প্রচ্ছদ: এহইয়াউস সুনান

cover_eihaus-sunan

Advertisements

প্রথম অধ্যায়: বাইবেল পরিচিতি (৫ম পর্ব)

১. ৫. বাইবেলের বাংলা অনুবাদের সমস্যা

সুপ্রিয় পাঠক, নাম সমস্যার চেয়েও কঠিন অনুবাদ সমস্যা। বাইবেলের একই পুস্তকের অনুবাদে বিভিন্ন বাংলা বাইবেলের মধ্যে তথ্যের ব্যাপক ভিন্নতা লক্ষণীয়। ইংরেজি পাঠের সাথে তুলনা করলে অনেক অনুবাদই বিকৃত বা পরিবর্তিত বলে দেখা যায়।

১. ৫. ১. হিব্রু, গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষা বনাম ইংরেজি ভাষা

বাইবেলের মূল ভাষা হিব্রু ও গ্রিক। এ ভাষাদ্বয়ে রচিত বাইবেল সহজপ্রাপ্য নয় এবং ভাষা দুটোও অত্যন্ত কঠিন। মধ্যযুগে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় গ্রিকভাষা থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত বাইবেলের উপরেই নির্ভর করত। ল্যাটিন ভাষা কারো মাতৃভাষা ছিল না। শুধু ধর্মগুরুরা এ ভাষা চর্চা করতেন। ফলে বাইবেল সম্পর্কে খ্রিষ্টান জনগণ কিছুই জানত না। ধর্মগুরুরা জনগণের ভাষায় বাইবেল অনুবাদের ঘোর বিরোধিতা করতেন। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকের শেষদিকে প্রসিদ্ধ ধর্মগুরু ‘John Wycliffe’- জন উইকলিফ (১৩৩০-১৩৮৮) সর্বপ্রথম বাইবেলকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন। এ অপরাধে খ্রিষ্টান চার্চের পক্ষ থেকে তাঁকে এবং তাঁর অনূদিত বাইবেলের পাঠকদেরকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার শাস্তি প্রদান করা হয়। উইকলিফের মৃত্যু হওয়ার কারণে চার্চের নির্দেশে তাঁর মৃতদেহ কবর থেকে তুলে আগুনে পুড়িয়ে ছাইগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
ক্যাথলিক চার্চ ও পোপ সাধারণের মধ্যে প্রচলিত কোনো ভাষায় বাইবেল অনুবাদের ঘোর বিরোধিতা করলেও খ্রিষ্টীয় ১৬শ শতকে প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মমত জোরালো হয় এবং তারা মাতৃভাষায় বাইবেল অনুবাদের পক্ষে ছিলেন। ইংল্যান্ডের প্রটেস্ট্যাস্ট রাজা জেমস ইংরেজিতে বাইবেল অনুবাদের জন্য খ্রিষ্টান ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে একটা কমিটি গঠন করেন। তাদের অনূদিত ও সম্পদিত বাইবেলটা ‘কিং জেমস বাইবেল’ বা কিং জেমস ভার্শন নামে প্রসিদ্ধ। ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে তা প্রকাশিত হয়।
এটা ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় ৪ শত বছর ‘অথোরাইজড ভার্শন’ অর্থাৎ অনুমোদিত, স্বীকৃত বা নির্ভরযোগ্য সংস্করণ বলে গৃহীত। আমেরিকার খ্রিষ্টীয় চার্চ সম্মেলনী (the Division of Christian Education of the National Council of the Churches of Christ in the USA) ১৯৫২-১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপিগুলোর উপর নির্ভর করে রিভাইজড স্টান্ডার্ড ভার্শন (The Revised Standard Version: RSV) প্রকাশ করে। এরপর এ সংস্করণের উপর নির্ভর করে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে নিউ রিভাইজড স্টান্ডার্ড ভার্শন (the New Revised Standard Version: NRSV) এবং ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে ইংলিশ স্টান্ডার্ড ভার্শন (the English Standard Version: ESV) প্রকাশ করা হয়। ইহুদি ও খ্রিষ্টান বাইবেল গবেষকরা এ ভার্শনগুলোকে নির্ভরযোগ্য ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপি নির্ভর বলে উল্লেখ করেছেন।
ইংরেজি অনুবাদ কতটুকু মূলাশ্রয়ী আমরা তা জানি না। ইংরেজি অনুবাদ বিষয়ক আপত্তি ও পর্যালোচনা সম্পর্কিত কিছু তথ্যের জন্য পাঠক নিম্নের ওয়েবসাইটটা দেখতে পারেন: http://www.rejectionofpascalswager.net/versions.html। তবে আমরা যেহেতু মূল হিব্রু বা গ্রিক ভাষা জানি না সেহেতু আমরা এ সকল ইংরেজি ভার্শনকেই মূল হিসেবে গণ্য করছি। আমরা দেখব যে, বাইবেলের হাজার হাজার পাণ্ডুলিপির একটার সাথে আরেকটার মিল নেই। বিশেষত নতুন নিয়মের একটা শ্লোকও দুটো পাণ্ডুলিপিতে অবিকল একরকম নয়। প্রতিটা শ্লোকেই পাণ্ডুলিপিগত বৈপরীত্য বিদ্যমান। আমরা আশা করি এ সমস্যার মধ্য থেকেই এ সকল স্বীকৃত ইংরেজি ভার্শনে মূল পাঠ যথাসম্ভব সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

১. ৫. ২. ইংরেজি অনুবাদের সমস্যা

১. ৫. ২. ১. ঈশ্বরগণ বনাম ঈশ্বর

ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় অনুবাদের পরিমার্জন, পরিবর্তন বা কারচুপির একটা নমুনা উল্লেখ করা যায়। পবিত্র বাইবেলের প্রথম বাক্য “In the beginning God created the heaven and the earth”। কেরি: “আদিতে ঈশ্বর আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি করিলেন।” জুবিলী: “আদিতে যখন পরমেশ্বর আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকাজ শুরু করলেন।” বা-২০০০ ও মো.-০৬: “সৃষ্টির শুরুতেই ঈশ্বর/ আল্লাহ মহাকাশ ও পৃথিবী/ আসমান ও জমীন সৃষ্টি করলেন।” (আদিপুস্তক/ পয়দাশে ১/১)
এখানে ইংরেজি ‘গড’ শব্দকে বাংলায় ঈশ্বর, পরমেশ্বর ও আল্লাহ বলা হয়েছে। মূল হিব্রুতে শব্দটা ‘এলোহিম’ (Elohim)। এলোহিম শব্দটা বহুবচন, এর অর্থ ঈশ্বরগণ। এর একবচন: ‘এল’ (ঊষ), যার অর্থ ঈশ্বর। একজনকে বোঝাতে বহুবচনের সর্বনামের ব্যবহার বিভিন্ন ভাষায় দেখা যায়। যেমন রাষ্ট্রপতির ঘোষণায় তিনি বলেন ‘আমরা, প্রেসিডেন্ট…’। অনেক সময় লেখক নিজের বক্তব্য বা মত বুঝাতে ‘আমি’ না বলে ‘আমরা’ বলেন। এভাবে যে কোনো ভাষায় ব্যক্তি নিজেকে বুঝাতে অনেক সময়ই বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহার করে। তবে এক ব্যক্তিকে বুঝাতে নিজ নাম (proper noun) বা সাধারণ বিশেষ্য (common noun)-এর বহুবচন ব্যবহার কোনো ভাষাতেই পাওয়া যায় না। এখানে মূল অনুবাদ হওয়া দরকার ছিল: আদিতে ঈশ্বরগণ, পরমেশ্বরগণ….!
ইহুদি-খ্রিষ্টান পণ্ডিতরা বিভিন্নভাবে এর ব্যাখ্যা করেন। কেউ বলেন, সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা বুঝাতে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো খ্রিষ্টান প্রচারক দাবি করেন, ঈশ্বরের ত্রিত্ব বা ত্রিত্ববাদ বুঝাতে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। বিরুদ্ধবাদীরা দাবি করেন যে, বহুবচন কখনোই ‘তিন’ বুঝায় না; বরং তেত্রিশ কোটিও বুঝাতে পারে। কাজেই বহুবচন দ্বারা তিন দাবি করা একেবারেই ভিত্তিহীন। এছাড়া ‘ত্রিত্ববাদে’ ঈশ্বর বহুজন বা তিনজন নন; বরং একজন। তাঁকে Gods, ঈশ্বরগণ, পরমেশ্বরগণ ইত্যাদি বলা যায় না। ঈশ্বর একাধিক বলে ধারণা করা খ্রিষ্টধর্মে কুফরী বলে গণ্য। কাজেই বাইবেলের এ ব্যবহার দ্বারা ত্রিত্ববাদ প্রমাণ করা যায় না; বরং ত্রিত্ববাদ খণ্ডন করা যায় এবং বহু-ঈশ্বরবাদ প্রমাণ করা যায়। সর্বাবস্থায় এক্ষেত্রে অনুবাদের সঙ্গতিপূর্ণ (Consistent) হবার দাবি ছিল, অনুবাদেও বহুবচন ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় ব্যাখা বা টীকা লেখা।

১. ৫. ২. ২. বাইবেলে থেকে Hell (নরক) চিরবিদায় নিচ্ছে!

আমরা দেখেছি যে, কিং জেমস ভার্শনটা অথোরাইজড বা ‘অনুমোদিত’ সংস্করণ বলে গণ্য। বর্তমানে ইংরেজিতে আরো অনেক অনুবাদ বিদ্যমান। এ সকল অনুবাদে অনেক পরিবর্তনও করা হচ্ছে। একটা নমুনা ‘হেল’ (Hell) অর্থাৎ নরক, দোজখ বা জাহান্নাম। কিং জেমস বাইবেলের মধ্যে এ শব্দটা ৫৪ স্থানে বিদ্যমান। এর বিপরীতে আধুনিক অনেক ইংরেজি বাইবেলে শব্দটা একবারও উল্লেখ করা হয়নি। এ থেকে জানা যায় যে, কোনো অনুবাদই ঈশ্বরের মূল কথাটা পাঠককে প্রদান করছে না। বরং অনুবাদক বা সম্পাদকের নিজস্ব মতের আলোকেই ঈশ্বরের কথা সাজানো হচ্ছে। Tentmaker নামক যাজক সম্প্রদায়ের ওয়েবসাইটে গ্যারি অ্যামিরল্ট (Gary Amirault) বিভিন্ন অনুদিত বাইবেলের মধ্যে নরক শব্দের উপস্থিতির নিম্নরূপ একটা তালিকা উল্লেখ করছেন [19]:

Number of times “Hell” appears in the text in English Bible Translations
Bible Translations Old Test New Test Total
“Authorized” King James Version 31 23 54
New King James Version 19 13 32
American Standard Version 0 13 13
New American Standard Bible 0 13 13
Revised Standard Version 0 12 12
New Revised Standard Version 0 12 12
Revised English Bible 0 13 13
New Living Translation 0 13 13
Amplified 0 13 13
New International Version 0 14 14
Darby 0 12 12
New Century Version 0 12 12
Wesley’s New Testament (1755) 0 0
Scarlett’s N.T. (1798) 0 0
The New Testament in Greek and English (Kneeland, 1823) 0 0
Young’s Literal Translation (1891) 0 0 0
Twentieth Century New Testament (1900) 0 0
Rotherham’s Emphasized Bible (reprinted, 1902) 0 0 0
Fenton’s Holy Bible in Modern English (1903) 0 0 0
Weymouth’s New Testament in Modern Speech (1903) 0 0
Jewish Publication Society Bible Old Testament (1917) 0 0
Panin’s Numeric English New Testament (1914) 0 0
The People’s New Covenant (Overbury, 1925) 0 0
Hanson’s New Covenant (1884) 0 0
Western N.T. (1926) 0 0
NT of our Lord and Savior Anointed (Tomanek, 1958) 0 0
Concordant Literal NT (1983) 0 0
The N.T., A Translation (Clementson, 1938) 0 0
Emphatic Diaglott, Greek/English Interlinear (Wilson, 1942) 0 0
New American Bible (1970) 0 0 0
Restoration of Original Sacred Name Bible (1976) 0 0 0
Tanakh, The Holy Scriptures, Old Testament (1985) 0 0
The New Testament, A New Translation (Greber, 1980) 0 0
Christian Bible (1991) 0 0 0
World English Bible (in progress) 0 0 0
Orthodox Jewish Brit Chadasha [NT Only] 0 0
Zondervan Parallel N.T. in Greek and English (1975) 0 0
Int. NASB-NIV Parallel N.T. in Greek and English (1993) 0 0

১. ৫. ৩. বাংলা ভাষায় বাইবেল ও অনুবাদের হেরফের

পলাশির যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিজয়ের পরে ইংল্যান্ডের প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানরা বাংলায় খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের জন্য মিশনারি প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। প্রসিদ্ধ ব্যাপটিস্ট খ্রিষ্টান মিশনারি William Carey: উইলিয়াম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪) সর্বপ্রথম ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাভাষায় পূর্ণ বাইবেলের অনুবাদ প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে ভারতে ও বাংলাদেশে বাংলা বাইবেলের বিভিন্ন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
কাফিরদের-অর্থাৎ খ্রিষ্টধর্ম ছাড়া অন্য সকল ধর্মের মানুষদের- খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরের চেতনা থেকেই বাংলা ও অন্যান্য ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করা হয়। উইলিয়াম কেরি এ প্রসঙ্গে একটা পুস্তক রচনা করেন। পুস্তকটার নাম: (An Enquiry into the Obligations of Christians to Use Means for the Conversion of the Heathens) ‘কাফিরদের ধর্মান্তর করার জন্য উপকরণাদির ব্যবহার বিষয়ে খ্রিষ্টানদের দায়বদ্ধতা-বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে এক অনুসন্ধান।”[1]

ধর্মান্তরের এ উদ্দেশ্যের কারণেই সম্ভবত এ সকল অনুবাদে আমরা বিভিন্ন প্রকারের অস্পষ্টতা, পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন দেখতে পাই। এখানে সামান্য কয়েকটা উদাহরণ পেশ করছি:

১. ৫. ৪. worship অনুবাদের হেরফের

বাইবেলের বাংলা অনুবাদের বিকৃতির একটা দিক হচ্ছে বিভিন্ন শব্দের অনুবাদে হেরফের করা। এখানে ইংরেজি ওয়র্শিপ (worship) ও ওয়াইন (wine) শব্দ দুটোর অনুবাদে বাংলা বাইবেলে, বিশেষত বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি কর্তৃক ২০০৬ সালে প্রকাশিত ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ নামক বাইবেলের বিকৃতি আলোচনা করব।

১. ৫. ৪. ১. worship শব্দটার আভিধানিক অর্থ

গুগলের অনলাইন অভিধানসহ যে কোনো অভিধানে পাঠক দেখবেন যে, worship শব্দটার অর্থ পূজা, উপাসনা, ভজনা, বন্দনা, অর্চনা, আরাধনা ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় ‘ইবাদত’ শব্দটাকে ইংরেজিতে ‘ওয়র্শিপ’ বলা হয়। শব্দটার মূল অর্থ ঈশ্বর বা দেবতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। কোনো বিশ্বাসী ব্যক্তি যার মধ্যে ‘দেবত্ব’ বিদ্যমান বলে বিশ্বাস করেন তার প্রতি যে বিশেষ ভক্তি নিবেদন করেন সেই বিশেষ ভক্তি বা ভক্তির প্রকাশকে ‘ওয়র্শিপ ’ বা ‘ইবাদত’ বলা হয়।

১. ৫. ৪. ২. worship শব্দটার বাইবেলীয় অর্থ সাজদা করা

বাইবেলের ব্যবহার থেকে প্রতীয়মান যে, ওয়র্শিপ বলতে ‘সাজদা’ করা বুঝানো হয়েছে। আরবি বাইবেলে ‘ওয়র্শিপ ’ শব্দটার প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সাজদা’ লেখা হয়েছে এবং ‘সার্ভ’ (serve) শব্দটার প্রতিশব্দ ‘ইবাদত’ বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে মূল হিব্রু শব্দটা আমরা জানতে পারছি না। তবে হিব্রু ও আরবি উভয়ই সেমিটিক ভাষা এবং প্রায় একই শব্দ ও বাক্যরীতি ব্যবহার করে। এতে প্রতীয়মান যে, মূল হিব্রু ভাষার ‘সাজদা’ বা তদর্থক শব্দকেই ইংরেজিতে ‘ ওয়র্শিপ ’ শব্দে অনুবাদ করা হয়েছে। বাংলা কেরির অনুবাদে শব্দটার অর্থ ‘প্রণিপাত’ লেখা হয়েছে। এতেও প্রতীয়মান হয় যে, মূল শব্দটা ‘সাজদা’ বা ‘প্রণিপাত’। এছাড়া বাইবেলে বিভিন্ন স্থানে bow down অর্থাৎ মাথা নোয়ানো বা সাজদা করা এবং ওয়র্শিপ বা ইবাদত করাকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে জানা যায় যে, বাইবেলের পরিভাষায় ওয়র্শিপ অর্থ সাজদা করা।
যাত্রাপুস্তক/হিজরত ২০/৫ শ্লোকে ঈশ্বর ভিন্ন অন্য দেবতা বা প্রতিমার ইবাদত নিষেধ করে ঈশ্বর বলছেন: “Thou shalt not bow down thyself to them, nor serve them”। কেরির অনুবাদ: “তুমি তাহাদের কাছে প্রণিপাত করিও না, এবং তাহাদের সেবা করিও না।” কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “তোমরা তাদের পুজাও করবে না, তাদের সেবাও করবে না।” আরবি বাইবেল: “لا تسجد لهن ولا تعبدهن”, অর্থাৎ “তোমরা তাদের সাজদাও করবে না, তাদের ইবাদতও করবে না।” একই কথা বলেছেন ঈশ্বর দ্বিতীয় বিবরণ ৫/৯ শ্লোকে এবং একই অনুবাদ করা হয়েছে আরবি ও বাংলায়।
আদিপুস্তক/পয়দায়েশ ২৪/২৬: “And the man bowed down his head, and worshiped the LORD”: “লোকটি তার মাথা নোয়াল এবং প্রভুর ইবাদত করল।” কেরির অনুবাদ: “তখন সে ব্যক্তি মস্তক নমন করিয়া সদাপ্রভুর উদ্দেশে প্রণিপাত করিলেন।” কিতাবুল মোকাদ্দস: “তখন সেই গোলাম মাবুদকে সেজদা করে”।
আদিপুস্তক ২৪/৪৮: ‘And I bowed down my head, and worshiped the LORD’: “আমি আমার মাথা নত করলাম এবং সদাপ্রভুর ইবাদত করলাম।” কেরির অনুবাদ: “আর মস্তক নমন করিয়া সদাপ্রভুর উদ্দেশে প্রণিপাত করিলাম।” কিতাবুল মোকাদ্দস: “তারপর আমি মাবুদকে সেজদা করলাম।”
এভাবে আমরা দেখছি যে, ওয়র্শিপ (worship) বা ইবাদত এবং বাউ ডাউন (bow down) উভয় শব্দই আরবিতে সাজদা এবং বাংলায় প্রণিপাত, সাজদা/ সেজদা বা পূজা অনুবাদ করা হয়েছে। বাউ ডাউন (bow down) বা সাজদা করার আরেকটা বাইবেলীয় পরিভাষা (fell on his face) মুখের উপর পড়ে যাওয়া, উবুড় হয়ে পড়া বা মাটির উপর মুখ রাখা এবং (fell on the ground) মাটির উপর পড়ে যাওয়া। (দেখুন: আদিপুস্তক/পয়দায়েশ ১৭/৩; যিহোশূয়/ যোশুয়া ৫/১৪; ১ শমূয়েল ২০/৪১; ২ শমূয়েল ৯/৬; ১ রাজাবলি ১৮/৭; মথি ২৬/৩৯; মার্ক ৯/২০; ১৪/৩৫; লূক ৫/১২)
নতুন নিয়মের দুটো বক্তব্য আরো নিশ্চিত করে যে, বাইবেলে (fell on his face) উবুড় হওয়া ও (worship) ইবাদত করা উভয়ই একই অর্থে ব্যবহৃত। যীশু একজন কুষ্ঠরোগী বা চর্মরোগীকে সুস্থ করেন। মথি ও লূক উভয়েই ঘটনাটা লেখেছেন। মথি বলেন: “And, behold, there came a leper and worshiped him, saying, Lord, if thou wilt, thou canst make me clean”: অর্থাৎ ‘সেই সময় একজন কুষ্ঠরোগী এসে তাকে ইবাদত (সাজদা) করে বলল…’। কিতাবুল মোকাদ্দস: “সেই সময় একজন চর্মরোগী এসে তাঁর সামনে উবুড় হয়ে বলল, হুজুর, আপনি ইচ্ছা করলেই আমাকে ভাল করতে পারেন।” (মথি ৮/২)
এখানে যে কর্মটা বুঝাতে মথি ‘ওয়র্শিপ ’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন, সে কর্মের বর্ণনায় লূক (fell on his face) মুখের উপর পড়া বা সাজদা করা পরিভাষা ব্যবহার করেছেন: “behold a man full of leprosy: who seeing Jesus fell on his face, and besought him, saying, Lord, if thou wilt, thou canst make me clean”: “…কুষ্ঠরোগে পূর্ণ একজন লোক যীশুকে দেখে মুখের উপর পড়ে গেল ও কাকুতি মিনতি করে বলল…।” কিতাবুল মোকাদ্দস: “ঈসাকে দেখে সে উবুড় হয়ে পড়ে কাকুতি-মিনতি করে বলল, ‘হুজুর, আপনি ইচ্ছা করলেই আমাকে ভাল করতে পারেন।” (লূক ৫/১২)
এ থেকে আমরা নিশ্চিত হই যে, বাইবেলের পরিভাষায় উবুড় হওয়া, মাটিতে পড়া, সাজদা করা, প্রণিপাত করা ও ইবাদত করা একই অর্থে ব্যবহৃত।
বাংলা কিতাবুল মোকাদ্দসেও ওয়রশিপ (worship) অর্থ ‘সেজদা’ করা বলা হয়েছে। উপরে আমরা দেখেছি যে, পয়দায়েশ ২৪/২৬ ও ২৪/৪৮ শ্লোকে worship শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে: ‘সেজদা করা’। অনুরূপভাবে শয়তান কর্তৃক যীশুকে পরীক্ষা করা প্রসঙ্গে মথি ৪/৯ ও লূক ৪/৭ শ্লোকে শয়তানের বক্তব্য “All these things will I give thee, if thou wilt fall down and worship me”। কেরির অনুবাদ: “তুমি যদি ভূমিষ্ট হইয়া আমাকে প্রণাম কর”। কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “তুমি যদি মাটিতে পড়ে আমাকে সেজদা কর তবে এই সবই আমি তোমাকে দেব।”
প্রেরিত ১০/২৫: “as Peter was coming in, Cornelius met him, and fell down at his feet, and worshiped him”। কিতাবুল মোকাদ্দস: “পিতর যখন ঘরে ঢুকলেন তখন কর্ণীলিয় তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর পায়ের উপর উবুড় হয়ে পড়ে তাঁকে সেজদা করলেন।”
এখানেও ওয়র্শিপ -এর অর্থ ‘সেজদা করা’ লেখা হয়েছে।

১. ৫. ৪. ৩. উবুড় হওয়া ও ইবাদত করা সমার্থক

উপরের উদ্ধৃতিগুলো থেকে আমরা আরো নিশ্চিত হলাম যে, বাইবেলের পরিভাষায় উবুড় হওয়ার অর্থ সাজদা করা বা ইবাদত করা। এজন্য fell on his face অর্থাৎ উবুড় হওয়া, মুখের উপর পড়া বা মাটিতে পড়া এবং worship অর্থাৎ ইবাদত করা বা পূজা করাকে সমার্থক অর্থে ব্যবহার করেছেন মথি ও লূক।
কেরির অনুবাদে সঙ্গতি রক্ষা করার প্রবণতা দেখা যায়। সেখানে সর্বদা ওয়র্শিপ অর্থ প্রণিপাত, উপাসনা বা পূজা এবং ‘বাউ ডাউন’ এবং ‘ফেল অন ফেস’ অর্থ উবুড় হওয়া লেখা হয়েছে। তবে কিতাবুল মোকাদ্দস এ সঙ্গতি রক্ষা করেনি। ঈশ্বর বা যীশুর প্রসঙ্গে ওয়র্শিপ বা বাউ ডাউন অর্থ ‘সেজদা করা’ লেখা হয়েছে। আর নবী, ফেরেশতা, বাদশাহ বা অন্যদের ক্ষেত্রে একই শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে উবুড় হওয়া, সালাম করা ইত্যাদি। বাহ্যত মুসলিম বিশ্বাসের দিকে লক্ষ্য রেখে এবং যীশুর দেবত্ব প্রমাণ করতেই একই শব্দের অর্থ বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।
আমরা দেখেছি বাংলা কিতাবুল মোকাদ্দসে হিজরত ২০/৫ এবং দ্বিতীয় বিবরণ ৫/৯ শ্লোকে ‘bow down’ শব্দের অর্থ করা হয়েছে: পূজা করা। অন্যত্র fell on his face অর্থাৎ মুখের উপর পড়া বা উবুড় হওয়ার অর্থ সেজদা করা লেখা হয়েছে। আদিপুস্তক/ পয়দায়েশ ১৭/১-৩: “And when Abram was ninety years old and nine, the LORD appeared to Abram … And Abram fell on his face…”। কেরির অনুবাদ: “অব্রামের নিরানব্বই বৎসর বয়সে সদাপ্রভু তাঁহাকে দর্শন দিলেন… তখন অব্রাম উবুড় হইয়া পড়িলেন…।” কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “ইব্রামের বয়স যখন নিরানব্বই বছর তখন মাবুদ তাঁকে দেখা দিয়ে… এতে ইব্রাম সেজদায় পড়লেন।”

১. ৫. ৪. ৪. worship শব্দটাকে ইবাদত বা পূজা অর্থে ব্যবহার

এভাবে আমরা দেখছি যে, বাইবেলের পরিভাষায় ‘ওয়র্শিপ’ অর্থই ‘সাজদা করা’ বা ‘মাটিতে উপুড় হয়ে পড়া’। তবে বাইবেলের অনুবাদে বিভিন্ন স্থানে ওয়র্শিপ অর্থ ইবাদত, উপাসনা, ভজনা বা পূজাও লেখা হয়েছে।
মথি ১৫/৯ ও মার্ক ৭/৭ উভয় শ্লোকেই বলা হয়েছে: “But in vain they do worship me”। কেরির অনুবাদ: “ইহারা অনর্থক আমার আরাধনা করে।” কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “তারা মিথ্যাই আমার এবাদত করে।”
যোহন/ ইউহোন্না ৪/২০-২৪ শ্লোকে ওয়র্শিপ শব্দটা ১০ বার ব্যবহৃত হয়েছে। দশ স্থানেই কেরির অনুবাদে ‘ভজনা’ এবং কিতাবুল মোকাদ্দসে ‘এবাদত’ লেখা হয়েছে। প্রথম শ্লোকটা (৪/২০) হচ্ছে- “Our fathers worshiped in this mountain; and ye say, that in Jerusalem is the place where men ought to worship”: “আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই পাহাড়ে এবাদত করতেন, কিন্তু আপনারা বলে থাকেন জেরুজালেমেই লোকদের এবাদত করা উচিত।” পরবর্তী ৪ শ্লোকে শব্দটা ৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে এবং সকল স্থানেই বাংলায় এবাদত বা ভজনা বলা হয়েছে।
এভাবে কিতাবুল মোকাদ্দসে বিভিন্ন স্থানে ওয়র্শিপ অর্থ এবাদত, উপাসনা বা পূজা লেখা হয়েছে। দেখুন: যোহন/ ইউহোন্না ১২/২০; প্রেরিত ৭/৪২; ৭/৪৩; ৮/২৭; ১৭/২৩; ১৮/১৩; ২৪/১১; ২৪/১৪। কেরির অনুবাদে ভজনা বা পূজা লেখা হয়েছে।

১. ৫. ৪. ৫. worship বিষয়ে বাইবেলীয় বিধান ও রকমারি অনুবাদ

পবিত্র বাইবেলে অধিকাংশ স্থানে একমাত্র ঈশ্বরকে ‘ওয়র্শিপ’ করতে বলা হয়েছে। অন্য কোনো দেবতা, প্রতিমা বা বস্তুকে ‘ওয়র্শিপ’ করতে নিষেধ করা হয়েছে। (যাত্রাপুস্তক ২০/৫; ৩৪/১৪; দ্বিতীয় বিবরণ ৫/৯; ৩০/১৭; ২ রাজাবলি ১৭/৩৬; মথি ৪/১০…) কিন্তু এর বিপরীতে বাইবেলে অনেক স্থানে নবীরা বা বশ্বাসীরা ঈশ্বর ছাড়া অন্য ব্যক্তিকে ওয়র্শিপ (worship) এবং বাউ ডাউন (bow down/ fell on his face) করেছেন। আমরা দেখেছি যে, বাইবেলীয় পরিভাষায় ওয়র্শিপ অর্থ সাজদা বা ইবাদত করা এবং বাউ ডাউন, উপুড় হওয়া বা মুখের উপর পড়ার অর্থও সাজদা করা। অর্থাৎ তাঁরা ঈশ্বর ছাড়া অন্যদের সাজদা করতেন। এছাড়া তাঁরা অন্যদের সাজদা ও ইবাদত গ্রহণ করেছেন। উপুড় হওয়া এবং মুখের উপর পড়ে যাওয়ার কথা- অর্থাৎ সাজদা করার কথা তো অনেক স্থানেই বিদ্যমান। এছাড়া ঈশ্বর ছাড়া অন্যকে ‘ওয়র্শিপ’ অর্থাৎ ইবাদত করার কথাও বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে। ইংরেজি বাইবেলে এ সকল বিষয় খুবই সুস্পষ্ট। উইলিয়াম কেরির অনুবাদ অনেকটাই মূলাশ্রয়ী। সকল ক্ষেত্রেই ওয়র্শিপ শব্দটার অর্থ লেখা হয়েছে ‘প্রণিপাত করা’, অর্থাৎ সাজদা করা। কিন্তু ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ নামক বাংলা বাইবেলে এক্ষেত্রে অনেক হেরফের করা হয়েছে। একই শব্দ কখনো পূজা, কখনো সালাম, কখনো ‘সেজদা’ ইত্যাদি রকমারি অনুবাদ করা হয়েছে। এতে ইহুদি ও খ্রিষ্টান নবীরা ও ধার্মিকরা যে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের সাজদা করতেন তা পাঠক জানতে পারছেন না। বরং তারা জানছেন যে, তারা আল্লাহর সাজদা বা পূজা করতেন আর ফেরেশতা, নবী ও অন্যদেরকে ‘উবুড় হয়ে’ সালাম করতেন বা সম্মান দেখাতেন। অন্য সকল ফেরেশতা, নবী, বাদশাহ ও ধার্মিকের মতই যীশু খ্রিষ্টকেও সে যুগের ধার্মিক বা ভক্তরা এভাবে ‘সাজদা’ করে ‘সম্মান’ করতেন। কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দসে নবী, বাদশাহ, ধার্মিক বা ফেরেশতাদের ক্ষেত্রে ‘ওয়র্শিপ’, ‘বাউ ডাউন’ বা ‘ফেল অন হিজ ফেস’ বলতে সালাম, সম্মান প্রদর্শন বা কদমবুছি শব্দ ব্যবহার করছেন। পক্ষান্তরে যীশু খ্রিষ্টের ক্ষেত্রে একই শব্দের অনুবাদে ‘সেজদা’ শব্দ ব্যবহার করছেন। বাহ্যত এ দ্বারা তারা বুঝাচ্ছেন যে, যীশুকেও ঈশ্বরের মত ইবাদত করা হত এবং যীশু তা গ্রহণ করতেন। এখানে সামান্য কয়েকটা নমুনা উল্লেখ করছি:

১. ৫. ৪. ৬. ওয়র্শিপ ও উবুড় হওয়া অর্থ সম্মান দেখানো বা সালাম করা

(ক) যিহোশূয় ফেরেশতাকে সাজদা ও ইবাদত করলেন
উপরে কয়েকটা উদ্ধৃতিতে আমরা দেখলাম যে, কিতাবুল মোকাদ্দসে worship, bow down, fell on his face শব্দগুলোর অর্থ ‘সেজদা করা’ বা ‘এবাদত করা’ লেখা হয়েছে। অন্যান্য স্থানে এ শব্দগুলোর অনুবাদে অন্যান্য শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
যিহোশূয় বা ইউসা পুস্তকের ৫/১৩-১৪ শ্লোক কিতাবুল মোকাদ্দসে নিম্নরূপ: “জেরিকোর কাছাকাছি গেলে পর ইউসা খোলা তলোয়ার হাতে একজন লোককে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। ইউসা তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কার পক্ষের লোক- আমাদের, না আমাদের শত্রুদের?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘আমি কারও পক্ষের লোক নই। আমি মাবুদের সৈন্যদলের সেনাপতি, এখন আমি এখানে এসেছি।’ এই কথা শুনে ইউসা মাটিতে উবুড় হয়ে পড়ে তাঁকে সম্মান দেখালেন।”
শেষ বাক্যটার ইংরেজি ‘fell on his face to the earth, and did worship’। অর্থাৎ: “তিনি মাটিতে মুখ রেখে সাজদা করলেন এবং ইবাদত করলেন।” আমরা দেখেছি যে, কেরির অনুবাদে ‘fell on his face’ অর্থ উপুড় হওয়া এবং ‘worship’ অর্থ প্রণিপাত বা সাজদা। এ মূলনীতি ঠিক রেখে এ শ্লোকে কেরির অনুবাদ: “তখন যিহোশূয় ভূমিতে উবুড় হইয়া পড়িয়া প্রণিপাত করিলেন।” কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ এখানে অসঙ্গতিপূর্ণ। উপরে বিভিন্ন স্থানে ‘fell on his face’ অর্থ লেখা হয়েছে: ‘সেজদায় পড়লেন’। অথচ এখানে একই কথার অর্থ লেখা হয়েছে ‘উবুড় হয়ে’। এরপর ‘ওয়র্শিপ’ শব্দটার অর্থ লেখা হয়েছে ‘সম্মান দেখানো’।
(খ) দাউদ তালুতের ছেলে যোনাথনকে সাজদা করলেন!
১ শমূয়েল ২০/৪১ “David arose out of a place toward the south, and fell on his face to the ground, and bowed himself three times” অর্থাৎ “দাউদ দক্ষিণের দিকে একটা স্থান থেকে উঠে আসলেন, মাটির উপর তার মুখ রেখে পড়ে গেলেন: সাজদা করলেন এবং তিনবার নিজেকে উপুড় করলেন।” কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “দাউদ সেই পাথরটার দক্ষিণ দিক থেকে উঠে আসলেন। তিনি যোনাথনের সামনে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে তিনবার তাঁকে সালাম জানালেন।”
এখানেও সাজদা করাকে ‘মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে সালাম জানানো’ বলা হল!
(গ) ধার্মিক ওবদিয় নবী ইলিয়াসকে সাজদা করলেন
১ রাজাবলি/ বাদশাহনামা ১৮/৭: “Obadiah was in the way, behold, Elijah met him: and he knew him, and fell on his face”: “ওবদিয় পথ দিয়ে যেতে ইলিয়াসকে দেখে চিনতে পেরে ‘তার মুখের উপর পড়ে গেলেন’: তাকে সাজদা করলেন।” কিতাবুল মোকাদ্দস: “ওবদিয় পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় ইলিয়াসের সংগে তাঁর দেখা হল। ওবদিয় তাঁকে চিনতে পেরে মাটিতে উবুড় হয়ে বললেন…।”
এভাবে বাইবেলে অনেক স্থানে নবীরা বা ধার্মিকরা অন্যদের সামনে মাটিতে উবুড় হয়েছেন, অর্থাৎ সাজদা করেছেন। কিতাবুল মোকাদ্দসে উবুড় হওয়া, সালাম করা, সম্মান দেখানো ইত্যাদি অনুবাদের মাধ্যমে মূল তথ্যটা একেবারেই অস্পষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখব যে, যীশুর ক্ষেত্রে এ শব্দের অর্থে ‘সেজদা করা’ লেখা হয়েছে।
(ঘ) ধার্মিক মহিলা নবী আল-ইয়াসাকে সাজদা করলেন
আল-ইয়াসা একজন মহিলার মৃত সন্তানকে জীবিত করেন। তখন মহিলা তাঁকে সাজদা করেন: ২ বাদশাহনামা ৪/৩৭ “Then she went in, and fell at his feet, and bowed herself to the ground: তখন স্ত্রীলোকটি ভিতরে আসল এবং তাঁর পায়ের উপর সাজদা করল।” কেরি: “তখন সে স্ত্রীলোক নিকটে গিয়া তাঁর পদতলে পড়িয়া ভূমিতে প্রণিপাত করিলেন।” কিতাবুল মোকাদ্দস: “স্ত্রীলোকটি ঘরে ঢুকে তাঁর পায়ে পড়লেন এবং মাটিতে উবুড় হয়ে তাঁকে সালাম জানালেন।”

১. ৫. ৪. ৭. যীশুর সাজদাকে উবুড় হওয়া বলা হল

বাইবেল থেকে আমরা জানছি যে, যীশু আল্লাহকে সাজদা করতেন, সাজদার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং সাজদারত অবস্থায় দুআ বা মুনাজাত করতেন।
মথি ২৬/৩৯: “And he went a little further, and fell on his face, and prayed, saying: তিনি কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে মুখের উপর পড়লেন, অর্থাৎ সাজদা করলেন এবং দুআ করে বললেন…।” কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “তিনি কিছু দূরে গিয়ে মাটিতে উবুুড় হয়ে পড়লেন এবং মুনাজাত করে বললেন…।”
মার্ক ১৪/৩৫: “And he went forward a little, and fell on the ground, and prayed” অর্থাৎ “তিনি কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে মাটির উপর পড়লেন: সাজদা করলেন এবং দুআ করলেন”। কিতাবুল মোকাদ্দস: “তার পরে তিনি কিছু দূরে গিয়ে মাটিতে উবুড় হয়ে পড়ে মুনাজাত করলেন।”
আমরা দেখেছি, ঠিক এ বাক্যাংশকেই কিতাবুল মোকাদ্দসে অন্যান্য স্থানে ‘সেজদা করা’ বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে উবুড় হওয়া বলা হয়েছে।

১. ৫. ৪. ৮. ‘ওয়র্শিপ’ বা ইবাদত অর্থ উবুড় হওয়া!

