যেই আবর্তে গড়ে উঠি (খন্ডাংশ)-০২

কিছুদিন আগে আমার দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাবা মারা গেলেন। অফিসে বসে খবর পেলাম রাত নয়টায় মোহম্মদপুর কবরস্থানে দাফন হবে। অফিসের পর অনেক ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে ছুটে গেলাম। শোকার্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার কিছু দুর্বলতা আছে। সারাটা পথই ভাবতে ভাবতে গেছি ওখানে গিয়ে কিভাবে ব্যাপারটা মোকাবেলা করব। যেয়ে দেখি ব্যাপারটা খুবই সহজ। তখনও লাশ এসে পৌঁছায়নি। আমাদের বন্ধুমহলের অনেকেই আছে। সেখানকার মসজিদের ভিতরে এবং বাইরে দাঁড়িয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে লাশের সাথে আসা আমার বন্ধুর সাথে হাত মেলাতে গিয়েই বুঝলাম জীবন চলছে খুব স্বাভাবিক গতিতে। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। শুধু খাটিয়ায় একজন শুয়ে আছে যার ভিতর কোনো চাঞ্চল্য নেই। জানাজার পরে কবরস্থানে গিয়ে দেখি পাশাপাশি এত কাছাকাছি গায়ে গা লাগিয়ে কবরগুলো যে তার মধ্যে হাটাচলা করা বা নতুন কবর খোড়া এবং লাশ নামানো এক দুরুহ ব্যাপার। আমি গ্রামের ছেলে। ফাঁকা জায়গায় বনের মধ্যে নিঃসঙ্গ কবর দেখে অভ্যস্ত। এটা আমার কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা। কবরস্থানে টিমটিমে লাইট জ্বলছিল আর সেই স্বল্প আলোয় কবরে মাটি দিয়ে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা যখন বন্ধুরা মিলে একটা গেট টুগেদারের আমেজে নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করছিলাম তখন সবাই ভুলেই গেছি ওটা কোন এক শোকের উপলক্ষ্য ছিল। আমি শুধু ভাবছিলাম সেই ব্যক্তির কথা যাকে আমরা কিছুক্ষণ আগে মাটির নিচে রেখে এসেছি আর দুনিয়ার সমস্ত বিষয় তার কাছে অতীত হয়ে গেছে। এই মানুষটাকে ভুলে যেতে কারোরই খুব বেশি সময় লাগবে না। আর কিছুদিন পর তাকে মনে করার মতোও বেশি মানুষ থাকবে না। আমি শুধু সেই মানুষটার জায়গায় নিজেকে কল্পনার প্রয়াস পাই। যা দেখি তাতে আমার নিজের ক্ষেত্রে এর থেকে আলাদা কিছু ঘটবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই।

আস্তিবাদী সাহিত্যিক আল বেয়ার কামুর আউটসাইডারের নায়কের মায়ের মৃত্যুর পর দেখানো উদাসীনতার কথা আগেই বলেছি। এটা এক সময় মূল্যবোধের ধারকদের প্রচন্ডভাবে ঝাঁকি দিয়েছিল। কিন্তু এখন বাস্তব জীবনে আমরা কী করছি? আমার দাদি শাশুড়িকে কবর দিয়ে ফেরার সময় দেখেছি আমার চাচাশ্বশুর বাজারের থলে হাতে বাজার করতে বেরুচ্ছে। সেই সন্ধ্যায় অস্তগামী সূর্যের আলোয় গঞ্জের হাটে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমরা গরম গরম সিঙ্গাড়া খেয়েছি। এটাই মানুষের জীবন। কারোর জন্যই এখানে কিছুই থেমে থাকে না। আর প্রত্যেকেই শেষ পর্যন্ত তার নিজের কর্মফলই ভোগ করবে।

এই বাস্তবতায় শুধু একজন মুমিনই জানে তার দুনিয়ার জীবনের কি ভুমিকা। তার কাছে মৃত্যু একটা দরজা মাত্র যেটা দিয়ে অনন্ত জীবনে প্রবেশ করা হয়। প্রতি মুহূর্তে মানুষ সেই দরজার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। সেই দরজায় দাঁড়িয়ে জীবনের সফলতা ব্যর্থতার হিসাব হবে দুনিয়ায় করে যাওয়া তার কাজের উপর। ‘হে মানুষ, তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকেই ধাবিত হচ্ছ, আর সত্যিই তুমি তার সামনাসামনি হবে। তখন যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে তার হিসাব সহজ করা হবে। সে খুশীতে নিজ পরিজনের কাছে ফিরে যাবে। আর যার আমলনামা তার পিছন থেকে দেওয়া হবে, সে তখন মৃত্যুকেই ডাকতে থাকবে। আর এভাবেই সে জ্বলন্ত আগুনে পুড়তে থাকবে। সে দুনিয়াতে তার পরিবার পরিজনের মাঝে আনন্দেই ছিল। সে ভেবেছিল তাকে কখনও ফিরতে হবে না। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তার প্রতিপালক তার উপর দৃষ্টি রাখছিলেন’ (সুরা ইনশিকাক, আয়াত-৬-১৫)।

