ঘুরে ঘুরে খেলা করে / সায়ীদ আবুবকর

কেবলি কোকিল আর কেবলি কুসুম
যে-বনে; যে-মাঠে
কেবলি শস্যের মেলা;

যে-আকাশে কেবলি ষোড়শী চাঁদ আর তার নিজঝুম
রূপের ঔজ্জ্বল্য; যে-জলে সাঁতার কাটে
কেবলি চিতল মাছ; সেখানে আমার হৃদয়ের হোলি খেলা।

আমার হৃদয় জোছনার মতো ঘুরে ঘুরে খেলা করে
পৃথিবীর সব সুন্দরে সুন্দরে।

১১.৯.২০১৪ মিলন মোড়, সিরাজগঞ্জ

Advertisements

তোমার সুঘ্রাণ / সায়ীদ আবুবকর

হৃদয় ভরে আছে তোমার সুঘ্রাণে,
কী হবে বলো আর ফুল দিয়ে;
মিষ্টি মধুমতী বয়েছে দুই প্রাণে,
কী হবে হেঁটে আর কূল দিয়ে!

কী হবে চৈতালি চকোর পাখি দিয়ে
যখন বুকে তুমি জুড়েছো গান;
রেখেছো বুঁদ করে সজল আঁখি দিয়ে-
কী হবে করে আর অমিয় পান!

কিসের বসন্ত, কিসের মধুমাস
যখন আছো তুমি বুক জুড়ে;
মিথ্যে ফুল আর পাখির উল্লাস
যখন আছো সব সুখ জুড়ে!

২৭.২.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

বসন্ত / সায়ীদ আবুবকর

বাতাস ভিজে গেছে শিমুলসৌরভে,
পলাশ আনন্দে ভাসছে বন;
কৃষ্ণচূড়াগাছে আগুন লাগা দেখে
রাধার মতো নাচে পাখির মন।

পাখিরা গান গায়, নদীর ঢেউ নাচে,
ফুলেরা উল্লাসে ছড়ায় বাস;
নতুন পল্লবে ভরেছে ডালপালা-
পড়েছে তার প্রেমে বুনো বাতাস।

বাতাস ভিজে গেছে শিমুলসৌরভে,
জোছনা তার ’পরে ছড়ায় রঙ;
পড়েছে খসে সব জরা ও জীর্ণতা,
শুকনো পাতা আর পুরনো জং।

২৫.২.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

মৎস্যকন্যাদের কথা / সায়ীদ আবুবকর

জোছনা ডুবে গেছে সমুদ্রের নিচে,
কৃষ্ণ জলরাশি কাঁপছে থরথর-
মৎস্যকন্যারা ঘুমায় সী-বীচে;
আস্তে ফেলো পা, যাবে যে ভেঙে ঘুম।

জোছনা ডুবে গেলে সী-বীচে আসে তারা,
এলিয়ে দেয় দেহ মুক্ত হাওয়ায়;
যখনি উঁকি মারে আকাশে শুকতারা,
পালায় দল বেঁধে জলের হিমঘরে।

আস্তে ফেলো পা, একটু আওয়াজেই
আঁতকে ওঠে তারা, যেন বা ভীত মৃগ;
একটু জোরে বয় বীচের হাওয়া যেই,
পালিয়ে যায় তারা চোখের পলকে।

যায় না দেখা ভালো রাতের এই ভাগে,
আঁধার গাঢ় হয়ে ফেলেছে ঢেকে সব;
দেখতে পাও যদি তুমি আমার আগে,
দিও হে মোবাইলে একটা মিচকল।

জানতো তারা যদি আমরা কি-সভ্য,
কি-আধুনিক আর বিজ্ঞান-মনস্ক!
হবে না মোটে তারা ভোগের কু-দ্রব্য,
থাকবে রানী হয়ে হৃদয়-সাম্রাজ্যে।

বুঝি না কী আরাম সাগরে ডুব দিয়ে,
নষ্ট করে রূপ চোখের আড়ালে,
জগত জানলো না, কী হবে রূপ দিয়ে-
কবিরা লিখলো না সনেট ভালবেসে!

আমরা কি-ভদ্র, বিনয়ী ও প্রেমিক,
বুঝতো তারা, যদি আসতো কাছে, হায়!
পোষা প্রাণীর মতো আপোসে ধরা দিক,
ঘটবে কি-সহজে বংশবিস্তার।

বংশবিস্তারে আমরা বিশ্বাসী,
নইলে হয়ে যাবে জগতে বিলুপ্ত;
আস্তে পা ফ্যালো, ফেলো না নিঃশ্বাসই-
কী নড়ে ওইখানে- পালালো বুঝি ওই-

যায় না দেখা ভালো রাতের এই ভাগে,
হয়তো এসেছিল মৎস্যকন্যারা;
মানুষ দেখলেই পালায় আগে আগে
অথচ বুঝলো না প্রেমের কি-মর্ম!

২৪.২.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

সর্ষেফুলনামা / সায়ীদ আবুবকর

সর্ষে খেতগুলো হলদে শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে থরথর
সর্ষেফুল হয়ে পোহায় রোদ্দুর আমার অন্তর

আমার অন্তর পোহায় রোদ্দুর সর্ষেফুলে ফুলে
যে-ফুল ঝিরঝিরে বাতাস লেগে ওঠে পুলকে দুলে দুলে

মধুপ দল বেঁধে বেড়ায় উড়ে উড়ে, কুড়ায় অমৃত
তার পরশ পেয়ে তনু ও অন্তর মিষ্টি, সুবাসিত

অমরাবতী বুঝি এসেছে নেমে, ঘ্রাণে ভরেছে দশ দিক-
কে গায় গান বনে? তাবৎ পাখি আজ বসন্তের পিক

২১.২.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

কিসের আলো লেগে / সায়ীদ আবুবকর

কিসের আলো লেগে উঠলো জেগে কায়া, উঠলো জেগে মন।
জগত মনে হলো স্বপ্নশতদল, কুহককাঞ্চন।।

দুচোখে লেগে আছে শুধুই সুন্দর, শুধুই অনাবিল।
গদ্যকবিতারা ধরেছে বুকে ফের ছন্দ আর মিল।।

রাত্রি হলো শেষ, প্রভাত চারদিকে এবং শুভ্রতা।
ফুলেরা জেগে উঠে ছড়ায় সৌরভ, পাখিরা সুরকথা।।

যে-আলো চোখে মেখে ত্রিকাল দেখেছিল হোমার-সফোক্লিস।
সজিনাগাছে আজ সে-আলো পান করে দোয়েল দেয় শিশ।।

বাতাস নাচে ডালে, পাতায় বোদ্দুর, রৌদ্রে মহাকাল।
লেগেছে ঘোর চোখে, সবুজ দেখি সব যা ছিলো জঞ্জাল।।

শরীর ওড়ে, সাথে মনও উড়ে যায়, যেন বা বুনো হাঁস।
মিথ্যে নয় এই কাব্যগান আর প্রাণের উল্লাস।।

১৯.১.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

জাগিয়া রাত যায় / সায়ীদ আবুবকর

জাগিয়া রাত যায় দেখিয়া চোখ ভরে রূপালি রাত্রিকে।
পরীর পাখনায় উড়িয়া যায় মন উদাস দিকে দিকে।।

বসুন্ধরা আজ ইডেন গার্ডেন, ভিজেছে জোছনায়।
সে-জোছনার ’পরে হরিণ খেলা করে চপল চার পায়।।

হাসনাহেনা আর গন্ধরাজে গেছে ভরিয়া সমীরণ।
সুবাস লাগে নাকে, পুলকে গাহে পিক, কাঁপিয়া ওঠে বন।।

নদীর জল নাচে, জলের ’পরে নাচে জোছনা আর চাঁদ।
দেখিয়া রাত যায়, মেটে না দুচোখের তবু দেখার সাধ।।

নিশুতি নিভৃতে জাগিয়া দুটি চোখ এবং অন্তর।
কেবলি ভালো লাগে রূপালি রাত আর মাটির কুঁড়েঘর।।

১০.১২.২০১৫ সিরাজগঞ্জ

ঘুমাতে ভয় লাগে / সায়ীদ আবুবকর

ঘুমাতে ভয় লাগে, কেবলি মনে হয় এ ঘুম ভাঙবে না পাখির ডাক শুনে
পাখির ডাক শুনে উঠবে জেগে ফুল, হালের বলদেরা, লক্ষ্মী চাষীবউ;
কেবল ভাঙবে না আমারই ঘুম বুঝি, যখন ফুলনদী ফুলেল ফাল্গুনে
ছুটবে যেন ঘোড়া ছলাৎ ছলছল এবং মৌমাছি বেড়াবে খুঁজে মউ।

যে-চোখ দেখলো না শিশিরভেজা ঘাস, রৌদ্রভেজা জল, সুবাসভেজা ফুল-
ব্যর্থ সেই চোখ! যে-কান শুনলো না ঘুঘুর মিহি সুর ও দোয়েলের শিশ-
ব্যর্থ সেই কান! ব্যর্থ সে-হৃদয়, গেলো না ডুবে যার কূল ও উপকূল
রূপের উচ্ছ্বাসে- বিফল সে-জীবন, কেমন পানসে ও কেমন নিরামিষ!

