-
আজকে কেমন বৃষ্টি / সাইফ আলি
আজকে কেমন বৃষ্টি এলো এলোমেলো ঝরলো ভীষণ সারা বিকেল-সন্ধ্যা-সারা রাত্রি জুড়ে আকাশ ফুড়ে ! রাস্তা জুড়ে বৃষ্টি ফোটা বেলুন ফোলায় ওড়ায় ছাতা মাতাল হাওয়া, একটু আলো একটু আঁধার সুখের এবং বিষন্নতার হঠাৎ হঠাৎ আসা-যাওয়া; গুনগুনিয়ে একটু গাওয়া একটু ঝরা পাতার পিঠে টাপুর টুপুর শব্দ-তালে। কদম ডালে ভিজতে থাকা একটা পাখি- জানলা খুলে বাড়িয়ে রাখা হাতের…
-
বলো তারপর কোথায় আমরা যাবো / সায়ীদ আবুবকর
এত মৃত্যু, এত লাশ এত ধ্বংসযজ্ঞ, এত সর্বনাশ আর ছোপ ছোপ এত রক্তের উপর দিয়ে হেঁটে হয়তো বা স্বপ্নের সে গেটে পৌঁছে যাবো ঠিকঠিকই, যে রহস্যময় গেট খুললেই সাফল্যের সাজঘর- তারপর? বলো তারপর কোথায় আমরা যাবো? ধু-ধু নীল আকাশে কেবলি ওড়ে আজ বাজপাখি, শকুন ও চিল। জীবনের রাজপথে ক্ষুধার্ত শেয়াল ডাকে। সেই ডাক টেনে আনে…
-
দুঃসময়ের প্রার্থনা / ফজলুল হক তুহিন
এইসব দিন এইসব রাত কিভাবে গড়ায় আমাদের প্রভু তুমি তো জানোই- রাতগুলো আর দিনগুলো সব খুন হয়ে যায়! আমরা তো প্রভু ত্রিকালদর্শী নই- সাধারণ আমরা সবাই অতীত-আগামী দেখি না, বুঝি না কুটিল পাঁকের বর্তমানও। বুঝি ইউনুস নবীর মতন আটকা পড়েছি ঘাতক মাছের পেটে বিষাক্ত দাঁতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় এই প্রাণের সীমানা! হায়, আমাদের বাঁচাবে…
-
আমি ইচ্ছে পুরণের মাটি নই / আল মাহমুদ
যারা আমাকে পরামর্শ দিতো মানুষ একা থাকতে পারে না। তারা হয়তো সত্যিই বলতো। কিন্তু আমি ছিলাম অনমনীয়। ছিলাম একটা পোড়ামাটির পাত্রের মতো। কারো ক্রোধ হলে পাত্রটিকে পাথরে আছড়িয়ে চূর্ণ করতে পারবে। কিন্তু দুমড়ে মুচড়ে আবার কাদার মতো ইচ্ছে পুরণের মাটিতে পরিবর্তন করতে পারবে না। প্রকৃত পক্ষে আমি অর্ধেক মানুষ আর বাকি অর্ধেক তো কবিতা। সম্পূর্ণ…
-
যৌবনজলতরঙ্গ / কাজী নজরুল ইসলাম
এই যৌবনজলতরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ? কে রোধিবি এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদ? যে সিন্ধু-জলে ডাকিয়াছে বান – তাহারই তরে এ চন্দ্রোদয়, বাঁধ বেঁধে থির আছে নালা ডোবা, চাঁদের উদয় তাদের নয়! যে বান ডেকেছে প্রাণ-দরিয়ায়, মাঠে-ঘাটে-বাটে নেচেছে ঢল, জীর্ণ শাখায় বসিয়া শকুনি শাপ দিক তারে অনর্গল। সারস মরাল ছুটে আয় তোরা!…
-
শীতের সকাল / আহসান হাবীব