এভাবে বাইবেলে বহু স্থানে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সৃষ্টিকে: নবী, ফেরেশতা, বাদশাহ বা অন্যদেরকে সাজদা করা হয়েছে এবং নবীরা ও ধার্মিকরাই এরূপ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ‘ওয়র্শিপ’ বা ‘ইবাদত’ শব্দটাও আল্লাহ ছাড়া অন্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। উপরে আমরা দেখেছি যে, ইউসা বা যিহোশূয় ফেরেশতাকে ‘ইবাদত’ করেছেন বলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেরির অনুবাদে সকল স্থানে ‘প্রণিপাত’ লেখা হয়েছে। কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদে অনেক হেরফের রয়েছে। এ পুস্তকেই অনেক স্থানে ওয়র্শিপ অর্থ সেজদা (সাজদা) বা এবাদত (ইবাদত) লেখা হয়েছে, কিন্তু অন্যান্য স্থানে ‘ওয়র্শিপ’ শব্দের এমন সব অর্থ লেখা হয়েছে যা শব্দটার আভিধানিক বা ব্যবহারিক অর্থ থেকে বহু দূরবর্তী।
কোথাও ওয়র্শিপের অর্থ লেখা হয়েছে ‘উবুড় হওয়া’। মথি লেখেছেন: “there came a certain ruler, and worshiped him, saying”: “তখন একজন নেতা/শাসক আসলেন এবং তাঁকে ইবাদত/উপাসনা/ ভজনা করে বললেন।” (মথি ৯/১৮)। এখানে কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “তখন একজন ইহুদি নেতা তাঁর কাছে আসলেন এবং তাঁর সামনে উবুড় হয়ে বললেন।”
অন্যত্র মথি লেখেছেন: “Then came she and worshiped him, saying: তখন স্ত্রীলোকটি এসে তাঁকে ইবাদত করে বলল…।” (মথি ১৫/২৫)। কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “সেই স্ত্রীলোকটি কিন্তু ঈসার কাছে এসে তাঁর সামনে উবুড় হয়ে পড়ে বলল।”
এভাবে বারবার ওয়র্শিপ শব্দের অর্থ লেখা হচ্ছে ‘উবুড় হওয়া’। অথচ অন্যান্য স্থানে এ শব্দেরই অর্থ লেখা হয়েছে ‘এবাদত করা’ বা ‘সেজদা করা’। আর এ কথা তো সকলেরই জানা যে, দেবতার সামনে উবুড় হয়ে সাজদা করা ছাড়া সাধারণ চিত, কাত বা উবুড় হওয়ার সাথে ‘ওয়র্শিপ’ শব্দটার কোনো সম্পর্ক নেই।

১. ৫. ৪. ৯. ‘ওয়র্শিপ’ বা ‘ইবাদত’ অর্থ সম্মান দেখানো

অন্যান্য স্থানে ওয়র্শিপ শব্দটার অর্থ সম্মান দেখানো লেখা হয়েছে। শুধু ঈশ্বর বা দেবতাকে ধর্মীয় ভক্তি বা সম্মান দেখানোকেই ইবাদত বা ওয়র্শিপ বলা হয় এবং সাজদার মাধ্যমেই তা প্রকাশ করা হয়। শুধু সম্মান দেখানোকে কখনোই ওয়র্শিপ বলা হয় না। মানুষ মা, বাবা, শিক্ষক, শাসক ও অন্য অনেককেই সম্মান দেখায়। এরূপ সম্মান দেখানোর কারণে কাউকে বলা হয় না যে, সে পিতা, মাতা, শিক্ষক, শাসক বা অমুকের পূজারী, ইবাদতকারী বা ওয়র্শিপার। এরূপ অর্থের কয়েকটা নমুনা দেখুন:
দানিয়েল ২/৪৬: “the king Nebuchadnezzar fell upon his face, and worshiped Daniel” অর্থাৎ “নেবুকাদনেজার তার মুখের উপর পড়ে গেলেন: সাজদা করলেন এবং দানিয়েলের ইবাদত বা পূজা করলেন।” কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “তখন বাদশাহ বখতে-নাসার দানিয়েলের সামনে উবুড় হয়ে পড়ে তাঁকে সম্মান দেখালেন। এবং তাঁর সামনে শস্য কোরবানী করতে ও ধূপ জ্বালাতে হুকুম করলেন।”
এখানে মূল ইংরেজিতে ‘সাজদা করা’ এবং ‘ইবাদত করা’ দুটো কর্মই উল্লেখ করা হয়েছে। উপরন্তু ‘দানিয়েল পূজার’ অংশ হিসেবে তাঁর সামনে শস্য কোরবানী ও ধূপ জ্বালানো হল। তারপরও কিতাবুল মোকাদ্দসে ‘উবুড় হয়ে সম্মান দেখালেন’ বলে পুরো বিষয়টাই অস্পষ্ট করা হয়েছে।
মথি লেখেছেন যে, যীশুর জন্মের পরে পূর্বদেশীয় কিছু পণ্ডিত তাঁকে সাজদা করার জন্য আগমন করেন। তারা রাজা হেরোদকে বলেন: “Where is he that is born King of the Jews? for we have seen his star in the east, and are come to worship him”: “ইহুদিদের যে রাজার জন্ম হয়েছে তিনি কোথায়? আমরা পূর্বদিকে তাঁর তারা দেখেছি এবং তাঁকে ইবাদত (সাজদা) করার জন্য এসেছি।” কিতাবুল মোকাদ্দস: “ইহুদিদের যে বাদশাহ জন্মেছেন তিনি কোথায়? পূর্ব দিকের আসমানে আমরা তাঁর তারা দেখে মাটিতে উবুড় হয়ে তাঁকে সম্মান দেখাতে এসেছি।” (মথি ২/২)
রাজা হেরোদ তাদেরকে বলেন: “when ye have found him, bring me word again, that I may come and worship him also”: “তাঁকে যদি আপনারা খুঁজে পান তবে আমাকে জানাবেন, যেন আমিও তাঁর ইবাদত (সাজদা) করতে পারি।” কিতাবুল মোকাদ্দস: “যেন আমিও গিয়ে মাটিতে উপুড় হয়ে তাঁকে সম্মান দেখাতে পারি।” (মথি ২/৮) একইভাবে ‘ওয়র্শিপ’ শব্দের এ অর্থ দেখুন মথি ২/১১; ৮/২।
বিষয়টা বড়ই অদ্ভুত! ওয়র্শিপ শব্দের আভিধানিক অর্থ ভজনা বা ইবাদত এবং বাইবেলের ব্যবহারিক অর্থ সাজদা করা। উভয় অর্থই কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদকরা জানেন এবং বারবার ব্যবহারও করেছেন। অথচ এখানে তারা প্রকৃত অর্থ বেমালুম চেপে যেয়ে এক শব্দের বদলে দীর্ঘ শব্দমালার অদ্ভুত একটা অর্থ লেখলেন।

১. ৫. ৪. ১০. ওয়র্শিপ বা ইবাদত করা অর্থ পা ধরা

অন্যত্র ‘ওয়র্শিপ’ বা ইবাদত অর্থ লেখা হয়েছে পা ধরা! মথি ১৮/২৬ শ্লোকে যীশু বলেন: “The servant therefore fell down, and worshiped him: তাতে সেই কর্মচারী মাটিতে পড়ল বা সাজদা করল এবং তার মালিককে ইবাদত করল।” কিতাবুল মোকাদ্দস: “তাতে সেই কর্মচারী মাটিতে পড়ে মালিকের পা ধরে বলল”।

১. ৫. ৪. ১১. ওয়র্শিপ অর্থ কদমবুসি

যীশু বলেছেন যে, ইহুদিদেরকে তিনি খ্রিষ্টানদের সামনে নত করাবেন এবং ইহুদিরা খ্রিষ্টানদের পায়ে পড়ে ‘ইবাদত’ (worship) করবে। প্রকাশিত বাক্য ৩/৯: “I will make them of the synagogue of Satan, which say they are Jews, and are not, but do lie; behold, I will make them to come and worship before thy feet: যারা নিজেদেরকে ইহুদি বলে অথচ ইহুদি নয়, শয়তানের দলের (শয়তানের সিনাগগের) সেই মিথ্যাবাদী লোকদের আমি তোমার কাছে আনব যেন তারা তোমার পায়ে পড়ে ইবাদত করে।”
“worship before thy feet: তারা তোমার পায়ে পড়ে ইবাদত করবে” কথাটার অনুবাদ কেরি: “তোমার চরণ সমীপে তাহাদিগকে উপস্থিত করাইয়া প্রণিপাত করাইব।” জুবিলী বাইবেল: “ওদের এনে আমি তোমার পায়ের সামনে প্রণিপাত করতে বাধ্য করব।” কি. মো. “তোমার পায়ের কাছে কদমবুসি করাব”।

১. ৫. ৪. ১২. ওয়র্শিপ বা ইবাদত অর্থ সম্মান বা গৌরব

লূক ১৪/১০ যীশু বলেন: “But when thou art bidden, go and sit down in the lowest room; that when he that bade thee comets, he may say unto thee, Friend, go up higher: then shalt thou have worship in the presence of them that sit at meat with thee: আপনি যখন দাওয়াত পাবেন তখন বরং সবচেয়ে নীচু জায়গায় গিয়ে বসবেন। তাহলে দাওয়াত-কর্তা এসে আপনাকে বলবেন, ‘বন্ধু, আরও ভাল জায়গায় গিয়ে বসুন।’ তখন অন্য সব মেহমানদের সামনে আপনি ইবাদত (ইংরেজি: worship, কেরি: গৌরব; কিতাবুল মোকাদ্দস: সম্মান) পাবেন।”

১. ৫. ৪. ১৩. ‘ওয়র্শিপ’ বা ইবাদত অর্থ ‘ভয় করা’

কিতাবুল মোকাদ্দসে অন্যত্র ‘ওয়র্শিপ’ শব্দের অর্থ বলা হয়েছে ভয় করা। মথি ৪/১০ ও লূক ৪/৮: “it is written, Thou shalt worship the Lord thy God, and him only shalt thou serve: লেখা আছে তুমি তোমার ঈশ্বরের ইবাদত (সাজদা) করবে এবং তাঁরই সেবা (ইবাদত) করবে।” কেরির অনুবাদ: “লেখা আছে, তোমার ঈশ্বর প্রভুকেই প্রণাম করিবে, কেবল তাঁহারই আরাধনা করিবে।” কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “পাক কিতাবে লেখা আছে, তুমি তোমার মাবুদ আল্লাহকেই ভয় করবে, কেবল তাঁরই এবাদত করবে।”
এরূপ স্বাধীন অনুবাদ ধর্মগ্রন্থ তো দূরের কথা সাধারণ সাহিত্য কর্মের ক্ষেত্রেও বিকৃতি বলে বিবেচিত হবে বলে আমরা ধারণা করি। যীশুর এ বক্তব্যটা দ্বিতীয় বিবরণ ৬/১৩ শ্লোকের উদ্ধৃতি। দ্বিতীয় বিবরণে ‘ওয়র্শিপ’ (সাজদা বা ইবাদত) শব্দের পরিবর্তে ফিয়ার (ভয়) শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে: “Thou shalt fear the LORD thy God, and serve him”: “তুমি সদাপ্রভু তোমার ঈশ্বরকে ভয় করবে এবং তাঁর সেবা করবে।” কিন্তু এখানে যীশু ‘ওয়র্শিপ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। কেরির অনুবাদে মৌলিকতা রক্ষা করা হলেও কিতাবুল মোকাদ্দসে যীশুর বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে।

১. ৫. ৪. ১৪. যীশুর ক্ষেত্রে ওয়র্শিপ আবার ‘সেজদা’ হয়ে গেল

উপরে আমরা দেখলাম যে, ওয়র্শিপ শব্দটার অর্থ ইবাদত, পূজা, প্রণিপাত বা সাজদা করা। কিন্তু বাংলা কিতাবুল মোকাদ্দসে শব্দটার অর্থ বহুভাবে হেরফের করা হয়েছে। এ হেরফেরের সর্বশেষ রূপ যীশুর ক্ষেত্রে ওয়র্শিপ সালাম করা, সম্মান দেখানো, কদমবুসি করা ইত্যাদি থেকে হঠাৎ করেই ‘সেজদা করা’ বা ‘উপুড় হয়ে সেজদা করা’ হয়ে গেল। কয়েকটা নমুনা দেখুন:
মথি ১৪/৩৩: “Then they that were in the ship came and worshiped him, saying…”। কিতাবুল মোকাদ্দস: “যাঁরা নৌকার মধ্যে ছিলেন তাঁরা ঈসাকে সেজদা করে বললেন, সত্যিই আপনি ইবনুল্লাহ।”
মথি ২৮/৯: “And they came and held him by the feet, and worshiped him”। কিতাবুল মোকাদ্দস: “তখন সেই স্ত্রীলোকেরা তাঁর কাছে গিয়ে পা ধরে তাঁকে সেজদা করলেন।”
মথি ২৮/১৭: “And when they saw him, they worshiped him: but some doubted”। কি. মো.: “সেখানে ঈসাকে দেখে তাঁরা তাঁকে সেজদা করলেন, কিন্তু কয়েকজন সন্দেহ করলেন।” (বাইবেল-২০০০: প্রণাম করে ঈশ্বরের সম্মান দিলেন)
লূক ২৪/৫২: “And they worshiped him”। কি. মো: “তখন তারা উবুড় হয়ে তাঁকে সেজদা করলেন।” (বা.-০০: উপুড় হয়ে প্রণাম করে ঈশ্বরের সম্মান দিলেন)
যোহন/ইউহোন্না ৯/৩৮: “And he said, Lord, I believe. And he worshiped him”। কি. মো: “তখন লোকটি বলল, ‘হুজুর, আমি ঈমান আনলাম।’ এই বলে সে ঈসাকে সেজদা করল।” (প্রণাম করে ঈশ্বরের সম্মান দিলেন)
বাহ্যত যীশুর ঈশ্বরত্ব প্রমাণের জন্যই ওয়র্শিপ শব্দের অনুবাদে এরূপ লুকোচুরি। যে শব্দটার অর্থ প্রণাম করা, সালাম করা ইত্যাদি লেখা হল, অবিকল সে শব্দটাই যীশুর ক্ষেত্রে ‘প্রণাম করে ঈশ্বরের সম্মান জানান’ বা ‘সাজদা করা’ হয়ে গেল!! অথচ যীশুকে যেভাবে ওয়র্শিপ, সাজদা বা ‘প্রণাম করে ঈশ্বরের সম্মান’ করা হয়েছে এরূপ ‘ওয়র্শিপ’ বাইবেলের নবী ও ধার্মিকরা ফেরেশতা, নবী, বাদশাহ ও অন্যদের করেছেন। বাইবেলীয় নবী ও ধার্মিকদেরকে নির্বিচারে এভাবে ওয়র্শিপ করা হয়েছে। ওয়র্শিপ এবং সমার্থক শব্দগুলো তাঁদের সকলের ক্ষেত্রেই একইভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। শুধু অনুবাদের স্বেচ্ছাচারিতায় বাংলাভাষী পাঠকের কাছ থেকে সত্য হারিয়ে গেল!

১. ৫. ৫. wine অনুবাদের হেরফের

ইংরেজি ওয়াইন (wine) শব্দটার অর্থ ‘মদ’ বা ‘আঙ্গুর থেকে প্রস্তুত মদ’, আরবি খামর (خمر)। এনকার্টা ডিকশনারি ওয়াইন শব্দের অর্থ লেখেছে: “an alcoholic drink made by fermenting the juice of grapes: আঙ্গুরের রস গাজিয়ে তুলে তৈরি করা মাদক পানীয়।” এনকার্টা বিশ্বকোষ লেখেছে: “Wine,  alcoholic beverage  made from the juice of grapes: ওয়াইন: আঙ্গুরের রস থেকে তৈরি মাদক পানীয়।” মাদকমুক্ত আঙ্গুররস, দ্রাক্ষারস বা গ্রেপ জুসকে কখনোই ‘ওয়াইন’ বলা হয় না।
মদ বা মাদক পানীয় বুঝাতে বাইবেলে wine অর্থাৎ মদ এবং strong drink অর্থাৎ মাদক পানীয় শব্দদ্বয় ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু বাংলা বাইবেলগুলোতে অধিকাংশ স্থানে ওয়াইনের অনুবাদ করা হয়েছে দ্রাক্ষারস বা আঙ্গুর রস। এজন্য ইংরেজি ভাষায় বাইবেল পাঠ করলে মদের বিষয়ে বাইবেলের নির্দেশনা অনুধাবন করা যত সহজ হয় বাংলায় তা একেবারেই সম্ভব নয়। বাইবেলের বাংলা অনুবাদগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ‘আঙ্গুর-রস’ বিষয়ে অনেক কথা পাঠককে মাতাল না করলেও হতবাক করে। অনুবাদের হাতছাফাইয়ে ইংরেজি ‘ওয়াইন’ শব্দটা কোথাও ‘আঙ্গুর রস’ বা ‘দ্রাক্ষারস’ এবং কোথাও মদে পরিণত হয়েছে এবং কোথাও শব্দটার অনুবাদ একেবারেই হারিয়ে গিয়েছে।

১. ৫. ৫. ১. আঙ্গুরের জুস খেয়েও মানুষ মাতাল হয়

অবাক বিস্ময়ে পাঠক বাংলা বাইবেলে বারবার পড়বেন, আঙ্গুর রস খেলে মানুষ মাতাল হয় (গীতসংহিতা ৭৮/৬৫)। “আফরাহীমের ইমাম ও নবীরা এখন আঙ্গুর-রস খেয়ে টলে ও মাতলামি করে…” (ইশাইয়া/ যিশাইয় ২৮/৭)। “আঙ্গুর রস খেয়ে ভীষণ মাতাল লোকের মত হয়েছি” (যিরমিয়/ইয়ারমিয়া ২৩/৯)। “আঙ্গুর রস খেয়ে টলতে থাকবে।” (যিরমিয় ২৫/১৫)। আঙ্গুর-রস খেয়ে কি পাঠক কখনো টলেছেন ও মাতলামি করেছেন? ভীষণ মাতাল হয়েছেন?

১. ৫. ৫. ২. আঙ্গুরের রস খেয়ে নবীরা উলঙ্গ হন ও ব্যভিচার করেন!

নোহ আঙ্গুর-রস খেয়ে উলঙ্গ হলেন (আদিপুস্তক/ পয়দায়েশ ৯/২১-২৪) এবং লোট আঙ্গুরের রস খেয়ে নিজের মেয়েদের সাথে সহবাসে লিপ্ত হলেন (আদিপুস্তক/পয়দায়েশ ১৯/৩২-৩৫)। পাঠক হতবাক হয়ে চিন্তা করবেন আঙ্গুর-রস বা গ্রেপ-জুস খেলে কিভাবে এরূপ হতে পারে?

১. ৫. ৫. ৩. ফুর্তিতে মাতাল হওয়ার জন্য আঙ্গুরের রস পান করুন

আঙ্গুর রসে মানুষের হৃদয় ফুর্তিতে ভরে যায় বা ফুর্তিতে মাতাল হয়ে উঠে! (২ শমুয়েল ১৩/২৮; ইষ্টের ১/১০; গীতসংহিতা/জবুর ১০৪/১৫; উপদেশক/ হেদায়েতকারী ১০/১৯; জাকারিয়া/সখরিয় ১০/৭)। পাঠক বুঝতে পারেন না কিভাবে তা হয়! আমরা যখন আঙ্গুরের জুস পান করি তখন কোনোই ‘ফুর্তি’ হয় না!
পাঠক পড়বেন: “যাদের মনে খুব কষ্ট আছে তাদের আঙ্গুর রস দাও। তারা তা খেয়ে তাদের অভাবের কথা ভুলে যাক, তাদের দুঃখ-কষ্ট আর তাদের মনে না থাকুক” (মেসাল/ হিতোপদেশ ৩১/৬-৭)। পাঠক আরও পড়বেন: “আমি স্বজ্ঞানে আঙ্গুর রস খেয়ে শরীরকে উত্তেজিত করলাম এবং নির্বোধের মত কাজ করে নিজেকে খুশী করবার চেষ্টা করলাম।” (উপদেশক/ হেদায়েতকারী ২/৩) পাঠক হতবাক হয়ে ভাববেন, আঙ্গুরের রস খেলে কিভাবে মানুষ দুঃখকষ্টের কথা ভুলে যেতে পারে? আঙ্গুরের রস খাওয়ার মধ্যে নির্বুদ্ধিতাই বা কী? আর আঙ্গুরের রস খেলে শরীরই বা কিভাবে উত্তেজিত হয়?

১. ৫. ৫. ৪. আঙ্গুর রস ভালবাসলে সে কখনো ধনী হতে পারবে না

বাংলা বাইবেলে পাঠক যখন পড়বেন, আঙ্গুর রস ভালবাসলে সে কখনো ধনী হতে পারে না (মেসাল/হিতোপদেশ ২১/১৭) তখন দিশেহারা হয়ে ভাববেন যে, কথাটা কিভাবে সত্য হতে পারে? আঙ্গুরের জুস পছন্দ করলে সমস্যা কোথায়?

১. ৫. ৫. ৫. সমস্যার সমাধানে ইংরেজি বাইবেল পড়ুন

ইংরেজি ভাষায় বাইবেল পড়লে পাঠকের উপরের সকল বিস্ময় কেটে যাবে। তবে অন্য একটা বিস্ময় তার উপর ভর করবে: কিভাবে মূল বাইবেলের মদ বাংলা বাইবেলে আঙ্গুর-রস বা গ্রেপ-জুসে পরিণত হল!

১. ৫. ৫. ৬. মাঝে মাঝে কারণ ছাড়াই আঙ্গুর-রস মদে পরিণত হয়!

বাংলা বাইবেলগুলোতে ‘ওয়াইনের’ অনুবাদ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্রাক্ষারস বা আঙ্গুর-রস লেখা হলেও মাঝে মাঝে মদ লেখা হয়েছে। মাঝে মাঝেই আমরা দেখি যে, ইংরেজি ‘ওয়াইন’ নিরীহ আঙ্গুর রস থেকে মদে পরিণত হয়েছে! কয়েকটা নমুনা দেখুন:
(How long wilt thou be drunken? put away thy wine from thee) “তুমি মদ খেয়ে আর কতক্ষণ নিজেকে মাতাল করে রাখবে, মদ আর খেয়ো না।” (১ শামুয়েল ১/১৪)। (drink the wine of violence): “জুলুম হল তাদের মদ” (মেসাল/ হিতোপদেশ ৪/১৭)। (Wine is a mocker): যে লোক মদানো আঙ্গুর-রস খেয়ে মাতাল হয় সে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে।” (মেসাল ২০/১) (They that tarry long at the wine; they that go to seek mixed wine. Look not thou upon the wine when it is red) যারা অনেকক্ষণ ধরে মদ খায় তাদেরই এই রকম হয়; তারা মিশানো মদ খেয়ে দেখবার জন্য তার খোঁজে যায়। মদের দিকে তাকায়ো না যদিও তা লাল রঙ্গের।” (মেসাল ২৩/৩০-৩১)(it is not for kings to drink wine) “বাদশাহদের পক্ষে মাদানো আঙ্গুর রস খাওয়া উপযুক্ত নয়।” (মেসাল: ৩১/৪)
(they shall be drunken with their own blood, as with sweet wine) “তারা মদের মত করে নিজেদের রক্ত খেয়ে মাতাল হবে।” (ইশাইয়া ৪৯/২৬)। (all ye drinkers of wine, because of the new wine; for it is cut off from your mouth): “ওহে সমস্ত মদখোর, তোমরা টাটকা আঙ্গুর-রসের মদের জন্য বিলাপ কর; কারণ তা তোমাদের মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।” (যোয়েল ১/৫)। (These men are full of new wine) “ওরা মদ খেয়ে মাতাল হয়েছে।” (প্রেরিত ২/১৩)। (the wine of the wrath of her fornication): “জেনার ভয়ংকর মদ” (প্রকাশিত কালাম ১৪/৮; ১৮/৩)। (the wine of the wrath of God): “আল্লাহর গজবের মদ” (প্রকাশিত ১৪/১০) । (the wine of the fierceness of his wrath): “তাঁর গজবের ভয়ংকর মদে” (প্রকাশিত ১৬/১৯)।
২০০৬ সালে বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি (BBS) প্রকাশিত কিতাবুল মোকাদ্দসে উপরের সকল স্থানে ‘ওয়াইন’ শব্দটার অনুবাদে মদ বা মদানো আঙ্গুর-রস বলা হয়েছে। অথচ একই শব্দকে একই প্রসঙ্গে অন্যান্য স্থানে আঙ্গুর-রস বলা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০১৩ সালে প্রকাশিত বাচিপ (BACIB) পরিবেশিত কিতাবুল মোকাদ্দসে আবার অধিকাংশ মদকেই আঙ্গুর রস বানানো হয়েছে। তবে দু’-এক স্থানে তা মদই রয়ে গিয়েছে (যেমন মেসাল ৩১/৪)।
আবার অনেক স্থানে ওয়াইন শব্দটার অনুবাদ বাদ দিয়ে শুধু মাতাল বা মতলামি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে: (be not drunk with wine) “মাতাল হয়ো না..।” (ইফিষীয় ৫/১৮)। (Not given to wine, no striker): “তিনি যেন মাতাল বা বদমেজাজী না হন।” (১ তীমথিয় ৩/৩)। (not given to much wine) “তাঁরা যেন মাতাল না হন…”। (১ তীমথিয় ৩/৮)। (not given to wine, no striker): “মাতাল বা বদমেজাজী” (তীত ১/৭)। (not given to much wine): “মাতাল হওয়া তাঁদের উচিত নয়।” (তীত ২/৩)। (excess of wine): “মাতলামি করে।” (১ পিতর ৪/৩)

১. ৫. ৬. অনুবাদে বিকৃতির আরো কিছু নমুনা

প্রথম নমুনা: ‘গীতসংহিতা’ বা জবুর শরীফের ৮২/৬ কিং জেমস ভার্শন (King James Version: KJV) বা অথোরাইজড ভার্শন (Authorized Version: AV)-এ নিম্নরূপ: “I have said, Ye are gods; and all of you are children of the Most High”: “আমি বলেছি, তোমরা ঈশ্বর, এবং তোমাদের সকলেই শ্রেষ্ঠতমের সন্তান”। রিভাইজড স্টান্ডার্ড ভার্শন (Revised Standard Version: RSV)-এর ভাষ্য নিম্নরূপ: “I say, you are gods, sons of the Most High, all of you” : “আমি বলি, তোমরা ঈশ্বর, শ্রেষ্ঠতমের পুত্র, তোমরা সকলেই”।
কেরি: “আমি বলেছি, তোমরা ঈশ্বর, তোমরা সকলে পরাৎপরের সন্তান।” জুবিলী: “আমি বলেছি, তোমরা ঐশীজীব! তোমরা সবাই পরাৎপরের সন্তান।” পবিত্র বাইবেল ২০০০: “আমি বলেছিলাম, তোমরা যেন ঈশ্বর, তোমরা সবাই মহান ঈশ্বরের সন্তান।” কিতাবুল মোকাদ্দস ২০০৬: “আমি বলেছিলাম, তোমরা যেন আল্লাহ, তোমরা সবাই আল্লাহ তা’লার সন্তান।” কিতাবুল মোকাদ্দস ২০১৩: “আমিই বলেছি, তোমরা দেবতা, তোমরা সকলে সর্বশক্তিমানের সন্তান।”
মূল ইংরেজি পাঠ থেকে সুস্পষ্ট যে, এখানে মানুষদেরকে, সকল মানুষকে সুস্পষ্টভাবে ঈশ্বর ও ঈশ্বরের পুত্র বলা হয়েছে। এ থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে, বাইবেলীয় পরিভাষায় কাউকে ঈশ্বর বলা বা ঈশ্বরের পুত্র বলা দ্বারা কোনো দেবত্ব বা ঈশ্বরত্ব বুঝায় না; বরং ঈশ্বরের দাস ও সৃষ্টি বুঝায়। কেরির বাংলা অনুবাদ মূলাশ্রয়ী। তবে অন্যান্য অনুবাদে মানুষকে ঈশ্বর বলার বিষয়টা অস্পষ্ট করা হয়েছে। জুবিলী বাইবেল ও মুকাদ্দস-১৩ ‘ঐশীজীব’ ও ‘দেবতা’ শব্দ ব্যবহার করেছে। আর অন্য দুই অনুবাদে ‘যেন’ শব্দটা অতিরিক্ত সংযোজন করা হয়েছে।
দ্বিতীয় নমুনা: বাইবেলের Proverbs নামের পুস্তকটার বাংলা নাম কেরি বাইবেলে ‘হিতোপদেশ’, জুবিলী বাইবেলে ‘প্রবচনমালা’ এবং কিতাবুল মোকাদ্দসে ‘মেসাল’। এ পুস্তকের ২৬ অধ্যায়ের ৪ ও ৫ শ্লোক নিম্নরূপ: “Answer not a fool according to his folly, lest thou also be like unto him.  Answer a fool according to his folly, lest he be wise in his own conceit”: “মুর্খকে উত্তর দিও না তার মুর্খতা অনুসারে; পাছে তুমিও তার মতই হয়ে যাও। মুর্খকে উত্তর দাও তার মুর্খতা অনুসারে; পাছে সে তার অহমিকায় জ্ঞানী হয়।”
কেরির অনুবাদ: “(৪) হীনবুদ্ধিকে তাহার অজ্ঞানতা অনুসারে উত্তর দিও না, পাছে তুমিও তাহার সদৃশ হও। (৫) হীনবুদ্ধিকে তাহার অজ্ঞানতা অনুসারে উত্তর দেও, পাছে সে নিজের দৃষ্টিতে জ্ঞানবান হয়।” কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩ কেরির অনুরূপ।
জুবিলী বাইবেলের অনুবাদ: “নির্বোধকে তার মুর্খতা অনুসারে উত্তর দিয়ো না, পাছে তুমিও তার মত হও। নির্বোধকে তার মুর্খতা অনুসারেই উত্তর দাও, পাছে সে নিজেকে প্রজ্ঞাবান মনে করে।”
এর বিপরীতে পবিত্র বাইবেল ২০০০ এবং কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬: “প্রয়োজন বোধে বিবেচনাহীনকে তার বোকামি অনুসারে জবাব দিয়ো না, জবাব দিলে তুমিও তার মত হয়ে যাবে। প্রয়োজন বোধে বিবেচনাহীনকে তার বোকামি অনুসারে জবাব দিয়ো, তা না হলে সে তার নিজের চোখে নিজেকে জ্ঞানী মনে করবে।”
এখানে ‘প্রয়োজন বোধে’ শব্দদুটো সংযোজন করা হয়েছে। বস্তুত বাইবেল সমালোচকরা এ দুটো শ্লোককে বাইবেলীয় বৈপরীত্যের সুস্পষ্ট নমুনা হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ, একই পুস্তকের একই অধ্যায়ের পাশাপাশি দুটো শ্লোকে সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী দুটো আদেশ দেওয়া হয়েছে: প্রথম আদেশ: নির্বোধকে তার নির্বুদ্ধিতা অনুসারে উত্তর দিয়ো না। দ্বিতীয় আদেশ: নির্বোধকে তার নির্বুদ্ধিতা অনুসারে উত্তর দাও।
খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা বিভিন্নভাবে এ বৈপরীত্যের উত্তর প্রদান করেছেন। কিন্তু কেউই পাক কিতাবের মধ্যে দুটো শব্দ সংযোজন করার সাহসিকতা দেখাননি। কিন্তু বাংলা কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদকরা সে সাহস দেখালেন। প্রাচীন কাল থেকে খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা এরূপ সংযোজনের সময় বন্ধনী ব্যবহার করতেন। বাংলা কিতাবুল মোকাদ্দসের সম্পাদকরা ‘প্রয়োজন বোধে’ দুটো শব্দ পবিত্র পুস্তকের মধ্যে সংযোজন করার জন্য এরূপ কোনো বন্ধনীরও ‘প্রয়োজন বোধ’ করেননি।
তৃতীয় নমুনা: মথি ৫/৩৯ KJV: “ye resist not evil…”  (তোমরা দুষ্ট/পাপী/মন্দ/বদমাইশ লোককে প্রতিরোধ করো না) RSV: Do not resist one who is evil… (যে ব্যক্তি দুষ্ট/ মন্দ/ পাপী/ বদমাইশ তাকে তোমরা প্রতিরোধ করো না।) কেরি ও কিতাবুল মোকদ্দস-২০১৩: “তোমরা দুষ্টের প্রতিরোধ করিও না; (বরং যে কেউ তোমার দক্ষিণ গালে চড় মারে, অন্য গাল তাহার দিকে ফিরাইয়া দেও।)” জুবিলী বাইবেলের অনুবাদ: “দুর্জনকে প্রতিরোধ করো না…।”
এর বিপরীতে পবিত্র বাইবেল ২০০০ ও কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬: “তোমাদের সংগে যে কেউ খারাপ ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে কিছুই করো না…”
পাঠক হয়ত বলবেন, অর্থ তো কাছাকাছিই! কিন্তু ধর্মগ্রন্থের মূল পাঠে কি লেখা আছে? “তোমাদের সংগে যে কেউ খারাপ ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে কিছুই করো না”? এ কথাটার ইংরেজি কী? পবিত্র গ্রন্থের মধ্যে এরূপ সংযোজন ও বিয়োজন কি অনুবাদের বিশ্বস্ততা ও ধর্মগ্রন্থের পবিত্রতা রক্ষা করে?
প্রকৃত বিষয় হল, যীশুর এ বাক্যটা অনেক সমালোচনা কুড়িয়েছে। দুষ্টকে প্রতিরোধ না করলে সমাজ টিকবে কি করে? সম্ভবত এজন্য অনুবাদকরা অর্থকে সহনীয় করার চেষ্টা করেছেন। তবে এতে পবিত্র পুস্তকের অর্থ বিকৃতি ছাড়া কোনো লাভ হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ এক্ষেত্রেও প্রশ্ন একই থাকে। আমাদের সন্তানদেরকে কি আমরা এটাই শিক্ষা দেব? তোমাদের কেউ মারলে, অত্যাচার করলে, ধর্ষণ করলে, পকেট মারলে…. তোমরা তার বিরুদ্ধে কিছুই বলবে না? বরং আরেকবার অপরাধটা করার সুযোগ দেবে?
চতুর্থ নমুনা: মথি ২৫/১৫ নিম্নরূপ: KJV: And unto one he gave five talents, to another two, and to another one; RSV: to one he gave five talents, to another two, and to another one…