Advertisements

প্রচ্ছদ: যেই আবর্তে গড়ে উঠি / সাইফ আলি

%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%97%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a7%87-%e0%a6%89%e0%a6%a0%e0%a6%bf-cover-01যেই আবর্তে গড়ে উঠি হোসেন এম জাকিরের একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। এ ধরনের গ্রন্থ বাংলা ভাষায় খুবই দুর্লভ। কেবল বুদ্ধি প্রয়োগ করে এ ধরনের গ্রন্থ রচনা করা যায় না। বিশ্বাসের তীব্র স্রোত, চোখে দেখা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব, বিবেকের দহন, মর্মপীড়া ও হৃদয়ের গহীনে সুপ্ত বৈপ্লবিক আগ্নেয়গিরি প্রভৃতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে সুপ্রাবন্ধিক হোসেন এম জাকিরের যেই আবর্তে গড়ে উঠি।

গ্রন্থের নাম দেখে যে-কারো মনে পড়ে যেতে পারে আল মাহমুদের ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থটির কথা। কিন্তু না, এটি কোনো আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ নয়। এটি লেখকের যাপিত জীবনের প্রতিক্ষণে উপলব্ধ সভ্যতার সংকট ও তার প্রতিকারের একটি জীবন্ত দলিল। আমার মনে হয়েছে, এটি একটি এ্যাটোম বোমার মতো গ্রন্থ, যার বিস্ফোরণ পাঠকের মনোজগতে ঘটলে মিথ্যার সর্বনাশ হবে এবং উত্থান ঘটবে সত্যের। তবে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, এ গ্রন্থের লেখক সত্যিকার অর্থেই একজন খাঁটি মানবতাবাদী, সত্য প্রকাশে নির্ভীক এবং মুক্ত বুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী সজ্জন।

হোসেন এম জাকির প্রচুর তথ্য ও উপাত্তের সমাবেশ ঘাটিয়েছেন এ গ্রন্থে, যা তাঁর ইতিহাস-সচেতনতা, বিজ্ঞান-মনস্কতা ও নৃতাত্ত্বিক জ্ঞানের পরিচয় বহন করে। সর্বোপরি, তাঁর ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও খরস্রোতা নদীর মতো বেগমান। একবার পাঠ করা শুরু করলে পাঠক এ গ্রন্থের মুড়ো না দেখে থামতে পারবেন বলে মনে হয় না। আমি হোসেন এম জাকিরের যেই আবর্তে গড়ে উঠি গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি।

– শিশ মহম্মদ

যেই আবর্তে গড়ে উঠি (খন্ডাংশ)

ধর্ম প্রসঙ্গে ভুলে গেলে চলবে না যে, দেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভুতি আর ধর্ম বিশ্বাস এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। বর্তমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এবং রাষ্ট্রের আনুকূল্যপ্রাপ্ত সেকুলারিস্টদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সত্য মিথ্যা যাই হোক, কুরআন এক প্রভাবশালী কিতাব। কুরআনকে ইচ্ছামত ব্যাখ্যা করে কুরআন প্রেমিক এবং কুরআন বিরোধী উভয় পক্ষই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে সন্ত্রাসবাদের শুরু কুরআনের ব্যাখ্যাকে আশ্রয় করেই। হযরত আলী (রাঃ) আর মুয়াবিয়া (রাঃ) যখন যুদ্ধের মাঠে মুখোমুখী হয়েছিলেন তখন বিশিষ্ঠ সাহাবীদের হস্তক্ষেপে আবু মুসা আশআারী (রাঃ) এবং আমর ইবনুল আসকে (রাঃ) দুই পক্ষের অছি নিয়োগ করে একটা মধ্যস্থতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই সময় রাতের অন্ধকারে যেসব সন্ত্রাসী আতর্কিত হামলা করে সেই শান্তি প্রকৃয়া নষ্ট করেছিল তাদের মধ্যে যেসব খারেজী ছিল তারা কিন্তু কঠিন পরহেজগার ছিল। তারা রাত জেগে নামাজ পড়ত। কুরআনের তিলওয়াত শুনলে অজ্ঞান হয়ে যেত। সেই খারেজীরা ফিতনা সৃষ্টি এবং হত্যার বিরূদ্ধে কুরআনের কঠোর হুশিয়ারী সম্বলিত অসংখ্য আয়াতকে উপেক্ষা করে কুরআন ঘেটে বের করেছিল যে- বিধান দাতা একমাত্র আল্লাহ (সুরা আনআমঃ আয়াত-৫৭, সুরা ইউসুফঃ আয়াত-৪০, ৬৭)। তাই ফয়সালাকারীর ভূমিকায় আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কাউকে তারা কাফের মনে করত। তারা হযরত আলী (রাঃ) এবং মুয়াবিয়া (রাঃ) উভয়কে কাফের বলে ফতোয়া দিয়েছিল। তাদের সন্ত্রাসী হামলার ফলে অনেক মুসলমানের প্রানহানী হয়েছিল। প্রানহানীর এবং গালাগালির ক্ষেত্রে তারা বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীদেরকে পর্যন্ত ছাড় দেয়নি। তালহা (রাঃ), যুবাইর (রাঃ), আয়িশা (রাঃ) সহ জামাল যুদ্ধে অংশ নেওয়া সব সাহাবীকে তারা কঠিন গুনাহগার মনে করত।