রাত্রিশেষ! কুয়াশায় ক্লান্তমুখ শীতের সকাল- পাতার ঝরোকা খুলে ডানা ঝাড়ে ক্লান্ত হরিয়াল। শিশির সন্নত ঘাসে মুখ রেখে শেষের কান্নায় দু’চোখ ঝরেছে কার, পরিচিত পাখিদের পায় চিহ্ন তার মোছেনি এখনো, আছে এখনো উজ্জ্বল- কান্নায় মাধুরীটুকু ঘাসে ঘাসে করে টলোমল। মলিন চাঁদের টিপ আকাশের পাণ্ডুর কপালে। প্রাত্যহিক পৃথিবীর পরিচিত সাতডিঙার পালে হাওয়া নেই। স্তব্ধ মূক এ অরণ্য…
-
হেমন্তের ঘর / সায়ীদ আবুবকর
সেজেছে বাংলাদেশ চাটগাঁয় মাটির পাহাড়ে, ধানসিঁড়ি-পুনর্ভবা-কপোতাক্ষ পাড়ে; নতুন শিশিরে ভিজে-নেয়ে সারা সিলেটের ঘাস আর নওগাঁর গাছের পাতারা; বসিয়েছে শুভ্রমেলা সিরাজগঞ্জের কাশ যমুনার দুই পাড়ে; পায়রার চোখ যেন সাতক্ষীরার আকাশ; মানিকগঞ্জের মাঠগুলো, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ি পরেছে সরিষাশাড়ি; সেজেছে বাংলাদেশ জামালপুর-ঠাকুরগাঁয়ে, যে হাঁটে কবির বুকে ঊর্বশীর পায়ে। প্রিয়তমা, ফিরে যাই চলো ফের পুনড্র নগরে,- মসলিন শাড়ি পরে…
-
ও বেহুলা ও সখিনা / ফজলুল হক তুহিন
ক. কী এক খোয়াবে পোয়াতী মেঘের মতো কেঁদে ফ্যালে বেহুলা সোয়ামি যে ঘরে মেখে দেবে তাকে প্রেমের প্রথম পরাগ সেখানেই তার প্রাণিত স্বপন হয়ে যাবে নীল বিলাপ- সে কথা কী হয় বিশ্বাস? তবু সাহসী বেহুলা। অতঃপর এলো সেই কাল রাত! নাগিনীর বিষে আসমানে জমে বিষমেঘ। জমিনে ঘাসেরা সবুজ হারায়। হাওয়ায় হাওয়ায় রটে অলুক্ষণে কী এক…
-
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি / আল মাহমুদ
কিছুকাল যাবত কিছু একটা পঁচে যাওয়া দুর্গন্ধ আমাকে কেবলি তাড়না করে ফিরছে। গন্ধটা কোথা থেকে আসছে তা বুঝতে না পারলেও এটা আন্দাজ করতে পারছি কাছেই কী একটা যেন মরে পচে এ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমি প্রতিটি নদীর পানি নাকের কাছে এনে শুঁকে দেখেছি। না, মেঘনা যমুনা পদ্মা এই সব স্রোতস্বিনী মাঝে মাঝে শুকিয়ে তলপেট বের করে…
-
জীবন / কাজী নজরুল ইসলাম
জাগরণের লাগল ছোঁয়া মাঠে মাঠে তেপান্তরে, এমন বাদল ব্যর্থ হবে তন্দ্রাকাতর কাহার ঘরে? তড়িৎ ত্বরা দেয় ইশারা, বজ্র হেঁকে যায় দরজায়, জাগে আকাশ, জাগে ধরা−ধরার মানুষ কে সে ঘুমায়? মাটির নীচে পায়ের তলায় সেদিন যারা ছিল মরি, শ্যামল তৃণাঙ্কুরে তারা উঠল বেঁচে নতুন করি; সবুজ ধরা দেখছে স্বপন আসবে কখন ফাগুন-হোলি, বজ্রাঘাতে ফুটল না যে,…
