কেন্দ্র হবে নাকি পরিধি / সাইফ আলি

চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুটা কেমন এক জায়গায় আটকে গেছে। মাথার উপর ফ্যানের তিনটা পাখা বো বো করে ঘুরছে। একই সাথে কথাগুলোও কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। অস্বস্তি বোধ করছে রুমা। পাশ ফিরে শুয়ে সামনের দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে থাকলো । একটা টিকটিকি তরতর করে উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। কি আয়েশ করেই না খাড়া দেয়ালটায় হেটে বেড়াচ্ছে ওটা। পাশের জানালা দিয়ে যে সামান্য আলো দেয়ালে এসে পড়েছে তাতেই দেখা যাচ্ছে ওটাকে। কিন্তু এই সামান্য আলোয় ওর লক্ষ্যবস্তু সন্ধান করাটা সমিচিন নয় ভেবে চোখ সরিয়ে নিলো রুমা। গতকাল ক্যাম্পাসে গিয়েছিলো যখন তখন মাথা পরিষ্কার। পড়ালেখার চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তাই ছিলো না। কিন্তু শাফি এমন একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেবে হঠাৎ করেই এটা ওর কল্পনায় আসেনি। শাফি ওর ক্লাসমেট, যদিও বয়সে ওর থেকে একটু বড়ই হবে। কি একটা কারণে শিক্ষাজীবনের কয়েকটা বছর নষ্ট হয়েছে ছেলেটার। পরিষ্কারভাবে জানা না থাকলেও বন্ধুদের কাছে শুনেছে শাফি যখন কলেজে পড়ে তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে ছ’মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে ওকে। যা ই হোক ছেলেটা ভালো এবং বুদ্ধিদীপ্ত। খুব মিশুক না হলেও বন্ধু মহলে যথেষ্ট খোলামেলা।
রুমা সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রী। চতুর্থ বর্ষ। আর কয়েক মাস পরেই পরীক্ষা। এর মধ্যেই অনেক প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু পড়ালেখার কথা বলে এড়িয়ে গেছে এতোদিন। কিন্তু এবার তো ভাবতেই হচ্ছে। আর এই ভাবনার জগতে হঠাৎ করেই শাফির উত্থান। কি উত্তর দেবে ওকে। ছেলেটা সোজা সাপ্টা প্রশ্নটা করলেই পারতো, এতো ঘুরিয়ে বলার দরকার টা কি। বিরক্ত হয় রুমা। কিন্তু ছেলেটার এই বাঁকা প্রশ্নটাই যে সারারাত ওকে জাগিয়ে রেখেছে! এত সিরিয়াসলি ভাবনার খোরাক জোগান দেওয়াটাও কিন্তু সহজ ব্যপার না।
দেয়ালে জানালা গলে আসা আলোটা স্থান পরিবর্তন করেছে। এখন আলোটার বুকে মরা গাছটার ডালপালা একটা লম্বাটে চিত্রকর্মের রূপ দিয়েছে। একটু একটু নড়ছে ছবিটা। ভাবনার জগতে ছেদ পড়ে রুমার। টিকটিকিটা কোথা থেকে যেনো আওয়াজ দিচ্ছে। রাত কতো হলো? একটু পরেই কি আজান দেবে? তাহলে ঘুম? সকালে উঠে ক্লাস আছে। না, সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। ঘুমের কোনো রেশই নেই চোখে। অথচ পাশের বেডে বান্ধবী কেমন আরামে ঘুমাচ্ছে। কাক ডাকছে বাইরে, কিছুক্ষণের মধ্যেই সকাল হয়ে যাবে। চোখ বন্ধ করলো রুমা। যে করেই হোক একটু ঘুমাতে হবে। তা না হলে ক্লাসে যেয়ে ঘুমানোর বিকল্প থাকবে না।
‘কেন্দ্র হবে নাকি পরিধি?’ শাফি দাঁড়িয়ে আছে সামনে। রুমা জানে কি বলবে ও।
বান্ধবীর চেচামেচিতে ঘুম ভাঙলো রুমার। -কিরে? চেচাচ্ছিস ক্যান…? ঘুম জড়ানো কণ্ঠ রুমার। ‘কতো বাজে দেখেছিস, আজ আর তোর ক্লাসে যাওয়া লাগবে না, আমি গেলাম।’ ‘একটু দাঁড়া, আমিও যাবো…

Advertisements

জলবেশ্যা / আল মাহমুদ

পেঁয়াজ আর রসুনের মরশুমে লালপুর হাটের চারপাশের গ্রামগুলোতেও পেঁয়াজ রসুনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। হাটের দুমাইল দূর থেকেও বাতাসে কাঁচা পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধটা বেপারিদের নাকে এসে লাগে। গন্ধটা তখন আর শুধু পেঁয়াজের গন্ধ থাকে না। রসুনেরও একটা অহংকারী গন্ধ আছে, যা বাতাসে পেঁয়াজের গন্ধের সাথে মিশে বাতাসকে স্বাদযুক্ত করে তোলে।

এ ধরণের কাঁচা মশলার মরশুমে শুধু যে বাজার আর বাতাসেই গন্ধটা ছড়িয়ে পড়ে তা নয়। হাটের চারপাশের এলাকার মানুষের শরীরেও এ গন্ধটা থাকে। কথা বললে তাদের মুখ থেকেও পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ বেরোয়। তাদের ঘামে, বগলের নিচের চুলের গন্ধটা এমন তীব্র হয়ে ওঠে যে, কোনো লোক যে পেঁয়াজ-রসুনের ব্যবসা করে না, তার পক্ষে এ পরিবেশ তিষ্টানো দায়।

হাটের মধ্যে, মানুষের পায়ে চলা পথের পাশে পেঁয়াজের খোসার আস্তরণ জমে এমন উঁচু হয়ে থাকে যে কাঁচা মসলার মরশুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মঙ্গলবারের হাটের পশারিরা পেঁয়াজ-রসুন স্তুপকৃত খোসার ওপরই তাদের বেসাত বসায়। এর উপরেই কেনাবেচা চলে। যারা চার-পাঁচ মাইল দূর থেকে হাটে তাদের বেসাত নিয়ে আসে, তাদের অনেকেই বেচাকেনা শেষ করে রাতে ঘরে ফিরতে পারে না। একে তো তারা হাট করে এমনিতেই ক্লান্ত থাকে, তার ওপর রাতের বেলায় মেঘনা পাড়ের পূর্বাঞ্চলটা কোনো বেপারির জন্যই তেমন নিরাপদও নয়। চুরি ডাকাতি লেগেই আছে। দিনের বেলাতেই বেপারিরা চোর-বাটপারের ভয়ে দল বেঁধে হাটে মাল নিয়ে আসে। চার-পাঁচজন বেপারির এক একটি ছোট ছোট দল হাটবারের সকাল থেকে মাদান অবধি মাথায় পশরা নিয়ে হাটে আসতে থাকে। রাত দুটোর দিকে হাট যখন স্তিমিত হয়ে আসে, হাটের নিকটবর্তী গ্রামের লোকেরা কেনাকাটা শেষ করে গায়ে ফিরে যায়। বেপারিরা তখন তাদের বড় বড় কুপির আলোয় পয়সা গোণা শুরু করে। আর এই হিসেবের কাজটা তারা যথাসম্ভব তাড়াতাড়িই শেষ করে ফেলে। তখন তাদের চেহারায়, হাতের নড়াচড়ায় এমন একটা সতর্কতার পরিচয় ফোটে দেখলে মনে হবে, কোনো অদৃশ্য তস্কর এখনি তাদের পুঁজি কেড়ে নেবে। খুতির মুখটা ভালো করে বেঁধে কোমরে না পেঁচানো পর্যন্ত তাদের মন থেকে অস্বস্তিটা দূর হয় না। প্রত্যেক বেপারির বাঁ কাঁধে সাবানে কাচা একটা করে আধ ময়লা শার্ট থাকে। সাধারণত মাল নিয়ে হাটে আসার সময় কিংবা বেচা-বিক্রির ঝামেলায় তারা জামাটা পরে না। পরে তখনই, মাল কাবারের পর খুতিটা কোমরে বাঁধা হয়ে গেলে হাটের হোটেলে ভাত খাওয়ার খুচরা দু-তিনটে ভাঙা টাকা রাখার যখন আর জায়গা থাকে না। তখন তারা তাদের কাঁধের ঘামে ভেজা কুচকানো শার্ট কিংবা পিরহানগুলো গায়ে দিয়ে পকেটে ভাতের টাকাটা রাখে। তারপর বিড়ি ধরাতে ধরাতে আজিজ মিয়ার ভাতের দোকানের দিকে হাঁটতে থাকে। রাত বারোটার পরই আজিজ মিয়ার চুলা থেকে মেঘনার তাজা বোয়াল কিংবা গজার মাছের ঝাল সরুয়ার প্রকাণ্ড ডেগটা নামে। কাঁচা মশলার বেপারিদের মন মতো খাবার পরিবেশনের ব্যাপারে আজিজ মিয়ার বেশ নাম ডাক আছে। আগুনের মতো ঝাল ঝোল দিয়ে বেপারিরা যখন লাল করে ভাত মাখিয়ে নিয়ে নলা তুলতে থাকে আজিজ মিয়া তখন আদরের সাথে তার বসার গদিটা ছেড়ে নেমে এসে খদ্দেরদের খাবার টেবিলের কাছে দাঁড়ায়। জগ থেকে কারো গ্লাসে পানি ঢেলে দিতে দিতে ছোকড়া চাকরটাকে বলে, ‘কান্দু বেপারিরে আরও দুইডা কাঁচামরিচ দে।’ কিংবা পাশের ভোজনরত বেপারির দিকে ঘাড় ফিড়িয়ে বলে খালেক ভাইয়ের পাতে একটু সওরা দে রইস্যা।’ দোকানের ছোকড়াটা মহাজনের কথা শেষ হবার আগেই গজার মাছের ‘ভাঙাচুরার’ কড়াই থেকে একহাতা তপ্ত ঝোল খালেক বেপারির পাতে ঢেলে দেয়। খালেক বেপারি ‘বছ্ বছ্’ করতে করতে টিপা নুনের মুচি থেকে নুন নিয়ে ভাতের ওপর ছিটাতে ছিটাতে পরিতৃপ্তির হাসিতে ঘর্মাক্ত মুখটা ভরিয়ে তোলে। খাওয়া হয়ে গেলে বেপারিরা পেঁয়াজ-রসুনের খোসার আস্তর পড়ে থাকা হাটের আনাচে-কানাচে তাদের ছালা গামছা বিছিয়ে রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে দেবার জন্য গোল হয়ে বসে আড্ডা জুড়ে দেয়। কেউ তাস খেলে। কেউ আবার দলের কাছে খতিটা নিরাপদে রেখে পেঁয়াজের বাকলের বিছানায় নাক ডাকিয়ে ঘুমোয়।

এ হলো যারা হাঁটা পথে দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে হাটে কাঁচা মসলা নিয়ে আসে তাদের অবস্থা। কিন্তু যারা নদীপথে নৌকা নিয়ে মাল কিনতে আসে তাদের কাজ কারবার আবার আলাদা। প্রতি হাটবারে তাদের অসংখ্য পাল তোলা নৌকা ভাটিয়ালি গাইতে গাইতে তর তর করে বাজারের বিস্তৃত ঘাট অঞ্চলকে ঘিরে ফেলে। নৌকার মাঝিরা ঘাটে ভিড়বার আগেই পালের দড়ি খসিয়ে নৌকার গতিবেগ স্তিমিত করে দিলে গলুইয়ের মাথাগুলো এমন সতর্কতার সাথে সারির ফাঁকফোকে ঢুকে যায়, দেখলে মেঘনার মাঝিদের হাল ধরার প্রশংসার না করে পারা যায় না। ঠোকাঠুকির কোনো ব্যাপার নেই। মাঝিরা একজন আরেকজনের নাওকে জায়গা করে দিচ্ছে যেন মাঝিদের মধ্যে এমন একটা অলিখিত নিয়ম আছে যাতে প্রতিটি নৌকা ঘাটের ঘেরের মধ্যে এমন নিজের উদ্যত মাস্তুল নিয়ে অনায়েসে ঢুকে পড়তে পারে। বাজারের ঘাটটাকে ঘিরে নৌকার সার যখন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, দূর থেকে দেখতে বেশ লাগে। মনে হয়, প্রাচীন যুগের কোনো পোতাশ্রয়। প্রতিটি মাস্তুল আকাশের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে আছে। বাতাসে দড়িদড়া নড়ছে। মেঘনার ঢেউয়ের বাড়িতে প্রতিটি নৌকা একটু একটু কাঁপছে। আর আহত জলের শব্দ চারিদিকে একটা একটানা মাতমের রোল তুলছে।

এসব নৌকা আশেপাশের বড় বড় বাজার ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট থেকে আসে। পেঁয়াজ, রসুন, মুগ-মশুর আর মিষ্টিজলের শুঁটকির জন্যে এ হাট প্রসিদ্ধ। ভৈরব, আশুগঞ্জ, আজমিরিগঞ্জ, নবীনগরের পরই লালপুর হাটের কথা লোকে বলে। যদিও হাটবারের লোক-সমাগমের দিক দিয়ে ভৈরব-আশুগঞ্জের কাছে এ হাট কিছুই না। তবু প্রতি হাটবারে চার-পাঁচশ বড় বড় নাও, এ হাটেই মাল কিনতে ভিড় জমায়। দেশের পয়সাঅলা মুদি, মরিচ-মশলার দালাল, শুটকির কারবারি, তাঁতে বোনা মোটা নীলাম্বরী শাড়ি আর লুঙ্গি ব্যবসায়ীদের বেহেশ্ত হলো লালপুর হাট। এ হাটের পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ, সিদল সুটকির খুশবাই নাকে লাগলেই হাটবারের উটকো দালালদের জিভে পানি ওঠে। তারা নাও বাইতে বাইতে বৈঠা কাঁপিয়ে বাতায় ঠুকে রসালো গান ধরে। আর আসে বেদেরা। তাদের ঝাঁকবাঁধা নৌকাগুলো মেঘনার বুকে ভাসমান ছোট গ্রামের মত দেখায়। তারা সহজে ঘাটে ভিড়ে না। যে পাড়ে হাট, তার ঠিক উল্টো দিকে, অপর পাড়ে তীরের মাটি থেকে তিরিশ-চল্লিশ গজ নদীর ভেতরে তারা তাদের বহর আটকায়। নদীর পাড়েও নয়, আবার নদীর মধ্যেও নয় এমন একটা জায়গায় তারা অবস্থান নেয়। তারপর ছোট কোষা নৌকায় এরা হাটের ঘাটে এসে লাগে। বেদে যুবারা হাটে কাচের বাংড়ি, আয়না, গন্ধের সাবান, সাপের তাবিজ, দাঁতের মাজন আর ছুরি-চাকু বিক্রি করে। মেয়েরা যায় গ্রামে। তাদের হলো সাপ নাচানো, সিঙ্গা লাগানো আর দাঁতের পোক খোলার ব্যবসা। হাটের দিন সকালে তারা আসে আর পরের দিন সূর্য ওঠার আগেই বহর ভাসিয়ে অন্য হাটের দিকে চলে যায়। আগের দিন সন্ধ্যায় যেখানে একটা গ্রামের মত দেখা যেত, দেখা যেত নদীর কোল ঘেঁষে জ্বলে উঠেছে অসংখ্য আলোর ফুটকি, রান্নার আগুন আর ধোঁয়া, কিংবা শোনা যেত শিশুর কান্না আর বেহুলার রূপ বর্ণনা করে পুরুষের গলা ছেড়ে দেওয়া গান, পরের দিন সেখানে উন্মুক্ত জলের বিস্তারে ঢেউয়ের মাতামাতি ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

