পূর্ব পাকিস্তানের জবান / আবুল মনসুর আহমদ

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা সুনির্দিষ্টভাবে ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক আদর্শে পরিণত হয়েছে। কোনো কারণেই ভারতীয় মুসলমান আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে না।

ভিন্ন নেতৃত্বের বাস্তববাদী দূরদর্শিতার গুণে মুসলিম লীগ রাজনীতিতে জাতীয়তার যে সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে, তাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানেরও স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত ও সম্ভব হয়ে উঠেছে। কাজেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত রূপায়ণের ভাবী রূপ নিয়ে মুসলিম বাংলার চিন্তা-নাগরিকদের মধ্যে এখন থেকেই আন্দোলন-আলোচনা খুব স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি যে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকার অভিনয় করছে, সে সম্বন্ধে বাংলার মুসলমান এমনকি, তাঁদের শিক্ষিতাংশও, আজও পুরোপুরি সচেতন হননি। বিশেষত এই ‘সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণস্বরূপ ‘আজাদ’ সম্পাদক মাওলানা আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও সহসম্পাদক মাওলানা মুজিবর রহমান খাঁ পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাঙ্গিক রূপায়ণে যে ভবিষ্যৎদ্রষ্টার দায়িত্ব বহন করে যাচ্ছেন, তা ভবিষ্যৎ বাংলা একদিন শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে, এ সম্বন্ধে আমার মনে তিলমাত্রও সন্দেহ নেই। বস্তুত, পাকিস্তানবাসীকে একটা নিছক রাজনৈতিক, এমনকি নির্বাচনী স্লোগান থেকে একটা ইন্টেলেকচুয়াল আইডিয়ালিজমে রূপান্তরিত করেছে প্রধানত এই দুই ব্যক্তির মনীষা। আমি একাধিকবার স্বীকার করেছি এবং আজও অসংকোচে স্বীকার করছি যে প্রধানত এঁদেরই প্রেরণায় আমি পাকিস্তানের আদর্শবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। কায়েদ-ই-আযমের মনে যা-ই থাক, বাংলায় পাকিস্তানবাদ নিশ্চয় পার্লামেন্টারি কচকচিতে খেই হারিয়ে ফেলত, যদি না এই দুজন ব্যক্তি নানা বিপদ ও অপ্রীতি অগ্রাহ্য করে নিশিদিন কলম চালিয়ে পাকিস্তানবাদকে এই ইন্টেলেকচুয়াল রূপ দিতেন এবং অনেক প্রতিপত্তিশালী লোকের অপ্রীতি ও অসন্তোষভাজন হয়েও চরম বিপদের মুহূর্তেও সে আদর্শবাদের ঝান্ডা উঁচু রাখতেন।
এই দুই ব্যক্তিই আমার নিতান্ত আপনার জন। তবু ওপরের কথাগুলো মোটেই ব্যক্তিগত প্রশংসার মতো শোনাবে না এই জন্য যে তাঁরা মুসলিম-বাংলার ইন্টেলেকচুয়াল রূপায়ণে যে বিপুল দান করেছেন ও করছেন, তার তুলনায় আমার মন্তব্য অতিশয়োক্তি তো নয়ই, যথেষ্টও নয়।
কিন্তু আমার আজকার আলোচনার জন্য এটা নেহাত দরকারি। কারণ, তথারা শুধু ‘পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটিরই জীবনস্বরূপ নন, পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র জাতীয় দৈনিক ‘আজাদ’-এর কান্ডারিও বটে।
আমার আজকের আলোচ্য বিষয় পূর্ব পাকিস্তানের জবান। আমার মতো লেখকেরা মুসলিম-বাংলার শিক্ষিতাংশের সঙ্গে কথা বলেছে কালে-ভদ্রে। আর তাঁরা তাঁদের কাছে কথা বলছেন রোজ সকালে। আমরা পাকিস্তান চাইনি; বরং গোড়ার দিকে ব্যক্তিগতভাবে আমি পাকিস্তানের বিরুদ্ধতা করেছি। কারণ, আমাদের রাষ্ট্রাদর্শের স্বপ্ন ছিল অন্য রকমের। ফলে পাকিস্তানবাদের ইন্টেলেকচুয়াল আকৃতির জন্য সমস্ত প্রশংসা তাঁদেরই প্রাপ্য। আমাদের তাতে কোনো অংশ নেই। এমনকি আমার বিশ্বাস, বাংলার লীগের বড় বড় পার্লামেন্টারি নেতারও তাতে কোনো অংশ নেই। গোটা প্রশংসা ‘আজাদ’-এর।
প্রশংসা যেমন তাঁদের, দায়িত্বও প্রধানত তাঁদেরই। এর কারণ আগেই বলেছি যে তাঁরা রোজ দেশবাসীর সঙ্গে আছেন। আরেক কারণ এই যে মুসলিম-বাংলার শিক্ষিতগণের মনে, আসনে তাঁদের দোসর নেই।
পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক রূপায়ণ নিয়ে যথেষ্ট না হলেও অনেক আলোচনাই তাঁরা করেছেন। আমরাও সে আলোচনায় অংশ নিয়েছি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা কী হবে, এ নিয়ে সোজাসুজি আলোচনা তাঁরা আগে করেননি। করেননি বোধ হয় এই জন্য যে পূর্ব পাকিস্তানের ‘জাতীয় দৈনিক ‘আজাদ’ বাংলা ভাষার কাগজ এবং এঁরাও তা-ই ধরে নিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা যে বাংলা হবে, এ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েই আছে।
হয়েই ছিল সত্য। বাংলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা হবে কি উর্দু হবে, এ তর্ক খুব জোরেশোরেই একবার উঠেছিল। মুসলিম-বাংলার শক্তিশালী নেতাদের বেশির ভাগ উর্দুর দিকে জোর দিয়েছিলেন। নবাব আবদুর রহমান মরহুম, স্যার আবদুর রহিম, মো. মনসুর হক, ডা. আবদুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবুল কাসেম মরহুম প্রভৃতি প্রভাবশালী নেতা উর্দুকে বাঙালি মুসলমানের ‘মাতৃভাষা’ করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম-বাংলার সৌভাগ্য এই যে উর্দুপ্রীতি যাঁদের বেশি থাকার কথা, সেই আলেমসমাজই এই অপচেষ্টার বাধা দিয়েছিলেন। বাংলার আলেমসমাজের মাথার মণি মাওলানা মোহাম্মদ আকবর খাঁ, মাওলানা আবদুল্লাহেল বাকী, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী উর্দুবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব করেছিলেন। তাঁদের প্রয়াসে শক্তি জুগিয়েছিলেন মরহুম নবাব আলী চৌধুরী সাহেব। সে লড়াইয়ে তাঁরাই জয়লাভ করেছিলেন। বাংলার ওপর উর্দু চাপানোর সে চেষ্টা তখনকার মতো ব্যর্থ হয়।
কিন্তু নির্মূল হয়নি। বাংলার বিভিন্ন শহরে, বিশেষত কলকাতায়, মাঝে মাঝে উর্দু কনফারেন্স করে করে উর্দুও‌য়ালারা নিজেদের আন্দোলনকে জিইয়ে রেখেছিলেন। সম্প্রতি পাকিস্তান আন্দোলনের ফলে মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদ তাঁদের রাজনৈতিক আদর্শের বনিয়াদে পরিণত হওয়ায় উর্দুওয়ালারা আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি ‘মর্নিং নিউজ’ ও ‘স্টার-অব-ইন্ডিয়া’ এ ব্যাপারে কলম ধরেছে। জনকতক প্রবন্ধ লেখকও তাতে জুটেছেন। তাঁরা বলছেন, পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা স্বভাবতই উর্দু হবে।
মুসলিম লীগ মুসলমানদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান বলে অধিকাংশ মুসলমান দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। বাংলায় লীগ-সমর্থক মুসলিম দৈনিক খবরের কাগজের মধ্যে একটি মাত্র বাংলা; দুইটা ইংরেজি আর সব উর্দু। এই দুটি ইংরেজি কাগজও যদি উর্দুর পক্ষে প্রচার চালায়, তবে বিপদ যথেষ্ট রয়েছে, এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তবু আমরা আশা করতে পারতাম যে এক ‘আজাদ’ই ওই দুটি ইংরেজি ও চার-পাঁচটা উর্দু দৈনিকের প্রচারের মুখে দাঁড়াতে পারবে যদি-না অন্য কতকগুলো ব্যাপারও আমাদের মুখালেফ হতো।
পয়লা ধরুন বাংলার নেতাদের কথা। লীগ মন্ত্রিসভাই বলুন, প্রাদেশিক লীগ ওয়ার্কিং কমিটিই বলুন, লীগ রিলিফ কমিটিই বলুন, মুসলিম চেম্বার অব কমার্সই বলুন, প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগের অ্যাডহক কমিটিই বলুন, নিখিল ভারতীয় যেকোনো ব্যাপারে মুসলিম-বাংলার প্রতিনিধিত্বই বলুন, কলকাতা করপোরেশনের মেয়র-ডেপুটি মেয়রগিরির যোগ্য মুসলমান বাছাইয়ের ব্যাপারই বলুন, এসব ব্যাপারের যেকোনোটিতে আমরা যখন মুসলিম-বাংলার বাছাই করা আধা ডজন নেতার নামের মোকাবিলা হই, তখন যাঁদের আমরা দেখি, তাঁরা শুধু যে নিজেরাই বাংলা বলেন না তা নয়; লাটসাহেবের সামনে বরং বাংলায় মনোভাব প্রকাশের ভরসা করতে পারেন।
কিন্তু এসব নেতার সামনে সে ভরসা নেই। সোজা কথায়, মুসলিম বাংলার তকদিরের রাজমিস্ত্রি, ইঞ্জিনিয়ার এবং শুভ রসিয়ারেরা সবাই উর্দুভাষী।
তার বাদে ধরুন, বাংলার রাজধানী কলকাতার কথা। কলকাতা ভারতবর্ষের আন্তর্জাতিক শহর। এখানকার রাস্তার ভাষা উর্দু। এ শহরের বাংলা খবরের কাগজের সংখ্যার চেয়ে উর্দু-হিন্দি খবরের কাগজের সংখ্যা কম নয়। মুসলমানদের বেলায় এটা আরও গুরুতর। অর্থাৎ কলকাতাবাসী অধিকাংশ মুসলমানের ঘরের ভাষাও উর্দু। তাঁদের বাংলা খবরের কাগজের চেয়ে উর্দু খবরের কাগজের সংখ্যা বেশি। তাহ্‌জিব, তমদ্দুন ও শিক্ষাগত ব্যাপারে রাজধানীর প্রভাব দেশের জনসাধারণের ওপর কত বেশি, সেটা সবাই জানেন। এই দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, মুসলিম-বাংলার ভাষাগত ভাগ্যনির্ণয়ের ব্যাপারে রাজধানীর প্রভাব বাংলা ভাষার মুখালেফ।
এর সঙ্গে বিচার করতে হবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বর্তমান নেতা হিন্দু ভ্রাতৃগণের ভাবগতিক এবং বাংলার শিক্ষা বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তাদের শিক্ষানীতির কথা। বাংলার মুসলমানের জবানি বাংলা এঁদের কাছে অস্পৃশ্য; মুসলমানদের নিত্যব্যবহার্য শব্দ বাংলা সাহিত্যে অপাঙ্‌ক্তেয়। হিন্দুর মন্দিরের মধ্যে তুর্কি টুপি পাওয়া গেলে যেমন হইচই লেগে যাবে বলে অনুমান করা যেতে পারে, বাংলা বইয়ে ‘আল্লাহ’, ‘খোদা’ ও ‘পানি’ দেখা গেলে হইচই তার চেয়ে কম শুরু হয় না। তাঁদের খুব জোরের কথা এবং সুস্পষ্ট অভিমত এই যে বাংলা ভাষায় ‘ওসব আরবি-ফারসি শব্দ চলবে না।’ ‘আমি পানি খাব’, ‘আমরা আল্লাহর ইবাদত করি’—এটা তাঁদের মতে শুদ্ধ বাংলা নয়। পরীক্ষার কাগজে ওসব লিখলে নম্বর কাটা যাবে। মুসলমানরা ইচ্ছে করলে ওভাবে কথা বলতে পারে বটে কিন্তু লেখার সময় শুদ্ধ বাংলায় লিখতে হবে ‘আমি জল খাব’, ‘আমরা ভগবানের উপাসনা করি’। কাজেই দেখা যাচ্ছে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বর্তমান দিকপালদের মতে, মুসলমানদের মুখের ভাষা বাংলা নয়। এখানে বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তারা, বাংলা সাহিত্যের মুরব্বিরা উর্দুওয়ালাদের সঙ্গে একমত। কাজেই এ অবস্থাটাও উর্দুরই অনুকূল।
ওপরে যে চারটা অবস্থার বর্ণনা করা গেল, তার প্রতিটাই গুরুতর; আর চারটির সমবেত শক্তিতে নিশ্চয়ই গুরুতর। কিন্তু এদের গুরুত্ব যে শেষ পর্যন্ত মুসলিম-বাংলার ভাব নির্ধারণে বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে, এটা আজও তেমন সুস্পষ্ট নয়। সুস্পষ্ট নয় বলেই বিপদ আরও বেশি। এ রকম ক্ষেত্রে বিপদ এমন হঠাৎ আসবে যে তখন ঠেকানো দায় হবে। ঠেকানো দায় হবে দুইটা কারণে। যাঁরা উর্দু প্রবর্তনের বিরোধী, তাঁদের মনোভাবটা উপেক্ষার মনোভাব। তাঁরা ভাবেন, ‘ওসব কিছু না। মুসলিম-বাংলার ওপর উর্দু চাপানোর চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য।’ ব্যর্থ হতে যে বাধ্য, সে সম্পর্কে দুই মত নেই। কিন্তু চেষ্টা যে হতে পারে এবং সে চেষ্টার অনুকূলে পরিবেশও যে চমৎকার, ওপরে আমি শুধু তারই উল্লেখ করেছি।
অপর যে কারণে উর্দু প্রবর্তনের অপচেষ্টা ঠেকানো দায় হবে, তা এই যে কার্যত এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ লোকের সংখ্যা কম হবে না। তাঁরা সমাজের চিন্তাহীন অংশ; যেকোনো অবস্থায় আত্মসমর্পণ করার মতো নির্বিরোধ তাঁদের প্রকৃতি। তাঁরা ভাবেন, হোক না উর্দু, দোষ কী তাতে? নিতান্ত তর্ক উঠলে তাঁরা জবাব দেবেন, মুসলমান জনসাধারণের শতকরা ৯৫ ভাগই যখন নিরক্ষর, তখন তাঁদের উর্দু শেখানো যা, বাংলা শেখানোও তাই। বলা দরকার, এটা গুরুতর রকমের ভুল যুক্তি। একটু পরেই এই যুক্তির গলদ দেখানো হবে।
পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি মসলিম-বাংলার ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্টের প্রতীক। এই সোসাইটি স্বভাবতই ওই বিপদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। সোসাইটির একাধিক বৈঠকে এ সমস্যার আলোচনাও হয়েছে। হাজিরানে মজলিশের বিপুল মেজরিটি উর্দুর বিরুদ্ধে মত এজহার করেছেন। কিন্তু উর্দুর পক্ষে যাঁরা বলেছেন, তাঁদের সংখ্যা ও যুক্তিও নিতান্ত তুচ্ছ ছিল না। রেনেসাঁ সোসাইটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, কাজেই তাতে ভোটাভুটিও হয় না; কোনো জাবেদা প্রস্তাবও গৃহীত হয় না। এখানে যুক্তিতর্কের দ্বারা শুধু প্রচার করা হয়। এখানে মাইনরিটি মেজরিটির মতো মেনে চলতে বাধ্য নন। মেজরিটি পক্ষের যুক্তিতর্কের ফলে মাইনরিটি দলের কতজন তাঁদের মত বদলিয়েছেন, তার ঠিক ঠিক হিসাব ধরাও সম্ভব নয়। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে, মুসলিম-বাংলার চিন্তকদের মধ্যে যতই ছোট হোক এক দল রয়েছে, যারা উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা করার পক্ষপাতী।
এ থেকে নিশ্চয় এটা বোঝা উচিত হবে যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে, এমনকি তার আগে থেকেই, বাংলায় উর্দু অভিধান হওয়া মোটেই অবাস্তব কল্পনামাত্র নয়; এবং সে চেষ্টা হলে তাতে বাধা দেওয়াও খুব সহজ হবে না।