-
ক্রান্তিকাল / আহসান হাবীব
মধ্যরাতে রাজপথে দেখি এক নরীর শরীর- যে নারী নায়িকা ছিলো কোনোকালে এই পৃথিবীর। সর্বাঙ্গ পুড়েছে তার বণিকের তৃষ্ণার উত্তাপ, হৃদয়ের রক্ত নিয়ে রেখে গেছে নখরের পাপ; দেখে মনে হয় বহুভোগ্য এই নারী, এ হৃদয় সে হৃদয় নয়। একদিন এই নারী ইতিহাস-বিন্যাসের ভার নিয়েছিল নিজ দেহে, পৃথিবীর সঙ্গীত সভার যে নারী সম্রাজ্ঞী ছিলো, অন্ধকার রাত্রির প্রহরে…
-
এপাড়ার চামচিকা ওপাড়ার মাতবর / সাইফ আলি
এপাড়ার চামচিকা ওপাড়ার মাতবর ঢাকা এসে আত্মিয়! বলে- মামা হাত ধর, এই ঢাকা শহরের অলিগলি-রাস্তায় তুবড়ি বাজিয়ে রাজ করে যাবো আস্থায় ভাগেযোগে নেতা আছি আমরা যে সাত ঘর। মাতবর বলে- বাহ, বুদ্ধি চমৎকার; মহৎ এ প্রস্তাবে বলুন অমত কার? সাতঘাড় এককাতে রাজি মতামত দেয় শাহাবাগে জড়ো হয়ে এক স্বরে ঘোঁত দেয়। ভেবাচেকা পাবলিক বলে, বাজিমাত…
-
অনামাঙ্কিত হৃদয় / আল মাহমুদ
আমার জীবনতরী দুলছে। যাকে বলি মরণপয়োধি এখন তার উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে পাল নামিয়ে ফেলেছি। গন্তব্যে পৌছার আগেই খসে যাচ্ছে মেধা, মনন, যৌবন ও স্মৃতি। এমনকি তোমার মুখও মনে পড়ে না। কেবল ভাঙাচোরা কিছু বিষয় মঝেমধ্যে আকাশ ফাটা বিদ্যুতের চমকে আমি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত দেখতে পাই। ভাসছে আমার দুটি চোখ, ভাসছে আমার মগজের কিছু অংশ। আর ঘাউড়া…
-
তখন হে দেশবাসী / সায়ীদ আবুবকর
হৃদয়ে ভারত যার, বাংলাদেশ মুখে আর যারা পাকিস্তান পুষে রাখে বুকে এদেশ তাদের নয়, তারা পরগাছা; এদেশের রক্ত চুষে তাদের এ বাঁচা নরকে বাঁচার মতো, তবু অহঙ্কারে চামচিকার পায়ে তারা জোড়া লাথি মারে এদেশবাসীর বুকে, আর কুটজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধে দেশ। যখন জঞ্জালে ভরে গেছে পথঘাট, থেমে গেছে গতি, তখন হে দেশবাসী, শোনো এ মিনতি আমার,…
-
মহান সম্রাট, আপনাকে / ফজলুল হক তুহিন
সম্প্রতি আমি একটি চরিতাভিধান রচনা করেছি পৃথিবীতে যারা সুমহান শুধু তাদেরকে নিয়ে। এই ধরুন চেঙ্গিস খান, হালাকু খান, হিটলার মিলোসভিচ প্রমুখ। আর আপনি তো আছেনই। একদম শুরুতেই- কেননা আপনি আমাদের যুগের প্রধান অধিপতি আপনাকে ছাড়া এক মুহূর্ত কি চলে পৃথিবীর গতি? আপনার মহানুভবতা পৃথিবীতে প্রশান্তির সুবাতাস এনেছে দারুণ। দেখুন না আপনার অলৌকিক হাতের মায়ায় খরার…