লালপুর হাটের তরুণ দালালদের নেতা হলো আবিদ বেপারি। সব হাটেই যেমন নিজের পুঁজি ছাড়া ব্যবসা জমানোর একদল লোক থাকে। লালপুর হাটেও পাটের মরশুম থেকে শুরু করে পেঁয়াজের মরশুম পর্যন্ত আবিদ বেপারির ইয়ারেরা হাঁকডাক করে বেরায়। বাইরের বেপারিদের মাল খরিদ করতে হলে দালালের সাহায্য না হলে চলে না। দরদস্তুর ও মাল ধরার কাজটা দালালেরা আগেই করে রাখে। এজন্য অবশ্য মহাজনরা আগেই দালালদের পয়সা দেয়। দালালেরা যাতে বাজারে আসা মাত্রই চাষীদের ঝুড়ি আর ছালা ভর্তি পেঁয়াজ-রসুনটা হাতাতে পারে সেজন্য অগ্রিম শ’খানেক টাকা প্রত্যেক মহাজনই দালালদের দিয়ে রাখে। মাল কেনা হয়ে গেলে মহাজনরা কুলি দিয়ে নৌকায় মাল উঠিয়ে নেয়। প্রথম এরা খুতি খুলে কুলি বিদেয় করে। পরে সন্ধেটা পার হয়ে গেলে, যখন নদীর ঘাটটা একটু অন্ধকার হয়ে আসে তখন একে একে দালালরা মহাজনের নৌকায় উঠতে থাকে। পান বিড়ি খেতে খেতে দালালির পয়সার হিসেব চলে। দালালরা তাদের পয়সাটা কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিয়ে তারপর নাও থেকে নামে। যে-দিন মহাজনের মনমত দামে দালালরা মাল ধরতে পারে সেদিন তাদের খুব আদর হয়। মহাজনরা নৌকায় বসিয়ে দারালদের খাওয়ায়। সাধারণত মহাজনরা খাবারটা নিজেদের মাঝিদের দিয়ে নৌকার মধ্যে ‘নাইয়া’ চুলায় রাঁধে। হাটের দিন তারা মুরগি খায়। খাওয়ার ব্যাপারে এসব মহাজনদের বেশ একটু দিলদড়িয়া ভাব আছে। যেসব মুদি-মহাজনের বয়স কম, তারা আবার হাটে আবার সময় পাটাতনের নিচে ‘বঙ্গেশ্বরী’র বোতল নিয়ে আসে। কিম্বা গাঁজার পুরিয়া। দিশি মদকেই মাঝি-মহাজনেরা ‘বঙ্গেম্বরী’ বলে সম্মান জানায়। রাত আটটার পর মহাজনদের নৌকার কাছে গেলে পেঁয়াজ-রসুন আর শুঁটকির গন্ধ ছাড়াও মাংসের সাধু গন্ধের সাথে মদ আর গাঁজার কড়া গন্ধ মিশ্রিত হয়ে একটা অদ্ভুত রাসায়নিক সৌরভ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। বাইরে থেকে আসা বড় নৌকার মহাজনরা আজিজ মিয়ার ভাতের দোকানে যায় না। যারা যায়, তারা হাড়কিপটে।

আজকের হাটে বেচাবিক্রি বেশি না হলেও আবিদ বেপারি তার দালালির পয়সা নিয়ে সকলের শেষে বেশ একটু রাত করে মহাজনের নাও থেকে নামল। প্রায় এক শ’ মণ পেঁয়াজ আজ দুজন মহাজনকে আবিদ বেপারি ধরিয়ে দিয়েছে। আড়াই শো টাকা আজ আবিদ বেপারির খুতিতে বাঁধা। এ হলো তার এক হাটের রোজগার। এখন এক সপ্তা স্রেফ আজিজের হোটেলে ঝাল ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়া আর হাটের গলিতে পেঁয়াজ-রসুনের বাকলের ওপর সঙ্গী-সাথীদের সাথে তাস পেটানো ছাড়া আবিদ বেপারির কোনো কাজকাম রইল না।

ঘাটপাড়ের ফ্যাচ্ফ্যাচে কাদামাটি এড়িয়ে আবিদ বেপারি বাজারের এক প্রান্তে শুঁটকি হাটার উঁচু জায়গায় এসে দাঁড়াল। তারপর ঘার ফিড়িয়ে তাকালো নদীর দিকে। হাটের এ দিকটায় নদীর প্রস্থ প্রায় মাইল চারেক হবে। নদী মোটামুটি শান্ত। ছোট ছোট ঢেউ থাকলেও মেঘনাকে এ সময়টায় প্রশান্তই বলা যায়। ওপাড়ে গ্রামগুলোকে একটা ক্ষীণ কালো রেখার মত দেখা যাচ্ছে। রেখার মধ্যে দুএকটা আলোর ফোঁটা দুধের ফোঁটার মত স্পষ্ট হয়ে আছে। বেদেদের ঝাঁকবাঁধা নাওগুলোর আলো নদীর ছোট ছোট ঢেউয়ে প্রতিবিম্ব তুলে একটা অখণ্ড আলোর মালার মত বাসমান মনে হচ্ছে। কিংবা মনে হচ্ছে, নদীর ভেতরে নুয়েপড়া কয়েকটা হিজল গাছকে যেন এক ঝাঁক অতিকায় জোনাকি ঘিরে ধরেছে। আবিদ বেপারি বেদের বহরটার দিকে চোখ রেখে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বহরটার প্রতিটি নৌকার ছৈয়ের ভিতরে, বেড়ার ফাঁক দিয়ে অথবা ছৈয়ের বাইরে আলো দেখা যাচ্ছে। বেদে-বেদেনীরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে তাদের রান্নাবান্নার কাজ সেরে খেতে বসেছে। কারণ একটু আগেও নৌকাগুলোকে ঘিরে যে ধোঁয়ার আস্তরণটা ছিল এখন আর তা নেই। রাতও অনেক হয়েছে। সময় সাড়ে দশটার কম হবে না।

আবিদ বেপারি একটা সিগ্রেট ধরালো। চোখ তার এখনও বেদে বহরটার দিকে স্থির হয়ে আছে। সিগ্রেটটা টান দেয়া মাত্রই একটা ঢেকুর উঠলো বেপারির গলা দিয়ে। দিশি মদ, ঝাল মুরগির মাংস আর পানের রসের মিশ্রিত ঝাঁঝালো মোদো গন্ধ। টক, বিস্বাদ ছড়িয়ে পরলো ময়লা জিবের ওপর। অন্ধকারে মুখটা বিকৃত করে বেপারি চোখ নামিয়ে আনলো তার আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগ্রেটটার ওপর। কড়া মিনার সিগ্রেটের ধোঁয়া পেটে গিয়েই এই অশুভ, দুর্গন্ধযুক্ত চুকা ঢেকুরটা ডেকে এনেছে। একবার ভাবলো সিগ্রেটটা ছুঁড়ে ফেলবে। আবার কি মনে করে সিগ্রেটটা ঠোঁটের ওপর এনে জোরে জোরে কয়েকটা টান দিল। অনেকটা সুখ টানের মত করে। তারপর এক বুক ধোঁয়া উগড়ে দিয়ে আবার নদীর দিকে চোখ ফেরাল। হাঁ, বহরটা থেকে বেশ দূরে, একটু দক্ষিণে নৌকা বাধা। ঢেউয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থেকে দুলছে। নৌকার ভেতরে কোনো বাতি দেখা যাচ্ছে না। আবিদ বেপারির মুখটা পলকে প্রসন্ন হয়ে উঠলো। নৌকাটিকে দেখা যাচ্ছে ভাসমান একটা কালো চোখের মত। আবিদ বেপারি জানে বহরের অন্যান্য নাওয়ের বাতি যখন নিভে যাবে তখন অন্ধকারে কালো চোখের মত এই নৌকার বাতি জ্বলে উঠবে। প্রথমে ছৈ-এর ভেতরে এক বিন্দু আলো। তারপর আলোটা গলুইয়ের কাছে এগিয়ে একটু স্থির হয়ে থাকবে। তারপর মানুষের মাথা সমান উঁচুতে উঠে বাতিটা তার প্রতিকীবার্তা ব্যক্ত করে ডানে-বাঁয়ে দুলতে থাকবে। তখন মনে হবে অমাবশ্যায় আচ্ছন্ন পৃথিবীর এক অংশে ভাগ্যক্রমে একটা আদিম অগ্নিকণা জলে-স্থলে পুরুষদের ডাকছে।

আবিদ বেপারি হাটের দিকে আর গেল না। বরং হাটের ডান হাতের রাস্তায় নদীর পাড় ধরে হাঁটতে লাগলো। পথটা অন্ধকার। তবে জলের সম্ভবত নিজস্ব একটা ক্ষীণ দ্যুতি আছে যাতে নদীর শরীরটা অন্তত বুঝে ওঠা যায়। আর এই উপলব্ধি থাকলে পানির পাশে কোথায় অন্ধকার মাটির ওপর দিয়ে পায়ে চলার পথটি আছে তাও রাতের পথিকরা ঠাহর করে ফেলে। বেপারি যেহেতু আশৈশব এ পথে চলাফেরা করেই বেড়ে উঠেছে, সেজন্য পথ চলতে গিয়ে তাকে মাটির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে না। আসলে তার চোখটা এখনও সেই নদীর ওপর ভাসমান অতিকায় কালো চোখের স্থির দারুদৃষ্টির দিকেই নিবদ্ধ। বেপারি নদীর পাড় ধরে প্রায় মাইল খানেক পথ পার হয়ে একটি গ্রামের ঘাটের কাছে এসে দাঁড়ালো। জেলেদের গ্রাম। জেলে বৌ’রা দিনমান এই ঘাটে জটলা বেঁধে জলের কাজ করে। এখন এই ঘাটটাকে বড়ো নিঃস্তব্ধ আর শীতল মনে হলো। ঢেউ এসে কাপড় কাচার কালো পাথরটার ওপর ছল ছল করছে। কেমন এক ধরণের শীতলতা আবিদ বেপারির শরীর স্পর্শ করলো। বেপারি ঘাটের পৈঠায় দাঁড়িয়ে বেদে বহরের পাশে নিঃসঙ্গ নৌকাটির দিকে তাকালো। কাত হয়ে পড়া একটি বিশাল মাখনার মত আয়তলোচন এখনও বেপারিকে দেখছে। চোখে চোখে তাকাতে না পারা বয়োসন্ধির কিশোরের মত আবিদ বেপারি তার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলো। ঘাটের কাছেই জেলেদের জাল রং করার শূন্য গামলাগুলো পড়ে আছে। এখন গাব ফল পোক্ত হওয়ার ঋতু। তাই ঘাটের পেছনে বহুদূর পর্যন্ত গাবের কষ সিদ্ধ করার বড়ো জালা আর গামলার ছড়াছড়ি। কাঁচা গাবের কষটে গন্ধ জেলেপাড়া থেকে নদীর ঘাট পর্যন্ত বাতাসকে কেমন বিভীষিকাময় করে রেখেছে। অন্য সময় এ পাড়ার পাশ দিয়ে গেলে মাছের আশটে গন্ধ নাকে এসে লাগতো। কিন্তু এখন গাবের কাঁচা রসের গন্ধে নাকে রুমাল দিয়ে ভদ্রলোকেরা ঘাট আর পাড়াটা পার হয়ে যায়।

আবিদ বেপারি দেখলো ঘাটের একটু দূরে যেখানে বড়ো কাঁঠালি বট গাছটা আছে সেখানে একটা লম্বা জেলে নাও খাড়া লগির সাধে বাঁধা। নাওটা খাড়া লগির সাথেই বাঁধা কি না তা যদিও আবছা অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না, তবুও এতদাঞ্চলের লোক বলে বেপারি তার সহজাত অন্তদৃষ্টিতে বুঝলো নৌকাটা নিশ্চয়ই চইরের সাথেই বাঁধা থাকবে। নাওটা দেখেই আবিদ বেপারি খুশি হয়ে গেল। আসলে বাজারের ঘাট থেকে অন্ধকারে জেলে পাড়া পর্যন্ত আসা যে শুধু একটা জেলে নৌকার জন্য তা যেন বেপারির অবচেতনা তার নিঃশব্দ সচেতনতার কাছে ব্যক্ত করলো। যেন বেপারি বুঝতে পেরেছে, নিরর্থক নয়, একটা নৌকার জন্যই তার এই মাইলতক পথ পেরিয়ে আসা। খুশি হয়ে গেল বেপারি। ঘাট পার হয়ে কাঁঠালি বটের প্রসারিত জটিল শিকড়ের ওপর গিয়ে আস্তে আস্তে বসলো। তার এখন অনেকটা সময় অতিবাহিত করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না বেদেদের ভাসমান গ্রামটা তাদের সবগুলো বাতি নিভিয়ে জল হয়ে যায়।

নদীর বাতাসে কাঁঠালি বটের পাতাগুলো মাথার ওপর সড় সড় শব্দ তুলছে। স্তব্ধতাকে বিশদ করার জন্যই যেন শব্দটা একটানা আবিদ বেপারির কানের ভেতর দিয়ে মরমে পৌঁছে যাচ্ছে। গাছের সবচেয়ে বড়ো শাখাটায় সম্ভবত শকুনের বাসা আছে। কারণ একটা পাখির কান্নার মত শব্দ অকস্মাৎ আবিদ বেপারির কানে বেজেই থেমে গেল। বেপারি একবার মুখ তুলে গাছের বড়ো ডলটার দিকে তাকালো। পরিচ্ছন্ন আকাশের দিকে গাছের পত্র-পল্লবকে একটা মস্ত বড়ো কালো ছাতি ছাড়া আবিদের আর কিছুই মনে হলো না। আর ছাতিটাকে যেন কোনো অদৃশ্য হাত বেপারির মাথাতেই ধরে থাকবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রকৃতির এই অনুকম্পায় আবিদ বেপারি কিছুটা অভিভূতের মত পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট খুলে একটা সিগ্রেট ধরালো।