কেরি এবং কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩: “তিনি এক জনকে পাঁচ তালন্ত, অন্য জনকে দুই তালন্ত, এবং আর এক জনকে এক তালন্ত … দিলেন।”
জুবিলী বাইবেল: “একজনকে তিনি পাঁচশ’ মোহর, অন্যজনকে দু’শো মোহর, ও আর একজনকে একশ’ মোহর … দিলেন।”
পবিত্র বাইবেল ২০০০ ও কিতাবুল মোকাদ্দস: “তিনি একজনকে পাঁচহাজার, একজনকে দু’হাজার ও একজনকে এক হাজার টাকা দিলেন।”
আমরা জানি না, বাইবেল সোসাইটিগুলোর নিকট শত ও হাজার একই সংখ্যা কি না! তবে আমরা দেখছি যে, কেরির অনুবাদ মূলাশ্রয়ী। তালন্ত (talent) যেহেতু প্রাচীন মুদ্রা, সেহেতু টীকায় তা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তবে ‘এক তালন্ত’-কে ইচ্ছামত ‘এক শত টাকা’ বা ‘এক হাজার টাকা’ বলে অনুবাদ করা মোটেও গ্রহণযোগ্য অনুবাদ বলে গণ্য নয়।
পঞ্চম নমুনা: মার্ক ১৬/১৫: KJV: Go ye into all the world, and preach the gospel to every creature. RSV: Go into all the world and preach the gospel to the whole creation
উভয় ভার্শনের অর্থ এক। কেরি এবং কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩: “তোমরা সমুদয় জগতে যাও, সমস্ত সৃষ্টির নিকটে সুসমাচার প্রচার/তবলিগ কর।” জুবিলী বাইবেলের অনুবাদ: “তোমরা বিশ্বজগতে বেরিয়ে পড়, সমস্ত সৃষ্টির কাছে সুসমাচার প্রচার কর।” কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬-এর অনুবাদ: “তোমরা দুনিয়ার সব জায়গায় যাও এবং সব লোকদের কাছে আল্লাহর দেওয়া সুসংবাদ তবলিগ কর।”
এখানে every creature/ the whole creation বা ‘প্রত্যেক সৃষ্টি/ সকল সৃষ্টি’ বাক্যাংশের অনুবাদ করা হয়েছে: ‘সব লোকদের’। এ অনুবাদের মাধ্যমে যীশুর মূল নির্দেশ পরিবর্তন করা হয়েছে। সৃষ্টি আর লোক এক নয়। সৃষ্টি অর্থ মানুষ ও অন্যান্য সকল সৃষ্টি। পক্ষান্তরে লোক বলতে মানুষ বুঝানো হয়। ইংরেজিতে সব লোকদের বুঝাতে ‘every man, every person/ all people’ ইত্যাদি বলা হবে।
বাহ্যত এ পরিবর্তনের বাহ্যিক কারণ বাইবেল সমালোচকদের তীর। তারা বলেন, যীশু সকল সৃষ্টির কাছে গসপেল বা ইঞ্জিল প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন। আর সৃষ্টি বলতে মাছ, পাখি, সাপ, বিচ্ছু সবই বুঝায়। খ্রিষ্টান প্রচারকরা কখনোই এগুলোর কাছে ইঞ্জিল প্রচার করেন না! এ সমালোচনা থেকে বাঁচতেই সম্ভবত এরূপ বিকৃতি। গ্রহণযোগ্য ধর্মগ্রন্থের জন্য যীশুর নির্দেশকে অবিকৃতি রেখে ব্যাখ্যা করাই কি উত্তম ছিল না?
ষষ্ঠ নমুনা: ‘লূক’ ৯/২৮: KJV: And it came to pass about an eight days after these sayings, he took Peter and John and James, and went up into a mountain to pray. RSV: Now about eight days after these sayings, he took Peter and John and James, and went up on the mountain to pray.
কেরির অনুবাদ: এই সকল কথা বলিবার পরে, অনুমান আট দিন গত হইলে তিনি পিতর, যোহন ও যাকোবকে সঙ্গে লইয়া প্রার্থনা করিবার জন্য পর্বতে উঠিলেন।” জুবিলী বাইবেল ও কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩ সংস্করণের অনুবাদেও ‘আনুমানিক আট দিন’ বলা হয়েছে। কিন্তু পবিত্র বাইবেল ২০০০ ও কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬-এ (eight days)-এর অনুবাদে ‘এক সপ্তাহ’ বলা হয়েছে।
পবিত্র বাইবেল-২০০০: “এই সব কথা বলবার প্রায় এক সপ্তা পরে যীশু প্রার্থনা করবার জন্য পিতর, যোহন ও যাকোবকে নিয়ে একটা পাহাড়ে গেলেন।” কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩: “এই সব কথা বলবার প্রায় এক সপ্তা পরে ঈসা মুনাজাত করবার জন্য পিতর, ইউহোন্না ও ইয়াকুবকে নিয়ে একটা পাহাড়ে গেলেন।”
আমরা জানি না, অনুবাদকদের কাছে এক সপ্তাহ এবং আট দিন একই কিনা অথবা তাদের সপ্তাহ আট দিনে হয় কি না! তবে মূল ভাষ্যের ‘৮ দিন’ কথাকে এভাবে ইচ্ছমত এক সপ্তা বানানো কখনোই গ্রহণযোগ্য অনুবাদ নয়।
সপ্তম নমুনা: লূক ১০/১৯:KJV: Behold, I give unto you power to tread on serpents and scorpions, and over all the power of the enemy: and nothing shall by any means hurt you. RSV: Behold, I have given you the authority to tread on serpents and scorpions and over all the power of the enemy: and nothing shall by hurt you.
পাঠক দেখছেন যে উভয় সংস্করণের অর্থ: “দেখ, আমি তোমাদেরকে সাপ ও বিচ্ছুর উপর দিয়ে হেঁটে যাবার ক্ষমতা দিয়েছি এবং শত্রুর সকল শক্তির উপরে কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা দিয়েছি। কোনো কিছুই কোনোভাবে তোমাদের ক্ষতি করবে না।”
কেরি: “দেখ, আমি তোমাদেরকে সর্প ও বৃশ্চিক পদতলে দলিত করিবার, এবং শত্রুর সমস্ত শক্তির উপর কর্তৃত্ব করিবার ক্ষমতা দিয়াছি। কিছুতেই কোনো মতে তোমাদের কোনো হানি করিবে না।” কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩ কেরির অনুরূপ।
পবিত্র বাইবেল ২০০০ ও কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬: “আমি তোমাদেরকে সাপ ও বিছার উপর দিয়ে হেঁটে যাবার ক্ষমতা দিয়েছি এবং তোমাদের শত্রু শয়তানের সমস্ত শক্তির উপরেও ক্ষমতা দিয়েছি। কোনো কিছুই তোমাদের ক্ষতি করবে না।”
এখানে ‘শয়তান’ শব্দটা অনুবাদের মধ্যে সংযোজন করা হয়েছে যা এ শ্লোকের মূল পাঠে কোথাও নেই। এ শ্লোকটা নিয়ে অনেক আপত্তি বিদ্যমান। যীশুর প্রেরিতগণ ও শিষ্যরা কখনোই শত্রুদের উপর ক্ষমতা পাননি। ইহুদি ও রোমানরা তাদের ইচ্ছামত নির্যাতন ও হত্যা করেছেন। বাহ্যত এ আপত্তি থেকে বাঁচার জন্য এ শব্দকে সংযোজন করা হয়েছে। এভাবে পবিত্র পুস্তকের মধ্যে একটা শব্দ যোগ করা হয়েছে। অথচ পবিত্র পুস্তকের শেষ কথা: যদি কেউ পবিত্র পুস্তকের মধ্যে একটা শব্দও যোগ করে তবে পবিত্র পুস্তকের সকল অভিশাপ ও গযব তার জন্য যোগ করা হবে! আর এরূপ ‘অভিশপ্ত’ সংযোজন দ্বারা তাঁরা আপত্তি খণ্ডন করতে পারেননি। কারণ, যীশুর দেওয়া এ ক্ষমতা ১২ প্রেরিতের একজন ইস্করিয়োতীয় যিহূদার কোনোই উপকার করতে পারেনি। শয়তান তাকে পুরোপুরিই গ্রাস করে।
অষ্টম নমুনা: নতুন নিয়মের চতুর্থ পুস্তক যোহন বা ইউহোন্না। যোহন ১২/২৫ ইংরেজিতে নিম্নরূপ: KJV: “He that loveth his life shall lose it; and he that hateth his life in this world shall keep it unto life eternal”. RSV: “He wjp loves his life loses it; and he who hates his life in this world will keep it for eternal life.” উভয় ভার্শনেই অর্থ: “যে তার নিজ জীবন/ প্রাণ ভালবাসবে সে তা হারাবে; এবং যে এ জগতে তার নিজের জীবন ঘৃণা করবে সে অনন্ত জীবনের জন্য তা সংরক্ষণ করবে।”
কেরির অনুবাদ: “যে আপন প্রাণ ভালবাসে সে তাহা হারায়; আর যে এই জগতে আপন প্রাণ অপ্রিয় জ্ঞান করে, সে অনন্ত জীবনের জন্য তাহা রক্ষা করিবে।” কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩ কেরির অনুবাদের অনুরূপ।
পবিত্র বাইবেল-২০০০ এবং কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬ নিম্নরূপ: “যে নিজের প্রাণকে বেশী ভালবাসে সে তার সত্যিকারের জীবন হারায়, কিন্তু যে এই দুনিয়াতে তা করে না সে তার সত্যিকারের জীবন অনন্ত জীবনের জন্য রক্ষা করবে।”
আমরা দেখছি যে, কেরির অনুবাদ মূলানুগ। শুধু ‘হেট’ বা ঘৃণা করাকে ‘অপ্রিয় জ্ঞান করা’ লেখা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী অনুবাদ খুবই একেবারেই ভিন্ন অর্থবাহী। সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে মূল অর্থ পরিবর্তন করে ‘বেশী’ শব্দটা যোগ করা হয়েছে। একইভাবে মূল বক্তব্য বিনষ্ট করে ‘সত্যিকারের জীবন’ শব্দদু’টো যোগ করা হয়েছে। আর হেট বা ঘৃণা করা শব্দটা বেমালুম চেপে যেয়ে ‘তা না করে’ বলা হয়েছে। ‘তা না করা’ অর্থাৎ কোনো কিছুকে ‘বেশি ভাল না বাসা’ কি ‘হেট’ বা ঘৃণা করার সমার্থক? বিশ্বের কোনো ভাষায় কি তা আছে? কোনো বিবেকবান মানুষ কি তা বলবেন? আমি আমার কোনো বন্ধুকে কম ভালবাসি- এর অর্থ কি আমি তাকে ঘৃণা করি?
কোনো ছাত্র যদি গ্রামার পরীক্ষায় এরূপ স্বাধীন বা স্বেচ্ছাচারী ব্যাখ্যাসমৃদ্ধ অনুবাদ করে তবে শিক্ষক কিভাবে তার মূল্যায়ন করবেন? কোনো আর্থিক বা রাজনৈতিক ডকুমেন্টের এরূপ অনুবাদ করা হলে তা কি ‘অপরাধ’ বলে গণ্য করা হবে না? এরূপ বিকৃতির কারণ বুঝতে পারা পাঠকের জন্য হয়ত কঠিন হতে পারে। ইঞ্জিলের এ বক্তব্যটা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও গবেষকদের প্রচুর সমালোচনা কুড়িয়েছে। কারণ নিজের জীবনকে ভালবাসা সহজাত মানবীয় প্রকৃতি। কাউকে বলা যায় যে, তুমি জীবনের চেয়ে দেশ, রাষ্ট্র, ধর্ম বা ঈশ্বরকে বেশি ভালবাসবে। কিন্তু এ কথা বলা যায় না যে, জীবনকে ভালবাসলেই তুমি চাকরি বা অনন্ত জীবন হারাবে। এজন্য যীশুর নামে কথিত বক্তব্যটা খুবই আপত্তিকর।
অন্যদিকে অনন্ত জীবন লাভ করতে জীবনকে ঘৃণা করতে হবে কথাটাও একই রকম অগ্রহণযোগ্য। কেউ যদি জীবনকে ঘৃণা-ই করে তবে তাকে অনন্তকালের জন্য রক্ষার চেষ্টা করবে কেন? জীবনের প্রতি প্রেমই তো তাকে তা অনন্তকালের জন্য রক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করে। জীবনের প্রতি ঘৃণা মানুষকে অসুস্থ ও অপ্রকৃতস্থ করে।[21]

বস্তুত যীশুর নামে ইঞ্জিলের মধ্যে লিখিত অনেক কথাই এধরনের প্রান্তিক। দ্বিতীয় শতাব্দীর খ্রিষ্টান সন্ন্যাসী ও জ্ঞানবাদী বা ‘মারফতি’ (Gnostic) সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে এসব ‘প্রান্তিক’ আবেগী কথাগুলো খুবই বাজার পেত। সম্ভবত এগুলো যীশুর নামে বানানো কথা। সর্বাবস্থায় এগুলোর ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, কিন্তু মূল বক্তব্যের মধ্যে মানবীয় ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়ে তাকে যীশুর বা ঈশ্বরের কথা বলে চালানো কি ধর্ম, মানবতা, বিবেক বা জাগতিক আইনে গ্রহণযোগ্য?
নবম নমুনা: রোমীয় ৩/৭: KJV: “For if the truth of God hath more abounded through my lie unto his glory; why yet am I also judged as a sinner?” (তার গৌরবের প্রতি আমার মিথ্যায় ঈশ্বরের সত্য যদি অধিকমাত্রায় উপচে পড়ে তবে আমি কেন পাপী বলে বিচারিত হই?)। RSV: But if through my false-hood God’s truthfulness abounds to his goory, why am I still being cindermned as a sinner? (যদি আমার মিথ্যাচারিতার মাধ্যমে ঈশ্বরের সত্যবাদিতা তাঁর মর্যাদায় উপচে পড়ে তবে এরপরও আমিও কেন পাপী বলে নিন্দিত হচ্ছি?)
কেরির অনুবাদ: “কিন্তু আমার মিথ্যায় যদি ঈশ্বরের সত্য তাঁহার গৌরবার্থে উপচিয়া পড়ে, তবে আমিও বা এখন পাপী বলিয়া আর বিচারিত হইতেছি কেন?”
কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩: “কিন্তু আমার মিথ্যায় যদি আল্লাহর সত্য তাঁর গৌরবার্থে উপচে পড়ে, তবে আমিও বা এখন গুনাহগার বলে আর বিচারের সম্মুখীন হচ্ছি কেন?”
জুবিলী বাইবেল: “কিন্তু আমার মিথ্যাচারিতায় যদি ঈশ্বরের সত্যনিষ্ঠা তাঁর গৌরবার্থে উপচে পড়ে, তবে আমি কেনই বা এখনও পাপী বলে বিবেচিত হচ্ছি?”
পবিত্র বাইবেল ২০০০ এবং কিতাবুল মোকাদ্দস ২০০৬: “কেউ হয়ত বলবে, আমার মিথ্যা কথা বলবার দরুন আরও ভালভাবে প্রকাশ পায় যে, ঈশ্বর/ আল্লাহ সত্যবাদী। এতে যখন ঈশ্বর/ আল্লাহ গৌরব লাভ করেন তখন পাপী/ গুনাহগার বলে আমাকে দোষী করা হয় কেন?”
সম্মানিত পাঠক, আপনি দেখছেন যে, ‘কেউ হয়ত বলবে’ কথাটুকু এ শ্লোকের কোনো ইংরেজি পাঠে নেই, প্রথমে উদ্ধৃত বাংলা অনুবাদেও নেই।সর্বশেষ দুটো অনুবাদে ‘কেউ হয়ত বলবে’ কথাটুকু সংযোজন করে পুরো বক্তব্যের অর্থই পরিবর্তন করা হয়েছে।
মূলত সাধু পল তার বিভিন্ন পত্রে বারবার বলেছেন যে, তিনি বহুরূপী। ঈশ্বরের ধর্ম বিস্তারের স্বার্থে তিনি প্রত্যেকের মন জুগিয়ে ভিন্ন কথা বলেন বা মিথ্যা কথা বলেন (দেখুন ১ করিন্থীয় ৯/ ১৯-২২)। এ কথাটাই তিনি এখানে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। কিন্তু একটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বাক্যাংশ সংযোজন করে মূল কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলা হয়েছে। বাহ্যত তাঁর স্বস্বীকৃত মিথ্যাচার অস্পষ্ট করার জন্যই এরূপ করা হয়েছে।
দশম নমুনা: করিন্থীয়দের প্রতি প্রেরিত পলের ১ম পত্রের ১৫ অধ্যায়ে পল যীশু খ্রিষ্টের মৃত্যু ও পুনরুত্থানের পর যে সকল শিষ্যের সাথে সাক্ষাৎ করেন তাঁদের নাম উল্লেখ করেছেন। ১৫ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোকটা KJV ও RSV এবং সকল বাইবেলে: “And that he was seen of Cephas, then of the twelve”
কেরি ও কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩: “আর তিনি কৈফাকে, পরে সেই বারো জনকে দেখা দিলেন।”
পবিত্র বাইবেলে ২০০০ এবং কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬: “আর তিনি পিতরকে এবং পরে তাঁর প্রেরিতদের/ সাহাবীদের দেখা দিয়েছিলেন।”
প্রথম অনুবাদ মূলাশ্রয়ী। কিন্তু দ্বিতীয় অনুবাদে ‘the twelve’ বা ‘সেই বারোজন’ পরিবর্তন করে ‘প্রেরিতদের’ এবং ‘সাহাবীদের’ লেখা হয়েছে। এভাবে মূলের পরিবর্তন ছাড়াও অসাধু সম্পাদনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
এখানে সাধু পল ভুল করেছেন। যীশু মৃত্যু থেকে উঠার পরে যখন প্রেরিতদের সাথে সাক্ষাৎ করেন তখন ‘সেই বারো’ জনের একজন ঈষ্করিয়োতীয় যিহূদা মৃত্যু বরণ করেছিলেন। ফলে প্রেরিতদের সংখ্যা ছিল ১১ জন। এজন্য সাধু পলের কথাটা এখানে ভুল। এ ভুল দ্বারা প্রমাণ হয় যে, সাধু পল পবিত্র আত্মার সাহায্যে তাঁর পত্রগুলো লেখেননি। বরং সাধারণ একজন ধর্ম প্রচারক হিসেবেই লেখেছেন। এজন্য তাঁর ভুল হত। বাহ্যত এ ভুলটা লুকানোর জন্য মূলকে পরিবর্তন করা হয়েছে।
একাদশ নমুনা: করিন্থীয়দের প্রতি প্রেরিত পলের দ্বিতীয় পত্রের শেষে (১৩/১২) পল লেখেছেন: “Greet one another with an holy kiss: একে অপরকে সালাম জানাবে একটা পবিত্র চুমু দিয়ে।” কেরির অনুবাদ: “পবিত্র চুম্বনে পরস্পরকে মঙ্গলবাদ কর।” কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩: “পবিত্র চুম্বনে পরস্পরকে সালাম জানাও।” কিন্তু পবিত্র বাইবেল ২০০০ এবং কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: “মহব্বতের মনোভাব নিয়ে তোমরা একে অপরকে সালাম জানায়ো।”
সুপ্রিয় পাঠক, অনুবাদটা কেমন মনে হচ্ছে? পরীক্ষার খাতায় যদি কেউ লেখে যে, ‘holy kiss’-এর অর্থ ‘মহব্বতের মনোভাব’ তবে নিরপেক্ষ পরীক্ষক তাকে কেমন নম্বর দেবেন? কোনো মামলা-মোকদ্দমার কাগজে ‘kiss’-এর অনুবাদে মহব্বতের মনোভাব লেখলে কি বিচারক সঠিক বিচার করতে পারবেন? এ অনুবাদটা শুধু বিকৃতই নয়; উপরন্ত এতে ধর্মগ্রন্থের শিক্ষাকেও বিকৃত করা হয়েছে। ধর্মগ্রন্থ নির্দেশ দিচ্ছে ‘চুম্বন’-এর দ্বারা ‘সালাম’ দিতে। অথচ ‘কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬’ পাঠ করে কোনো খ্রিষ্টানই ঈশ্বরের এ পবিত্র নির্দেশ বুঝতে বা পালন করতে পারবেন না।
দ্বাদশ নমুনা: নতুন নিয়মের ঊনবিংশ পুস্তক ‘ইব্রীয়’। বিগত প্রায় দু’ হাজার বছর যাবৎ পত্রটা সাধু পলের লেখা বলে প্রচার করা হয়েছে। বর্তমানে বাইবেল সোসাইটিগুলো পত্রটা বেনামি ও অজ্ঞাতপরিচয় লেখকের লেখা বলে প্রচার করছেন। এ পত্রের ৬ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোক কিং জেমস ভার্শন (KJV)-এ নিম্নরূপ: “Therefore leaving the principles of the doctrine of Christ, let us go on perfection” (অতএব, খ্রিষ্টের শিক্ষার মূলনীতিগুলো পরিত্যাগ করে আসুন আমরা পূর্ণতার দিকে গমন করি) রিভাইজড স্টান্ডার্ড ভার্শন (RSV) নিম্নরূপ: “Therefore let us leave the elementary doctrine of Christ and go on to maturity” (অতএব আসুন আমরা খ্রিষ্টের প্রাথমিক শিক্ষা পরিত্যাগ করি এবং পরিপক্কতার দিকে গমন করি)।
এখানে সাধু পলের (বা অজ্ঞাতপরিচয় লেখকের?) বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। তিনি বলছেন যে, খ্রিষ্টের শিক্ষা ছিল প্রাথমিক এবং সাধু পলের (বা অজ্ঞাত লেখকের?) শিক্ষা উন্নত স্তরের। কাজেই প্রাথমিককে পিছে রেখে উন্নত স্তরে এগিয়ে যেতে হবে।
সম্মানিত পাঠক যদি biblegateway.com ওয়েবসাইটে ইব্রীয় ৬/১-এর সকল ইংরেজি মিলিয়ে পড়েন তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হবেন। যদিও কোনো কোনো ইংরেজি অনুবাদে বিষয়টাকে কিছুটা অস্পষ্ট করা হয়েছে, অধিকাংশ অনুবাদেই বিষয়টা সুস্পষ্ট। যেমন এমপ্লিফাইড বাইবেল (Amplified Bible)-এর পাঠ নিম্নরূপ:
Therefore let us go on and get past the elementary stage in the teachings and doctrine of Christ (the Messiah), advancing steadily toward the completeness and perfection that belong to spiritual maturity. “অতএব, এস, আমরা খ্রিষ্টের নীতি ও শিক্ষার প্রাথমিক স্তর পিছনে রেখে চলে যাই, স্থিরভাবে এগিয়ে যাই পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার দিকে, যা আধ্যাত্মিক পরিপক্কতার অন্তর্ভুক্ত।”
পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব যে, যীশুর শিষ্যরা অনেকেই যীশুর শিক্ষা অনুসারে তৌরাতের শরীয়ত পালন করাকে গুরুত্ব দিতেন। পক্ষান্তরে সাধু পল শরীয়ত পালনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এজন্য শিষ্যরা অনেকেই পলের বিরোধিতা করেছেন। এ বিরোধিতাকে পাশ কাটাতে তিনি এখানে ‘ খ্রিষ্টান’ বা ‘খ্রিস্টীয় শিক্ষাকে’ প্রাথমিক ও পূর্ণতার পরিপন্থী এবং তাঁর নিজের পলীয় শিক্ষাকে পূর্ণতর বলে দাবি করেছেন। অর্থাৎ যীশু খ্রিষ্ট প্রাইমারি ও সাধু পল বিশ্ববিদ্যালয়!
কিন্তু বাংলা অনুবাদে বিষয়টা অস্পষ্ট। কেরির অনুবাদ: “অতএব আইস, আমরা খ্রিষ্ট বিষয়ক আদিম কথা পশ্চাতে ফেলিয়া সিদ্ধির চেষ্টায় অগ্রসর হই।” জুবিলী বাইবেলের অনুবাদ নিম্নরূপ: “সুতরাং এসো, খ্রিষ্ট বিষয়ক প্রাথমিক শিক্ষা পাশে রেখে আমরা সিদ্ধতার কথার দিকে এগিয়ে যাই।” পবিত্র বাইবেল ২০০০: “এইজন্য খ্রিষ্টের বিষয়ে প্রথমে যে শিক্ষা পেয়েছি, এস, তা ছাড়িয়ে আমরা পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাই।” কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬: “এজন্য মসীহের বিষয়ে প্রথমে যে শিক্ষা পেয়েছি, এস, তা ছাড়িয়ে আমরা পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাই।” কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩: “অতএব এসো, আমরা মসীহ বিষয়ক প্রাথমিক শিক্ষার কথা পিছনে ফেলে পরিপক্কতা লাভের চেষ্টায় অগ্রসর হই।”
যদিও সকল সম্পাদনার পরেও এ বক্তব্য নিশ্চিত করছে যে, যীশুর বিষয়ে প্রথমে যে শিক্ষা যীশুর প্রেরিতরা ও যীশুকে স্বচক্ষে দেখা শিষ্যরা প্রচার করেছিলেন সেগুলো পূর্ণতার পরিপন্থী, বাতিলযোগ্য ও পলীয় ধারার শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক।
বাইবেলের বঙ্গানুবাদে এরূপ হেরফের অগণিত। সবচেয়ে অবাক বিষয় যে, এরূপ বিকৃতি সবই ধার্মিক মানুষেরা করছেন, যারা পবিত্র বাইবেলকে অভ্রান্ত ঐশী বাণী বলে বিশ্বাস করেন। আর বাইবেলের মধ্যেই মিথ্যাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, মিথ্যাবাদীকে চির জাহান্নামী বলে উল্লেখ করা হয়েছে, বাইবেলের মধ্যে সামান্যতম সংযোজন বা বিয়োজন নিষেধ করা হয়েছে এবং কেউ এরূপ করলে তার জন্য ভয়ঙ্করতম অভিশাপ ও পরিণতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। (লেবীয় ১৯/১১; হিতোপদেশ ১২/২২, মথি ১২/৩১-৩২, প্রকাশিত বাক্য ২১/৮, ২২/১৮-১৯)
সর্বাবস্থায়, বঙ্গানুবাদের এ হেরফেরের কারণে আমরা বাইবেলের বাংলা উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে কেরির অনুবাদের উপর নির্ভর করব। সহজবোধ্য হওয়ার জন্য কখনো কখনো পরবর্তী অনুবাদের উপরও নির্ভর করব। পাশাপাশি ইংরেজি অথোরাইজড ভার্শন/কিং জেমস ভার্শন (AV/KJV), রিভাইজড স্ট্যান্ডার্ড ভার্শন (RSV) ও অন্যান্য ইংরেজি অনুবাদের সহায়তা গ্রহণ করব।

সূচীপত্রে ফিরে চলুন

প্রথম অধ্যায়: বাইবেল পরিচিতি (৪র্থ পর্ব)

১. ৪. বাইবেলীয় পুস্তকগুলোর বাংলা নাম

১. ৪. ১. নামের অনুবাদ ও অনুবাদের হেরফের

জাগতিক কোনো ডকুমেন্টের মধ্যে নিজস্ব নাম (ঢ়ৎড়ঢ়বৎ হড়ঁহ)-এর আক্ষরিক বা আভিধানিক অনুবাদ বিকৃতি/পরিবর্তন বা অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য। তবে খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা ধর্মগ্রন্থের অনুবাদের ক্ষেত্রে নিজস্ব নাম (ঢ়ৎড়ঢ়বৎ হড়ঁহ)-এর অনুবাদ করেন। বাইবেলের নামের ক্ষেত্রে যেরূপ, বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান গ্রন্থগুলোর নামের ক্ষেত্রেও আমরা তদ্রƒপই দেখতে পাই। একইভাবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে ধর্ম প্রচারের জন্য তারা একই ভাষায় বিভিন্নভাবে নামকরণ করেন। এজন্য অনেক সময় তথ্যসূত্র বা রেফারেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে খুবই অসুবিধা হয়। যেমন বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান প্রথম পুস্তকটার ইংরেজি নাম ‘ঞযব ইড়ড়শ ড়ভ এবহবংরং’, অর্থাৎ সূচনাপুস্তক বা সৃষ্টিপুস্তক। বাংলা বাইবেলের বিভিন্ন সংস্করণে এ বইটার বাংলা নাম ‘আদিপুস্তক’। কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দস নামক বাইবেলে এ বইটার নাম ‘পয়দায়েশ’। এখন তথ্যসূত্রে ‘আদিপুস্তক’ লেখা হলে সাধারণ পাঠক পুরো ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ ঘেটেও এ বইটা খুঁজে পাবেন না। আবার ‘পয়দায়েশ’ লেখা হলে প্রচলিত বাংলা বাইবেলের কোথাও তা খুঁজে পাবেন না। ফলে তিনি বিব্রত হবেন অথবা তথ্যসূত্র প্রদানকারীর প্রতি সন্দিহান বা বিরক্ত হবেন। বাইবেলের প্রায় সকল পুস্তকের ক্ষেত্রেই নামের এরূপ হেরফের বিদ্যমান। এজন্য বাইবেল বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা ও উদ্ধৃতি প্রদানের পূর্বে আমরা বাংলা বাইবেলের বিভিন্ন সংস্করণে ব্যবহৃত বাংলা নামগুলো এখানে উল্লেখ করছি। স¦ভাবতই আমরা এখানে শুধু ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান পুস্তকগুলোর বাংলা নাম উল্লেখ করছি। কারণ অন্য কোনো বাইবেল বাংলায় অনুবাদ করা হয়নি।

১. ৪. ২. বাইবেলীয় পুস্তকগুলোর বিভিন্ন বাংলা নাম

প্রথমত: পুরাতন নিয়ম

ইংরেজি নাম পবিত্র বাইবেল: জুবিলী পবিত্র বাইবেল: কেরি কিতাবুল মোকাদ্দস
Genesis আদিপুস্তক আদিপুস্তক পয়দায়েশ
Exodus যাত্রাপুস্তক যাত্রাপুস্তক হিজরত
Leviticus লেবীয় পুস্তক লেবীয় পুস্তক লেবীয়
Numbers গণনা পুস্তক গণনা পুস্তক দ্দমারী
Deuteronomy দ্বিতীয় বিবরণ দ্বিতীয় বিবরণ দ্বিতীয় বিবরণ
Joshua যোশুয়া যিহোশূয় ইউসা
Judges বিচারকচরিত বিচারকর্তৃগণ কাজীগণ
Ruth রূথ রূত রূত
1 Samuel সামুয়েল ১ম পুস্তক ১ শমূয়েল ১ শামুয়েল
2 Samuel সামুয়েল ২য় পুস্তক ২ শমূয়েল ২ শামুয়েল
1 Kings রাজাবলি ১ম পুস্তক ১ রাজাবলি ১ বাদশাহনামা
2 Kings রাজাবলি ২য় পুস্তক ২ রাজাবলি ২ বাদশাহনামা
1 Chronicles বংশাবলি ১ম পুস্তক ১ বংশাবলি ১ খান্দাননামা
2 Chronicles বংশাবলি ২য় পুস্তক ২ বংশাবলি ২ খান্দাননামা
Ezra এজরা ইষ্রা উযায়ের
Nehemiah নেহেমিয়া ইহিমিয় ইহিমিয়া
Tobias তোবিত পুরো বইটা জাল গণ্যে বাতিলকৃত (১)
Judith যুদিথ পুরো বইটা জাল গণ্যে বাতিলকৃত (২)
Esther এস্থার ইষ্টের ইষ্টের
1st Machabees মাকাবীয় ১ম পুস্তক পুরো বইটা জাল গণ্যে বাতিলকৃত (৩)
2nd Machabees মাকাবীয় ২য় পুস্তক পুরো বইটা জাল গণ্যে বাতিলকৃত (৪)
Job যোব ইয়োব আইয়ুব
Psalms সামসঙ্গীত মালা গীতসংহিতা জবুর শরীফ
Proverbs প্রবচনমালা হিতোপদেশ মেসাল
Ecclesiastes উপদেশক উপদেশক হেদায়েতকারী
Song of Solomon পরম গীত পরমগীত সোলায়মান
The Book of Wisdom প্রজ্ঞা পুস্তক পুরো বইটা জাল গণ্যে বাতিলকৃত (৫)
Ecclesiasticus: Sirach বেন-সিরা পুরো বইটা জাল গণ্যে বাতিলকৃত (৬)
Isaiah ইসাইয়া যিশাইয় ইশাইয়া
Jeremiah যেরেমিয়া ডযরমিয় ইয়ারমিয়া
Lamentations বিলাপ-গাঁথা বিলাপ মাতম
Baruch বারুক পুরো বইটা জাল গণ্যে বাতিলকৃত (৭)
Ezekiel এজেকিয়েল যিহিষ্কেল হেজকিল/ ইহিস্কেল
Daniel দানিয়েল দানিয়েল দানিয়েল
Hosea হোসেয়া হোশেয় হোসিয়া
Joel যোয়েল যোয়েল যোয়েল
Amos আমোস আমোষ আমোস
Obadiah ওবাদিয়া ওবদিয় ওবদিয়
Jonah যোনা যোনা ইউনুস
Micah মিখা মীখা মিকাহ্
Nahum ইাহুম নহূম নাহূম
Habakkuk হাবাকুক হবক্কুক হাবাক্কুক
Zephaniah জেফানিয়া গফনিয় গফনিয়
Haggai হগয় হগয় হগয়
Zechariah জাখারিয়া সখরিয় জাকারিয়া
Malachi মালাখি মালাখি মালাখি

