-
দাড়ি-বিলাপ / কাজী নজরুল ইসলাম
হে আমার দাড়ি! একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি আমারে কাঙাল করি, শূন্য করি বুক! শূন্য এ চোয়াল আজি শূন্য এ চিবুক! তোমার বিরহে বন্ধু, তোমার প্রেয়সী ঝুরিছে শ্যামলী গুম্ফ ওষ্ঠকূলে বসি! কপোল কপাল ঠুকি করে হাহাকার – ‘রে কপটি, রে সেফটি (safety) গিলেট রেজার!’…. একে একে মনে পড়ে অতীতের কথা – তখনও ফোটেনি মুখে…
-
রোদনের উৎস / আল মাহমুদ
আমার জন্যে যাদের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না, ভাবত অকাজের কাজী লোকটা আল্লা মালুম কোথায় হুমড়ি খেয়ে মরবে। কথা শোনে না, সাহায্যের হাত বাড়ালেও ধরে না; একাকী শূন্যে হাতড়ে বেরিয়ে যায়। মনে হয় যেনো বাতাসের পালক শক্ত করে ধরে আছে। অথচ দেখ, এই শহরে কত খানাখন্দ! ম্যানহোলের ঢাকনাহীন পথের প্রতিটি বাঁকেমৃত্যু হা করে আছে! কে তাকে…
-
‘হক নাম ভরসা’ / আহসান হাবীব
আদাব সালাম অন্তে সমাচার এই যে, হুজুর কাল ফজরের অনেক আগেই তামাম মুরুব্বীদের দোয়ার বরকতে সহি-সালামতে এসে নিজের বাটিতে পৌছেচি। এখন সে কারণ পত্রযোগে শতকোটি সালাম নিবেন আর সবিশেষ সংবাদাদি পত্রে জানিবেন। যখন জাহাজঘাটে নেমেছি, তখন নিশিরাত্রি। মন কিছুটা ঘাবড়ালো, তবু মালেকের নাম নিয়ে যখন মাঠের মাঝে এসে নামলাম দেখলাম আজব ব্যাপার, বেশুমার বাতি আসমানের…
-
যদি চাও / সাইফ আলি
যদি চাও, বৃষ্টিতে ধুয়ে নিতে পারো চোখ- কথা হোক ভারাক্রান্ত মেঘেদের সাথে কিছুক্ষণ; তারপর ফের আমাদের ছোটো ছোটো কথাগুলো নরম মাটিতে রুয়ে খেলা শেষ। যদি চাও, ঠান্ডা বাতাস মেখে কৃত্রিম শীতে নিজেকে কুকড়ে নিয়ে আশ্রিত হতে পারো পাঁজরের উষ্ণতায়। হবে?
-
সুখ / সাইফ আলি
রোদ্দুরে পোড়া সুখ ভেজা সুখ বৃষ্টিতে কম্বল মোড়া সুখ খোয়া সুখ কৃষ্টিতে সুখ গানে, কবিতায় শব্দে, বর্ণে; সুখ কারো অযথায় লুকোচুরি দৃষ্টিতে। কারো সুখ হেটে হেটে কারো ফের দৌড়ে, কারো কারো সুখ বেঁচে থাকে আটপ্রৌড়ে ভিটেবাড়ি আঁকড়ে; কারো সুখ খেয়ে যায় ক্ষুদে পোকা-মাকড়ে। সুখ কারো দুধ-ভাত কারো ঝাল-মুড়িতে, কারো সুখ ঝুলে যাওয়া সুবিশাল ভুড়িতে; কারো…
-
পৃথিবী মানুষ এবং তারা / ফজলুল হক তুহিন
পৃথিবী যখন ঘুমে প্রশান্তি প্রশান্তি ঘুমে ঘুমে নীল মানুষ যখন স্বপ্নে সবুজ সবুজ স্বপ্নে স্বপ্নে অমলিন তখন তাদের চোখ রক্তেআঁকা চোখ জ্বলে ওঠে দাউদাউ শিশুদের হৃদয়ে হৃদয়ে তারা ভয়ের আওয়াজ তোলে: হাউমাউ! হাউমাউ! মানুষেরা যখন গভীর আস্থায় বিশ্বাসে পরস্পর গড়ে তোলে ব্রীজ তখন তাদের মন যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রক্তের সিরিজ চালু করে মানুষের সভ্যতায়।…
-
অন্ধ স্বদেশ-দেবতা / কাজী নজরুল ইসলাম