আবুল মনসুর আহমদ বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ের এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তাঁর স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পেয়েছে নানাভাবে—কখনো রাজনীতির মঞ্চে, সংবাদপত্রে, কখনো সাহিত্যে-স্যাটায়ারিস্ট ও প্রবন্ধে চিন্তক হিসেবে। জীবনের শুরুতে দেখেছেন বাঙালি মুসলমানের চেতনার উন্মেষ যুগ, যৌবনে জড়িয়েছেন উপমহাদেশের স্মরণীয় আন্দোলনের সঙ্গে, আর পরিণত বয়সে সংবাদপত্রে যুক্ত হয়ে নানা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০১২ সালে আমি যখন ‘কালের ধ্বনি’র ‘দুর্লভ কথক: আবুল মনসুর আহমদ সংখ্যা’র কাজ করছি, সেই সময় প্রথম ‘পূর্ব পাকিস্তানের জবান’ শিরোনামের এই দুর্লভ প্রবন্ধটি আমার নজরে আসে। প্রবন্ধটি আবুল মনসুর আহমদের কোনো বইয়ে স্থান পায়নি। এটি প্রথম ছাপা হয়েছিল মাসিক ‘মোহাম্মদী’র ১৭ বর্ষে, প্রথম সংখ্যায় (কার্তিক ১৩৫০)। প্রকাশের পরপরই প্রবন্ধটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ১৯৪৩ সালে পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে মানুষের ভাষা কী হবে—এ নিয়ে ছিল নানা সংশয়, তর্ক-বিতর্ক। এই প্রেক্ষাপটে প্রবন্ধটি লিখলেন আবুল মনসুর আহমদ। এতে বাংলা ভাষা জাতীয় পর্যায়ে সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে পাকিস্তানে বাঙালি মুসলমানরা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে কী ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে, উপস্থাপিত হয়েছে সেসবের ব্যাখ্যা। গোটা প্রবন্ধে বাংলা ভাষার প্রতি প্রবন্ধকারের অনুরাগ স্পষ্ট। বস্তুত, ভাষা হিসেবে বাংলা কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটি এখানে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করেছেন আবুল মনসুর আহমদ। সেই সময়ের বাস্তবতায় এটি কিন্তু সহজ কাজ ছিল না। উল্লেখ্য, অগ্রন্থিত এ লেখা ছাপার ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়েছে প্রমিত বাংলা বানানরীতি।