ঘুমাতে ভয় লাগে; আমি এ জনপদে থাকবো জেগে শুধু, যেভাবে জাগে চাঁদ;
যেভাবে জেগে থাকে নদীর বুকে ঢেউ, দিনের বুকে রোদ, মাটির বুকে ঘাস,
থাকবো জেগে আমি সেভাবে এদেশের সবুজ বুক জুড়ে; মেটে না দেখে সাধ
রূপসী এই দেশ, নাকফুলের মতো ধানের খেত আর নিখুঁত নীলাকাশ।

১৬.১১.২০১৫ সিরাজগঞ্জ

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

দ্বাদশ সর্গ

ছিলো মজে জার্মানীতে সখীদের সাথে
দু-তনয়া; হেসেখেলে, গেয়ে আর ঘুরে
বসন্তের পাখি যেন, ইউরোপকুঞ্জে।
গেছেন হাসিনা তাঁর পুতুল ও জয়
দু-সন্তান নিয়ে স্বামী ওয়াজেদ আলী
মিয়ার কর্মস্থলে; সাথে তাঁর ছোট ভগ্নি
শেখ রেহানাও। হেথা ঘোরে, সেথা ঘোরে,
কি-অপূর্ব দেশ, যত দ্যাখে তত জাগে
দেখবার সাধ এর নিত্যনবরূপ!
ঐশ্বর্যে-বৈচিত্র্যে রেখেছে সাজিয়ে যেন
প্রতিটা শহর মহাসম্রাজ্ঞীর মতো।
ধনাঢ্য রূপসী রাজকন্যা প্রকৃতির
গোটা ইউরোপ যেন, অনন্ত যৌবনা;
কে না চায়, দেখে তারে জুড়ায় নয়ন!
মিললো দুদিনের ছুটি ওয়াজেদ মিয়ার;
চললেন সে-ছুটিতে সবাইকে নিয়ে
বেলজিয়ামের রাজধানী স্বর্গপুরী
ব্রাসেলসে; তারিখ চৌদ্দ আগস্ট। সোজা
উঠলেন গিয়ে বেলজিয়াম-রাষ্ট্রদূত
সানাউক হকের বাসায়। প্রেসিডেন্ট-
তনয়া ও জামাতার উপস্থিতি, যেন
হাতে পাওয়া চাঁদ, দিয়েছে বাড়িয়ে তাঁর
আভিজাত্য আরো। অভিভূত রাষ্ট্রদূত
জানালেন অভ্যর্থনা মহামর্যাদায়
রাষ্ট্রীয় অতিথিদের। দূতাবাসে কর্ম-
রত বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা-
কর্মচারী যত, রাষ্ট্রদূত হতে নিম্ন
পদমর্যাদার, এ দূর বিদেশভুয়ে
ব্যস্ত সকলেই নির্ভুল মনোরঞ্জনে
অভ্যাগতা রাজঅতিথির; যা-ই চায়,
চোখের পলকে চলে আসে; চায় না যা,
তাও এসে গড়াগড়ি খায় কন্যাদের
পায়ের তলায়। ভৃত্য যারা, ক্রীতদাস,
তারা চিরদিন চেয়ে থাকে শকুনের
মতো শ্যেন-চোখে মনিবের সন্তুষ্টির
দিকে; মনিবের তুষ্টি ছাড়া, তোষামোদি
ছাড়া বাঁচে না জগতে তারা একদিনও।
ছিলো ডুবে প্রেসিডেন্ট-তনয়ারা অথৈ
হর্ষোল্লাসে, মৎস্য যেন মহাসাগরের,
কাঁটছিল আনন্দসাঁতার দূর দেশে;
সাথে দুই পুষ্পশিশু, জয় ও পুতুল।
রাষ্ট্রদূত হকের কন্যারা প্রাণ খুলে
করছিল গল্পগুজব, কৌতুক, হাসি-
ঠাট্টা নবাগতা সখীদের সাথে, রাত্রি
জেগে জেগে। পনেরো আগস্ট মধ্যরাতে
রেহেনার অট্টহাসি ছড়ালো ঝংকার
সুপ্ত জনে জনে। তবু না বিরক্ত কেউ;
বরং জনাব হক বললেন হেসে:
“হাসারই বয়স; হাসবেই তো; হাসুক না!”
ভগ্নিপতি ওয়াজেদ মিয়া ছুটে এসে
ধমকালেন তাঁকে; বললেন ক্রুদ্ধস্বরে:
‘যত হাসি তত কান্না, মনে রেখো, মেয়ে।’
যত রাগে দোলাভাই তাঁর, তত যায়
হেসে গড়াগড়ি কন্যাগণে। হায়, তারা
জানতো যদি, কি-কঠিন দুঃসংবাদ
করছে অপেক্ষা, কি-দুর্দিন আসছে নেমে
জীবনে তাঁদের, কি-বৈরি বৈশাখি মেঘ
ভাগ্যের আকাশ তাঁদের ফেলেছে ঘিরে!

ফোন এলো ভোর বেলা। বাংলাদেশ থেকে।
তখনও ভাঙেনি কারো ঘুম। উঠে গিয়ে
রাষ্ট্রদূত ধরলেন রিসিভার: ‘এক
সেনা-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট
শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাস-
ভবনে নিহত, স্বপরিবারে।’ কাঁপছেন
শুনে তিনি ভয়ে। লাটিমের মতো যেন
ঘুরছে জগত। বুদ্ধি তাঁর নেমে যাচ্ছে
পারদের মতো নিচে। এখন উপায়?
দরজায় নক করে উঠালেন ডেকে
প্রেসিডেন্ট-জামাতাকে ঘুম থেকে। উঠে
এসে ওয়াজেদ আলী মিয়া শুনলেন
সব কথা। বাকরুদ্ধ তিনি দুঃসংবাদে।
অন্তরাত্মা তাঁর কেঁপে উঠলো ভয়ে-ত্রাসে:
‘হায়, খোদা! কী শোনালে এ কুক্ষণে তুমি!’
পড়লো আকাশ যেন ধসে, আচমকা
বসন্ত-কাননে; যেন বৃষ্টিহীন, মেঘ-
হীন, খর-রৌদ্রে নিদারুণ বজ্রপাত
হর্ষে হেঁটে চলা দূরগামী পথিকের
মাথার উপর; যেন সমুদ্রসৈকতে
ঝিনুক কুড়াতে কুড়াতে উচ্ছল হর্ষ-
শিশু, বেখেয়ালে, ডেবে গেল চোরা-
বালির হাঁ-এর ভেতর, ভাগ্যের দোষে;
হায়, প্রভু; কী শোনালে এ কুক্ষণে তুমি!

অবশ শরীর; নিশ্চল হাত-পা; যেন
ভারী পাথরের পা ফেলে, কি-কষ্টে তবু
ওয়াজেদ মিয়া বসলেন গিয়ে পাশে
সুপ্ত স্ত্রীর; পাশে তাঁর ঘুমায় শান্তিতে,
স্বর্গ থেকে নেমে আসা দুই স্বর্ণশিশু;
ফিরালেন চোখ তিনি দয়িতার দিকে-
কুসুমের মতো শুয়ে আছে কি-সুন্দর
যেন স্বর্গের অপ্সরী, পিতৃ-অন্ত প্রাণ,
পিতা-বঙ্গবন্ধু ছাড়া বোঝে না যে কিছু,
পুত্রের অধিক যে তাঁর জগদ্বিখ্যাত
পিতার নিকট; ‘হায়, হাসু, প্রিয়ংবদী,
জীবনসঙ্গিনী হে আমার, কোন্ প্রাণে
কবো এই কথা তোমাকে হে!’ বসে বসে
ভাবছেন তিনি; দুই চক্ষু বেয়ে তাঁর
দরদর করে ঝরছে অশ্রুজল; তার
কয় ফোঁটা পড়লে পুষ্পিত মুখে, ধড়-
ফড় করে উঠলেন যেন জেগে এক
ভয়ার্ত হরিণী; স্বামীর দুহাত ধরে
বললেন: ”হায়! কী হয়েছে! কী ব্যাপার!
কেন কাঁদো এইভাবে? খুলে কও সব।”
মুছলেন ত্রস্ত হাতে দুচোখের পানি;
পরমাণূ বিজ্ঞানী সে, শক্তি নিয়ে যাঁর
রাত্রিদিন গবেষণা; মানায় কি তাঁর
মেয়েলি ক্রন্দন? টানটান হয়ে তিনি
বললেন কম্পমান কণ্ঠে: “রেহেনাকে
ডাকো। গ-গোল প্রচ-, ঢাকায় । গুলি
ছুঁড়েছে সৈন্যরা বত্রিশ নম্বরে। আব্বা-
আম্মা-ওরা সব কেমন আছেন, কেউ
বলতে পারছে না।” “কী বলছো এসব!”
বলে ফুঁপিয়ে উঠলো যেন আষাঢ়ের
মেঘ, ঝরঝর: ছুটে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে
উঠালেন তিনি রেহেনাকে। দুই ভগ্নি
দুজনকে বুকে বেঁধে, ফুঁপিয়ে ফুুঁপিয়ে
কাঁদলেন কিছুক্ষণ, কিছু না বুঝেই।
কী ঘটেছে, কী হয়েছে-জানে না এখনো
তাঁরা; জানে না কী কারবালা ঘটিয়েছে
সীমারেরা বাংলার মসনদে। ও-দুখিনী
অনাথ মেয়েরা বাংলার, কে মোছাবে
তোমাদের আঁখিজল, যখন শ্রাবণ
বেঁধেছে অনন্ত বাসা তোমাদের চোখে?
কাঁদো, নারী, কাঁদো, যদি কেঁদে সুখ হয়,
যদি জুড়ায় হৃদয় কেঁদে বেইমান-
অকৃতজ্ঞ এই মীর জাফরের দেশে!