কিছুদিন আগে রুবায়েত ফেরদৌসের উপস্থাপনায় আরটিভির এক টক শোতে শাহরিয়ার কবির ইসলামী ফাউন্ডেশন অনুদিত কুরআন শরিফের একটা কপি নিয়ে এসেছিলেন। টক শোতে অংশ নেওয়া এক আলেমকে তিনি সেই কুরআন থেকে ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্থি নেই’ সেটা প্রমান করার চেষ্টা করছিলেন। দ্বীনের ব্যাপারে জবরদস্তির উদাহরন দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন- গত মাসে বগুড়ায় জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের তের জন কর্মীকে মসজিদে এনে তওবা করিয়েছে এবং তাদের বিরূদ্ধে মামলা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এই কাজটা করে থাকলে তা ঠিক করেনি। আর তার জন্য মামলা হওয়াটাই যথার্থ কাজ হয়েছে। আমরা এর বিচারটাও দেখতে চাই। কিন্তু বিষয়টার আলোচনা এখানেই শেষ করা সম্ভব হয় না। শাহরিয়ার কবির কুরআনের এক বা দুইটা আয়াত দেখিয়ে যখন জামায়াতের কোন কাজের সমালোচনা করেন তখন জামায়াতেরও সুযোগ সৃষ্টি হয় কুরআনের অন্য অনেক আয়াত দিয়ে তাদের অনেক কাজের বৈধ্যতা প্রমান করার। শাহরিয়ার কবির কুরআনকে একেবারে অগ্রহনযোগ্য কিতাব মনে করলে অন্য কথা। কিন্তু তার দেখানো কুরআনের কিছু অংশকে গ্রহন করতে হলে জামায়াত বা অন্য যে কোন ধর্মীয় গোষ্ঠী সেই একই কুরআনের যে বৃহৎ অংশকে অনুসরন করে আমাদের জন্য সেগুলোও মেনে নেওয়ার যুক্তিগত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়।

ইসলামকে উগ্র এবং চরমপন্থী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে আমাদের মৌলবাদী আর সেকুলারিস্ট উভয় দলেরই প্রায় একই রকম ভূমিকা আছে। এটা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমে শিক্ষাপ্রাপ্ত বৃটিশ আমেরিকান লেখিকা Lesley Hazleton. ২০১১ সালের ১৯ শে ফেব্রুয়ারী Young Muslim Association আয়োজিত এবং Islamic Center of America তে অনুষ্ঠিত রাসুলুল্লাহর (সাঃ) জন্মদিবস উদযাপন অনুষ্ঠানের Key Note Speaker হিসাবে তাঁর বক্তৃতায় কুরআন থেকে প্রসঙ্গ বর্হিভিূত এবং খন্ডিত রেফারেন্স দেওয়ার প্রবনতা এবং পরিনতি সম্পর্কে তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেনঃ

Reading the quran is far easier said than done. So instead of it actually been read, it’s ususally simply quoted. And I do mean simply. As for the flood of quotation from the Bible, the quranic quotations tend to be highly selective and out of context. In other words, they are not really quotations at all. They are misquotations. And it’s not only non Muslims who do this. What particularly interests me is that the people who use the quran this way are both Muslims and non Muslims. That is conservative Muslims and conservative Islamophobs. Both groups use what I call the highlighter version of the quran. Fitting each other the same out of context quotes, reinforcing each other’s prejudices and extremism to the extent of the highliter version often includes phrases that simply are there. Phrases that meet preconcieved expectations but aren’t the reality. So fundamental Muslims and non Muslim coservatives are basically partners in the sterotyping Islam as violent and extremist. (প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের বক্তৃতার পুরোটা শুনতে পাবেন এখানে।)

সুতরাং ইসলামের নামে সন্ত্রাস কায়েম করা আর মুক্ত চিন্তার নামে ধর্মকে অস্বীকার করা, যে উদ্দেশ্যেই হোক কুরআনের আয়াতের সুবিধাজনক ব্যাখ্যা করা সম্ভব। একারনেরই কুরআনের বহু জায়গায় বলা হয়েছে এই কিতাব সেই সব বিশ্বাসীদের জন্য উপকারী যারা সরল সহজ পথের সন্ধান করে। আমাদের ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিবিদ এবং সেকুলার, নাস্তিকসহ সকল পক্ষকে বুঝতে হবে ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যান নিশ্চিত করতে। মানবতার দোহাই দিয়ে সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য নয়।

হোসেন এম জাকির

রেসিজমের শিকার ইসলাম এবং মুসলমান

নীচের ছবিটা জিম কেরি অভিনীত  Me, Myself and Irene মুভির একটা দৃশ্য।

Untitled-1

ছবিতে এই মুভির মূল চরিত্র চার্লি, আইরিন এবং একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে দেখা যাচ্ছে। ট্যাক্সি ড্রাইভার নান চাকু দিয়ে চার্লিকে পিটাচ্ছে। পৌনে তিন মিনিটের যে ভিডিও ক্লিপের ছবিটা দেখা যাচ্ছে সেখানকার ডায়লগগুলো খেয়াল করে দেখা যাক।

Charlie: Excuse me, do you people take checks?