তবে কি সে চেষ্টা সফল হবে? তাও হবে না। হলে উর্দুর বিরুদ্ধে আমাদের কোনো আপত্তিই হতো না। কারণ, বৈজ্ঞানিক মনে ভাষা সম্বন্ধে কোনো কুসংস্কার নেই। মুক্তবুদ্ধির মানুষের কাছে ভাষায়-ভাষায় পক্ষপাতিত্বের কোনো ইতরবিশেষ থাকা উচিতও নয়। ভাষার বিচার হবে শুধু বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে। ছাপাখানা, টাইপ-রাইটিং, টেলিগ্রাফ, পরিভাষা, আন্তর্জাতিকতা ও বর্ণমালার নিতিক বৈজ্ঞানিকতা প্রভৃতি আধুনিক গুণাবলির দ্বারা ভাষার ভালো-মন্দের বিচার হতে পারে, অন্য কিছুতে নয়। কাজেই এসব গুণনির্বিশেষে এবং দোষ-গুণ নিরপেক্ষভাবে উর্দুর বিপক্ষে বা বাংলার পক্ষে আমাদের মনে কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই।
ভাষা হিসেবে আমরা উর্দুর নিন্দুক নই। আমরা শুধু বাংলার ওপর উর্দু চাপানোর প্রয়াসের বিরোধী। আমাদের এ বিরোধের কারণ এই নয় যে বাংলা ভাষা ভাষা হিসেবে উর্দুর চেয়ে উৎকৃষ্ট—সে তর্কই আমরা এখানে তুলব না। উর্দু প্রবর্তনের চেষ্টার বিরোধী আমরা অন্য কারণে। সে কারণগুলোই এই আলোচনায় আমি দেখানোর চেষ্টা করব।
সবচেয়ে বড় কারণ এই যে কোনো জাতির মাতৃভাষা বদলিয়ে এক ভাষা থেকে অপর ভাষায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এটা একেবারেই অসম্ভব সে জাতিতে, যে জাতির লোকসংখ্যা প্রায় চার কোটি। বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানের সংখ্যা তা-ই। ওদের সবাইকে বাংলা ছাড়িয়ে উর্দু শেখানোর চেষ্টা পাগলামি মাত্র।
.ভাষাটা শুধু কতকগুলো অক্ষরও নয়, কতকগুলো শব্দ নয়। অক্ষর, শব্দ, ব্যাকরণ, উচ্চারণ, ফনিটিকস, ফসহিত্য বালাগত, মুখ্রেজ, তালাফ্ফুজ প্রভৃতি নিয়েই একটা ভাষা হয়। এর মধ্যে শিক্ষার নমুনা ও শিক্ষিতের বাহাদুরি যে অক্ষর, সেটা হচ্ছে ভাষার সবচেয়ে গৌণ ব্যাপার। আমরা দেশের শতকরা যে ৯৫ ভাগকে অশিক্ষিত বা নিরক্ষর বলি, তারা শুধু হরফের ব্যাপারেই নিরক্ষর-ব্যাকরণ, ফনিটিকস, মুখরেজ ও তালাফ্ফুজের ব্যাপারে তারা অশিক্ষিত নয়। কারণ, ওসব বিদ্যা স্বভাবজাত, সমাজের দেওয়া। কথাটা খুবই সোজা। তবু অসাবধান পাঠকের সুবিধার খাতিরে একটা নজির দেওয়া দরকার।
প্রথমে ধরুন মুখরেজ বা ফনিটিকসের কথা। ‘হাওড়া’ যে ‘হাওরা’ নয়, এটা শেখাতে বা বোঝাতে বাঙালিকে ফনিটিকসও পড়তে হয় না; এমনকি ‘ড়’ ও ‘র’র পার্থক্য বোঝার জন্য ‘বর্ণবোধ’ও পড়তে হয় না। যেকোনো অশিক্ষিত, নিরক্ষর ও নাবালক বাঙালি নিজের অজ্ঞাতসারেই ‘হাওড়ার হারু বিড়িওয়ালা’র ফনিটিক্যাল বিশুদ্ধ উচ্চারণ করে যাবে। কিন্তু অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফনিটিকসের প্রফেসরও অমন নিখুঁতভাবে ‘ড়’ ও ‘র’ পার্থক্য উচ্চারণ করতে পারবেন না।
তার বাদে ধরুন ব্যাকরণের কথা। একজনে যে ‘আমি,’ ‘তুমি’ ও ‘সে’ হয়, আর বেশি লোকে যে ‘আমরা’ ‘তোমরা’ ‘তারা’ হয়; আমি যে ‘গেছ্লাম’, ‘তুমি’ যে ‘গেছলে’, সে যে ‘গেছ্লো’ এবং ‘আপনি’ যে ‘গেছলেন’ এত ‘শব্দরূপ’ ও ‘বিভক্তি’-জ্ঞান নিরক্ষর জনসাধারণ কোথায় শিখেছে? দিল্লি-লক্ষ্ণৌর যেকোনো নিরক্ষর কুলির মুখে শুনবেন ‘মরদ করতা হ্যায়’ আর ‘আওরত করতি হ্যায়’। এ ব্যাকরণ তারা মায়ের পাঠশালা ও সমাজের স্কুলেই শিখেছে।
তারপর ধরুন তালাফ্ফুজ বা এক্সেন্টের কথা। তারা (তাহারা), তারা (তারকা), পারা (সক্ষম হওয়া), পারা (পারদ), বাত (বাতাস), বাত (রোগ), বাত (কথা), বাত (ভাত-পূর্ব বাংলা), এসবের উচ্চারণভেদ বা এক্সেন্ট শেখানোর জন্য বৈয়াকরণদের কোনো দিন ঘরে ঘরে প্রচার করতে হয়নি।
এতেই বোঝা যাচ্ছে যে হরেক জবানের একেকটা নিজস্ব ব্যাকরণ বা বালাগত, উচ্চারণতত্ত্ব বা মখ্রেজ, যতিতত্ত্ব বা তালাফ্ফুজ রয়েছে, যার প্রথম স্থান কেতাবে না, মানুষের জিহ্বা এবং কানে। এটা সব ভাষা সম্বন্ধেই সত্য। সত্য বলেই এক জাতির ভাষাকে সাধারণভাবে গণভিত্তিতে আরেক জাতির গণভাষায় পরিণত করা সম্ভব না।
ধরুন, বাংলা ভাষার যে কয়টা বিশেষত্বের কথা ওপরে বলা হলো, যদি আমরা ইচ্ছে করি যে সেসব বিশেষত্ব ছেড়ে দিয়েই আমাদের জনসাধারণকে উর্দু শিখিয়ে ফেলব, তবু আমরা তা পারব না। কারণ, উর্দু ভাষার মধ্যেও ওই সব এবং ওই ধরনের আরও অনেক বিশেষত্ব রয়েছে। ওই সব বিশেষত্ব মানুষকে পাঠশালায় শেখানো যায় না। যুগ-যুগান্তরের পরিপার্শ্বে ওই সব বিশেষত্ব গড়ে উঠেছে। মাত্র পরিপার্শ্বই আমাদের ওই সব বিশেষত্ব শেখাতে পারে। পরিপার্শ্বের প্রভাব এ ব্যাপারে এত দরকারি ও প্রভাবশালী যে আপনি যদি বছর কুড়ি লক্ষ্ণৌ বাস করেন এবং আপনার ছেলেমেয়েরা যদি সব লক্ষ্ণৌতে জন্মায় এবং পনেরো-কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত লক্ষ্ণৌতেই বাস করে, তবে তারা মাদ্রাসা-মক্তবে না পড়েও সুন্দর উর্দু শিখে ফেলবে। বাঙালি ছেলেমেয়ে বলে তাদের ধরাই যাবে না। অথচ বাংলার কোনো পাড়াগাঁয়ে আপনি লাক্ষ্ণৌর খুব বড় পণ্ডিতকে শিক্ষক রাখলেও আপনার ছেলেমেয়েকে অমন উর্দুভাষী করতে পারবেন না। এখানে মনে রাখবেন, উর্দু ভাষায় লেখক বা পণ্ডিত হওয়া আর উর্দুভাষী হওয়া এক কথা নয়। এখানে আরেকটা কথা পরিষ্কার করে রাখা ভালো। বলা হবে, উর্দু হরফ চালানো তো আর কঠিন কাজ নয়। ছেলেমেয়েদের ‘ক’ ‘খ’ শিখতে যা, ‘আলেফ’ ‘বে’ শিখতেও তাই। উর্দু যাঁরা আনতে চাইছেন, তাঁরা উর্দু হরফও তো আনবেন। তবে আমি এ আলোচনায় হরফের ব্যাপারে কোনো কথা বলছি না কেন? কারণ, এই যে হরফের ব্যাপারটা আলাদা। হরফ বদলালেই স্বতই ভাষা বদলানো হয়ে যায় না। বাংলা ভাষা আরবি বা রোমান বা অন্য যেকোনো হরফে লেখা যেতে পারে এবং তার উল্টোটা সম্ভব। কাজেই হরফ-সমস্যাটা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। আমি আরেক প্রবন্ধে সে সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ওপরের আলোচনা থেকে পাঠকগণ বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয় যেকোনো এক জাতির ভাষাকে গণভিত্তিতে অন্য স্থান ও অন্য আবহাওয়ায় দুসরা জাতির গণভাষায় পরিণত করা যায় না। ভাষা, খোরাক ও পোশাক স্থানীয় পরিবেশের চাপে, স্থানীয় প্রয়োজনের তাগিদে, যুগ-যুগান্তর ধরে গড়ে ওঠে। এতে সংস্কার চলে, কিন্তু আমূল পরিবর্তন চলে না; এতে নতুন জিনিস ঢোকানো চলে, কিন্তু পুরোনোকে বাদ দেওয়া চলে না।
উর্দুওয়ালারা এটা বুঝতে পারছেন অথবা পরে পারবেন। তবু তাঁরা এ চেষ্টা করবেন কয়েকটা কারণে:
১. চেষ্টা করে দেখাই যাক না; যদি সফল হয়, তবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের গণভাষা এক হয়ে যাবে। এটা কত বড় কাজ!
২. যদি নিতান্তই ব্যর্থ হয়, তবু তো পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের এক বিরাট অংশ, অন্তত উচ্চশিক্ষিত অংশ, উর্দুজ্ঞানী হবে। সেটা কম লাভ কি?
৩. বাংলার ওপর উর্দু চাপানোর প্রয়াসের মধ্যেই বাঙালি মুসলমানদের ওপর পশ্চিমা ভাইদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। অপর জাতির ওপর ইন্টেলেকচুয়াল প্রাধান্য ও মাতব্বরি করার মধ্যে একটা গৌরব, একটা মাদকতা রয়েছে; সে সম্ভাবনার মধ্যেও একটা রোমান্স রয়েছে। ছয় আনার ভোটার চাষি মুসলমানদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা আসার পরেও যে কারণে বাংলার লীগ-নেতৃত্ব, সুতরাং রাষ্ট্র-নেতৃত্ব, উর্দুভাষীদের হাতেই রয়েছে, ঠিক এই কারণ থেকেই উর্দু প্রসারের প্রয়াসও হবে।
৪. পাকিস্তানবাসীর ভাবের আদান-প্রদানের সাধারণ ভাষা হিসেবে আমাদের অন্তত দ্বিতীয় ভাষাস্বরূপ উর্দু শেখা উচিত, এই যুক্তিতে উর্দুওয়ালারা একটা শেষ চেষ্টাও করতে পারেন।
ওপরের চারটি কল্পিত ও সম্ভাব্য অবস্থার প্রতিটিতেই ওদের একটা বড় যুক্তি থাকবে এই যে উর্দু ভাষা যেমন ইসলামি ভাবের অনুকূল, উর্দু সাহিত্য তেমনি ইসলামি কেতাবে ভরা। আরবি ও ফারসি সাহিত্য তার চেয়ে অনেক বেশি ইসলামি কেতাবে ভরা, বিশেষত আরবি ভাষা মুসলমানদের ধর্ম ভাষা এবং বিশ্বের মুসলমানদের সাধারণ ভাষা হতে পারে, এ যুক্তি দিয়ে কিন্তু তাঁরা আমাদের আরাব শিখতে বলছেন না। বরং কেউ যদি ওসব যুক্তি দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের মাতৃভাষা উর্দুর বদলে আরবি করার জন্য দিল্লি-লক্ষ্ণৌতে গিয়ে সভা-সমিতি করতে চায়, তবে এরাই বিশ্ব মুসলিমের ভ্রাতৃত্বের কথা শিকায় তুলে রেখে বক্তাদের মুগুর নিয়ে তাড়া করে আসবেন। এর কারণ কী, এর মনোবিজ্ঞানগত কৈফিয়তটাই-বা কী, তা ক্রমে পাঠকগণ বুঝতে পারবেন।
এবার আসুন আমরা বিচার করে দেখি, উর্দুকে বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা, জাতীয় ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা হলে কী কী অবস্থা ঘটতে পারে। ধরুন, পাকিস্তান হয়ে গেছে; পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম জনসাধারণ তাদের ইচ্ছামতো ও পছন্দমতো রাষ্ট্র গঠন করে নিয়েছে। গণপ্রতিনিধিগণ জনসাধারণের হুকুমমতো রাজ্য করছেন। শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-বাণিজ্য—সবই মুসলিম রাষ্ট্রনায়কদের ইচ্ছামতো চলছে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, ফ্যাক্টরি-কারখানায় দেশ ছেয়ে গেছে।
ঠিক এই সময়ে পাকিস্তানের নেতারা বললেন, আমরা জনসাধারণ মেনেও নিলাম যে পাকিস্তানের জনসাধারণের ভাষা বাংলার বদলে উর্দু করতে হবে। এটা সফল করতে হলে:
১. বাংলার সব প্রাইমারি স্কুলে উর্দু বাধ্যতামূলক করতে হবে;
২. উর্দুকে শিক্ষার মিডিয়াম করতে হবে;
৩. উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে, অর্থাৎ অফিস-আদালতের ভাষা, নথিপত্র, সরকারি কাগজপত্র, আইনকানুনের কেতাব, রেল, পোস্টাফিস ও টেলিগ্রাফের টিকিট পর্যন্ত সবই উর্দু ভাষায় করতে হবে।
সোজা কথায়, ইংরেজি ভাষা আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষাজীবনে যে স্থান দখল করে আছে, উর্দুকে সে স্থানে বসাতে হবে।
অথচ ইংরেজি দেড় শ বছরে আমাদের মাতৃভাষাও হয়ে যায়নি; সে চেষ্টাও হয়নি। ইংরেজিকে আমাদের মাতৃভাষা বা গণভাষা করার উদ্দেশ্যেই ইংরেজ যে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনে এভাবে ইংরেজি ঢুকিয়েছে, এ কথা বলা যেতে পারে না। ইংরেজিকে শুধু রাষ্ট্রভাষা করাই ইংরেজদের উদ্দেশ্য ছিল। শুধু রাষ্ট্রভাষা ইংরেজি আমাদের জীবনে যতখানি জায়গা দখল করে আছে, উর্দুকে গণভাষা করতে হলে তাকে আমাদের জীবনে ইংরেজির চেয়ে আরও বেশি জায়গা দিতে হবে।
দিলে কী হবে, তার বিচার করুন। দেড় শ বছরে আমরা কতজন কী পরিমাণ ইংরেজি শিখেছি? ইংরেজি অবশ্য শিক্ষাকে আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করেনি। কাজেই আমাদের মধ্যে শতকরা পাঁচ-সাতজনের বেশি লেখাপড়া শেখেনি। কিন্তু যারা লেখাপড়া করেছে, তাদের সবাইকে তো ইংরেজি পড়তে হয়েছে। যারা উচ্চশিক্ষা লাভ করেছে, তাদের সবাইকে সাহিত্য ছাড়া অন্যান্য বিষয়ও ইংরেজি মারফত শিখতে হয়েছে। ইংরেজিতে ব্যুৎপত্তি দিয়েই আমাদের শিক্ষার উচ্চতা মাপা হয়েছে; ইংরেজি-জ্ঞান বিচার করেই আমাদের চাকরি-নকরি দেওয়া হয়েছে। ইংরেজিতে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ওকালতিতে শ্রেষ্ঠত্ব, নির্ধারিত হয়েছে।
তবু আমরা দেড় শ বছরে কতটা ইংরেজি শিখেছি? ইংরেজি ভাষা কী পরিমাণে, কত দূর আমাদের শিক্ষিত সমাজের গণভাষায় পরিণত হয়েছে? আমাদের বাংলা কথায় আমরা প্রচুর ইংরেজি ‘ওয়ার্ড’ ‘ইউজ’ করছি বটে, কিন্তু ইংল্যান্ড-আমেরিকার ভদ্রলোক ইংরেজ-মার্কিনদের সঙ্গে তো দূরের কথা, কলকাতার ট্যাশদের সঙ্গেই কি আমরা সহজভাবে ইংরেজিতে কথা বলতে শিখেছি? যেসব বাঙালি অধ্যাপক কলেজে মিল্টন-শেক্‌সপিয়ার পড়াচ্ছেন, তাঁরাই রাস্তায় বেরিয়ে একটা সাধারণ ট্যাশের সঙ্গে দুই দণ্ড ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন?
উর্দুর বেলায়ও আমরা এর বেশি শিখতে পারব না। পাকিস্তানে শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে; সুতরাং সবাই উর্দু লিখতে-পড়তে পারবেন। কিন্তু তার মধ্যে শতকরা দুই-দশজনও মোল্লা জান মোহাম্মদের সঙ্গে সহজভাবে উর্দুতে আলাপ করতে পারবেন না। বর্তমানে শিক্ষা বাধ্যতামূলক হয়ে যদি বাংলার সবাই গ্র্যাজুয়েট হয়েও যেত, তবুও রাগের সময় ‘ড্যাম’ ‘রাস্কেল’ ছাড়া আর বেশি কিছু ইংরেজি কথোপকথন করতে পারত না। তেমনি বাংলার সব মুসলমান উর্দুতে পুরা কেতাবি জ্ঞান লাভ করার পরেও রাগের মাথায় ‘শুয়ার কা বাচ্চা’র বেশি উর্দু বাৎচিত সহজভাবে করতে পারবে না।
কিন্তু কিছুসংখ্যক বাঙালি যেমন বিলেত ঘুরে এসে, মেমসাব বিয়ে করে, বাড়িতে বিলাতি কুত্তা এবং নেপালি রেখে কিছুটা সাহেব হয়েছে এবং ছেলেমেয়েদের বেবি ডেকে ইংরেজি ভাবার মধ্যে তাদের ‘পাপা-মাম্মা’ শিখিয়েছে, উর্দুর বেলায়ও কিছু মুসলমান মিরাটা বা সুবিধাবাদী ছেলেমেয়েকে উর্দু শেখাতে পারবেন। কিন্তু বিলাতফেরত ‘কালা-সাহেবদের মতোই ওরা হবেন একটা একঘরে শ্রেণি, ‘ক্লাস বাই দেমসেলভস’। বাংলার জনসাধারণের সঙ্গে তাদের কোনো আত্মীয়তা থাকবে না। বিলাতফেরত ‘কালা-সাহেবরা’ যেমন লড়াই লাগার আগ পর্যন্ত ছোটার মধ্যে বিলাতে ‘হোমে’ যেতেন, পূর্ব পাকিস্তানের ওই সব উর্দু শরিফও ছুটাতে তেমনি লক্ষ্ণৌ বা মিরাটে ‘হোমে’ যাবেন।
এসবই হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু চালানোর সামগ্রিক চেষ্টার দশ-বিশ-পঞ্চাশ-এক শ বছরের পরের কথা। সে চেষ্টার গোড়াতেই কী হবে, এখন চলুন আমরা তার বিচার করে দেখি।
আগেই বলেছি, উর্দু পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা করার প্রথম পদক্ষেপ হবে, তাকে বাংলার রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার মিডিয়াম করা। এবার ধরুন—
১. অফিস-আদালতের ভাষা ইংরেজির বদলে উর্দু করা হলো,
২. শিক্ষার মিডিয়াম ইংরেজির বদলে উর্দু করা হলো,
৩. শিক্ষার সকল স্তরে এমনকি, প্রাইমারি স্কুলেও উর্দুকে বাধ্যতামূলক করা হলো।
এর প্রথম ফলই হবে যে হাকিম-হুকামা, ডিপটা-মুনসেল, জজ-ম্যাজিস্ট্রেট, শিক্ষক-অধ্যাপক, সবাইকে উর্দুতে হতে হবে। এটা অবশ্য এক দিনে হবে না। রাতারাতি সব সরকারি কর্মচারী উর্দুভাষী হয়ে যাবেন না। কিন্তু কী নীতি ও কী তরিকায় এটা কাজ করবে, তার বিচার করতে পারি আমরা ইংরেজির গতি থেকে। ইংরেজিও এক দিনে চাপানো হয়নি। ইংরেজি দ্বারা শুধু প্রাধান্য, অগ্রগণ্যতা বা প্রেফারেন্স পেয়েছে মাত্র। বস্তুত এই প্রেফারেন্স-নীতি অবলম্বন করা ছাড়া এক ভাষাকে অন্য ভাষার স্থলবর্তী করার আর কোনো তরিকা নেই। আমরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাই, তবে এই প্রেফারেন্স-নীতি আমাদের এখতিয়ার করতেই হবে।
ফলে—
১. ইংরেজি প্রবর্তনের গোড়াতে শিক্ষকতা ও অধ্যাপনা যেমন ইংরেজদের একচেটে ছিল, তেমনি পাকিস্তানের শিক্ষকতা ও অধ্যাপনা, অন্তত কিছুদিনের জন্য, পশ্চিমা ভাইদের একচেটে থাকবে;
২. সরকারি অফিস-আদালতে ইংরেজদের স্থলে দিল্লি-লক্ষ্ণৌওয়ালাদের প্রাধান্য, অগ্রগণ্যতা মেনে নিতে হবে;
৩. শিল্প-বাণিজ্যে, কল-কারখানায় ইংরেজ প্রাধান্যের স্থলে দিল্লি-মুম্বাইওয়ালাদের প্রাধান্য মেনে নিতে হবে।
এই তিনটা ব্যাপারের গুরুত্ব একটু ধীরভাবে চিন্তা করে দেখলেই আপনারা দেখতে পাবেন যে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়, শিক্ষাগত ও সামাজিক রূপায়ণের প্রাথমিক স্তরে বাংলার জনসাধারণ তো দূরের কথা, মুসলিম বঙ্গের আজিকার শিক্ষিত সম্প্রদায়ও কোনো সক্রিয় অংশ নিতে পারবে না; তারা অভিনয় করবে শুধু বেকার, নিরপেক্ষ, নির্বোধ, দর্শক ও ট্যাক্সদাতার ভূমিকায়। ইংরেজদের অধীনে আমরা ভারতবাসী আজ যেরূপ সাবঅর্ডিনেট পজিশনে থাকতে বাধ্য হচ্ছি, বাঙালি মুসলমানকে উর্দুভাষীদের কাছে সেই সাবঅর্ডিনেট পজিশনেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। বিদ্যায়, জ্ঞানে, বুদ্ধিতে, প্রতিভায় অনেক ভারতবাসী ইংরেজের চেয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ হয়েও যেমন শুধু ভাষার প্রাধান্যে নিচে পড়ে আছে, বাঙালি মুসলমানের বেলায়ও ঠিক তা-ই হবে। পাণ্ডিত্য থাকে পেটে ও মাথায়। কথাবার্তাতেই শুধু সেটা প্রকাশ পেতে পারে। সহজভাবে কথা বলার ভাষার অভাবেই আমাদের অনেক জানা কথা বলা হয় না; এবং তর্কে আমরা হেরে গিয়ে থাকি। ইংরেজের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে গিয়েই আমরা ছোট ও বোকা বনে থাকি মুখে অনেক কথা ও মাথায় অনেক বুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও। এই প্রকাশশক্তির অভাব হেতুই বক্তার মনে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স জন্মে থাকে। ইংরেজির বেলায় আমাদের জীবনে যা যা ঘটেছে, উর্দুর বেলায়ও ঠিক তা তা ঘটবেই। উর্দু ভাষার রাষ্ট্রভাষা হওয়ার ১০ বছরের মধ্যেই আমরা বুঝতে পারব ও স্বীকার করব যে দিল্লি-লক্ষ্ণৌওয়ালারা প্রতিভা-মনীষায় বাঙালি মুসলমানের চেয়ে সর্বাংশে শ্রেষ্ঠ। একটা জাতির ইন্টেলেকচুয়াল মৃত্যুর জন্য এই মনোভাবই যথেষ্ট।
তার ওপর আসবে অর্থনৈতিক তারতম্য। বাংলার শিক্ষিত মুসলমান লাখ লাখ যুবক-প্রৌঢ় উর্দু-জ্ঞানের অভাবে হবে বেকার। যারা খাতির-খোশামোদে চাকরি পাবে, তারাও পাবে সাবঅর্ডিনেট পদ। মাইনেও হবে তাদের কম। কাজেই অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বও দেবে ওদের আভিজাত্য। বর্তমানের ‘আইসিএস’-এর মতো একটা পশ্চিমা ‘স্টামফ্রেম’ ক্রমে গড়ে উঠবে এবং অন্তত কয়েক যুগ ধরে বাংলা শাসন করবে তারাই। পূর্ব পাকিস্তান কার্যত থাকবে পশ্চিম পাকিস্তানের একটা উপনিবেশ মাত্র।
অথচ এত করেও বাংলার চার কোটি বাংলাভাষী মুসলিম জনসাধারণ হাজার বছরেও উর্দুভাষী হবে না, সে কথা আমি আগেই বলেছি। লাভের মধ্যে হবে একশ্রেণির অভিজাত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। এদের সঙ্গে জনসাধারণের কোনো যোগ থাকবে না, এ কথাও আগেই বলেছি। কিন্তু তাঁরা পশ্চিমাদের গলায় সুর মিলিয়ে উর্দুর মাহাত্ম্য গেয়ে যাবেন। কারণ, তাঁরাই হবেন পশ্চিমাদের এ দেশি আত্মীয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শাসকশ্রেণি। শাসকশ্রেণির ভাষা থেকে জনসাধারণের ভাষা পৃথক থাকার মধ্যে মস্ত বড় একটা সুবিধে আছে। তাতে অলিগার্কি ভেঙে প্রকৃত গণতন্ত্র কোনো দিন আসতে পারে না। সুতরাং, পূর্ব পাকিস্তানে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রোকাওট হিসেবে রাজনৈতিক মতলবেই এই অভিজাত শ্রেণি উর্দুকে বাংলার ঘাড়ে চাপিয়ে রাখবেন। শুধু চাকরিবাকরিতে নয়, আইনসভার মেম্বরগিরিতেও যোগ্যতার মাপকাঠি হবে উর্দু বাগ্মিতা। সুতরাং, সেদিক দিয়েও এই ভাবাগত আভিজাত্যের স্টিলফ্রেম ভেঙে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা করার চেষ্টার বিপদ এখানে। পাকিস্তানের প্রধান রাজমিস্ত্রি ‘আজাদ’ সম্পাদক মাওলানা আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও রেনেসাঁ সোসাইটির সম্পাদক মাওলানা মুজিবুর রহমান খাঁ সাহেবের দৃষ্টি এদিকে আকর্ষণ করছি এবং আগে থেকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি।
অথচ উর্দু নিয়ে এই ধস্তাধস্তি না করে আমরা সোজাসুজি বাংলাকেই যদি পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষারূপে গ্রহণ করি, তবে পাকিস্তান প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই আমরা মুসলিম বাংলার শিক্ষিত সম্প্রদায় নিজেরাই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও শিল্পগত রূপায়ণে হাত দিতে পারব। আমাদের নিজেদের বুদ্ধি, প্রতিভা ও জীবনাদর্শ দিয়েই আমাদের জনসাধারণকে উন্নত, আধুনিক জাতিতে পরিণত করব, জাতির যে অর্থ, শক্তি, সময় ও উদ্যম উর্দু প্রবর্তনে অপব্যয় হবে, তা যদি আমরা শিক্ষা-সাহিত্যে, শিল্পে-বাণিজ্যে নিয়োজিত করি, তবে পূর্ব পাকিস্তানকে আমরা শুধু ভারতের নয়, সমগ্র মুসলিম জগতের, এমনকি, গোটা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত করতে পারব। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকেও আদর্শ মুসলিম ভাষা ও মুসলিম সাহিত্যে পরিণত করতে পারব।
পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষার কী রূপ হবে, আগামী প্রবন্ধে আমি তার আলোচনা করব।