এবার সিগ্রেটটা আর তত খারাপ লাগছে না। বিস্বাদ অবস্থাটা কেটে গিয়ে তামাকের স্বাদটা পাওয়া যাচ্ছে। বেপারি আস্তে, মৃদু টানে টানে সিগ্রেটটা শেষ করতে লাগলো। এই বটগাছটার আঁকাবাঁকা শিকড়ের সাথে বেপারির কৈশোরের কয়েক বছরের আনন্দময় স্মৃতিও জড়িয়ে ছিল। বারো তেরো বছরের এক বালক তার এক বখাটে সঙ্গীর সাথে স্কুলের নাম করে এখানে সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়ে মাকে বলতো, ‘পড়া কইরা আইছি।’ আর আর আনন্দে বিগলিত এক চাষী বৌ তার ছেলেকে যতœ করে ভাত খাইয়ে দুধের বাড়তি সরের পেয়ালাটা ছেলের মুখের কাছে তুলে ধরতো। হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ায় আবিদের মনটা ভিজে গেলো। যে বড়ো শিকড়টার নিচে বইপত্র লুকিয়ে রেখে আবিদ তার সঙ্গির পেছন পেছন জেলেপাড়ায় গিয়ে মার্বেল খেলতো, গাছের সেই বড়ো শিকড়টার ওপরই এখন সে বসে আছে। আর গাছের মাত্র ত্রিশগজ দূরেই তার মায়ের কবর। কৈশোরের সুখের দিনগুলো শেষ হবার আগেই মা তার উলাওঠায় মরে যায়। মার কথা মনে পড়ায় বেপারি শিকড়ের আসন ছেড়ে নেমে এলো। তারপর চললো কবরস্থানটার দিকে।

কবরস্থানের উঁচু জায়গাটায় উঠে দাঁড়াতেই, একটা ঠাণ্ডা ভয়ের বাতাস এসে আবিদের শরীর ও মনকে কাঁপিয়ে দিল। মদের নেশা নেশা ভাবটা কেমন যেন কেটে যাচ্ছে। আর নেশার শূন্যস্থান পূরণ করার জন্যই যেন কবরের গর্তগুলোতে বহতা বাতাস বাড়ি খেয়ে আবিদের শরীরের ওপর আছড়ে পড়তে লাগলো। ভয়ে শিঁউড়ে উঠলো আবিদ বেপারি, আগের সেই বারো তেরো বছরের বালকের মত। একবার তার মায়ের কবরটা জিয়ারত করার কথা মনে উঠলো। কিন্তু কবর ও নৈঃশব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার যে আতঙ্ক আছে তা সম্ভবত কোনো বয়স মানে না। পঁয়ত্রিশ বছরের যুবক আবিদ বেপারি স্কুল পালানো বারো বছরের বালকের মত হঠাৎ এক দৌড়ে কবরস্থানটা ছেড়ে আবার বট গাছের কাছে ফিরে এলো। যদিও নদীর পাড়ের এই নিঃসঙ্গ গাছটার নিচে ভয় থেকে পালানোর কোনো কারণ অথবা সত্যিকারের নিরাপত্তা নেই তবুও আবিদের মনে হলো, এখানে কোনো ভয় নেই। এক আবিদ বেপারি ছাড়া জায়গাটা আগের মতই জনমানব শূন্য। শুধু শকুনের বাচ্চাটা বোধ হয় আরও একবার মানুষের শিশুর কান্নার মত শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
আবিদ বেপারি বুঝতে পারল না কেন সে তার মায়ের কবর থেকে এভাবে দৌড়ে পালিয়ে এসেছে। সাধারণত বেপারি ভীতু লোক নয়। ভূত বা জিনটিনের ভয় সে করে না। এছাড়া এখন সে আর বারো বছরের স্কুল পালানো নিতান্ত বালকও নয়। তবু কেন এমন হলো? বেপারি নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলো। পরে অবশ্যই সে আপন মনেই এ প্রশ্নের একটা জবাব খুঁজে বের করতে চাইল। তার মনে হলো, কবরটা হলো মরা মানুষের জায়গা। এরা আর পৃথিবীর কেউ না। আজ যেমন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সারারাত অপেক্ষা করলে এদের কথা শোনা বা দেখা যাবে না, তেমনি কাল প্রভাতেও কবর কবরই থাকবে। জ্যান্ত মানুষের কোনো কাজে এদের আর কিছু করার নেই। জীবন ত্যাগ করে যা পাওয়া যায় এই কবরের মৃতরা নিশ্চয়ই তা পেয়েছে। যারা প্রাণবন্ত তারা তা জানে না। জীবনধারণ করে তা কোনোদিন কেউ জানতে পারেনি। কবরের লোকেরা, এমন কি তার মা-ও জীবনের জানা শেষ করে জীবনের অতিরিক্ত যে মৃত্যু তার মধ্যে আত্মগোপন করে থাকায়, আবিদ বেপারি তাদের ভয় পেয়েছে। আর এখন যে গাছটার নিচে সে নিজেকে নিরাপদ বোধ করছে, হোক তা রাতের মধ্যভাগে জনমানব অথবা কলরব শূন্য কিন্তু তা জীবনের মধ্যেই রয়েছে। এই নিরবিচ্ছিন্ন অন্ধকারের মধ্যে যেমন তাদের অস্তিত্ব আছে আগামীকাল সকালেও তারা থাকবে। জীবন ও জগৎ ত্যাগ করে মৃত্যুর রহস্য তারা আবিদ বেপারির মত অনবহিত বলেই এদের মধ্যেই আবিদ বেপারির নিরাপত্তা। এ ধরণের একটা রন্ধ্রহীন দার্শনিক চিন্তায় আবিদ বেপারির মত আধ-মাতাল হাটবারের দালালও আনন্দে আটখানা হয়ে গেলো। মনে হলো তার ভীতিটা অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। সে আবার মুখ ফিরিয়ে কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে, জোরে চিৎকার করে বললো, ‘মায়ো, বাজান আবার এক বেডিরে বিয়া কইরা আমারে খেদাইয়া দিছে। জমি জিরাত কিছু দেয় নাই। আমি বাজারে ব্যবসা করি, দালালি করি। ভালাই আছি। তুই হুনছ মায়ো, আমার কতা? হুনছ?’

অন্ধকার কোনো জবাব দিল না। কোনো প্রকার জবাবের আশায় নয় বরং কিভাবে তার কাঁপা কাঁপা সম্বোধনগুলো অন্ধকারের আবরণের মধ্যে মিশে যাচ্ছে তা উপলব্ধি করার জনই আবিদ বেপারি কতক্ষণ তাকিয়ে রইলো।
বেদে বহরের বাতিগুলো কখন নিভে গিয়ে পুরো বহরটা একটা কালো দাগের মত হয়ে গেছে তা আবিদ বেপারির খেয়াল ছিল না। যখন নদীর ওপর চোখ পড়লো, দেখলো সব কিছু কেমন ঠাণ্ডা জল হয়ে আছে। আর সেই নৌকাটা যা এতক্ষণ আবিদ বেপারিকে চোখে চোখে রাখছিলো, তা-ও কেমন যেন ঢেউয়ের ওপর ঠাণ্ডা চুপ মেরে ভাসছে। তবে কি কোনো অসতর্ক মুহূর্তে কালো কাঠের চন্দ্রবিন্দুর মধ্যে কোনো আলোর কণা জ্বলে উঠে অন্ধকার দিকবিদিকে তার প্রতীকী আহবান জানিয়ে এখন চুপ মেরে গেছে? মহা ভাবনায় পড়লো আবিদ বেপারি। তার মনে হলো নৌকার বাতি তাকে আকুল হয়ে ডেকেছিলো। কোনো সারাশব্দ না পেয়ে এখন নিভে গেছে। কিংবা হাটের কোনো তরুণ দালাল বাতিটার ডাক শুনে নিশ্চয়ই আবিদ বেপারির আগেই সেখানে পৌঁছে গেছে।
দারুণ অস্বস্তির মধ্যে আবিদ বেপারি আরও কতক্ষণ বসে রইল। আর কালো চোখের মত নৌকাটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো, ‘আমি যামুই। কেউ গিয়া থাকলেও যামু। মাইরা ভাগাইয়া দিয়া ভিতরে হামামু।’ এবার তার চোখ গেলো ঘাটের অদূরে বাঁধা জেলে নৌকাটার দিকে। এ নৌকাটাকেও বেপারির কাছে একটা তীর্যক দৃষ্টি কালো চোখের মতই মনে হলো। যেন নদীর বিশাল দু’টি আয়তলোচন কেউ জলের ললাটের দু’পাশে জোর করে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে নদীর ওপার থেকে একটা চোখ যেমন এক দৃষ্টিতে আবিদ বেপারিকে দেখছে, তেমনি এপাড়েও অপর চোখটা টেরচা চাওনিতে তাকে অবলোকন করছে বলেই বেপারির মনে হলো।
বেপারি গাছের শিকড়টা ছেড়ে নিচে নেমে এলো। একবার তাকালো বেদে বহরটার দিকে। বেদেরা ঘুমিয়ে পড়েছে। হাঁটতে হাঁটতে নৌকাটার কাছে এসে লগির বাঁধন খুলতে খুলতে একবার আকাশের দিকে, আবার নদীর দিকে দেখলো। আকাশের প্রভাবে পানির ওপর অস্পষ্ট দ্যূতি প্রতিফলিত হচ্ছে। নিশ্চয়ই একটু পরই চাঁদ উঠবে। যদিও অস্পষ্ট আকাশের ঈশানে এক টুকরো মেঘ জমে আছে, তবুও আবিদ বেপারি নির্ভয়ে নাও ভাসালো। অবশ্য এরই মধ্যে নদীর ওপরে বাতাসের বেগটা একটু বৃদ্ধি পাওয়ায় ঢেউয়ের দাপানি বেড়ে গিয়ে নৌকাটাকে বেশ দোলাচ্ছে। বেপারি নৌকা ভাসিয়েই টলমল করতে লাগল। বেপারি পাকা মাঝির মত ঠোঁট কামড়ে প্রাণপণ শক্তিতে আবার এটাকে বাঁয়ে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে বেশ একটু হাঁপিয়ে পড়েছে। শুধু লগি ঠেলে এত বড়ো নদী পাড়ি দিয়ে উদ্দিষ্ট স্থানে পৌঁছা সোজা ব্যাপার নয়। তবু বেপারি শুধু গায়ের জোরে নৌকাটাকে যথাসম্ভব সোজা রেখে যেতে লাগলো। একবার লগি ঠেলে দিয়ে কোমড় সোজা করে সামনের দিকে তাকাতেই দেখলো বহুদূরে ভাসমান কালো চোখের ওপর একটি আলোর বিন্দু বিরামহীনভাবে ডানে বাঁয়ে দুলছে। সতেজ ঢেউয়ের ওপর দোদুল্যমান আবিদ বেপারির শরীরের প্রতিটি সন্ধি যেন এক আনন্দময় শিহরণে অকস্মাৎ কেঁপে উঠলো।
অই ডাকতাছে, মনে মনে বললো আবিদ বেপারি।
ততক্ষণ আবিদ বেপারির নৌকাটা মাঝ নদীতে পৌঁছাবার বেশি দেরি নেই। আবিদ বেপারির কেবলই মনে হতে লাগলো নদীর একটা অন্ধকার চোখ যেন আকস্মিক জলের ঝাপটায় দৃষ্টি ফিরে পেয়ে হারিয়ে যাওয়া অপর একটি চোখকে ডাকছে। আর এই মায়াবী আহবানে, মন্ত্রবলে বেপারিও ললাটভ্রষ্ট এক আয়তলোচনকে নদীর দুঃখিত মুখমণ্ডলের কাছে একটু একটু ঠেলে দিয়ে যাচ্ছে।
আকাশের দিকে তাকালো বেপারি। আকাশব্যাপী তারার ঝালরের মধ্যে সাপের ডিমের মত শাদা চাঁদ দেখা দিয়েছে। পানখ সাপের ডিমের মতই চাঁদের মধ্যভাগটা একটু ঘোলাটে আর এবড়ো থেবড়ো। এখন আর ঈশান কোণে পুঞ্জীভূত মেঘের পাহাড়টা নেই। যদিও নদীর ওপর দিয়ে বাতাসের বেগটা এখনও স্তিমিত হয়নি। বেপারি আবার অন্ধকার চোখের শাদা মণির মত কম্পমান আলোর ফোঁটার দিকে তাকালো। আলোটা এখনও নড়ছে। আর যে হাত আলোর ইশারা নিয়ে এতক্ষণ নড়াচড়া করছিল, এখন অস্পষ্ট হলেও আবিদ বেপারির দৃষ্টিগোচর হলো। কালো একটা গাছ যেন একটি মাত্র সোনালী ফুল ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবিদ বেপারি তাড়াতাড়ি ব্যবধানটা অতিক্রম করতে চাইলো। কিন্তু জোরে লগি ফেলেই বুঝলো এখানে থৈ নেই। নৌকা এখন মাঝ নদীতে। এখানে আর নদীর তল পাওয়া যাচ্ছে না। এ জায়গায় নদী খুব গভীর তা বেপারির অজানা ছিল না। এতক্ষণ লগিটার প্রায় মাথায় আঙুলের টিপ রেখে বেপারি নৌকা বেয়ে এসেছে। এই অথৈ অবস্থায় কি করবে হঠৎ বেপারি যেন তা সমঝে উঠতে পারছে না।
এদিকে আহ্বানকারী চোখের মণিটা হঠাৎ স্থির হয়ে আছে। কাঁপুনি থামিয়ে আলোময় চোখটা যেন মায়াভরা চাহনিতে তার সহোদর চোখটাকে দেখছে। আর নদীর অথৈ ললাটের ওপর দিশেহারা একটা চোখ তার উদ্দিষ্ট যুগলের কাছে পৌঁছাতে না পেরে ঢেউয়ের দুলুনিতে ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে খেতে ভাসতে লাগল।
বেপারি হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর লগিটাকে মাঝামাঝি ধরে নৌকার দু’পাশে জলের ওপর অনেকটা বাড়ি দেওয়ার মত করে জল টানতে লাগলো। হ্যাঁ, এবার ঢেউয়ের ওপর দিয়ে কমজোর চলায় নাওটা এগোচ্ছে। আস্তে আস্তে বেপারি মাঝ নদী পেরিয়ে যাচ্ছে। নৌকা যতই আগে বাড়ছে, ঢেউয়ের দাপানিও ততই কম লাগছে। শেষে নৌকাটা যখন স্থির গতি পেল, আবিদ বেপারি দেখলো সে আর বেশি দূরে নেই। আলোর গাছটা বেশ স্পষ্ট হয়ে এসেছে। আলোর ফুলটা যা এতক্ষণ অদৃশ্য বৃক্ষের উঁচু শাখায় ফুটন্ত মনে হচ্ছিল তা সহসা ঝরে পড়ার মত বৃক্ষের মূলে পড়ে আছে। গাছটাও আর অস্পষ্ট নয়। দীর্ঘাঙ্গীনী এক নারীমূর্তি নদীর উদ্দাম বাতাসে চুল খুলে দিয়ে নৌকার প্রান্তভাগে দাঁড়ানো। তার পায়ের কাছে একটা ঘোলাটে লণ্ঠন সর্বশক্তি নিয়ে আলো ছড়াচ্ছে। নারীমূর্তির মুখ যে বেপারির জেলে নৌকার দিকেই ফেরানো তা বেপারি বুঝলো। নৌকা আর একটু এগিয়ে যেতেই মূর্তির সর্বাঙ্গ বেপারির নজরে এলো। বেপারির মনে হলো, বহুদিন আগে, তার কিশোর বয়সে গ্রামের মাতব্বরের পুকুর কাটার সময় মাটি কাটার মজুররা মাটির নিচে একটা মূর্তি পেয়েছিল। গাঁয়ের লেখা পড়া জানা লোকেরা বলেছিল মূর্তিটা হলো গঙ্গার। হঠাৎ বহুদিন আগে দেখা সেই গঙ্গামূর্তির কথা আবিদ বেপারির মনে পড়ল। গঙ্গার মতই একটা হাত কাঁখালে রেখে শরীরটা দাঁড়িয়ে আছে। সুগঠিত ও সরল। শুধু চুলগুলোই খোঁপায় বাঁধা না থেকে বাতাসে পিছন দিকে উড়ছে। এই বেমিল দেখে আবিদ বেপারি মনে মনে ভাবলো, ‘তা অইলে তুমি গঙ্গাদেবী না, মেঘনাদেবী!’ এ ধরণের একটা উপমা প্রয়োগের ক্ষমতা থাকায় আবিদের হৃদয় পুলকিত হয়ে উঠলো।