দ্বিতীয়ত: নতুন নিয়ম

ইংরেজি নাম পবিত্র বাইবেল: জুবিলী পবিত্র বাইবেল: কেরি কিতাবুল মোকাদ্দস
The Gospel According to Matthew মথি মথি মথি
The Gospel According to Mark মার্ক মার্ক মার্ক
The Gospel According to Luke লুক লূক লূক
The Gospel According to John যোহন যোহন ইউহোন্না
The Acts of the Apostles শিষ্যচরিত প্রেরিত প্রেরিত
The Letter of Paul to the Romans রোমীয় রোমীয় রোমীয়
The 1st Letter of Paul to the Corinthians ১ করিন্থীয় ১ করিন্থীয় ১ করিন্থীয়
The 2nd Letter of Paul to the Corinthians ২ করিন্থীয় ২ করিন্থীয় ২ করিন্থীয়
The Letter of Paul to the Galatians গালাতীয় গালাতীয় গালাতীয়
The Letter of Paul to the Ephesians এফেসীয় ইফিষীয় ইফিষীয়
The Letter of Paul to the Philippians ফিলিপ্পীয় ফিলিপীয় ফিলিপীয়
The Letter of Paul to the Colossians কলসীয় কলসীয় কলসীয়
The 1st Letter of Paul to the Thessalonians ১ থেসালোনিকীয় ১ থিষলনীকীয় ১ থিষলনীকীয়
The 2nd Letter of Paul to the Thessalonians ২ থেসালোনিকীয় ২ থিষলনীকীয় ২ থিষলনীকীয়
The First Letter of Paul to Timothy ১ তিমথি ১ তীমথিয় ১ তীমথিয়
The Second Letter of Paul to Timothy ২ তিমথি ২ তীমথিয় ২ তীমথিয়
The Letter of Paul to Titus তীত তীত তীত
The Letter of Paul to Philemon ফিলেমন ফিলীমন ফিলীমন
The Letter to the Hebrews হিব্রু ইব্রীয় ইবরানী
The Letter of James যাকোব যাকোব ইয়াকুব
The First Letter of Peter ১ পিতর ১ পিতর ১ পিতর
The Second Letter of Peter ২ পিতর ২ পিতর ২ পিতর
The First Letter of John ১ যোহন ১ যোহন ১ ইউহোন্না
The Second Letter of John ২ যোহন ২ যোহন ২ ইউহোন্না
The Third Letter of John ৩ যোহন ৩ যোহন ৩ ইউহোন্না
The Letter of Jude যুদ যিহূদা এহুদা
The Revelation to John প্রত্যাদেশ প্রকাশিত বাক্য প্রকাশিত কালাম

সূচীপত্রে ফিরে চলুন

প্রথম অধ্যায়: বাইবেল পরিচিতি (৩য় পর্ব)

১. ৩. বাইবেলের নতুন নিয়ম

১. ৩. ১. বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভিন্ন ভিন্ন নতুন নিয়ম

আমরা  দেখেছি, খ্রিষ্টান বাইবেলের দ্বিতীয় অংশকে ‘নতুন নিয়ম’ বা ‘নবসন্ধি’বলা হয়। প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক উভয় বাইবেলেই বর্তমানে এ অংশে ২৭টা পুস্তক বিদ্যমান। পুস্তকগুলোর তালিকা প্রদানের পূর্বে নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষণীয়:

প্রথমত: খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে মিসরে খ্রিষ্টানদের মধ্যে মিসরীয় গ্রিক ইঞ্জিল (The Greek Gospel of the Egyptians) প্রচলিত ছিল। গসপেলটা পরবর্তী মিসরীয় কপ্টিক গসপেল ও প্রচলিত নতুন নিয়মের গসপেলগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।খ্রিষ্টানরা ভিন্নমত দমনের সময় ভিন্নমতের মানুষদের নির্মূল করার পাশাপাশি তাদের ধর্মগ্রন্থগুলো নির্মূল করতেন। ফলে প্রাচীন এ গসপেলের পূর্ণাঙ্গ পান্ডুলিপি পাওয়া যায় না। তবে প্রাচীন পন্ডিতদের লেখায় বিভিন্ন উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। এছাড়া টমাসের ইঞ্জিল (The Gospel of Thomas) নামক ইঞ্জিলের পূর্ণাঙ্গ পান্ডুলিপি কিছু দিন আগে মিসরে পাওয়া গেছে এবং মুদ্রিত হয়েছে। গ্রন্থটা প্রচলিত নতুন নিয়মের মধ্যে নেই।[১২]

দ্বিতীয়ত: খ্রিষ্টধর্মের সুতিকাগার ফিলিস্তিন ও বৃহত্তর সিরিয়ার খ্রিষ্টানরা দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই ভিন্ন এক ‘নতুন নিয়ম’-এর উপর নির্ভর করতেন। আসিরীয় টিটান (Tatian the Assyrian) দ্বিতীয় খ্রিষ্টীয় শতকের প্রসিদ্ধ খ্রিষ্টান ধর্মগুরু ছিলেন (জন্ম ১২০ খ্রিষ্টাব্দ, মৃত্যু ১৮০ খ্রিষ্টাব্দ)। তাঁর সংকলিত ইঞ্জিলের নাম ছিল ডায়াটেসারন (the Diatessaron), অর্থাৎ সাদৃশ্যময় (harmony)। তার কর্ম থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দ্বিতীয় খ্রিষ্টীয় শতকে ‘ইঞ্জিল’ নামে অনেক পুস্তক প্রচারিত হতে শুরু করে। তিনি তাঁর গ্রন্থের মধ্যে প্রচলিত ইঞ্জিলগুলোর বিষয় একত্রে সংকলিত করেন। প্রচলিত চার ইঞ্জিলের অনেক বিষয় তাঁর সংকলনে বিদ্যমান।তবে প্রচলিত চার ইঞ্জিলের তথ্যের সাথে তাঁর অনেক তথ্য সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ও ভিন্ন। প্রচলিত চার ইঞ্জিলের মধ্যে বিদ্যমান অনেক প্রসিদ্ধ গল্প ও ঘটনা তিনি বাদ দিয়েছেন। প্রচলিত চার ইঞ্জিলের কোনোটার সাথেই তার পুরো মিল নেই।তার সংকলিত এ বাইবেলটা তৃতীয়-চতুর্থ খ্রিষ্টীয় শতাব্দীতে ফিলিস্তিন ও বৃহত্তর সিরিয়ার খ্রিষ্টানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।

চতুর্থ খ্রিষ্টীয় শতকের প্রসিদ্ধতম খ্রিষ্টান ধর্মগুরু ইউসিবিয়াস (Eusebius) লেখেছেন: “These, indeed, use the Law and Prophets and Gospels, … but … abuse Paul the apostle and set aside his epistles, neiter do they receive the Acts of the Apostles.” “তারা (সিরীয়রা) তোরাহ, নবীগণের পুস্তক ও ইঞ্জিলগুলো ব্যবহার করে।…  তবে … তারা শিষ্য পলকে গালি দেয় এবং তার পত্রগুলো প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি তারা প্রেরিতদের কার্যবিবরণীও গ্রহণ করে না।”[১৩]

এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সিরীয় খ্রিষ্টানদের নতুন নিয়মে বা টিটানের সংকলিত নতুন নিয়মে প্রেরিতদের কার্যবিবরণী ও পলের পত্রাবলির কিছুই ছিল না।

উল্লেখ্য যে, টিটান কঠোর একত্ববাদী খ্রিষ্টান ছিলেন। তিনি যীশুর ঈশ্বরত্বের স্বীকৃতি দেননি। এমনকি মুক্তিলাভের (redemption) জন্য যীশুর নামও তিনি উল্লেখ করেননি। খ্রিষ্টান চার্চ তাকে ধর্মদ্রোহী (heretic) বলে ঘোষণা দেয়। তৎকালীন নিয়ম অনুসারে বিরুদ্ধবাদীদের নির্মূলের সাথে সাথে তাদের ধর্মগ্রন্থও নির্মূল করা হয়। তার স্থান পূরণ করে সিরীয় পেশিট্টা।[১৪]

উইকিপিডিয়ার Development of the New Testament canon প্রবন্ধের Outside the Empire অংশে Syriac Canon অনুচ্ছেদের বক্তব্য:“Moreover, after the pronouncements of the 4th century on the proper content of the Bible, Tatian was declared a heretic and in the early 4th century Bishop Theodoretus of Cyrrhus and Bishop Rabbula of Edessa (both in Syria) rooted out all copies they could find of the Diatessaron and replaced them with the four canonical Gospels (M 215). As a result, no early copies of the Diatessaron survive… .” “সর্বোপরি ৪র্থ শতাব্দীতে বাইবেলের সঠিক বিষয়বস্তু ঘোষণা করার পরে টিটানকে ধর্মদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ৪র্থ শতাব্দীর শুরু থেকে সিরহাসের বিশপ থিওডোরেটাস এবং এডেসার বিশপ রাব্বুলা (উভয়ই সিরিয়ার) ডায়াটেসারনের যত কপির খোঁজ পেয়েছিলেন তার সবই ধ্বংস করেন। তদস্থলে চার্চের বিধিসম্মত গসপেলগুলো প্রবর্তন করেন। ফলে ডায়াটেসারনের প্রাচীন পান্ডুলিপির কিছুই আর টিকে নেই।”

তৃতীয়ত: ডায়াটেসারনের পরে খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত খ্রিষ্টধর্মের সুতিকাগার ফিলিস্তিন বা বৃহত্তর সিরিয়ায় যে ‘নতুন নিয়ম’ প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ ছিল তা সিরীয় পেশিট্টা (Syriac Peshitta) বা সিরীয় সাধারণ সংস্করণ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। সিরীয় ভাষা মূলত যীশু এবং তাঁর শিষ্যদের ব্যবহৃত আরামিক ভাষারই একটা শাখা বা উপভাষা (dialect, or group of dialects, of Eastern Aramaic)। এ বাইবেলের পুরাতন নিয়মটা হিব্রু ভাষা থেকে এবং নতুন নিয়মটা গ্রিক ভাষা থেকে অনূদিত। ৪০০খ্রিষ্টাব্দে মৃত প্রসিদ্ধ ধর্মগুরু সেন্ট ক্যাথেরিনের (St. Catherine) তালিকায় পেশিট্টা নতুন নিয়মে সতেরটা গ্রন্থের তালিকা প্রদান করা হয়েছে। উইকিপিডিয়া Development of the New Testament canon প্রবন্ধের Outside the Empire অংশে Syriac Canon অনুচ্ছেদে উল্লেখ করছে: “McDonald & Sanders 2002, lists the following Syrian catalogue of St. Catherine’s, c.400:Gospels (4): Matt, Mark, Luke, John, Acts, Gal, Rom, Heb, Col, Eph, Phil, 1–2 Thess, 1–2 Tim, Titus, Phlm”

“ম্যাকডোনাল্ড ও সানডারস ২০০২ সেন্ট ক্যাথেরিনের (৪০০ খ্রি.) সিরিয়ান ক্যাটালগ থেকে নিম্নের তালিকা প্রদান করেছেন: চার গসপেল: (১) মথি, (২) মার্ক, (৩) লূক, (৪) যোহন, (৫) প্রেরিত, (৬) গালাতীয়, (৭) রোমীয়, (৮) ইব্রীয়, (৯) কলসীয়, (১০) ইফিসীয়, (১১) ফিলিপীয়, (১২) ১ থিযলনীকীয়, (১৩) ২ থিযলনীকীয়, (১৪) ১ তিমথীয়, (১৫) ২ তিমথীয়, (১৬) তীত, (১৭) ফিলীমন।”

উইকিপিডিয়ার পেশিট্টা (Peshitta) প্রবন্ধের আলোচনাও এটা প্রমাণ করে। উইকিপিডিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করার পূর্বে বাইবেলীয় পুস্তকগুলো সম্পর্কে দুটো খ্রিষ্টীয় পরিভাষা বুঝতে হবে: (ক) এন্টিলেগোমেনা (Antilegomena) এবং (খ) সাধারণীয় পত্রাবলি (General epistles/ Catholic Epistles)

(ক) নতুন নিয়মের কয়েকটা পুস্তককে এন্টিলেগোমেনা (Antilegomena) বা সন্দেহযুক্ত বা বিতর্কিত পুস্তক বলা হয়। চতুর্থ খ্রিষ্টীয় শতকের ইউসিবিয়াস (৩৪০ খ্রি.) তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, এ পুস্তকগুলোকে অনেকে খ্রিষ্টীয় বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত করলেও এগুলোর বিশুদ্ধতা সন্দেহযুক্ত ও বিতর্কিত। এগুলোর মধ্যে প্রচলিত নতুন নিয়মের শেষের ৬টা পুস্তক রয়েছে। সেগুলোর তালিকা নিম্নরূপ:

(১) যাকোবের পত্র (the Epistle of James)। প্রচলিত নতুন নিয়মে ২০ নং।
(২) পিতরের দ্বিতীয় পত্র (2 Peter)। প্রচলিত নতুন নিয়মে ২২ নং।
(৩) যোহনের দ্বিতীয় পত্র (2 John)। প্রচলিত নতুন নিয়মে ২৪ নং।
(৪) যোহনের তৃতীয় পত্র (3 John)। প্রচলিত নতুন নিয়মে ২৫ নং।
(৫) যিহূদার পত্র (the Epistle of Jude)। প্রচলিত নতুন নিয়মে ২৬ নং।
(৬) যোহনের নিকট প্রকাশিত বাক্য (Apocalypse of / The Revelation to John)। প্রচলিত নতুন নিয়মের ২৭ নং পুস্তক।
(৭) পলের কার্যবিবরণী (Acts of Paul),
(৮) হারমাসের রাখাল (the Shepherd of Hermas),
(৯) বার্নাবাসের পত্র (the Epistle of Barnabas) (১১) ডিডাচে (the Didache) বা ১২ শিষ্যের শিক্ষা।
(১০) পিতরের নিকট প্রকাশিত পত্র (the Apocalypse of Peter),
(১১)  ইব্রীয়গণের সুসমাচার (the Gospel of the Hebrews/ the gospel according to Hebrews)।

সর্বশেষ পুস্তকদুটো কোনো খ্রিষ্টান বাইবেলেই অন্তর্ভুক্ত হয়নি। প্রথম ৬টা পুস্তক প্রচলিত নতুন নিয়মের মধ্যে সংযোজিত। পরবর্তী তিনটা পুস্তকও কোনো কোনো খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বাইবেলে বা প্রাচীন পান্ডুলিপিতে পাওয়া যায়।[১৫]

(খ) দ্বিতীয় পরিভাষা সাধারণ পত্রাবলি। উইকিপিডিয়ার সাধারণ পত্রাবলি (General epistles/ Catholic Epistles) আর্টিকেলে এগুলোর তালিকা নিম্নরূপ:

(১) ইব্রীয়গণের প্রতি পত্র (Epistle to the Hebrews),
(২) যাকবের পত্র (Letter of James),
(৩) পিতরের প্রথম পত্র (First Epistle of Peter),
(৪) পিতরের দ্বিতীয় পত্র (Second Epistle of Peter),
(৫) যোহনের প্রথম পত্র (First Epistle of John),
(৬) যোহনের দ্বিতীয় পত্র (Second Epistle of John),
(৭) যোহনের তৃতীয় পত্র (Third Epistle of John),
(৮) যিহুদার পত্র (Epistle of Jude)

উইকিপিডিয়া (Wikipedia) বিশ্বকোষের পেশিট্টা (Peshitta) আর্টিকেলের সিরীয় নতুন নিয়ম (Syriac New Testament) অনুচ্ছেদে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

“One thing is certain, that the earliest New Testament of the Syriac church lacked not only the Antilegomena… but the whole of the Catholic Epistles.”

অর্থাৎ “একটি বিষয় নিশ্চিত যে, সিরীয় চার্চের প্রাচীনতম এ ‘নতুন নিয়মে’-র মধ্যে এন্টিলেগোমেনা (Antilegomena) বা সন্দেহযুক্ত পুস্তকগুলো তো নেই-ই, উপরন্তু ‘সাধারণীয় পত্রগুলোর’ কোনোটাই এর মধ্যে নেই।”

এভাবে আমরা দেখছি যে, প্রচলিত নতুন নিয়মের শেষের পুস্তিকাগুলো সিরীয় নতুন নিয়মের মধ্যে ছিল না। সিরীয় নতুন নিয়ম ছিল মূলত ৪ ইঞ্জিল, প্রেরিতগণের কার্যবিবরণী পুস্তক ও সাধু পলের পত্রাবলি। বর্তমানে নতুন নিয়মে সাধু পলের নামে ১৪টা পত্র বিদ্যমান। সেন্ট ক্যাথেরিনের বর্ণনা অনুসারে ১ ও ২ করিন্থীয় পেশিট্টার অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তবে ইব্রীয় পুস্তকটা ছিল। পক্ষান্তরে উইকিপিডিয়ার বর্ণনা অনুসারে ইব্রীয় পুস্তকসহ শেষের ৯টা পুস্তকের কোনোটাই সিরীয় নতুন নিয়মের মধ্যে ছিল না। তবে পরবর্তীকালে সিরীয় নতুন নিয়মের মধ্যে যাকোবের পত্র, পিতরের ১ম পত্র ও যোহনের ১ম পত্র সংযোজন করা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ পরবর্তী গবেষকরা এ বাইবেলের পুস্তকসংখ্যা ২২ বলে উল্লেখ করেছেন।

৪র্থ-৫ম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর প্রসিদ্ধতম খ্রিষ্টান ধর্মগুরু জন ক্রীযোস্টম (John Chrysostom: 347-407), থিওডোরেট (Theodoret: 393-466) প্রমুখ প্রাচীন ধর্মগুরু ২২ পুস্তকের নতুন নিয়মের উপর নির্ভর করেছেন এবং এরই উদ্ধৃতি দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে মালানকারা সিরীয় অর্থোডক্স চার্চ (Malankara Syrian Orthodox Church) এবং পূর্ব সিরীয় ক্যালডিয়ান ক্যাথলিক চার্চ (East SyriacChaldean Catholic Church) পেশিট্টার ২২ পুস্তকের উপরেই নির্ভর করেন।

চতুর্থত: প্রাচীনতম খ্রিষ্টীয় চার্চগুলোর অন্যতম মিসরীয়বা কপ্টিক (Egyptian/ Coptic) চার্চ। কপ্টিক বাইবেলের মধ্যে অতিরিক্ত দু’টা পুস্তক সংযোজিত। ক্লিমেন্টের প্রথম পত্র ও ক্লিমেন্টের ২য় পত্র (the two Epistles of Clement)।

পঞ্চমত: আর্মেনিয়ান এপস্টলিক চার্চ (The Armenian Apostolic church)-এর বাইবেলে প্রচলিত ক্যাথলিক-প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেলের ২৭ নং পুস্তক:‘প্রকাশিত বাক্য’ পুস্তকটাকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং করিন্থীয়দের প্রতি পৌলের তৃতীয় পত্র (Third Epistletothe Corinthians) নামে একটা পুস্তক সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়া শিষ্যদের প্রতি ঈশ্বরের মাতার উপদেশ (Advice of the Mother of God to the Apostles), ক্রিয়াপসের পুস্তকগুলো (the Books of Criapos) এবং বার্নাবাসের পত্র (Epistle of Barnabas) পুস্তকগুলোকে অনেকে আর্মেনিয়ান নতুন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত করেন, তবে তা সর্বজনস্বীকৃত হয়নি।[১৬]

ষষ্ঠত: ইথিওপিয়ান চার্চ (Ethiopian Orthodox Church)-এর বাইবেল, ইথিওপিক বাইবেল (Ethiopic Bible) বা ইথিওপিয়ান নতুন নিয়ম (Ethiopian New Testament)-এপ্রচলিত ২৭টা পুস্তকের সাথে অতিরিক্ত আরো কয়েকটা পুস্তক বিদ্যমান: (১) সিনডস (the Sinodos) (পুস্তকটা কিছু প্রার্থনা ও বিধিবিধানের সংকলন এবং তা রোমের ক্লিমেন্টের সংকলিত বলে মনে করা হয়), (২) ইথিওপিয়ান ক্লিমেন্ট (Ethiopic Clement): ক্লিমেন্টের পত্রের ইথিওপীয় ভাষ্য, (৩) অকটাটেউক (Octateuch) (ধারণা করা হয় যে, বইটা পিটার লেখেছিলেন রোমের ক্লিমেন্টকে) (৪) প্রতিজ্ঞাপুস্তক (নিয়মপুস্তক) ১ম খ- (the Book of the Covenant 1), (৫) প্রতিজ্ঞাপুস্তক ২য় খ- (the Book of the Covenant 2) (৬) ডিডাসক্যালিয়া (the Didascalia): চার্চের নিয়মকানুন বিষয়ক।

ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চ স্বীকৃত বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান অতিরিক্ত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে: (১) হারমাসের রাখাল (the Shepherd of Hermas), (২) ক্লিমেন্টের প্রথম পত্র (1 Clement), (৩) পলের কার্যবিবরণী (Acts of Paul)।[১৭]

এভাবে আমরা দেখছি যে, প্রচলিত ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেলে নতুন নিয়মের পুস্তক সংখ্যা ২৭ হলেও বর্তমানে বিদ্যমান প্রাচীন ও আধুনিক অনেক বাইবেলেরনতুন নিয়মের পুস্তক সংখ্যার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। বিভিন্ন খ্রিষ্টীয় বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান পুস্তকগুলোর তালিকা উল্লেখের আগে এ বিষয়ে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার একটা বক্তব্য উদ্ধৃত করছি। বাইবেলীয় সাহিত্য (biblical literature) আর্টিকেলে ‘৪র্থ শতকের কানুন নির্ণয়’ (Determination of the canon in the 4thcentury) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:

Athanasius, a 4th-century bishop of Alexandria and a significant theologian, delimited the canon and settled the strife between East and West. On a principle of inclusiveness, both Revelation and Hebrews (as part of the Pauline corpus) were accepted. The 27 books of the New Testament—and they only—were declared canonical. In the Greek churches there was still controversy about Revelation, but in the Latin Church, under the influence of Jerome, Athanasius’ decision was accepted. It is notable, however, that, in a mid-4th-century manuscript called Codex Sinaiticus, the Letter of Barnabas and the Shepherd of Hermas are included at the end but with no indication of secondary status, and that, in the 5th-century Codex Alexandrinus, there is no demarcation between Revelation and I and II Clement.In the Syriac Church, Tatian’s Diatessaron (…. It was the standard Gospel text in the Syrian Middle East until about AD 400) was used until the 5th century, and in the 3rd century the 14 Pauline Letters were added. Because Tatian had been declared a heretic, there was a clear episcopal order to have the four separated Gospels when, according to tradition,  Rabbula, bishop of Edessa, introduced the Syriac version known as the  Peshitta—also adding Acts, James, I Peter, and I John—making a 22-book canon. Only much later, perhaps in the 7thcentury,did the Syriac canon come into agreement with the Greek 27 books.

“চতুর্থ শতাব্দীর আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ ও প্রসিদ্ধ ধর্মগুরু এথানেসিয়াস নতুন নিয়মের আইনসিদ্ধ পুস্তকগুলো নির্ধারণ করেন এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়  (ক্যাথলিক/ রোমান ক্যাথলিক) ও পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায় (অর্থোডক্স/ গ্রিক অর্থোডক্স)-এর মধ্যে বিদ্যমান বিভক্তির সমাধান করেন। বাদ না দিয়ে ঢুকিয়ে নাও- এ নীতির ভিত্তিতে ‘প্রকাশিত বাক্য’ ও ‘ইব্রীয়গণের প্রতি পত্র’(পলীয় রচনাবলির অংশ হিসেবে)উভয়কেই তিনি গ্রহণ করেন। নতুন নিয়মের ২৭টা পুস্তক এবং শুধু এ ২৭টাকেই আইনসিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়। গ্রিক অর্থোডক্স চার্চগুলোর মধ্যে এখনো ‘প্রকাশিত বাক্য’ পুস্তকটার বিষয়ে বিতর্ক-বিরোধ বিদ্যমান। তবে ল্যাটিন (ক্যাথলিক) চার্চে (পরবর্তী ৫ম শতাব্দীর প্রসিদ্ধ ধর্মগুরু) জীরোমের (Saint Jerome) প্রভাবে এথানেসিয়াসের মতটা স্বীকৃত হয়ে যায়।

সর্বাবস্থায়, এখানে উল্লেখ্য যে, সিনাইয়ের পান্ডুলিপি (Codex Sinaiticus) নামে প্রসিদ্ধ খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের বাইবেলের লিখিত পান্ডুলিপির শেষে বার্নাবাসের পত্র এবং হারমাসের রাখাল পুস্তকদুটো বিদ্যমান। বই দুটো নতুন নিয়মের অন্যান্য বইয়ের চেয়ে ভিন্ন মানের বা দ্বিতীয় পর্যায়ের বলে পান্ডুলিপিটার মধ্যে কোনোরূপ ইঙ্গিত নেই। আলেকজান্দ্রীয় পান্ডুলিপি (Codex Alexandrinus) নামে প্রসিদ্ধ ৫ম শতাব্দীর বাইবেলীয় পান্ডুলিপির মধ্যে ক্লিমেন্টের প্রথম পত্র ও ক্লিমেন্টের দ্বিতীয় পত্র বিদ্যমান। এ দুটো পুস্তক যে প্রকাশিত বাক্য থেকে ভিন্ন সেরূপ কোনো ইঙ্গিত বা পৃথকীকরণ সেখানে নেই।

সিরীয় চার্চে টিটানের ডায়াটেসারন ব্যবহৃত হত ৫ম শতাব্দী পর্যন্ত। প্রায় ৪০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সিরীয় চার্চে এটাই ছিল গসপেল বা ইঞ্জিলের বিশুদ্ধ ও সঠিক পাঠ। তৃতীয় শতাব্দীতে এর মধ্যে পলের ১৪টা পত্র সংযোজন করা হয়। টিটানকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা দেওয়ার কারণে বিশপের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয় যে, পৃথক চার গসপেলকে গ্রহণ করতে হবে। এজন্য প্রচলিত মত থেকে জানা যায় যে, যখন (৫ম শতাব্দীতে) এডেসার বিশপ রাব্বুলা পেশিট্টা নামক নতুন নিয়মের সিরীয় সংস্করণ প্রকাশ করলেন তখন তিনি প্রেরিতদের কার্যবিবরণী, যাকোব, ১ পিতর ও ১ যোহন পুস্তকগুলো এর মধ্যে সংযোজন করেন। এভাবে ২২ পুস্তকের আইনসিদ্ধ ধর্মগ্রন্থ রচিত হয়। অনেক পরে ৭ম শতাব্দীতে সিরিয়ান বাইবেলের মধ্যে গ্রিক ২৭ পুস্তকই সংযোজন করা হয়।”

১. ৩. ২. নতুন নিয়মের পুস্তকগুলোর তালিকা

ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট নতুন নিয়মের পাশাপাশি সিরীয়, ইথিওপীয়, মিসরীয় কপ্টিক ও আর্মেনিয়ান এপস্টলিক চার্চের পুস্তকগুলোর নামের তালিকা নিম্নরূপ। বিস্তারিত জানতে পাঠক এনকার্টার Bible/Books of the Bible এবং উইকিপিডিয়ার Books of the Bible I Orthodox Tewahedo biblical canon প্রবন্ধগুলো পাঠ করুন।

ক্রম সিরীয় ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট মিসরীয় আর্মেনীয় ইথিওপীয়/ টেওয়াহিদো
1. Matthew Matthew Matthew Matthew Matthew
2. Mark Mark Mark Mark Mark
3.  Luke Luke Luke Luke Luke
4.  John  John  John  John  John
5. Acts Acts Acts Acts Acts
6. Romans Romans Romans Romans Romans
7. Corinthians 1 Corinthians 1 Corinthians 1 Corinthians 1 Corinthians 1
8. Corinthians 2 Corinthians 2 Corinthians 2 Corinthians 2 Corinthians 2
9. Galatians  Galatians  Galatians  Galatians  Galatians
10. Ephesians Ephesians Ephesians Ephesians Ephesians
11. Philippians Philippians Philippians Philippians Philippians
12. Colossians Colossians Colossians Colossians Colossians
13. Thessalonians 1 Thessalonians 1 Thessalonians 1 Thessalonians 1 Thessalonians 1
14. Thessalonians 2 Thessalonians 2 Thessalonians 2 Thessalonians 2 Thessalonians 2
15. Timothy 1 Timothy 1 Timothy 1 Timothy 1 Timothy 1
16. Timothy 2 Timothy 2 Timothy 2 Timothy 2 Timothy 2
17. Titus Titus Titus Titus Titus
18. Philemon Philemon Philemon Philemon Philemon
19. Hebrews Hebrews Hebrews Hebrews Hebrews
20. James (ms‡hvwRZ) James James James James
21. 1 Peter (ms‡hvwRZ) Peter 1 Peter 1 Peter 1 Peter 1
22. Peter 2 Peter 2 Peter 2 Peter 2
23. 1 John (ms‡hvwRZ) John 1 John 1 John 1 John 1
24. John 2 John 2 John 2 John 2
25. John 3 John 3 John 3 John 3
26. Jude Jude Jude Jude
27. Revelation Revelation Revelation
28. Clement 1 Clement 1
29. Clement 2 Ser`atä Seyon (30 canons)
30. Corinthians 3 Te’ezaz(71 canons)
31. Epistle of Barnabas Gessew (56 canons)
32. Advice of the Mother of God to the Apostles Abtelis

(81 canons)

33. the Books of Criapos
34. the Sinodos
35. Octateuch
36. Book of the Covenant 1
37. Book of the Covenant 11
38. the Didascalia
39. the Shepherd of Hermas
40. Acts of Paul

১. ৩. ৩. নতুন নিয়মের সন্দেহজনক পুস্তকাবলি

উপরের তালিকা থেকে আমরা দেখছি যে, প্রচলিত ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট নতুন নিয়মের মধ্যে ২৭টা পুস্তক থাকলেও বর্তমানে বিদ্যমান প্রাচীন ও আধুনিক নতুন নিয়ম বা চার্চ স্বীকৃত নতুন নিয়ম (New Testament canon)-এর মধ্যে ৪০টা পুস্তক বিদ্যমান। এখানে উল্লেখ্য যে, এ ছাড়া আরো শতাধিক ইঞ্জিল, পত্র ও পুস্তক প্রথম শতাব্দীগুলোর খ্রিষ্টানদের মধ্যে ‘ইঞ্জিল শরীফ’ ও ‘নতুন নিয়মের আসমানি পুস্তক’ হিসেবে প্রচলিত ছিল। তবে সেগুলো কোনো চার্চ স্বীকৃত ‘নতুন নিয়মের’ মধ্যে স্থান পায়নি। এগুলোকে নতুন নিয়মের গোপন, সন্দেহজনক বা জালপুস্তক (New Testament apocrypha) অথবা সন্দেহজনক বা গোপন নতুন নিয়ম (Apocryphal New Testament) বলা হয়। এ বিষয়ে এনকার্টার Bible প্রবন্ধের The New Testament পরিচ্ছেদের precanonical writings অর্থাৎ ‘চার্চস্বীকৃত নতুন নিয়ম সৃষ্টির আগের লেখালেখি’ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

““The 27 books of the New Testament are only a fraction of the literary production of the Christian communities in their first three centuries. … As many as 50 Gospels were in circulation during this time.” “খ্রিষ্টান সম্প্রদায়গুলো খ্রিষ্টীয় প্রথম তিন শতকে যা কিছু লেখেছিল ২৭টা পুস্তক হচ্ছে তার অতি সামান্য অংশ। … এ সময়ে প্রায় ৫০টা ইঞ্জিল প্রচলিত ছিল।”

এনকার্টার সন্দেহজনক নতুন নিয়ম (Apocryphal New Testament) প্রবন্ধে বলা হয়েছে: Apocryphal New Testament … title that refers to more than 100 books written by Christian authors between the 2nd and 4th centuries.“সন্দেহজনক নতুন নিয়ম..বলতে এক শতেরও অধিক পুস্তক বুঝানো হয় যেগুলো খ্রিষ্টান লেখকরা ২য় থেকে ৪র্থ শতাব্দীর মধ্যে লেখেছিলেন।”

আমরা উইকিপিডিয়ার The New Testament apocrypha ও The Lost Books of the Bible and the Forgotten Books of Eden প্রবন্ধ থেকে, http://www.biblestudytools.com/ apocrypha/ ওয়েবসাইট এবং http://www.interfaith.org/christianity/ apocrypha/ ওয়েবসাইট থেকে নিম্নে নতুন নিয়মের দেড় শতাধিক বইয়ের তালিকা প্রদান করছি। এগুলোর কয়েকটা পুস্তক এখনো প্রচলিত কোনো কোনো বিধিবদ্ধ বা স্বীকৃত (canonical) নতুন নিয়মের মধ্যে বিদ্যমান।