“কেঁদো না, কেঁদো না” বলে ওয়াজেদ মিয়া
লাগলো সান্ত¡না দিতে, প্রিয় জনে। “কেউ
যায়নি তো মারা?” বলে প্রেয়সী হাসিনা
চেয়ে রয় কি-করুণ দুর্বোধ্য স্বামীর
মুখের দিকে, অচেনা যেন কত এই
মুখ! বললেন: “এক্ষুণি বলবো কথা
বাবা-মার সাথে।” ওয়াজেদ মিয়া তার
প্রত্যুত্তরে খোঁজেন বাহানা কত, তাঁকে
ভোলাবার; ছোট ছোট মিথ্যা দিয়ে ঢেকে
রাখার আপ্রাণ চেষ্টা তাঁর ভয়াবহ
প্রাণঘাতী কঠিন সত্যকে: “ঢুকছে না
ফোন, হাসু। ধৈর্য ধরো। আস্তে আস্তে যাবে
জানা সব কথা। হয়ো না অস্থির মোটে।”
অস্থিরতা ততই যাচ্ছে যে বেড়ে! হায়,
ভাবেন রেহেনা, গত রাত্রির আমারই
অট্টহাসি যত অকল্যাণের মূল? কেন
চেয়ে আছে এইভাবে দোলাভাই তাঁর
দিকে? কেন এ বাড়ির লোকজন এত
পর পর, অচেনা ভীষণ, মনে হচ্ছে
হঠাৎ এভাবে? “হায়, আপু, কী হয়েছে,
রেখো না লুকিয়ে কিছু, খুলে বলো!” বলে
লুকায়ে ভগ্নির বুকে মুখ, হাউমাউ
করে কাঁদতে লাগলো অনাথ বালিকা
বাংলার, দূর দেশে। ভগ্নি তাঁর “চুপ
র্ক” বলে তাকালেন ফের ওয়াজেদ
মিয়ার দিকে: “কী হলো, ফোন করো, খোঁজ
নাও।” ধীর পদক্ষেপে, যেন জ্যান্ত লাশ,
গেলেন বাংলার ধীমান জামাতা উঠে
রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের নিকট।
গিয়ে শুনলেন তাঁর চাপা হট টক
টেলিফোনে, জার্মানীর বাংলাদেশের
রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর
সাথে: “কি-উটকো ঝামেলা দেখুন! সব
আপদ এ দুঃসময়ে চেপে বসে আছে
আমার উপর। আপনি তো নির্ঝঞ্ঝাট-”
লজ্জায় ও অপমানে হয়ে উঠলো লাল
ওয়াজেদ মিয়ার বিষণ্ন মুখ: ‘হায়,
কী কয় চামচিকা! বঙ্গবন্ধু-তনয়ারা
রাষ্ট্রের আপদ? পঙ্কে নিপতিত যেন
বিশাল হস্তিনী, পা দেখায় মূর্খ ভেক
তাকে, সক্রোধে।’ জামাতা তিনি, প্রেসিডেন্ট
শেখ মুজিবের; কী সাহসে এ নির্বোধ
উচ্চারণ করে মুখে হেন ভাষা, তাঁর
সম্মুখে! পেলেন গন্ধ তিনি সুগভীর
ষড়যন্ত্রের, চারদিকে। এক্ষুণি বেরুতে
হবে তাঁকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে, দূরে কোথা,
এ নিবাস থেকে; যেভাবে পালিয়েছিল
লুৎফাকে নিয়ে পরাস্ত সিরাজ। তিনি
লুকিয়ে মনের ক্ষোভ মনে, বললেন
বিনয়ের সাথে: “লাইন দেবেন না কেটে;
দিন হুমায়ুন সাহেবের সাথে কথা
বলি।” বড়ই বিব্রত রাষ্ট্রদূত হক;
অগত্যা দিলেন তুলে ফোন তাঁর হাতে;
দিয়েই গেলেন ঢুকে ঘরে তস্করের
মতো; বিদূষী স্ত্রী তার, দিলেন ধিক্কার
মহারোষে: “অমানুষ তুমি! কথা কও
এইভাবে বিপদের দিনে কোন্ মুখে?”
উঠলো অস্ফুটস্বরে ফুঁসে রাষ্ট্রদূত,
যেন জাতসাপ: “বুঝো না আমার চেয়ে
বেশি; বঙ্গবন্ধু ঝাড়ে-বংশে শেষ; কার
ধড়ে মাথা ক’টা, ঠাঁই দেয় বেঁচে যাওয়া
তাঁর তনয়াকে!” ওদিকে আরেক ঘরে
তাঁরই কন্যাগণ কেঁদে জারজার, হায়,
সখীদের দুঃখে! এরকমই বুঝি হয়
নিয়তির খেলা, যাদের কল্যাণকথা
ভেবে ব্যতিব্যস্ত সারাক্ষণ, শত্রু ভেবে
ছোঁড়ে তারা নির্দয়ের মতো তীক্ষ্ন বাক্য-
বাণ! ‘হায়, যার জন্যে করি চুরি,সেই কয়
চোর!’ ভাবেন উন্মনা হয়ে তিনি। চলে
গেলে ওয়াজেদ আলী মিয়া, উঠলো বেজে
ফের ফোন। রাষ্ট্রদূত সানাউল হক
ছুটে এসে করলেন রিসিভ। জানালেন
জার্মানীর রাষ্ট্রদূত তাকে: পাঠাচ্ছেন
গাড়ি তিনি ব্রাসেলস আর জার্মানীর
বর্ডারে; ব্যবস্থা নেন যেন তিনি দ্রুত
বর্ডার পর্যন্ত তাঁদেরকে পাঠানোর।
‘হা-পরমেশ্বর! কী-বাঁচা বাঁচালে তুমি!’
এই বলে জানালো সে মনোতুষ্টি; পরে
দিলো সে ধিক্কার চাপাস্বরে: “বাকশাল
ও রক্ষিবাহিনী নিয়ে মেতেছিলে বড়;
হয়েছে পতন ঠিকই আপনারই দোষে !’
বলে সে হাসলো দাঁতে দাঁতে শেয়াল ও
শকুনের হাসি, যেভাবে মীর জাফর-
ঘসেটি বেগম-রাজ বল্লভ-জগৎ
শেঠরা সানন্দে হেসেছিল প্রাণখুলে
সতেরো শ সাতান্নোয় বাংলার নবাব
সিরাজ উদ দৌলার করুণ মৃত্যুতে।

কি-বিচিত্র এই বঙ্গদেশ আর তার
মানুষেরা! চোখের পানিতে ভেসে ভেসে
মুজিবদুলালী শেখ হাসিনা ভাবতে
লাগলেন এক মনে। পাশে ভগ্নি কাঁদে;
মা-খালার কান্না দেখে, কাঁদে জয়; কাঁদে
অবুঝ পুতুলও পিতৃকোলে; কেবল হে
পাষ- সীমার, কাঁদলো না তোর মন;
কাঁপলো না হৃৎপি- তোর একবারও!

উঠলেন জার্মানীতে এসে অবশেষে
মুজিবকন্যারা। সাক্ষাৎ-ফেরেস্তা যেন
রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
তটস্থ সারাক্ষণ মুজিবকন্যাদের
আদরআপ্যায়ণ ও নিরাপত্তা নিয়ে।
যাবে চাকরি? যাক। কী হবে চাকরি দিয়ে
যখন ঘাতক ছুড়েছে বুলেট প্রিয়
পিতার পিঞ্জরে! যাবে প্রাণ? যাক না হে!
কী হবে জীবন দিয়ে, যখন জাতির
জনক নিহত বাংলায়, যখন ঘৃণ্য
শকুনের হাতে আজ প্রাণের পতাকা,
লাল-সবুজ যে-পতাকার জন্যে ত্রিশ লক্ষ
বাঙালী দিয়েছে প্রাণ, দিয়েছে ইজ্জত
মাতাভগ্নি দুই লক্ষ। জনাব চৌধুরী
বললেন দৃঢ় কণ্ঠে: “আমার এখানে
থাকুন নিশ্চিন্তে; পাবেন না কোনো ভয়।”
মহীয়সী পত্নী তাঁর, শোনাতে লাগলো
অভয়বাণী। কেন এ অভয়? আসলে
কী ঘটেছে বত্রিশ নম্বরে? জানেন না
এখনো তা হাসিনা-রেহেনা বিস্তারিত।
খুললেন মুখ অবশেষে প্রিয় নেতা
শেখ মুজিবের মন্দাদৃষ্টা দু-কন্যার
উপর্যুপরি পীড়াপীড়িতে রাষ্টদূত
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী: “যা বাস্তব,
হবেই তা মেনে নিতে, আজ কিংবা কাল;
লাভ নেই লুকিয়ে সত্যকে, হবেই তা
প্রকাশিত একদিন না একদিন; হে
বঙ্গবন্ধু-তনয়ারা, ” কাঁপতে লাগলো
কণ্ঠ তাঁর বলতে গিয়ে, “তাহলে শুনুন,
বঙ্গবন্ধু বেঁচে নেই, করেছে সৈন্যরা
হত্যা তাঁকে ভোর রাতে।” “বেঁচে নেই?” বলে
গেলেন রেহেনা মুর্ছা হাসিনার কোলে।
হুমায়ুন-পত্নী তাঁকে পাঁজাকোলা করে
শোয়ালেন বেডে; ব্যস্ত হয়ে গেল সব
জ্ঞান ফেরানোর জন্যে তাঁর। ওয়াজেদ
মিয়া ধরে আছেন পত্নীকে শক্ত হাতে;
পত্নী তাঁর বাকরুদ্ধ হয়ে, দিয়েছেন
ছেড়ে অশ্রুজল, যেন পদ্মানদী তাঁর
অবাক দুচোখে হঠাৎ গিয়েছে মিশে;
পুতুল ও জয় ভয়ে, ধরে জননীর
গলা, জুড়ে দেছে কান্না উচ্চৈঃস্বরে। কে সে
পাষাণ, না কেঁদে পারে এই ক্ষণে! কাঁদে
ওয়াজেদ মিয়া, কাঁদে রাষ্ট্রদূত, কাঁদে
এ বাড়ির সব লোক একসাথে। হায়,
দেশ, মাতা বঙ্গ, তোমার চোখের পানি
শুকাবে না আর কোনোদিন; কেঁদে কেঁদে
যাবে যে তোমার প্রাণ, কারণ তোমার
শ্রেষ্ঠ যে-সন্তান সহস্র বছরে, তাঁকে
ফেলেছে যে হত্যা করে জারজ সীমার!