আবিদের নাওকে কাছে আসতে দেখে মেঘনা তার বাতিসহ নৌকার ছৈয়ের ভিতর ঢুকে গেলো। তারপর একটা খিল খিল হাসির ঢেউ বয়ে গেলো আরেক মেঘনার ঢেউয়ের ওপর দিয়ে।
আবিদ বেপারি তার নাওটাকে সামনের নৌকার বাতার কাছে এনে লগিতে ভর রেখে দাঁড়াতেই নদী যেন নয়ন মেলে দিল আকাশের দিকে। এখন চোখ দু’টি আর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নেই। সোজা চাঁদের দিকে মাত্রাজ্ঞানহীনের মত চোখ মেলে আছে।
লগিটাকে নদীর তলদেশে সহজেই পুঁততে পারলো বেপারি। লগির সাথে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধলো নাওটাকে। তারপর অসঙ্কোচে গিয়ে ঢুকলো সামনের নৌকায়। এক নৌকা থেকে অন্য নৌকায় উঠলে যে দুলুনি ওঠে, সে দুলুনিতে বেপারি বুঝলো এ নৌকাটা হালকা জাম কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি। ভেতরে আলোর পাশে বসা মেঘনার কাছে গিয়ে বসা সত্ত্বেও নাওটা সমানে দুলছিল। লগি ঠেলে আবিদ বেপারি রীতিমত ঘামে নেয়ে উঠেছে। বাইরে নদীতে বাতাস থাকায় শরীরের ঘামটা এতক্ষণ চামড়ার ওপর ফুটে বেরুতে পারে নি। এখন বদ্ধ নৌকায় তা সুযোগ পেয়ে দরদর করে সারা গতর ভিজিয়ে সপসপে করে দিল। বেপারি নৌকার ছৈয়ের চটায় গুঁজা শাড়ির পাড়ের সুতোয় তৈরি একটি হাতপাখা দেখে তা তুলে নিল। পাখা ঘোরাতে ঘোরাতে বললো, ‘কি নাম বাইদানির?’ প্রশ্ন শুনে একটা খিল খিল হাসির শব্দে ঢেউয়ের দোলায় উথাল পাথাল নৌকাটাও বুঝি মুহূর্তের জন্যে গমগম করে উঠলো।

‘নাম জিগাইয়া কি অইব? নাম আমার বেউলা সুন্দরী!’
কথা কটি বলেই আবার হাসিতে গড়িয়ে পড়লো মেয়েটি। হাসির চোটে বুকের কাপড় কেঁপে কেঁপে নেমে গেলে একহাতে কাপড়টা ছতরের ওপর ধরে রাখলো বেউলা সুন্দরী। ব্লাউজহীন পরিচ্ছন্ন কালো শরীর। বক্ষস্থলের ওপর ভাগটা কণ্ঠার দুটি প্রসারিত হাড় পর্যন্ত জলের মত কালো হলেও একটু বেশি উজ্জ্বল এবং নির্মল। তার ওপর ঝুলে আছে গাঢ় সবুজ দুগাছি পুঁতির মালা। মালার গোটাগুলো এত ছোট যে প্রথম দৃষ্টিতেই মনে হবে মেঘনায় মাঝে মাঝে সে সোনালী মাগুর মাছ ধরা পড়ে বুঝি সে সব মাছের সবুজ ডিম দিয়ে কেউ দু’গাছি মালা গেঁথে দিয়েছে।
হাসির লহরটা সশব্দে আছড়ে পড়ে কয়েকটা গমকে ভাগ হয়ে থামতে না থামতেই বেউলা সুন্দরী বেপারির দিকে মুখ কাত করে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, ‘আমার নাম তো শুনলে মহাজন, অখন আপনার নামডা কন?’
‘আমার নাম আবিদ বেপারি। আমি অই হাডে দালালি করি।’ চিবুকটা চুলকাতে চুলকাতে বললো, আবিদ বেপারি।
‘অ আল্লাহ, আপনে তইলে লখিন্দর না! আর আমি ভাবতাছি, আমার নাওয়ে লখাই আইছে।’
আবার হাসতে লাগল বেউলা সুন্দরী। তবে এখন আর তেমন সশব্দে না বরং ঠোঁট টিপে একটু গা কাঁপিয়ে।
মেয়েটির নিগূঢ় হাসি সংক্রামিত হলো বেপারির ঠোঁটেও। বেপারিও বোকার মত হেসে ফেললো। বললো, ‘তইলে ধইরা নেও আমিই চান্ সদাগরের পোলা লখাই! তোমার লখিন্দর!’
‘এই কথা কন। আপনে তো লখিন্দরই, আমি জানি। রাইত নিশিতে যারা আমার ভরায় উডে, বাত্তির ডাহে উইড়া আইয়ে, তারা হগলতই লখাই।’
এবার মেয়েটির হাসিতে তার দাঁতের পাটি নজরে পড়লো বেপারির। ফক্ফকে শাদা আর নিখুঁতভাবে দৃঢ়। মাড়ির যেটুকু আভাস পাওয়া গেল তাও চকচকে কালো আর সুন্দরভাবে সংঘবদ্ধ। বেউলা সুন্দরীর হাসিটা বড়ো ভালো লাগলো বেপারির।
‘একটা পান খাইবেন মহাজন? জর্দা আছে জর্দা দিয়া দিমু।’
বেপারিকে বেশ নরম সুরে কথায় মায়া মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলো বেউলা। বেপারি হেসে বললো, ‘আমারে মহাজন কও কেরে, আমি না তোমার লখাই!’
‘অমা, আবার রসও আছে দেহি! বেইশ বেইশ, আমার ভুল অইছে। অখন থিকা ঠিকঠাক কথা কমু। কমু লখাই মহাজন! লখিন্দরও মহাজনই আছিল। সদাগরের পুত সদাগর। সদাগররে তো মহাজনই কয়। কয় না মহাজন?
‘হ কয়।’ বেউলার মুখ নাড়ার কাছে হেরে গেলো আবিদ বেপারি, হাসলো, ‘তোমার অত বুদ্ধি! অতকথা জানলা কেমনে সুন্দরী? পানির মাইয়ারা এমুন চালাক অয়, হিডা তো জানতাম না!’
‘কেরে জানতেন না লখাই মহাজন? অতদিন বুঝি হগল হাডবারে ভরার নৌকা বিচরাইয়া হুদা পানির মত মাইয়া দেখছেন। পানির ভেতরে ঢেউ দেখেন নাই?’
বেউলার পটাপট জবাবে বেপারি একটু লজ্জিত ও স্মিমিত হয়ে গেলো। তার কেন যেন মনে হলো সে এক কালনাগিনীর গর্তে এসে পরেছে, যার ফণা এখন তার মাথার ওপর বিস্তৃত। বেপারি এমন অকস্মাৎ দমে যাওয়া দেখে মেয়েটিও যেন হঠাৎ শরমিন্দা হয়েছে। বললো, ‘কি অইল, কথা কন না ক্যান্? কথা কন, আমি পান বানাই।’
আবির বেপারির দিকে পেছন ফিরে পিট দেখিয়ে বসে বেউলা নৌকায় একটা পাটাতন তুলে ভেতর থেকে পানের ডাবর বের করে আনলো। ডাবরে হাত ঢুকিয়ে খয়েরের দাগে ভরা একটা তেনায় পেঁচানো একগুচ্ছ পান বের করলো।
এ অবসরে আবিদ মেয়েটির পিঠ, বাহু, কোমর আর চীনা হাঁসের মত বাঁকানো গ্রীবাভঙ্গি দেখার সুযোগ পেল। যদিও লণ্ঠনটা ধোঁয়াটে আলো ছড়াচ্ছে, তবুও তা ছৈয়ের বাঁশের চটায় ঝোলানো থাকায় সম্মুখবর্তিনীর সর্বাঙ্গে আলো পড়েছে। পেট আর বুক দিয়ে হাঁটু আর উরতের ওপর চেপে বসায় পেছন থেকে তার পিষ্ট স্তন দু’টির ফুলে ওঠা পর্যন্ত আবিদ বেপারি লোভাতুরের মত দেখতে লাগলো। যেন কোনো নায়রী নাওয়ের বালক মেঘনার বুকে আত্কা ভেসে ওঠা গাঙ শুশুকীর সুডৌল বুকের এক অংশ দেখে ফেলে অবাক হয়ে মনে মনে ভাবছে, অমা মাছেরও আবার বুনি আছে!
বেউলা সুন্দরী তখন ছুরাতার ফাঁকে একটা আস্ত সুপারি রেখে ধীরে চাপ দিয়ে কুচি কুচি করে কাটছিল। আর এই চাপের শিহরণ তার মাংসের ওপর এমনভাবে কাঁপন তুলছে যে বেপারির মনে হলো মেয়েটির ঘাড়ের পেশি আর দাপ্নার দুলুনি যেন দাড়াশ সাপের দ্রুতগামী কামলীলা। পেছন থেকে তার পাছা আর পিঠের নিচের অংশ অনেকটা চাল কাড়ার হালকা ঢেঁকি উল্টে রাখার মত। নিখুঁত আর তেলতেলে। বেউলা সুন্দরীর পরনে মোটা কালোপেড়ে শাদা শাড়ি। এ ধরণের শাড়ি সাধারণত বেদে মেয়েদের পরতে দেখা যায় না। তারা রঙচঙে কাপড়ই পছন্দ করে। বেউলার সাদাসিধা শাড়ি আর শাড়ির গোঁজন-গাজন দেখে তাকে বেদেনী বলে মনে হচ্ছে না। বরং তার শাড়ির অস্বভাবিক শাদা জমিন আর কালো পাড় দেখে তাকে কোনো পরমাসুন্দরী জেলে বৌ বলেই ভুল হবে। দু’হাতের কবজি ভরা সবুজ বাংড়ি টুংটাং শব্দ করছে। বাঁ হাতের কনুইয়ে একটু ওপরে মোটা কালো তাগায় একটা চ্যাপটা মতন বড় রুপোর তাবিজ বাতি নিয়ে নৌকার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার সময়। যে কেশরাশি বাতাসের সাথে বইতে দেওয়ার জন্য ছেড়ে রেখেছিল নৌকার ভিতর তার সম্বরণ করে নেওয়ায় তার মাথার প্রায় সমান সমান এক বিশাল খোঁপার সৃষ্টি হয়েছে। যেন দূর থেকে দেখা নদীপাড়ের কোনো গ্রামের বাড়ির বনের কুঞ্জি। আবার সেই পুকুরে পাওয়া গঙ্গামূর্তির কথা মনে পড়লো বেপারির।
বেউলা সুন্দরী ততক্ষণে পান বানিয়ে বেপারির দিকে ঘুরে বসেছে। তার চোখে চোখপড়ার লজ্জা এড়াবার জন্য বেপারি দৃষ্টি সরিয়ে নৌকার ভেতরে আসবাবপত্র দেখতে লাগলো।
‘লন পান।’ হেসে বেউলা ছোট একটা পিতলের তস্তরিতে দু’খিলি পান এগিয়ে দিল।
খিলিজোড়া একসাথে হাত তুলে বেপারি প্রশ্ন করলো, ‘কেমুন জর্দা, সুন্দর খুশ্বাই বারুইতাছে!’
‘কস্তুরী জর্দা মহাজন। কেল্লা শহিদের মাজার থিকা আনছি। খাইয়া দেখেন, ঘামে বুকের পশম ভিজ্জা যাইব।’
হেসে বললো বেউলা সুন্দরী। তার কথায় আবিদ বেপারিও না হেসে পারলো না। তারপর পানের খিলি দু’টি একসাথে মুচ্ড়ে মুখ পুরে দিল। তার পান খাওয়ার নমুনা দেখে মেয়েটি আবার হেসে গড়িয়ে পড়লো। আবিদ বেপারিও হাসতে হাসতে আবার নাওয়ের আসবাবপত্রের দিকে চোখ ফেরাল। মেয়েটি যেখানে বসেছিল, তার পেছন দিকে তিনটি সাপের ঝুড়ি। একটার ওপর আরেকটা বসানো। ঝুড়ির পাশে একটা কাঠের ডেউয়া। তার সাথেই কাত করে রাখা ছোট একটা বটি দাও। মেয়েটির ঠিক মাথার ওপর ছৈয়ের ধনুকের মত বাঁকা চূড়াটা থেকে একটা সাপের হাড়ের মালা ঝলছে। ছৈয়ের একপাশের বেড়ায় একটা বড়ো শিঙ্গা গাঁথা। এরকম শিঙ্গা দিয়েই বেদেনীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বয়স্ক বেতো নর নারীর রক্তমোক্ষণ করে বাত সারায়। কলকিসহ একটা নারকেলের হুকাও বেড়ায় ঝুলছে। বেড়ার সাথে বাঁধা দড়িতে দু’টি ময়লা শ্রীহীন শাদা শাড়ি। ছেঁড়া, পাড়হীন। এতক্ষণে আবিদ বেপারির চোখে বেউলা সুন্দরীকে ঘিরে ধরা মমতাহীন দারিদ্র্যের বেষ্টন ধরা পড়লো।
‘কি দেখতাছেন মহাজন পানি খাওড়ী পক্ষির বাসা দেখেন?’
হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলো বেউলা সুন্দরী। বেপারি কিছু বলার আগেই আবার ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করলো, ‘ঘরে বউ বাচ্চা আছে?’
‘না বিয়া করি নাই।’
‘অ, ল্যাজ কাডা হাপ!’ বলেই বেউলা সুন্দরী আবার হাসতে লাগলো। এবার তার হাসিতে ঠাট্টার গমক বেমি। বেপারি মেয়েটির টিটকারীর রেশটা বুঝতে পেরে বললো, ‘ল্যাজ দিয়া কি করুম, ল্যাজ থাকলে টানুন লাগে।’
‘অ টানাটানির মাঝে নাই, খালি ছোপ্ মারার তালে ঘুরেন? ইয়ানে ইয়ানে গিয়া খালি ছোপ্ মাইরা পালাইয়া যাওন। বাপরে, সোজা মানুষ না। একবারে পানখ হাপের মিজাজ!’
মেয়েটির মুখ নাড়া কথার ভঙ্গিতে এবার বেপারিও জোরে হেসে ফেললো। বললো, ‘তোমার লগে কথায় পারুম না সুন্দরী। তুমি বাকসিদ্ধা বাইদানি।’
আবিদ বেপারির এ সহজ পরাজয়ে বেউলা বেশ পুলকিত হয়েছে বলেই মনে হলো। সে ঠোঁট টিপে আবার একটু হেসে কথা ঘুরিয়ে বললো, ‘আর বুঝি তর সইতাছে না লখাই মহাজনের, তাড়াতাড়ি খালি মরণের ঢেউ বুকে লাগাইবার মন চায়।’
কথা শুনে আবিদ হেসে মেয়েটির একটি হাত ধরলো। হাত সরিয়ে না নিয়েই বেউলা সুন্দরী বললো, ‘হুনেন লখিন্দর মহাজন, আগে কন দেনমোহর কত দিবাইন?’
আবিদ বেপারি খুশি হয়ে বললো, ‘হুদা দেনমোহর কেরে, তুমি চাইলে কাবিন পর্যন্ত লেইখা দিমু সুন্দরী!’