ক্রম

 ইংরেজি নাম

বাংলা নাম

1 Gospel of the Ebionites এবোনাইটদের ইঞ্জিল
2 Gospel of the Hebrews হিব্রুগণের ইঞ্জিল
3 Gospel of the Nazarenes নাসারাগণের (নাযারীন) ইঞ্জিল
4 Gospel of Marcion মারসিওনের ইঞ্জিল
5 Gospel of the Lord (Marcion) প্রভুর ইঞ্জিল (মারসিওন)
6 Gospel of Mani মানির ইঞ্জিল
7 Gospel of Apelles এপিলিসের ইঞ্জিল
8 Gospel of Bardesanes/  Bardaisan বারডাইসানে ইঞ্জিল
9 Gospel of Basilides বাসিলাইডসের ইঞ্জিল
10 Gospel of Thomas থমাসের ইঞ্জিল
11 Gospel of Peter পিতরের ইঞ্জিল
12 Gospel of Barnabas বার্নাবাসের ইঞ্জিল
13 Gospel of Nicodemus নিকোডেমাসের ইঞ্জিল
14 Gospel of Bartholomew বার্থলমেয়র ইঞ্জিল
15 Gospel of Judas(Iscariot) জুডাস (ইস্করিয়ট)-এর ইঞ্জিল
16 Gospel of Mary (Magdalene) মেরি (মগ্দিলিন)-এর ইঞ্জিল
17 Gospel of the Nativity of Mary মেরির জন্মের ইঞ্জিল
18 Gospel of Philip ফিলিপের ইঞ্জিল
19 Greek Gospel of the Egyptians মিসরীয়দের গ্রিক ইঞ্জিল
20 Coptic Gospel of the Egyptians মিসরীয়দের কপ্টিক ইঞ্জিল
21 Gospel of Truth সত্যের ইঞ্জিল
22 Egerton Gospel ইজার্টন ইঞ্জিল
23 Gospel of Jesus’ Wife যীশুর স্ত্রীর ইঞ্জিল
24 Gospel of Eve হাওয়ার ইঞ্জিল
25 Gospel of the Four Heavenly Realms চার স্বর্গীয় অঞ্জলের ইঞ্জিল
26 Gospel of Matthias ম্যাথিয়াসের ইঞ্জিল
27 Gospel of Perfection বিশুদ্ধতার ইঞ্জিল
28 Gospel of the Seventy সত্তরের ইঞ্জিল
29 Gospel of Thaddaeus থাড্ডাউসের ইঞ্জিল
30 Gospel of the Twelve দ্বাদশের ইঞ্জিল
31 Gospel of Cerinthus সেরিন্থাসের ইঞ্জিল
32 Secret Gospel of John/ Apocryphon of John যোহনের গোপন ইঞ্জিল
33 Apocryphon of John (long version) যোহনের গোপন ইঞ্জিল (দীর্ঘ সংস্করণ)
34 Gospel of the Saviour/ The Unknown Berlin Gospel ত্রাণকর্তার ইঞ্জিল (বার্লিনের পরিচয়হীন ইঞ্জিল)
35 The Secret Gospel of Mark মার্কের গোপন ইঞ্জিল
36 The Oxyrhynchus Gospels অক্সিরিনকাস ইঞ্জিল
37 Infancy Gospel (protevangelium/ Protoevangelium) of James যাকোব রচিত শৈশবীয় ইঞ্জিল
38 Infancy Gospel of Matthew/ Birth of Mary and Infancy of the Saviour মথি রচিত শৈশবীয় ইঞ্জিল/ মেরির জন্ম ও ত্রাণকর্তার শিশুকাল
39 Infancy Gospel of Thomas Greek A থমাস রচিত শৈশবীয় ইঞ্জিল গ্রিক-ক
40 Infancy Gospel of Thomas – Greek B থমাস রচিত শৈশবীয় ইঞ্জিল গ্রিক-খ
41 Infancy Gospel of Thomas – Latin থমাস রচিত শৈশবীয় ইঞ্জিল ল্যাটিন
42 Syriac Infancy Gospel সিরীয় শৈশবীয় ইঞ্জিল
43 Arabic Infancy Gospel আরবি শৈশবীয় ইঞ্জিল
44 First Infancy Gospel of Jesus Christ যীশু খ্রিষ্টের প্রথম শৈশবীয় ইঞ্জিল
45 History of Joseph the Carpenter সুত্রধর যোশেফের ইতিহাস
46 Life of John the Baptist যোহন বাপ্তাইজকের জীবনী
47 Pseudo-Cyril of Jerusalem on the Life and the Passion of Christ খ্রিষ্টের জীবন ও যন্ত্রণা বিষয়ে জেরুজালেমের সিরিলের নামীয় পুস্তক
48 Diatessaron/ Harmonized gospel ডায়টেসরন: সমন্বিত ইঞ্জিল
49 Questions of Bartholomew বার্থলমেয়র প্রশ্নাবলি
50 Resurrection of Jesus Christ (according to Bartholomew) যীশু খ্রিষ্টের পুনরুত্থান (বার্থলমেয়র মতানুসারে)
51 The Sophia of Jesus Christ যীশু খ্রিষ্টের প্রজ্ঞাপুস্তক (সোফিয়া)
52 Coptic Apocalypse of Paul পলের নিকট প্রকাশিত বাক্য কপ্টিক
53 Apocalypse of Paul পলের নিকট প্রকাশিত বাক্য
54 Apocryphon of James/ Secret Book of James যাকোবের নিকট প্রকাশিত বাক্য/ যাকোবের গোপন পুস্তক
55 Book of Thomas the Contender প্রতিযোগী থমাসের পুস্তক
56 Dialogue of the Saviour ত্রাণকর্তার কথোপকথন
57 Apocalypse of Peter পিতরের নিকট প্রকাশিত বাক্য
58 Gnostic Apocalypse of Peter পিতরের নিকট প্রকাশিত বাক্য মারফতি
59 Pistis Sophia বিশ্বাসের প্রজ্ঞা/ ত্রাণকর্তার প্রজ্ঞা
60 Second Treatise of the Great Seth মহান সেথের দ্বিতীয় গবেষণা গ্রন্থ
61 Trimorphic Protennoia ট্রায়মরফিক প্রটেনিয়া (ত্রিপর্যায়িক প্রটেনিয়া)
62 Ophite Diagrams অফাইট ডায়াগ্রাম (অফাইট রেখাচিত্র)
63 Acts 29 প্রেরিতদের কার্যবিবরণী ২৯
64 Acts of Andrew এন্ড্রুর কার্যবিবরণী
65 Acts of Barnabas বার্নাবাসের কার্যবিবরণী
66 Acts of John যোহনের কার্যবিবরণী
67 Acts of John the Theologian ধর্মতাত্ত্বিক যোহনের কার্যবিবরণী
68 Acts of the Martyrs শহীদদের কার্যবিবরণী
69 Acts of Paul পলের কার্যবিবরণী
70 Acts of Paul and Thecla পল ও থেলকার কার্যবিবরণী
71 Acts of Peter পিতরের কার্যবিবরণী
72 Acts of Peter and Andrew পিতর ও এন্ড্রুর কার্যবিবরণী
73 Acts of Peter and Paul পল ও পিতরের কার্যবিবরণী
74 Acts of Peter and the Twelve পিতর ও দ্বাদশের কার্য বিবরণী
75 Acts of Philip ফিলিপের কার্যবিবরণী
76 Acts of Pilate পিলেটের কার্যবিবরণী
77 Acts of Thomas থমাসের কার্যবিবরণী
78 Acts of Timothy তিমোথির কার্যবিবরণী
79 Acts of Xanthippe, Polyxena, and Rebecca যানথিপ, পেলিক্সেনা ও রেবেকার কার্যবিবরণী
80 Acts and Martyrdom of St. Matthew the Apostle শিষ্য মথির কার্যবিবরণী ও শহীদ হওয়ার বিবরণ
81 Acts of Thaddeus (Epistles of Pontius Pilate) থাড্ডিয়াসের কার্যবিবরণী/ পন্টিয়াস পিলেটের পত্র
82 Acts of Xanthippe and Polyxena যানথিপ ও পেলিক্সেনার কার্যবিবরণী
83 Epistle of Barnabas বার্নাবাসের পত্র
84 Epistles of Clement 1 ক্লিমেন্টের ১ম পত্র
85 Epistles of Clement 2 ক্লিমেন্টের ২য় পত্র
86 Epistles of Clement 3 ক্লিমেন্টের ৩য় পত্র
87 Epistle of the Corinthians to Paul পলের প্রতি করিন্থীয়দের পত্র
88 Epistle of Ignatius to the Smyrnaeans স্মিরনীয়দের প্রতি ইগনাটিয়াসের পত্র
89 Epistle of Ignatius to the Trallians ট্রালিয়ানদের প্রতি ইগনাটিয়াসের পত্র
90 Epistle of Polycarp to the Philippians ফিলিপীয়দের প্রতি পলিকার্পের পত্র
91 Epistle to Diognetus ডায়গনেটাসের প্রতি পত্র
92 Epistle to the Laodiceans (Paul) লোডিসীয়দের প্রতি পত্র
93 Epistle to Seneca the Younger (Paul) যুবক সিনিকার প্রতি পত্র
94 Paul and Seneca পল ও সিনিকা
95 Third Epistle to the Corinthians করিন্থীয়দের প্রতি তৃতীয় পত্র
96 Epistles of Pontius Pilate পন্টিয়া পিলেটের পত্র
97 Letter of Aristeas এরিস্টাসের পত্র
98 Apocalypse (Revelation) of Pseudo-Methodius মেথোডিয়াসের নামে প্রচারিত প্রকাশিত বাক্য
99 Apocalypse of Thomas থমাসের প্রতি প্রকাশিত বাক্য
100 Apocalypse of Stephen স্টিফেনের প্রতি প্রকাশিত বাক্য
101 First Apocalypse of James যাকোবের প্রতি প্রকাশিত বাক্য ১
102 Second Apocalypse of James যাকোবের প্রতি প্রকাশিত বাক্য ২
103 Revelation of John the Theologian ধর্মতাত্ত্বিক যোহনের প্রতি প্রকাশিত বাক্য
104 Revelation of Paul পলের প্রতি প্রকাশিত বাক্য
105 The Shepherd of Hermas হারমাসের রাখাল
106 The Home Going of Mary মেরির গৃহে প্রত্যাবর্তন
107 The Falling asleep of the Mother of God ঈশ্বরের মাতার ঘুমিয়ে পড়া
108 The Descent of Mary মেরির অবতরণ
109 Apostolic Constitutions শিষ্যদের সংবিধান
110 Book of Nepos নেপোসের পুস্তক
111 Canons of the Apostles শিষ্যদের কানুন
112 Cave of Treasures গুপ্তধনের গুহা
113 Didache (Teachings of the Twelve Apostles) বার শিষ্যের শিক্ষামালা
114 Liturgy of St James সাধু যাকোবের নীতিমালা
115 Penitence of Origen অরিগনের অনুশোচনা
116 Prayer of Paul পলের প্রার্থনা
117 Sentences of Sextus সেক্সটাসের বিচার
118 Physiologus ফিযিওলোগাস (প্রাণিদের কাহিনী)
119 Book of the Bee মৌমাছির পুস্তক
120 The Naassene Fragment নাসীন পান্ডুলিপি
121 The Fayyum Fragment ফাইঊম পান্ডুলিপি
122 Memoria Apostolorum শিষ্যগণের স্মৃতি
123 Martyrdom of Polycarp পলিকার্পের শহীদ হওয়া
124 Epistula Apostolorum/ Letter of the Apostles শিষ্যগণের পত্র
125 Epistle of Pseudo-Titus তিতের নামীয় পত্র
126 Letter of Peter to Philip, ফিলিপের প্রতি পিতরের পত্র
127 The Epistles of Jesus to Abgarus এবগারাসের প্রতি যীশুর পত্র
128 Decretum Gelasianum or the Gelasian Decree জেলাসিআনের ডিগ্রী
129 Acts of Andrew and Matthias এন্ড্রু ও ম্যাথিয়াসের কার্যবিবরণী
130 Martyrdom of Bartholomew বার্থলমেয়র শহীদ হওয়া
131 Book of John the Evangelist ইঞ্জিল প্রচারক যোহনের পুস্তক
132 The Martyrdom of Matthew মথির শহীদ হওয়া
133 Teaching of Thaddeus থাড্ডিয়াসের শিক্ষা
134 Consummation of Thomas থমাসের পরিপূর্ণতা
135 Book of John concerning the dormition of Mary (transitus mariæ) মেরির ঊর্ধ্বারোহণ বিষয়ে যোহনের পুস্তক
136 Narrative of Joseph of Arimathaea আরিমাথিয়ার যোসেফের বর্ণনা
137 Avenging of the Saviour ত্রাণকর্তার প্রতিশোধ
138 Alexandrians আলেকজান্দ্রীয়গণ
139 Muratonian Canon (fragment) মুরাটোনিয়ান বাইবেল (পান্ডুলিপির অংশ)
140 Traditions of Mattias মাটিয়াসের ঐতিহ্য
141 Preaching of Peter পিতরের প্রচার
142 Didascalia Apostolorum ডিডাসক্যালিয়া: শিষ্যগণের নিয়মকানুন
143 Psuedo-Sibylline Oracles (Sibyl) সিবিলের নামে প্রচলিত বক্তব্যসমূহ
144 The Apostles’ Creed প্রেরিতগণের ধর্ম বিশ্বাস
145 The Epistle of Ignatius to the Ephesians ইফিষীয় প্রতি ইগনাটিয়াসের পত্র
146 The Epistle of Ignatius to the Magnesians মাগনেসীয়দের প্রতি ইগনাটিয়াসের পত্র
147 The Epistle of Ignatius to the Trallians ট্রালীয়দর প্রতি ইগনাটিয়াসের পত্র
148 The Epistle of Ignatius to the Romans রোমীয়দের প্রতি ইগনাটিয়াসের পত্র
149 The Epistle of Ignatius to the Philadelphians ফিলাডেলফীয়দের প্রতি ইগনাটিয়াসের পত্র
150 The Epistle of Ignatius to the Smyrneans স্মারনীয়দের প্রতি ইগনাটিয়াসের পত্র
151 The Epistle of Ignatius to Polycarp পরিকার্পেপর প্রতি ইগনাটিয়াসের পত্র
152 Letter of Herod To Pilate the Governor গভর্নর পীলাতের প্রতি হেরোডের পত্র
153 Letter of Pilate to Herod হেরোদের প্রতি পীলাতের পত্র

১. ৩. ৪. নতুন নিয়ম বনাম ইঞ্জিল শরীফ

উপরের ২৭টা গ্রন্থের মধ্যে প্রথম চারটা গ্রন্থকে ‘ইঞ্জিল চতুষ্টয়’ বলা হয়। ইঞ্জিল শব্দটা মূলত গ্রিক ভাষা থেকে আরবিকৃত শব্দ। এনকার্টা ইংলিশ ডিকশনারি (Encarta English Dictionary) অনুসারে গ্রিক‘eu’ অর্থ ভাল (good) এবং ‘aggelein’ অর্থ ঘোষণা (announce), একত্রে ‘euaggelos’ অর্থ সুসংবাদ ঘোষণা (bringing good news)।  গ্রিক ‘euaggelion’ শব্দের অর্থ সুসংবাদ (good news)। এ শব্দটা থেকে আরবি ‘ইঞ্জিল’ শব্দ এবং ইংরেজি ‘ইভাঞ্জেল’ (evangel) শব্দের উৎপত্তি।

ইঞ্জিল বা ইভাঞ্জেল বলতে প্রথম চারটা পুস্তককেই শুধু বোঝানো হয়। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের বাইবেল সোসাইটিপুরো নতুন নিয়মকেই ‘ইঞ্জিল’ নামে প্রচার করে। তারা চার ইঞ্জিলের পরের পুস্তকগুলোকেও ইঞ্জিলের অমুক বা তমুক খন্ড বলে উল্লেখ করছেন। বিষয়টা অনুবাদের ক্ষেত্রে বিকৃতি (Distortion) বলেই প্রতীয়মান। ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ অবশ্যই আক্ষরিক ও মূলাশ্রয়ী হতে হবে। কিন্তু বাইবেলের অনুবাদ করা দু’ভাবে মৌলিকতা নষ্ট করেছেন:

(ক) প্রথম চারটা পুস্তকের ক্ষেত্রে মূল গ্রিক ও ইংরেজি নাম ‘সাধু মথির, মার্কের, লূকের বা যোহনের মতানুসারে ঈসা মাসীহের পবিত্র ইঞ্জিল’ কথাটার অনুবাদে তারা লেখছেন: ‘ইঞ্জিল শরিফ, প্রথম খন্ড: মথি’।

(খ) চারটা ‘মতানুসারে ইঞ্জিল’-এর পরের ২৩টা পুস্তক বা পত্রকেও তারা ইঞ্জিল বা ইঞ্জিলের বিভিন্ন খন্ড বা ‘সিপারা’ বলে চালিয়ে দেচ্ছেন।

তারা দাবি করছেন যে, গ্রন্থগুলো মূল গ্রিক থেকে অনূদিত। কিন্তু এ কথা নিশ্চিত যে, মূল গ্রিকে এ দুটো বিষয়ের একটাও নেই। নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষণীয়:

প্রথমত: আমরা দেখলাম যে, নতুন নিয়মের প্রথম চারটা পুস্তককেখ্রিষ্টানরা ‘ইঞ্জিল’ বলে দাবি করেছেন। এছাড়া বাকি ২৩টা পুস্তককে বিগত ২ হাজার বছরে কোনো খ্রিষ্টান ‘ইঞ্জিল’ বলে দাবি করেননি।

দ্বিতীয়ত: আমরা দেখেছি যে, বাইবেলের বাংলা অনুবাদকে তারা ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ নামকরণ করেছেন। খ্রিষ্টানরা বাইবেলের আরবি অনুবাদকে মূলত এ নামে আখ্যায়িত করেন। তারা বলতে পারেন যে, আমরা বাংলা অনুবাদের জন্য আরবি নাম ব্যবহার করেছি। এক্ষেত্রেও তারা সঙ্গতি নষ্ট করেছেন। বাইবেলের নতুন নিয়মকে কখনোই আরবিতে ‘ইঞ্জিল’ বলা হয় না। আরবিতে প্রথম চারটা পুস্তককেই শুধু ‘ইঞ্জিল’ বলা হয়। আর ২৭ পুস্তকের সমষ্টিকে একত্রে العهد الجديد বলা হয়, যার অর্থ ‘নতুন নিয়ম’ বা ‘নব সন্ধি’।

তৃতীয়ত: যে কোনো জাগতিক ‘ডকুমেন্ট’ অনুবাদের ক্ষেত্রে এরূপ করলে তা ‘ক্রিমিন্যাল’ বা ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হবে। পাঠক একটু চিন্তা করুন:

(১) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার একটা প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘ড্রীমস ফ্রম মাই ফাদার’ (Dreams from My Father)। যদি কেউ এ শিরোনামে বই ছেপে তার মধ্যে  আমেরিকা সরকারের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা মন্ত্রীর লেখা কিছু বই সংযোজন করে প্রকাশ করেন বা ড্রীমস বইটার প্রথম খন্ড, দ্বিতীয় খন্ড ইত্যাদি নামে প্রকাশ বা প্রচার করেন এবং মানুষ এ সকল সংযোজিত পুস্তকের বক্তব্য বারাক ওবামার বক্তব্য হিসেবে গণ্য করে তবে বারাক ওবামা ও আমেরিকার প্রশাসন বিষয়টাকে কিভাবে দেখবেন? পাঠক এরূপ কর্মকে কতটুকু সঠিক ও বিশ্বস্ত বলে গ্রহণ করবেন?

(২) ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ শিরোনাম দিয়ে একটা বই ছেপে এর মধ্যে যদি সুপ্রিম কোর্টের কিছু রায়, সরকারি কিছু গেজেট, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর লেখা কিছু পুস্তক সংযোজন করে বাংলাদেশ সংবিধান দ্বিতীয় খন্ড, তৃতীয় খন্ড ইত্যাদি নামে সংবিধানের সাথেই প্রকাশ ও প্রচার করা হয় এবং মানুষ এ সকল সংযোজিত পুস্তকের বক্তব্য ‘বাংলাদেশের সংবিধান’-এর বক্তব্য হিসেবে উদ্ধৃতি দিতে থাকে তখন বাংলাদেশ সরকার বিষয়টাকে কিভাবে নেবেন?

সকল ডকুমেন্টের ক্ষেত্রেই বিষয়টা সুস্পষ্ট। যে সকল পন্ডিত বাইবেল অনুবাদ করেছেন তাদের লেখা কোনো গ্রন্থ বা তাদের সম্পত্তির কোনো দলিলের মধ্যে এরূপ কিছু করা হলে তারা তাকে প্রতারণা বলে গণ্য করবেন এবং আদালতের আশ্রয়  নেবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ধর্মগ্রন্থের অনুবাদের ক্ষেত্রে তারা মূলকে সংরক্ষণ করছেন না।

পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছে যে, মিথ্যা ঈশ্বরের নিকট ঘৃণিত ও বিশ্বস্ততা মুক্তির পথ (লেবীয় ১৯/১১; হিতোপদেশ ১২/২২),অনন্ত নরকই মিথ্যাবাদীদের ঠিকানা (প্রকাশিত বাক্য ২১/৮)। বাইবেলেই ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সামান্যতম সংযোজন বা বিয়োজন করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং কেউ এরূপ করলে সে পরকালের মুক্তি থেকে বঞ্চিত হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে (প্রকাশিত বাক্য ২২/১৮-১৯)। নতুন নিয়মকে ইঞ্জিল বলা কি মিথ্যা ও অবিশ্বস্ততা নয়? প্রথম খন্ড, দ্বিতীয় খন্ড ইত্যাদি সংযোজন করা কি ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সংযোজন  নয়? তাহলে ধার্মিক মানুষ কিভাবে এরূপ করেন?

১. ৩. ৫. ‘ইঞ্জিল’ বনাম ‘মতানুসারে ইঞ্জিল’

আমরা দেখলাম যে, ২৭টা বইয়ের মধ্যে মাত্র চারটা বইকে খ্রিষ্টানরা ইঞ্জিল বলে দাবি করেছেন। মূল গ্রিকবা ইংরেজি বাইবেলে এগুলোর নাম নিম্নরূপ:

(১) The Holy Gospel of Jesus Christ According to St. Matthew/ The Gospel According To St. Matthew: সাধু মথির মতানুসারে ঈসা মাসীহের পবিত্র ইঞ্জিল/ সাধু মথির মতানুসারে ইঞ্জিল।

(২) The Holy Gospel of Jesus Christ According to St. Mark/ The Gospel According To St. Mark: সাধু মার্কের মতানুসারে ঈসা মাসীহের ইঞ্জিল।

(৩) The Holy Gospel of Jesus Christ According to St. Luke/ The Gospel According To St. Luke: সাধু লূকের মতানুসারে ঈসা মাসীহের ইঞ্জিল।

(৪) The Holy Gospel of Jesus Christ According to St. John/ The Gospel According To St. John: সাধু যোহনের মতানুসারে ঈসা মাসীহের ইঞ্জিল।

নাম থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, বিভিন্ন ব্যক্তি পুস্তক লেখে তা ‘ইঞ্জিল’ বলে দাবি করেন, এজন্যই পুস্তকগুলোর এরূপ নামকরণ করা হয়। পরবর্তী আলোচনা থেকে আমরা জানব যে, যীশুর তিরোধানের শতাধিক বছর পরে অনেক মানুষ ‘ইঞ্জিল’ লেখে প্রচার করতে শুরু করেন  যে, এগুলো যীশুর ইঞ্জিল। এজন্য এগুলোর এরূপ নামকরণ করা হয়: ‘অমুকের মতানুসারে এটা ইঞ্জিল’। আমরা নতুন নিয়মের সন্দেহজনক পুস্তকগুলোর মধ্যে আরো অনেক ‘মতানুসারে ইঞ্জিল’ দেখেছি।

১. ৩. ৬.‘মতানুসারে ইঞ্জিল’ ও প্রকৃত ইঞ্জিল

এ সকল ‘মতানুসারে ইঞ্জিলের’ সাথে ‘ঈসা মাসীহের ইঞ্জিলের’ মুল পার্থক্য ঈসা মাসীহের ‘ইঞ্জিল’ আল্লাহর কালাম বা তাঁর নিজের বক্তব্য। আর প্রচলিত ‘মতানুসারে ইঞ্জিল’ চারটার মধ্যে আল্লাহর কোনো কালাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এগুলোর মধ্যে ঈসা মাসীহের বক্তব্যও কম। এগুলো মূলত তাঁর জীবনীগ্রন্থ। এগুলোর মধ্যে ঈসা মাসীহ বিষয়ে বিভিন্ন মানুষের বর্ণনা সংকলন করা হয়েছে।
এছাড়া আমরা দেখলাম যে, এরূপ প্রায় অর্ধশত ‘মতানুসারে ইঞ্জিল’দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকের খ্রিষ্টানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। সেগুলোর মধ্য থেকে খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা নিজেদের পছন্দের উপর নির্ভর করে এ চারটাকে বাছাই করেন। এ বিষয়ে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার biblical literature প্রবন্ধের বক্তব্য:

As far as the New Testament is concerned, there could be no Bible without a church that created it; yet conversely, having been nurtured by the content of the writings themselves, the church selected the canon. … Indeed, until c. AD 150, Christians could produce writings either anonymously or pseudonymously—i.e., using the name of some acknowledged important biblical or apostolic figure. The practice was not believed to be either a trick or fraud. …

“নতুন নিয়মের বিষয়টা হল, যদি চার্চ (ধর্মীয় মন্ডলি বা জামাত) বাইবেল তৈরি না করত তাহলে কোনো বাইবেলই থাকত না। অপরদিকে লেখনিগুলোর বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে চার্চই বাইবেলের বইগুলো বাছাই করেছে। … প্রকৃত বিষয় হল, ১৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে যে কোনো খ্রিষ্টান নাম প্রকাশ না করে, অথবা  কোনো প্রসিদ্ধ বাইবেলীয় ব্যক্তিত্ব বা যীশুর শিষ্যদের নামে বই লেখতে পারতেন। এরূপ কর্মকে ছলচাতুরি বা প্রতারণা বলে গণ্য করা হত না! …”

বিষয়টা বিস্ময়কর। ১০০/১৫০ বছর পরে যে কোনো খ্রিষ্টান সম্পূর্ণ মিথ্যাভাবে একটা বই লেখে প্রচার করছেন, এটা মথি লিখিত ইঞ্জিল, এটা পিতর লিখিত ইঞ্জিল… এভাবে যীশুর শিষ্যদের বা সাধুদের নামে যে যা পারছে লেখে প্রচার করছে। এরূপ কর্মকে উক্ত ধার্মিক লেখক বা সমাজের অন্য কোনো ধার্মিক খ্রিষ্টান কেউই অন্যায় বা পাপ বলে গণ্য করছেন না! এগুলো সমাজে ইঞ্জিল নামে প্রসিদ্ধ হওয়ার আরো ১০০/১৫০ বছর পর এরূপ ধার্মিক খ্রিষ্টানরা ‘অজ্ঞাত ধার্মিক মানুষদের লেখা’ অর্ধশত ইঞ্জিল থেকে শুধু বিষয়বস্তুর পছন্দনীয়তার দিকে তাকিয়ে ৪টা ইঞ্জিল বেছে নিয়ে ‘নতুন নিয়ম’-এর অর্ন্তভুক্ত করলেন! এ বিষয়ে মাইক্রোসফট এনকার্টার বক্তব্য আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, যেখানে বলা হয়েছে  প্রথম তিন শতকে ৫০টার মত ইঞ্জিল চালু ছিল এবং নতুন নিয়মের ২৭টা বই খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লিখিত ধর্মগ্রন্থগুলোর সামান্য অংশমাত্র।


[১২] উইকিপিডিয়া: The Greek Gospel of the Egyptians, the Gospel of Thomas

[১৩]Eusebius, Ecclesiastical History, p 166. আরো দেখুন উইকিপিডিয়া: Syriac Canon.

[১৪]  বিস্তারিত দেখুন: উইকিপিডিয়া: Tatian, Diatessaron.

[১৫]  উইকিপিডিয়া, Antilegomena.

[১৬]    বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়া, ব্রিটানিকা, এনকার্টা ইত্যাদি বিশ্বকোষে Apocrypha, Peshitta, Antilegomena, General epistles, Development of the New Testament canon/ Armenian আর্টিকেলগুলো দেখুন।

[১৭] দেখুন: উইুকুপুডয়া Development of the New Testament canon/East African canons; New Testament apocrypha/ Development of the New Testament canon.


সূচিপত্রে ফিরে চলুন

প্রথম অধ্যায়: বাইবেল পরিচিতি (২য় পর্ব)

১. ২. বাইবেলের পুরাতন নিয়ম

১. ২. ১.খ্রিষ্টধর্মীয় বাইবেলের দু’টা অংশ

খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলোকে দুভাগে ভাগ করেন: পুরাতন নিয়ম বা পুরাতন সন্ধি (Old Testament) ও নতুন নিয়ম, নতুন সন্ধি বা নবসন্ধি (New Testament)। প্রথম ভাগের গ্রন্থাবলি সম্পর্কে তারা দাবি করেন যে, সেগুলো ইহুদি ধর্মের ধর্মগ্রন্থ। অর্থাৎ যীশুর আগমনের পূর্বে বনি-ইসরাইল বা ইহুদিদের মধ্যে যে সকল নবী আগমন করেছিলেন তাঁদের গ্রন্থগুলোকে ইহুদিরা ধর্মগ্রন্থ হিসেবে সংকলন করেন। এটা ইহুদি বাইবেল (Jewish Bible) এবং হিব্রু বাইবেল (Hebrew Bible) নামে পরিচিত। এটাকেই খ্রিষ্টানরা তাদের বাইবেলের পুরাতন নিয়ম হিসেবে গণ্য করেন। দ্বিতীয় অংশ নতুন নিয়মের গ্রন্থগুলোর বিষয়ে তারা দাবি করেন যে, এগুলো যীশুর ‘ইঞ্জিল’ এবং তাঁর শিষ্যদের বা তাঁদের শিষ্যদের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ বা পত্র।

১. ২. ২. বিভিন্ন প্রকারের বাইবেল ও বিভিন্ন সংখ্যার পুস্তক

আমরা সকলেই জানি যে, প্রত্যেক ধর্মের অনেক দল-উপদল আছে। কিন্তু একই ধর্মের দল-উপদলের জন্য ভিন্নভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থাকে বলে হয়ত আমাদের কোনো পাঠকই জানেন না। হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে অনেক দল-উপদল বিদ্যমান। কিন্তু কুরআন, বেদ, ত্রিপিটক ইত্যাদির ভিন্নভিন্ন সংস্করণ বা ভিন্নভিন্ন বই আছে বলে আমরা জানি না। কিন্তু খ্রিষ্টান ধর্মের বিষয়টা ভিন্ন। খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে বিভিন্ন চার্চ বা ধর্মীয় জামাতের জন্য ভিন্নভিন্ন ‘বাইবেল’ বিদ্যমান। এ সকল বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান পুস্তকের সংখ্যার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। যে সকল পুস্তক সকল বাইবেলে বিদ্যমান সেগুলোর বিষয়বস্তু, অধ্যায়, অনুচ্ছেদ, শ্লোক ইত্যাদির মধ্যেও অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। বাইবেলের পার্থক্য জানার জন্য খ্রিষ্টধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায় সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।বর্তমানে বিশ্বের খ্রিষ্টানরা মূলত তিনটা বৃহৎ দলে বিভক্ত: ক্যাথলিক, প্রটেস্ট্যান্ট ও অর্থোডক্স। এ তিনটা বৃহৎ সম্প্রদায়ের বিভক্তির মূল কারণ পোপের আধিপত্য।

(১) ক্যাথলিক বা সর্বজনীন: খ্রিষ্টধর্মের মূল ধারা ক্যাথলিক (Catholic) অর্থাৎ সর্বজনীন বা রোমান ক্যাথলিক (Roman Catholic) হিসেবে পরিচিত। রোমের বা ভ্যাটিকানের চার্চ ও পোপের নিয়ন্ত্রনাধীন খ্রিষ্টধর্ম এ নামে পরিচিত।

শুরু থেকেই খ্রিষ্টান প্রচারকরা বিভিন্ন অঞ্চলের প্রধান পুরোহিত ও ধর্মযাজককে ‘বিশপ’ (Bishop/greek: episkopos) অর্থাৎ সর্দার বা তত্ত্বাবধায়ক  (overseer) অথবা প্রেসবিটার (presbyter) অর্থাৎ মুরব্বি (elder) বলে আখ্যায়িত করতেন। বিশপকে সাধারণত ‘বাবা’ বা পিতা বলে ডাকা হত। এই শব্দটার গ্রিক পাপ্পাস (pappas), ল্যাটিন পাপা (papa) এবং ইংরেজি পোপ (Pope)। ক্রমান্বয়ে রোমের বিশপ, অর্থাৎ ভ্যাটিকানে অবস্থিত সেন্ট পিটার চার্চের প্রধান পুরোহিত নিজেকে পুরো খ্রিষ্টধর্মের প্রধান বা প্রধান বিশপ বলে দাবি করতে থাকেন। একমাত্র তিনিই বাবা বা পোপ হিসেবে আখ্যায়িত হতে থাকেন। মূলত একাদশ খ্রিষ্টীয় শতাব্দী পর্যন্ত খ্রিষ্টধর্ম পুরোপুরিই ভ্যাটিকানের পোপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অর্থাৎ খ্রিষ্টধর্মের প্রথম হাজার বছর খ্রিষ্টধর্ম বলতে ক্যাথলিক ধর্মকেই বুঝানো হত।[২]

(২) অর্থোডক্স বা গোঁড়া: ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট কন্সটান্টাইন (Constantine the Great) খ্রিষ্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। রোমান সাম্রাজ্য পশ্চিমে ইউরোপ থেকে পূর্বে এশিয়া মাইনর, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ক্রমান্বয়ে রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত হয়ে যায়। গ্রিকভাষী পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের বিশপরা রোমের বিশপের একছত্র আধিপত্য মানতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাদের বিশ্বাসে প্রত্যেক বিশপই স্বাধীন ‘পাপা’, বাবা বা পোপ এবং সকল বিশপ সম মর্যাদার অধিকারী। ক্রমান্বয়ে তাদের মধ্যে ধর্মীয় বিষয়েও মতানৈক্য দেখা দেয়। বিশেষ করে যীশু খ্রিষ্টের প্রকৃতি নিয়ে। খ্রিষ্টধর্মের মূল কালিমা ‘নাইসীন ক্রীড’ বা নিসিয়ার আকীদার মধ্যে পশ্চিমের খ্রিষ্টানরা সংযোজন করেন যে, ‘পবিত্র আত্মা পিতা ও পুত্র উভয় থেকে আগত’। পূর্বের খ্রিষ্টানরা এ সংযোজন বিভ্রান্তি বলে গণ্য করেন। বিবাদের এক পর্যায়ে ১০৫৪ সালে পূর্বের খ্রিষ্টানরা পশ্চিমের বা ভ্যাটিকানের পোপের প্রভাবাধীন খ্রিষ্টানদের থেকে বিভক্ত হয়ে যান। তারা অর্থোডক্স (Orthodox) অর্থাৎ গোঁড়া, মৌলবাদী বা মূলধারার অনুসারী হিসেবে পরিচিত। খ্রিষ্টধর্মের ইতিহাসে এ বিভক্তি বড় বিভক্তি (Great Schism) নামে পরিচিত।[৩]

(৩) প্রটেস্ট্যান্ট বা প্রতিবাদী: খ্রিষ্টধর্মের মূল ধারা পোপের নিয়ন্ত্রণেই চলতে থাকে। ১৬শ খ্রিষ্টীয় শতকে পোপের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কোনো কোনো ধর্মগুরু বিদ্রোহ করেন। এদের অন্যতম ছিলেন প্রসিদ্ধ জার্মান ধর্মগুরু মার্টিন লুথার (১৪৮৩-১৫৪৬ খ্রি.)। তিনি এবং সমসাময়িক কিছু ধর্মগুরু ধর্মের মধ্যে পোপের নেতৃত্ব ও অধিকার সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে যে নতুন ধর্মীয় ফিরকা বা ধারার সৃষ্টি হয় সেটা প্রটেস্ট্যান্ট (Protestant) বা প্রতিবাদী বলে পরিচিত।[৪]

(৪) মূল এ তিন সম্প্রদায়ের তিন প্রকার বাইবেল ছাড়াও আরো অনেক সম্প্রদায়ের পৃথক বাইবেল বিদ্যমান। বিশেষত খ্রিষ্টধর্মের সুতিকাগার ও খ্রিষ্টীয় প্রথম দুই শতাব্দীতে যে সকল অঞ্চলে খ্রিষ্টধর্ম প্রসার লাভ করে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিন ও বৃহত্তর সিরিয়া, আরমেনিয়া, মিসর ও ইথিওপিয়া। এ সকল এলাকার খ্রিষ্টানরা প্রাচীন যুগ থেকে নিজস্ব ‘বাইবেল’ অনুসরণ করেন। তাদের বাইবেলের সাথে প্রচলিত ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেলের অনেক পার্থক্য বিদ্যমান।

১. ২. ৩.খ্রিষ্টধর্মীয় পুরাতন নিয়ম বনাম ইহুদি বাইবেল

উপরের কয়েক প্রকারবাইবেলের আলোচনার জন্য প্রথমে ইহুদি বাইবেলের আলোচনা প্রয়োজন। আমরা দেখেছি যে, ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ ইহুদি বাইবেল (Jewish Bible) এবং হিব্রু বাইবেল (Hebrew Bible) নামে পরিচিত।ইহুদি বাইবেলই খ্রিষ্টান বাইবেলের পুরাতন নিয়ম, তবে ইহুদি বাইবেল ও খ্রিষ্টান বাইবেলের পুরাতন নিয়মের মধ্যে পুস্তকের সংখ্যা ও বিন্যাসে পার্থক্য রয়েছে।

খৃস্টান বাইবেলের পুরাতন নিয়মের মূল ভিত্তি ইহুদি বাইবেলের ‘গ্রীক অনুবাদ’ বা গ্রিক সংস্করণ। ইহুদি বাইবেলের গ্রিক সংস্করণকে সেপ্টুআজিন্ট (Septuagint) বা সত্তরের কর্ম বলা হয়।

ইহুদিদের ধর্মীয় ও ব্যবহারিক ভাষা হিব্রু। পুরাতন নিয়মের গ্রন্থগুলোহিব্রু ভাষায়  লেখা ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ সালে আলেকজান্ডার প্যালেস্টাইন দখল করেন এবং তা গ্রিক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ইহুদিরা গ্রিক নাগরিকে পরিণত হয় এবং ক্রমান্বয়ে তাদের মধ্যে গ্রিকভাষার কিছু প্রচলন শুরু হয়। প্রায় এক শতাব্দী পরে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৮৫-২৪৫ সালের দিকে ইহুদি ধর্মগ্রন্থগুলো গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করা হয়। কথিত আছে যে, মিসরের শাসক ২য় টলেমি: টলেমি ফিলাডেলফাস (Ptolemy Philadelphus)- এর রাজত্বকালে (খ্রি. পূ. ২৮৫-২৪৬) তাঁর নির্দেশে ৭০/৭২ জন প-িত তা ‘আলেকজান্ড্রীয় গ্রিক ভাষায়’ অনুবাদ করেন। এই গ্রিক অনুবাদটাই the Septuagint (LXX) বা সত্তরের অনুবাদ বলে প্রসিদ্ধ। একে গ্রিক পুরাতন নিয়মও (Greek Old Testament) বলা হয়। যীশুর সময়ে এ অনুবাদটা প্রচলিত ছিল।

