগে।
উনিশ শ তিয়াত্তরের আলজিয়ার্স
নন-এলাইন্ড সম্মেলনে পৃথিবীর
কত বড় বড় নেতাদের সাথে দেখা
হয়েছিল। কথা হয়েছিল কিউবার
নেতা ফিডেল ক্যাস্ট্রোর সাথে। হায়, কত
বড় নেতা, নিজেই এসেছিলেন, কথা
বলতে একান্তে। মনে পড়ে তাঁর কথা।
তিনি বললেন, ‘হে মুজিব, হিমালয়
দেখতে চাই না আর; আমি আপনাকে
দেখেই বুঝেছি হিমালয় কী রকম।’ ”
বলতে বলতে হয়ে পড়লেন গম্ভীর
বঙ্গের বাদশা, যেন অকস্মাৎ কোনো
গভীর ভাবনায় তলিয়ে গেছেন তিনি
ভারী পাথরের মতো। ফজিলাতুন্নেছা
তাকিয়ে আছেন নির্বাক, সেদিকে। ফের
বলে উঠলেন বঙ্গবন্ধু: “হাত ধরে,
বসলেন তিনি মুখোমুখি। বললেন
বসে, ‘কিন্তু মুজিব, আপনি তো খতম;
আপনার নাম দিয়েছি আমরা কেটে
জীবিতদের তালিকা থেকে। আপনি শেষ,
যেভাবে চিলির প্রেসিডেন্ট সালভেদর
গিলেরমো আলেন্দে গসেন্স শেষ হয়ে
গেছে।’ হতভম্ব হয়ে যাই আমি, শুনে।
আমি বললাম, “মহামান্য প্রেসিডেন্ট,
কী বলতে চান আপনি?” তিনি দিলেন না
উত্তর। বরং পাল্টা প্রশ্ন চাবুকের
মতো মারলেন তিনি ছুঁড়ে: “কাদেরকে
দিয়ে দেশ চালাচ্ছেন, মুজিব? অফিসে-
আদালতে সব বসে আছে কারা? ছিলো
সব পরাজিত পাকিস্তানের সার্ভেন্ট।”
আমি বললাম, “কী করে চালাবো আমি
দেশ দক্ষ অফিসার ছাড়া?” বললেন
তিনি, “আমাকে বুঝান, হে মুজিব, তারা
দক্ষ হলো কিভাবে? আপনি কাদেরকে
দিয়ে শত্রুমুক্ত করেছেন বাংলাকে?
কাদের সাহায্যে পেয়েছেন স্বাধীনতা?”