Limo Driver: Say that again. Do “we people” take checks? You mean a black man?

Charlie: No, no, no, no! God, no. Your company.

Limo Driver: Don’t give me that bullshit! That was a racist slur.

Charlie: No, it wasn’t. l would never. . .

Limo Driver: Tell you what, l’ll make it easy for you. Why don’t you just pay me in cotton or a cartload of watermelons? Or how’s about some fried chicken, ’cause you know black people love fried chicken !

Charlie: Hey, no, come on now.

Irene: What’s going on?

Limo Driver : This cat don’t believe a nigger knows how to cash a check! Ain’t that ’bout a bitch?

Irene: Charlie, l don’t wanna ever hear you use the N-word in this house.

Charlie: What! l never said anything remotely racist!

Limo Driver : Oh, so it’s a “little people” thing, then.

Charlie: No!

Limo Driver: You think just ’cause l’m small you can push me around? Come on, let’s boogie.  l’m gonna give you a little lesson in low center of gravity.

আমার মনে আছে, অনেক আগে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে এক মাঠ জরিপের কাজে এক প্রত্যন্ত এলাকায় দুই সপ্তাহ ছিলাম। সেখানকার কাজ শেষ হলে ঢাকায় ফেরার আগে সেই এলাকার পাশের জেলায় আমাদের এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। খোঁজ নিয়ে বুঝতে পারলাম সেই বন্ধুর বাড়ির আশেপাশে আমার ছোট ভগ্নিপতির এক বোনের বাসা। আমার বন্ধুদেরকে রেখে বিকালে আমি সেই আত্মীয়ের বাসায় গেলাম। সেই আত্মীয়রা আমাকে প্রচন্ড যত্নআত্তি করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ আমাকে সেখানে দেখে খুব অবাকও হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আমার বন্ধুর পরিচয় দিয়ে যখন বললাম আমি তার বাসায় বেড়াতে এসেছি তখন ভদ্রলোক বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন- বলো কি? ওরা তো নম শুদ্র! বৃটিশ বা পাকিস্তানী আমলে এটা হয়ত খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু এই সময় এসেও আমার এক শিক্ষিত আত্মীয়ের মুখে এই কথা শুনে আমি হতবাক হয়েছিলাম। দুঃখ জনক হলেও সত্য আমাদের দেশের মানুষ কারনে হোক আর অকারনে হোক অনেক শব্দ ব্যবহার করে সেগুলো যে অবমাননাকর হতে পারে সেই বোধ ছাড়াই। আমার পরিচিত এক দম্পত্তির নিজেদের ছেলে মেয়ে হয়নি। তারা ছোট থেকে এক মেয়েকে লালান পালন করে আসছেন। মেয়ে তাদেরকে বাবা-মা বলে, আরা তারাও মেয়েকে নিজের সন্তান বলেই পরিচয় দেন। কিন্তু আমি দেখেছি আত্মীয় স্বজনেরা সেই মেয়েকে ‘পোষা মেয়ে’ বা ‘পালিত মেয়ে’ ছাড়া সম্বোধন করতে পারে না।

এভাবে আমাদের দেশের সাধারন মানুষ যারা মালাউন, বামন, কানা-খোড়া-নুলা, হিজড়া শব্দগুলো অবলীলায় ব্যবহার করে তাদের পক্ষে জিম ক্যারির এই মুভির ট্যাক্সি ড্রাইভারের রাগের কারন বুঝতে পারা কঠিন। তারা এটাও বুঝবে না চার্লি কেন দাড়িয়ে দাড়িয়ে এই ক্ষর্বাকায় মানুষটার কাছে মার খায় আর তার নববধু আক্রমনকারীকেই সমর্থন করে। এখানে দেখানো পুরো বিষয়টা হচ্ছে বর্নবাদী আচরন নিয়ে। বর্নবাদের কথা শুনলেই আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষের মনে পড়ে দক্ষিন আফ্রিকার কথা। সেখানকার সাদা চামড়ার মানুষ কালো নিগ্রোদের সাথে যে আচরন করেছে তা এবং কালোদের অধিকার আদায়ে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে সংগ্রামের কথা ইতিহাসের সুপরিচিত অধ্যায়। কিন্তু বর্তমানে উন্নত বিশ্বে এবং আমাদের কর্পোরেট জগতে বর্নবাদ আরো অনেক ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। আমাদের বিজনেস স্কুলগুলোতে বিজনেস কমিউনিকেশন কোর্সে সেগুলো পড়ানো হয়।

