-
দেশ মাতৃকার জন্য / আল মাহমুদ
একজন কবি আর কি দিতে পারে? এই নাও আমার পরিস্রুত ভাষা নাও কবিতা- আমার রক্ত। কলমের কালির চেয়েও মহার্ঘ। নাও আমার অশ্রুজল দ্যাখো এতে যদি তোমার মরে যাওয়া স্রোতগুলো নদীকে বিহ্বল করে ঘোলা পানির তোড় নিয়ে সমুদ্রের দিকে ধাবমান হয়। নাও অক্ষিগোলক। যদি এতে তোমার ভবিষ্যৎদৃষ্টি একবিংশ শতাব্দীকে দুটি তীক্ষ্ন তীরের মত গেঁথে ফেলে। আমার…
-
কঠিন-কোমল / সাইফ আলি
খসখসে কড়াপরা হাত দেখে ভেবোনা এই আঙুল কখনো গোলাপ ছোঁয়নি; উষ্কখুষ্ক চুল আর ঘর্মাক্ত শরীর কোনো উজবুকের নিশানা নয় ভেবোনা এই বিব্রত চোখ কখনো স্বপ্ন দেখতে শেখেনি কুচকে পড়া আস্তিন আর রঙ জ্বলে যাওয়া ত্বকের অন্দরে যার বসবাস তার চেহারাটা তোমার মতই মোলায়েম, দাগ বসে, তাকে বড্ড সাবধানে ছুঁতে হয়; যেনো চোট না পৌঁছোয়। ঝিনুক…
-
পারাপার / আহসান হাবীব
এখন নিবেছে আলো মিসরে ও দূর বেবিলনে! নগ্ন নীল এ নদীর অতল নির্জনে পাখি তার ক্লান্ত মুখ ধুয়েছে এখন। মাঝির হৃদয় জুড়ে এখন নতুন পারাপার- যে নৌকা ফেরেনি ঘাটে অপেক্ষায় তার। এখন কর্ডোভা আর গ্রানাডায় অন্ধকার নামে! হৃতদীপ্তি অথৈ বিশ্রামে মুক্তি তার। ইতিহাস-নগরীর নেয়ে একটি নতুন শিখা বুকে জ্বেলে অপেক্ষায় আছে পথ চেয়ে- কখন নতুন…
-
নিঃসঙ্গ নির্জনে দার্শনিক / ফজলুল হক তুহিন
আমি এখন কঠিন ব্যধিগ্রস্তের মতন ভীষণ আতঙ্কগ্রস্থ, অস্তিত্বের প্রশ্নে উদ্বিগ্ন! হতাশা, ব্যথা, হাহাকার, মনস্তাপ, উদ্বেগ আমাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে শূন্যতায় অগ্নিকুন্ডে ফেলে দিচ্ছে! সাংঘাতিক অসহায় আমি জীবনের এ প্রহরে। এক অজানা ভীতির তরঙ্গে জীবন কেঁপে কেঁপে উঠছে ক্রমেই ধীরে, সংগপনে। সূক্ষ্ম এ ভীতির শেকড় খুঁজতে খুঁজতে অদৃশ্য অন্ধকারময় ও রহস্যময় এক দৈত্যের সমুখে হয়েছি হাজির! যাকে…
-
রাতের তারাগুলো / সায়ীদ আবুবকর
রাতের তারাগুলো আলোর সুর তোলে কালের ট্রাম্পেটে কাঁচের জানালায় সে-সুর শুনে একা রাত্রি যায় কেটে কী বলে তারাগুলো নিরব সংগীতে, বুঝিনে ভাষা তার- হৃদয়সৈকতে আছড়ে পড়ে এক উথাল হাহাকার ৩০.৯.২০১৫ সিরাজগঞ্জ
-
ভুলে গেছি / আবুল হাসান
ভুলে গেছি, কাকে যেনো ভুলে গেছি উদাস সুরে আর ডেকোনা ঘুঘু পাখী! দুপুর গড়ায়, মনের পারে যাকে যাচি তার অভাবে তোমার ডাকও চরম ফাঁকি! জেনে গেছি সবই যেনো জেনে গেছি কেউ এখানে বুঝবেনা সেই ধুমল স্বর! ঝরা পাতার কান্না নিয়ে মধুর মাছি পুড়ে গেছে, হায়রে জাগে ক্ষোভের ঝড়! আঁচড় দিয়ে ঘুঘু পাখী রক্ত খুড়ি প্রশ্বাসে…
-
হজরত আলী (রা.): জ্ঞানের দরোজা / আবদুল মান্নান সৈয়দ
আমি জ্ঞানের নগরী এবং আলী তার দরোজা। – হজরত মুহম্মদ (সা.) যোদ্ধা-কবি একই সঙ্গে, একই সঙ্গে রৌদ্রে-জ্যোৎস্নায় প্লাবিত তোমার আত্মা। ভ্রাতৃরক্তে রাঙা পৃথিবীতে চেষ্টা করেছিলে তুমি অফুরান শান্তি এনে দিতে;- যে-ব্যর্থতা ভরে আছে লাবণ্যে ও মহৎ আভায়। আবুজরের সঙ্গেও গিয়েছিলে রাবজায় তুমি; উসমানকে বাঁচাতেও পাঠিয়েছিলে নিজেরই পুত্রকে;- দরদী সেবক তুমি। অবিচল ছিলে সুখে, শোকে। বহু…
-
স্বগত কবিতা / সাইফ আলি