বলেই দুবাহু দিয়ে বেহুলাকে জড়িয়ে ধরলো বেপারি এবং বিদ্যুতের মত দ্রুতগতিতে মাথা নুয়ে তার কণ্ঠার হাড়ে গভীরভাবে সশব্দে চুম্বন করলো। বেপারির এই আকস্মিক ব্যবহারে মেয়েটি একটুও অবাক হলো না। বরং ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে বেপারির মাথাটা একটু ঠেলে দিয়ে বললো, ‘কেমুন কাবিন, মেঘনার পানিত্ লেখা ঢেউয়ের কাবিন নিহি? না মহাজন, আমি কাবিন চাই না, আমারে দেনমোহরের টেহাডা হাতে দেন আগে, পরে গতর হাতাইবেন।’
কথা শেষ করেই বেউলা সুন্দরী বেশ ভদ্রভাবে কিন্তু সবলে আবিদের বাহুর বেষ্টন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিল। আবিদ উপলব্ধি করলো, এই ছিপছিপে গড়নের কালো মেয়েটির দেহে এক যুবা পুরুষের জোর লুকিয়ে আছে।
আবিদ সতর্ক হয়ে তাকালো বেউলার দিকে। তার ছতর থেকে শাড়িটা লুটিয়ে পড়েছে মাজার ওপর। খুঁতহীন ছোটো কটোরার মত বুক দুটিকে মনে হচ্ছে গর্ববতী গাঙশুশুকীর শরীরের ওপর ভাগের নিটোল দুটি স্তনের মতই স্ফীত, পরিপূর্ণ।
আবিদ বেপারি নিজের কোমরে হাত দিয়ে প্রথম খুতির ওপর বাঁধা গামছাটা খুলে দড়িতে ঝোলানো মলিন শাড়িগুলোর ওপর রেখে, পরে খুতিটা বের করলো। খুতির মুখ ফচ্কা গিঁরোতে শক্তভাবে বাঁধা থাকলেও বেপারি কায়দা করে একটানে খুলে ফেললো। হাত দিয়ে বের করে আনলো তাড়া বাঁধা নোট। সব দশটাকার। গুণে গুণে পাঁচটা নোট আলাদা করে, তাসের মত ছড়িয়ে সে বেউলার দিকে মেলে ধরলো, ‘লও সুন্দরী তোমার দেনমোহর পঞ্চাশ টাহাই দিলাম।’ বেউলা বেপারির অন্য হাতে ধরা আরেক তাড়া নোটের ভাঁজের দিকে আড়চোখ এক ঝলক তাকিয়ে হেসে সামনের তাসের মত ছড়ানো দশ টাকার পাঁচটা নোট ধরলো। হেসে বললো, ‘মেঘনা পাড়ের হাট বাজারে দালালিরও বেইশ্ পয়সা আছে দেখতাছি!’
আবিদ কোনো কথা না বলে বাকি টাকাটা খুঁতিতে ভরে মুখটা পেঁচিয়ে বেঁধে ফেললো। তারপর তা কোমরে না বেঁধে গামছাটা যেখানে রেখেছিলো। সেখানেই খুতিটা রাখলো। মেয়েটিও বেপারির খুঁতি রাখার মধ্যে একটা পূর্ব প্রস্তুতির আভাস পেয়ে তার হাতে ধরা পাঁচটা দশ টাকার নোট দ্রুত ভাজ করে পেছনের সাপের ঝুড়ির ডালাটা মুহুর্তের মধ্যে ফাঁক করে নোটগুলো গুঁজে দিয়ে পলক ফেলতে না পেলতেই ডালাটা আবার চাপিয়ে দিল। তবুও ডালা স্পর্শ করা মাত্রই ভেতরে সাপের ফোঁস্-ফোঁসানি শুনতে পলো আবিদ বেপারি। জিজ্ঞেস করলো, ‘কি হাপ?’
‘পানোখী। মাইনষে কালনাগিনী কয়।’
বলে সোজা বেপারির মুখের দিকে তাকালো বেউলা। জর্দা দিয়ে কড়া পান খেয়ে বেপারির কপাল ঘামছে। ঠোঁট দুটি একটু কালচে লাল। বেউলাকে তার দিকে তাকাতে দেখে বেপারি জানতে চাইলো, ‘তুমি হাপ নাচাও?’
‘না। আমি হাপ পালি, আর মানুষ নাচাই।’
কথাটা বলেই বেউলা হাঁটুর ওপর ভর রেখে দাঁড়িয়ে দেহের চারÑদিকে হাত ঘুরিয়ে শাড়ির প্যাঁচ খুলতে লাগলো। এখন বেউলার বুক দুটি আবিদের মুখের কাছে ফলের মত নুয়ে পড়েছে। সদ্য চেরাই করা জাম কাঠের গন্ধের মত একটা গন্ধ মেয়েটির শরীর থেকে আবিদ বেপারির নাকে এসে লাগলো। বেপারি ঘাড় উঁচু করে একটি ফলের ওপর আলতোভাবে তার জর্দাতাপিত ঠোঁট দুটি ছোঁয়ালো। বেউলা শাড়ির প্যাঁচ গুটিয়ে নিয়ে উরুতের ফাঁকে রেখে নাভির ওপরকার শক্ত গিঁটটা নখ দিয়ে খুঁটে খুলতে চেষ্টা করছে। বেপারি বললো, ‘আমি খুইলা দিমু?’
বেউলা খিলখিল শব্দে হেসে উঠে বললো, ‘বান্ যে বড়ো শক্ত লখাই মহাজন, দাঁত দিয়া খুলন লাগবো। পারবাইন্ খুলতে?’
এ সুযোগ আবিদ বেপারি ছাড়তে চাইলো না। সোজাসুজি মুখটা নামিয়ে আনলো বেউলার নাভির কাছে। শাড়ির গিঁটে দাঁত বসার আগেই ঠোঁট ছোঁয়ালো গভীর নাভিমণ্ডলের গর্তের নিন্মভাগে। বেউলা তলপেটে পুরুষের তপ্ত ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে শরীর কুঁচকে বসে যেতে যেতে বেপারির মাথায় হাতের ধাক্কা মারলো, ‘আরে করেন কি আপনে আমার ক্যাত্কুতি লাগে না?’
‘ক্যাত্কুতি আছে নাহি মাইয়া লোকের? আচ্ছা দেও বান্ডাই খুইলা দেই। আর চুমা দিমু না।’

কথাগুলো বলে আবিদ বেপারি অনেকটা গায়ের জোরে, বেউলার উরুতে হাতের চাপ দিয়ে তাকে আবার হাঁটুর ওপর দাঁড় করিয়ে দিলো। বেউলার ফের উঠে দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে কোমরের গিঁটের দু’পাশের শাড়ি সরে গিয়ে তার তলপেট থেকে হাটু পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। দুটি ছোট কলাগাছের কাণ্ডের মত উরুমূল তার যুগল বাহু জ্যামিতির কাটার মত বিস্তার করে থাকায় বেউলার অধোদেশকে একটি সুন্দর তোরণের মত মনে হতে থাকলো আবিদের। আবিদ আবার মুখটা নামিয়ে আনলো মেহগনি কাঠের আলো পিছলে যাওয়া কালো রঙকে হার মানাবে এমন সুন্দর নাভি মণ্ডলের কাছে। চুম্বনের ইচ্ছায় ঠোঁটের মাংস কুঞ্চিত হতে থাকলেও বেপারি গিঁটের একটা কুচকানো অংশে দাঁত চেপে আস্তে টান দিল। প্রথম টানেই গিঁটের পাকানো আঁচলটা খুলে গেলে আবিদ বললো, ‘দেখলে সুন্দরী, আমি কেমনে আঁট গিঁরো খুলতাম পারি।’
কথা বলার সময় আবিদের চোখ বেউলার মুখের দিকে ছিল না বরং শাড়ির বাঁধন মুক্ত হয়ে পড়ায় তার অধোদেশ সম্পূর্ণ নিরাবরণ থাকায় বেপারি কালো গুল্মময় ত্রিভূজাকৃতি এক ঈষদুচ্চ বদ্বীপের মোহময় সুন্দর্য অবলোকন করতে ব্যস্ত। আবিদের মনে হলো যেন এক ফণা মেলা সাপিনী তার ফণাসহ গর্তে ঢুকতে গিয়ে গর্তের মুখে মুখ আটকে থমকে আছে।
‘নেন, জাগা ছাড়েন, আমি হুতি।’
বলে বেউলা সুন্দরী বেপারির অভিভূত মুখের ওপর তর্জনীর টোকা মারলো। বেপারি নাওয়ের মধ্যভাগের দখল ছেড়ে ছৈয়ের কাছে সরে যেতেই বেউলা সুন্দরী চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো পাটাতনে। তার বুক, পেট আর উরুতের মাংসপেশিকে মনে হচ্ছে কোনো পারদর্শী শরীর চর্চাকারিণীর প্রদর্শনরতা একটি অপরূপ কৌশলের মত। আবিদ বেপারি লুঙ্গিটা খুলে দড়ির কাপড়ের ওপর রেখে শার্টের বোতাম খেলতে খুলতে বললো, ‘একটা সিগ্রেট খাইয়া লমু?’
‘আ মরণ! এমুন সময় আবার কেউ সিগ্রেট ধরায়? রাইত আর বেশি নাই মহাজন, জলদি করেন। হুন্তাছেন না কিনারের গাঁওয়ে মোরগা ডাকতাছে। পহর ধলা মারলে আমার বহর ছাইড়া যাইবো। আইয়েন।’
বেপারির দিকে না ফিরে বরং ছৈয়ের বাঁকা তুঙ্গে ভোলানো সাপের হাড়ের শাদা মালাটার ওপর চোখ রেখে তাড়া দিল বেউলা সুন্দরী।
আবিদ বেপারি গায়ের জামাটা খুলে ¯তূপ করে দড়ির ওপর রেখে সাপের ঝুড়িগুলোর কাছে যেখানে বেউলা তার কদলীকাণ্ডের মত নগ্ন উরুযুগল ভাঁজ করে শুয়ে আছে সেখানে গিয়ে বসলো। তার সামনে গুম্বুজের মত বেউলার সুডৌল হাঁটুর চূড়া উঁচু হয়ে আছে। আবিদ বেপারি নিজের হাঁটুর ওপর, নিজেও একটু উঁচু হয়ে উঠলো। তার মাথা সাপের সাজানো ঝুড়িগুলোর সমান হলে সে দেখলো বেউলা চোখ মুদে গম্ভীর, থমথমেভাবে শুয়ে আছে। আর তার বুকের ওপরে গোল আতাফলের মঝে বসা দুটি ভ্রমরের মত স্তনের বোটা সদাজাগ্রত কালো আঁখিতারার মত স্থিরভাবে বেপারির উলঙ্গ দেহসৌষ্ঠব নিরীক্ষণ করে স্তম্ভিত, অভিভূত।