বর্তমান শিক্ষায় কালোকে কালো, কানাকে কানা, পঙ্গুকে পঙ্গু বলে উল্লেখ করাটাও বর্ণবাদী (Racist বা Sexist) আচরন। এর মূল কথা হচ্ছে এমন শব্দ ব্যাবহার করা যাবে না যাতে লিঙ্গ, বর্ন, জাতি, ধর্ম, শারিরিক বৈশিষ্ঠ বা অন্য কোনভাবে মানুষের মাঝে কোন রকম বিভেদ প্রকাশ পায় বা মানুষকে হেয় করা হয়। এজন্য এমনকি ডিকশনারির কিছু অতি প্রচলিত শব্দকেও বিজনেস কমিউনিকেশনে এখন ঘুরিয়ে লেখা হয়। যেমন, শুধুমাত্র man শব্দটার ব্যাবহার এড়াতে Policeman কে বলা হয় Police Officer, Businessman কে বলা হয় Business Person । কারন, man শব্দটার মাধ্যমে লিঙ্গ বৈষম্য প্রকাশ পায়। আমাদের দেশে মানুষ যেমন হিন্দু ধর্মাবলীদেরকে অবলীলায় মালাউন বলে থাকে, আমেরিকাতে তেমন কাউকে ইহুদী বললে সেটা কঠিন অপরাধ বলে গন্য হয়। সেদেশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউকে ইহুদী বলে সম্বোধন করলে তার স্টুডেন্ট ভিসা বাতিল হবে এটা নিশ্চিত। জেল জরিমানাও হতে পারে। পাঠকের মনে থাকার কথা, যে অস্টেলিয়ান ক্রিকেটাররা শ্লেজিংয়ের জন্য বিখ্যাত সেই অস্ট্রেলিয়ারই ক্রিকেটার এ্যান্ড্রু সাইমন্ডকে ভারতের হরভজন সিং ‘মাঙ্কি’ বললে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া হরভজন সিংয়ের বিরূদ্ধে বর্নবাদী আচরনের দায়ে হৈ হৈ করে উঠেছিল। ২০০৮ সালে সিডনি টেস্ট চলাকালে সেই বিতর্কিত ঘটনায় ভারতীয়রা দাবী করে যে হরভজন সাইমন্ডকে বাদর বা ‘মাঙ্কি’ বলেইনি। সে হিন্দিতে এমন কিছু বলেছিল (এক কার্টুনে পড়েছিলাম,‘তেরি মন কি’) যা ‘মাঙ্কি’র মত শুনতে। কিন্তু সাইমন্ড আর অস্ট্রেলিয়ানদের দাবী ছিল বাদর বলে হরভজন তার আদিবাসী জাতিসত্তার প্রতি কটাক্ষ করেছে। অস্ট্রেলিয়াতে কাউকে Aborigin বা আদিবাসী হিসাবে উল্লেখ করাও ‘রেসিস্ট’ বা বর্নবাদী আচরন।

বলাই বাহুল্য বর্নবাদী আচরনের এই উচ্চ মার্গের ব্যখ্যা উন্নত শিক্ষা না থাকলে বুঝতে পারা সম্ভব নয়। আমাদের দেশের অনেক মানুষের উন্নত শিক্ষা তো বটেই ন্যূনতম শিক্ষারও অভাব আছে। কিছুদিন আগে জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমুর বিয়ের ছবি প্রকাশিত হলে তাঁর স্বামীর চেহারা নিয়ে অনেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ায় কুৎসিত সব মন্তব্য করে। এরও আগে আমাদের জনপ্রিয় ক্রিকেটার নাসির হোসেন তাঁর নিজের বোনের সাথে ফেসবুকে এক ছবি পোস্ট করলে সেখানে মানুষ অশ্লীল মন্তব্য করতে থাকে। এসব ঘটনায় আমাদের অনেকেই বিশ্ময় প্রকাশ করলেও আমি অন্তত অবাক হইনি। এইসব মন্তব্যকারীদের শিক্ষা দীক্ষার স্তর তো বটেই এমনকি আমাদের রাস্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত শালীনতা বোধের অভাবের সাথে মিলিয়ে দেখলে এসব ঘটনাতে তেমন অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা দেশের দুই প্রয়াত রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে যে ভাষায় মন্তব্য করেন তা দুঃখজনক। সাহবাগ আন্দোলনের সময় আমাদের অনেক গ্রহনযোগ্য এবং সম্মানিত বুদ্ধিজীবি, লেখকরাই তরুন পর্ন লেখকদের নেতৃত্বে মিছিল করতে কোন সংকোচবোধ করেননি। এভাবে বর্নবাদ, অশ্লীলতা, ঘৃণা এগুলো জাতীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে।

সাধারনত বর্নবাদের শিকার হয় বিশেষ করে সংখ্যা লঘু আর দুর্বল সম্প্রদায়। আমার কাছে এটা একটা নির্মম পরিহাসের বিষয় বলে মনে হয় যে, বাংলাদেশে সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান আর তাদের ধর্ম ইসলাম বর্নবাদী আচরনের সবচেয়ে বড় শিকার। এদেশে যে কোন সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের বিষয়ে কটুক্তি করলে তা বৈষম্যমূলক আচরন হিসাবে মিডিয়াতে ঝড় তোলে। এটা যে বৈষম্যমূলক কাজ তা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান আর ইসলামকে মনের সাধ মিটিয়ে গালি-গালাজ করলেও এদেশে তা সেরকম অফেন্সিভ হিসাবে দেখা হয় না। এদেশে দাড়িওয়ালা নামাজী ছেলেদেরকে ‘হুজুর’ বলা হয়। শব্দটা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তুচ্ছার্থে ব্যবহার করা হয়। এটা যে ভাষাগতভাবে আধুনিক শিক্ষার মানদন্ডে বর্নবাদী আচরন কেউ তা মনেই করে না। একইভাবে আলেমরা ‘মোল্লা’ বলে পরিচিত। পর্দানশীল মহিলাদেরকেও পরিচিত মহলে হুজুর বা বোরখাওয়ালী বলা হয়।

