• আমি ইচ্ছে পুরণের মাটি নই / আল মাহমুদ

    যারা আমাকে পরামর্শ দিতো মানুষ একা থাকতে পারে না। তারা হয়তো সত্যিই বলতো। কিন্তু আমি ছিলাম অনমনীয়। ছিলাম একটা পোড়ামাটির পাত্রের মতো। কারো ক্রোধ হলে পাত্রটিকে পাথরে আছড়িয়ে চূর্ণ করতে পারবে। কিন্তু দুমড়ে মুচড়ে আবার কাদার মতো ইচ্ছে পুরণের মাটিতে পরিবর্তন করতে পারবে না। প্রকৃত পক্ষে আমি অর্ধেক মানুষ আর বাকি অর্ধেক তো কবিতা। সম্পূর্ণ…


  • খাঁচার ভিতর অচিন পাখি / আল মাহমুদ

    কিছুকাল যাবত কিছু একটা পঁচে যাওয়া দুর্গন্ধ আমাকে কেবলি তাড়না করে ফিরছে। গন্ধটা কোথা থেকে আসছে তা বুঝতে না পারলেও এটা আন্দাজ করতে পারছি কাছেই কী একটা যেন মরে পচে এ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমি প্রতিটি নদীর পানি নাকের কাছে এনে শুঁকে দেখেছি। না, মেঘনা যমুনা পদ্মা এই সব স্রোতস্বিনী মাঝে মাঝে শুকিয়ে তলপেট বের করে…


  • অনামাঙ্কিত হৃদয় / আল মাহমুদ

    আমার জীবনতরী দুলছে। যাকে বলি মরণপয়োধি এখন তার উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে পাল নামিয়ে ফেলেছি। গন্তব্যে পৌছার আগেই খসে যাচ্ছে মেধা, মনন, যৌবন ও স্মৃতি। এমনকি তোমার মুখও মনে পড়ে না। কেবল ভাঙাচোরা কিছু বিষয় মঝেমধ্যে আকাশ ফাটা বিদ্যুতের চমকে আমি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত দেখতে পাই। ভাসছে আমার দুটি চোখ, ভাসছে আমার মগজের কিছু অংশ। আর ঘাউড়া…


  • মেঘ থেকে মাটি পর্যন্ত / আল মাহমুদ

    আমি নিজের মধ্যে আমার ইচ্ছেমতো ঋতু পরিবর্তনের আবহাওয়া তৈরি করে নেওয়ার অবস্থায় পৌছেছি না অন্ধত্ব না বার্ধক্য কেবল অস্তিত্বের কার্যকারণ আমাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে মেঘের ওপর ঠেস দিয়ে আমি পৃথিবীকে দেখি দেখি আমার জন্মের দ্বীপদেশকে খুব মৃদু শব্দে উচ্চারণ করি, বাংলাদেশ এতো মৃদু যে আমার অন্তরের শব্দ আমার কানে পৌছোয় না। একদা আমি…


  • অমরতার আক্ষেপ / আল মাহমুদ

    কতবার ভেবেছি কবির আংরাখা আমি খুলে ফেলি কিন্তু জগতের সবগুলো চোখ আমার নগ্নতা অবলোকনে উদগ্রীব। তুমি তো জানো কবির কোনো বন্ধু হয় না। যেমন রাজার কোনো বন্ধু থাকে না। আমি আমার পোশাক তোমার পালঙ্ক স্পর্শ করে খুলে ফেলতে চাই। চুমকির কাজ করা এই পিরহান, দামেস্কের দর্জির তৈরি এই কোট, রেশমের ঝলকানো এই পাজামা, একলক্ষ মুক্তো…


  • নাবিক / আল মাহমুদ

    দেখো আমার মুখের দিকে। মনে হবে নোনা তরঙ্গের উপর ডানা মেলে দিয়েছে এক গাঙচিল। মনে হবে ফেনার আলোড়নের মধ্যে আমার জন্ম মনে হবে মাটি নয় তরঙ্গই আমার আবাস। আমি জানি ঢেউয়ের ভেতর শুয়ে আছে আমার কত পূর্বসূরি ঢেউয়ের ভেতর আমি তাদের চোখ, চোখের মণি মুক্তা হয়ে যেতে দেখেছি তাদের হাড়গোড় এখন প্রবাল তাদের কত স্বাদ…


  • বাতাসের মুখে লাগাম দিয়ে / আল মাহমুদ

    ইচ্ছে ছিল দেখতে দেখতে যাওয়ার। আমার কৈশোরের পথও ছিল ছায়াশীতল। বৃক্ষ ও পাখির অরণ্যের একঘেয়েমি পেরিয়েই যে নদী তা আমি জানতাম। যেমন জানে ডিমের ভেতরকার পাখির কুসুম। চিরকাল ভেবে এসেছি একটা নদীর লেজ ধরতে পারলেই আমার গন্তব্যে অর্থাৎ মস্তকে গিয়ে দাঁড়াবো। একেবারে ফণার ওপর। এক মধ্য দুপুরের নদী যেখানে বাঁক ধরেছে সেখানে পৌঁছেই দেখি ডাঙা…