কোমল স্পর্শে বেপারি বেউলার গুম্বুজের মত হাঁটুতে হাত রাখলে মেয়েটি অতি ধীরে তার ভারি উরুযুগলের একটি ফাঁক করে দিল। যুগলের বাম স্তম্ভ জঙ্ঘার একপাশে আস্তে নেমে গেলে বেউলা তার ভাঁজ করা বা পায়ের ভাঁজ খুলে পাটাতনের ওপর নিঃশব্দে স্থাপন করলো। বেশ আরামের সাথে রাখলো পা’টা। অন্য পা’টাও এভাইে রাখবে ভেবে বেপারি অপেক্ষা করছে। কিন্তু স্তম্ভটা অনড়। বেপারি তার ডান হাতটা আবার স্তম্ভের চূড়ায় রাখতে গিয়ে বুঝলো হাতটা কাঁপছে। ঠিক জালি লাউয়ের মোটা লতার মত কাঁপছে। বেপারির স্পর্শে বেউলা ঘুমজড়ানো ধানচেরা চোখ দু’টি মেললো। দৃষ্টিতে গভীর ঘুমের অলসতা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি বোঝা গেল না। কালো মাংসল ঠোঁটজোড়ায় কোনো বাসনার কুঞ্চন নেই। বরং কেমন দৃঢ়তায় সংবদ্ধ।
বেপারি কাঁপা গলায় বললো, ‘পাও সরাও বাইদানি।’
বেপারীর ‘বাইদানি’ সম্বোধনে বেউলার চাপা ঠোঁটের ওপর হাঁসির একটু মৃদু ঝিলিক খেলে গেলো। সে অনুমান করলো তার মহাজনের অবস্থা কাহিল। বেউলা তার ডান উরু একটু ডান দিকে হেলিয়ে প্রসারিত করতে লাগলো। তবে তা পাটাতনের ওপর না বিছিয়ে অকস্মাৎ তুলে দিলো বেপারির বিস্তৃত কাঁধের ওপর। পায়ের পাতা কাঁধ অতিক্রম করে গিয়ে সাপের ঝুড়ির ডালায় ঠেকলো। বেপারি বেউলার এই উদার সম্প্রসারণে কৃতার্থ হয়ে তার ডান হাঁটুর পাশে ঠোঁট ঘষতে লাগলো। দর দর করে ঘাম ঝরছে আবিদের পেশিবহুল পিঠ আর বুকের পশম ভিজিয়ে। তার কোমরে মোটা ঘুন্সির তাগাটা ভিজে আঁট হয়ে আছে। বেপারির নগ্নতাও এখন শিল্পিত পাথরের মত সুন্দর আর ঋজু। যেন যাদুঘরে রাখা পাল যুগের কোনো অবলোকিতেশ্বরের মূর্তি ধরাচূড়া ফেলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেছে।
ওদিকে আবিদের অলক্ষে তার পিঠের ওপর রাখা বেউলার ডান পায়ের অগ্রভাগ অর্থাৎ পায়ের পাতা ও আঙুল অকস্মাৎ ক্রুদ্ধ রাজহাঁসের চঞ্চুর মত ঠোকর মেরে সাপের ঝুড়ির ডালাটা ফেলে দিল। আর চোক্ষের নিমেষে একটা অকথ্য ফেঁসফোঁসানি তুলে ঝুড়ির অধিবাসিনী কালনাগিনী দ্রুত হিলহিল করে বেউলার পা বেয়ে নেমে এসে আবিদের ডান বাহুতে ছোবল হানলো। বাহুর ওপর সাপের মুখের ভেজা শীতল স্পর্শে ঘাড় ফিরিয়েই বেপারির চোখের তারা ভয়ে স্থির হয়ে গেল। সাপটা বেউলার উরুতের ওপর থেকে ঘাড় বাঁকিয়ে আবিদের দু’চোখের মধ্যিখানে ফণা তুলে একটু ডানে-বাঁয়ে দুলছে। আর মুখ থেকে কালো সুতোর মতো সরু জিভটা দ্রুত পিছলে পিছলে আসা-যাওয়া করছে। বুঝি নড়লেই আবার ছোবল হানবে। বেউলা এক দৃষ্টে সাপটার দিকে তাকিয়েই চোখ বড় বড় করে চিৎকার করে উঠলো, ‘খাইছে মহাজন, আপনেরে কালে খাইছে! সব্বেনাশ অইছেÑ এই হাপের যে দাঁত তোলা অয় নাই গো!’
তার চিৎকার আর উরুতের কাঁপুনিতে সাপটা ক্রুদ্ধ হয়ে আবিদের দু’চোখের মাঝখানে, নাসিকার গোড়ায় সজোড়ে ছোবল মারলো। বেপারির দু’চোখের পাতা থর থর করে কয়েকবার কেঁপে শেষে স্থির বিষ্ফোরিত হয়ে রইলো। তারপর অজ্ঞান দেহটা উবুড় হয়ে পড়লো বেউলার বুকের ওপর।’ এমন ভাবে পড়লো, দেখলে মনে হবে কোনো রমণরত পুরুষ তার অংশভাগিনীকে মধুরতম পুলকের মাঝে আলোড়িত করতে করতে দাঁত দিয়ে বক্ষবর্তুল মর্দন করছে।

আবিদের জ্ঞানহীন দেহটা বুকের ওপর দু’হাতে জড়িয়ে ধরে খিলখিল হেসে উঠলো বেউলা সুন্দরী। তার বাহুর ওপর থেকে ফণা মেলে রাখা কালনাগিনীর দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমার লখিন্দরের কাম অইয়া গেছে লো লেংটা বাইদানি। অখন তর ফোঁস ফোঁস থামা।’

বলেই আবার খিলখিল করে হাসতে লাগলো বেউলা। মুখমণ্ডল উঁচু করে আবিদ বেপারির কপালের নিচে নাসিকার গোড়ায় যেখানে সাপটা ছোবল বসিয়েছিল, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী চুম্বন করলো। পরে বেপারির দেহটাকে কায়দা করে বুকের উপর থেকে ঠেলে পাশে চিৎ করে শুইয়ে দিল ঠিক একটা বাচ্চা ছেলেকে শুইয়ে দেয়ার মত। বেপারির ঠোঁট জোড়া একটু ফাঁক হয়ে আছে। তার ধীরগতি নিঃশ্বাসের দুলুনিতে পেশল বুক নেতিয়ে পড়া পেট পরস্পরের সাথে তাল রেখে ক্রমাগত ওঠাপড়া করছে। শিশ্নটিকে মনে হচ্ছে হাত ফস্কে বেরিয়ে পড়া ‘টাকি’ মাছের মত লম্বমান।
বেউলা সুন্দরী উঠে বসে নগ্ন জঙ্ঘা প্রান্তে দু’হাত রেখে আড়মোড়া ভাঙলো। লুটিয়ে পড়া কেশরাশি খোঁপা করে বাঁধল। কিন্তু শাড়ি পরল না। সাপটাকে তখনও ফণা ধরে থাকতে দেখে হাত বাড়িয়ে কালনাগিনীর ঘাড়টা খপ করে ধরলো।
‘দাঁত নাই বাইদানির আবার ফঁস্ ফঁসানি কত! লো নেংটা বাইদানি, তুই আমার লখিন্দররে করলি কি? দিমু মাথা ছেইচা!’
সাপটাকে কপট তিরস্কার করতে করতে কোমর উঁচু করে বেউলা উঠলো। কালনাগিনী তখন বেউলার হাতে লতার মত ঝুলছে। সাপটা যাতে দেহ মুচড়াতে না পারে সেজন্য অপর হাতে তার কোমরটা ধরে ফেললো বেউলা। শেষে তুলে এনে ঝুড়ির ভেতর নামিয়ে দিয়ে ডালা চাপিয়ে দিল। তার হাতের নড়াচড়ায় কোনো তাড়াহুড়া আছে বলে মনে হলো না। বরং ধীরে সুস্থে ছৈয়ের বেড়ায় কাপড় ঝোলানোর দড়িটার কাছে বসে বেপারির গামছা দিয়ে মুখটা মুছলো। টাকার খুতিটা খুঁজে বের করে তা সাপের ঝুড়ির ডালার ভেতরে গোল করে গুঁজে দিল। এবারও সাপটা ফোঁসফোঁসানির শব্দে তার ক্রোধ ব্যক্ত করছে।
টাকার খুতিটা সামলানো হয়ে গেলে বেউলা গামছাটা দিয়ে বেপারির জ্ঞানহীন দেহের নগ্নতা ঢেকে বেশ সাহসের সাথে তাকে পাজা কোলে তুলে নিয়ে নৌকার গলুইয়ের কাছে এসে দাঁড়ালো। আবিদ বেপারির ভারি দেহের ভারে বেউলার মত শক্তিস্বরূপিণীও একটু বাঁকা হয়ে আছে। নদীর ওপর জোর বাতাস আর অনর্গল ঢেউ থাকায় আবিদ বেপারির জেলে নৌকার হালকা গুলুইটা মাছের মত লাফাচ্ছে। বেউলা নাওয়ের দাপানিতে পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয়ে একটা সুযোগের অপেক্ষায় নৌকার কিনারার কাঠে পা রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। কিন্তু আবিদ বেপারির ভারি দেহের ভার তার হাতে আর সইছিল না। শেষে ঢেউয়ের দুলুনির মধ্যেই সে জেলে নৌকার গুলুইয়ে পা রেখে চির অভ্যস্তের মত উঠে গেল। আর জেলে নৌকার দুটো তক্তার ওপর বেপারিকে শুইয়ে দিয়ে হাত বাড়িয়ে নদীর পানি তুলে বেপারির চোখে একটা ঝাপটা মেরে দ্রুত ফিরে এলো নিজের নৌকায়। তারপর মুহূর্ত বিলম্ব না করে লগির বাঁধন খুলে নাও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো বেদে বহরটার দিকে। যেন মেঘনার ললাটের ওপর থেকে এক অতিকায় কালো চক্ষু স্বইচ্ছায় তার সহোদরা লোচনকে ত্যাগ করে ভেসে যাচ্ছে। আর ঢেউয়ের ওপর আটকে রাখা দোদ্যল্যমান পরিত্যক্ত নয়নটি এক নগ্ন গঙ্গামূর্তির চাতুরী দেখে অথৈ ঢেউয়ের ওপর ছল ছল করে কাঁদতে লাগলো।