বাহ্যত প্রজাদের মধ্যে প্রচলিত প্রসিদ্ধ ধর্মগ্রন্থের বিষয়বস্তু জানার উদ্দেশ্যে শাসকরা এ অনুবাদ তৈরি করেন। যেমন মুসলিম শাসকদের অনুরোধে সর্বপ্রথম রামায়ণের বাংলা অনুবাদ করা হয়। তবে ক্রমান্বয়ে এ গ্রিক সংস্করণের ব্যবহার ইহুদিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ইহুদিরা, বিশেষত ফিলিস্তিনের বাইরে, আলেকজান্দ্রিয়া ও অন্যান্য স্থানে বসবাসকারী ইহুদিরা হিব্রু ভাষায় দুর্বল হয়ে পড়েন। তারা গ্রিক ভাষা ব্যবহারে অধিক অভ্যস্থ হয়ে পড়েন। তারা এ গ্রিক বাইবেলের উপর নির্ভর করতে থাকেন। প্রথম প্রজন্মের খ্রিষ্টানরা এটার উপরেই নির্ভর করতেন। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত প্রায় তিনশত বছর ইহুদিরা এ গ্রিক বাইবেলের উপরেই নির্ভর করতেন। ইহুদিপন্ডিতরা ইহুদি বাইবেলের হিব্রু সংস্করণ ও গ্রিক সংস্করণকে একইরূপ গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করতেন। উইকিপিডিয়া ‘Septuagint’ প্রবন্ধের ‘Jewish use’ অনুচ্ছেদে লেখেছে:“Pre-Christian Jews, Philo and Josephus considered the Septuagint on equal standing with the Hebrew text.” অর্থাৎ “খ্রিষ্টপূর্ব ইহুদিফিলো (মৃত্যু ৫০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং যোসেফাস (মৃত্যু ১০০ খ্রিষ্টাব্দ) সেপ্টুআজিন্ট বা সত্তরের অনুবাদকে হিব্রু ভাষ্যের মত একইরূপ গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করতেন।”

পঞ্চম খ্রিষ্টীয় শতকের শেষ দিক থেকে ইহুদিরা গ্রিক পান্ডুলিপি পরিত্যাগ করে হিব্রু পান্ডুলিপির দিকে ঝুঁকে পড়েন। তবেখ্রিষ্টানরা গ্রিক নির্ভরতা অব্যাহত রাখেন। প্রথম খ্রিষ্টীয় শতাব্দী থেকে পরবর্তী প্রায় দেড় হাজার বছর সকল খ্রিষ্টানই গ্রিক পুরাতন নিয়মের উপর নির্ভর করেন। প্রাচীন সকল খ্রিষ্টীয় বাইবেলের ভিত্তি এ ‘সত্তরের অনুবাদ’। উইকিপিডিয়ার ভাষায়: “The Septuagint is the basis for the Old Latin, Slavonic, Syriac, Old Armenian, Old Georgian and Coptic versions of the Christian Old Testament.”: “সেপ্টুআজিন্ট-ই প্রাচীন ল্যাটিন, স্লাভোনিক, সিরীয়, প্রাচীন আর্মেনিয়ান, প্রাচীন জর্জিয়ান ও কপ্টিক সকল খ্রিষ্টানবাইবেলের পুরাতন নিয়মের ভিত্তি” (উইকিপিডিয়া: Septuagint)।সপ্তদশ শতক থেকে প্রটেস্ট্যান্টরা হিব্রু ভাষ্যের উপর নির্ভর করতে শুরু করেন।[৫]

এভাবে আমরা দেখছি যে, পুরাতন নিয়মের ক্ষেত্রে প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেলের ভিত্তিহিব্রু সংস্করণ। অবশিষ্ট সকল খ্রিষ্টান বাইবেলের ভিত্তি সেপ্টুআজিন্ট। তবে বাস্তবে আমরা দেখি যে, গ্রিক সেপ্টুআজিন্ট-এর সাথে ক্যাথলিক ও অন্যান্য বাইবেলের অনেক পার্থক্য রয়েছে। আমরা নিম্নে হিব্রু ইহুদি বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান পুস্তকগুলোর পাশাপাশি গ্রিক সেপ্টুআজিন্ট, ক্যাথলিক, প্রটেস্ট্যান্ট ও গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ স্বীকৃত ‘ক্যানন’ বা বিধিসম্মত বাইবেলের পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলোর তালিকা প্রদান করছি। উল্লেখ্য যে, মিসরীয়, কপ্টিক, ইথিওপীয়, আর্মেনীয় ইত্যাদি খ্রিষ্টধর্মীয় চার্চের নিকট স্বীকৃত বাইবেলের পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদির ক্ষেত্রে আরো কিছু ভিন্নতা রয়েছে। বিস্তারিত জানতে পাঠক এনকার্টার Bible/Books of the Bible এবং উইকিপিডিয়ার Books of the Bible ও Septuagint প্রবন্ধগুলো পাঠ করুন:

ক্রমিক ইহুদি বাইবেল
(২৪ পুস্তকে ৩৯)
প্রটেস্ট্যান্ট
৩৯ পুস্তক
ক্যাথলিক
৪৬ পুস্তক
অর্থোডক্স
৫১ পুস্তক
সেপ্টুআজিন্ট
৫৩ পুস্তক
1 Genesis Genesis Genesis Genesis Genesis
2 Exodus Exodus Exodus Exodus Exodus
3 Leviticus Leviticus Leviticus Leviticus Leviticus
4 Numbers Numbers Numbers Numbers Numbers
5 Deuteronomy Deuteronomy Deuteronomy Deuteronomy Deuteronomy
6 Joshua Joshua Joshua Joshua (Iesous) Joshua
7 Judges Judges Judges Judges Judges
8 1 Samuel Ruth Ruth Ruth Ruth
9 2 Samuel 1 Samuel 1 Samuel 1 Samuel  I Samuel
10 1 Kings 2 Samuel 2 Samuel 2 Samuel  II Samuel
11 2 Kings 1 Kings 1 Kings 1 Kings I Kings
12 Isaiah 2 Kings 2 Kings 2 Kings II Kings
13 Jeremiah 1 Chronicles 1 Chronicles 1 Chronicles I Chronicles
14 Ezekiel 2 Chronicles 2 Chronicles 2 Chronicles II Chronicles
15 Hosea Ezra Ezra 1 Esdras 1 Esdras
16 Joel Nehemiah Nehemiah Ezra (2 Esdras) Ezra
17 Amos Esther Tobit Nehemiah Nehemiah (2 books as one)
18 Obadiah Job Judith Tobit (Tobias) Tobit/ Tobias
19 Jonah Psalms Esther Judith Judith
20 Micah Proverbs 1 Maccabees Esther Esther with additions
21 Nahum Ecclesiastes 2 Maccabees 1 Maccabees 1 Maccabees
22 Habakkuk Song of Solomon Job 2 Maccabees 2 Maccabees
23 Zephaniah Isaiah Psalms 3 Maccabees 3 Maccabees
24 Haggai Jeremiah Proverbs 4 Maccabees Psalms
25 Zechariah Lamentations Ecclesiastes Job Psalm 151
26 Malachi Ezekiel Song of Songs Psalms Prayer of Manasseh
27 Psalms Daniel Wisdom Prayer of Manasseh Job
28 Proverbs Hosea Sirach Proverbs Proverbs
29 Job Joel Isaiah Ecclesiastes Ecclesiastes
30 Song of Songs Amos Jeremiah Song of Songs Song of Solomon
31 Ruth Obadiah Lamentations Wisdom Wisdom
32 Lamentations Jonah Baruch Sirach Sirach/ Ecclesiasticus
33 Ecclesiastes Micah Ezekiel Isaiah Psalms of Solomon
34 Esther Nahum Daniel Jeremiah Hosea
35 Daniel Habakkuk Hosea Lamentations Amos
36 Ezra Zephaniah Joel Baruch Micah
37 Nehemiah Haggai Amos Letter of Jeremiah Joel
38 1 Chronicles Zechariah Obadiah Ezekiel Obadiah
39 2 Chronicles Malachi Jonah Daniel Jonah
40 Micah Hosea Nahum
41 Nahum Joel Habakkuk
42 Habakkuk Amos Zephaniah
43 Zephaniah Obadiah Haggai
44 Haggai Jonah Zachariah
45 Zechariah Micah Malachi
46 Malachi Nahum Isaiah
47 Habakkuk Jeremiah
48 Zephaniah Baruch
49 Haggai Lamentations
50 Zechariah Letter of Jeremiah
51 Malachi Ezekiel
52 Daniel with additions
53 4 Maccabees

মিসরীয়-আফ্রিকান কপ্টিক অর্থোডক্স খৃস্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম অংশ ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়ার অর্থোডক্স টেওয়াহিদো (Orthodox Tewahedo) খৃস্টম-লী। এ সম্প্রদায় স্বীকৃত ও ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়ায় বর্তমানে প্রচলিত বাইবেলকে অর্থোডক্স টেওয়াহিদো বাইবেল (the Orthodox Tewahedo Bible) বলা হয়। এ বাইবেলের মধ্যে অর্থোডক্স বাইবেলের উপরের ৫১ পুস্তক ছাড়াও নিম্নের অতিরিক্ত পুস্তকগুলো বিদ্যমান: (1) Jubilees, (2) Enoch, (3) Ezra 2nd, (4) Ezra Sutuel, (5) 4 Baruch, (6) Josippon,। এছাড়া এ বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান মাকাবীয় পুস্তকগুলো অর্থোডক্স বাইবেলের মাকাবীয় চারটা পুস্তক থেকে সম্পুর্ণ ভিন্ন। ইথিওপীয় বাইবেল বা আবিসিনিয়ান ক্যানন (Abyssinian canon)-এর বিভিন্ন সংস্করণ বা পান্ডুলিপির মধ্যে Ascension of Isaiah আরো একটা পুস্তক বিদ্যমান। পাঠক বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়ায়: Orthodox Tewahedo biblical canon, Ascension of Isaiah, Book of Jubilees, Book of Enoch, 1 Esdras, 4 Baruch, Josippon প্রবন্ধগুলো পাঠ করুন।

সুপ্রিয় পাঠক, এখানে নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষণীয়:

প্রথমত: ইহুদি বাইবেল বা তানাখ/তানাক (Tanakh/Tenak)-এর পুস্তকসংখ্যা ২৪, যেগুলোর মধ্যে উপরের ৩৯টা পুস্তক বিদ্যমান।তালিকাটা নিম্নরূপ:
(১-৭)…….১ থেকে ৭ নং পুস্তক: ৭টা পৃথক পুস্তক।
(৮)………৮ ও ৯ নং পুস্তক: ১ শমূয়েল ও ২ শমূয়েল একটা পুস্তক।
(৯)………১০ ও ১১ নং পুস্তক: ১ রাজাবলি ও ২ রাজাবলি একটা পুস্তক।
(১০-১২)… ১২ থেকে ১৪ নং তিনটা পৃথক পুস্তক (যিশাইয়, যিরমিয়, যিহিষ্কেল)
(১৩)…….১৫ থেকে ২৬ নং পর্যন্ত ১২টা পুস্তক একত্রে ‘দ্বাদশ’ (The Twelve/ Trei Asar) (বারজন গৌণ নবী) নামে একটা পুস্তক।
(১৪-২২)…২৭ থেকে ৩৫ নং পর্যন্ত ৯টা পৃথক পুস্তক।
(২৩)…….৩৬ ও ৩৭ নং পুস্তকদ্বয় (ইযরা ও নহিমিয়) একত্রে একটা পুস্তক।
(২৪)……..৩৮ ও ৩৯ নং পুস্তকদ্বয় (১ বংশাবলি ও ২ বংশাবলি)

দ্বিতীয়ত: ইহুদিদের একটা সম্প্রদায় শমরীয় (Samaritan) ইহুদিরা পুরাতন নিয়মের শুধু প্রথম ৫টা গ্রন্থ বিশুদ্ধ ও পালনীয় বলে স্বীকার করেন, যা শমরীয় তৌরাত, শমরীয় পঞ্চপুস্তক বা শমরীয় বৈধ বাইবেল (The Samaritan Pentateuch/ the Samaritan Torah/ The Samaritan canon) নামে প্রসিদ্ধ। বাইবেলের অন্য সকল পুস্তকের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা তারা অস্বীকার করেন। তারা মূল হিব্রু পান্ডুলিপির অনুসরণ করেন। এনকার্টায় শমরীয় তৌরাতকে তৌরাতের প্রাচীনতর ভাষ্য (an older text of the first five books of the Bible) বলা হয়েছে। আধুনিক ইহুদিতৌরাত এবং গ্রিকতৌরাতের সাথে শমরীয় তৌরাতের প্রায় ৬ হাজার পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক যুগে আবিষ্কৃত মৃত সাগরের পান্ডুলিপি (Dead Sea Scrolls) আবিষ্কারের পর পাশ্চাত্য গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, ইহুদি বাইবেল ও খ্রিষ্টান বাইবেলের চেয়ে শমরীয় বাইবেল প্রাচীন পান্ডুলিপিগুলোর সাথে অধিক মিল-সম্পন্ন।[৬]

তৃতীয়ত: ইহুদি বাইবেল ও প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেলের পুস্তকগুলোর সংখ্যা একই। তবে পুস্তকগুলোর ক্রমবিন্যাসে অনেক পার্থক্য। ধর্মগ্রন্থের সূরা বা পুস্তকগুলোর মধ্যে এরূপ অমিল মুসলিম পাঠকের কাছে খুবই অগ্রহণযোগ্য ও অবিশ্বাস্য বিষয়। ধর্মগ্রন্থের সূরা, অধ্যায় বা পুস্তকগুলোকে এভাবে ইচ্ছামত আগে পরে করা যায় বলে মুসলিমরা ভাবতেও পারেন না। এমনকি কোনো সাধারণ লেখকের সংকলিত ও সম্পাদিত একটা গ্রন্থমালার বইগুলো পরবর্তীকালে কেউ আগে পিছে করলে তা সকল গবেষক ও সমালোচকের নিকট অগ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু খ্রিষ্টান পন্ডিতরা বিষয়টাকে হাল্কা হিসেবেই দেখেন।

চতুর্থত: আমরা দেখলাম যে, পুরাতন নিয়মের মূল ভিত্তি গ্রিক সেপ্টুআজিন্ট (Septuagint)-এর মধ্যে ৫৩ টা পুস্তক, অর্থোডক্স পুরাতন নিয়মে ৫১টা পুস্তক, ক্যাথলিক পুরাতন নিয়মে ৪৬টি পুস্তক এবং প্রটেস্ট্যান্ট পুরাতন নিয়মে ৩৯ টা পুস্তক বিদ্যমান। একই ধর্মের একই ধর্মগ্রন্থের মধ্যে এত পার্থক্য পৃথিবীর আর কোনো প্রসিদ্ধ ধর্মের ধর্মগ্রন্থের মধ্যে আছে বলে জানা যায় না।
‘বাইবেলের বৈধ-বিশুদ্ধ গ্রন্থাবলি: এক গোঁড়া বাইবেল বিশ্বাসী প্রেক্ষাপট: The Canon of the Bible A conservative, bible believing perspective’ নামক আর্টিকেলে (দেখুন http://www.bible.ca/canon.htm) এবং ‘খ্রিষ্টীয় বাইবেল, রোমান ক্যাথলিক বাইবেল, গ্রীক অর্থোডক্স বাইবেলের তালিকা: List of books in the Christian Bible, Roman Catholic Bible, Greek Orthodox Bible’ (দেখুন: http://www.bible.ca/b-canon-orthodox-catholic-christian-bible-books.htm ) থেকে বিভিন্ন খ্রিষ্টীয় বাইবেলের মধ্যকার পার্থক্য উল্লেখ করছি। উল্লেখ্য যে, এসব ওয়েবসাইটে খ্রিষ্টীয়ান বাইবেল বলতে প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেল বুঝানো হয়েছে।

ইংরেজি নাম বাংলা নাম

 

Christian’s Bible (খ্রিষ্টান বাইবেল) Roman Catholic Bible

(রোমান ক্যাথলিক বাইবেল)

Greek Orthodox Bible

(গ্রীক অর্থোডক্স বাইবেল)

The Septuagint

(সেপ্টুআ-জিন্ট)

1. 1 Esdras ১ ইসদরাস নেই নেই আছে আছে
2. Tobit তোবিত নেই আছে আছে আছে
3. Judith যুদিথ নেই আছে আছে আছে
4. Additions to Esther (103 Vrs) ইস্টেরে (১০৩ শ্লোক) সংযোজন নেই আছে আছে আছে
5. Wisdom of Solomon সলোমনের প্রজ্ঞাপুস্তক নেই আছে আছে আছে
6. Ecclesiasticus বিন সিরাহ নেই আছে আছে আছে
7. Baruch বারুক নেই আছে আছে আছে
8. Epistle of Jeremiah যিরমিয়ের পত্র নেই আছে আছে আছে
9. Song of the Three Children তিন শিশুর সঙ্গীত নেই আছে আছে আছে
10. Story of Susanna সুসান্নার গল্প নেই আছে আছে আছে
11. Bel and the Dragon বেল ও ড্রাগন নেই আছে আছে আছে
12. Prayer of Manasseh  মনশির প্রার্থনা নেই আছে আছে আছে
13. 1 Maccabees ১ মাকাবীয় নেই আছে আছে আছে
14. 2 Maccabees ২মাকাবীয় নেই আছে আছে আছে
15. 3 Maccabees ৩ মাকাবীয় নেই নেই আছে আছে
16. 4 Maccabees ৪ মাকাবীয় নেই নেই আছে আছে
17. Psalm 151 গীতসংহিতা ১৫১ নেই নেই আছে আছে
18. Psalms of Solomon সলোমনের গীতসংহিতা নেই নেই নেই আছে

পঞ্চমত: আমরা দেখছি যে, ক্যাথলিক বাইবেলের পুরাতন নিয়মের পুস্তক সংখ্যা ৪৬ এবং অর্থোডক্স পুরাতন নিয়মের পুস্তক সংখ্যা ৫১। পক্ষান্তরে তারা সকলেই যে মূল গ্রিক সংস্করণ বা সেপ্টুআজিন্টের উপর নির্ভর করেছেন তার মধ্যে পুস্তকের সংখ্যা ৫৩। এভাবে আমরা দেখছি যে, মূল গ্রিক সেপ্টুআজিন্টের মধ্যে ১৪টা পুস্তক বিদ্যমান যেগুলো ইহুদি ও প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানরা বাতিল বলে গণ্য করেছেন। এগুলোর মধ্য থেকে ৭টা পুস্তক ক্যাথলিকরা গ্রহণ করেছেন। অবশিষ্ট ৭টার মধ্যে ৫টা অর্থোডক্সরা গ্রহণ করেছেন। অবশিষ্ট দু’টা পুস্তক তিন সম্প্রদায়ই বাতিল করেছেন। আমরা আগেই বলেছি যে, ইথিওপীয়, মিসরীয়, সিরীয় ইত্যাদি প্রাচীন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়গুলোর বাইবেলের মধ্যে এ সকল পুস্তক বিদ্যমান।

ষষ্ঠত: প্রটেস্ট্যান্টরা ক্যাথলিক পুরাতন নিয়মের ৭টা পুস্তককে সন্দেহভাজন বা ‘জাল’ বলে গণ্য করেছেন। প্রায় ১৬০০ বছর পবিত্র বাইবলের অন্তর্ভুক্ত আসমানি গ্রন্থ বা ঐশ্বরিক পুস্তক হিসেবে গণ্য হওয়ার পর প্রটেস্ট্যান্টরা সপ্তদশ শতাব্দীতে এগুলোকে বাদ দিয়ে তাদের বাইবেল মুদ্রণ করেন। তবে প্রটেস্ট্যান্টদের স্বীকৃত নতুন নিয়মের পুস্তকগুলোর মধ্যে এ সকল জাল বা বাতিলকৃত বইয়ের উদ্ধৃতি পাওয়া যায়।[৭]

১. ২. ৪. পুরাতন নিয়মের আরো অনেক পুস্তক

পুরাতন নিয়মের উপরের গ্রন্থগুলো ছাড়াও আরো অনেক পুস্তক রয়েছে, যেগুলো প্রাচীনকাল থেকে ইহুদি সমাজে এবং প্রথম শতাব্দীগুলোর খ্রিষ্টান সমাজে আসমানী গ্রন্থ বা ধর্মগ্রন্থ হিসেবে প্রচলিত থাকলেও পরবর্তী যুগের ইহুদি-খ্রিষ্টান পন্ডিত ও ধর্মগুরুরা সেগুলোকে ‘বিশুদ্ধ’ বা ‘আইনসিদ্ধ’ (canonical) বলে গ্রহণ করেননি। এগুলোকে তারা এপক্রিপা (apocrypha) অর্থাৎ সন্দেহজনক, অনির্ভরযোগ্য, লুকানো বা জাল পুস্তক বলে গণ্য করেছেন। তবে তাদের স্বীকৃত কোনো কোনো পুস্তকে এ সকল জাল পুস্তকের উদ্ধৃতি বিদ্যমান। এছাড়া স্বীকৃত বাইবেলের অনেক প্রাচীন পান্ডুলিপির মধ্যেও এ সকল সন্দেহজনক বা জাল পুস্তক বিদ্যমান। নিম্নে এজাতীয় কিছু পুস্তকের নাম দেখুন:[৮]

ক্রম ইংরেজি নাম বাংলা নাম
1. Assumption of Moses মূসার স্বর্গারোহণ
2. Book of Jubilees জয়ন্তী পুস্তক
3. History of the Captivity in Babylon ব্যাবিলনে বন্দিদশার ইতিহাস
4. III Baruch বারুখের ৩য় পুস্তক
5. Paralipomena Jeremiae, or the Rest of the Words of Baruch: 4 Baruch বারুখের ৪র্থ পুস্তক
6. Martyrdom and Ascension of Isaiah যিশাইয়র শহীদ হওয়া ও ঊর্ধ্বারোহণ
7. Pseudo-Philo’s Liber Antiquitatum Biblicarum (The Biblical Antiquities of Philo) ফিলো রচিত বাইবেলীয় প্রাচীনকালের নিদর্শনাবলি
8. The Apocalypse of Baruch বারুখের নিকট প্রকাশিত বাক্য
9. Jannes and Jambres/ Iannes যান্নি ও যামব্রি
10. Joseph and Aseneth যোসেফ (ইউসুফ) ও আসেন্থ
11. Letter of Aristeas আরিস্টিসের পত্র
12. Life of Adam and Eve আদম ও হাওয়ার জীবনী
13. Lives of the Prophets নবীগণের জীবনী
14. Ladder of Jacob যাকোবের (ইয়াকুবের) মই
15. History of the Rechabites রেকাবীয়দের ইতিহাস
16. Eldad and Modad এলদাদ ও মদাদ
17. History of Joseph যোসেফের (ইউসুফের) ইতিহাস
18. Odes of Solomon শলোমনের কবিতা-গাঁথা
19. Prayer of Joseph যোসেফের প্রার্থনা
20. Prayer of Jacob যাকোবের প্রার্থনা
21. The First Book of Adam and Eve আদম ও হাওয়ার প্রথম পুস্তক
22. The Second Book of Adam and Eve আদম ও হাওয়ার দ্বিতীয় পুস্তক
23. The Book of the Secrets of Enoch ইনোকের রহস্য পুস্তক
24. The Story of Ahikar অহিকারের কাহিনী
25. The Testaments of the Twelve Patriarchs দ্বাদশ কুলপতির নিয়ম পুস্তক
26. Testament of Reuben রুবেনের নিয়ম পুস্তক
27. Testament of Simeon শিমোনের নিয়ম পুস্তক
28. Testament of Levi লেবীর নিয়ম পুস্তক
29. The Testament of Judah যিহূদার নিয়ম পুস্তক
30. The Testament of Issachar ইশাখরের নিয়ম পুস্তক
31. The Testament of Zebulun সেবুলূনের নিয়ম পুস্তক
32. The Testament of Dan দানের নিয়ম পুস্তক
33. The Testament of Naphtali নাপ্তালির নিয়ম পুস্তক
34. The Testament Of Gad গাদের নিয়ম পুস্তক
35. The Testament of Asher আশেরের নিয়ম পুস্তক
36. The Testament of Joseph যোষেফের নিয়ম পুস্তক
37. The Testament of Benjamin বিন ইয়ামিনের নিয়ম পুস্তক
38. The Book of Enoch ইনোকের পুস্তক
39. The Testament of Job ইয়োবের (আইউবের) নিয়ম পুস্তক

১. ২. ৫. মূল পুস্তকগুলোর বক্তব্যের পার্থক্য

সম্মানিত পাঠক, পার্থক্য বা ভিন্নতা শুধু পুস্তকগুলোর ক্ষেত্রেই নয়। যে পুস্তকগুলো সকল বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান সেগুলোর বক্তব্যের মধ্যেও অনেক ভিন্নতা রয়েছে। উইকিপিডিয়ার সেপ্টুআজিন্ট (Septuagint) প্রবন্ধ থেকে ইহুদি ও খ্রিষ্টান সকলের নিকট স্বীকৃত ‘তৌরাত’ নামে প্রসিদ্ধ পঞ্চপুস্তক থেকে দু’টা নমুনা পেশ করছি। ( http://en.wikipedia.org/wiki/Septuagint )

প্রথম নমুনা: আদিপুস্তক চতুর্থ অধ্যায়ের ৭ শ্লোক (Genesis 4:7)
সেপ্টুআজিন্ট বা গ্রিক পুরাতন নিয়মে (NETS) এ শ্লোকটা নিম্নরূপ:“If you offer correctly but do not divide correctly, have you not sinned? Be still; his recourse is to you, and you will rule over him.”:“যদি তুমি সঠিকভাবে নিবেদন/ উৎসর্গ কর কিন্তু সঠিকভাবে বণ্টন না কর, তবে তুমি কি পাপ করলে না? স্থির/ শান্ত হও; তার আশ্রয়/ অবলম্বন তোমার প্রতি, এবং তুমি তার উপর রাজত্ব/ শাসন করবে।”

ইহুদি বাইবেলে (Masoretic/ MT:Judaica Press) শ্লোকটা নিম্নরূপ:“Is it not so that if you improve, it will be forgiven you? If you do not improve, however, at the entrance, sin is lying, and to you is its longing, but you can rule over it.”“এটাই কি বিষয় নয় যে, যদি তুমি উন্নতি কর, তবে তোমাকে ক্ষমা করা হবে? যাই হোক, যদি তুমি উন্নতি না কর, প্রবেশের সময়েই/ শুরুতেই পাপ অবস্থান করবে, এবং তোমার প্রতিই তা আকাক্সক্ষী, কিন্তু তুমি তার উপর রাজত্ব/ শাসন করতে পার।”

ল্যাটিন ভলগেট (Latin Vulgate/ Douay-Rheims)-এ শ্লোকটার বক্তব্য নিম্নরূপ:“If thou do well, shalt thou not receive? but if ill, shall not sin forthwith be present at the door? but the lust thereof shall be under thee, and thou shalt have dominion over it.”“তুমি যদি ভাল কর, তুমি কি পাবে না? কিন্তু যদি মন্দ হয় তবে পাপ কি তৎক্ষণাৎ দরজায় উপস্থিত হবে না? কিন্তু তার লালসা/ কামনা তোমার নিচে থাকবে এবং তার উপর তোমার কর্তৃত্ব থাকবে।”

উল্লেখ্য যে, বাংলা বাইবেলগুলোতে উপরের বৈপরীত্য তত সুস্পষ্ট নয়। বাংলা অনুবাদগুলো হিব্রু ও ল্যাটিন পাঠের নিকটবর্তী। কেরি: “যদি সদাচরণ কর, তবে কি গ্রাহ্য হইবে না? আর যদি সদাচরণ না কর, তবে পাপ দ্বারে গুঁড়ি মারিয়া রহিয়াছে। তোমার প্রতি তাহার বাসনা রহিয়াছে, এবং তুমি তাহার উপর কর্তৃত্ব করিবে।”

জুবিলী বাইবেলের অনুবাদ: “সদ্ব্যবহার করলে তুমি কি মুখ উচ্চ করে রাখবে না? কিন্তু সদ্ব্যবহার না করলে পাপই তোমার দ্বারে ওত পেতে বসে রয়েছে। তোমার জন্য সেই পাপ লোলুপ বটে, কিন্তু তা দমন করা তোমার উপরই নির্ভর করবে।”

বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি কর্তৃক ২০০৬ সালে প্রকাশিত কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ জুবিলী বাইবেলের কাছাকাছি, কিন্তু ২০১৩ সালে প্রকাশিত কিতাবুল মোকদ্দসের অনুবাদ কেরির অনুবাদের অনুরূপ।

দ্বিতীয় নমুনা: দ্বিতীয় বিবরণের ৩২/৪৩ মূসার গীত (the Song of Moses)
ইহুদি বাইবেলের ( Masoretic ) ভাষ্য:“1 Shout for joy, O nations, with his people. 2 For he will avenge the blood of his servants. 3 And will render vengeance to his adversaries. 4 And will purge his land, his people.”

“১ চিৎকার কর আনন্দের জন্য, হে জাতিগণ, তার প্রজাদের সাথে। ২ কারণ তিনি তার দাসদের রক্তের প্রতিশোধ নিবেন। ৩ এবং প্রদান করবেন প্রতিশোধ তার বিরোধীদের প্রতি। ৪ এবং বিশোধিত করবেন তার দেশ ও তার প্রজাদেরকে।”

কুমরান পান্ডুলিপিতে বক্তব্যটা এরকম:“1 Shout for joy, O heavens, with him. 2 And worship him, all you divine ones. 3 For he will avenge the blood of his sons. 4 And he will render vengeance to his adversaries. 5 And he will recompense the ones hating him. 6 And he purges the land of his people.”

“১ চিৎকার কর আনন্দের জন্য, হে আকাশমন্ডল, তার সাথে। ২ এবং ইবাদত কর তার, তোমরা দেবগণ সকলে। ৩ কারণ তিনি তার সন্তানদের রক্তের প্রতিশোধ নিবেন। ৪ এবং তিনি প্রদান করবেন প্রতিশোধ তার বিরোধীদের প্রতি। ৫ এবং তিনি প্রতিফল দিবেন তাদেরকে যারা তাকে ঘৃণা করে। ৬ এবং বিশোধিত করবেন তার দেশ ও তার প্রজাদেরকে।”

সেপ্টুআজিন্ট বা মূল গ্রিক পুরাতন নিয়মের ভাষ্য:“1 Shout for joy, O heavens, with him. 2 And let all the sons of God worship him. 3 Shout for joy, O nations, with his people. 4 And let all the angels of God be strong in him. 5 Because he avenges the blood of his sons. 6 And he will avenge and recompense justice to his enemies. 7 And he will recompense the ones hating. 8 And the Lord will cleanse the land of his people.”

“১ চিৎকার কর আনন্দের জন্য, হে আকাশম-ল, তার সাথে। ২ আল্লাহর সকল পুত্র তার ইবাদত করুক। ৩ চিৎকার কর আনন্দের জন্য, হে জাতিগণ, তার প্রজাদের সাথে। ৪ এবং আল্লাহর সকল ফেরেশতা তার মধ্যে সুদৃঢ়/ স্থির হোক। ৫ কারণ তিনি তার সন্তানদের রক্তের প্রতিশোধ নিবেন। ৬ এবং তিনি প্রতিশোধ নিবেন এবং ন্যায় প্রতিফল দিবেন তার শত্রুদেরকে। ৭ এবং তিনি প্রতিফল দিবেন তাদেরকে যারা ঘৃণাকারী। ৮ এবং প্রভু পরিস্কার করবেন দেশ এবং তার প্রজাদেরকে।”

ইংরেজি কিং জেমস ভার্শন, রিভাইজড স্টান্ডার্ড ভার্শন ও অন্যান্য ভার্শনে ইহুদি পাঠ গ্রহণ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ইংলিশ স্টান্ডার্ড ভার্শন, নিউ লিভিং ট্রান্সলেশন ইত্যাদি সংস্করণে সেপ্টুআজিন্ট-এর পাঠ অনুসরণ  করা হয়েছে। কিন্তু এ সকল অনুবাদে ঈশ্বরের সকল পুত্র (all the sons of God)-এর পরিবর্তে ঈশ্বরের সকল ফেরেশতা (all the angels of God) লেখা হয়েছে। ইন্টারনেটে biblestudytools.com[৯], biblegateway.com[১০]

ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে পাঠক বিষয়টা বিস্তারিত জানতে পারবেন।
উল্লেখ্য যে, বাইবেলের বাংলা অনুবাদে এ পার্থক্য দৃশ্যমান। কেরির অনুবাদ হচ্ছে: “জাতিগণ, তাঁহার প্রজাদের সহিত হর্ষনাদ কর; কেননা তিনি আপন দাসদের রক্তের প্রতিফল দিবেন, আপন বিপক্ষগণের প্রতিশোধ লইবেন, আপন দেশের জন্য, আপন প্রজাগণের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করিবেন।”

জুবিলী বাইবেলের অনুবাদ এরকম: “আকাশমন্ডল, তাঁর সঙ্গে আনন্দে চিৎকার কর! ঈশ্বরের সকল সন্তান তাঁর সম্মুখে প্রণিপাত করুক! জাতিসকল, তাঁর জনগণের সঙ্গে আনন্দে চিৎকার কর! ঈশ্বরের সকল দূত তাঁর শক্তির কথা প্রচার করুন। কেননা তিনি তাঁর আপন দাসদের রক্তের প্রতিশোধ নেবেন, তাঁর আপন বিরোধীদের উপরেই প্রতিফল ফিরিয়ে দেবেন, যারা তাঁকে ঘৃণা করে, তিনি তাদের যোগ্য মজুরি দেবেন তাঁর আপন জনগণের দেশভূমি শোধন করবেন।”

সম্মানিত পাঠক, ধর্মগ্রন্থের একই পুস্তকের বিভিন্ন সংস্করণের মধ্যে এরূপ ভিন্নতা অ-খ্রিষ্টান গবেষক ছাড়াও আধুনিক অনেক খ্রিষ্টান গবেষককেও প্রচন্ডভাবে বিব্রত করে। ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা দাবি করেন যে, প্রচলিত পঞ্চপুস্তক মূসা (আ.) থেকে হুবহু বর্ণিত অভ্রান্ত ঐশ্বরিক বাণী। এরূপ ভিন্নতা এ দাবির সাথে সাংঘর্ষিক। উল্লেখ্য যে, বাইবেলের প্রায় সকল পুস্তকের সকল শ্লোকেরই একাধিক পাঠ ও ভিন্নতা রয়েছে।

১. ২. ৬. ইহুদি বাইবেল, পুরাতন নিয়মবনাম তৌরাত

তোরাহ, তৌরাত, তাওরাতবা ‘তাওরাহ’ হিব্রু শব্দ। এর অর্থ আইন বা শিক্ষা (law or doctrine)। কখনো কখনো ইহুদি বা খ্রিষ্টানপন্ডিতরা ইহুদি বাইবেল বা পুরাতন নিয়মকে ‘তৌরাত শরীফ’ নামে প্রচার করেন। বিষয়টা সঠিক নয়।আমরা দেখেছি যে, ইহুদি বাইবেলের ২৪টা পুস্তক তিন ভাগে বিভক্ত:

(ক) প্রথম ৫টা পুস্তক তোরাহ (Torah/The Law)

(খ) পরবর্তী৮টা পুস্তক নাবী বা নাবিয়্যীম ( Navi / Nevi’im: Prophets), অর্থাৎ নবীগণ।  তন্মধ্যে প্রথম ৪টা পুস্তক পূর্ববর্তী নবীগণ (Earlier Prophets):  যিহশূয়, বিচারকর্তৃগণ, ১ শমূয়েল ও ২ শমূয়েল একত্রে এবং ১ রাজাবলি ও ২ রাজাবলি একত্রে। আর পরবর্তী ৪টা পুস্তক পরবর্তী নবীগণ (Latter Prophets): যিশাইয়, যিরমিয়, যিহিষ্কেল তিনটা পুস্তক এবং পরবর্তী১২ পুস্তক: হোশেয়, যোয়েল, আমোস, ওবাদিয়, যোনা, মিখা, নাহূম, হাবাক্কুক, যেফনিয়, হগয়, সখরিয় ও মালাখি একটা পুস্তক।

(গ) সর্বশেষ ১১টা পুস্তক কিতুবীম ( Ketuvim ) বা লিখনিসমূহ ( The Writings ):গীতসংহিতা, হিতোপদেশ, ইয়োব, পরমগীত, রুত, বিলাপ, উপদেশক, ইস্টের, দানিয়েল, ইয্রা ও নেহেমিয় একত্রে এবং ১ বংশাবলি ও ২ বংশাবলি একত্রে।

তিন অংশের এ ২৪টা পুস্তকের সমষ্টিকে একত্রে তানাক (Tanak / Tanakh) বলা হয়।আমরা আগেই উল্লেখ করেছি নামটা তিন অংশের প্রথম বর্ণের সমন্বয়। তৌরাতের ‘তা’, ‘নাবিয়্যীম’-এর ‘না’ এবং ‘কিতুবীম’-এর ‘ক’ একত্রে মিলিয়ে ‘তানাক’ বা ‘তানাখ’ নামকরণ করা হয়েছে। ইহুদিরা শুধু প্রথম অংশকেই ‘তৌরাত’ বলেন। কখনোই তারা এ তিন অংশের সমন্বিত ২৪টা পুস্তকের সংকলনকে তৌরাত বলে দাবি করেন না।

পক্ষান্তরে ক্যাথলিক পুরাতন নিয়মে পুস্তকগুলো চারভাগে ভাগ করা হয়েছে:

(১) তৌরাতবা পঞ্চপুস্তক (The Pentateuch/Torah): প্রথম ৫ পুস্তক।
(২) ঐতিহাসিক পুস্তকসমূহ (The Historical Books): পরবর্তী ১৬টা পুস্তক।
(৩) প্রজ্ঞাপুস্তকসমূহ (The Wisdom Books): পরবর্তী ৭টা পুস্তক।
(৪) নবীগণের পুস্তকসমূহ (The Prophetical Books): সর্বশেষ ১৮টা পুস্তক।

প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেলের বিভাজন ও বিন্যাস অনেকটা ক্যাথলিক বাইবেলের মতই, তবে প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেলে প্রজ্ঞাপুস্তক সমূহকে কাব্যিক পুস্তকসমূহ (The Poetical Books) নামকরণ করা হয়েছে।তাদের বিন্যাস নিম্নরূপ:

(১) তৌরাত বা পঞ্চপুস্তক (The Pentateuch/Torah): প্রথম ৫ পুস্তক।
(২) ঐতিহাসিক পুস্তকসমূহ (The Historical Books): ১২টা পুস্তক।
(৩) কাব্যিক পুস্তকসমূহ (The Poetical Books): ৫টা পুস্তক।
(৪) নবীগণের পুস্তকসমূহ (The Prophetical Books): ১৭টা পুস্তক।[১১]

চার অংশের সমন্বিত সংকলনকে সকল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সকল বাইবেলেই ওল্ড টেস্টামেন্ট (Old Testament), অর্থাৎ ‘পুরাতন নিয়ম’, ‘পুরাতন ব্যবস্থা’ বা ‘পুরাতন সন্ধি’ বলে নামকরণ করা হয়েছে। কোনো খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ৪৬ বা ৩৯ পুস্তকের সমষ্টিকে ‘তৌরাত’ বলে দাবি বা নামকরণ করেননি।
এভাবে আমরা দেখছি যে, ইহুদিও খ্রিষ্টধর্মীয় পরিভাষায় পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তককে একত্রে তৌরাত বলা হয় না। আর ইসলামি পরিভাষায় মূসা (আ.)-এর উপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ গ্রন্থটাই শুধু ‘তাওরাত’। কাজেই পুরাতন নিয়মকে ‘তৌরাত’ বলা ধর্মীয় ও নৈতিকভাবে সঠিক নয় বলেই প্রতীয়মান।


[২]Microsoft Encarta, articles: catholic, bishop, pope, papacy, schism.