-
তামসিক একটি মুহূর্ত / আহসান হাবীব
একদা হঠাৎ এক অপরাহ্নে মনে হলো মৃত্যুও কঠিন হতে পারে। যেহেতু অনন্তকাল বাঁচবে না জানি মৃত্যুর দর্শনে বহু কবিতার শরীরে স্বাস্থের অতীন্দ্রিয় উজ্জ্বলতা রেখেছি; ভেবেছি জীবন এবং এই জগৎকে দুদিনের পান্থশালা; সহজে পেয়েছি নির্মল আনন্দ যার ব্যাখ্যা নেই পৃথিবীর ফুলের পাপড়িতে কিম্বা হীরকে পান্নায়। আহারে-বিহারে শুধু কালক্ষেপ, প্রতীক্ষায় হৃদয় রেখেছি উম্মুখ, কখন কবে অনাদি অনন্তকাল…
-
নগদ কথা / কাজী নজরুল ইসলাম
দুন্দুভি তোর বাজল অনেক অনেক শঙ্খ ঘন্টা কাঁসর, মুখস্থ তোর মন্ত্ররোলে মুখর আজি পূজার আসর,− কুম্ভকর্ণ দেবতা ঠাকুর জাগবে কখন সেই ভরসায় যুদ্ধভূমি ত্যাগ করে সব ধন্না দিলি দেব-দরজায়। দেবতা-ঠাকুর স্বর্গবাসী নাক ডাকিয়া ঘুমান সুখে, সুখের মালিক শোনে কি – কে কাঁদছে নীচে গভীর দুখে। হত্যা দিয়ে রইলি পড়ে শত্রু-হাতে হত্যা-ভয়ে, করবি কী তুই ঠুঁটো…
-
আমাদের একমাত্র কথা / সায়ীদ আবুবকর
এইসব ফুল, নদী, নারী- হয়তো বা ভুলে যেতে পারি; ভুলে যেতে পারি বেচাকেনা, গঞ্জের চায়ের স্টল, চেনা রাস্তাঘাট, ব্রিজ, খালবিল; পারি আকাশের গাঢ় নীল যেতে ভুলে, আর ভরা চাঁদ, সর্ষে বাটা ইলিশের স্বাদ; আরো যদি চাও, দাদা, পারি ভুলে যেতে তরিতরকারি- সবজির খেত, ঘর, গোলা, খেজুরের রস, গুড়, ছোলা; এত পথ পার হয়ে এসে ভুলে…
-
রবীন্দ্রনাথের প্রতি / ফজলুল হক তুহিন
ক দিন ধরেই মেঘে আর বৃষ্টিতে জিম্মি করে রেখেছে এই আমাকে, সবাইকে। মেঘকে নিশ্চয় প্ররোচণা দিয়ে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ। আশ্চর্য তাঁর বর্ষাপ্রীতি অসময়ে এই বাংলাদেশে বৃষ্টি ঝরায় একদিন নয়, দুইদিন নয়, এক সপ্তাহ সবাই বৃষ্টিবন্দি! মৃত্যুর পরও কেন আপনি বাড়িয়েছেন বর্ষাপ্রিয় যাদুকরি সেই হাত? আপনার মতো বর্ষাযাপনের সাধ থাকলেও সাধ্য নেই আমাদের। চায়ের স্টলে প্রাণজ আড্ডায়…
-
জীবন / আহসান হাবীব
ভাঙাচোরা দেয়ালের স্তুপাকার পুরনো ইটের ইতিহাস-লাবণ্যের কিছু আভা পাওয়া যায় টের মনে মনে! কী আবেগে দু’হাতে সরাই পুরনো ইটের স্তুপ, লিখে রেখে যাই আরো কথা, আরো কিছু গান আর নতুন খেয়াল বানাই নতুন ইট নতুন দেয়াল। পথে পথে সংশয়ের সন্দেহের ধূলি ওড়ে কত, বেদনায় নত দুই চোখ, ঝরে অশ্রু। সেই ধূলি সেই অশ্রু নিয়ে দু’হাতে…