  • গতিই আমার নিয়তি / আল মাহমুদ

    সবার মধ্যেই দেখেতে পাচ্ছি আমাকে নিয়ে উদ্বেগ। আমার দিকে তীর্যক চোখের দৃষ্টি। ফিসফিসিয়ে কথা। এই তুমি লাইন ভেঙে এগুচ্ছো কেন? দেখছ না আমরা আছি? আমরা তোমার মুরব্বী। বয়সে তো বড়? আমি বুঝলাম না, আমার একটা পা একটু আগ বাড়ানো বটে। কিন্তু আমি তো লাইন ভেঙে যাইনি। আমি তো নড়িনি। কেন সবাই ভাবছে আমি তাদের ছাড়িয়ে…


  • হৃদয় ভাঙার শব্দ / আল মাহমুদ

    হৃদয় ভাঙার শব্দে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়। বিছানায় হাতড়ে ফিরি। শুন্য একটা বালিশ রয়েছে- তুলোর বালিশ কেশতেলের গন্ধে ভরা নারীর বালিশ, ছেঁড়া চুলও আছে হয়তো লেগে অথচ হৃদয় ভাঙার যে শব্দে কবিদের ঘুম ভেঙে যায় সেটা তো প্রকৃত পক্ষে মুগুরের শব্দ। ইট ভাঙা মুগুরের শব্দ প্রতিটি বাড়িতেই ঝুর ঝুর ভেঙে পড়ছে রাঙা ইট। ভাঙা…


  • অন্তিম বাসনার মতো / আল মাহমুদ

    আরেকটু এগোতে চাই। বান্ধবহীন এ মহাযাত্রায় আর কয়েক পা। দেখো সমাপ্তির কাছে এসে পায়ের মাংস ফুলে উঠেছে, হাঁটুতে বিদ্যুৎ। ভর রাখার জন্য টলটলায়মান মাংসপেশী। যারা কাঁধ বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের বিচার করা আমার আর সাজে না। ভর রাখতে চাই এখন যে-কোনো শত্রুর কাঁধে যদি তার আস্তিনে লুকানো থাকে বাঁকা ছুরি, তবে তা আমূল বসিয়ে…


  • ভেঙে যেয়ো না মা আমার / আল মাহমুদ

    যেসব শিশুদের আমি একদা হাসতে খেলতে এবং হাঁটতে শিখিয়েছিলাম এখন তারা আমার পঙ্গুত্ব চোখের নিষ্প্রভতা এবং নিশ্চল নৈরশ্য নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করছে। আড়ালে নয় আমার সামনে। আমি ভাবি এটাই জগতের নিয়ম কিনা আমি অবশ্য এতে কোনো চাঞ্চল্য অনুভব করি না, না-বেদনা না-দুঃখ। কারণ আমি কালকে অতিক্রম করে আসা একটি নিভে যাওয়া ধুমকেতু মাত্র, যেন তেজ…


  • স্বপ্নের ভেতর দর্জি মেয়েটি / আল মাহমুদ

    রাতভর বৃষ্টি। আর সেলাই কলের শব্দ। কে এই যুবতী? ক্রমাগত সেলাই করে চলেছে ভাসমান মেঘের সাদা থানগুলো সে কি সেলাই করছে আমার জন্য কাফন? তার মুখ আমি বিদ্যুতের ঝলকের মধ্যে একবার মাত্র ঝলসে উঠতে দেখেছি। অচেনা ঘর্মাক্ত চেহারা। নাকের নাকফুলটিতে একটিমাত্র জোনাকি। খাটের উপর উপচে পড়ছে এক প্রবল পুরুষের নগ্নতা। মেয়েটি আমার চেনা নয়। কিন্তু…


  • জিদের শহর / আল মাহমুদ

    জিদের শহরে আছি। এ শহরে কেউ বুঝি মচকায় না কোনোদিন। হেলে পড়ে না, কাত হয় না, চিৎ হয় না। কেবল আকাশের দিকে মাথা তুলে গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। মৃত্যুর গর্জন কিংবা বিদ্যুতের ঝলসে ওঠা দেখে পাখিরা অন্ধকারেও ঝাঁপ দেয় যেখানে, পশুরা পালায়। ওই তো একটা চিতল হরিণী দিগ্বিদিব জ্ঞানশূন্য হয়ে কেওড়ার কাঁটায় ঝাঁপ দিচ্ছে। ক্ষত-বিক্ষত,…


  • অলৌকিক কুয়াশা / আল মাহমুদ

    আমার এখন এমন একটা অবস্থা, আমি অর্থাৎ আমার চোখ এমন এক কুয়াশাকে কবুল করেছে, কোনো মানুষের চেহারার পার্থক্য, বৈশিষ্ট্য নাক-মুখ-চোখের বর্ণ কিংবা তিলচিহ্ন ইত্যাদি খুঁটিনাটি যাতে একজনকে শনাক্ত করা যায়- তুমি আসমা, তুমি কাজল, তুমি কাওসারী কিংবা তোমাকে চিনি না এই বোধ জন্ম লয়; আমার আর নেই। আমার এখন প্রতিটি মানুষকে মনে হয় মানুষ মাত্র।…