(দৈনিক প্রথম আলো থেকে সংগৃহিত)

Advertisements

পহেলা বৈশাখ ও বাংলা বৈশাখী কবিতা / সায়ীদ আবুবকর

বাংলা সনের মূল নাম ছিল তারিখ-এ-এলাহী। মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে তার রাজত্বকালের ২৯তম বর্ষের ১০ কিংবা ১১ মার্চ তারিখে এক ডিক্রি জারির মাধ্যমে তারিখ-এ-এলাহী প্রবর্তন করেন। সিংহাসনে আরোহণের পরপরই তিনি একটি বৈজ্ঞানিক, কর্মপোযোগী ও গ্রহণযোগ্য বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন, যেখানে দিন ও মাসের হিসাবটা যথাযথ থাকবে। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ শিরাজীকে নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরির দায়িত্ব প্রদান করেন। বিখ্যাত পন্ডিত ও সম্রাট আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল এ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা প্রদান করেন যে, হিজরি বর্ষপঞ্জি কৃষিকাজের জন্য মোটেই উপযোগী ছিল না কারণ চন্দ্র বছরের ৩১ বছর হয় সৌর বছরের ৩০ বছরের সমান। চন্দ্র বছরের হিসাবেই তখন কৃষকশ্রেণির কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো অথচ চাষবাস নির্ভর করতো সৌর বছরের হিসাবের ওপর। চন্দ্র বছর হয় ৩৫৪ দিনে। সেখানে সৌর বছর হয় ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনে। ফলে দুটি বর্ষপঞ্জির মধ্যে ব্যবধান থেকে যায় বছরে ১১ বা ১২ দিন। বাংলা সনের জন্ম ঘটে সম্রাট আকবরের এই রাজস্ব আদায়ের আধুনিকীকরণের প্রেক্ষাপটে।

তারিখ-এ-এলাহীর বারো মাসের নাম ছিল কারবাদিন, আর্দি, বিসুয়া, কোর্দাদ, তীর, আমার্দাদ, শাহরিয়ার, আবান, আজুর, বাহাম ও ইস্কান্দার মিজ। কারো পক্ষে আসলে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় কখন এবং কীভাবে এসব নাম পরিবর্তিত হয়ে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র হয়। অনুমান করা হয়, বারোটি নক্ষত্রের নাম নিয়ে পরবর্তীকালে নামকরণ করা হয় বাংলা মাসের। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়ীস্থা থেকে জ্যৈষ্ঠ, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, আশ্বায়িনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রায়হন থেকে অগ্রহায়ণ, পউস্যা থেকে পৌষ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নতুন বছর উদযাপন প্রথাটাও কিন্তু আকবরেরই তৈরি। আকবরের সময়ে তার প্রবর্তিত ১৪টি উৎসব পালিত হতো মহা-সমারোহে। তার মধ্যে একটি ছিল নওরোজ বা নববর্ষ উৎসব। মজার ব্যাপার হলো, এই নওরোজ বা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানেই রাজপুত্র সেলিম, পরে যিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে খ্যাত হন, মেহেরুন্নেছার প্রেমে পড়েন। এই মেহেরুন্নেছাই ইতিহাসের সেই বিখ্যাত নূরজাহাজ। এরকম আরেকটি নববর্ষের উৎসবে রাজপুত্র খুররম, পরবর্তীকালের সম্রাট শাহজাহান, খুঁজে পান তার জীবনসঙ্গিনী মমতজ মহলকে, যার জন্যে তিনি নির্মাণ করেন জগদ্বিখ্যাত তাজমহল। যদি এই নববর্ষ উৎসব না থাকতো, তাহলে আমরা হয়তো নূরজাহানকেও পেতাম না, বিশ্বের বিস্ময় তাজমহলও পেতাম না।

পহেলা বৈশাখ এখন বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাংলার মুসলমান-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধকে এক মঞ্চে আনার শাশ্বত কোনো উৎসব যদি থেকেই থাকে বাঙালির, তা এই পহেলা বৈশাখ। কালের পরিবর্তনে এ উৎসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন নতুন উপাদান। পিঠাপুলি থেকে শুরু থেকে মাংস-পোলাও খাওয়া-খাওয়ির ব্যাপার স্যাপার তো আছেই, সেই সাথে আছে অত্যাবশ্যকীয় পান্তা-ইলিশের ঘনঘটা। এসব প্রতিযোগিতায় যেমনটি থেমে নেই শিশু-কিশোর-কিশোরীরা, তেমনই থেমে নেই তরুণ-তরুণী-বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও। ব্যবসায়ী-বণিকেরা যেমন নতুন হালখাতা খুলে এ দিবসকে উৎযাপন করেন নতুন আবেগে নতুন স্বপ্নে, তেমনি কবি-সাহিত্যিকদেরও জন্যে এ এক নতুন প্রেরণার উৎসব। বৈশাখকে তারা কল্পনা করেন যুগ-পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে। পুরাতন বছরের রোগশোক, অসুখবিসুখ, ব্যথা-ব্যর্থতা, জরাজীর্ণতাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে শুধু ভালবাসা-প্রেমে, শস্যে-সঙ্গীতে, সুখে-শান্তিতে যেন ভরে দেয় নতুন বছর তাদের জীবনের ঘরগোলা, এই থাকে তাদের একমাত্র আহ্বান। এ কারণে বৈশাখ ধরা দেয় কবিদের কাছে রুদ্ররূপে। বৈশাখের রুদ্ররূপে তারা বিচলিত নন। বরং বৈশাখের কাল-বৈশাখীর জন্য তারা পথ চেয়ে থাকেন উদগ্রীব হয়ে, যাতে জীর্ণ পাতারা ঝরঝর করে ঝরে পড়ে, নতুন পল্লবে ভরে ওঠে জীবনের ডালপালা, নতুন রঙে, নতুন খুশিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায় বাংলার জনপদ। নজরুল তাই গর্জে ওঠেন তার সন্ধ্যা কাব্যের ‘কাল-বৈশাখী’ কবিতায় তার স্বভাবসিদ্ধ অগ্নিঝরা কণ্ঠে :

বারেবারে যথা কাল-বৈশাখী ব্যর্থ হল রে পুব-হাওয়ায়
দধীচি-হাড়ের বজ্র-বহ্নি বারেবারে যথা নিভিয়া যায়,
কে পাগল সেথা যাস হাঁকি-
“বৈশাখী কাল-বৈশাখী!”
হেথা বৈশাখী-জ্বালা আছে শুধু, নাই বৈশাখী-ঝড় হেথায়
সে জ্বালায় শুধু নিজে পুড়ে মরি, পোড়াতে কারেও পারিনে, হায়।

কবি আক্ষেপ করেন এই বলে, বৈশাখ তার প্রকৃত রুদ্ররূপ ধরে আবির্ভূত হয়নি বলেই সারা দেশ আজও পুরাতন জং ধরা জরাজীর্ণতায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে। তাই তার ক্ষোভ :

কাল-বৈশাখী আসেনি হেথায়, আসিলে মোদের তরু-শিরে
সিন্ধু-শকুন বসিত না আসি’ ভিড় করে আজ নদীতীরে।
জানি না কবে সে আসিবে ঝড়
ধূলায় লুটাবে শত্রুগড়,
আজিও মোদের কাটেনি ক’ শীত, আসেনি ফাগুন বন ঘিরে।
আজিও বলির কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়া উঠেনি মন্দিরে।

জাগেনি রুদ্র, জাগিয়াছে শুধু অন্ধকারের প্রমথ-দল,
ললাট-অগ্নি নিবেছে শিবের ঝরিয়া জটার গঙ্গাজল।
জাগেনি শিবানী- জাগিয়াছে শিবা,
আঁধার সৃষ্টি- আসেনি ক’ দিবা,
এরি মাঝে হায়, কাল-বৈশাখী স্বপ্ন দেখিলে কে তোরা বল।
আসে যদি ঝড়, আসুক, কুলোর বাতাস কে দিবি অগ্রে চল।

রবীন্দ্রনাথও বৈশাখকে অবলোকন করেছেন রুদ্ররূপে। কল্পনা কাব্যের ‘বৈশাখ” কবিতায় বৈশাখকে তার সরাসরি সম্বোধন এ নামেই :

হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ,
ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,
তপ : ক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল
কারে দাও ডাক-
হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ?