যদু / সাইফ আলি

সে শুধু ভাবে। আর পাঁচজন লোকের সাথে তার পার্থক্যটাই এখানে। তার একটাই কথা- কাজ যখন করবো, ভেবে চিন্তেই করবো; না জেনেশুনে কাজে নামে বোকালোক। ধরা খাওয়াটাও তাদের নিত্য নৈমেত্যিক ব্যপার। যেমন ধরুন ঐ কলিমের কথাই বলি, গেলো বছর পেয়াজে লাভ দেখে মনে করেছিলো এবারও… কিন্তু হলোটা কি? উল্টা। এবার নির্ঘাত লোকশানে পড়বে বেচারা। আরে বার বার কি আর এক সোনা ফলে। তারপর বকুল মিয়ার কথা ভাবো, মাছের চাষ করে দু’বছর বেশ লাভই করেছিলো, কিন্তু এবার পানিতে যে ঘের শুদ্ধ ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সে কি আর জানতো?? বেচারা। তাই বলি, কাজে নামার আগে বহুৎ চিন্তা ভাবনার দরকার আছে। এমন কাজে নামতে হবে যেনো লাভ ছাড়া ক্ষতির মুখ দেখতে না হয়। তার কথায় সম্মতি জ্ঞাপন করে মাথা ঝাকানো লোকও আছে। তারা তার আশেপাশেই থাকে। তাদের নিকট সে মুটামুটি আদর্শ বনে গেছে।
গ্রামে ডুকে দশ মিনিটের হাটা রাস্তা, তারপরেই মসজিদ; গ্রামে একটাই। মসজিদে তেমন লোক হয়না। গ্রামের কয়েকজন মুরব্বি ছাড়া কারোরই ধর্মেকর্মে মনোযোগ নেই। মনের মধ্যে পাকাপক্তভাবে ধারণা জন্মে গেছে, ওটা বুড়ো বয়সের হিসাব। মানুষ যখন বুড়ো হয়, মৃত্যুর ভয় জাগে; তখনই তারা মসজিদে-মন্দিরে যায়। আর জোয়ান বয়সটা হচ্ছে কাজের বয়স। টাকা পয়সা কামানোটাই এখানে মুখ্য বিষয় , তারপর বিয়ে-সংসার ইত্যাদি। মসজিদের পাশেই্ একটা চায়ের দোকান, শুধু চায়ের দোকান বললে অবিচার করা হয়। চানাচুর মুড়ি থেকে শুরু করে সুই-সুতো সবই পাওয়া যায় এখানে। দোকানের সামনে বাশেঁর মাচাং পাতা আছে। এটাই যদুর আড্ডাখানা। সকাল থেকে রাত যখনই তার খোঁজ করা হয় সে এখানেই থাকে। শুধু শুধু বসে থাকলে দোকানির উপর অবিচার করা হয় এ জ্ঞানটুকু তার আছে। আর একারনেই ঘন্টায় ঘন্টায় চায়ে চুমুক পড়ে তার। একা একা চা খাওয়াটা তার ধাতে সয় না। ফলে সর্বক্ষণ চা খাওয়া লোক তার আশেপাশেই থাকে। আগে বলা লাগতো এখন আর তাও লাগে না। চা খেয়ে যাওয়ার সময় বলে যায়- বিলটা দিয়ে দিও যদু ভাই। যদুর তাতে না নেই। খাবেই তো। গ্রামের ভাই-ভাগার মানুষ, এক কাপ চা খাবে সেটা আবার বলা লাগে! কোনোদিন রোগেশোগে যদু যদি নাও আসতে পারে তাও তার নামে বাকি জমে যায়। কে কি খেয়েছে সেটাও বলা লাগে না, টাকার পরিমানটা বললেই হয়।
যায় হোক, এ বিষয়ে কেউ যদুর সাথে বাজি লাগতে যায় না যে, আশপাশ চৌদ্দ গ্রামে তার মতো কেউ দাবা খেলতে পারে। যত বড় খেলোয়াড়ই আসুক না কেনো, পনের থেকে বিশ দান। অভিজ্ঞতার আলোকে খেলে যদু, প্রতিপক্ষের চাল দেখলেই বুঝে ফেলে মনের কথা। অনেকে বলে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। কিন্তু সে তার পছন্দ না। খেলাধুলা নিছক বিনোদনের বস্তু, ওসবে প্রতিযোগিতা থাকতে নেই। আনন্দ ছাড়া আর কিছুই এখান থেকে আশা করা উচিত নয়। পাশে বসে কেউ যদি রেডিওতে ধারাভাষ্য শোনে তবে মিজাজ গরম হয়ে যায় যদুর- দরকার পড়লে খেল গিয়ে, বসে বসে কি শুনিশ??
এভাবে দিনকাল যদুর ভালোই কাটছিলো, বাপ ছিলো এক সন্তান; জমি জমার অভাব নেই। সংসারে আয় রোজগারের জন্য তিনি কারো মুখাপেক্ষি নন। চার বোনের পর জদুর জ¤œ হয়েছিলো বর্ষা কালে। নিউমনিয়া হয়ে ছেলে বাঁচবে বলে আশা ছিলো না কারো। তারপরও কেমন করে যেন আল্লা হাতে ধরে বাঁচিয়ে দিলো। অতি আদরের যদু তাই ছোটবেলা থেকে হুকুম করে অভ্যস্ত, শুনে নয়। লেখা পড়া করেছে অনার্স পর্যন্ত। মাস্টার্স শেষ করলো না কারণ ভালো লাগে না। এতো লেখাপড়া জেনে কি হবে? চাকরি-বাকরি এখনো দরকার পড়েনি। তবে ইদানিং ভাবছে। আগে মনে করতো ব্যবসা করবে কিন্তু এখন আর সে জোর পায় না। অনেক ভেবে চিন্তে এই তার উপসংহার- শিক্ষা তাকে শিখিয়েছে কিভাবে একজন ভালোমানের চাকর হওয়া যায়। ফলে মালিক হওয়াটা বড়ই কষ্টকর। লাভ ক্ষতির হিসেব সে ঠিকই জানে। কিন্তু ক্ষতিটাকে কিভাবে লাভে পরিনত করা যায় সে হিসেব তার অজানাই থেকে গেছে। এর চেয়ে চাকরি করা অনেক সহজ, মাস গেলে নিয়ম মতো বেতন পাওয়া যায়। কিন্ত সেদিকে তাকিয়েও হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকে না তার। মানুষ কিভাবে পারে এগুলো। রোবটের মতো চলতেই থাকে দিনের পর দিন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। একই রুটিন একই কাজ!! ফলে যদু বেকার থাকাটাই ভালো মনে করে। ভবিষ্যতের চিন্তা করে কূল কিনারা পাওয়া মুশকিল। তাই ওটা নিয়ে চিন্তাও করে না আর।
গতকাল রাতের কথা, যদুর কাছে এই প্রথম কোনো আবদার নিয়ে এসেছেন এলাচি বেগম। ছেলের কাছে কিছুই চান না তিনি শুধু একটা মাত্র আবদার তার। ছেলেকে তিনি বিয়ে দিতে চান। যদুরও তাতে কোনো আপত্তি নেই বলে দিয়েছে। কিন্তু এখন বিষয়টা নিয়ে সে চিন্তিত। কিভাবে সম্ভব?? বেকার ছেলের সাথে মেয়ে দেবে কে? আর দিলেও বউয়ের কাছে রাত দিন যে খোটা খেতে হবে না সে গ্যারান্টি কে দেবে? বিষয়টাকে হালকা ভাবার কোনো কারণ নেই। এখন কি করা যায়। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে এ কথায় ভাবছে যদু। সঙ্গী-সাথীরা কয়েকজন এসে চা খেয়ে ফিরে গেছে। আজ আর দাবা খেলা জমছে না। মাথায় অন্য চিন্তা নিয়ে দাবা খেলা সম্ভব নয়। দোকানি বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছে কিন্ত যদু উত্তর দেয়নি। বিষয়টা সবাইকে জানানো যাবে না। এটা তার জীবনের দ্বিতীয় গোপনীয় কাজ। প্রথমটা ছিলো খাতনা।
তিন-চার দিন চলে গেছে মায়ের কাছ থেকে আর কোনো তথ্য আসেনি। ফলে আজ একটু নিশ্চিন্তেই ঘর থেকে বের হচ্ছিলো যদু, কিন্তু তা আর হলো না। মায়ের ডাক- এই যদু, আজ আর তোর দোকানে বসে কাজ নেই; আমার সাথে এক জায়গা যেতে হবে।
–    কোথায়?
–    সেটা তোর জেনে কাজ নেই, আমার পিছে পিছে হাটবি; কোনো প্রশ্ন করবি না।
–    বারে, কোথায় যাবো সেটাও জানতে পারবো না!!
–    গেলেই তো জানতে পারবি।
যদু আর কথা বাড়ালো না, লাভ নেই; এলাচি বেগমের পেট থেকে এর বেশি কিছুই সে বের করতে পারবে না যতক্ষণ না তিনি নিজ থেকে কিছু বলেন। ঘরে বসে নিজে নিজেই ভাবতে লাগলো- এমন কি ব্যপার যে, আম্মা আগে থেকে বলছে না??
মায়ের সাথে যদু যেখানে এসেছে সেটা তার মায়ের বান্ধবির বাড়ি। এতোকাল পর বান্ধবীর সাথে মায়ের গল্প করার খায়েস জাগলো কেনো তা যদুর মাথায় ঢুকলো না। কথা সূত্রে জানা গেলো তারা প্রায় ৭-৮ বছর পর পরষ্পর মিলিত হয়েছেন। দু’জনে গল্প জুড়েছেন ভালো মতোই, শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। মা-খালাদের গল্পের মধ্যে নিজেকে কেমন বেমানান লাগতে শুরু করেছে। ওর চোখে মুখে মনে হয় ব্যপারটা প্রকাশ পেয়েছে, কারণ ওর দিকে তাকিয়ে মায়ের বান্ধবী বলেই ফেললেন, তোমার একটু কষ্ট হয়ে যাচ্ছে মনে হয়, কিন্তু কি করবো বলো, তোমার মা যে এই অসময়ে এমন একটা আবদার নিয়ে আসবে তা কে জানতো? ও গেছে খালার বাড়িতে, আর কিছুক্ষনের মধ্যে চলে আসবে।
পুরো ব্যপারটাই যদুর কাছে ধোয়াটে মনে হচ্ছে। কার কথা বলছে খালা? ও কি কারো জন্য অপেক্ষা করছে?? এলাচি বেগম যদুর দিকে আড় চোখে তাকান, আবার বান্ধবীর সাথে গল্প জোড়েন। যদু এদিক সেদিক চিন্তা করে কূল না পেয়ে শেষমেশ থিতু হয়ে বসে আছে। এক কাপ চা খুব টানছে এখন।
–    আপনাদের চা দেবো?
অপ্রত্যাশিত এমন প্রশ্নে, প্রশ্নকর্তীর দিকে না তাকিয়েই যদু বলে ফেললো, জ্বী, হলে ভালো হয়।
–    কিরে, কখন এলি তুই?
–    মাত্রই এলাম। দেখলাম তোমরা খালি মুখে গল্পে মজেছো তাই…
–    এখানে আয়, তোর খালাকে সালাম কর; অনেক আগে দেখেছিলি, মনে থাকার কথা না।
–    আমিও তো চিনতে পারি নি, কতো বড় হয়ে গেছে মেয়েটা…
অপ্রত্যাশিত চায়ের প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে যার আগমন ঘটলো তার দিকে যদুর প্রথম দৃষ্টি সংকোচমিশ্রিত হলেও সুখকর। এতক্ষনে সে কিছুটা আঁচ করতে পারছে, কেনো তার মা হঠাৎ বান্ধবীর জন্য পাগল হয়ে উঠেছেন। মায়ের অতি আদরে রিনা এখন নিজেই সংকুচিত, দু’একবার যদুর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে সেও। অবশেষে ব্যপারটা যখন দু’জনের কাছেই পরিষ্কার তখন যাবার বেলা। তাড়াতাড়িই আবার আসবে বলে উঠে দাড়িয়েছে এলাচি বেগম। যদুকে তাড়া দিয়ে বললো- কিছুক্ষনের মধ্যেই মাগরীবের আজান দিয়ে দেবে, ওঠ।
আজ আর যদুকে চায়ের দোকানে দেখা যাচ্ছে না। সকাল থেকে বিভিন্ন ছুতায় মায়ের আশপাশে ঘুরঘুর করছে। এলাচি বেগমও সমানে হুকুম করেই যাচ্ছেন। লবনটা দে, তেলটা এগিয়ে দে, তোর বাবাকে বল বাজার করতে হবে না আজ ইত্যাদি।
–    মেয়েটাকে কেমন দেখলি?
–    খারাপ না।
এলাচি বেগম হেসে ফেললো- এবার মনে হয় তোর বাবার কাছ থেকে কিছু শিক্ষা নেওয়া উচিত।
–    মানে?
–    কিছু না করলে তোর হাতে মেয়ে দেবে কে?
–    ও।
বেশ কিছুদিন যাবৎ চায়ের দোকানে বাকি জমেছে, এর মধ্যে যদুর দেখা মেলেনি। কেউ কেউ বলছে, যদু মনে হয় লাইনে আসলো এবার। আবার কারো কাছে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ছাড়া আর কিছুই নয়।


দৈনিক সংগ্রাম, ঢাকা, শুক্রবার 26 August 2016 ১১ ভাদ্র ১৪২৩, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৭ হিজরী  

কবুতরের গল্প / সাইফ আলি

গতবার যখন এসেছিলাম তখনও পায়রাদুটো ছিলো। তবে বাসা ছিলো না। কার্নিশের এক পাশে দেয়ালে অর্ধেকটা ইট না থাকায় সেখানে বাসা বেঁধেছিলো পায়রাদুটো। বেশিরভাগ সময় কার্নিশে ঘুরাঘুরি করতো, ডাকতো আর খুনশুটিতে মেতে থাকতো। কিন্তু যখন ডিম পাড়লো তখন সবসময় একটাকে দেখতাম ডিমে তা দিতে আর একটা বেরিয়ে পড়তো। আর এবার বাড়িতে এসে দেখলাম দুটো বাচ্চা হয়েছে এবং বাচ্চা দুটো কিছুদিনের ভেতরেই ওড়া শিখে যাবে। কার্নিশের উপর এবার একটা নতুন ঘরও চোখে পড়লো, দুটো ডিম নিয়ে তাতে বসে আছে সেই পুরোনো কবুতর।

দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ যাচ্ছে আজকাল। গুলশানে কুটনৈতিক পাড়ায় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে বিদেশি নাগরিকদের। জঙ্গীরা নিহত হয়েছে সবাই। উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়ে ওরা, দেশের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র; এলিট সোসাইটিতে বসবাস ওদের। হঠাৎ করে ওরা এমন নরপশুতে পরিণত হলো কি করে তা ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছেন না বুদ্ধিজীবী মহল। তাদের একটাই কথা, এদের বেশির ভাগই ইংলিশ মিডিমায়ামে লেখাপড়া করেছে। ধর্মের নাম-গন্ধও যে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নেই সেই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এসকল ধনির দুলালেরা কিসের নেশায় এরকম আত্মঘাতি হয়ে উঠেছে। অথচ কিছুদিন আগেও এদের মধ্যে অনেকেই বন্ধুদের সাথে পার্টিতে গেছে, দেশবরেন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সাথে মিশেছে, কেউ কেউ গিটার বাজিয়ে পার্টি মাতিয়েছে। হঠাৎ তারা কিসের নেশায় আকুল হলো!!? প্রশ্নটা প্রশ্নই থেকে গেছে, ধুয়া উঠেছে চায়ের টেবিলে, মিডিয়াতে জমেছে টকশো। সে যায় হোক, আমাদের ছোট মাথায় এতো বড় ব্যপার ঢোকে না । আমরা শুধু এটুকুই বুঝি- কোনো যন্ত্রের কার্যবীধি সমর্কে যারা জানে আর যারা জানে না তাদের মধ্যে পার্থক্য হলো যারা জানে তারা ভুল করে কম আর যারা জানে না তারা হর-হামেশাই ভুল করে বসে।

ও হ্যা, কথা হচ্ছিলো আমার পাশের বাসার কার্নিশের কবুতর নিয়ে। এই একটা সমস্যা আজকাল যাই নিযেই কথা বলতে যাই না কোনো ঐ এক ভুত সবজায়গা দখল করে আছে। দেশ যে কবে এর থেকে মুক্তি পাবে জানি না। আর পাবেই বা কি করে? আমার একটা বন্ধুর গল্প করি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে ছেলেটা, দাড়ি রেখেছে তা প্রায় দু’বছর হতে চললো। আর কোথাও দেখা হোক বা না হোক মসজিদে গেলে তাকে পাওয়া যাবে এমনটাই জানতাম। হঠাৎ তার সাথে দেখা, মুখে দাড়ি নেই- মাথায় টুপি নেই; আমিতো অবাক। বললাম- বন্ধু কারণ কি?? বন্ধু আমার উত্তরে বললো বাবা-মা থেকে শুরু করে সমাজের মুরুব্বিদের একটাই কথা- বাবা দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। এখন ওসব না রাখলে হয়না? সবার কথা শুনতে গিয়ে শেষমেশ ওর আসল রূপটাই হারিয়েছে বেচারা।

আবারোও সেই একই কান্ড, যা বলতে যাচ্ছি তা বলা হচ্ছে না। কবুতরের গল্প করছিলাম আমি। কার্নিশে আজ আর কবুতর নেই। সকালে দেখলাম খালি। বাচ্চাগুলো ওড়া শিখে গেছে হয়তো কিন্তু তাদের বাসা পরিবর্তনের কারণ নিশ্চয় অন্য কিছু, ডিম নিয়ে বসে থাকা কবুতরটাও নেই হয়তো ডিমদুটো কাকে খেয়েছে; আর সেই শোকে কবুতর গুলো ঘর ছেড়েছে। কার্নিশে পড়ে আছে শূন্য বাসাটা।

খুন / সাইফ আলি

বালিসের পাশ থেকে মোবাইলটা নিয়ে সময় দেখলো সাইরা- রাত এখন আড়াইটা বাজে। শেয়াল আর কুকুরের শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে। বহুদিন পর আজ একটু শান্তি করে ঘুমোতে চেয়েছিলো, তা আর হলো না। বাইরে কয়েকটা শেয়াল কিছু একটা কাড়াকাড়ি করছে আর পাড়ার নেড়ী কুত্তাটা দূরে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করছে। কাছে ঘেঁসতে সাহসে কুলোচ্ছে না ওর। জানালাটা খোলা ছিলো তাই শব্দটা বেশি আসছে। বিছানা থেকে উঠে জানালা আটকাতে গেলো সাইরা। হঠাৎ কি মনে হতে, টর্চটা হাতে নিলো- কি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে?