বিষণ্ন বদনে চেয়ে আছে সকলেই
শেখ মুজিবের শোকার্ত দুলালী শেখ
হাসিনার অশ্রু টলোমলো চোখে, যেন
তিনি অশ্রু-সরোবরে করুণ নয়নে
চেয়ে থাকা কোনো দুঃখকমল। মুখ
খুললেন তিনি অবশেষে এই বলে,
বিস্ময়ে: “এও কি সম্ভব! গুজব বোধ-
হয় ছড়িয়েছে বিরোধীরা।” বললেন
চৌধুরী: “আমরা খোঁজ নেবো তারও।” বলে
চললেন মুজিবতনায়া, যেন তিনি
শুনতে পাননি কিছু কিংবা শুনছেন না
কারো কথা: “বাঙালী কী করে পারে হত্যা
করতে আমার পিতাকে? পাকিস্তনীরাও
করেনি সাহস ছুঁড়তে বুলেট যাঁর
বুকে-!” বললেন ওয়াজেদ মিয়া, “পারে,
হাসু, পারে। রয়েছে যে মীর জাফরের
প্রেতাত্মারা ঘাপটি মেরে আজও শান্তিপ্রিয়
বাঙালীর মাঝে; সতের শ সাতান্নোয়
ওরা ছিলো, আজও আছে এবং থাকবে
চিরদিন।” হুতাশন যেন, উঠলেন
জ্বলে পত্নী তাঁর: “কোথায় সে মীরজাফর,
আমি আট কোটি বাঙালীকে সাথে নিয়ে
করবো মূলোৎপাটন তার, বাংলার
বুক থেকে। মিঃ এ্যামবাসাডার, আপনি
কালই ব্যবস্থা নিন আমাকে ঢাকাতে
পাঠানোর। কী ঘটেছে ঢাকায়, সচক্ষে
দেখতে চাই আমি।” বললেন হুমায়ুন
রশীদ চৌধুরী, “হে বঙ্গবন্ধু তনয়া,
শান্ত হোন। কিভাবে ঢাকায় ফিরবেন
আপনি-এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার
করেছে আপনাদের স্বদেশে ফেরার
ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি। আপাতত দেশে
ঢুকতে পারবেন না আপনারা, দু-বোনের
কেউ। ” “ঢুকতে পারবো না আমাদের দেশে
আমরা? শেখ মুজিবের বাংলায়? বলুন
কে সে সরকার, কার এত স্পর্ধা, রাখে
আটকে বৈদেশে বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে?
কন, প্রেসিডেন্ট নন আমার জনক?”
“ছিলেন। এখন মৃত।” “মৃত? আজ দেশে
কে তবে রাষ্ট্রপ্রধান?” “তিনি মহামান্য
প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক।” “ কে সে?
খন্দকার মোশতাক? পিতার কাছের
মানুষ- বাণিজ্য মন্ত্রী?” “কাছের মানুষ
বটে, কিন্তু ছিলেন না বিশ্বস্ত ” উঠলেন
বলে ওয়াজেদ আলী মিয়া, “জানি, তাঁকে
বাবাও কখনো করতেন না পছন্দ।
যুগে যুগে মার্কাস ব্রুটাস বন্ধুবেশে
করেছে হামলা জুলিয়াস সিজারের
’পরে মোক্ষম সময়ে। মনে করে দ্যাখো,
খোকাচাচা একবার মোশতাকের জন্যে
এসেছিল সুপারিশ নিয়ে; বাবা তাকে
বলেছিলেন, ‘রে খোকা, এসেছিস তুই
কার জন্যে? কখনো পশ্চাৎ থেকে কেউ
করে যদি ছুরিকাঘাত আমাকে, মনে
রাখিস, তাহলে করবে তা মোশতাক।’
এই সেই মোশতাক, রটিয়ে কুৎসা
তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে, বাবার কাছ
থেকে তাঁকে করেছিল বিচ্ছিন্ন; উদ্দেশ্য,
প্রকৃত বন্ধুরা যাতে ভিড়তে না পারে
তাঁর কাছে। আজ সব হয়ে যাচ্ছে স্পষ্ট।”

চোখ দুটো যেন জলে ডোবা পদ্মফুল;
সেই চোখে ভেসে উঠছে কত স্মৃতি এই
খন্দকার মোশতাকের, আঁঠার মতোই
থাকতো যে লেগে সারাক্ষণ তাঁর পিতা
প্রেসিডেন্ট-মুজিবের সাথে সাথে। হায়,
এই কি সেই মোশতাক, যার রুগ্ন স্ত্রীর
সেবাশুশ্রুষার সমস্ত দায়দায়িত্ব
তুলে নিয়েছিলেন মা কাঁধে, যখন সে
কারাগারে বন্দী, স্বাধীনতার আগে? হায়,
এই কি সেই মোশতাক, যে কিনা মাটিতে
গড়াগড়ি খেয়ে করেছিল কান্নাকাটি
দাদীর মৃত্যুর পর? শোকে মুহ্যমান
বাড়ির সবাই, দাদীর মৃত্যুতে; কিন্তু
যে রক্তের কেউ নয়, সেই কিনা শোকে
গড়াগড়ি খাচ্ছে ধুলোয়! তবে কি স্রেফ
অভিনয়ই ছিলো এইসব?-“বেইমান!”
বলে, উঠলেন কেঁদে মুজিবদুলালী:
“সব বেইমান! সব বিশ্বাসঘাতক!
কিন্তু এই আমি, জগত-বিখ্যাত পিতা
স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবের কন্যা আল্লার ইচ্ছায়
বেঁচে আছি পৃথিবীতে; আমার সন্তান
জয় ও পুতুলের কসম, জন্মদাতা
পিতার কসম, মায়ের কসম আর
আমার প্রাণের ভাই জামাল-কামাল-
রাসেলের কসম, কাউকে ছাড়বো না
আমি, কাউকেই ছাড়বো না; সব
ঘাতকেরই কল্লা আমি ছিঁড়ে নেবো এই
হাতে; প্রতিটা মৃত্যুর নিখুঁত হিসেব
বুঝে নেবো ঠিকই কড়ায় গ-ায়, পাই-
পাই করে; ঘাতক সে যেই হোক, টুটি
তার ছিঁড়ে ফেলবোই!” অতঃপর তিনি
জুড়লেন আর্তনাদ জননীর নামে:
“ও মাগো, আমাকে কেন পাঠালে বৈদেশে?
তুমি বুঝি অনেক আগেই পেয়েছিলে
টের, সবাইকে মেরে ফেলবে ওরা, বাঁচতে
দেবে না কাউকে? তাই বুঝি পুত্রদের
কাছে রেখে, আমাকে ও রেহেনাকে,
কন্যা বলে, ঠেলে দিলে দেশের বাইরে,
বাঁচতে তোমাদের ছাড়া? হয়তো সবার
চেয়ে বেসেছিলে ভালো; তাই আমাদের
চাওনি মরতে দিতে! ও মা, মাতৃহীন-
পিতৃহীন আজ দুই এতিম সন্তান
দেখে যাও পৃথিবীতে কি-শান্তিতে আছে!
তুমি দেখে যাও, পিতা, তোমার স্নেহের
দুলালীরা আজ হঠাৎ শেওলা হয়ে
ভাসতেছে কিভাবে ভাগ্যের দরিয়ায়,
জগতে যাদের খোদা ছাড়া কেউ নেই।”

মুজিবদুলালী হাসিনার এ-রোদনে
পড়ে গেল আহাজারি সারা বাড়ি। কেউ
কাঁদে উচ্চৈঃস্বরে, কেউ চাপড়ায় বুক,
যেন কারবালায় ফের ইমাম হোসেন
হয়েছেন খুন, স্বজনেরা তাঁর ‘হায়,
খোদা! হায় খোদা!’ বলে করছে ক্রন্দন;
যেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব
সিরাজউদ্দৌলা ফের হয়েছে শহীদ
মহম্মদ আলী বেগের ক্রুর ছুরির
আঘাতে, লুৎফা বেগম তার কন্যাকে
বুকে নিয়ে জুড়েছে ক্রন্দন হা-হা রবে
বাংলার বাতাসে। সে-ক্রন্দনে থরথর
কাঁপছে আকাশ, কাঁপছে জগতময়
কোটি মানুষের আহত বিবেক; আর
মেঘনা-যমুনা-পদ্মা ও মধুমতীর
মিষ্টি পানি হঠাৎ রক্তিম হয়ে, স্থির
হয়ে গেল, পেলো না কখনো আর যারা
ফিরে খরস্রোত, প্রিয় মুজিবের শোকে।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘মহাশোক পর্ব’; নাম ‘দ্বাদশ সর্গ’।