জ্বলিতেছে সম্মুখে তোমার
লোলুপ চিতাগ্নিশিখা লেহি লেহি বিরাট অম্বর-
নিখিলের পরিত্যক্ত মৃতস্তুপ বিগত বৎসর
করি ভস্মসার-
চিতা জ্বলে সম্মুখে তোমার।

কবিতার শুরুতে কবি বৈশাখের রুক্ষ রূপ তুলে ধরেছেন। কিন্তু তিনি নজরুলের মতো বৈশাখের বজ্রকঠিন আঘাতের পক্ষপাতী নন। স্রেফ নির্বিঘ্ন শান্তির প্রার্থনায় তিনি মগ্ন :

হে বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ।
উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে-
যাক নদী পার হয়ে, যাক টলি গ্রাম হতে গ্রামে,
পূর্ণ করি মাঠ।
হে বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ।

শান্ত ঋষির মতো বৈশাখের কাছে কবির আবেদন :

দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ
তোমার ফুৎকারক্ষুব্ধ ধুলাসম উড়ুক গগনে,
ভরে দিক নিকুঞ্জের স্খলিত ফুলের গন্ধ-সনে
আকুল আকাশ-
দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ।

ছাড়ো ডাক, হে রুদ্র বৈশাখ!
ভাঙিয়া মধ্যহ্ণতন্দ্রা জাগি উঠি বাহিরিব দ্বারে,
চেয়ে রব প্রাণীশূন্য দগ্ধতৃণ দিগন্তের পারে
নিস্তব্ধ নির্বাক-
হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।

বৈশাখকে নিয়ে প্রচুর গান রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বর্ষবরণের এ গানটি এখন বাঙালির প্রাণের সঙ্গীত :

এসো এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।

যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক।

রবীন্দ্র-নজরুলের পর বাংলা ভাষায় পহেলা বৈশাখকে নিয়ে যারা দীর্ঘতম কবিতা লিখে বিখ্যাত হয়েছেন, তাদের অন্যতম ফররুখ আহমদ। রবীন্দ্রনাথের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে বসে তিনি ‘বৈশাখ’ ও ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’ নামে যে-দুটি কবিতা রচনা করেন তা বৈশাখের কবিতায় নতুন মাত্রা দান করেছে। অনেকটা রবীন্দ্রনাথের আদলে রচিত হলেও ভিন্নতর বার্তা ও আলাদা কণ্ঠস্বর ধারণ করে আছে তার ‘বৈশাখ’ কবিতাটি। বৈশাখকে ফররুখও দেখেছেন রুদ্ররূপে। বৈশাখ তার কাছে মহাশক্তির প্রতীক, যা মহাকল্যাণ সাধনের জন্যেই আবির্ভূত হয়েছে মর্ত্য। শুরুতেই কবি বৈশাখকে সম্বোধন করেছেন এভাবে :

ধ্বংসের নকীব তুমি হে দূর্বার, দুর্ধর্ষ বৈশাখ
সময়ের বালুচরে তোমার কঠোর কণ্ঠে
শুনি আজ অকুণ্ঠিত প্রলয়ের ডাক।

কিন্তু তিনি যখন এরকম করে বলেন :

রোজ হাশরের দগ্ধ তপ্ত তাম্র মাঠ, বন, মৃত্যুপুরী, নিস্তব্ধ নির্বাক;
সূরে ইস্রাফিল কণ্ঠে পদ্মা মেঘনার তীরে
এস তুমি হে দৃপ্ত বৈশাখ।

তখন টের পাওয়া যায় নিজস্ব ঐতিহ্যের ঘরানায় থেকেই অবলোকন করেছেন তিনি বৈশাখকে। তার আহ্বান অনেকটা নজরুলের মতো; বিপ্লবের স্বপ্নে তিনি বিভোর; তার দুচোখ জুড়ে জরাজীর্ণতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার তীব্র কামনা :

এস তুমি সাড়া দিয়ে বিজয়ী বীরের মতো, এস স্বর্ণ শ্যেন,
বাজায়ে নাকাড়া কাড়া এস তুমি দিগি্বজয়ী জুলকারনায়েন,
আচ্ছন্ন আকাশ নীলে ওড়ায়ে বিশাল ঝান্ডা শক্তিমত্ত ও প্রাবল্যে প্রাণের
সকল প্রাকার বাধা চুর্ণ করি মুক্ত কর পৃথিবীতে সরণি প্রাণের,
সকল দীনতা, ক্লেদ লুপ্ত কর, জড়তার চিহ্ন মুছে যাক;
বিজয়ী বীরের মতো নির্ভীক সেনানী তুমি
এস ফিরে হে দৃপ্ত বৈশাখ।

ফররুখ যে-বৈশাখের কল্পনা করেছেন তার সাথে নজরুলের চেয়ে পি বি শেলির বেশি মিল পাওয়া যায়। শেলির ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উয়িন্ড’ জগদ্বিখ্যাত বিপ্লবী কবিতা। শেলি ওয়েস্ট উয়িন্ডকে বিশাল শক্তির প্রতীক বলে মনে করেন; সে যখন পৃথিবীতে আগমন করে, আটলান্টিক মহাসাগর আতঙ্কিত হয়ে তার জন্যে রাস্তা করে দেয়; সে যখন আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে যাত্রা করার প্রস্তুতি নেয় তখন মহাসাগরের তলদেশে যত জলজ উদ্ভিদ আছে তারা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ডালপালার সমস্ত পাতা ঝরিয়ে দেয়; এমনই ভয়ঙ্কর ওয়েস্ট উয়িন্ড। ফররুখ তার ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’ কবিতায় বৈশাখকে তেমনি মহাশক্তিধররূপে চিত্রায়িত করেছেন। ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’ ফররুখের একটি অনন্য সনেট। যেমন এর ছন্দের গাঁথুনি ও নিখুঁত অন্ত্যমিলের ব্যবহার তেমনই এর গুরুগম্ভীর বিষয়বস্তু, যা অসাধারণ চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ হয়ে বাংলা ভাষার একটি অমূল্য শিল্প হয়ে উঠেছে।

বৈশাখের কালো ঘোড়া উঠে এলো। বন্দর, শহর
পার হয়ে সেই ঘোড়া যাবে দূর কোকাফ মুলুকে,
অথবা চলার তালে ছুটে যাবে কেবলি সম্মুখে
প্রচন্ড আঘাতে পায়ে পিষে যাবে অরণ্য, প্রান্তর।
দূর সমুদ্রের বুকে নির্বাসিত যুগ যুগান্তর
শুনেছে ঘরের ডাক দূর দিগন্তের পার থেকে,
বাঁকায়ে বঙ্কিম গ্রীবা বজ্রের আওয়াজে উঠে ডেকে
শূন্যে ওড়ে বুকে নিয়ে সুলেমান নবীর স্বাক্ষর।

শূন্য হতে শূন্য স্তরে-আরো ঊর্ধ্বে পরেনদা তাজীর
পাখার ষাপট শুনে শিহরায় পল্লীপথ, গ্রাম,
শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে আতঙ্কে বিশাল পৃথিবীর;
ভেঙে পড়ে অরণ্যানি। ছেড়ে সুখশয্যার আরাম
অচেনা গতির স্রোতে হয় বন্দী এমন অধীর;
ঝড় বেগে ওড়ে ঘোড়া (জানি না তো সে ঘোড়ার নাম)।

সনেটটির আদ্যোপান্ত পাঠ করলে বুঝা যায় শেলির ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উয়িন্ড’-এর তৃতীয় ভাগের সাথে এর যথেষ্ট মিল রয়েছে। ফররুখ বলেন : ” পরেনদা তাজীর/পাখার ষাপট শুনে শিহরায় পল্লীপথ, গ্রাম,/শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে আতঙ্কে বিশাল পৃথিবীর;/
ভেঙে পড়ে অরণ্যানি।” শেলি বলেন :

‘Thou
For whose path the Atlantic’s level powers
Cleave themselves into chasms, while far below
The sea-blooms and the oozy woods which wear
The sapless foliage of the ocean, know
Thy voice, and suddenly grow grey with fear,
And tremble and despoil themselves.’

ফররুখের কবিতার বিশেষত্ব হলো তিনি কখনও তার ঐতিহ্যের কথা বিস্মৃত হন না; তার সাহিত্যের সর্বত্র তিনি বেখে যেতে চান তার স্বকীয়তার ছাপ, যে কারণে এ সনেটে কবি নির্দ্বিধায় ব্যবহার করেছেন ’সুলেমান নবী’র প্রসঙ্গ, যা পাঠকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে না কখনও।

রবীন্দ্রনাথেরই মতো সমস্ত বাঙালির হৃদয় কেঁদে ওঠে এই দিনে দুঃখক্লিষ্ট মানুষের যন্ত্রণায়। আমরা পান্তা-ইলিশ খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি বটে, কিন্তু জাতির দুঃখ-দুর্দশার কথা ভুলি না, নিপীড়িত মানবতার কথা ভুলি না। নতুন স্বপ্নে জ্বলজ্বল করে ওঠে আমাদেরও দুই চোখ, আমাদেরও হৃদয় নত হয় এই প্রার্থনায় :

মাঠ ঘাট বন
পুড়ছে যখন
অগ্নিখরায়
তাপে

পুড়ছে পৃথিবী
পুড়ছে জীবন
পারমাণবিক
পাপে

যখন মানুষ,
পশু ও পাখির
জীবন ওষ্ঠা-
গত

তখন বোশেখ
এলো পৃথিবীতে
হাতেমতায়ীর
মতো।

বোশেখ এসেছে-
ফুলবৃষ্টিতে
ধুয়ে যাক শোক-
তাপ

কালবৈশাখী
এনেছে সঙ্গে,
উড়ে যাক যত
পাপ।

পহেলা বৈশাখের এই আনন্দঘন দিনে যখন আমরা ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে পারবো, সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে উদ্দীপ্ত হতে পারবো সবাই একসাথে, কেবল তখনই সার্থক হবে আমাদের পান্তা-ইলিশ খাওয়া, রমনার বটমূলে গান গাওয়া আর বৈশাখের কবিতা পাঠ করা।

লেখক : কবি, সাহিত্য সমালোচক

কবি ফররুখ আহমদের কি অপরাধ? / আহমদ ছফা

u1_as

খবর পেয়েছি বিনা চিকিত্সায় কবি ফররুখ আহমদের মেয়ে মারা গেছে। এই প্রতিভাধর কবি যাঁর দানে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে—পয়সার অভাবে তাঁর মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে পারেননি, ওষুধ কিনতে পারেননি। কবি এখন বেকার। তাঁর মৃত মেয়ের জামাই, যিনি এখন কবির সঙ্গে থাকছেন বলে খবর পেয়েছি তাঁরও চাকুরি নেই। মেয়ে তো মারাই গেছে। যারা বেঁচে আছেন, কি অভাবে, কোন অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিনগুলো অতিবাহিত করছেন, সে খবর আমরা কেউ রাখিনি।

হয়ত একদিন সংবাদ পাব কবি মারা গেছেন, অথবা আত্মহত্যা করেছেন। খবরটা শোনার পর আমাদের কবিতাপ্রেমিক মানুষের কি প্রতিক্রিয়া হবে? ফররুখ আহমদের মৃত্যু সংবাদে আমরা কি খুশি হব, নাকি ব্যথিত হব? হয়ত ব্যথিতই হব এ কারণে যে, আজকের সমগ্র বাংলা-সাহিত্যে ফররুখ আহমদের মত একজনও শক্তিশালী স্রষ্টা নেই। এমন একজন স্রষ্টাকে অনাহারে রেখে তিলে তিলে মরতে বাধ্য করেছি আমরা। ভবিষ্যত্ বংশধর আমাদের ক্ষমা করবে না, অথচ কবি ফররুখ আহমদের মরার সমস্ত ব্যবস্থা আমরাই পাকাপোক্ত করে ফেলেছি। আমরা তাঁর চাকুরি কেড়ে নিয়েছি, তাঁর জামাই এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের সত্ভাবে পরিশ্রম করে বাঁচবার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছি। রাস্তা-ঘাটে কবির বেরোবার পথ বন্ধ করে দিয়েছি। প্রয়োজনীয় সবগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আমরা ত্রুটি রাখিনি।

কবি ফররুখ আহমদকে আমরা এতসব লাঞ্ছনার মধ্যে ফেলেছি তার কারণ তো একমাত্র কবিতাই। ফররুখ আহমদের একমাত্র অপরাধ তিনি একদা পাকিস্তানের সপক্ষে কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতার একটি বিশেষ জীবনাদর্শ দুষ্টলোকের ভাষায় ইসলামি জীবনাদর্শ। এখন কথা হল, তখন কি পাকিস্তানের সপক্ষে কবিতা লেখা অপরাধ ছিল? আমরা যতটুকু জানি পাকিস্তান এবং ইসলাম নিয়ে আজকের বাংলাদেশে লেখেননি এমন কোন কবি-সাহিত্যিক নেই বললেই চলে। অন্য অনেককে বাদ দিয়েও কবি সুফিয়া কামালের পাকিস্তান এবং জিন্নাহর ওপর নানা সমযে লেখা কবিতাগুলো জড়ো করে প্রকাশ করলে ‘সঞ্চয়িতা’র মত একখানা গ্রন্থ দাঁড়াবে বলেই আমাদের ধারণা। অথচ ভাগ্যের কি পরিহাস কবি সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হয়ে মস্কো-ভারত ইত্যাদি দেশ সফর করে বেড়াচ্ছেন, আর ফররুখ আহমদ রুদ্ধদ্বার কক্ষে বসে অপমানের লাঞ্ছনায় মৃত্যুর দিন গুনছেন।

ফররুখ আহমদের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করে বাংলাভাষার সতীত্ব হানি করেছেন। কিন্তু কবি ফররুখ আহমদ নিজে বলেছেন, তিনি শব্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, কবিতার ক্ষেত্রে তা নিশ্চয়ই দোষনীয় নয়। বিশেষত বাংলাদশে এমন একটা সময় ছিল, কবি-সাহিত্যিকেরা উর্দু, ফারসি ঘেঁষা দেখাতে পারলে বর্তে যেতেন। তাদের অনেকেই এখন বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন রয়েছেন। তাছাড়া ইংরেজি, জার্মান, সংস্কৃত ইত্যাদি ভাষা নিয়ে যাঁরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কবিতা, গল্প লিখতে চেষ্টা করেছেন, তাঁদেরকে সে সকল রচনার জন্য পুরস্কৃত করতেও আমাদের বাধছে না। ও সমস্তের ফলে যে বাংলাভাষা সমৃদ্ধ হচ্ছে সত্যিকার অর্থে সে বিচার কে করবে? অথচ অন্য কবি-সাহিত্যিক সকলে বাইরে রয়েছেন। কিন্তু শাস্তি ভোগ করছেন একা ফররুখ আহমদ—এ কেমন ধারা বিচার? ফররুখ আহমদের বিরুদ্ধে যে দু’টি উল্লেখযোগ্য নালিশ রয়েছে, সেগুলো হল—তিনি রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে চল্লিশজন স্বাক্ষরকারীর একজন। তিনি স্বশ্রদ্ধভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছেন।