অন্ধ স্বদেশ-দেবতা ফাঁসির রশ্মি ধরি আসিছে অন্ধ স্বদেশ-দেবতা, পলে পলে অনুসরি মৃত্যু-গহন-যাত্রীদলের লাল পদাঙ্ক-রেখা। যুগযুগান্ত-নির্জিত-ভালে নীল কলঙ্ক-লেখা! নীরন্ধ্র মেঘে অন্ধ আকাশ, অন্ধ তিমির রাতি, কুহেলি-অন্ধ দিগন্তিকার হস্তে নিভেছে বাতি, − চলে পথহারা অন্ধ দেবতা ধীরে ধীরে এরই মাঝে, সেই পথে ফেলে চরণ – যে পথে কঙ্কাল পায়ে বাজে! নির্যাতনের যে যষ্টি দিয়া শত্রু আঘাত হানে…
-
এই পতাকার সূর্য সাক্ষী / আল মাহমুদ
দ্যাখো আজ পতাকা দেখারই দিন। কলরব করে ওঠো, উচ্চারণ কর মুক্তির ভাষা। আমিও তোমাদের সাথে দেখতে থাকি। তোমাদের সাথে আমার অপরিচ্ছন্ন দৃষ্টির অশ্রুসজল চোখ দু’টি মেলে দাঁড়িয়ে থাকি। কী লাল, সবুজ পতাকার মধ্যে গোল হয়ে বসে আছে, মনে হয় যেন পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের রক্তের লোহিত কণায় অঙ্কিত হয়েছে এ সূর্য। আমার ভেতরে কলরব করে ওঠে…
-
চরিতাখ্যান : নববর্ষ / আহসান হাবীব
মৃত্যুর মতন তার সারা দেহ শীতল এবং কুৎসিত কর্কশ তার নগ্ন হাত মুখে তার মরিচিকা-রঙ কোনো এক মায়াবিনী নারীর মুখের, বুকে তার মরুতৃষ্ণা। আর সেই তৃষ্ণার আগুন বারবার হেমন্তের হেমলতা বসন্তের নিবিড় বিথার গ্রাস করে। টলোমলো শিশিরের স্নান পাখিদের কলকণ্ঠ জীবনের যৌবনের গান সে আগুনে আর সেই মরীচিকা রঙের সে-মুখে নির্বোধ কৌতুকে খেলা করে। কবে…
-
দাঁড়াও, পথিকবর, জন্ম যদি বঙ্গে / সায়ীদ আবুবকর
দাঁড়াও, পথিকবর, জন্ম যদি বঙ্গে; দু’দণ্ড দাঁড়াও স্থির এ সমাধিস্থলে- যেভাবে দাঁড়ায় বৃক্ষ মৃত্তিকার সঙ্গে; মানুষ কি বাঁচে, হায়, শূন্যে কিংবা জলে! যে-আকাশে থাক পাখি, ফিরে আসে নীড়ে; কিন্তু সেই পাখি শ্রেষ্ঠ, যে-পাখি ছড়ায় স্বদেশের গান মহা মানুষের ভিড়ে- সারা দেশ নুয়ে পড়ে তার পদ্মপায়! পিতা নূর মহম্মদ আর মা আমেনা, সায়ীদ আবুবকর বঙ্গজের নাম…
-
দুঃস্বপ্নের কাকফেরি / ফজলুল হক তুহিন
ভাবতেই পারিনি আমরা সকালের সুবাতাস এভাবে শোকের বিষে নষ্ট হবে আজ। পাখিদের আর্তনাদে, বিলাপে বিদীর্ণ হবে নিজের নিশ্বাস! কেউ কী জানতো কখনও পাখির কান্নার ভারে ভেঙে পড়বে মায়ের বুক। প্রথম যেদিন নীড় বুননের খড়কুটো নিয়ে ছায়ার উঠোনে, পাতাবাহারের সবুজ আড়ালে দুটো বুলবুলি এসে আশ্রয়ের নিচ্ছিল প্রস্তুতি; সেদিন মা বললেন, দেখ্ দেখ্ পাখি দুটো বাসা বানাচ্ছে,…
-
অগ্রহায়ণ / আল মাহমুদ
আমি এই মধ্য অগ্রহায়ণের আকাশে মেঘের গম্বুজ ভেঙ্গে পড়তে দেখেছি কেউ তো আমার মতো অকাজের কারিগর নয় যে মাটির উপর বিছানো মানবিক শত সমস্যা মেলে রেখে আকাশের দিকে তাকাবে? ও অগ্রহায়ণের আকাশ ঝরাও বৃষ্টি, এখন ঘরে ঘরে নবান্ন চলছে মাঠগুলোতে উদগমের কাজ অবসন্ন কিন্তু আমার এখন বৃষ্টি দরকার উদ্ভেদ ও উদগম দরকার। যে নারী আমাকে…
-
বুনো কৈতর / সাইফ আলি
কই তোর কৈতর কই বুনো কৈতর বুঝি উড়ে গেছে বনে, তাই বুঝি নির্জনে একাকি গোপণে কাঁদছিস? বোকা! নিজেকে নিজেই তুই দিয়েছিস ধোকা। ডানাদুটো প্রিয় ছিলো কাটিসনি তাই? তাহলে তো উড়বেই, মিছে অভিমানে কাঁদছিস বোকা, শোন- প্রিয় কৈতর, সারাক্ষণ বাস করে বুকের ভেতর।