[৩]Microsoft Encarta: Orthodox church, bishop, pope, papacy, schism.

[৪] Microsoft Encarta, articles: protestant, protestantism, Martin Luther

[৫]     উপরের বিষয়গুলোর জন্য উইকিপিডিয়া, এনকার্টা, ব্রিটানিকা ইত্যাদি বিশ্বকোষে নিম্নের আর্টিকেলগুলো দেখুন: Old Testament, Development of the Hebrew Bible canon, Development of the Old Testament canon

[৬]     উইকিপিডিয়া: The Samaritan Pentateuch, ব্রিটানিকা: biblical literature/ The Samaritan canon, এনকার্টা: Samaria.

[৭]     বিস্তারিত দেখুন: The New Encyclopedia Britannica, 15th Edition, Vol-2, Biblical Literature, pp883, 932-935. উেইকিপিডিয়া:Non-canonical books referenced in the Bible.

[৮]    এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা : biblical literature; উইকিপিডিয়া: Jewish apocrypha, Biblical apocrypha, Pseudepigrapha, The Lost Books of the Bible and the Forgotten Books of Eden, Non-canonical books referenced in the Bible. আরো দেখুন: The Forgotten Books of Eden, by Rutherford H. Platt, Jr., [1926], full text e text at sacred-texts.com.

[৯]http://www.biblestudytools.com/nlt/deuteronomy/32.html.

[১০]https://www.biblegateway.com/passage/?search=Deuteronomy+32

[১১] বিস্তারিত দেখুন: এনকার্টা: Books of the Bible


সূচিপত্রে ফিরে চলুন

প্রথম অধ্যায়: বাইবেল পরিচিতি

১. ১. বাইবেল: নামকরণ ও অর্থ

১. ১. ১. উৎপত্তি ও অর্থ

‘বাইবেল’ শব্দটা বাঙালিদের নিকট অতি পরিচিত। বাংলাদেশ ও ভারতের সকল বাংলাভাষী সাধারণভাবে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থকে ‘বাইবেল’ নামে চেনেন। ইংরেজি ও সকল ইউরোপীয় ভাষায় ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ ‘বাইবেল’ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে বিজয় লাভের পর বৃটিশ খ্রিষ্টান মিশনারিরা বাংলাদেশে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারক প্রেরণ করেন। তারা তাদের ধর্মগ্রন্থকে ‘পবিত্র বাইবেল’ নামে বাংলায় অনুবাদ করে প্রচার করেন।

বাইবেল শব্দটার অর্থ ‘পুস্তক’। ভূমধ্যসাগরের উপকূলে বর্তমান বৈরুতের নিকটবর্তী প্রাচীন ফনিশিয়া ( Phoenicia ) রাজ্যের একটা শহরের নাম ছিল ‘বিবলস’ ( Byblos )। এ শহর থেকেই গ্রিকরা প্রাচীন ‘কাগজ’ প্যাপিরাস ( Papyrus ) আমদানি করত। এজন্য গ্রিক ভাষায় প্যাপিরাস বা কাগজ এবং প্যাপিরাস বান্ডিল ( papyrus scroll ) ‘বিবলস’ ( Byblos / biblos ) এবং কাগজে লেখা ছোট পুস্তক ‘বিবলিয়ন’ ( biblion = small book ) নামে পরিচিত ছিল। মাইক্রোসফট এনকার্টা বিশ্বকোষের ‘বাইবেল’ আর্টিকেলে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

The term Bible is derived through Latin from the Greek biblia, or “books,” the diminutive form of byblos, the word for “papyrus” or “paper,” which was exported from the ancient Phoenician port city of Biblos. By the time of the Middle Ages the books of the Bible were considered a unified entity.

“বাইবেল শব্দটা ল্যাটিন ভাষার মাধ্যমে গ্রিক ‘বিবলিয়া’ শব্দ থেকে আগত। এটা মূলত ‘বিবলস’ শব্দ থেকে গৃহীত। বিবলস অর্থ ছিল প্যাপিরাস বা কাগজ, যা প্রাচীন ফনিসিয়ান বন্দরনগরী ‘বিবলস’ থেকে আমদানি করা হত। মধ্যযুগে এসে বাইবেলের পুস্তকগুলোকে একীভূত অস্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হত।”

১. ১. ২. বাইবেল বনাম পবিত্র বাইবেল

উপরের তথ্য থেকে আমরা দেখছি যে, ‘বাইবেল’ শব্দটার অর্থ ‘পুস্তক’ বা ‘পুস্তকমালা’। আমরা আরো দেখছি যে, প্রাচীন যুগে ‘বাইবেল’-কে ‘পবিত্র বাইবেল’ বলার প্রচলন ছিল না। মধ্যযুগে ল্যাটিন ভাষায় কখনো কখনো ‘বিবলিয়া’ শব্দটার সাথে ‘স্যাকরা’ ( sacra ) শব্দ ব্যবহার করা হত, যার অর্থ পবিত্র ( sacred )। এ ব্যবহারের ভিত্তিতে ইংরেজিতে ‘the holy Bible’ বা ‘পবিত্র বাইবেল’ বলার প্রচলন ছিল। বর্তমানে ‘বাইবেল’ ও ‘পবিত্র বাইবেল’ উভয় পরিভাষাই দেখতে পাওয়া যায়।

১. ১. ৩.গ্রিক বনাম হিব্রু

আমরা দেখছি যে, ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মের ধর্মগ্রন্থটার নাম মূলত গ্রিক ভাষা থেকে গৃহীত এবং ল্যাটিন ভাষায় পরিমার্জিত হয়ে ‘পবিত্র বাইবেল’ নামে পরিচিত। পরবর্তী আলোচনা থেকে আমরা দেখব যে, এ গ্রন্থটা মূলত হিব্রু ভাষায় রচিত ও প্রচারিত। অনেক শতাব্দী পরে গ্রন্থটা গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করা হয়। আমরা জানি, প্রতিটা গ্রন্থেরই তার নিজস্ব ভাষায় নাম থাকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হলেও গ্রন্থটার মূল নাম ( proper noun ) অবিকৃত ও অভিন্নই থাকে। তাহলে ‘বাইবেল’ নামক এ বইটার হিব্রু ভাষায় নাম কী ছিল? বইটার সংকলক ও প্রচারকরা কি হিব্রু ভাষায় বইটার কোনো নাম দেননি? দিলে তা কী ছিল এবং কেনই বা তা পরিবর্তন করে গ্রিক ভাষায় নামকরণ করা হল? প্রশ্নগুলোর উত্তর সুস্পষ্ট নয়। পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব যে, বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান গ্রন্থগুলোর প্রত্যেকটার ভিন্ন ভিন্ন হিব্রু নাম রয়েছে। সংকলিত গ্রন্থমালারও হিব্রু নাম আছে। তবে গ্রিক ভাষার বাইবেল শব্দটাই নাম হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।

১. ১. ৪. বাইবেল বনাম কিতাবুল মোকাদ্দস

‘বাইবেল’ শব্দটা মূল আভিধানিক অর্থে যে কোনো গ্রন্থের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও ব্যবহারিকভাবে তা খ্রিষ্টধর্মের ধর্মগ্রন্থের নাম যা ব্যাকরণের পরিভাষায় ‘ proper noun ’ অর্থাৎ নিজস্ব নাম বা সংজ্ঞাবাচক নাম। যেমন ‘কুরআন’, ‘বেদ’, ‘গীতা’, ‘ত্রিপিটক’ ইত্যাদি প্রত্যেক শব্দের আভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন ব্যবহারিকভাবে তা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের নিজস্ব নাম বা ‘proper noun’-এ পরিণত হয়েছে। এজন্য এ সকল গ্রন্থ যে ভাষাতেই অনুবাদ করা হোক না কেন, গ্রন্থের মূল নাম অপরিবর্তিত থাকে।

খ্রিষ্টান ধর্মগুরু ও পন্ডিতরা সাধারণভাবে এ নীতি অনুসরণ করলেও আমরা দেখি যে, অনেক সময় তারা ব্যক্তি, স্থান বা গ্রন্থের নিজস্ব নামও অনুবাদ করেন। বাইবেলের ক্ষেত্রেও এরূপ হয়েছে। বাইবেল শব্দটা ‘proper noun’ হওয়ার কারণে বাইবেলের বিভিন্ন ভাষার অনুবাদে তারা নামটা বহাল রেখেছেন। বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রেও তারা ‘বাইবেল’ নামটা অপরিবর্তিত রেখেছিলেন।

১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার কলরাডো (Colorado) রাষ্ট্রের কলরাডো স্প্রীংস (Colorado springs) শহরে অনুষ্ঠিত (north American conference on muslim evangelization) ‘মুসলিমদের খ্রিষ্টান বানানো বিষয়ে উত্তর আমেরিকান সম্মেলনে’ খ্রিষ্টানপ্রচারকরা মুসলিমদেরকে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার লক্ষ্যে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এগুলোর মধ্যে ছিল ধর্মগ্রন্থগুলোকে মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত ও আকর্ষণীয় পরিভাষায় অনুবাদ করা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বর্তমানে বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি বাইবেলকে ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ নাম দিয়ে প্রকাশ করেছে।

মধ্যযুগ থেকে বাইবেলের আরবি অনুবাদের ক্ষেত্রে খ্রিষ্টানরা‘আল-কিতাবুল মুকাদ্দাস’ শব্দ ব্যবহার করেন। ‘কিতাব’শব্দটা ‘বাইবেল’ শব্দের আরবি অনুবাদ, অর্থাৎ ‘গ্রন্থ’। আর ‘মুকাদ্দাস’ শব্দের অর্থ ‘পবিত্র’। এভাবে ‘কিতাবুল মোকাদ্দাস’ অর্থ ‘পবিত্র গ্রন্থ’। এখানে লক্ষণীয়, গ্রন্থটার বাংলা অনুবাদ গ্রন্থের জন্য আরবি অনুবাদ নাম ব্যবহার। এখানে প্রথমত একটা নাম (proper noun)-এর অনুবাদ করা হয়েছে, যা অনুবাদের ক্ষেত্রে পরিত্যাজ্য। দ্বিতীয়ত অনুবাদের ভাষায় নামটার অনুবাদ না করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ভাষার অবোধ্য বা দুর্বোধ্য নাম ব্যবহার করা হয়েছে। বাহ্যত এর উদ্দেশ্য মুসলিমদেরকে আকৃষ্ট করা।

১. ১. ৫. কী নাম ছিল এ গ্রন্থের যীশুর যুগে?

মূসা (আ.) বা মোশি থেকে ঈসা (আ.) বা যীশু পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার বছর যে ধর্মগ্রন্থটা প্রচলিত ছিল তার নিশ্চয় একটা নাম ছিল। কী নাম ছিল তার? বাইবেল থেকে জানা যায় যে, যীশু ও তাঁর শিষ্যরা ‘বাইবেল’ বা ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ নাম জানতেন না। ‘বাইবেল’ নামক গ্রন্থটা বুঝাতে তাঁরা নিম্নের পরিভাষা ব্যবহার করতেন:

(১) the scripture/scriptures । এ শব্দটার মূল অর্থ: লিখিত বিষয় ( what is written ) বা লিখিত পুস্তক। ব্যবহারিকভাবে এর অর্থ ধর্মগ্রন্থ বা লিখিত শাস্ত্র।[1]

(২) The Law and the Prophets । অর্থাৎ ‘তৌরাতও নবীগণ’। কেরির অনুবাদে ‘ব্যবস্থা ও ভাববাদীগণ’। (দেখুন: মথি ৫/১৭; ৭/১২; ১১/১৩; ২২/৪০; লূক ১৬/১৬; ২৪/৪৪; যোহন ১/৪৫; প্রেরিত ১৩/১৫; ২৪/১৪; ২৮/২৩; রোমীয় ৩/২১)

(৩) The law of Moses, and in the prophets, and in the psalms । ‘মূসার তৌরাত এবং নবীগণ ও গীতসংহিতা অথবা দাউদের গীতসংহিতা। (দেখুন: লূক ২৪/৪৪। আরো দেখুন: লূক ২০/৪২; প্রেরিত ১/২০)

পরবর্তীতে আমরা দেখব যে, ইহুদি বাইবেল তিন অংশে বিভক্ত: (১) তৌরাত (The Law), (২) নাবিয়্যীম: নবীগণের পুস্তক (the Prophets) এবং (৩) কিতুবীম: লিখনিসমূহ (the Writings)। গীতসংহিতা পুস্তকটা তৃতীয় অংশের মধ্যে বিদ্যমান। ‘তৌরাত-এর ‘তা’, ‘নাবিয়্যীম’-এর ‘না’ ও ‘কিতুবীম’-এর ‘ক’ নিয়ে একত্রে বাইবেলের পুরাতন নিয়মের ইহুদি সংস্করণকে ইহুদিরা ‘তানাক’ বলেন।

এভাবে আমরা দেখছি যে, প্রথম খ্রিষ্টীয় শতকেবাইবেল নামক ধর্মগ্রন্থের কোনো একক  নাম ছিল না। এ গ্রন্থসমষ্টিকে একত্রে ‘ধর্মগ্রন্থ’বলা হত। অথবা এ গ্রন্থের দুটো অংশকে পৃথকভাবে নাম উল্লেখ করে বলা হত: ‘তৌরাত ও নবীগণ’। ইহুদি বাইবেল বা পুরাতন নিয়মের তৃতীয় অংশ ‘কিতুবীম’-এর মধ্য থেকে গীতসংহিতা পুস্তকটা সে সময়ে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। বাহ্যত ‘কিতুবীম’ নামক এ অংশটা তখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি এবং ‘ধর্মগ্রন্থ’-এর অংশ হিসেবে গণ্য হয়নি।


[1]    মথি ২১/৪২; ২২/২৯; ২৬/৫৪; ২৬/৫৬; মার্ক ১২/১০; ১২/২৪; ১৪/৪৯; ১৫/২৮; লূক ৪/২১; ২৪/২৭; ২৪/৩২; ২৪/৩৯; যোহন ২/২২; ৫/৩৯; ৭/৩৮; ৭/৪২; ১০/৩৫; ১৩/১৮; ১৭/১২; ১৯/২৪; ১৯/২৮; ১৯/৩৬; ১৯/৩৭; ২০/৯; প্রেরিত ১/১৬; ৮/৩২; ৮/৩৫; ১৭/২; ১৭/১১; ১৮/২৪; ১৮/২৮; রোমীয় ১/২, ৪/৩; ৯/১৭; ১০/১১; ১১/২; ১৫/৪; ১৬/২৬; গালাতীয় ৩/৮; ৩/২২; ৪/৪০; ১ কলসীয় ১৫/৩; ১৫/৪; ১ তীমথিয় ৫/১৮; ২ তীমথিয় ৩/১৫; ৩/১৬; যাকোব ২/৮; ২/২৩; ৪/৫; ১ পিতর ২/৬; ২ পিতর ২/২০; ৩/১৬।


সূচিপত্রে ফিরে চলুন

ভূমিকা

প্রশংসা মহান আল্লাহর নিমিত্ত। সালাত ও সালাম তাঁর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) এর জন্য, তাঁর বান্দা আদম, নূহ, ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব, মূসা, ঈসা ও অন্যান্য সকল নবী-রাসূলের জন্য, তাঁদের পরিজন ও সহচরদের জন্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব অনুষদে অধ্যাপনার কারণে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব আমাদের পড়তে ও পড়াতে হয়। ছাত্র ও গবেষকবৃন্দ এ বিষয়ে কিছু লেখা আশা করেন। পাশাপাশি সংযুক্ত হয়েছে ধর্মপ্রচার বিষয়ক বিশেষ প্রেক্ষাপট। বিশ্বায়নের মাধ্যমে পৃথিবীর সকল সভ্যতা, ভাষা ও সংস্কৃতির মত সকল ধর্মও কাছাকাছি হয়ে গিয়েছে। বেড়েছে আন্তঃধর্মীয় আলোচনা, সংলাপ, বিতর্ক ও দ্বন্দ্ব। বিভিন্ন ধর্মের প্রচার বেড়েছে। বিভিন্ন ধর্ম অধ্যয়নে মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা নিজ ধর্মের প্রচারের পাশাপাশি নিজ ধর্মের বিরুদ্ধে অন্যান্য ধর্মের প্রচারকদের প্রচারণা খন্ডনের চেষ্টাও বাড়িয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটেই এ পুস্তকটার রচনা।
বিগত শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকেই খ্রিষ্টধর্মীয় প্রচারকরা বাংলাদেশে খ্রিষ্টধর্মের প্রচার জোরদার করেছেন। স্বভাবতই তারা বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ বা মুসলিমকে খ্রিষ্টধর্মের গুরুত্ব বোঝাতে কমবেশি হিন্দু, বৌদ্ধ বা ইসলাম ধর্ম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা নবীর উপর আক্রমণ করেন। বিশেষ করে মুসলিমরা যেহেতু তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীদের (সকলের প্রতি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তিবর্ষিত হোক) প্রতি ভক্তিপ্রবণ, সেহেতু মুসলিম সমাজে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে তারা এ সকল ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করেন। এ ছাড়া মুহাম্মাদ (ﷺ)- এর অনুসরণের মাধ্যমে মুক্তি সম্ভব নয় বলে প্রমাণ করার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে অবমাননাকর কথা প্রচার করেন। তাদের বক্তব্য অনেক মুসলিমকে আহত করে। কখনো বা সংঘাত সৃষ্টি করে।
মুসলিম প্রচারকরা এ বিষয়ে তথ্য নির্ভর গ্রন্থাদি আশা করেন। বাংলা ভাষায় এ জাতীয় বইয়ের অভাব। এ অভাব পূরণ করে পবিত্র বাইবেল পর্যালোচনা ও সমালোচনায় বাঙালি পাঠকের সামনে সামগ্রিক তথ্যাদি তুলে ধরাই এ পুস্তকের উদ্দেশ্য।
ধর্মতত্ত্বের পাঠক ও পাঠদাতা হিসেবে আমরা মনে করি, ধর্ম আলোচনায় কেউ কখনোই নিরপেক্ষ হতে পারেন না, তবে বস্তুনিষ্ঠ হতে পারেন এবং হওয়াই উচিত। প্রতিটা মানুষই তার বিশ্বাসের পক্ষে এবং বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত। নাস্তিক, ধর্মবিহীন আস্তিক এবং ধর্মানুসারী আস্তিক প্রত্যেকেই তার বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হন। আমিও আমার বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত। তবে আমি আমার সাধ্যমত তথ্য উপস্থাপনায় ও পর্যালোচনায় বস্তুনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করেছি। বিশেষত অন্য ধর্মের আলোচনায় কুরআন ও সুন্নাহ যে নির্দেশনা ও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তা মেনে চলার চেষ্টা করেছি। কুরআন বলছে: “তোমরা ধর্মগ্রন্থ-অনুসারীদের (অন্য ধর্মের অনুসারীদের) সাথে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে ছাড়া বিতর্ক করবে না” (সূরা-২৯ আনকাবূত: আয়াত ৪৬)। কুরআন অন্যত্র বলেছে: “আল্লাহ ছাড়া যাদের তারা ডাকে তোমরা তাদের বিষয়ে কটুক্তি করবে না।” (সূরা-৬ আনআম: আয়াত ১০৮)।
গবেষণার বস্তুনিষ্ঠতা ও ধর্মীয় নির্দেশনার আলোকে আলোচনা, পর্যালোচনা ও সমালোচনার ক্ষেত্রে আমরা কয়েকটা মূলনীতি রক্ষার চেষ্টা করেছি:
প্রথমত: পবিত্র বাইবেল বিষয়ক সকল তথ্য ইহুদি-খ্রিষ্টান বা পাশ্চাত্য বাইবেল গবেষকদের থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: বাইবেলের পর্যালোচনা বা সমালোচনায় ইহুদি-খ্রিষ্টান বা পাশ্চাত্য বাইবেল গবেষক বা সমালোচকদের উপর নির্ভর করা হয়েছে। প্রয়োজনে গবেষকদের মূল ইংরেজি বক্তব্য যথাসম্ভব উদ্ধৃত করার পরে অনুবাদ করা হয়েছে, যেন আগ্রহী পাঠক মূলের সাথে অনুবাদ মিলিয়ে দেখতে পারেন।
তৃতীয়ত: সকল পর্যালোচনায় বাইবেলের বক্তব্যের উপরে নির্ভর করা হয়েছে। বাইবেলের উদ্ধৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে বাইবেল সোসাইটি বা খ্রিষ্টধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রচারিত বঙ্গানুবাদের উপর নির্ভর করা হয়েছে। বাংলা অনুবাদের অস্পষ্টতা দূর করার প্রয়োজন ছাড়া স্বাধীন অনুবাদ পরিহার করা হয়েছে।

পবিত্র বাইবেল ও মুসলিম মানস

প্রথমত: ধর্মগ্রন্থ ও ইসলামি বিশ্বাস

তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল নামগুলো মুসলিম মানসে ভক্তিপূত। তবে এ সকল গ্রন্থের বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনা অধিকাংশ মুসলিমই জানেন না। ফলে বর্তমানে প্রচলিত এ সকল নামের গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিদ্যমান অশোভন তথ্য তাদেরকে ভয়ঙ্করভাবে আহত করে। এ সকল ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশনা নিম্নরূপ:
(ক) মহান আল্লাহ মূসা (আ)-কে তাওরাত, দাউদ (আ)-কে যাবূর ও ঈসা (আ)-কে ইঞ্জিল নামক ধর্মগ্রন্থ ওহীর মাধ্যমে প্রদান করেন। (সূরা-৩ আল-ইমরান ৩, ৪৮, ৬৫; সূরা-৪ নিসা: ১৬৩; সূরা-৫ মায়িদা: ৪৬, ৬৬, ৪৭, ৬৬, ৬৮, ১১০; সূরা-৬ আন‘আম: ১৫৪; সূরা-৭ আ’রাফ: ১৫৭; সূরা-৯ তাওবা: ১১১; সূরা-১৭ বনী ইসরাঈল: ৫৫; সূরা-৪৮ ফাতহ: ২৯; সূরা-৫৭ হাদীদ: ২৭ আয়াত)
(খ) তাঁদের অনুসারীরা গ্রন্থগুলি বিকৃত করেছেন। তিনভাবে তারা তা বিকৃত করেছেন: (১) নিজেরা মনগড়াভাবে কিছু লেখে ধর্মগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেছেন ও ধর্মগ্রন্থ হিসেবে প্রচার করেছেন, (২) ধর্মগ্রন্থের বক্তব্য পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজনের মাধ্যমে বিকৃত করেছেন। (৩) ধর্মগ্রন্থের অনেক পুস্তক বা তথ্য তারা ভুলে গিয়েছেন বা হারিয়ে ফেলেছেন। (সূরা-২ বাকারা ৭৫, ৭৯; সূরা-৩ আল-ইমরান ৭৮-৭৯; সূরা-৫ মায়িদা: ১৩, ১৪, ১৫, ৪১ আয়াত)
(গ) বিকৃতি, সংযোজন, বিয়োজন, বিলুপ্তি, ভুলে যাওয়া, গোপন করা ইত্যাদির পরেও ‘আহল কিতাব’দের নিকট তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জিল নামে কিছু কিতাব রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে আল্লাহর বাণী ও মানবীয় বিকৃতি সংমিশ্রিত হয়ে রয়েছে। এ ছাড়া এ সকল বিকৃত গ্রন্থও তাদের মধ্যে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস প্রমাণ করে না। বরং তাদের মধ্যে প্রচলিত অনেক বিশ্বাস ও কর্মই প্রচলিত বিকৃত ধর্মগ্রন্থের নিন্দা বা অপ্রমাণ করে। কুরআন মাঝে মাঝে এ বিষয়টার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। (সূরা-২ বাকারা: ১১৩; সূরা-৩ আল-ইমরান: ৯৩; সূরা-৫ মায়িদা: ৪৩, ৪৭, ৬৮; সূরা-১০ ইউনূস: ৯৪ আয়াত)
(ঘ)  কুরআন কারীমই সংরক্ষক-বিচারক।  মহান আল্লাহর বাণী ও মানবীয় বিকৃতির সংমিশ্রণ এ সকল ধর্মগ্রন্থের মধ্যে ঠিক কোন্ কথাটা সঠিক ওহী এবং কোন্ কথাটা বিকৃতি তা বোঝার বা যাচাই করার কোনো বৈজ্ঞানিক, পান্ডুলিপিগত বা অন্য কোনো পথ নেই। এখন এগুলোর মধ্য থেকে সঠিক বক্তব্য যাচাই করার একমাত্র ভিত্তি আল্লাহর সর্বশেষ ওহী আল-কুরআন। মহান আল্লাহ বলেন: “এবং আপনার উপর সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, তার পূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সমর্থক (con firmer) ও পর্যবেক্ষক-নিয়ন্ত্রক (watcher) রূপে।” (সূরা-৫ মায়িদা: ৪৮ আয়াত)

দ্বিতীয়ত: নবীদের মর্যাদায় বাইবেল ও কুরআন

ইসলামি বিশ্বাসে মহান আল্লাহর মহান নবীরা সকলেই মানুষ ছিলেন এবং মানবীয় সততা ও পবিত্রতায় আদর্শ ছিলেন। মহান আল্লাহর বিধান পালন, বাস্তবায়ন, বিনয়, সততা, ক্রন্দন ও আল্লাহ-ভীতিতে তাঁরা অনুকরণীয় আদর্শ ছিলেন। কুরআন ও হাদীসে তাঁদেরকে এভাবেই চিত্রিত করা হয়েছে। কুরআনে বর্ণিত অনেক নবীর নাম পবিত্র বাইবেলের মধ্যেও বিদ্যমান। একজন মুসলিম স্বভাবতই ধারণা করেন যে, বাইবেলও তাঁদের পবিত্রতা ও মর্যাদা বর্ণনা করেছে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পবিত্র বাইবেলে নবীদেরকে অত্যন্ত নোংরাভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। খ্রিষ্টধর্মীয় বিশ্বাসে নবীরা নিষ্পাপ নন, তবে ঈসা মসীহ নিষ্পাপ। কিন্তু ইঞ্জিল শরীফে তাঁকেও নোংরাভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। পর্যালোচনার প্রয়োজনে আমাদেরকে এ সকল বিষয় উদ্ধৃত করতে হয়েছে। বিষয়গুলো বিশ্বাসী মুসলিমকে ভয়ঙ্করভাবে আহত করে। কারণ কোনো ধর্মের কোনো নবীর বিষয়ে এ জাতীয় নোংরা কথা তারা চিন্তাও করতে পারেন না। আমাদের এ গ্রন্থে এ সকল বিষয় উল্লেখ করাকে তারা ইসলামি বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক বলে গণ্য করতে পারেন।
তাদেরকে বুঝতে হবে যে, আমরা পবিত্র বাইবেলের বর্ণনামূলক পর্যালোচনার জন্যই এ সকল তথ্য উল্লেখ করেছি। এ সকল তথ্য এ সকল মহান মানুষের পাপ বা নীচতা প্রমাণ করে না, বরং এ সকল গ্রন্থের অপ্রামাণ্যতা প্রমাণ করে। বাইবেলীয় এ সকল তথ্য ইহুদি বা খ্রিষ্টানরা তাদের বিশ্বাসের আলোকে ব্যাখ্যা করেন, তবে মুসলিম বিশ্বাসে এগুলো সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মিথ্যা।

বাইবেলের বঙ্গানুবাদ, পরিভাষা ও বানান

ব্রিটিশ প্রটেস্ট্যান্ট প্রচারক উইলিয়াম কেরি সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেন ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে। ধর্মপুস্তক বা পবিত্র বাইবেল নামে তা প্রচারিত হয়। পরবর্তী প্রায় দু’শত বছর যাবৎ বাইবেলের বাংলা অনুবাদে মূলত কেরির পরিভাষাগুলোই ব্যবহার করা হয়। বিগত কয়েক দশক ধরে খ্রিষ্টান প্রচারকরা ‘ইসলামী বাংলায়’ বাইবেলের অনুবাদ করছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি প্রকাশিত পবিত্র বাইবেল-২০০০, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি প্রকাশিত কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬ এবং বাচিব প্রকাশিত কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩।
প্রথম অধ্যায়ে অনুবাদ প্রসঙ্গে পাঠক দেখবেন যে, কেরির অনুবাদ মূলানুগ হলেও তা দুর্বোধ্য। পরবর্তী অনুবাদ সহজবোধ্য হলেও অনেক সময় তাতে মূল অর্থ সংরক্ষিত হয়নি। মূল অর্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি সহজবোধ্য অনুবাদ উদ্ধৃত করার জন্য আমাদেরকে বিভিন্ন বাংলা বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করতে হয়েছে। অনুবাদের ভাষা ও পরিভাষার পরিবর্তন অনুধাবনের জন্য কয়েকটা উদ্ধৃতি উল্লেখ করছি।

প্রথম উদ্ধৃতি: ইঞ্জিল শরীফের প্রথম পুস্তক ‘মথি’৩ অধ্যায় ১-৩ শ্লোক

(১) কেরি: “সেই সময়ে যোহন বাপ্তাইজক উপস্থিত হইয়া যিহূদিয়ার প্রান্তরে প্রচার করিতে লাগিলেন, তিনি বলিলেন, মন ফিরাও, কেননা স্বর্গ-রাজ্য সন্নিকট হইল। ইনিই সেই ব্যক্তি, যাঁহার বিষয়ে যিশাইয় ভাববাদী দ্বারা এই কথা কথিত হইয়াছিল, ‘প্রান্তরে এক জনের রব, সে ঘোষণা করিতেছে, তোমরা প্রভুর পথ প্রস্তুত কর।”

(২) পবিত্র বাইবেল জুবিলী বাইবেল-১৯৯৯, ২০০৬: “নির্ধারিত সময়ে দীক্ষাগুরু যোহন আবির্ভূত হলেন। তিনি যুদেয়ার মরুপ্রান্তরে প্রচার করতেন, তিনি বলতেন, মনপরিবর্তন কর, কেননা স্বর্গরাজ্য কাছে এসে গেছে। ইনিই সেই ব্যক্তি যার বিষয়ে নবী ইসাইয়া বলেছিলেন, এমন একজনের কণ্ঠস্বর যে মরূপ্রান্তরে চিৎকার করে বলে, প্রভুর জন্য পথ প্রস্তুত কর…।”

(৩) পবিত্র বাইবেল-২০০০: “পরে বাপ্তিস্মদাতা যোহন যিহূদিয়ার মরু-এলাকায় এসে এই বলে প্রচার করতে লাগলেন, পাপ থেকে মন ফেরাও, কারণ স্বর্গ-রাজ্য কাছে এসে গেছে। এই যোহনের বিষয়েই নবী যিশাইয় বলেছিলেন, মরু-এলাকায় একজনের কণ্ঠস্বর চিৎকার করে জানাচ্ছে, তোমরা প্রভুর পথ ঠিক কর…।”

(৪) মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬: “পরে তরিকাবন্দীদাতা ইয়াহিয়া এহুদিয়ার মরুভূমিতে এসে এই বলে তবলিগ করতে লাগলেন, তওবা কর, কারণ বেহেশতী রাজ্য কাছে এসে গেছে। এই ইয়াহিয়ার বিষয়েই নবী ইশাইয়া বলেছিলেন, মরুভূমিতে একজনের কণ্ঠস্বর চিৎকার করে জানাচ্ছে, তোমরা মাবুদের পথ ঠিক কর।”

(৫) মোকাদ্দস-২০১৩: “সেই সময়ে বাপ্তিস্মদাতা ইয়াহিয়া উপস্থিত হয়ে এহুদিয়ার মরুভূমিতে তবলিগ করতে লাগলেন, তিনি বললেন, তওবা কর, কেননা বেহেশতী-রাজ্য সন্নিকট হল। ইনিই সেই ব্যক্তি, যাঁর বিষয়ে নবী ইশাইয়া বলেছিলেন, ‘মরুভূমিতে এক জনের কণ্ঠস্বর, সে ঘোষণা করছে, তোমরা প্রভুর পথ প্রস্তুত কর।”