কিন্তু স্বাক্ষরদানকারী চল্লিশজনের অনেকেই তো এখনো বাংলাদেশ সরকারের বড় বড় পদগুলো অলংকৃত করে রয়েছেন। কিন্তু ফররুখ আহমদকে একা কেন শাস্তি ভোগ করতে হবে? পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন না কে? আজকের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী (শেখ মুজিব) স্বয়ং তো এক সময়ে পাকিস্তান আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। সাতই মার্চের পূর্ব পর্যন্ত তিনি পাশাপাশি জয়-বাংলা এবং জয়-পাকিস্তান শব্দ দু’টো উচ্চারণ করেছিলেন, তাহলে ফররুখ আহমদের অপরাধটা কোথায়? বলা হয়ে থাকে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে তিনি অনেকবেশি সাম্প্রদায়িক বিষোদগার করেছিলেন। সেপ্টেম্বরের যুদ্ধের সমস্ত প্রমাণ এখনো নষ্ট হয়ে যায়নি।

বাংলাদেশের সমস্ত লেখক-কবি-সাহিত্যিক সাম্প্রদায়িকতার প্রচাওে কে কার চাইতে বেশি যেতে পারেন সে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। কেউ যদি চ্যালেঞ্জ করেন আমরা দেখিয়ে দিতে পারি। মানুষের স্মৃতি এত দুর্বল নয় যে, হিং টিং ছট ইত্যাদি প্রোগামগুলো ভুলে গেছে। ঐ সমস্ত প্রোগ্রাম যারা করেছে সংস্কৃতির সে সকল কলমধারী গুন্ডারা বাংলাদেশে বুক চিতিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতির আসন দখল করে আছে—কি আশ্চর্য। চাকুরি হারাবেন, না-খেতে পেয়ে মারা যাবেন এক ফররুখ আহমদ।

এতসব দোষের মধ্যেও ফররুখ আহমদের কতিপয় গুণের কথা আমরা না-উল্লেখ করে পারছিনে। সেপ্টেম্বর যুদ্ধের পরে কবি ফররুখ আহমদকে যখন প্রাইড অব পারফরমেন্স দেয়ার কথা ওঠে, তিনি অস্বীকার করেছিলেন। আমরা শুনেছিলম, তিনি বলেছিলেন, একজন কবির ক্ষমতাদর্পীর হাত থেকে নেয়ার কিছুই নেই। খবর পেয়েছিলাম, সে প্রাইড অব পারফরমেন্স এমন একজন সাহিত্যসেবীকে দেয়া হয়েছিল এখন যত্রতত্র তাঁর শোকসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি দলের সকলে তাঁর কথা মনে করে শোকাশ্রু বর্ষণ করছেন।

মজার কথা হল, তিনিও দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা বাধ্য হয়ে পাকিস্তানের সপক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। যাকে নিয়ে এত লাফালাফি তিনি যদি বেঁচে থাকতেন আজ হয়ত কারাগারেই থাকতেন। আমাদের কথা হল, ফররুখ আহমদের মত একজন শক্তিমান স্রষ্টার চাকুরি কেড়ে নেয়া, সপরিবারে তাঁকে মৃত্যু-যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করার পেছনে ন্যায়-নীতিসঙ্গত যুক্তিটা কি হতে পারে?

আমরা বাংলাদেশের আরো একজন খ্যাতনামা কবির কথা জানি (কবি শামসুর রাহমান)। যিনি পাকিস্তানি দখলদার সৈন্যদের তত্ত্বাবধানে সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিকটির (দৈনিক পাকিস্তান) সম্পাদকীয় রচনা করেছিলেন। ঐ পত্রিকার চাকুরি করেন আর একজন কবি সম্পর্কে কানা-ঘুষা শোনা যাচ্ছে যে, তিনি পাকিস্তানি মেজর ক্যাপটেনদের সাহায্যে নাম ভাঙ্গিয়ে লাহোর করাচি ছুটোছুটি করেছেন। কেউ যদি আমাদের বক্তব্যকে অসত্য মনে করেন, বাস্তব প্রমাণ দাখিল করতে পারব।

কত মুসলিম লীগ এবং জামাতে ইসলামের গুন্ডা, এনএসএফ-এর চর সরকারি আনুকূল্যে পুনর্বহাল হয়েছে, তাদের সংখ্যা হাজারকে হাজার। একজন দুজন নয়।

কিন্তু শাস্তিভোগ করবেন একজন আত্মমর্যাদাজ্ঞানসম্পন্ন কবি। এ ধরনের অবিচার আমাদের এ বাংলাদেশেই হওয়া সম্ভব। প্রসঙ্গত ভূতপূর্ব পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকার কুখ্যাত বার্তা-সম্পাদক এবিএম মুসার নাম বলতে পারি। এই মুসা সাহেব মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কোলকাতায় যেয়ে হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডে আওয়ামী লীগারদের বিরুদ্ধে যে বিষোদগার করেছিলেন, দেশপ্রেমিক নাগরিকদের মন থেকে সে স্মৃতি এত তাড়াতাড়ি মুছে যায়নি। মুছে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দেশপ্রেমিক সম্মানটি দিতেও রাজি ছিলেন না।

হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডে তাকেও রেবেল বলে অবহিত করেছিলেন। সেই মুসা সাহেব এখন বাংলাদেশের সংসদ-সদস্য (আওয়ামী লীগের)। ফররুখ আহমদের অপরাধ শেষ পর্যন্ত এই দাঁড়ায় যে, তিনি অন্যান্য বিশ্বাসঘাতকদের মত শ্লোগান বদল করতে পারেননি। সৎ কবিরা অনেক সময় ধরতাই বুলিতে গা ঢেলে দিতে পারেন না। সেটাই তাদের একমাত্র অপরাধ। কবি ফররুখ আহমদও এই একই অপরাধে অপরাধী।

অন্যান্য কবি-সাহিত্যিক যাদের কোন রকমের আদর্শবোধ নেই, চরিত্র নেই, সুবিধেটাই নীতি। আমরা জানি, তারা আজ ফররুখ আহমদের নামে দুটো সমবেদনার কথা কইতে কুণ্ঠাবোধ করেন। তারপরেও আমরা মনে করি ফররুখ আহমদ একজন বীরচরিত্রের পুরুষ। একজন শক্তিমন্ত কবি। ফররুখ আহমদের রুটি রোজগারের পথ খুলে দিতে আবদন করার কোন সার্থকতা নেই। কেননা, এবিএম মুসা সাহেবের মত মানুষেরা এই সরকারের সংসদ-সদস্য, হি টিং ছটের কলমধারী গুন্ডারা এই সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণাদাতা। তাদের যদি বিবেক থাকত, যদি সাহিত্যে এবং সাহিত্যিকদের প্রতি প্রেম থাকত কবি ফররুখ আহমদের মেয়ে বিনা চিকিত্সায় মারা যেত না। কবিকে বৃদ্ধ বয়সে উপোস করতে হত না। আমরা ফররুখ আহমদকে বাঁচাবার জন্য, তার পরিবারকে বাঁচাবার জন্য ‘ফররুখ আহমদ সাহায্য তহবিল’ গঠন করার জন্য কবির অনুরাগীজন এবং দেশপ্রেমিক, সংস্কৃতিপ্রেমিক জনগণের কাছে আবেদন রাখছি।” –গণকণ্ঠ, ১৬ জুন, ১৯৭৩

সীমান্ত হত্যাঃ রাষ্ট্রের দায় / মাহমুদুর রহমান

[ দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান 25/০২/17 তারিখে একটি সেমিনারে এই লেখাটি মূল প্রবন্ধ হিসাবে পাঠ করার কথা ছিল। পুলিশ সেমনারটিতে বাঁধা দিয়েছে। পিপলস মুভমেন্ট ফর ডেমক্রেসি নামে একটি সংগঠনে সেমিনারটি আয়োজন করেছিল ঢাকায়। সীমান্তে হত্যা ছিল সেমিনারের মূল বিষয়বস্ত। মজলুম সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মূল বক্তব্যটি যা সেমিনারে পাঠ করার কথা ছিল এখানে হুবহু উপস্থাপন করা হল। ]

প্রেক্ষাপট
ভারত এবং মিয়ানমার বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তি ভারতের সঙ্গেই বাংলােেদশের প্রধান সীমান্ত যার দৈর্ঘ ৪০০০ কিলোমিটারের অধিক। এর মধ্যে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয় এবং পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের যথাক্রমে ২৬২, ৮৫৬, ১৮০, ৪৪৩ এবং ২২১৭ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যবর্তী সীমান্তের দৈর্ঘ বিশ্বে পঞ্চম দীর্ঘতম। অপরদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত আছে। দুই দেশের মধ্যকার স্থলসীমান্তের দৈর্ঘ ২০৮ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ৬৪ কিলোমিটার সীমান্ত নাফ নদী বরাবর দুই দেশকে পৃথক করেছে।

সীমান্তে পাহারা দেয়ার কাজে বাংলাদেশের যে বাহিনী দায়িত্বপ্রাপ্ত তাকে সাম্প্রতিক সময়ে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি) নামকরণ করা হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই বাহিনীর নাম ছিল বাংলাদেশ রাইফেলস্ যা বিডিআর নামেই অধিক পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বিডিআর গৌরবজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক নাম বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলবর্তী নাগরিকবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় বিএসএফ এর আগ্রাসনের নির্মম শিকার হয়ে নিপীড়িত হচ্ছে। বিএসএফ আমাদের সীমান্ত অঞ্চলে গড়ে প্রতি সপ্তাহে একাধিক বাংলাদেশী নাগরিককে গুলি অথবা নির্যাতন করে হত্যায় রীতিমতো অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার নাগরিককে সুরক্ষা দিতে অব্যাহত ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। বিএসএফ এবং বিজিবির মধ্যে নিয়মিত পতাকা বৈঠক, শীর্ষ বৈঠক ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশী নাগরিক হত্যায় কোন বিরাম নেই। এই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরা একই সঙ্গে আতংকিত হই এবং অপমানিত বোধ করি যখন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেই বাংলাদেশী হত্যার পক্ষে এক ধরনের ন্যায্যতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতি রাষ্ট্রের এই দূর্বল অবস্থান মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তেও আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক নাগরিক মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে গুলিতে নিহত হয়েছেন। কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে এ নিয়েও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, বর্ডার গার্ড ফোর্সেস, সে দেশের প্যারা-মিলিশিয়া নাসাকা এবং বাংলাদেশের বিজিবিও এই ঘটনায় অভিযুক্তের তালিকায় আছে। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্কের টানাপোড়েন চললেও, গুলি করে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সীমান্তে সংঘটিত অব্যাহত বাংলাদেশী হত্যাকান্ডের প্রেক্ষিতে সঙ্গত কারনেই প্রশ্ন উঠবে যে, আমাদের বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থা কী তাহলে নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদানে সমর্থ হচ্ছে না? যদি রাষ্ট্রের দায় কিংবা ব্যর্থতা প্রমানিত হয়, সে ক্ষেত্রে নাগরিকের দায়িত্ব কি? আমরা কি অসহায়ত্ব মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করবো, নাকি রাষ্ট্রকে নতুন করে নির্মাণের আন্দোলন করবো?

রাষ্ট্র ও তার দায়:
বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা সম্পর্কে বিশদ আলোচনার আগে রাষ্ট্র গঠন ও তার দায়-দায়িত্ব নিয়ে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। রাষ্ট্র গঠন সম্পর্কে সেই গ্রীক সভ্যতার কাল থেকে অদ্যাবধি বিভিন্ন মনীষি নানারকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন, বিচার বিশ্লেষন করেছেন। আমি এই প্রবন্ধে কেবল Social Contract Theory বা সামাজিক চুক্তি তত্বের মধ্যে আলোচনা সীমিত রাখব। এই চুক্তি অনুযায়ী, Individuals or citizens have consented, either explicitly or tacitly, to surrender some of their freedoms and submit to the authority, in exchange for protection of their remaining rights. (ব্যক্তি অথবা নাগরিক হয় আনুষ্ঠানিকভাবে কিংবা ইঙ্গিতে তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা রাষ্ট্রের কাছে গচ্ছিত রাখতে সম্মত হয়েছে তাদের অন্যান্য অধিকারের সুরক্ষার বিনিময়ে)।
প্রাচীনকাল থেকেই এই তত্ত্ব সুপ্রচলিত হলেও ফরাসী মনীষি রুশো ((Jean Jacques Rousseau) ১৭৬২ সালে তার লিখিত বইতে সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের আধুনিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং সামাজিক চুক্তি অথবা Social Contract কথাটি ব্যবহার করেন। রুশোর আগে এবং পরে অন্যান্য রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশেষত টমাস হবস (১৬৫১), জন লক (১৬৮৯) এবং ইমানুয়েল কান্ট (১৭৯৭) রাষ্ট্র্রের এই সামাজিক তত্ত্বের সমর্থক এবং প্রচারক।

আমরা যে সকল মৌলিক অধিকার সুরক্ষার বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছে ব্যক্তি স্বাধীনতা গচ্ছিত রাখি তার মধ্যে প্রাণের সুরক্ষা (the right to life) এবং নির্যাতন থেকে সুরক্ষা (freedom from torture) অন্যতম। প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী যখন আমাদের নাগরিকদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করে এবং তাদের হত্যা করে তখন সেই সকল নাগরিকদের প্রধান মৌলিক অধিকার হরণ করা হয় এবং রাষ্ট্র যদি সেই নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে রাষ্ট্রগঠনের নৈতিক ও আইনগত উভয় ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। কেবল বায়বীয় চেতনা দিয়ে সেই রাষ্ট্রকে আর রক্ষা করা সম্ভব হয় না। দূর্ভাগ্যের বিষয় হলো ফ্যাসিবাদী শাসন কবলিত বাংলাদেশে কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনীই নয়, রাষ্ট্রের নিজস্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও প্রতিদিন নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণ করে চলেছে। পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন, বিচার বহির্ভূত হত্যা, এবং গুম এমনভাবে এ দেশে বিস্তার লাভ করেছে যে এ সকল ঘটনা আজ আর সংবাদ-মাধ্যমেও প্রকাশিত হওয়ার মত গুরুত্ব পায় না। বাংলাদেশের নাগরিক আজ অভ্যন্তরীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বহি:শত্রু উভয় দিক থেকে ভয়াবহ নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার। এ দেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন ইস্যুতে সুয়ো মোটো রুল জারি করলেও নাগরিকের প্রধান দুই মৌলিক অধিকার, , the right to life Ges freedom from torture রক্ষার বিষয়ে দৃশ্যত: নিস্পৃহ থাকছেন। সব মিলে রাষ্ট্রের দায় বৃদ্ধি পেতে পেতে হিমালয় সমান হয়ে উঠেছে।
আমাদের স্মরনে রাখা উচিৎ যে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তারিখে মুজিবনগর থেকে যে proclamation of Independence জারি করা হয়েছিল সেখানে স্বাধীনতা ঘোষনার ন্যায্যতা দিতে নিরস্ত্র বাংলাদেশী জনগণের উপর পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যা এবং নির্যাতনের উল্লেখ ছিল। আমি Proclamation of Independence থেকে প্রাসঙ্গিক অংশটি উদ্ধৃত করছিঃ

“Whereas in the conduct of a ruthless and savage war the Pakistani authorities committed and are still continuously committing numerous acts of genocide and unprecedented tortures, amongst others on the civilian and unarmed people of Bangladesh.”