“আমার অকুতোভয় মুক্তিবাহিনীর
সাহায্যে।” “বলুন এ-বাহিনীর সদস্য
ছিলো কারা?” “বাংলার কৃষক-শ্রমিক-
ছাত্র-জনতা।” “তাহলে বলুন, মুজিব,
যে-অফিসাররা বুদ্ধি দিয়ে, প্রজ্ঞা দিয়ে
বাঁচাতে পারলো না পাকিস্তানকে, হেরে
বসলো অশিক্ষিত ও আধা-শিক্ষিত সব
মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, কী করে হলেন
দক্ষ কর্মকর্তা তারা? ভিতরে ভিতরে
তারা ক্ষুব্ধ, লজ্জিত এবং ঈর্ষান্বিত;
ঘা খাওয়া কেউটের মতো খুঁজতেছে
ছোবল মারার সুবর্ণ সুযোগ; শেখ,
সাবধান! পরাজিত শক্তিরাই কিন্তু
পেতে যাচ্ছে চুপিসারে ষড়যন্ত্রজাল
আপনার বিরুদ্ধে। আপনি চোখ-কান
খোলা রাখুন। আমাকে দেখুন, আমার
সৈন্যরা আমাকে আগলে রেখেছে কিভাবে;
আমেরিকা আমাকে মারতে চায়; কিন্তু
ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। সব ব্যর্থতার
রহস্য আমার বিশ্বস্ত সৈন্যরা। এরা
আমার এমনই সৈনিক, জীবন দেবে,
তবু মরতে দেবে না আমাকে। খাবারে
বিষ দিয়ে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা
করে আমেরিকা। তাও ব্যর্থ হয়ে যায়;
রহস্য আমার বিশ্বস্ত সৈন্যরা। এরা
নিজেরা না খেয়ে কোনো খাদ্যকণা ছুঁতে
দেয় না আমাকে। টেস্ট না করে, টানতে
দেয় না চুরুট। কী করে আমাকে হত্যা
করবে আমেরিকা? আমার সৈন্যকে কেউ
টাকা দিয়ে কিনতে পারবে না। এরা হলো
তারা, করেছি যাদের সাথে একসাথে
যুদ্ধ রণাঙ্গনে; এরা মরে যাবে, তবু
মারতে দেবে না আমাকে। মুজিব, মনে
রাখবেন চিরদিন একথা, জগতে
যুদ্ধের বন্ধুই শ্রেষ্ঠ বন্ধু মানুষের।’ ”
বলে থামলেন বঙ্গবন্ধু। কাঁপছেন
ভয়ে বঙ্গমাতা। জাপটে ধরলেন প্রিয়
জীবনসঙ্গীকে। মনে হলো তাঁর, বুঝি
হন্তারক ওঁৎ পেতে আছে আশপাশে।
বললেন কেঁদে, “চলুন পালিয়ে যাই;
কামাল জামাল হাসিনা রেহানা আর
রাসেলকে নিয়ে চলে যাই দূর দেশে;
রাষ্ট্রশাসনে আমার কাজ নেই আর।
চলুন পালিয়ে যাই, হাসিনার বাপ!”

স্ত্রীর কা- দেখে ফেটে পড়লেন অট্ট-
হাসিতে বঙ্গের অধিপতি। বললেন,
“রেনু, তুমিই না জুগিয়ে এসেছো শক্তি-
সাহস আমাকে সারাটা জীবন; ঠেলে
দিয়েছো আমাকে তুমিই না হাসিমুখে
বাংলার মুক্তিসংগ্রামে; কই, সেই
ভয়াবহ পঁচিশে মার্চের কালোরাত্রি
আসার পূর্বে তো এতটা ভড়কে যাওনি
তুমি; মহাযুদ্ধের আভাস পেয়েও তো
পর্বতের মতো অবিচল হয়ে ছিলে;
আজ তো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার
একচ্ছত্র অধিপতি তোমার মুজিব;
তবু কেন ভয়ে এত কুঁকড়ে যাচ্ছো তুমি-
এই ভয় তোমাকে কি মানায়, হে রেনু?”

আর্দ্রস্বরে বললেন বঙ্গমাতা, “ভয়,
শুধু ভয় রাত্রিদিন আমাকে সাপের
মতো খালি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ধরে। আমি
খুব ভয়ে ভয়ে থাকি সারাক্ষণ। সেই
দুর্বার সাহস আসে না হৃদয়ে আর।
তখন প্রচ- শক্তি ছিলো মনে; মনে
হতো, কুমিরের মুখে পড়লেও আপনি
ফিরে আসবেন ঠিকঠিকই নিরাপদে
আমার নিকট। আজ শুধু ভয় করে;
সত্যি বলতে কি, আপনি রাষ্ট্রের কাজে
যতক্ষণ বাইরে থাকেন, আল্লাহ আল্লাহ
করতে থাকি আমি; ঘরে না ফেরা পর্যন্ত
টেনশন কাটে না আমার। আগে মনে
হতো, সকলেই আপনার বন্ধু; আজ
মনে হয়, চারদিকে খালি দুশমন।
বলে না আমার মন ভালো কিছুতেই-”
বলে হাউমাউ করে উঠলেন কেঁদে
বঙ্গমাতা।

‘কী হয়েছে’ বলে ছুটে এলো
হাসিনা-রেহানা একসাথে। অপ্রস্তুত
মহানেতা। সামলিয়ে নিয়ে, বললেন
তবু হেসে, “তোমার মা খালি টেনশন
করে-আমার কী হবে আর তোমাদের
কী হবে-এসব ছাইভস্ম নিয়ে রোজ!
তা, হাসিনা, তোমার তো জার্মানি যাওয়ার
হয়ে এলো সময়-প্রস্তুতিপর্ব শেষ?”