—–সমাপ্ত——

মুজিবনামা / সায়ীদ আবুবকর

একাদশ সর্গ

পনেরো আগস্ট শেষ রাতে, নেমে এলো
আসমান থেকে ফেরেস্তা আজরাইল
সৌম্যমূর্তি ধরে। হাতে ফুল, শুভ্র কেশ;
এসে কি-বিনম্র পায়ে করতে লাগলো
হাঁটাহাঁটি ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে,
২৭ মিন্টো রোডে আর শেখ ফজলুল
হক মনির ধানমন্ডির বাসস্থানে;
তিন জায়গায় একসাথে এক রূপে
হাঁটতে লাগলো তাঁর অলৌকিক পায়ে।
চিন্তামগ্ন হাঁটছে সে একা, ঘুরে ঘুরে;
হাতে বাঁধা সোনার ঘড়ির দিকে তীক্ষ্ন
চোখে তাকাচ্ছে বারংবার; থেকে থেকে
ঘুমন্ত বাড়ির সবগুলো জানলা দিয়ে
মারছে কৌতূহলে ঊঁকি-ঝুঁকি। তাই দেখে
থরথর করে, যেন বাতাসে বটের
পাতা, কাঁপছে বঙ্গমাতা বেগম মুজিব।
কাঁপছে হাত-পা তাঁর। ঘামছে কপাল।
শুকিয়ে আসছে গলা। ভীষণ তৃষ্ণায়
এক গ্লাস পানির উদ্দেশে ছুটলেন
তিনি হাজেরার মতো, ডাইনিং রুমে।
জগগুলো পড়ে আছে খালি। কলসিতে
পানি নেই। ট্যাপগুলো শুকিয়ে আমড়া-
কাঠ। এক ফোঁটা পানি নেই কোনোখানে,
যেন কারবালা হঠাৎ এ বাড়ি। তিনি
ডাকলেন উচ্চৈঃস্বরে “কামাল! কামাল!”
বলে কতবার, এলো না উত্তর। সব
ঘুমাচ্ছে মড়ার মতো সারা বাড়ি। নেই
সাড়াশব্দ কারো, কোনোখানে। উবে গেল
তৃষ্ণা তাঁর আস্তে আস্তে, কর্পূরের মতো।

ধীর পায়ে তিনি, অসীম সাহস বুকে
নিয়ে, দাঁড়ালেন এসে জানলার কাছে;
“এই যে, শোনেন” বলে ডাকলেন, একা
পায়চারি করা লোকটাকে। তাঁকে দেখে
লুকালো সে অন্ধকারে, কারো উপস্থিতি
টের পেয়ে যেভাবে লুকায় তস্কর। ‘হা-
খোদা, সর্বশক্তিমান; শ্রেষ্ঠ রক্ষাকারী!’
ঘামতে ঘামতে তিনি ফিরলেন বেডে;
এক নজর দেখলেন চেয়ে-মহামান্য
প্রেসিডেন্ট বাংলার, বঙ্গবন্ধু, তাঁর
স্বামী, শুয়ে আছে কি-শান্তিতে, তাঁর পাশে!
‘লা-হাওলা অলা কুয়াতা’ বলে মারলেন
ছুঁড়ে থুঁতু শয়তানের উদ্দেশে তাঁর
শিয়রের বাম দিকে; তিন বার করে
কলেমা তৈয়েবা ও কলেমা শাহাদাত
করলেন পাঠ মনে মনে; অতঃপর
বুজলেন চোখ কেবলার দিকে ফিরে।

গভীর নিদ্রায় ডুবে আছে লোকজন
তিন বাড়ি। ছিলো মেতে আনন্দ-আহ্লাদে
সারা সন্ধ্যা শেখ মুজিবের সাথে। তিনি
মহান বিপ্লবী নেতা বাংলার; সেই
সাথে প্রিয় পিতাও যে তিনি তিন পুত্র
শেখ কামাল, জামাল আর রাসেলের;
শেখ নাসেরের প্রিয় ভ্রাতা; ফজলুল
হক মনির দরদী মামা; আবদুর
রব সেরনাবিয়াতের প্রিয় ভগ্নিপতি;
সুলতানা কামাল ও রোজি জামালের
স্নেহার্দ্র শ্বশুর। কত দাবি সকলের,
আর কত শত আবদার! কি-গভীর
ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালবাসা নিয়ে তারা সব
ঘোরে তাঁর চারদিকে। কি-স্বর্গীয় সুখ
এইসবে! প্রিয় পত্নী ফজিলাতুন্নেছা;
আকাশের মতো তাঁর বিশাল হৃদয়;
সে-হৃদয় দিয়ে তিনি মাতিয়ে রাখেন
সারা বাড়ি, যত্ন আত্তিতে। যে-আসে তাঁর
কাছে, সে আর চায় না যেতে দূরে, পর
কি আপন। খানাপিনা, গল্প-আড্ডা শেষে
কি-শান্তিতে শুয়ে আছে সব! চোখ জুড়ে
শুধু সুখ, শুধু স্বপ্ন। এপাশ ওপাশ
করছেন শুয়ে শেখ নাসের। অনেক
দিন হলো, এসেছেন তিনি। খুব ভোরে
হয়েছিলেন রওনা খুলনার উদ্দেশে
ভাইকে না বলে। লোক দিয়ে রাস্তা থেকে
ফিরিয়ে আনেন বঙ্গবন্ধু। হেসে দিয়ে
বলেন, “আমাকে ফাঁকি দিয়ে, চেয়েছিলি
পালাতে তো? পারলি না। ধরা পড়ে গেলি।”
বাংলার শাসক তিনি; তবু একবারও
ভোলেন না ডুবিয়ে রাখতে স্নেহাদরে
প্রাণের এ ভাইটিকে। জানে না এখনো
তাঁরা, অদৃষ্ট তাঁদের বেঁধেছে কি শক্ত
অমর বন্ধনে। খানাপিনা শেষে ফিরে
গেছে সেরনিয়াবত ২৭ মিন্টো রোডে
নিজের নিবাস আর ধানমন্ডি শেখ
মনি তাঁর শান্তি-নীড়ে। স্ত্রী আরজু মনি
অন্তঃসত্বা। পেটের সন্তান রাত্রিদিন
নিচ্ছে পৃথিবীর মুখ দেখার প্রস্তুতি;
যখন সয় না তর, তুলতুলে পায়ে
জোড়ে লাথি; বার বার জাগে তার মাতা
মধুর ব্যথায় সারা রাত। আজও রাতে
যথারীতি জেগে উঠে, শিশুর পিতার
পাশে বসে কল্পনায় দেখতে দেখতে
অনাগত সন্তানের কচি মুখ, ফের
ঢলে পড়ে পরম শান্তিতে মহাঘুমে।
শেষ রাতে মারামারি, কাটাকাটি আর
গোলাগুলির দুঃস্বপ্ন দেখে, ধড়পড়
করে উঠলো সে জেগে ফের। উঠে “মা! মা!”
বলে কাতরালো একবার, দুইবার।
তারপর পুনরায় ঢলে পড়লো অথৈ
ঘুমের ভেতর। আজরাইল এসে ফের
করতে লাগলো হাঁটাহাঁটি। তার ভারী
পায়ের আওয়াজে ভেঙে গেলে কাঁচা ঘুম,
আতঁকে উঠলো বেবি সেরনাবিয়াত;
ঠোঁট ফুলিয়ে সে কাঁদলো কয়েকবার;
তারপর ঘুমিয়ে পড়লো একা একা।
দুধ দেয়া অবলা গাভীটা হাম্বা হাম্বা
রবে ডেকে উঠলো তিনবার; তার ডাক
ভাঙাতে পারলো না কারো ঘুম; অতঃপর
সে নিশ্চুপ হয়ে গেল। প্রহরী অবাক
হলো হাম্বা হাম্বা ডাক শুনে এত রাতে।
হয়তো সৌখিন গাভী মশার কামড়ে
হয়েছে উত্যক্ত, ভাবলো সে। তারপর
কান খাড়া করে শুনতে লাগলো চুপচাপ
মহাকাল-তরঙ্গের কলকল ধ্বনি।