ইংরেজি অনুবাদ অধ্যয়ন করলে পাঠক দেখবেন যে, সেগুলোতে শব্দ ব্যবহারে পরিবর্তন ঘটলেও নাম (proper noun) বা ধর্মীয় পরিভাষাগুলোর ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে না। কিন্তু বাংলায় এ জাতীয় পরিবর্তন পাঠকের জন্য সমস্যা তৈরি করে। উপরের অনুবাদে বিশেষ করে নিম্নের পরিবর্তন লক্ষণীয়: ইংরেজি John the Baptist বাংলায় যোহন বাপ্তাইজক, দীক্ষাগুরু যোহন, বাপ্তিস্মদাতা যোহন,  তরিকাবন্দীদাতা ইয়াহিয়া এবং বাপ্তিস্মদাতা ইয়াহিয়া। ইংরেজি Judaea বাংলায় যিহূদিয়া, যুদেয়া এবং এহুদিয়া।ইংরেজি Repent বাংলায় মন ফিরাও, মনপরিবর্তন কর এবং তওবা কর। ইংরেজি kingdom of heaven বাংলায় স্বর্গ-রাজ্য এবং বেহেশতী রাজ্য। ইংরেজি prophet বাংলায় ভাববাদী ও নবী। ইংরেজি Esaias / Isaiah যিশাইয়, ইসাইয়া এবং ইশাইয়া এবং ইংরেজি Lord বাংলায় প্রভু ও  মাবুদ।

এখানে কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদে পরিবর্তনশীলতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ২০০০ ও ২০০৬ সংস্করণে John the Baptist  অনুবাদ করেছে “তরিকাবন্দীদাতা ইয়াহিয়া”; কিন্তু ২০১৩ সংস্করণ লেখেছে “বাপ্তিস্মদাতা ইয়াহিয়া”।

দ্বিতীয় উদ্ধৃতি: মথি ১০ অধ্যায়ের ৫-৭ শ্লোক

(১) কেরি: “এই বারো জনকে যীশু প্রেরণ করিলেন, আর তাঁহাদিগকে এই আদেশ দিলেন- তোমরা পরজাতিগণের পথে যাইও না এবং শমরীয়দের কোন নগরে প্রবেশ করিও না; বরং ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষগণের কাছে যাও। আর তোমরা যাইতে যাইতে এই কথা প্রচার কর, স্বর্গ-রাজ্য সন্নিকট হইল।”

(২) জুবিলী: “এই বারোজনকে যীশু প্রেরণ করলেন, আর তাদের এই নির্দেশ দিলেন, তোমরা বিজাতীয়দের এলাকায় যেয়ো না, সামারীয়দের কোন শহরেও প্রবেশ করো না; বরং ইস্রায়েলকুলের হারানো মেষগুলোর কাছে যাও। পথে যেতে যেতে তোমরা এ কথা প্রচার কর, স্বর্গরাজ্য কাছে এসে গেছে।”

(৩) বাইবেল-২০০০: “যীশু সেই বারোজনকে এই সব আদেশ দিয়ে পাঠালেন, “তোমরা অযিহূদীদের কাছে বা শমরীয়দের কোন গ্রামে যেয়ো না, বরং ইস্রায়েল জাতির হারানো মেষদের কাছে যেয়ো। তোমরা যেতে যেতে এই কথা প্রচার করো যে, স্বর্গ-রাজ্য কাছে এসে গেছে।”

(৪) মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬: “ঈসা সেই বারোজনকে এই সব হুকুম দিয়ে পাঠালেন, “তোমরা অ-ইহুদীদের কাছে বা সামেরীয়দের কোন গ্রামে যেয়ো না, বরং ইসরাইল জাতির হারানো ভেড়াদের কাছে যেয়ো। তোমরা যেতে যেতে এই কথা তবলিগ কর যে, বেহেশতী রাজ্য কাছে এসে গেছে।”

(৫) মোকাদ্দস-২০১৩: “এই বারো জনকে ঈসা প্রেরণ করলেন, আর তাঁদেরকে এই হুকুম দিলেন- তোমরা অ-ইহুদীদের পথে যেও না এবং সামেরিয়দের কোন নগরে প্রবেশ করো না, বরং ইসরাইল-কুলের হারানো মেষদের কাছে যাও। আর তোমরা যেতে যেতে এই সুসমাচার তবলিগ কর, ‘বেহেশতী-রাজ্য সন্নিকট’।”

এখানে ইংরেজি Jesus বাংলায় যীশু ও ঈসা; Gentiles বাংলায় পরজাতি, বিজাতীয়, অযিহূদী, অইহুদী; Samaritans বাংলায় শমরীয়, সামরীয়, সামেরিয়; Israel বাংলায় ইস্রায়েল ও ইসরাইল এবং heaven বাংলায় স্বর্গ ও বেহেশত।

তৃতীয় উদ্ধৃতি: মথি ২৬ অধ্যায়ের ৬৩-৬৫ শ্লোক

(১) কেরি: “মহাযাজক তাঁহাকে কহিলেন, আমি তোমাকে জীবন্ত ঈশ্বরের নামে দিব্য দিতেছি, আমাদিগকে বল দেখি, তুমি কি সেই খ্রীষ্ট, ঈশ্বরের পুত্র? যীশু উত্তর করিলেন, তুমিই বলিলে; আরও আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, এখন অবধি তোমরা মনুষ্যপুত্রকে পরাক্রমের দক্ষিণ পার্শ্বে বসিয়া থাকিতে এবং আকাশের মেঘরথে আসিতে দেখিবে। তখন মহাযাজক আপন বস্ত্র ছিঁড়িয়া কহিলেন, এ ঈশ্বর-নিন্দা করিল, আর সাক্ষীতে আমাদের কি প্রয়োজন ? দেখ, এখন তোমরা ঈশ্বর-নিন্দা শুনিলে…।”

(২) জুবিলী: “মহাযাজক তাঁকে বললেন, ‘জীবনময় ঈশ্বরের দিব্যি দিয়ে আমি তোমাকে  বলছি, আমাদের বল, তুমি কি সেই খ্রীষ্ট, সেই ঈশ্বর পুত্র? উত্তরে যীশু তাঁকে বললেন, আপনি নিজেই কথাটা বললেন, এমন কি আমি আপনাদের বলছি, এখন থেকে আপনারা মানবপুত্রকে পরাক্রমের ডান পাশে বসে থাকতে ও আকাশের মেঘবাহনে আসতে দেখবেন। তখন মহাযাজক নিজের পোশাক ছিঁড়ে ফেলে বললেন, এ ঈশ্বরনিন্দা করল! সাক্ষীতে আমাদের আর কী দরকার ? দেখুন, আপনারা এইমাত্র ঈশ্বরনিন্দা শুনলেন…।”

(৩) বাইবেল-২০০০: “মহাপুরোহিত আবার তাকে বললেন, ‘তুমি জীবন্ত ঈশ্বরের দিব্য দিয়ে আমাদের বল যে, তুমি সেই মশীহ, অর্থাৎ ঈশ্বরের পুত্র কি না।’ তখন যীশু তাঁকে বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। তবে আমি আপনাদের এটাও বলছি, এর পরে আপনারা মনুষ্যপুত্রকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ডান পাশে বসে থাকতে এবং মেঘে করে আসতে দেখবেন।’ তখন মহাপুরোহিত তাঁর কাপড় ছিঁড়ে ফেলে বললেন, “এ ঈশ্বরকে অপমান করল। আমাদের আর সাক্ষীর কি দরকার? এখনই তো আপনারা শুনলেন, সে ঈশ্বরকে অপমান করল।”

(৪) মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬: “মহা-ইমাম আবার তাকে বললেন, ‘তুমি আল্লাহ্র কসম খেয়ে আমাদের বল যে, তুমি সেই মসীহ্ ইবনুল্লাহ কি না। তখন ঈসা তাঁকে বললেন, ‘জ্বী, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। তবে আমি আপনাদের এটাও বলছি, এর পরে আপনারা ইবনে-আদমকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র ডান পাশে বসে থাকতে এবং মেঘে করে আসতে দেখবেন।’ তখন মহা-ইমাম তাঁর কাপড় ছিঁড়ে ফেলে বললেন, ‘এ কুফরী করল। আমাদের আর সাক্ষীর কি দরকার? এখনই তো আপনারা শুনলেন, সে কুফরী করল।”

(৫) মোকাদ্দস-২০১৩: “মহা-ইমাম তাকে বললেন, আমি তোমাকে জীবন্ত আল্লাহ্র নামে কসম দিচ্ছি, আমাদেরকে বল দেখি তুমি কি সেই মসীহ, আল্লাহ্র পুত্র? জবাবে ঈসা বললেন, তুমিই বললে; আরও আমি তোমাদেরকে বলছি, এখন থেকে তোমরা ইবনুল-ইনসানকে পরাক্রমের ডান পাশে বসে থাকতে এবং আসমানের মেঘরথে আসতে দেখবে। তখন মহা-ইমাম তাঁর কাপড় ছিঁড়ে বললেন, এ কুফরী করল,আর সাক্ষীতে আমাদের কি প্রয়োজন? দেখ, এখন তোমরা কুফরী শুনলে…।”

এখানেও ভাষার পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিভাষার পরিবর্তন লক্ষণীয়। উপরে আলোচিত শব্দগুলো ছাড়াও এখানে লক্ষণীয়: ইংরেজি high priest বাংলায় মহাযাজক, মহাপুরোহিত ও মহা-ইমাম। ইংরেজি God বাংলায় ঈশ্বর ও আল্লাহ। ইংরেজি blasphemy বাংলায় ঈশ্বর নিন্দা, ঈশ্বর অপমান ও কুফরী।

ইংরেজি Son of God  বাংলা অনুবাদে‘ঈশ্বরের পুত্র’ থেকে মুসলমানি বাংলায় ‘আল্লাহর পুত্র’ না হয়ে আরবি ভাষায় ‘ইবনুল্লাহ’ হয়ে গিয়েছে। ইংরেজি Son of man বাংলা অনুবাদে ‘মনুষ্যপুত্র’ ও ‘মানবপুত্র’ থেকে আরো সহজ বাংলায় ‘মানুষের ছেলে’ হতে পারত। কিন্তু বঙ্গানুবাদেতা আরবি হয়ে গিয়েছে। মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬-এ ইবনে আদম হওয়ার পরে মোকাদ্দস-২০১৩-এ তা ‘ইবনুল ইনসান’ হয়ে গিয়েছে।

এখানেও আমরা কিতাবুল মোকাদ্দস নামক বাংলা বাইবেলে পরিভাষার পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। Son of man মানুষের পুত্র বাক্যাংশটার অনুবাদ এক সংস্করণে ইবনে আদম ও অন্য সংস্করণে ইবনুল ইনসান লেখা হয়েছে। বাঙালি পাঠকের জন্য দুটোই দুর্বোধ্য, বিশেষত ‘ইবনুল ইনসান’ কথাটার অর্থ শিখিয়ে না দিলে মুসলিম বা অমুসলিম কোনো বাঙালি পাঠকই বোঝবেন না। ‘ঈশ্বরের পুত্র’ পরিবর্তন করে ‘ইবনুল্লাহ’ লেখাও একইরূপ। আল্লাহর পুত্র বললে মুসলিম-অমুসলিম সকল বাঙালি পাঠকই বুঝেন। তবে ‘ইবনুল্লাহ’ কথাটার অর্থ কোনো বাঙালিই বোঝেন না। তবে যদি কেউ আরবি ভাষায় অভিজ্ঞ হন তবে ভিন্ন কথা।

চতুর্থ উদ্ধৃতি: ইঞ্জিলের তৃতীয় পুস্তক লূক, ১১ অধ্যায় ৫০-৫১ শ্লোক

(১) কেরি: “যেন জগতের পত্তনাবধি যত ভাববাদীর রক্তপাত হইয়াছে, তাহার প্রতিশোধ এই কালের লোকদের কাছে লওয়া যায়- হেবলের রক্ত অবধি সেই সখরিয়ের রক্ত পর্যন্ত যিনি যজ্ঞবেদি ও মন্দিরের মধ্যস্থানে নিহত হইয়াছিলেন…।”

(২) জুবিলী: “যেন জগৎপত্তন থেকে যে সকল নবীর রক্ত ঝরানো হয়েছে, তার হিসাব এই প্রজন্মের মানুষদের কাছে চেয়ে নেওয়া হয়,- আবেলের রক্ত থেকে শুরু ক’রে সেই জাখারিয়ারই রক্ত পর্যন্ত যাঁকে যজ্ঞবেদি ও গৃহের মাঝখানে হত্যা করা হয়েছিল।”

(৩) বাইবেল-২০০০: “এর ফল হল, জগৎ সৃষ্টির সময় থেকে আরম্ভ করে যত জন নবীকে খুন করা হয়েছে, তাদের রক্তের দায়ী  হবে এই কালের লোকেরা। হ্যাঁ, আমি আপনাদের বলছি, হেবলের খুন থেকে আরম্ভ করে যে সখরিয়কে বেদী এবং পবিত্র স্থানের মধ্যে মেরে ফেলা হয়েছিল সেই সখরিয়ের খুন পর্যন্ত…।”

(৪) মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬: “এর ফল হল, দুনিয়া সৃষ্টির সময় থেকে শুরু করে যতজন নবীকে খুন করা হয়েছে, তাঁদের রক্তের দায়ী হবে এই কালের লোকেরা। জ্বী, আমি আপনাদের বলছি, হাবিলের খুন থেকে শুরু করে যে জাকারিয়াকে কোরবানগাহ্ এবং পবিত্র স্থানের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল সেই জাকারিয়ার খুন পর্যন্ত..”

(৫) মোকাদ্দস-২০১৩: “যেন দুনিয়া পত্তনের সময় থেকে যত নবীর রক্তপাত হয়েছে তার প্রতিশোধ এই কালের লোকদের কাছ থেকে নেয়া যায়-  হাবিলের রক্ত থেকে সেই জাকারিয়ার রক্ত পর্যন্ত যিনি কোরবানগাহ ও বায়তুল-মোকাদ্দসের মধ্যস্থানে নিহত হয়েছিলেন- …।”

এখানে ইংরেজি Abel বাংলায় হেবল, আবেল ওহাবিল; Zacharias বাংলায় সখরিয়, জাখারিয়া ওজাকারিয়া; altar বাংলায় যজ্ঞবেদি, বেদী ও কোরবানগাহ এবং temple বাংলায় মন্দির, গৃহ, পবিত্র স্থান ও বায়তুল মোকাদ্দস। এখানেও কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদের পরিবর্তন লক্ষণীয়। ২০০০ ও ২০০৬ সংস্করণে ‘টেম্পল’ শব্দটার অর্থ পবিত্র স্থান। কিন্তু ২০১৩ সংস্করণে শব্দটার অর্থ ‘বায়তুল মোকাদ্দস’।

পঞ্চম উদ্ধৃতি: নতুন নিয়ম বা ইঞ্জিলের চতুর্থ পুস্তক যোহন বা ইউহোন্নার প্রথম অধ্যায়ের ৪৫-৪৬ শ্লোক

(১) কেরি: “ফিলিপ নথনেলের দেখা পাইলেন, আর তাঁহাকে কহিলেন, মোশি ব্যবস্থায় ও ভাববাদিগণ যাঁহার কথা লিখিয়াছেন, আমরা তাঁহার দেখা পাইয়াছি; তিনি নাসরতীয় যীশু, যোষেফের পুত্র …।”

(২) জুবিলী: “ফিলিফ নাথানায়েলের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন; তাঁকে বললেন, ‘মোশী বিধান-পুস্তকে যাঁর কথা লিখেছিলেন, নবীরাও যাঁর কথা লিখেছিলেন, আমরা তাঁর সন্ধান পেয়েছি; তিনি যোসেফের ছেলে নাজারেথের সেই যীশু।”

(৩) বাইবেল-২০০০: ফিলিপ নথনেলকে খুঁজে বের করে বললেন, ‘মোশি যাঁর কথা আইন-কানুনে লিখে গেছেন এবং যাঁর বিষয়ে নবীরাও লিখেছেন আমরা তাঁর দেখা পেয়েছি। তিনি যোষেফের পুত্র যীশু, নাসরত গ্রামের লোক’…।”

(৪) মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬: “ফিলিপ নথনেলকে খুঁজে বের করে বললেন, ‘মূসা যাঁর কথা তৌরাত শরীফে লিখে গেছেন এবং যাঁর বিষয়ে নবীরাও লিখেছেন আমরা তাঁর দেখা পেয়েছি। তিনি ইউসুফের পুত্র ঈসা, নাসরত গ্রামের লোক’…।”

(৫) মোকাদ্দস-২০১৩: “ফিলিপ নথনেলের দেখা পেলেন, আর তাঁকে বললেন, মূসা শরীয়তে ও নবীরা যাঁর কথা লিখেছেন, আমরা তাঁর দেখা পেয়েছি; তিনি নাসরতীয় ঈসা, ইউসুফের পুত্র …।”

এখানে আমরা ইতোপূর্বে আলোচিত নাম ও পরিভাষার পরিবর্তন ছাড়াও নতুন কয়েকটা বিষয় দেখছি। ইংরেজি Moses বাংলায় মোশি, মোশী ও মূসা; ইংরেজি the law বাংলায় ব্যবস্থা, বিধান-পুস্তক, আইন-কানুন, তৌরাত শরীফ ও  শরীয়ত; ইংরেজি Nazareth বাংলা নাসরত ও নাজারেথ এবং ইংরেজি Joseph বাংলায় যোষেফ, যোসেফ ও ইউসুফ।

এখানেও কিতাবুল মোকাদ্দসে অনুবাদে পরিবর্তন। ইংরেজি the law ব্দটার আভিধানিক অর্থ আইন। ধর্মীয় পরিভাষায় হিব্রু ‘তোরাহ’ শব্দটার অর্থ বিধান, ব্যবস্থা বা আইন। এজন্য তোরাহ বোঝাতে ইংরেজি বাইবেলে ‘the law’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়।পাঠক যদি ইন্টারনেটে হিব্রু বাইবেল অথবা ইংরেজি উচ্চারণে হিব্রু বাইবেল (hebrew bible english transliteration) পাঠ করেন তবে দেখবেন যে, ইংরেজিতে যেখানে ‘the law of Moses / the law’ লেখা হয়েছে, হিব্রুতে সেখানে ‘তোরাহ’ লেখা রয়েছে। আমরা দেখলাম যে, পরিভাষাটার অনুবাদে কেরি: ‘ব্যবস্থা’, জুবিলী, ‘বিধান-পুস্তক’ এবং বাইবেল-২০০০ ‘আইন-কানুন’। আক্ষরিক অনুবাদ হিসেবে এগুলো গ্রহণযোগ্য। তবে কিতাবুল মোকাদ্দসে যেহেতু ‘তৌরাত’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে সেহেতু ইংরেজি ‘ল’ পরিভাষার অনুবাদে মূল হিব্রু ‘তৌরাত’ লেখা স্বাভাবিক ছিল। আমরা দেখছি যে, মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬ শব্দটার অনুবাদ করেছে ‘তৌরাত শরীফ’, কিন্তু মোকাদ্দস-২০১৩ লেখেছে ‘শরীয়ত’।

কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘ল’ শব্দের অনুবাদে ‘তৌরাত শরীফ’ বা ‘তৌরাত কিতাব’ লেখেছে, তবে কোথাও কোথাও ‘শরীয়ত’ লেখেছে। পক্ষান্তরে কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩ ‘ল’ শব্দের অনুবাদে সর্বদা ‘শরীয়ত’ লেখেছে।

আমরা জানি যে, ‘শরীয়ত’ ও ‘তৌরাত’ কখনোই সমার্থক নয়; যেমন ‘কুরআন’ ও ‘শরীয়ত’ সমার্থক নয়। তাহলে তৌরাত শব্দটা বঙ্গানুবাদে ব্যবহার করা সত্ত্বেও অনুবাদের সময় মূল হিব্রু ‘তোরাহ’ শব্দটার অনুবাদে ‘তৌরাত’ না লেখে শরীয়ত লেখার কারণ কী? বাহ্যত তৌরাত বিষয়ক বহুবিধ অভিযোগ অস্পষ্ট করা। আরো কয়েকটা নমুনা দেখুন:

(১) যিহোশূয়/ ইউসা ৮/৩১-৩২: “as it is written in the book of the law of Moses … And he wrote there upon the stones a copy of the law of Moses, which he wrote in the presence of the children of Israel.”

এখানে ‘the law of Moses’ বাক্যাংশ দু’ শ্লোকে দু’ বার ব্যবহার করা হয়েছে। মোকাদ্দস-২০০০ ও ২০০৬ প্রথমে তৌরাত ও পরে শরীয়ত লেখেছে। “মূসার তৌরাত কিতাবে যেমন লেখা আছে সেই অনুসারেই তিনি তা তৈরি করলেন। … ইউসা পাহাড়ের উপরে বনি-ইসরাইলদের সামনে পাথরের উপরে মূসার শরীয়ত লিখলেন।”

মোকাদ্দস-২০১৩ উভয় স্থানেই শরীয়ত লেখেছে। “তেমনি তারা মূসার শরীয়ত-কিতাবে লেখা হুকুম অনুসারে … সেখানে পাথরগুলোর উপরে বনি-ইসরাইলদের সম্মুখে তিনি মূসার লেখা শরীয়তের একটি অনুলিপি লিখলেন।”

‘HEBREW TRANSLITERATION SCRIPTURE’ ওয়েবসাইটে শ্লোকদ্বয় নিম্নরূপ[1]: “as it is written in the sefer ha Torah Mosheh … And he wrote there upon the stones a copy of ha Torah Mosheh, which he wrote in the presence of Benai Yisrael” “মোশেহর তৌরাত পুস্তকে যেভাবে লেখা… তিনি পাথরের উপরে মোশেহর তৌরাতটি লেখলেন, যা তিনি লেখলেন বনি-ইসরাইলের সম্মুখে।”

(২) ১ বাদশাহনামা/ রাজাবলি ২/৩ ইংরেজি “KJV: And keep the charge of the LORD thy God, to walk in his ways, to keep his statutes, and his commandments, and his judgments, and his testimonies, as it is written in the law of Moses.”  হিব্রু উচ্চারণ নির্ভর ইংরেজি অনুবাদ: “…. as it is written in the Torah Mosheh: মোশেহের তৌরাতে যেভাবে লেখা আছে।”[2]

অথচ কিতাবুল মোকাদ্দসের সকল সংস্করণেই এখানে তৌরাত না লেখে শরীয়ত লেখা হয়েছে। মোকাদ্দস-২০০৬: “তোমার মাবুদ আল্লাহর ইচ্ছামত তুমি তাঁর পথে চলবে এবং মূসার শরীয়তে লেখা মাবুদের সব নিয়ম, হুকুম, নির্দেশ ও দাবি মেনে চলবে…।” মোকাদ্দস-২০১৩: “আর তোমার আল্লাহ মাবুদের রক্ষণীয় বিধান রক্ষা করে তাঁর পথে চল, মূসার শরীয়তে লেখা তাঁর বিধি, তাঁর হুকুম, তাঁর অনুশাসন ও তাঁর সমস্ত সাক্ষ্য পালন কর…।”

(৩)২ বাদশাহনামা/ রাজাবলি ২৩/২৫ হিব্রু অনুসারী ইংরেজি অনুবাদ: “that turned to YHWH with all his heart, and with all his soul, and with all his might, according to all the Torah of Mosheh…”[3] ইংরেজি: KJV: “… turned to the LORD with all his heart, and with all his soul, and with all his might, according to all the law of Moses.”

এখানেও আমরা দেখছি যে, হিব্রু ‘মোশেহের তৌরাত’ বাক্যাংশকে ইংরেজিতে ‘ল অব মোসেস’ বলা হয়েছে। কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দসের সকল সংস্করণেই ‘তৌরাত’ বাদ দিয়ে ‘শরীয়ত’ লেখা হয়েছে।

এভাবে ভাষার বিবর্তনের পাশাপাশি বাইবেল অনুবাদকরা ধর্মীয় নাম ও পরিভাষাও পরিবর্তন করেছেন। আরেকটা নমুনা প্রেরিত বনাম সাহাবী। যীশু খ্রিষ্টের বার জন নির্বাচিত শিষ্যকে ইংরেজিতে (Apostle) বলা হয়। শব্দটার আভিধানিক অর্থ ‘প্রেরিত’। যীশু শিষ্যদের মধ্য থেকে যে বার জনকে প্রচার ও সেবার জন্য ‘প্রেরণ’ করেন খ্রিষ্টধর্মীয় পরিভাষায় তাদেরকে প্রেরিত বলা হয়। কেরির অনুবাদে এবং পরবর্তী অনুবাদগুলোতে প্রেরিত পরিভাষাই ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে ‘মুসলিম’ অনুবাদগুলোতে প্রেরিত বোঝাতে ‘সাহাবী’ শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘সাধারণ’ অনুবাদগুলোতে প্রেরিত পরিভাষার ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। কোনো বাইবেলে ‘সাহাবী’ এবং কোনো বাইবেলে ‘প্রেরিত’। ‘প্রেরিত’ পরিভাষার সাথে পরিচিত পাঠকের কাছে ‘সাহাবী’ পরিভাষা দুর্বোধ্য অস্পষ্ট। এর বিপরীতে সাহাবী পরিভাষার সাথে পরিচিত পাঠকের কাছে প্রেরিত শব্দটা অপরিচিত। আমরা কোন পরিভাষা ব্যবহার করব?

অনুরূপভাবে বাইবেলের প্রথম পুস্তকটার নাম কোনো কোনো বাইবেলে ‘আদিপুস্তক’ এবং কোনো কোনো বাইবেলে ‘পয়দায়েশ’। আমরা কোন নাম ব্যবহার করব? একটার সাথে পরিচিতের কাছে অন্যটা দুর্বোধ্য।

নাম ও পরিভাষার পরিবর্তনের একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা দেখুন:

ইংরেজি কেরি ও অন্যান্য কিতাবুল মোকাদ্দস
Abraham অবরাহাম ইব্রাহিম
Amalek অমালেক আমালেক
Angel দূত, ঈশ্বরের দূত ফেরেশতা
Aron হারোণ ঘারুন
Canaan কনান কেনান
Children of Israel ইস্রায়েল সন্তানগণ বনি ইসরাইল
Christ খ্রীষ্ট, মশীহ এসীহ
Church মন্ডলী জামাত
Disciple, Apostle শিষ্য সাহাবী
Ezra ইয্রা উযাইর
Gentile পরজাতি অ-ইহুদি
Gospel সুসমাচার ইঞ্জিল
High priest মহাযাজক, মহাপুরোহি মহা-ইমাম
Holy Ghost/ Spirit পবিত্র আত্মা পাক-রূহ
Israel ইস্রারায়েল ইসরাইল
Jacob, James যাকোব ইয়াকুব
Jerusalem যিরুশালেম জেরুশালেম
Jesus ঐীশু ঈসা
Jew যিহূদী ইহুদী
John যোহন ইয়াহিয়া
John যোহন ইউহোন্না
Joshua যিহোশূয় ইউসা
Judah Judaea, Judea যিহূদা (রাজ্য) এহুদা/ এহুদিয়া
Judah, Judas, Jude যিহূদা (ব্যক্তি) এহুদা
Moses মোশি, মোশী মূসা
Passover নিস্তার পর্ব উদ্ধার ঈদ, ঈদুল ফেসাখ,
Pharaoh ফরৌণ ফেরাউন
Philistines পলেষ্টীয় ফিলিস্তিনী
Priest যাজক, পুরোহিত ইমাম
Sacrifice ঊলি কোরবানী / বলি
Scribe অধ্যাপক আলেম
Scripture শাস্ত্র পাক-কিতাব
Solomon শলোমন সোলায়মান
Temple মন্দির, ধর্মধাম এবাদতখানা, বাইতুল মোকাদ্দস
The law ব্যবস্থা তৌরাত, শরীয়ত
Joseph যোষেফ, যোসেফ ইফসুফ

উপরের জটিলতার আলোকে আমরা অনুবাদ ও পরিভাষার ক্ষেত্রে নিম্নের মূলনীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছি।

(ক) সাধু ভাষার উদ্ধৃতি কেরির অনুবাদ থেকে গৃহীত। চলিত ভাষায় মুসলমানি অনুবাদ কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬ ও কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩ থেকে গৃহীত। চলিত সাধারণ বাংলা অনুবাদ পবিত্র বাইবেল-২০০০ থেকে গৃহীত। ক্যাথলিক বাইবেলের উদ্ধৃতিগুলো জুবিলী বাইবেল থেকে গৃহীত।

(খ) কেরির অনুবাদকে মূল ধরা হয়েছে। এজন্য কেরি থেকে উদ্ধৃতি প্রদানের সময় শুধু বাইবেলের পুস্তক, অধ্যায় ও শ্লোক উল্লেখ করা হয়েছে, সংস্করণের উল্লেখ করা হয়নি। যেমন (মথি ৩/১-৩), (লূক ১১/৫০-৫১), (যোহন ১/৪৫-৪৬) ইত্যাদি। অন্যান্য সংস্করণ থেকে উদ্ধৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে বাইবেলের পুস্তক, অধ্যায় ও শ্লোকের পাশাপাশি উদ্ধৃতির শুরুতে বা শেষে সংস্করণের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমন  (মথি ৩/১-৩, জুবিলী), (মথি ৩/১-৩, বা.-২০০০), (মথি ৩/১-৩, মো.-০৬), (মথি ৩/১-৩, মো.-১৩), (যোহন ১/৪৫-৪৬, জুবিলী), (যোহন ১/৪৫-৪৬, বা.-২০০০), (ইউহোন্না ১/৪৫-৪৬, মো.-০৬), (ইউহোন্না ১/৪৫-৪৬, মো.-১৩)… ইত্যাদি। অষ্টম ও নবম অধ্যায়ে কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬ থেকে অধিকাংশ উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে বলে অধ্যায়ের শুরুতে উল্লেখ করেছি।  এজন্য এ সংস্করণ থেকে উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে সংস্করণের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়নি। অন্যান্য সংস্করণ থেকে উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে তা উল্লেখ করা হয়েছে।

(গ) নবীদের এবং বাইবেলীয় পুস্তকগুলোর নামের ক্ষেত্রে আমরা কেরির পরিভাষা অধিক ব্যবহার করেছি। পাশাপাশি কিতাবুল মোকাদ্দসের পরিভাষাও ব্যবহার করেছি। যেমন অবরাহাম, ইবরাহিম, মোশি, মূসা, শলোমন, সুলায়মান, যীশু, ঈসা, খ্রিষ্ট, মসীহ, পবিত্র আত্মা, পাক-রুহ, প্রেরিত, সাহাবী, যিহুদা, এহুদা, যাজক, ইমাম, বলি, কোরবানি, ব্যবস্থা, তৌরাত…. ইত্যাদি। অনুরূপভাবে আদিপুস্তক, পয়দায়েশ, যাত্রাপুস্তক, হিজরত, গণনাপুস্তক, শুমারী, যিহোশূয়, ইউসা, বিচারকর্তৃগণ, কাজীগণ, শমূয়েল, শামুয়েল, রাজাবলি, বাদশাহনামা, ইত্যাদি।

অনেক ভাষাতেই বানান সমস্যা রয়েছে। ইংরেজি ভাষা বানান সংস্কারের প্রক্রিয়া পার হয়ে এসেছে। ফলে সমস্যাগুলো স্থির রয়েছে এবং সাধারণ লেখক ও পাঠকদের জন্য ভাষার ব্যবহার সহজ হয়েছে। বাংলা বানানের বিবর্তন ও পরিবর্তন চলমান। বস্তুত ভাষাবিদদের হাতে বাংলা ভাষার সাথে আমরা সাধারণ বাঙালিরাও নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছি। ছোটবেলা থেকে যে বানানগুলো লেখে ও দেখে অভ্যস্ত হয়েছি এখন সেগুলো বাতিল বা ভুল বলে গণ্য হচ্ছে। শ্রবণের সাথে বানান মিলাতে যেয়ে দর্শনের সাথে সঙ্ঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। এ সমস্যার সাথে আমাদের এ গ্রন্থে যুক্ত হয়েছে বাইবেলের বিভিন্ন অনুবাদে বানানের ভিন্নতা। আমাদের সমস্যার সাথে পাঠককে একাত্ম করার উদ্দেশ্যে নিম্নে কয়েকটা বিষয় উল্লেখ করছি:

 

  • বাংলা বানানের ক্ষেত্রে বঙ্গানুবাদ বাইবেলগুলো বিভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করেছে। এজন্য উদ্ধৃতির মধ্যে মূল গ্রন্থের বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
  • ঙ, ং, ই-কার, ঈ-কার, উ-কার, ঊ-কার, ও-কার ইত্যাদি বিষয়ে উদ্ধৃত পাঠের বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। লেখকের নিজের বক্তব্যে প্রমিত রীতি অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন যিহূদী, ইহুদী, ইহুদি, কোরবানী-কোরবানি, ফিলিস্তিনী, ফিলিস্তিনি, বারো, বার, এগারো, এগার, বলব, বলবো, বলছ, বলছো, রং, রঙ, আংগুর, আঙ্গুর, সংগে, সঙ্গে…
  • ‘যীশু খ্রীষ্ট’ বানানটার বিষয়ে বাংলা প্রমিত নিয়ম অনুসারে ‘যিশু খ্রিস্ট’লেখতে হয়। তবে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষেরা ‘যীশু’ শব্দটা সর্বদা ঈ-কার দিয়েই লেখেন। আর ‘খ্রীষ্ট’ শব্দটার ক্ষেত্রে ‘ষ’ ব্যবহারের পাশাপাশি সাধারণত ঈ-কার ব্যবহার করেন। কিন্তু ‘খ্রিষ্টান’, ‘খ্রিষ্টাব্দ’ ইত্যাদি লেখতে সাধারণত সকলেই ই-কার ব্যবহার করেন। সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা ‘যীশু খ্রিষ্ট’, ‘খ্রিষ্টান’, ‘খ্রিষ্টাব্দ’ ব্যবহার করেছি।
  • ঈসা মসীহ লেখতে কিতাবুল মোকাদ্দসে ‘ম’-এর সাথে ‘আ’-কার ব্যবহার করা হয়নি, যদিও আরবি প্রতিবর্ণায়ন নিয়মে ‘মাসীহ’ লেখা উচিত। আমরা সর্বত্রই ‘মসীহ’ ব্যবহার করা চেষ্টা করেছি।
  • আরবি উচ্চারণ অনুসারে আমরা ‘তাওরাত’ লেখে ও বলে অভ্যস্ত। তবে কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদে সর্বদা ‘তৌরাত’ লেখা হয়েছে। এজন্য এ গ্রন্থে আমরা সাধারণভাবে ‘তৌরাত’ লেখেছি। আরবি উচ্চারণ অনুসারে ‘ইনজীল’ লেখাই বিধেয়, তবে কিতাবুল মোকাদ্দসের ব্যবহার অনুসারে আমরা সর্বদা ‘ইঞ্জিল’ লেখেছি।
  • ফেরেশতা, বেহেশত ইত্যাদি শব্দের ক্ষেত্রে কিতাবুল মোকাদ্দস এ-কার ব্যবহার করেছে। আমরা সকল ক্ষেত্রেই এভাবে এ-কার ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছি, যদিও সাধারণভাবে আমরা এ সকল ক্ষেত্রে ই-কার ব্যবহার করে অভ্যস্থ।
  • আমরা দেখলাম, ‘জেরুজালেম’ বানানে কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬ ও ২০১৩-এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। উদ্ধৃতির বাইরে আমরা সর্বত্র ‘জেরুজালেম’ ব্যবহার করেছি।

এই পুস্তক রচনার ক্ষেত্রে অনেকেই উৎসাহ ও পরামর্শ দিয়েছেন। মুশাহিদ আলী, এমদাদুল হক, আব্দুল মালেক, হোসেন এম জাকির ও অন্যান্য শ্রদ্ধাভাজন বন্ধু প্রুফ দেখে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। সাইফ আলী প্রচ্ছদ তৈরী করে দিয়েছেন।সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। মহান আল্লাহ তাদের সকলকে উত্তম পুরুস্কার প্রদান করুন।

 

খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর


[1]http://www.messianic-torah-truth-seeker.org/Scriptures/Tenakh/Yehoshua/Yehoshua08.htm

[2]http://www.messianic-torah-truth-seeker.org/Scriptures/Tenakh/Melekim-Alef/Melekhim-Alef02.htm

[3]http://www.messianic-torah-truth-seeker.org/Scriptures/Tenakh/Melekim-Bet/Melekhhim-Bet23.htm