ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খন্ডকবিতা / আফসার নিজাম

এক/ক.
সূর্য ডুবে গেলে
কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া
একচিলতে রোদের আশায়
পরবাসী স্বামীর মতো
অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচীন অশ্বথ।

এক/খ.
সব রাত্রী ঘরে ফেরে
তিনমাথা মানুষের মতো
একচিলতে রোদে
ছায়া হয়ে শুয়ে থাকে প্রাচীন অশ্বথ।

দুই/ক.
চৈত্র দুপুরে আমার ছায়াটি অদৃশ্য হয়ে গেলে
দীর্ঘ পদযাত্রায় ক্লান্ত পথিকের মতো
ছায়া খুঁজতে অশ্বথের নিচে দাঁড়ালে
কোথা থেকে লোকটি এসে জিজ্ঞেস করে-

কি খুঁজছেন হুজুর?
ছায়া। আপনি?
আমিও।

দুই/খ.
অশ্বথের নিচে দাঁড়িয়ে লোকটিকে বলতে শুনেছি
সব পথিকের ছায়া কেড়েছে প্রাচীন অশ্বথ
আমি তার মূল খুড়ে ছায়া নিয়ে যাবো
এই দেখুন খন্তা কুড়াল…
বলেই লোকটি খুড়তে থাকে অশ্বথের শেকড়

আজও সে খুড়ে যাচ্ছে
কান সজাগ থাকলে আপনিও শুনতে পাবেন।

তিন/ক.
গতকাল সূর্যের আলোয় যে সুরমা রঙের ছায়াটি
আমার উঠোন পর্যন্ত এসেছিলো
আজ রাতেও চাঁদের আলোয়
সে আমার প্রাঙ্গণে আছড়ে পড়েছে
তাকে পাঁজাকোলা করে ঘরে প্রবেশ করি
সে মিশে যায় আমার ভেতর

এখন আমার কোনো ছায়া নেই।

তিন/খ.
ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে
যে উচ্চারণ করে
আমার কোনো ছায়া নেই-

প্রভু সে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বি হতে চায়।

আমার আগে কেউ না / আফসার নিজাম

আমার আগে কেউ কবিতার জন্য প্রাণদান করেনি
কেউ একটি নতুন গাছ রোপণ করে ঢালেনি পানি
মায়া মমতা প্রেম ভালোবাসা দিয়ে
করে তোলেনি সুঠাম দেহের অধিকারী

আমার আগে কেউ প্রেমের জন্য লাঙল চষেনি
পলিমাটির ভেতর বীর্য রোপণ করে বলেনি- জীবন

আমার আগে কেউ অস্বীকার করেনি নীলচাষ
নীলের বদলে- সোনালি আঁশের ভাঁজে ভাঁজে
রুয়ে দেয়নি আস্ত সূর্য

আমার আগে কেউ গন্ধম ফলের স্বাদ গ্রহণ করেনি
নারীর চিবুক ধরে আকণ্ঠ পান করেনি সৌন্দর্য
চোখে চোখ রেখে কাটিয়ে দেয়নি পয়ত্রিশ বছর

আমার আগে কেউ না! না কেউ না!!

দূরাগত প্রেমিকের প্রতি / আফসার নিজাম

১.
গাঢ় কুয়াশার ভেতর শুয়ে আছি। কুয়াশার কবর থেকে উঠে আসে স্মৃতিচিহ্ন।
ভোরের জানালা ভেদ করে পরানপাখি উড়ে যায় হাইব্রিড ধানক্ষেতে
বেঁচে থাকার আনন্দ দূরের জিনফুল জীবনের মতো দূরাগত
মনে হয় সমুদ্রের জানালা খুলে ভাসে জানাজার তেলাওয়াত
তবুও কুয়াশার সমাধির পাশে শুয়ে স্বপ্ন দেখি
লবণের ঋণ শোধ করা অথবা মায়ের
দুধের ঋণ শোধ করার আনন্দ
তবুও আমি চিরঋণি
আমার দেশ
মাটি
মা
এবঙ আমার ভালোবাসার গ্রাম ও ফিকে হওয়া স্মৃতির দূরাগত প্রেমিকের প্রতি।