আঁচলে দুচোখ মুছে বলে উঠলেন
বঙ্গমাতা ঝাঁঝালো কণ্ঠে, “এ বাড়ি ছেড়ে
সবাই যেখানে খুশি চলে যাক, আমি
একা একা শ্মশান চৌকি দি।” বলে তিনি
বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। পাছ পাছ
ছুটে গেলেন রেহেনা। পিতার মুখের
দিকে চেয়ে রইলেন অপলক শেখ
হাসিনা পরম কৌতূহলে। বললেন
পিতাশ্রেষ্ঠ, “ইদানীং তোমার মা যেন
ভেঙে পড়ছে মনের দিক থেকে। ছোট-
খাটো বিষয় নিয়েও টেনশন করছে।
তুমি জার্মাানিতে যাচ্ছো। রেহেনাও যাচ্ছে
সাথে। এসব তোমার মাকে বিচলিত
করে তুলছে। অনর্থক টেনশন। তবু
মার মন তো। তোমারও এরকমই হবে
একদিন। তবে যেখানেই থাকো, মনে
রেখো, তুমি মুজিবের মেয়ে, কাপুরুষ
ছিলো না তোমার পিতা, ঘাড় উঁচু করে
বীরঙ্গনা হয়ে বেড়াবে এ পৃথিবীতে।”

বললো দুহিতা তাঁর, শান্তস্বরে, “বাবা,
জার্মানিতে যাই, দিচ্ছেনা আমার মনও
সায় কিছুতেই। আপনি বললে যেতে,
যাবো; নইলে থেকেই যাবো এইবার;
যাবো না কোথাও আপাতত।” বললেন
বঙ্গবন্ধু শুনে, “ আমারও কি মন চায়
তোমাকে ছাড়তে, মাগো? তবু তুমি যাও;
থেকে আসো কিছু দিন ওয়াজেদ মিয়ার
সাথে। তারপরই না হয় ফিরে এসো
সব। ফিরে এসে বাংলাদেশ গড়ার
মহাসংগ্রামে নিয়োজিত রেখো তুমি
নিজেকেও। কত না স্বপ্ন আমার, হাসু,
এ দেশকে নিয়ে। আমি যদি না-ও থাকি,
সোনার বাংলাদেশ নিয়ে ছুটে যেও
উন্নতির চরম শিখরে; পৃথিবীকে
দেখিয়ে দিও-হ্যা, আমরাও পারি; পারি
আমরাও বাড়িয়ে দিতে সাহায্যের হাত
বিশ্বের দুর্দিনে।”

“এমন অশুভ কথা
কবেন না, পিতা, মুখে। আপনি না থাকলে
কী হবে বলুন এদেশের গতি! জাতি,
দেশ এবং আমরা কী নিয়ে থাকবো
আপনি না থাকলে! ” বলে উঠলেন কেঁদে
দুলালী হাসিনা হুঁ-হুঁ করে। এক নদী
জল ঢেউ খেলে গেল মহান নেতার
ব্যথিত দুচোখে। কে জানতো, এই যাওয়া
টেনে দেবে অনন্ত বিচ্ছেদ জনক ও
আত্মজার মাঝখানে! হায়, কে জানতো
ফিরে এসে দেখতে আর পারবে না প্রিয়
জনকের মুখ তাঁর, কোনোদিন; ধু-ধু
গোরস্থান হয়ে যাবে বিশাল মানুষ,
বাংলার হিমালয়, বিস্ময় বিশ্বের,
শেখ মুজিবুর রহমান, কে জানতো!

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘সংকট পর্ব’; নাম ‘দশম সর্গ’।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s