যেসব মুক্তমনা পর্দা প্রথার বিরোধীতা করতে গিয়ে হেজাব পরিহিত মেয়েদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে থাকে তাদের কাছে স্বেচ্ছায় পর্দা করে এরকম অসংখ্য মুসলিম নারীর স্বাধীন ইচ্ছার মূল্য কোথায়? ক্রিকেট বা ফুটবল স্টেডিয়াম থেকে টিভি ক্যামেরায় সম্প্রচারিত খেলার মাঝে আমরা এরকম অনেক দেখেছি যে দর্শকদের মধ্যে যুবতীরা ক্যামেরার সামনে বুকের কাপড় উঠিয়ে বিশ্বের দর্শকদেরকে তাদের স্তন দেখার সুযোগ করে দেয়। ছেলে মেয়েকে, ছেলে ছেলেকে, মেয়ে মেয়েকে স্টেডিয়ামের ভিড়ে বসেই চুমু খায়। এসবের জন্য সেসব দেশে কোন ছি ছিক্কার ওঠে না। কোন ধারাভাষ্যকার এইসব দৃশ্য প্রচারের সময় যদি সেগুলো নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে তাহলে ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরোধীতা করায় তার চাকুরী যেতে পারে। এই সব কিছু মেনে নিয়ে আমি শুধু প্রশ্ন করতে চাই সম্পূর্ন স্বেচ্ছায় কোন নারী পর্দা করার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে নিয়ে কটুক্তি করলে ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষতি হয় না?

হোসেন এম জাকির

কর্পোরেট লোভ আর অসদাচারন

১.
ছোট বেলায় দেখেছি সম্ভবত পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে এক চিমটি লবণ, আধা কেজি পানি আর এক মুঠি গুড় দিয়ে খাবার স্যালাইন বানানোর প্রশিক্ষণ দিত। আধা কেজি পানি মেপে প্রতিটা বাড়িতে একটা মগ বা জগে দাগ দিয়ে দেওয়া হত যাতে পরে তারা সেই মাপ ব্যবহার করতে পারে। এভাবেই আমাদের দেশে হাজার হাজার শিশু মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। রোগের কারণ আর প্রতিকার জানার আগে ডায়েরিয়া, কলেরার মত রোগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। তখন আমাদের দেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ সেগুলোকে ‘খারাপ বাতাসের’ দোষ মনে করত। বিজ্ঞান আমাদেরকে খারাপ বাতাসের ভয় কাটিয়ে দিয়েছে। শুধু আমাদের দেশেই না, মধ্য যুগের ইউরোপ, এশিয়া এবং নব আবিষ্কৃত আমেরিকান ভূখন্ডে লাখে লাখে মানুষ মারা গেছে প্লেগে।

কিন্তু বিজ্ঞান, ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগ আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত প্রতিষ্ঠানের কল্যানে বিশ্বের বুক থেকে পোলিওসহ অনেক রোগ সর্ম্পূনভাবে বিতাড়িত হয়েছে। এখন পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে অজানা রোগে একজন রোগীও আক্রান্ত হলে সারা বিশ্বে সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে প্রতিকার বের করেন। আক্রান্ত দেশ থেকে আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রতিটা দেশের এয়ারপোর্টে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ্যভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইবোলা ভাইরাস ইত্যাদি শব্দগুলো যখন আমরা শুনেছি তখন এরকমই সব তৎপরতা দেখেছি। মিডিয়াসহ বিশ্ব কমিউনিটি মানবতার জন্য হুমকি স্বরূপ যে কোন শত্রু মোকাবেলায় এখন অনেক বেশী সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু সে হচ্ছে গল্পের একটা দিক। এর অন্য দিকও আছে।