উঠলো গর্জন করে বাইরে বন্দুক।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই, পড়ে গেল
সশস্ত্র প্রহরী-একজন-দুইজন-
এক এক করে সকলেই। ঘাতকেরা
ছুঁড়ছে বৃষ্টির মতো গুলি; ছুঁড়তে ছুঁড়তে
এগিয়ে আসছে তারা, যেন ঘূর্ণিঝড়।
ধুলাতে গড়িয়ে পড়ার আগে, কে যেন
শেষ-উচ্চারণ রেখে গেল কেঁপে ওঠা
বঙ্গজ বাতাসে-“পারলাম না রুখতে,
হে রজনী, তীক্ষ্ন তোর খড়গের আঘাত।
জীবনের আলো শেষে সরে যাচ্ছে দূরে,
বহু দূরে। রক্তচক্ষু সীমারের দল
জারজ আঁধার চিরে, পড়ছে ক্রমশ
ঢুকে বত্রিশ নম্বরে। ধিক, হে প্রহরী,
ব্যর্থ হয়ে গেল তোর মানবজীবন!”
কে শুনলো তার কথা আড়ষ্ট বাতাসে,
জানতে পারলো না সে। সাক্ষী তার রয়ে
গেল, শুধু কয় ফুট রক্তরাঙা পথ।
তারপর আরও রক্ত। আলতা-রঙ সেই
রক্তের উপর উজান রক্তের স্রোত।
কৃষ্ণ সেই স্রোতে পা ডুবিয়ে, সীমারেরা
উদ্ধত এগিয়ে গেল প্রাসাদের দিকে।

খুনীরা হয়েছে একত্রিত। সাফল্যের
দ্যুতি করতেছে চিকচিক সব মুখে।
মেজর রশিদ এসে বললো সোল্লাসে,
“মিন্টো রোড ও ধানমন্ডির অপারেশন
সাকসেসফুল। সেরনিয়াবত আর
ফজলুল হক মণি হয়েছে খতম
সপরিবারে। এখন শুধু বাকি শেখ
মুজিবুর রহমান। যত দ্রুত পারো,
পাঠাও পালের গোদাটাকে জাহান্নামে।
নেই হাতে সময় মোটেই। জলদি করো।”
“জয় খন্দকার মোস্তাকের জয়!” বলে
ছুটে গেল বিদ্রোহীরা গেটের ভেতর।

উঠলেন জেগে শেষে বাংলার বীর।
হৃদয়ে স্বদেশ নিয়ে, বেশিক্ষণ নয়,
গিয়েছিলেন ঘুমিয়ে। কুসুমপ্রেয়সী
ফজিলাতুন্নেসা তাঁর পাশে। স্বপ্ন দেখে
বারবার জেগে উঠে, পড়ছিলেন ঢলে
আবার নিদ্রার কোলে। তিনিও সত্রাসে
উঠলেন জেগে, বাইরে শুনতে পেয়ে
গুলির আওয়াজ। ধরলেন ত্রস্ত হাতে
এঁটে স্বামীর দুহাত।- “দুঃস্বপ্নে আমার
ভেঙে গেল ঘুম। দেখলাম এইমাত্র
স্বপ্নে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব
সিরাজুদ্দৌলাকে। দেখলাম মহম্মদী
বেগ কি-নির্মম হাতে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে
বাংলার হৃৎপিন্ড। আমার যে করতেছে
খালি ভয়! বাইরে শুনতে পাচ্ছি ওই
কিসের আওয়াজ? আবার কি পলাশীর
আমবনে ফেলছে লর্ড ক্লাইভ তার
কামানের গোলা আর সেনাপতি মীর
জাফর দেখছে তামাশা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?”

বললেন মহাবীর, “শান্ত হও, রেনু।”
বলে তিনি উঠালেন হাতে টেলিফোন-
সেট। শেষ এই রাত্রি যেন পড়ে গেছে
ঝড়ের কবলে আচানক। মহুর্মুহু
গর্জন বাতাসে। তখনও পায়নি টের
৩২ নম্বরের বাসিন্দারা, ক্ষুব্ধ অথৈ
দরিয়ায় খাচ্ছে হাবুডুবু জীবনের
তরণী তাদের। রিসিভার তুলে তিনি
করলেন ডায়াল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে।
বেজেই চলেছে ফোন। ধরছে না কেউ।
কার এত বুকের পাটা এ বাংলায়-
শেখ মুজিবুর রহমান করে ফোন
কিন্তু করে না রিসিভ! থমকে গেলেন
মহাবীর। চোখের পর্দায় তাঁর ভেসে
উঠলো মুহূর্তে, উত্তাল সাতই মার্চ,
পঁচিশে মার্চের কালো রাত্রি আর রক্ত-
ক্ষয়ী একাত্তর। বাংলার মানুষ যাঁর
একটা হুঙ্কারে লাফিয়ে পড়তে পারে
লাখে লাখে মৃত্যুর গহ্বরে, ভয়হীন;
আর যাঁর ডাকে পতঙ্গের মতো নীল
অগ্নিচুল্লিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দিতে পারে
আত্মাহুতি ত্রিশ লক্ষ বীর নির্দ্বিধায়-
সে-ই মুজিব করছে ডায়াল অথচ
করছে না রিসিভ, কে এমন নরাধম
আছে এ বাংলায়? শত্রুরা ফেলেছে ঘিরে
তাঁর বাড়ি, চতুর্দিক থেকে; পারলেন
বুঝতে তিনি। হায়! এখন উপায়? এরা
কারা? আর্মি জোয়ানেরা? বাংলার আর্মি
কেন মুজিবের বত্রিশ নম্বরে, কার
ইশারায়, কার নির্দেশে? কোথায় তবে
রক্ষিবাহিনী তাঁর? কাটছে কি ঘাস তারা,
যখন ফেলেছে ঘিরে হায়েনার মতো
বাংলার স্থপতি শেখ মুজিবের গৃহ?
চলছে তুমুল গোলাগুলি- “হায়, রেনু,
খুলে দাও দোর, দেখি কোন্ শৃগালের
বাচ্চারা পড়েছে হামলে বাঘের বাড়ি!”
পথরুদ্ধ করে আছে পত্নী তাঁর, “না, না!
আপনি যাবেন না কোথাও; আপনাকে
মেরে ফেলবে ওরা। কোথাও দেবো না যেতে
আপনাকে আমি।” বলে স্বামীকে জড়িয়ে
ধরে কাঁদতে লাগলেন বেগম মুজিব।
চলেছেন ডায়ালের পর ডায়াল করে
বিভিন্ন নম্বরে; করে না রেসপন্স কেউ।
বহু কষ্টে একটা নম্বরে অবশেষে
মিললো জবাব, তিনি তাঁর মিলিটারি-
সেক্রেটারি কর্নেল জামিল উদদীন।
ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি। উঠলেন লাফিয়ে,
ঢুকলো কর্ণকুহরে যেই মুজিবের
আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর-“কর্নেল জামিল,
শেখ মুজিব বলছি। আর্মি-জোয়ানরা
হামলা করেছে আমার বাসায়। দ্রুত
পদক্ষেপ নাও। তা নইলে সবাইকে
শেষ করে ফেলবে। কোথায় আমার রক্ষি-
বাহিনী, পাঠাও এক্ষুণি। খতম করে
ফ্যালো মীর জাফরের প্রেতাত্মাগুলোকে।”
“আমি দেখছি, স্যার।” বলে ছুটলেন তিনি
সেই অবস্থায়, রুদ্ধশ্বাসে প্রেসিডেন্ট
শেখ মুজিবুর রহমানের বাসাবাড়ি
বত্রিশ নম্বরে। পথিমধ্যে হলো দেখা
প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড রেজিমেন্টের
সাথে। তাদেরকে ঘুরতে বললেন তিনি
শেখ মুজিবের বাসভবনের দিকে:
“আক্রান্ত প্রেসিডেন্টের বাড়ি! দ্রুত চলো।”
অস্বীকার করলো তারা। হায়, কি-ঔদ্ধত্য!
শত্রুরা প্রেসিডেন্টের গৃহে। তবু তারা
করছে অস্বীকার যেতে উদ্ধারাভিযানে।
হায় খোদা! পেতেছে মীর জাফর বুঝি
ষড়যন্ত্রজাল ফের সোনার বাংলায়!
শান্তস্বরে, আবেগ ও যুক্তি দিয়ে, গোটা
পরিস্থিতি বুঝালেন তিনি। তবু তারা
করলো না কর্ণপাত। অগত্যা কর্নেল
জামিল সশস্ত্র ছুটলেন একা একা।
কী পেয়েছে কাপুরুষের বাচ্চারা, করে
গুলি শত বছরের সাধনায় পাওয়া
মহামানব, বাংলার বিপ্লবী পুরুষ,
স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবের
বাসস্থানে? এসে দেখলেন তিনি, করছে
গুলি বেপরোয়া, বিদ্রোহী সৈন্যরা। গেট
ভেঙে অন্দরমহলে প্রবেশের করছে
চেষ্টা। নিয়েছে সিঁড়ির নিচে অবস্থান;
কিছু আছে বাড়ির প্রবেশপথে। কিছু
বুঝে ওঠার আগেই, রয়েল বেঙ্গল
টাইগার যেন, পড়লো ঝাঁপিয়ে বুনো
শূকরের ’পরে অকস্মাৎ। ছুঁড়লেন
গুলি অব্যর্থ নিরিখে কর্নেল জামিল;
পড়লো লুটিয়ে ধুলোয়, সৈনিক এক।
বাকিরা দাঁড়ালো ঘুরে, হতবিহ্বল;
দেখা গেল মুখ মেজর ডালিম, নূর
চৌধুরী, মেজর হুদা, মেজর রশিদ,
মেজর ফারুক, মহিউদ্দিন আহমেদ
প্রমুখ পাপিষ্ঠ বিদ্রোহীর। ছাড়লেন
হুঙ্কার ব্যাঘ্রের কণ্ঠে বিক্ষুব্ধ জামিল,
“ফিরে যাও সব ব্যারাকে। সময় আছে।
কী চাও তোমরা, শুনবো আমরা সব।
তা নইলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।
রেহাই পাবে না কেউ। কী হলো, উত্তর
দাও।” “তবে রে, পা চাটা কুত্তা মুজিবের!”
বলে টেনে দিলো ব্রাশ উদ্ধত মেজর
ডালিম, সরোষে। “হায়, খোদা!” বলে ঢলে
পড়লেন মুজিবপ্রেমিক মহাবীর
রাতের আঁধারে; হা-হা রবে হেসে উঠলো
ক্রুর শয়তানী হাসি ঘৃণ্য পাতকেরা।
গৌরবের মৃত্যুর আগে, অস্ফুটস্বরে
বললেন মহাবীর: “বদলা নেবেই
জাতি একদিন এ-হত্যার। শুনে রাখ,
পাপিষ্ঠেরা, ক্ষমা তোরা পাবি না কখনো
বাংলার মানুষ ও খোদার দরবারে।”