২.
কাছিমগালা পান্ডুলিপির বিবর্ণ ইতিহাস মুছে গেছে
অথচ কাছিমের মতো হেঁটে আসে মৃত্যু
যেনো মরে যাওয়ার আনন্দেই
লংমার্চ করে পিঁপড়ে জীবন
তবুও শিশুর আলিঙ্গনের মতো
জানালার কার্নিশ বেয়ে নেমে আসে জীবন।

৩.
কুয়াশার কবরের পাশে শুয়ে দেখি অনন্তকাল
জীবনের পাপ পুণ্য লোভ ভালোবাসা জান্নাত জাহান্নাম
উপরে সপ্তাকাশ খুলে খেলে যায় ফেরেস্তাদের শিশুজীবন
নিচে নিয়মের শৃঙ্খল ভেঙে গান গায় মানব মাটি অস্থি মজ্জা
আমাদের চোখ সমাধি হয় ভোরের জানালা খুলে দৃশ্যপাখি উড়ে যায়
হাইব্রিড জীবন নতুন জীবনের খুঁজে উড়াল দেয় অনন্তকালের ঘূর্ণায়মান জীবনে।

স্বরাজ ফেরিওয়ালা / আফসার নিজাম

নজরুল জন্মদিবসে

ক্রমাগত পান্ডুর রাত্রী শেষে
শকুনচক্ষুর অন্তরালে
মেলে দিয়েছো ঈগলডানা
আর ডানায় স্বপ্ন মেখে ফেরি করেছো
কহিনুর রোদ।

তিল তিল অপেক্ষায়
ফেনাইত নির্যাতনের শিকল ছিঁড়ে
দরাজ কণ্ঠে হাক দিয়েছো
‘স্বরাজ লাগবে স্বরাজ
‘আমি স্বরাজ ফেরিওয়ালা’

স্বরাজ ফেরি করতে করতে
তুমি ঢুকে গেছো মানুষের মনে-মগজে
‘মিছিলে-মিটিং
কারাগারে
মসজিদ-মন্দিরে
এবং বুলবুলের গানের আসর
ও খঞ্জনার নাচের ঘরে
তারপর তোমার রক্তের সিরিঞ্জ বেয়ে
নেমে আসলো স্বাধীনতা।

আমরাও চিৎকার করে
স্বরাজ এসেছে, স্বরাজ
বলতে বলতে- বেমালুম ভুলে গেলাম
তুমি একদিন আমাদের স্বরাজ ফেরিওয়ালা ছিলে।

কলমের সাইকেল-দৌড় / আফসার নিজাম

আমার সাইকেলটির মতোই হারিয়ে গেছে জহুরী

লেখকের কলমটির প্রতি আমার প্রচন্ড লোভ ছিলো
যখন তার টেবিলের সামনে চেয়ার পেতে বসতাম
কি অনায়াসে না- কলমটি তিন আঙ্গুলের আলিঙ্গনে
চলতে থাকতো আমার সাইকেলটির মতো।

কলমটির চলা দেখতে দেখতে
কতোবার ভেবেছি- আমি ঐ কলমটি চুরি করবো
কিন্তু যতোবার চুরির খায়েশ নিয়ে রুমে ঢুকেছি
ততোবারই দেখেছি কলমের সাইকেল-দৌড়
আর ভেবেছি দৌড় সমাপ্ত হলেই
চুরি করে নেবো কলম আর কলমের ম্যাজিক-লেখনি।

মানুষ বিক্রির ফরমান / আফসার নিজাম

একটা মানুষ কিনবেন? মানুষ?
খুব কম দামে দিয়ে দেবো
আহ! জনাব, চিন্তা করবেন না
আপনি যেমনটি চেয়েছেন, ঠিক তেমনিÑ
তার দুটি চোখ আছে
আঁধারেও দিব্যি দেখতে পায় দিনের মতো।

দুটি হাত আছে
কাজ করতে পারে মেশিনের মতো
আর অবাক করা দুটি পা আছে
আপনার বাড়ি থেকে হাঁটা শুরু করে
গোটা পৃথিবীটাই ঘুরে আসতে পারে- যদি আপনি চান।

আর একটি পিঠ আছে
শপাং শপাং চাবুক কষে দেখতে পারেন
গ-ারের মতো চামড়া
ইচ্ছে করলে আপনি তা দিয়ে একজোড়া জুতা বানাতে পারেন
গ্যারান্টি দিতে পারি, জুতা জোড়া চলবে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত।