বাইরে টর্চের আলো ফেলতেই ডাকাডাকি থামিয়ে দিয়েছে শেয়ালগুলো শুধু দূরে দাঁড়িয়ে কুকুরটা ডেকেই চলেছে। শেয়ালগুলো পিছিয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঢেুকে যাচ্ছে , শুধু একটা শেয়াল হতভম্বের মতো টর্চের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো টর্চের আলোর কারণে চোখে দেখছে না। মুখে কিছু একটা ঝুলছে যেনো। ভালো করে লক্ষ্য করলো ছাইরা। আঙ্গুলগুলো অপরিণত। একটা মানব শিশুর হাত!! হাত থেকে টর্চ পড়ে গেলো, কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লো সাইরা। মনে হলো আজ যাকে সে নিজের দেহ থেকে আলাদা করেছিলো তাকে নিয়েই যেনো শেয়ালের হাঙ্গামা শুরু হয়েছে। ডুকরে কেঁদে উঠলো সাইরা। অ্যাবর্শনের পর থেকে এ পর্যন্ত যা কাঁটার মতো বিঁধেছে এখন তা ছুরি হয়ে গলায় বসতে চাচ্ছে।

তনু ওকে বলেছে যে মাস দুয়েকের মধ্যেই বিয়েটা সেরে ফেলবে। বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে ও। চেহারা সুরতে খুবই স্মার্ট। এমন একটা ছেলেকে ও সবসময়ই চেয়েছে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে। ভার্সিটিতে পরিচয়। অন্য ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই ছিলো তনু। ওরই এক বান্ধবীর মাধ্যমে প্রেমের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো। প্রথমে না করতে হয় তাই করেছিলো কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই জমে ওঠে প্রেম। ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে শেষমেশ আজকের পরিণতির জন্যে এককভাবে কেউই দায়ী না। কিভবে কি হয়ে গেলো কিছু বুঝে উঠতে পারছিলো না ওরা। এ অবস্থায় কাউকেই ব্যপারটা জানানো যাচ্ছিলো না। আবার সমস্যা দিন দিন স্পষ্ট হয় উঠছিলো।
শেষ কাজটা করার আগে অনেকবার নিজেকে প্রশ্ন করেছে সাইরা। ‘তুমি কি তোমার সন্তানকে হত্যা করবে??’ মন মানতে চায়নি কখনো, কিন্তু উপায় কি?? ওর ভালোর জন্যই ওকে পৃথিবীর আলো দেখানো যাবে না। মানুষ ওকে দেখে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে, অবৈধ বলবে তা হতে দেবে কেনো সাইরা। মা হয়ে এসব ওর সহ্য হবে না। কিন্তু একটু আগে ও যা দেখলো তার কি হবে…?? আঙ্গুলগুলো অপরিণত হলেওতো ওগুলো ওর সন্তানেরই আঙ্গুল। ঐ আঙ্গুলগুলো হাতের মুঠোই করে পরিণত করে তোলাই তো ওর মাতৃত্বের দাবি ছিলো। কিন্তু আজ অপারেশন থিয়েটারে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে তাকে। তনু ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। অপারেশনের সব ব্যায় ওই বহন করেছে। সবসময় ওকে সাপোর্ট দিয়েছে কিন্তু তারপরও ও মানতে পারছে না। জীবনকে ওরা অন্যভাবে সাজাবে ভেবেছিলো। জেনে বুঝে, একে অপরকে পরিপূর্ণরূপে চিনে তারপর। কিন্তুু এরই মাঝে যে তাদের দুজনের সাক্ষ্য রক্ত মাংশে প্রকাশিত হতে চাবে সেটা তারা ভাবেনি কখনো। এই সাক্ষ্যকে লুকোতেই এতো কিছু। নিজেকে খুনি ছাড়া আর কিইবা ভাবতে পারবে এখন। যেই মা তার গর্ভের সন্তানকে খুন করেছে…!!! এর চেয়ে নিষ্ঠুর খুনি আর পৃথিবীতে আছে কি??

শেয়ালের ডাকাডাকি থেমে গেছে। ফিরে গেছে নেড়ীটাও। তনু হয়তো ঘুমোচ্ছে এখন। সাইরার চোখে ঘুম নেই…

“এভাবেই নয় শুধু, কখনো ছেলে সন্তানের প্রত্যাশায়, কখনো নিজেকে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে আবার কখনো নির্লজ্জ লালশার বসে আমরা হয়ে যাই নিকৃষ্ট খুনি।”

না, করিমের বাড়িতে … / সাইফ আলি

আনন্দগড়ের ছোট রেলওয়ে স্টেশন । বিদ্যুৎ পৌছায়নি এখনো । হারিকেনের মৃদূ আলোতে অন্ধকার কিছুটা ফিকে হলেও কেমন যেন চোখে ধাঁধাঁ লাগে । আজ অমাবশ্যা, গাঢ় অন্ধকারে চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে আছে । হারিকেনের আলো যতটুকু ছড়াচ্ছে দৃষ্টির সীমা ঠিক ততটুকুই । এই মৃদূ আলোর জন্যই হয়তো বাইরের দিকটা একটু বেশি অন্ধকার দেখাচ্ছে ।
স্টেশন মাস্টারের রুমের দরজাতে নড়বড়ে এক তালা ঝুলছে । দেখেই বোঝা যায় ভেতরে দামী অথবা গোপনীয় কিছু নেই । আর তা না হলে এলাকার মানুষ একটু বেশিই সৎ বলে মনে করতে হবে । যাই হোক, সামনে একটা বেঞ্চ পাতা আছে । আর একপাশে একটা হারিকেন মুমূর্ষু রোগীর মত জ্বলছে ।
স্টেশনের দু’তিন মাইলের মধ্যে তেমন কোন লোকালয় নেই । নতুন কিছু বসতি গড়ে ওঠা শুরু হয়েছে কেবল । সপ্তাহে একটা মাত্র ট্রেন এখানে থামে । আর এদিন লোকের ভীড় একটু বেশিই হয় । এলাকাটা তখনই কেবল গম গম করে । অস্থায়ী কিছু চা-বিড়ির দোকানও বসে এসময় । আজও যথা সময়ে সবাই হাজির হয়েছিল । তবে ট্রেন সময়মত না আসার কারণে সবই ভেস্তে গেছে ।
কি একটা সমস্যার করণে আজকের ট্রেনটা সময় মত আসতে পারেনি । দুপুরের ট্রেন এসেছে রাত দুটোয় । বাইরে থেকে আসা যাত্রীও আজ নেই বললেই চলে কারণ অনেকের ক্ষেত্রে একজনকে উপেক্ষা করা দোষের কিছু নয় । অন্তত এই গনতান্ত্রিক দেশে । যাই হোক, আজ একজনই ট্রেনে চেপে এসেছে । বাড়ি তার এখান থেকে পাঁচ কি ছ’ কিলো ভিতরে । পথ ভালো থাকলে হয়তো এটাও চিন্তার ব্যাপার নয় । কিন্তু বাড়ি যাবার পথে তাকে একটা নদীও পার হতে হবে যা এত রাতে বিনা নৌকায় অসম্ভব; অন্তত মাসুদের জন্য তাই । ট্রেন আসতে দেরি হওয়ায় এবং সঙ্গী হিসেবে কাউকে না পাওয়ায় বাড়ি যাওয়ার চিন্তাটা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয়েছে ।
কিছুটা হতাশায় এবং কিছুটা ঘুমের ঝুলে বড় একটা হাই তুলে পেতে রাখা বেঞ্চটার দিকে এগুলো মাসুদ ।
‘এটাতে বসেই রাত কাটাতে হবে । ’ মনে মনে ভাবল সে । জমে ওঠা ¬ ধূলোর আস্তরণ ঝেড়ে ফেলে তাতে আরাম করে চেপে বসল । আশার বিষয়, কালি ধরা হারিকেনটা টিপ টিপ করে জ্বলছে তখনও । মাসুদ উঠে গিয়ে হারিকেনের জোরটা বাড়িয়ে দিল । তারপর অসংখ্য তারাভরা আকাশটাই তার এ যাত্রার সঙ্গী । এভাবে কতক্ষণ অতিবাহিত হয়েছে তা বোঝার উপায় ছিল না ।
– এত রাতে এখানে বসে কি করেন?
প্রশ্নকর্তার কণ্ঠ অপরিচিত ।
– ঘুমাই
ঘোরের মধ্যে উত্তর দিল মাসুদ ।
– ট্রেন আসতে দেরি হয়েছে বুঝি? বাড়ি কি ভেতরের দিকে?
এত রাতে অপরিচিত একটা লোকের এতগুলো প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত ছিল না মাসুদ । লোকটা কেমন তাও যখন তার অজানা তখন কি করে তার কাছে সব কথা বলা যায় ভেবে পাচ্ছে না সে । যে যুগ যামানা পড়েছে তাতে মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে কেউ ক্ষতি ছাড়া ভালো করতে চায় না । অন্য কোন সময় হয়তো লোকটাকে এড়িয়ে যেত মাসুদ । তার উপর গ্রামের অশিক্ষীত লোকদের উপর কিছুটা আস্থা আছে । বলল-
হ্যা, বাড়ি ভিতরের দিকেই । ট্রেনটা আসতে দেরি করল আর সাথেও কেউ ছিল না তাই…..
– বুঝেছি, মাসুদের কথার মাঝখানেই বলে উঠল লোকটা । ‘তা বাড়ি কতদূর ভাইজানের ?’
– সোনাখালের ওপারে, মিয়া বাড়ি ।
– চিনছি, সে তো মেলা পথ । এসময় তো যাওয়াও সম্ভব না ।
– সে জন্যই তো এখানে বসে রাতটা কাটিয়ে দেব ঠিক করেছি ।
– এভাবে কি রাত কাটানো যায়, চলেন; আমার সাথে চলেন ।
– কোথায়?
– আমার বাড়িতে । বেশি দূর না এইতো সামনেই ।
এমন একটা সময়ে অপরিচিত কারো এমন প্রস্তাব গ্রহণ করার মত লোক মাসুদ না, কিন্তু কি কারণে যেন লোকটার কোন কথাই ফেলা সম্ভব হচ্ছে না । ফলে আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ল মাসুদ । কিন্তু মনের ভেতর জাগতে লাগল নানা রকম প্রশ্ন ।
হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হল লোকটা? কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে কিনা কে জানে, ইত্যাদি ।
‘আমি স্টেশন দেখাশুনা করি, নাম করিম মিয়া । ’ মাসুদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটানোর জন্যই যেন পরিচয় দিল সে । পিছু পিছু হাটছে মাসুদ । বিস্ময়ের ব্যপার হল লোকটার চেহারা দেখা যাচ্ছেনা । গামছা দিয়ে মুখটা এমন ভাবে ঢাকা যে, ভালো করে দেখার উপায়ও নেই । হারিকেনের আলোর তেজও ছিল কম ফলে আশে-পাশে কোন কিছুই ঠিকমত দেখা যাচ্ছিল না । বেশ কিছু দূর আসার পর একটা কুঁড়ের অবয়ব স্পষ্ট হল । একটাই ঘর ।
– আপনার পরিবার…?
– ‘কেউ নেই । ’ মাসুদের প্রশ্ন শেষ না হতেই বলে উঠল করিম মিয়া । ‘আপনি বসেন আমি আসছি । দেয়াশলাই আর প্রদীপটা বেড়ার পাশেই আছে । ’
মাসুদের কথা বলার সময় না দিয়েই বেরিয়ে গেল করিম । মাসুদ এতে অনেকটাই বিরক্ত হল । কাউকে মেহমান করে ডেকে এনে আলো পর্যন্ত না ধরিয়ে কেউ যে এভাবে চলে যেতে পারে? কি আর করা বিপদে পড়লে অনেক কিছুই সহ্য করতে হয় । হাতড়ে-হাতড়ে প্রদ্বীপ আর দেয়াশলাই বের করে আগুন জ্বালল মাসুদ । তেল খুবই অল্প, তলানির মত জমে আছে । সারা গা ধুলোয় ভরা । বহুদিন যাবৎ পরিত্যক্ত থাকলে যেমনটি হয় । ঘরের মধ্যে আসবাব বলতে একটা পানির কলস কাত হয়ে পড়ে আছে, বেড়ায় এক গোছা পাটের দড়ি আর কিছু ভাঙা পাতিল । বহুকাল ধরে এখানে কেউ থাকে না বলেই মনে হয় ।
‘আপনি কি এখাইে থাকেন?’ পশ্ন করার পর মনে পড়ে সে এখানে নেই । মনে মনে চিন্তিত হয়ে পড়ে মাসুদ । এই নির্জনে একা কাউকে রেখে কেউ যে উধাও হতে পারে তা ওর জানা ছিল না । যেখানেই যাক ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই ।
রাত পার হয়ে যাচ্ছে অথচ লোকটার কোন খোঁজ নেই । বসে থেকে কতক্ষণ কাটানো যায় । মনে মনে ভীষন বিরক্ত হয় মাসুদ ।
গরমের বেলা, পাঁচটা বাজতেই অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে কিন্তু করিম আর আসে না । ‘কি জানি লোকটার কি হল, কিন্তু আর যে থাকা চলে না, এবার বাড়ির পথ ধরতে হবে । ’ উঠে দাড়ায় মাসুদ । পথটা মনে আছে ফলে বের হয়ে আসতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তার । বড় রাস্তায় উঠতেই গাঁয়ের এক পরিচিত লোকের সাথে দেখা । লোকটা অবাক চোখে মাসুদকেই দেখছে । মাসুদদের প্রতিবেশি, কিন্তু ওভাবে তাকিয়ে কেন লোকটা?
– আমাকে চিনতে পারেননি চাচা? আমি মাসুদ ।
– চিনেছি, তা এদিকে কোথা থেকে এলে?
– করিম মিয়ার ওখানে রাত্রে ছিলাম ।
এবার তো লোকটা একেবারে হা হয়ে গেল ।
– বল কি বাপু! করিমের ওখানে ছিলে? সে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল?
– হ্যা, কিন্তু আমাকে রেখে লোকটা যে তখুনি কোথায় উধাও হয়ে গেল বলতে পারব না ।
– উধাও হয়ে গেল? কিন্তু করিম তো প্রায় বছর খানেক আগে রেলের চাকায় কাটা পড়েছিল । আগে ও ই স্টেশন দেখাশুনা করতো এখন আমি করি ।
মাসুদ শিউরে উঠল । তবে সে কার সাথে ওখানে গেল? কার সাথে কথা বলল? কার বাড়িতে রাত কাটাল?
মাসুদ ভুতে বিশ্বাস করে না । কিন্তু এ সব কি করে ঘটতে পারে? তবে কি সত্যই…… কিন্তু তাই বা কি করে সম্ভব? একটা মানুষ এক বছর আগে মারা যাওয়ার পর সে কি করে…… নাহ, কিছুই ভাবতে পারছে না মাসুদ ।

এমন সময় পাশ থেকে কে যেন বলল ‘কি ব্যাপার, ভাইজান কি সারা রাত এইখানেই ছিলেন?’
ধড়ফর করে ওঠে মাসুদ । ঘোর কাটতেই দেখল- সে স্টেশনের সেই নড়বড়ে বেঞ্চে বসে আছে । হারিকেনটা তখনো মিটমিট করে জ্বলছে । সকাল হয়ে গেছে । সারা শরীর ঘামে ভেজা । সামনে প্রশ্নকর্তা উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে । মাসুদ বলল-
না, করিমের বাড়িতে ।