আমাদের দেশে কয়েক বছর আগে একটা ভাইরাস নিয়ে মিডিয়া খুব সরগরম হয়ে ওঠে। সেই সময় এক নামকরা বিদেশী ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর কাছে সেই ভাইরাসজনিত রোগের ওষুধ মজুত আছে বলে সেই কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা টিভিতে দেওয়া সাক্ষাতকারে জানিয়েছিলেন। ব্যাপারটা নিয়ে মিডিয়ায় এমন আতংক ছড়ানো হয় যে, সামর্থ্যবান লোকেরা রাতারাতি সেই ওষুধ জোগাড় করতে তৎপর হয়ে ওঠে। আমিও কিছু খোঁজ খবর নিলাম। জানতে পারলাম, যে ওষুধগুলো মজুত আছে সেগুলোর মেয়াদ আছে পরের বছরের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। যখনকার কথা বলছি সেটা ছিল বছরের শেষ সময় (নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে হবে)। যে রোগের কথা বাংলাদেশের মানুষ আগে কখনও শোনেনি সেই রোগের ওষুধ মজুত ছিল সেই কোম্পানির কাছে! বিশ্বের নামকরা কোম্পানী কোটি কোটি ডলার রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে ব্যয় করে। তারা সম্ভাব্য রোগের ওষুধও বানিয়ে রাখে। তাছাড়া আমাদের দেশে নতুন হলেও সেই রোগ নাকি পৃথিবীর অনেক দেশে অনেক আগেই দেখা দিয়েছে। তথ্যগুলো অবিশ্বাস করার কোন কারন নেই। কিন্তু এদেশে সেই রোগের আতংক ছড়িয়ে পড়ল সেই ওষুধের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েকমাস আগে? আর কয়েকমাস পরেই সেই ভাইরাসের কথা মানুষ বেমালুম ভুলে গেল। মিডিয়ায় তা নিয়ে আর একটা কথাও শোনা যায়নি। কিভাবে সেই ভাইরাস এদেশে আসলো আর কিভাবে বিতাড়িত হলো সে আমরা জানতে পারলাম না। প্রশ্ন জাগে, সেই প্রায় মেয়াদোত্তীর্ন ওষুধের মজুতের সাথে সেই ভাইরাসের আতংকের কোন সম্পর্ক ছিল কি?

২.
সম্প্রতি প্যারাডট নামের একটা চালু প্যারাসিটামল ট্যাবলেটসহ এই গ্রুপের বায়ান্নটা কোম্পানির ওষুধ সরকার নিষিদ্ধ করেছে। পত্র-পত্রিকায় সে খবর আসলেও ঠিক কি কারণে সেগুলো নিষিদ্ধ তা কেউ স্পষ্ট করে বলেনি। একটা ওষুধ ক্ষতিকর হয়ে থাকলে তা বাজার থেকে তুলে নিতে যে প্রচার প্রচারণা এবং জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সেরকম কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। অনেকটা নীরবে নিষিদ্ধ করার কাজটা সম্পন্ন হয়েছে। এক ফার্মেসীর মালিক আমাকে বলেছে প্যারাডট খুব ভাল ওষুধ। সরকারদলীয় প্রভাবশালী এক নেতার কোম্পানির প্যারাসিটামলকে প্রতিযোগিতায় টিকাতেই এই নিষিদ্ধকরনের কাজটা করা হয়েছে। ফার্মেসী মালিকের দাবী কতটুকু সত্য তা জানা নেই। কিন্তু একটা সন্দেহ ঠিকই মাথায় ঢুকে যায়। আসল ঘটনাটা কি?

৩.
পাঠকের মনে থাকার কথা গুড়া দুধে মেলামাইন মেশানো আছে বলে একবার গুজব উঠেছিল। সম্প্রতি ম্যাগী নুডলসে ক্ষতিকর উপাদান আছে বলে গুজব উঠেছে। এসব গুজবের উৎস কি?

৪.
প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্য, প্লাস্টিকের দ্রব্যসহ অসংখ্য প্রোডাক্ট নিয়ে দেশের এবং বিদেশের বাজারে এদেশের অন্যতম বৃহত্তম ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রাণ গ্রুপ সুপরিচিত এক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ২০১৫ সালের ৩রা অক্টোবর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ICDDR,B-এর হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড লিগাল এ্যাফেয়ার্স জানান যে, প্রাণ গ্রুপের মালিকানাধীন কোম্পানি ডিউরেবল প্লাস্টিক লিমিটেড বাজারে যে Drinkit Water Purifier মেশিন বিক্রি করে সেটা ICDDR,B কতৃক পরীক্ষিত বলে যে দাবী করা হয় তা মিথ্যা। প্রাণ গ্রুপের টাকা পয়সার অভাব নেই। সেখানে শিক্ষিত ডিগ্রীধারী মানুষরাই মার্কেটিং এবং ব্রান্ডিংয়ের কাজ করে থাকে। তাদের পক্ষে এধরনের মিথ্যাচার কিভাবে সম্ভব?

৫.
সম্প্রতি বেশ কয়েকটা ব্যাংক তাদের লাখ লাখ গ্রাহকের এ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন উপায়ে কোটি কোটি টাকা কেটে নিয়ে মুনাফা করেছে। একটা নামকরা ব্যাংক স্টেটমেন্ট চার্জ হিসাবে বিশ কোটি টাকা কেটে নেওয়ার পর পত্রিকায় ব্যাপারটা ফাঁস হলে সেসব টাকা গ্রাহকের হিসাবে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছে। আরেকটা ব্যাংক সেভিংস একাউন্টের সুদ হিসাবায়ন পিছনের তারিখ থেকে পরিবর্তন (Recalculate) করে বেশ কয়েক কোটি টাকা মুনাফায় নিয়েছে। অন্য একটা প্রথম সারির ব্যাংক সরকারের নির্ধারিত এক্সাইজ ডিউটি গ্রাহক একাউন্ট থেকে দুইবার করে কেটেছে। এসব ঘটনা ফাঁস হলে বেশীরভাগ ব্যাংকই সেগুলোকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলে দাবী করেছে। দু’একটা ব্যাংক সবাইকে টাকা ফেরত দিলেও বেশীরভাগ ব্যাংকই যেসব গ্রাহক দাবী করবেন শুধু তাদেরকে টাকা ফেরত দেওয়ার নীতি গ্রহন করেছে। এভাবে প্রত্যেক একাউন্ট থেকে কর্তিত টাকার পরিমান খুব অল্প হওয়ায় বেশীরভাগ গ্রাহক ব্যাপারটা খেয়ালই করেননি। অনেকেই সামান্য টাকার জন্য ব্যাংকে গিয়ে রিফান্ড দাবী করার ঝামেলায় জাননি। যে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ সেখানে জমা রাখে তারা আসলে কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