তার একটা পেট আছে
প্রয়োজনে বালিশ বানিয়ে শুতে পারেন
আপনার ক্লান্তি দূর করার জন্য কিন্তু
তার জন্য মোটেই অর্থ ব্যয় করতে হবে না
আপনার উচ্ছিষ্টটুকু দিলেই চলবে।

আর একটা মাথা আছে
মনে করে তার মাথা থেকে মগজটা খুলে রাখবেন
না হয় সে নিজেকে মানুষ ভাবতে পারে।

হারানো বিজ্ঞপ্তি / আফসার নিজাম

কবিতাটি এভাবে লিখা হয়

গুজরাটে যে ক’জন মানুষ পুড়েছে
তাদের মধ্যে আমি একজন
পুলিশ পুড়ে যাওয়া লাশ তুলে নেয়ার সময়
আমার ঈশ্বরকে ফেলে এসেছেন

যদি কোনো সু-হৃদয়বান ব্যক্তি আমার ঈশ্বরকে পেয়ে থাকেন
দয়া করে নিম্ন ঠিকানায় পৌঁছে দেয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি

আফসার নিজাম
প্রজত আল্লারক্ষা
খোদা স্ট্রিট-গুজরাট-ভারত
ইমেল afsarnizam@yahoo.com

কবিতাটি এভাবেও লেখা যেতো

গুজরাটে যে ক’জন মানুষ পুড়েছে
তাদের মধ্যে আমি একজন
পুলিশ পুড়ে যাওয়া লাশ তুলে নেয়ার সময়
আমার হৃদয়টিকে ফেলে এসেছেন

যদি কোনো সু-হৃদয়বান ব্যক্তি
আমার হৃদয়কে পেয়ে থাকেন
দয়া করে +৮৮০১৮১৯-৫১৫১৪১ নম্বরে ফোন করবেন।

শবেবরাত / আফসার নিজাম

গত শবেবরাতে তিনি আসবেন বলে
একশ বত্রিশ লাইন মোনাজাত
এবঙ এক বোতল চোখের পানি নিয়ে ছিলেন।

এবারও তিনি আসবেন
বরাতের বাজেট পাশ করিয়ে নেবো-
আপনাকে আর ফেরাবো না
সব পাওনা চুকিয়ে দেবো
বাড়িওয়ালির ভাড়া
দোকানের বকেয়া
বন্ধুদের দেয়া ধার-
সব চুকিয়ে দেবো, আপনাকে আর ফেরাবো না

কারণ তিনি কথা দিয়েছিলেন
আমার যাবতীয় সেজদার বিনিময়ে
আমার বাজেট পাস করে দেবেন।

শয়তানের জন্য প্রার্থনা / আফসার নিজাম

হায় শয়তান!
তোর মৃত্যুর জন্য মহান প্রভুর কাছে প্রার্থনা করি।

আজরাইল যদি তোর মৃত্যুর পাতা ছিঁড়ার
হুকুম না পেয়ে থাকে
তা হলে প্রভুর কাছে প্রার্থনা
তোর ওপর বর্ষিত হোক
প্রেম ভালোবাসা এবঙ
নান্দনিক বিশ্বাসের নির্যাস

হায় শয়তান!
তোর জন্য প্রার্থনায়
আমার আর কীবা বলার আছে?

তোমাকে ভেঙে দেবো আয়নার মতো / আফসার নিজাম

প্রিয় অসুন্দর, তোমাকে ভেঙে দেবো আয়নার মতো
যেভাবে ঢেউ ভেঙে দেয় এক মামুলি কচুরিপানা
দেখো তখন তোমার প্রতিটি কাঁচটুকরো
তোমারই প্রতিবিম্ব খন্ড খন্ড হয়ে দেখা দেবে
তোমার চোখের সীমানায়।
তুমি তখন চিৎকার করবে- ‘হায় সময়
আমার সহস্র পাপের খন্ডাংশ
আমাকে কেমন ক্ষত বিক্ষত করে
আমাকে রক্তাক্ত করে।’

তুমি আবারও চিৎকার করে বলবে,
‘আমি মুক্তি চাই আমার
যাবতীয় পাপের মায়াজাল থেকে।
আর বলবে, ‘হায় পাপের মায়াজাল তুমি আমাকে
ধ্বংস করেছো- যেভাবে ধ্বংস করে মানুষ মানুষকে।’