ঘাতকের দল বিজয়উল্লাসে মেতে
উঠলো ধ্বংসযজ্ঞে। খই ফোটার মতো
ফুটছে গুলি। সে-গুলিতে পড়লো লুটিয়ে
বঙ্গবন্ধু-তনয় শেখ জামাল। তাঁর
ক্রন্দনে থমকে গেল রাতের বাতাস।
পদ্মামেঘনায় উঠলো তুফান মহা-
শোকের। ব্যথার শিশির ঝরিয়ে দিলো
আকাশ, বাংলার ঘাসে ঘাসে। শুধু ঘৃণ্য
ঘাতকেরা হাসতে লাগলো প্রাণখোলা
হাসি আর ঝাঁপিয়ে পড়লো পূর্ণোদ্যমে
অকাতর হত্যা-অভিযানে। বলছেন
ক্রুদ্ধস্বরে বঙ্গবন্ধু : “সব বেইমান!
কি-স্পর্ধা দ্যাখো, মুজিব ফোন করে, তবু
ধরে না কে এম শফিউল্লাহ, চিফ
অব আর্মি স্টাফ; ডিজিএফআই-এর
এয়ার ভাইস মার্শাল আমিনুল খান
ধরে না আমার ফোন। স্বাধীন করেছি
এই দেশ এইসব বিশ্বাসঘাতক
বাঙালীর জন্যে? হায়, রেনু, ছাড়ো পথ,
দেখে নিতে চাই আমি কুলাঙ্গারগুলো;
কী-সাহসে ঢোকে তারা শেখ মুজিবের
বাড়ি শেষ রাতে! বাইরে কেবলি ভারি
বুটের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি কেন? কই
গেল আমার কামাল জামাল রাসেল?
তাঁদের আওয়াজ কেন শুনতে পাচ্ছি না,
হায়? কর্নেল জামিল-সেই বা কোথায়!
বললো আসছি; কতক্ষণ লাগে আসতে
এখানে! আমি কি বসে চুষবো আঙুল
যখন দস্যুরা করতেছে তছনছ
আমার নিবাস; খুলে দাও তুমি দোর;
ফজিলা, আমাকে আটকে রেখো না আর।”

বুটের আওয়াজ ছাড়া ঘরের বাইরে
আর কোনো শব্দ নেই। সিঁড়ি দিয়ে কারা
সব ভারী পায়ে করতেছে ওঠানামা।
বেগম মুজিব, বর্ষার আকাশ যেন,
কাঁদছেন ঝরঝর আর কাঁপছেন
ভয়ে; স্বামীর দুহাত ধরে কি-করুণ
চেয়ে আছেন মুখের দিকে তাঁর, আর
বলছেন উচ্চৈঃস্বরে, “আমার জামাল-
কামালকে ওরা মেরে ফেলবে; শিগগির
করুন একটা কিছু । ইন্দিরা গান্ধীকে
ফোন দেন। আপনার বিশ্বস্ত বন্ধু তিনি।
তিনি নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবেন কোনো।”

বললেন বঙ্গপতি, “দিয়েছে বিচ্ছিন্ন
করে আগে থেকে সমস্ত লাইন মীর-
জাফরেরা, বিদেশের সাথে। চেষ্টা আমি
করেছি অনেক, কাজ হয় নাই। রেনু,
বৃথা আর কালক্ষেপণ। আমাকে যেতে
দাও। দেখি কী-সাহসে অমানুষগুলো
ঢুকেছে আমার বাড়ি আর কী উদ্দেশ্যে!”
বলেই হেঁচকা টানে ফেললেন খুলে
স্ত্রীর দুর্বল বাঁধন। ক্ষিপ্র হাতে তিনি
দরোজা খুলেই ছাড়লেন বজ্রনাদ,
যা শুনে পালালো দৌড়ে ইঁদুরের মতো
সৈনিকেরা, সিঁড়ি দিয়ে। এসেছেন ছুটে
পাছপাছ বেগম মুজিব; -“আপনার
সাথে আমি যাবো। বাঁচতে চাই না আমি
আপনাকে ছাড়া।” বলে কাঁদছেন অঝোরে।
এগিয়ে গেলেন মহানেতা মহাক্রোধে
সিঁড়ির নিকট। পড়ছে ঠিকরে ঠিকরে
ক্রোধাগ্নি চাহনি থেকে তাঁর। চালিয়েছে
হত্যাযজ্ঞ যারা এতক্ষণ ধরে সারা
বাড়ি, ফাঁটা বেলুনের মতো চুপসে গেছে
তারা ভয়ে। রুমে রুমে করছিল তল্লাশি
মেজর মহিউদ্দিন, বজলুল হুদা
ও মেজর নূর চৌধুরী। খুঁজছিল তারা
হন্যে হয়ে শেখ মুজিবকে। সিঁড়ি দিয়ে
উপরে ওঠার পথে মুজিবকে দেখে
ঘাবড়ে যায় মেজর মহিউদ্দিন; সে
দ্যাখে যেন সর্ষেফুল চারদিকে। দ্যাখে,
এক সৌম্যপুরুষ, পাইপ হাতে, সাদা
পাঞ্জাবি গায়ে, ধুসর চেক লুঙ্গি পরা,
নির্ভীক দাঁড়িয়ে আছে, যেন হিমালয়।
ভাষা হারিয়ে সে শুধু বলে, “স্যার! স্যার!
আপনি আসেন।” গর্জে ওঠেন মুজিব,
“কী চাস তোরা? এসেছিস হত্যা করতে
আমাকে? ভুলে যা। পারবি না। পারেনি যা
পাক-আর্মিরা, করতে চেয়েছিস তোরা
তাই? সাহস থাকে তো গুলি র্ক।” চেয়ে
রইলেন বীর নির্ভীক নয়নে। ফোন
করেছেন তিনি কয়েক জায়গায়। কাল-
ক্ষেপণ করছিলেন শুধু, যাতে কোনো
সাহায্য পৌঁছায় এসে এর ফাঁকে। আশা
কর্নেল জামিল। বহু ভরসার সেই
বিশ্বস্ত জামিল তাঁর হয়েছে শহীদ
পাপীদের হাতে ইতোমধ্যে, জানা নেই
তাঁর। নিস্তব্ধতা চারদিকে। ধূর্ত নূর
চৌধুরীর ইশারায় সরে গেল এক
পাশে মেজর মহিউদ্দিন। সাথে সাথে
মহাপাপী নূর টেনে দিলো স্টেনগান
তাক করে বাংলার সিজার, মেঘনাদ
মহাবঙ্গের, নবাব সিরাজুদ্দৌলার
সুযোগ্য উত্তরসূরী, বাঙালীর স্বপ্ন-
পুরুষ, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতা,
মহান রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিবের
সুসবুজ বুক। সাথে সাথে প্রাণঘাতী
আটটি বুলেট করে দিলো ঝাঁঝরা তাঁর
শুভ্র বক্ষদেশ। পড়লেন হুমড়ি খেয়ে
সিঁড়ির উপর স্বাধীনতার স্থপতি,
বাংলার রাখালরাজা শেখ মুজিবুর
রহমান। ফিনকি দিয়ে পড়ছে গড়িয়ে
রক্ত নয়, যেন বাংলার হৃৎপিন্ড চিরে
বহু শতাব্দীর জমাট ক্রন্দন। “হায়,
খোদা! আনলে ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে তাঁকে
বাঁচিয়ে বাংলায়, এভাবে মরবে বলে
ভীরু কাপুরুষ ভ্রষ্টা বাঙালীর হাতে?
কী দেখালে, প্রভু! না, না, দেখতে চাই না
আমি! দেখতে চাই না-” বলে চোখ বুজে
জুড়লেন আর্তনাদ বঙ্গমাতা হা-হা-
রবে। হন্যে শেয়ালের মতো বজলুল
হুদা টানতে টানতে তাঁকে নিয়ে গেল
একপাশে। ছাড়লো হুঙ্কার অতঃপর:
“জলদি খতম করে ফ্যালো সব। কেউ
যেন বাঁচতে না পারে। চালাও তল্লাশি।
সব ঘর। সব টয়লেট। কে কোথায়
লুকিয়েছে দ্যাখো। তন্ব তন্ব করে দ্যাখো।
কাউকেই দেবে না রেহাই। কেউটের
বাচ্চাও কেউটে সাপ-একথা যেয়ো না
ভুলে।” পড়ে গেল ছুটোছুটি দোতলায়,
যেন চার পায়ে দাঁতাল শূকর ছুটছে
মত্ত হয়ে; প্রাণহীন বুটের আওয়াজে
হয়ে গেল মুহূর্তেই জ্বলন্ত হাবিয়া
মহান নেতার বাড়ি বত্রিশ নম্বর।