কিশোরী ফেলানীসহ যে হাজার হাজার অসহায় বাংলাদেশীদের ভারতীয় বিএসএফ হত্যা করেছে তারাও কী নিরস্ত্র এবং বেসামরিক ব্যক্তি নন? স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ সেই সব দরিদ্র, অসহায় নাগরিকদের সুরক্ষায় কোন কার্যকর ব্যবস্থা কী গ্রহন করেছে? ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা, আমাদের শাসক গোষ্ঠীর কন্ঠে কোন প্রতিবাদ ধ্বনিও আমরা শুনতে পাইনা।

ভারত- বাংলাদেশ সীমান্ত:
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণির অভিমত অনুসারে ভারত বাংলাদেশের সর্বোত্তম বন্ধুরাষ্ট্র। সরকারের মন্ত্রীরা বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারত এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে সহযোগীতা করেছে তার ঋণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরেও আমরা পরিশোধ করে উঠতে পারব না। সেই কারণেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে বিনা শুল্কে ভারতকে করিডোর ব্যবহার করতে দিতে হবে। সেই করিডোরে প্রয়োজনীয় রাস্তা ও রেল অবকাঠামো আমরা বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে নির্মান করবো। ঋণের বোঝাও অবশ্যই বাংলাদেশের জনগনের ঘাড়েই চাপবে। এতদসত্ত্বেও করিডোর ব্যবহারের জন্য শুল্ক চাওয়া আমাদের জন্যে নাকি ‘অসভ্যতা’ বলে পরিগণিত হবে। এই তোষণ-নীতির বিনিময়ে জনগণের ভাগ্যে অশ্বডিম্ব জুটলেও ক্ষমতাসীনদের পক্ষে দিল্লির সমর্থনে বিনা নির্বাচনে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে রাখা জায়েয করা হবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অপমৃত্যুতে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী পশ্চিমা শক্তি অস্বত্ত্বি বোধ করলে সেই অস্বত্ত্বি নিরসনের ব্যবস্থাও দিল্লিই করে দেবে। এমন বন্ধু খুঁজে পাওয়া প্রকৃতই কঠিন!

বিস্ময়ের ব্যপার হলো ভারত এ দেশে ক্ষমতাসীন মহলের সর্বোত্তম বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও ভারতের অন্য কোন সীমান্তেই বাংলাদেশীদের মতো এতো মানুষ হত্যা হয় না। পাকিস্তান ভারতের চিরশত্রু রাষ্ট্র রূপে বিবেচিত। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে প্রতিদিন গোলাগুলি চলছে, একে অপরের প্রতি কামান দাগছে দুই বৈরী দেশের সেনাবাহিনী। অথচ সীমান্তে নিহতের সংখ্যা বাংলাদেশীদের তুলনায় এক তৃতীয়াংশেরও নীচে। যে সকল পাকিস্তানী নাগরিক ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোলাগুলিতে নিহত হচ্ছে তাদের মধ্যে নব্বই শতাংশই আবার সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য। বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা সেখানে নগন্য। তাছাড়া ওই সীমান্তে ইটের বদলে পাটকেল চলছে। অর্থাৎ ভারতীয় পক্ষে নিহতের সংখ্যা পাকিস্তানীদের তুলনায় কম তো নয়ই বরঞ্চ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশি। অথচ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিহতদের প্রায় সকলেই বাংলাদেশের বেসামরিক, নিরস্ত্র নাগরিক। বিএসএফ যেন বাংলাদেশীদের হত্যা করে সৈনিকদের হাতের নিশানা পাকা করছে।

চীনের সঙ্গেও বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ভারতের দীর্ঘকালের বৈরিতা রয়েছে। বিশেষত: দুই দেশের সীমান্ত সীমা নির্দেশক ম্যাকমোহন লাইনকে চীন কখনই মেনে নেয়নি। তারা ভারতের অরণাচল প্রদেশের একটি অংশকে নিজেদের বলে দাবী করে। ১৯১৪ সালে বৃটিশ ঔপনিবেশিক সরকার এবং তিব্বতের মধ্যে সম্পাদিত এক চুক্তির প্রেক্ষিতে বিরোধপূর্ন অংশটি ভারতভূক্ত হয়। অরুণাচল রাজ্যের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে ১৯৬২ সালে ভারত এবং চীনের মধ্যে এক দফা যুদ্ধও হয়ে গেছে। সেই যুদ্ধে ভারতের অমর্যাদাকর পরাজয় হয়েছিল। এমন বিরোধপূর্ন সীমান্তেও কোন চীনা বেসামরিক নাগরিককে গুলি করে হত্যা করার কথা কল্পনা করতেও সম্ভবত: বিএসএফ সক্ষম হবে না। কারণ তারা জানে এমন হঠকারী ঘটনার পরিনাম ভারতের জন্য আদৌ সুখকর হবে না।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত বছর সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, গত দশ বছরে বিএসএফ ৫৯১ জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে। তিনি সংসদে আশ্বাস দিয়ে তখন বলেছিলেন বিএসএফ প্রধান নাকি হত্যাকান্ডকে শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি তাকে দিয়েছেন। অথচ বাংলাদেশের অন্যতম মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী কেবল ২০১৬ সালেই বিএসএফ ৩১ জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে। বাংলাদেশের অপর মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের জানুয়ারী, ২০১৭ এর প্রতিবেদনে বিএসএফ কর্তৃক দুই জন বাংলাদেশী হত্যা, ৩ জন আহত, ৫ জনকে অপহরণের পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। এই ফেব্রুয়ারী মাসেও বিএসএফ এর হত্যাকান্ড অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে দেয়া বিএসএফ প্রধানের প্রতিশ্রুতি শূন্যেই ভাসমান থেকে গেছে। সেটি বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ ভারতীয় পক্ষ কখনই গ্রহন করেনি। যে বিএসএফ প্রকাশ্যে দাবী করে যে, বাংলাদেশীরা অপরাধী এবং সেই কারনেই গুলি করে মারা হয়, তাদের প্রতিশ্রুতিতে একমাত্র দিল্লির দালাল শ্রেণির ব্যক্তিরাই আস্থা স্থাপন করতে পারে। নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া মহাদেশের নির্বাহী পরিচালক ব্র্যাড এডামস মন্তব্য করেছেন, “Routinely shooting poor, unarmed villagers is not how the world’s largest democracy should behave.
(নিয়মিতভাবে দরিদ্র, নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা বিশ্বে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না)।

এ দেশের নাগরিকদের জন্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণির দিল্লির লেজুর বৃত্তি। সীমান্ত হত্যা বিষয়ে বিজিবি- বিএসএফ এর মধ্যকার যে কোন শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের পরই অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে নিহতদের দায়ী করার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। সকল বিএসএফ প্রধান সরাসরি বলেন যে নিহতরা সব ক্রিমিনাল। গত সপ্তাহে ঢাকায় শীর্ষ বৈঠকে বিএসএফ প্রধান দাবী করেছেন যে এখন বিএসএফ সদস্যরাই নাকি সীমান্তে সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। তার এই উদ্ভট দাবীর পেছনে কোন তথ্য-প্রমান অবশ্য তিনি হাজির করেননি। অপরদিকে বিজিবি প্রধানরা খানিকটা রাখ-ঢাক করার পর প্রকারান্তরে বাংলাদেশেীদের ওপরই দায় চাপান। তারা গরু চোরাচালানের তত্ব দিয়ে বিএসএফকে দায়মুক্তি দিতে চান। অথচ সকল তথ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে বিগত এক দশক ধরে গরু চোরাচালান লক্ষনীয়ভাবে হ্রাস পেলেও নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যা একই ধারায় চলছে।

বিএসএফ এর নির্বিচার হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে পশ্চিম বঙ্গের বিবেক সম্পন্ন নাগরিক এবং মানবাধিকার সংগঠন সমূহ সোচ্চার হয়েছেন। বহুল আলেচিত কিশোরী ফেলানীকে হত্যার অভিযোগ থেকে বিএসএফ জওয়ান অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয়া হলে পশ্চিম বঙ্গের সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম)’র প্রধান কিরীটি রায় বিবিসিকে বলেছিলেন ফেলানীর পরিবারের উচিৎ ভারতের সুপ্রীম কোর্টে বিচার চাওয়া। ‘মাসুম’ এর ভাষ্যমতে কিরীটি রায় এবং অপর আর একজন মানবাধিকার কর্মী (সিকিম আদালতের সাবেক বিচারপতি মলয় সেনগুপ্ত) ফেলানি হত্যা মামলা চলাকালীন তার পরিবারকে সহায়তার উপায় খুঁজতে বাংলাদেশে আসার জন্যে কলকাতার বাংলাদেশ উপ-দূতাবাস থেকে ভিসা পাননি। কিরীটি রায় অভিযোগ করেছেন, এক সপ্তাহে ছয় দফায় তিনি উপ-দূতাবাসে ভিসার জন্য গিয়েছেন। প্রতিবার তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। একটি রাষ্ট্র যখন এমন লজ্জাজনক নতজানু পররাষ্ট্র নীতি গ্রহন করে তখন সেই রাষ্ট্রের নাগরিকরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন সেটাই প্রত্যাশিত।

২০১০ সালে নিউইয়র্ক ভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশীদের নির্বিচারে হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের ওপর যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তার শিরোনাম ছিল “Trigger Happy.” সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশী নাগরিক মতিউর রহমানকে ভয়ংকরভাবে নির্যাতনের কাহিনী বর্নিত হয়েছে। আমি প্রতিবেদন থেকে উদ্বৃত করছি,
‘They blind folded me and took me to the BSF camp. I thought that BSF were going to kill me. After reaching the camp, the BSF personal removed the blindfold and tied me to a tree.— I was beaten severely with a bamboo stick on my back and feet by the same soldier who brought me the food. I was kicked several times and as a result started bleeding from my penis. Another soldier started beating me on my head with a bamboo stick. This went for at least 45 minutes. The BSF men jumped on my chest, and kicked me on my head and face with their boots.’

হাবিবুর রহমান নামের অপর এক দরিদ্র, নিরস্ত্র, অসহায় বাংলাদেশীকে ধরে নিয়ে বিএসএফ এর ১০৫ নম্বর ব্যটালিয়নের সৈনিকেরা বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে। নির্যাতন চলাকালে সৈনিকেরা নিজেদের মধ্যে আনন্দ-ফূর্তি করছিল। এই নির্যাতনের ছবি ওই ব্যাটালিয়নেরই অপর এক সৈনিক ইউটিউবে পোষ্ট করলে বাংলাদেশের জনগনের মধ্যে ব্যপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কিন্তু, বাংলাদেশের সরকার নির্বিকারই থাকে। এ দেশের বর্তমান সরকার ভারতকে যতই বাংলাদেশের জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু রূপে প্রচার করুক না কেন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিরীহ, নিরস্ত্র, বাংলাদেশী গ্রামীন জনগণের রক্তের বহমান নদী প্রতিনিয়ত সেই বন্ধুত্বের মুখোস উম্মেচিত করছে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত:
বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ নাগরিকদের নিপীড়ন প্রধান অন্তরায়। বিশ্ব শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত অং সাং সূচির দেশ মিয়ানমার যে নির্মমতার সঙ্গে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে সেটি অং সাং সূচির জন্য অবমাননাকর এবং তার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বৌদ্ধ ধর্মের অহিংসা নীতির সঙ্গেও মিয়ানমারে মুসলিম নিধন সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ার ফলে নিরাশ্রয় রোহিঙ্গা মুসলিম নারী, পুরুষ, শিশু নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বিপুল সংখ্যায় এই দেশে ছুটে আসছে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ন রাষ্ট্র। তার ওপর উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার ফলে আমাদের সাধ্য সীমিত। এমতাবস্থায় লাখ লাখ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সাধ্যাতীত। এই মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলার জন্য সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল। দূর্ভাগ্যবশত: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পর্যন্ত শুধু উদ্বেগ জানানোর মধ্যেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কিছু দিন আগে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফর করে গেলেও জাতিসংঘের তরফ থেকে এ পর্যন্ত তেমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। মিয়ানমারে পরিস্কারভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযান চললেও অজ্ঞাত কারনে কফি আনান তার সফর কালে সেই কথা স্বীকার করেননি। মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সংগঠন ওআইসি জন্মাবধি অভ্যন্তরীন দূর্বলতা এবং কোন্দলে বিপর্যস্ত। সংগঠনটি বিশ্বে কোথাও মুসলমানদের বিপর্যয়ে কোন ইতিবাচক ভূমিকা আজ পর্যন্ত রাখতে পারেনি। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও তাদের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পেয়েছি।

উপরোক্ত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কর্তব্য কী? রোহিঙ্গারা অবশ্যই মিয়ানমারের নাগরিক। ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি বাংলাদেশের কোন দায়িত্ব থাকার কথা নয়। কিন্তু, পাশ্ববর্তী দেশের নির্যাতনের শিকার হয়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী আশ্রয়ের সন্ধানে এদেশে এলে তাদেরকে অবধারিত মৃত্যু ও জুলুমের দিকে ঠেলে দেওয়া অমানবিক। তদুপরি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির সংঙ্গে আমরা ধর্মীয় বন্ধনে আবদ্ধ। সুতরাং বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী হত্যা, ধর্ষনসহ নানাবিধ জুলুমের শিকার রোহিঙ্গাদের এদেশে প্রবেশে বাধা দেওয়ার যে নীতি গ্রহন করেছে তার সঙ্গে কোন বিবেকবান মানুষ সহমত পোষণ করতে পারে না। বাংলাদেশে অবস্থানরত জাতিসংঘের কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক (John Mckissik) রোহিঙ্গাদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বিবিসিকে বলেছেন, ‘Soldiers are killing men, slaughtering children, raping women.’