কথা ছিলো পথ শেষ হলে আমাদের কবিতার বহরে ফিরিয়ে আনবো প্রত্যাখ্যাত প্রেম কথা ছিলো আমাদের গ্রামে-গঞ্জে-শহরে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো প্রজাপতি পাখনার কারু ফড়িঙের ভিড় অরণ্য নিবিড় আর কাশফুল-শাদা মন নিয়ে নদীতীরে বেরোবো ঘুরতে কথা ছিলো বৈরি এ বাতাসে উড়তে উড়তে গন্তব্যে পৌছুতেই আমরা ফিরিয়ে আনবো গানের বহর; গ্রাম-গঞ্জ আর পুরোনো শহর আবসযোগ্য করে তুলবো ফের…
-
প্রার্থনার ভাষা / আল মাহমুদ
একটু জানান দাও হে প্রভূ, তুমি হাল ধরে আছো আমার মত এক টলটলায়মান দিগভ্রান্ত নৌকোর। জানান দাও তুমি আছ এক ছেঁড়াখোড়া আর সাত তালিমারা পালের ফুলে ওঠা অদৃশ্য বাতাস হয়ে। আমি পাড়ি দিয়ে এসেছি পর্বতপ্রমাণ তরঙ্গের উল্টো দিক থেকে সময়ের উল্টো দিক থেকে আমার যাত্রা। আমি পেওছুব তোমার নির্ধারিত কিনারে। তোমার নির্বাচিত উপত্যকায়। আমার আয়োজন…
-
যৌবনে জীবনে তুমি / আহসান হাবীব
তোমারই আভায় নিত্য নবরূপে তোমাকে দেখার আকাঙ্ক্ষার দীপ জেলে হৃদয়ে কৈশর-যৌবনের সারাপথ হেঁটেছি, জীবন আমার একার নয় জেনেছি এবং তোমাতেই সমর্পণ করেছি; রেখেছি একাগ্র দৃষ্টির আলো পথে ফেলে যে পথের ধূলি মেখেছি সর্বাঙ্গে আর কারার নির্মম অন্ধকার উপেক্ষা করেছি মুক্ত বুক সঙনের মুখে পেতেছি নির্ভয়ে শুধু এক অকৃত্রিম বাসনায়। পলাশে বকুলে বিকশিত সোঁদাল মাটির গন্ধে…
-
আগমনি / কাজী নজরুল ইসলাম
এ কী রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন – ঝন রনরনরন ঝনঝন! সে কী দমকি দমকি ধমকি ধমকি দামা দ্রিমি দ্রিমি গমকি গমকি ওঠে চোটে, চোটে, ছোটে লোটে ফোটে! বহ্নি ফিনিক চমকি চমকি ঢাল-তলোয়ারে খনখন! সদা গদা ঘোরে বোঁও বনবন শোঁও শনশন! হই হই রব ওই ভৈরব হাঁকে লাখে লাখে ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল গৈরিক-গায় সৈনিক ধায়…
-
বিবেকের প্রতিনিধি / ফজলুল হক তুহিন
পিচের সড়কে হেঁটে চলি, চলে কবির শরীর। লাইট পোস্টের আলো রাস্তার মসৃণ পিঠে পড়ে কাঁদে আর কাঁদে। টিপটিপ বৃষ্টির পালক ঝরে নিসর্গে, সড়কে, জোনাকীর নীল ডানায়, কবির জমার জমিনে আর চায়ের স্টলের ফুঁটো চালে। রিকসার টুংটাং শব্দে ও নৈশব্দে ওড়ে পাখি। সন্ধ্যের নরম অন্ধকার দেহে করে মাখামাখি আর নক্ষত্রের মুখ চলে যায় দৃষ্টির আড়ালে। হেঁটে…
-
পুরোনো বাড়ি / সায়ীদ আবুবকর
পুরোনো এই বাড়ি, বুনো লতায় ঘেরা, দাঁড়িয়ে নির্জনে; পড়ছে খসে ছাদ, পলেস্তারা আর নকশা করা ইট; কে ছিলো এই বাড়ি-জানে না কেউ আজ, কারো তা নেই মনে; সেখানে বাস করে এখন ভূতপ্রেত, সর্প আর কীট। সিংহমূর্তিটা দাঁড়িয়ে তিন পায়ে সদর দরোজায়, গিয়েছে ভেঙে মুখ, রেখেছে ধরে তবু প্রাচীন প্রাচূর্য; এখানে একদিন উঠতো রাতে চাঁদ জমাট…
-
তবুও তো জানি / আবুল হাসান
তবুও তো জানি সুরেসা তোমার নীহার পালকে ঠোঁট গুঁজে একা একটি ময়ূর কেঁদেছিল সেই রাতে! ব্যথার তীরের ফলায় বিদ্ধ আর্ত হৃদয় অধীর আকাশ, অবুঝ তারার রংছুট যত ছিন্ন গোলাপ ঝরেছিল তাঁর সাথে। তীক্ষ্ন পাঁজরে মৌ নেশা আর উষ্ণ রক্ত ফুটিয়ে কেবলি দুরু যাতনার দলিত প্রহরে তারা ভীরু নির্বীজ অশ্রুর মতো সুরেসা তবুও ঝড়ের হাওয়ায় তোমার…