কাঁদছেন বেগম মুজিব পতিশোকে;
করছেন ছটফট, যেন কোনো গলা-
কাটা কবুতর; আর ঘাতকের কাছে
বারবার করছেন করুণ মিনতি:
“আমাকে মারতে চাস? বেশ, মেরে ফ্যাল্
এখানেই। মুজিবের লাশের পাশেই
রেখে যা রে তাঁর বেগমের লাশও।” কার
কথা কে বা শোনে, যখন চড়েছে খুন
মস্তকে! মেজর হুদা ঠেলতে ঠেলতে
নিয়ে গেল তাঁকে বেডরুমের দরজার
কাছে। এক হাতে ঠেসে ধরে দেয়ালের
সাথে, করে দিলো এক গুলিতেই স্তব্ধ
চিরতরে নারীশ্রেষ্ঠ, বাঙালীর মাতা,
ফজিলাতুন্নেছাকে। একটিবারও, হায়,
কাঁপলো না জাহান্নামী সীমারের হাত
জননীসদৃশ, পূত রমণীনিধনে।
পড়লেন ঢলে তিনি মেঝের উপর;
ভাসতে লাগলো যেন বেহেস্তের ফুল
লাল টকটকে শোণিতের স্রোতে। হন্যে
হুদা লাথি মেরে তাঁর পবিত্র শরীরে
ছুটলো নতুন কোনো শিকারের খোঁজে।

হরিণের বনে যেন পড়েছে হঠাৎ
হামলে, বুভুক্ষু বাঘ এক পাল; যাকে
পায়, তাকে ধরে; ভাঙে তার ঘাড়। খুনী
সৈন্যরা নির্মমভাবে করলো হত্যা একে-
একে জামাল, কামাল, অতঃপর দুই
পুত্রবধূ রোজি জামাল ও সুলতানা
কামালকে। মৃত্যুর ভয়ে শেখ নাসের
লুকিয়ে ছিলেন টয়লেটে। ঘাতকেরা
আনলো দরজা ভেঙে তাঁকে ধরে। তিনি
ব্যবসায়ী খুলনার। সরল মানুষ।
সারা বাড়ি এত মৃত্য আর রক্ত দেখে
কাঁপছেন থরথর। মরতে কে চায়
এ জগতে! হাতজোড় করে বললেন
তিনি, “আমাকে মেরো না। আমি তো করি না
রাজনীতি কোনো। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে
আমি আছি।” তাঁর কথা শুনে ঘাতকেরা
হায়েনার হাসি হেসে বললো উল্লাসে;
“ঠিক আছে। মারবো না। চল তবে নিচে
যাই।” অতঃপর দাঁড় করিয়ে পশ্চিম
দিকে, তার পশ্চাতে ছুঁড়লো তারা গুলি।
হায়, মৃত্যু, বর্বর এমন মৃত্যু, কবে
দেখেছে কোথায় কেবা! দুই ভাবী রোজি
ও সুলতানার মৃত্যু দেখেছে রাসেল
লুকিয়ে খাটের তলে। দশ বছরের
শিশু মৃত্যুভয়ে যেন জড়োসড়ো এক
খরগোশছানা। জল্লাদেরা খুঁজে খুঁজে
তাকেও আনলো ধরে। কাঁদতে লাগলো
ভয় পাওয়া শিশু ‘মা! মা!’ করে। কাঁপে
আসমান সে-শিশুর নির্মল ক্রন্দনে।
তবু ঘাতকের দল কি-পুলকে হেসে
যায় গড়াগড়ি! বললো সে, “মার কাছে
যাবো আমি। আমাকে আমার মার কাছে
নিয়ে যাও।” বেচারার আর্তনাদে কেঁপে
উঠলো বক্ষ এক সহযোগী সৈনিকের;
বাঙালী সে, তার উপর এক পিতা; দীর্ণ
তার পিতৃহৃদয় সোনালি শিশু শেখ
রাসেলের সকরুণ মুখ দেখে ভেসে
গেল করুণ মায়ায় শেওলার মতো;
অশ্রুছলোছল চোখে মেজর পাশার
হাত ধরে করলো সে অনুনয়: “স্যার,
ছেড়ে দিন ওকে।” একথার বিনিময়ে
দিতে হলো প্রাণ তাকে তৎক্ষণাৎ, শেখ
রাসেলের আগে। যেন আজরাইল এরা,
মৃত্যু ছাড়া দেওয়ার কিছু নেই; দয়া-
অনুকম্পা, ভালবাসা, স্নেহ কোনোদিন
দ্যাখেনি হৃদয়ে ছুঁয়ে। ‘সাপের বাচ্চাও
সাপ’- এ প্রবাদে বিশ্বাসীরা ‘মার কাছে
চলো’ বলে নিয়ে গেল শেখ রাসেলকে
তুলে। যখন বাঁধলো তারা তার হাত,
“আমাকে মেরো না! আমাকে মেরো না!” বলে
করতে লাগলো আহাজারি। হায়, পিতা,
মহান মুজিব, ভাগ্যবান আপনি, এই
দৃশ্য দেখার আগেই বুজেছেন চোখ
চিরতরে। হায়, মাতা, ফজিলাতুন্নেছা,
আপনার প্রাণের ধন রাসেলের কান্না
শোনার আগেই অনন্ত ঘুমের দেশে
গেছেন আপনি চলে, ভাগ্যবতী আপনি!
দেখতে হলো না আপনাকে, বুলেটের
আঘাতে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া রাসেলের
বুক। হায় রে, ঘাতক, রাসেলের বক্ষ
নয়, দিয়েছিস বুলেটে ঝাঁজরা করে
তুই বাংলার হৃৎপি-; ধিক তোকে!

সারি সারি পড়ে আছে লাশ, যাঁরা কোনো
প্রতিরোধ ছাড়া পড়েছে মৃত্যুর কোলে
ঢলে। পুরাকালে কোষবদ্ধ তরবারি
নিয়ে ঘুরতো রাজারা; রাজপুত্রগণ
পেতো উপহার রত্ন-খচিত সুতীক্ষ্ন
তলোয়ার, রাজাদের কাছ থেকে; তাই
দিয়ে সাজিয়ে রাখতো তারা রাজবাড়ি;
কি-সাহস দুর্বৃত্তের, ফ্যালে এক পা-ও
সে-বাড়ির দেউড়িতে! সাম্রাজ্যের চেয়ে
বড় সম্রাট; থাকেনি সাম্রাজ্য কোথাও
টিকে, তাঁর কিংবা তাঁর সুযোগ্য উত্তরা-
ধিকারীর অবর্তমানে। গড়েছে দুর্গ
তাই রাজাবাদশারা যুগে যুগে। নেই
সেই লালবাগ কেল্লা; তাই অরক্ষিত
বড্ড আজ রাজার জীবন। এ কেমন
রাজ্যশাসন, অন্যের হাতে তুলে দিয়ে
নাঙ্গা তলোয়ার, চেয়ে থাকে রাজা তার
অনুকম্পার দিকে-অস্ত্রহীন, ভিখারীর
মতো। আসুক আবার ফিরে ঈশা খাঁর
খাপখোলা খড়গের সভ্যতা; বাঙালীর
বীরত্ব আবার দেখুক জগত। দাও
অস্ত্র তুলে ফের মহাবীর মুজিবের
হাতে; তারপর, হে ঘাতক, কাপুরুষ,
ভেড়ার শাবক নূর, দেখাও তোমার
বাহাদুরি জগতবাসীকে। ধিক তারে,
নিরস্ত্র জনে যে হর্ষে হানে তলোয়ার
আর বীর বলে করে বাহাদুরি! কাকে
বলে বীর? বীর অর্থ কি রাত্রির বোবা
অন্ধকারে নিরস্ত্র পুরুষ-নারী-শিশু
হত্যা করা নি্ির্বচারে? সমান শক্তিতে
মুখোমুখি হয়ে যে-দেয় গুড়িয়ে মহা-
রোষে মানসিংহের শাণিত কৃপাণ
এক ঘায়ে, বীর তাঁকে বলে ইতিহাসে।
কি-উল্লাসে তবু সব জারজ চন্ডাল
করতে লাগলো নাচানাচি জনকের
লাশ ঘিরে-“স্বৈরাচার নিপাত যাক!
মুজিব নিপাত যাক! বাকশাল নিপাত
যাক! খন্দকার মোশতাক-জিন্দাবাদ!
বাংলাদেশ- জিন্দাবাদ!” বলে বলে। হায়,
বর্বর মূর্খেরা, কী দিয়ে মুছবি বল্
বাংলার বক্ষ থেকে ‘জয় বাংলা’ আর
জনকের নাম, যখন হৃদয়ে লেখা
কোটি বাঙালীর ‘স্বাধীনতার স্থপতি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’,
জন্ম যাঁর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া,
ঊনিশ শ বিশ সালে, তারিখ সতেরো
মার্চ, পিতা শেখ লুৎফর রহমান,
মাতা সায়েরা খাতুন; পনেরো আগস্ট
ঊনিশ শ পঁচাত্তরে বরণ করেন যিনি
শাহাদত, কতিপয় উচ্চ-অভিলাষী
পথভ্রষ্ট কাপুরুষ সৈনিকের হাতে।

মুজিবনামা মহাকাব্যের ‘ম্যাসাকার পর্ব’; নাম ‘একাদশ সর্গ’।