একই পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালে আমরা ভারতে আশ্রয় গ্রহন করেছিলাম এবং সেদেশে আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আজ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে দেয়া হলে জালিমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের নৈতিক অবস্থান দূর্বল হয়ে পড়বে। বিশ্বের অন্যত্র যে কোন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর জুলুম হলে আমাদের নিপীড়িত মানবতাকে সমর্থন করাই কর্তব্য। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও আমরা অভিন্ন আদর্শিক অবস্থান ধরে রাখতে চাই। কক্সবাজার অঞ্চলের সাধারণ বাংলাদেশী নাগরিক তাদের সাধ্যমতো রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের সহায়তা দিচ্ছেন। অত্যাচারিত, আহত, রুগ্ন নারী-পুরুষ-শিশুর জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে চিকিৎসার দাযিত্ব গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের কর্তব্য এই সমস্ত ব্যক্তি উদ্যোগকে যথাসম্ভব সহায়তা প্রদান করা। দূর্ভাগ্যবশত:এই সমস্ত উদ্যোগকে সহায়তার পরিবর্তে বাধাগ্রস্ত করার উদ্বেগজনক সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই এই সমস্ত সংবাদ তথ্যভিত্তিক নয়। এর আগে মিয়ানমারের পুলিশ কর্তৃক একজন বাংলাদেশী নিহত হলে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমার দূতাবাসে কুটনৈতিক নোট পাঠিয়ে তার প্রতিবাদ করেছিল। বিএসএফ এর হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোন প্রতিবাদ জানানোর মতো সাহস সঞ্চয় করতে না পারলেও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে সেই সাহসটুক দেখানোয় দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী মাত্রই উৎসাহিত বোধ করবেন। রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধে এবং শরনার্থীদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে পূনর্বাসন করতে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারের কাছে আহবান জানাতে পারে।

লক্ষ্য করার বিষয় যে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের বাংলাদেশে সাময়িক আশ্রয় প্রদানের বিষয়ে ভারত সরকার এবং তাবেদার সুশীল সমাজের আপত্তি রয়েছে। দিল্লিভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (অঈঐজ) রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার নীতির সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির পরিচালক পরিতোষ চাকমা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবস্থানের জন্য তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আশ্চর্য্যের ব্যাপার হলো, পরিতোষ চাকমা ভুলে গেছেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহীরা সত্তরের দশক থেকে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে ভারতে শুধু অবস্থানই করেনি, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সহায়তা ক্রমে চাকমা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ চালিয়ে এ দেশের হাজার হাজার বাঙালী ও পাহাড়ীকে হত্যা করেছে। তাদের বাড়ি-ঘড় জ্বালিয়ে দিয়েছে, সম্পত্তি লুট করেছে। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরাও আছেন। অথচ পরিতোষ চাকমা আজ দাবী জানাচ্ছেন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া চলবে না। দিল্লি থেকে এই প্রকার চাপের ফলেই হয়তো বাংলাদেশ সরকার নিরাশ্রয় রোহিঙ্গাদের অমানবিকভাবে পুশ ব্যাকের নীতি গ্রহণ করেছে। আমাদের অবস্থান পরিস্কার করে বলা উচিৎ নিপীড়িতকে আশ্রয় প্রদান মানবিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কোন চাপের মুখেই আমরা অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না।

উপসংহার:
রাষ্ট্রের কাঠামো উদ্ভাবনের মধ্যেই রাষ্ট্রচিন্তকরা নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষাকে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব রূপে চিহিৃত করেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঘরে এবং বাইরে নাগরিক তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশী নাগরিক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর নির্যাতন ও হত্যার শিকারে পরিণত হচ্ছে। দেশের ভেতরেও পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং গুম এদেশকে ক্রমেই অরওয়েলিয়ান রাষ্ট্রে পরিণত করছে। বাংলাদেশের নাগরিকের প্রাণের অধিকার, নির্যাতন থেকে সুরক্ষার অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে অন্তহির্ত হয়েছে। রুশো এবং অন্যান্য মনীষীরা রাষ্ট্র গঠনের সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে যে দেয়া-নেয়ার কথা বলেছিলেন সেটি বাংলাদেশে অনুপস্থিত। এদেশে রাষ্ট্র একতরফাভাবে ব্যক্তির সকল অধিকার হরণ করে তাদের দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছে। জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে সেই শৃঙ্খল মোচনের পন্থা নিয়ে সর্বত্র আজ বিতর্কের আয়োজন আবশ্যক। ব্যক্তির সকল অধিকার হরণ করে কোন রাষ্ট্রশক্তি যাতে দানবের ভূমিকায় অবতীর্ন না হয় তারই লক্ষ্যে আমাদের সমন্বিত প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। আজকের সেমিনারে উপস্থিত সকল নাগরিকের প্রতি এই অহবান রেখে আমার প্রবন্ধে সমাপ্তি টানছি।

রফিক আজাদ: এক বিপ্লবী কবির নাম / সায়ীদ আবুবকর

Layer 1

অলংকরণ: সাইফ আলি

সমগ্র বিশ্বের প্রকৃত কবিরা হলেন একসাথে একটি সমুদ্রের মতো। সবাই মিলে একই পানিতে নতুন নতুন তরঙ্গ সৃষ্টি করেন তারা, যার ধ্বনি আমাদের কানকে বিমোহিত করে, হৃদয়কে আন্দোলিত করে এবং চক্ষুকে শীতল করে। কতিপয় কবিতার কারণে রফিক আজাদও বিশ্বকবিতার মহাসমুদ্রে একটি আলাদা তরঙ্গ হিসেবে স্বীকৃত হবেন বলে আমার বিশ্বাস। ষাটের দশকের উজ্জ্বলতম কবি রফিক আজাদ কবি হিসেবে ছিলেন সবার থেকে আলাদা। অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের এ কবি ছিলেন সমুদয় শোরগোল ও প্রচারপ্রপাগান্ডার বিপরীতে। তাঁর কবিতাই অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল এদেশবাসীর কাছে।
অনেকগুলো জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থের জনক কবি রফিক আজাদ। অসম্ভবের পায়ে, সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে, হাতুড়ির নীচেয় জীবন, খুব বেশি দূরে নেই, অপার অরণ্য প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা হলো ’ভাত দে হারামজাদা’। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও এ কবিতা দেশ ও কালের সীমানা অতিক্রম করে বৈশ্বিক হতে পেরেছে এর সার্বজনীন আবেদনের কারণে। অন্তরের তাগিদে কোনো কবিতা রচিত হলে তার ফলাফল এরকমই হয়; নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র ক্ষেত্রেও এরকমই হয়েছিল। কবিতা কোনো একটি নির্দিষ্ট সময় ও মৃত্তিকাকে বুকে ধারণ করে সৃজিত হয় বটে; কিন্তু তা যদি শিল্পের মানদন্ডে একবার টিকে যায় তাহলে সাপ্রতিকতার তুচ্ছতা সে-কবিতাকে গ্রাস করতে পারে না কিছুতেই।
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তাঁর এ কবিতাটি আঠারো মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ও অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা। স্রেফ একটি গদ্যকবিতা। তারপরও কবিতাটি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে একটুও অসুবিধে হয়নি এদেশে। কবিতা গদ্য কি পদ্য, এটা বড় কথা নয়; আসল কথা হলো, যে-ধরনেরই হোক না কেন, কবিতা যদি মানবিক আবেদনে পরিপূর্ণ হয় তা পাঠকের হৃদয়তন্ত্রীতে টান না মেরে পারে না। কবি আজাদ কত সহজেই বুভুক্ষাপীড়িত মানুষের কণ্ঠকে আত্মস্থ করে উচ্চারণ করতে পারেন বিদ্রোহীর মতো-

দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোনো দাবি,
অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায়;
বাড়িগাড়ি, টাকাকড়ি-কারু বা খ্যাতির লোভ আছে;
আমার সামান্য দাবি: পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর-
ভাত চাই-এই চাওয়া সরাসরি-ঠান্ডা বা গরম,
সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চালে হ’লে
কোনো ক্ষতি নেই- মাটির শানকিভর্তি ভাত চাই;
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য সব দাবি।

দু-ছত্র প্রেমের কবিতা যে-কেউই লিখতে পারে; গীতিকবিতাকে তো গ্রিক ক্লাসিক সাহিত্যে তৃতীয় শ্রেণির কবিতা বলেই গণ্য করা হতো; এ ধরনের কবিতা মুহূর্তের মধ্যে ভুরিভুরি রচনা করা যায়; কিন্তু ’ভাত দে হারামজাদা’র মতো বৈপ্লবিক কবিতা যখন তখন সৃজন করা যায় না। এ ধরনের কবিতার জন্য চাই আলাদা মাহেন্দ্রক্ষণ, আলাদা সাধনা। রফিক আজাদ আপদমস্তক ছিলেন মানবতাবাদী; তাই তাঁর কাব্যখ্যাতি বাংলা ভাষায় স্থিত হয়ে যায় গণমানুষের কবি হিসেবে। তাই তিনি অগ্নির মতো জ্বলে উঠতে পারেন ক্ষুধার্তের কণ্ঠ হয়ে:

সর্বপরিবেশগ্রাসী হ’লে সামান্য ভাতের ক্ষুধা
ভয়াবহ পারিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ ক’রে।
দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে খাবো: গাছপালা, নদী-নালা,
গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব-প্রধান নারী,
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি-
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।

ভাত দে হারামজাদা, তা-না হ’লে মানচিত্র খাবো।

সত্যি বলতে কি, ফররুখ আহমদের ‘লাশ’ কবিতার পর বাংলা ভাষায় সবচেয়ে উজ্জ্বল বিপ্লবী কবিতা রফিক আজাদের ’ভাত দে হারামজাদা’। কবিতাটি দীর্ঘদিন ধরে ঘোরের মধ্যে রেখেছিল ষাটোত্তর তরুণ কবিদেরকে। এটা একজন বড় কবির লক্ষণ, সন্দেহ নেই।

রফিক আজাদ ছিলেন অত্যন্ত ছন্দ সচেতন কবি। তথাকথিত মাথামু-ুহীন গদ্যকবিতার বিরুদ্ধে তাঁকে বিদ্রোহ করে উঠতে দেখি তাঁর ‘গদ্যের অরণ্যে হারিয়ে-যাওয়া আমি এক দিগভ্রান্ত পথিক’ কবিতায়। তাঁর হৃদয় কত ক্ষত-বিক্ষত, তা আমরা টের পাই যখন কবি এরকম করে বলে ওঠেন:

‘মানুষ’ শব্দটিও ক্রমশই
বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে-
পথের পরিবর্তে ‘রাস্তা’
মানুষের পরিবর্তে ‘লোক’
ব্যবহৃত হয়ে আসছে আজকাল,
‘মানুষ’ ক্রমশ স্থায়ীভাবে
অভিধানে চলে যাচ্ছে-

গদ্যকবিতার কথা বলতে গিয়ে কবি রূপকাশ্রয়ী হয়ে ওঠেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ নিয়মে। তাঁর চোখে-মুখে ফুটে ওঠে বিধ্বস্ত স্বদেশ, প্রিয় দেশমাতৃকার সকরুণ ছবি। তাই তাঁর বিক্ষুব্ধ উচ্চারণ-

বড় বেশি গদ্য-চর্চা হচ্ছে আজকাল
প্রবাদপ্রসিদ্ধ এই দেশে।
যার ফলে আমরা একজন বজ্রকণ্ঠ, স্বপ্নদ্রষ্টা
নেতার পরিবর্তে পাচ্ছি অসংখ্য ছোট-ছোট গদ্য নেতা,
একজন সিরাজদ্দৌলার পরিবর্তে
অসংখ্য মীরজাফর,
একজন ভাসানীর পরিবর্তে পাচ্ছি
অসংখ্য ফেরেব্বাজ,
একজন বাংলার বাঘের পরিবর্তে
অসংখ্য মেষ-শাবক-
একজন চন্ডী দাসের পরিবর্তে
অসংখ্য আবৃত্তিকার-
আমরা রুদ্ধবাক হয়ে তাঁর কথামালা শুনি আর নড়েচড়ে উঠি নিরাভরণ সত্যের উত্তাপে। প্রকৃতপক্ষে রফিক আজাদ ছিলেন স্বভাবে বিপ্লবী, অন্তরে খাঁটি মানবতাবাদী। এ শ্রেণির কবির অভাব অন্য কিছু দিয়ে পুরা করা যায় না। এ ধরনের কবির মৃত্যুও হয় না কখনও কোনো ভাষায়, কোনো দেশে। বরেণ্য এ কবি সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮৪), কবি আহসান হাবীব পুরস্কার (১৯৯১) কবি হাসান হাফিজুর রহমান পুরস্কার (১৯৯৬), বরেণ্য মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার (১৯৯৭) ও একুশে পদক (২০১৩)। শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও কবি রফিক আজাদ মৃত্যুহীন হয়ে থাকবেন বাংলা কবিতার বিশাল ভুবনে।