-
হযরত উসমান (রা.) : অজস্র প্রস্রবণ / আবদুল মান্নান সৈয়দ
আমি হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘উসমান! যদি আল্লাহতালা তোমাকে খিলাফতের পোশাক পরিয়ে দেন, তবে স্বেচ্ছায় কখনো তা খুলে ফেলো না।’ -আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ইতিহাসে জ্যামিতি কি কাজ করে যায় শব্দহীন? উমর এবং আলী বজ্রাদপি কঠোর; কোমল আবুবকর, উসমান। উসমান লাজুক, নির্বল, সত্তরেও সসংকোচ। একমাত্র আল্লাহর অধীন। এমনই দরদী তিনি, খুললেস অজস্র প্রস্রবণ মরুবালুকার…
-
গন্তব্যের কাছাকাছি এসে / আল মাহমুদ
নদীটা পেরিয়েই মনে হল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সব শব্দ আমাকে ছেড়ে গেছে। ঢেউ, বৈঠা আর পানির ছলছলানির সাথে এতক্ষণ নিরুদ্দেশ যাত্রার যে প্রতিবাদ উঠেছিল। আশ্চর্য নৈশব্দের মধ্যে কখন সব তলিয়ে গেল। শত্রুতাও কি এখন এমন সবুজ মাঠ? যতদূর চোখ যায় বিদ্বেষ হয়ে গেছে পাকা ধানের দুলুনি? আমার পরিশ্রম দেখে যারা একদা বলত, আর একটি মাত্র নদী আর…
-
যখন বিরতি / আহসান হাবীব
নিখুঁত সংলাপে আর অভিনয়ে দু’বেলার কড়ি কুড়িয়ে, পেছনে রেখে মঞ্চের আলোকসজ্জা আর সাজঘরের সীমানা পেরিয়ে পোড়া ইট সাজানো বাগান দূরে রেখেে এখানে বিশ্রাম করি একা বসে অকৃত্রিম মাটির আসন পেতে। সব সাজ খুলে ফেলি রাজা কিম্বা উজীরের অথবা ভাঁড়ের বিচিত্র টুপিটি খুলে দূরে রাখি। ঘাসের শিশিরে মুখের সমস্ত রঙ তুলে ফেল নিপুণ দু’হাতে। অতঃপর সামনের…
-
বিদ্রোহী / কাজী নজরুল ইসলাম
বল বীর- বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির! বল বীর- বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া খোদার আসন আরশ ছেদিয়া, উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর! মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর! বল বীর- আমি চির উন্নত শির! আমি চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস, মহা-প্রলয়ের…
-
উৎসর্গ / কাজী নজরুল ইসলাম
বাঙলার অগ্নি-যুগের আদি পুরোহিত, সাগ্নিক বীর শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষ শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু অগ্নি-ঋষি! অগ্নিবীণা তোমায় শুধু সাজে। তাই তো তোমার বহ্নিরাগেও বেদনবেহাগ বাজে। দহনবনের গহনচারী — হায় ঋষি — কোন্ বংশীধারী নিঙড়ে আগুন আনলে বারি অগ্নিমরুর মাঝে। সর্বনাশা কোন্ বাঁশি সে বুঝতে পারি না যে। দুর্বাসা হে! রুদ্র তড়িৎ হানছিলে বৈশাখে, হঠাৎ সে কার শুনলে বেণু কদম্বের ওই…
-
অন্ধকারের সান্নিধ্য / সাইফ আলি
বাড়ন্ত কষ্টের ছায়াটাকে মুছে ফেলো; নেভাও প্রদীপ- কে তুমি প্রদীপ জ্বেলে দেখে নিলে সবটুকু ব্যথা? পানপাত্রে অধরের নিংড়ানো বীষ নীল, সমুদ্র অথৈই; আকাশের চিরচেনা নীল নয় লাশের মিছিল আর শূন্য বাড়িটার পড়ে থাকা দরজার খিল। সবকিছু বুঝে নিলে, নাও; তবু প্রদীপ নেভাও। মাঝে মাঝে অন্ধকার বন্ধু হয় ভালো শুষে নেয় দুঃখ আর কষ্টের সমস্ত দাগ;…