-
পোড়ামাটির টব / সাইফ আলি
আজকাল ছোট এই পোড়ামাটির টবেই কোনোমতে টিকে আছে কবিতার চাষাবাদ, প্রত্যাক্ষাণের জৈব আর অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাদের নোনতা জলবায়ু চারাগুলোকে এমন পরিপুষ্ট করে তুলবে ভাবতে পারিনি। তুমি তো ভেবেছিলে, অধিকারের আবাদি জমিটুকু কেড়ে নিলেই নিস্ব হয়ে যাবো; তোমার পায়ে পড়ে বলবো- আর একটা মৌসুম, মাত্র আর একটা; তারপর সব তোমার! শেষ যেবার মেঘ ফেটে বৃষ্টি নামলো, উঠোন…
-
-
ইতিহাস-বিন্যাসের পথে / আহসান হাবীব
এখন হৃদয়ে ডাক বসন্তের- স্তব্ধবাক্ পাখিরা মুখর। সময়ের ক্লান্তি ঝেড়ে অনায়াসে এখানে এখন অশেষ তৃষ্ণার ঢেউ পাখা মেলে। ভাঙা হাটে নগরে বন্দরে রাত্রির পাহারা আর মৃত্যুকে এড়িয়ে সেই ঢেউ এতদিন এখানে এখন বিশাল সমুদ্র এক- এখন জোয়ার। এখন জোয়ার আর ঘাটে বাঁধা সাম্পানের মাঝি তুলেছে নতুন পাল পালে তার মৃদঙ্গের সুর হাওয়ায় হাওয়ায় সুর বসন্তবাহার-…
-
বাংলার “আজীজ” / কাজী নজরুল ইসলাম
পোহয়নি রাত, আজান তখনও দেয়নি মুয়াজ্জিন, মুসলমানের রাত্রি তখন আর-সকলের দিন। অঘোর ঘুমে ঘুমায় যখন বঙ্গ-মুসলমান, সবার আগে জাগলে তুমি গাইলে জাগার গান! ফজর বেলার নজর ওগো উঠলে মিনার পর, ঘুম-টুটানো আজান দিলে – ‘আল্লাহো আকবর!’ কোরান শুধু পড়ল সবাই বুঝলে তুমি একা, লেখার যত ইসলামি জোশ তোমায় দিল দেখা। খাপে রেখে অসি যখন খাচ্ছিল…
-
গান্ধীজীর প্রতি / ফজলুল হক তুহিন
দু হাজার দুই সাল। ঠিক এই সময়ে গান্ধিজী, আপনার জন্মভূমে আগুনের স্বাদু খাদ্য হলো জীবন্ত মানুষ! মানুষের কয়লায় হিংস্রতার পেট এখন ভরাট দাউদাউ আগুনের চমৎকার জাহান্নাম আজ গুজরাট! আপনার ‘সত্যাগ্রহ’ আপনার ভস্মের সাথেই উধাও। সত্যের মতো নীতির মতো কবেই আভিধানিক শব্দাবলী। সে জন্যেই বুঝি আপনার সুসন্তানেরা সব কী নিপুণভাবে চিরে ফেলছে গর্ভবতীর পেট অতঃপর কী…
-
এপিটাফ / সায়ীদ আবুবকর
দাঁড়াও, পথিকবর, জন্ম যদি বঙ্গে; দুদণ্ড দাঁড়াও স্থির এ সমাধিস্থলে- যেভাবে দাঁড়ায় বৃক্ষ মৃত্তিকার সঙ্গে; মানুষ কি বাঁচে, হায়, শূন্যে কিংবা জলে! যে-আকাশে থাক পাখি, ফিরে আসে নীড়ে; কিন্তু সেই পাখি শ্রেষ্ঠ, যে-পাখি ছড়ায় স্বদেশের গান মহা মানুষের ভিড়ে- সারা দেশ নুয়ে পড়ে তার পদ্মপায়! পিতা নূর মহম্মদ আর মা আমেনা, সায়ীদ আবুবকর বঙ্গজের নাম…
-
আর কি নেবে শব্দ ছাড়া / সাইফ আলি
একটা কবির সব কবিতা অন্য কারো হাতের মুঠোয় শূন্য খাতা, বিষন্নতা বুকের মধ্যে কি জল উঠোয়!? কি ফুল ফুটোয় শুকনো ডালের মুমূর্ষুতার বাকল পেটে এক জীবনের প্রেম কাহিনী ঝুলতে থাকে আকাশ ফেটে! আর কি নেবে শব্দ ছাড়া- আর কি আছে কবির কাছে? গোলাপ ছাড়া আর কি ফোটে একটা পুরোন গোলাপ গাছে? হয়তো কিছু বৃষ্টি আছে-…