  • দিগ্বিজয়ের ধ্বনি / আল মাহমুদ

    আমাকে বিদীর্ণ করে মাটি ও রক্ত ফুঁড়ে বেরিয়েছে এই নিশান। তারপর আর ‘আমি’ বলে কিছু নেই। আমি আমি আমি। না, আমরা অর্থাৎ এই সবগুলো নদী, এই সবগুলো মানুষ, এই সবগুলো পাখি পতঙ্গ পরিবেশ। এই তো আমরা। আমাদের অস্তিত্বের ভেতর থেকে লক্ষ লক্ষ মসজিদের মিনার। কলরবমুখর হয়ে উঠেছে এই নীলিমা, চন্দ্র সূর্য তারকারাজি আমাদের আযানই তো…


  • দেবদারু / আল মাহমুদ

    এবার বোশেখের আগে এই গাঁয়ের উঁচু মাথাঅলা বনস্পতিরা মড় মড় শব্দ তুলে হেলে পড়েছে। সব একদিকে কাত হয়ে যাওয়া গাছের সারি। আম, জাম, কাঁঠাল। এমনকি এই গাঁয়ের বুড়ো-অশ্বথ তিনদিকে তিন বাহু মেলে চিৎপটাং শুধু বটের ঝুড়ি কান্ডটা বাঁচিয়ে দরবেশের দাড়ি হয়ে গেছে। সব একদিকে একমুখী হয়ে বুদ্ধি-বিবেচনাহীনভাবে চলতি বাতাসের ধাক্কায় এক কাতারে দাঁড়ানো। তখন পাতার…


  • বসন্তবৈরী / আল মাহমুদ

    এবারই প্রথম। ব্যর্থ কোকিলের ঝাঁক বাংলার বিমর্ষ সবুজকে বিদীর্ণ করে দিয়ে ভাঙা গলায় কুহু ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে প্রান্তরে মিলিয়ে গেল। তুমি যখন উঠোন পেরুলে তখন কোনো সম্ভাষণ নেই। না-প্রকৃতির না-ঋতুচক্রের। আমি ইচ্ছে করলে আমার ক্যাসেটে বন্দি নকল পাখির ডাক তোমাকে শুনিয়ে দিতে পারি। একেবারে নির্ভুল কুহুধ্বনি। যদিও গাছে কোনো ফুল ফোটাতে আমি পারব না।…


  • সংলাপ / সাইফ আলি

    দুঃখ এসে একদিন সম্মুখে বসল আমার সমস্ত শরীর জুড়ে ফেলে নিঃশ্বাস বলল- মানুষ, আজ থেকে তোমার আমার নিত্য বসবাস। সে আমার বোধের প্রথম ভোর- এরপর থেকে বিরতিহীন দুঃখের ছায়া আশীর্বাদ হয়ে থাকে মাথার উপর। সুখ-পাখি, এসেছিলো সেও জানালায় বসে তার মিষ্টি মিহি সুরে বলেছিলো- শোনো, আমাকে দেখতে পাবে ভোরের মিষ্টি রোদে, আলোর দুপুরে, বিকালে, গোধূলিবেলা,…


  • জনশূন্য আমার বিবেক / আল মাহমুদ

    ধানের বাতিকগ্রস্ত ভূমিহীন কৃষাণ যেমন বসে থাকে ধান কাটা শূন্য মাঠে ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তেমনি আমিও চেয়ে দেখি আকাশের নীল প্লেটে একগুচ্ছ মেঘের কুন্তল। যেন-বা আমার মায়ের হাতে বেড়ে দেওয়া ঈদের পোলাও। আর- ঝালের রেকাবী থেকে গুঞ্জরিত হিংয়ের গন্ধের মতো কিছু তাপ ঢুকে যায় আমার দেহেও। অতীত কিছুই নেই; সবি বর্তমান। আজ নেই, কালও বুঝি…


  • শূন্যতাকে মানি না / আল মাহমুদ

    শুধু চোখের দৃষ্টি কমে এসেছে এমন নয়। বিচরণের ক্ষমতাও এখন ক্লান্ত। অথচ নিত্য বিচরণের ক্ষেত্র হে আমার পৃথিবী, হে আমার মহাদেশ, হে আমার দেশ, আমার গ্রাম ও আমাদের শহর আমার পা আর উঠতে চায় না। আমার দেহের সবচেয়ে ব্যবহৃত অঙ্গ-প্রতঙ্গের মধ্যে এ প্রাচীন পদদ্বয় আমাকে জানান দিচ্ছে গাছের মতো কিছুকাল স্থানু হয়ে থাকতে। বৃক্ষের স্বভাব…