৬.
The Economist সম্প্রতি `Dirty secret of the car industry’  শিরোনামে এক কাভার স্টোরি করেছে (The Economist, September 26th –October 2nd 2015)। জার্মান মোটর গাড়ি প্রস্তুকারী কোম্পানি ভক্সওয়াগন স্বীকার করেছে যে তারা বিশ্বব্যাপী ১১ মিলিয়ন ডিজেল-ইঞ্জিন চালিত মোটর গাড়িতে এমন একটা সফটওয়্যার ইনস্টল করেছে যা নাইট্রোজেন অক্সাইড ও অন্যন্য ক্ষতিকর উপাদান নির্গমনের মাত্রা পরীক্ষার যন্ত্রকে ফাঁকি দিতে পারে। পরীক্ষা শেষে গাড়িগুলো রাস্তায় চলা শুরু করলেই সফটওয়্যার অকার্যকর হয়ে সেগুলোর ক্ষতিকর উপাদান নির্গমন প্রতিরোধ সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সেসব গাড়ি থেকে অনুমোদিত মাত্রার চল্লিশগুণ বেশী ক্ষতিকর উপাদান নির্গমন হয়। কোম্পানির চিপ এক্সিকিউটিভ মার্টিন উইন্টারকর্ন পদত্যাগ করে এবং তারা এই কেলেংকারীর সম্ভাব্য আর্থিক ধাক্কা সামলাতে ৭৩০ কোটি ডলার আলাদা করে রাখা হয়। সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখে এই কেলেংকারী ফাঁস হওয়ার পরের চার লেনদেন দিবসে কোম্পানির শেয়ারের দাম এক তৃতীয়াংশ পড়ে যায়। ইকনোমিস্টের প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছেঃ ‘উপর দিকে (নেতৃত্ব) পরিবর্তন আর বড় অংকের জরিমানাতেই যেন বিষয়টা শেষ না হয়। কর্পোরেট ক্রাইমের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বড় অংকের জরিমানা করে শেয়ারহোল্ডারদের শাস্তি না দিয়ে তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমেরিকার সরকারী আইনজীবিদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিৎ। সাম্প্রতিক ব্যাংকিং কেলেংকারীর বেশীরভাগই নিষ্পত্তি হয়েছে অস্বচ্ছ ভাবে এবং বড় বড় অংকের জরিমানার মাধ্যমে, কোর্টরুমে নয়। এর আগে এ মাসেই ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস আমেরিকার বৃহত্তম মোটরগাড়ী প্রস্তুতকারী কোম্পানি জেনারেল মটরস্ – এর সাথে ৯০ কোটি ডলারের এক নিষ্পত্তির ঘোষণা দেয় কারন কোম্পানিটা ত্রুটিপূর্ণ ইগনিশন সুইচযুক্ত গাড়ি যার কারনে দুর্ঘটনায় ১২৪ জনের মৃত্যু এবং ২৭৫ জনের আহত হওয়ার অভিযোগ আছে সেগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে ব্যর্থ হয়। সরকারী আইনজীবিরা (নাম প্রকাশ ছাড়া) বলেছিল যে, ‘জেনারেল মটরস্ এর ম্যানেজারেরা জেনেশুনেই সম্ভাব্য প্রাণঘাতি পরিণতির কথা উপেক্ষা করেছে এবং নিরাপত্তার উপর মুনাফাকে প্রাধান্য দিয়েছে। এরপরও তারা কোন চার্জ আনেনি’।

উল্লেখিত ঘটনাগুলোর প্রভাব যেকোন সন্ত্রাস, বিশৃঙ্খলার থেকেও বেশী। অথচ সেগুলোকে অপরাধ হিসাবে দমন বা নিয়ন্ত্রন করার ক্ষেত্রে আধুনিক সব সিস্টেমই মারাত্মকভাবে দুর্বল। ইকনোমিস্টের প্রতিবেদনের উল্লেখিত অংশের শেষ কথাটা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় সাম্প্রতিক উন্নত বিশ্বের কর্পোরেট জগতে আসলে কি ঘটে গেছে। কর্পোরেট জগতে সিস্টেম এবং মুষ্টিমেয় ব্যক্তি মিলে ব্যক্তিগত অর্থ প্রতিপত্তির জন্য সাধারন মানুষের আর্থিক এবং স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তাকে কিভাবে উপেক্ষা করেছে সেগুলোর ভিতরের গল্পগুলো খুবই ভয়ংকর।

হোসেন এম জাকির

চলবে…