-
ফকির / সায়ীদ আবুবকর
ছেঁড়া আলখেল্লা পরে একটি ফকির হো হো করে হাসতে হাসতে দৌড়াচ্ছিল রাস্তা দিয়ে। আমি হাত ঊঁচু করে তাকে থামিয়ে দিলাম: কী ব্যাপার, এত হাসি কিসের? ভিক্ষেটিক্ষে কিছু চাই নাকি? তওবা তওবা বলে সে দৌড়াতে লাগলো চোখবুজে। পশ্চাতে ফিরেও তাকালো না একটিবার। কিছুদিন পর শহরের মাঝখানে তার সাথে ফের দেখা। অনেক দিনের পরিচিত কোনো মানুষের মতো…
-
আগত, অনাগতকাল শান্তিময় হোক / আল মুজাহিদী
যখন আমার স্বপ্নগুলো পাখির পোড়ানো পালকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে আমি চিৎকার করে উঠি ‘হিরোশিমা’, ‘হিরোশিম ’ বলে। সারারাত নিদ্রাহীন কেটে যায় দুঃস্বপ্নের ভেতর, মেঘের জলবিদ্যুতের সাথে আছড়ে পড়ি। হিরোশিমা, দোযখের লাল অগ্নিশিখা যখন দাউ দাউ করে জ্বলে আমি ধ্বংসের কিনারে এসে উৎকণ্ঠায় ভেঙে পড়ি আজ যেন আমার আর কোনো সূর্যোদয় নেই সূর্যাস্ত কেবল ছায়া ফেলে।…
-
ভেঙে যেয়ো না মা আমার / আল মাহমুদ
যেসব শিশুদের আমি একদা হাসতে খেলতে এবং হাঁটতে শিখিয়েছিলাম এখন তারা আমার পঙ্গুত্ব চোখের নিষ্প্রভতা এবং নিশ্চল নৈরশ্য নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করছে। আড়ালে নয় আমার সামনে। আমি ভাবি এটাই জগতের নিয়ম কিনা আমি অবশ্য এতে কোনো চাঞ্চল্য অনুভব করি না, না-বেদনা না-দুঃখ। কারণ আমি কালকে অতিক্রম করে আসা একটি নিভে যাওয়া ধুমকেতু মাত্র, যেন তেজ…
-
মা / সায়ীদ আবুবকর
সে প্রথম চুম্বনের পর কেঁপে উঠেছিল থরথর করে, যেন ঝড়ে কাঁপা কোনো অশ্বত্থের কচি ডাল। অতঃপর অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো সে সুপ্রিয় তার প্রেমিক পুরুষের দিকে, যেন কোনো অবাক হরিণী। সে প্রথম মিলনের পর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠে নিঃসাড় হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর মুগ্ধচোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল সুঠাম তার প্রেমিক পুরুষের বুজে থাকা প্রশান্ত চোখের পাপড়িগুলো।…
-
এখন আমি অতীত হবো… / সাইফ আলি
এবার শীতে- কুয়াশার চাঁদর গায়ে জড়িয়ে যখন বসন্তের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম ঠিক তখনই তোমার রুক্ষস্বর আমাকে জানিয়ে দিলো – গ্রীষ্ম সমাগত। অথচ- গ্রীষ্ম কোথায়…!! এ দেখি বর্ষার প্লাবনে বুকের চাতাল ভিজে একাকার- এরপর- প্রকৃতির সকল নিয়ম ভঙ্গ করে অনাকাক্সিক্ষত সময়ের আবির্ভাবে হতচকিত আমি নদীতীরে বসে অপেক্ষায়… ভেবেছিলাম- এবার বুঝি সত্যি সত্যিই সাদা মেঘের ভাঁজে…
-
নো পাসারান নো পাসারান / আল মুজাহিদী
`Arma virumque cano’ (I sing of arms and the man) -Virgil ‘নো পাসারান’। এই ধ্বংস আর ভস্মরাশি থেকে আমি জেগে উঠি। হিরোসিমা তুমি-ই প্রত্যুষ তুমি-ই সূর্যাস্ত তুমিই আগামী সূর্যোদয়। ‘নো পাসারান’। আমি তোমার স্তবগাথা রচনা করি প্রতিটি ধ্বংশ এবং নির্মানের মধ্যে। বিনাশের কাঁটাটিকে একটি অমোঘ দূরত্বের দিকে সরিয়ে রাখাই ভালো। জানো? পারমাণবিক বিধ্বংসিতা মানুষের আয়ত্বের…
-
ভয় / সায়ীদ আবুবকর
ভয় কোথায় গেল হে, বলতে বলতে লোকটা দৌড়াচ্ছিল ঊর্ধ্বশ্বাসে। আমি ছুটে গিয়ে বললাম, ভাই, কী খুঁজছেন এইভাবে? সে থমকে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বললো, ভয়! ভয়কে এ ফেরাউনের শহরে আমি পাচ্ছি না কোথাও খুঁজে। হায়, এ শহরে ভয় ছাড়া কিছুই তো পড়ে না আমার চোখে- আমি বললাম, যেদিকে তাকাই, শুধু ভয়; বন্দুকের ভয়, কিরিচের ভয়, গলা…
-
কফ / সাইফ আলি
লক্ষ্য করলাম, আজকের পত্রিকার পাতায় কোনো মৃত্যুর সংবাদ নেই নেই কোনো ধর্ষণের রমরমা প্রতিবেদন; নেই কোনো আত্মহত্যা কিংবা আত্মঘাতি বোমা হামলার সাধারণ চিত্রও। আতিপাতি খুঁজতে শুরু করলাম কোনো অপঘাত কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার নূন্যতম একটা সংবাদের জন্য; কিন্তু কি আশ্চর্য কোথাও কোনো সংবাদ পেলাম না যা দিয়ে ফেসবুকে কিংবা চায়ের কাপে সামান্য ঝড় তোলার প্রয়াস চালানো…
-
ভালোবাসি, বাসি না / সাইফ আলি
ধুসর প্রজাপতি, তোমার একটা ডানা আমার বড্ড প্রয়োজন; নান্দনিক একটা প্রচ্ছদের জন্য, তোমার ডানা যে বইয়ের শোভা বর্ধন করবে তার মধ্যে রয়েছে গোটা চল্লিশেক প্রেমের কবিতা। কিন্তু তোমাকে মেরে তোমার ডানাটা ছিনিয়ে নিতে মন সায় দিচ্ছে না। কি করবো বলো? এখন শুধু তোমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিই বা করার আছে…
-
আহারে বোকা চোখ / সাইফ আলি
ধোঁয়াটে মেঘগুলো চোখের পর্দায় কখনো সাদাকাশ কখনো বালুচর, কখনো জানালায় আলতো এলোমেলো চুলের কারুকাজ কাঁপছে থরথর। আমি কি অদ্ভুত ভেবেছি গাঙচিল ছুঁয়েছে বালিয়াড়ি ভিজেছে মরুমন, অথচ ঘাসফুল, সে ছিলো ফুলহীন কুয়াশা ঝরেছিলো সকালে কিছুক্ষণ। আহারে বোকা চোখ কি তোর দৃষ্টি মেঘ না উড়তেই ভেবেছি বৃষ্টি।
-
নাটকের মতো / সায়ীদ আবুবকর
কেমন স্বপ্নের মতো লাগলো সব। মুসলমানির ভয়ে যে-ছেলেটি বুনোগাছের মতো গজে ওঠা পাটখেতের ভেতর পালিয়ে থাকতো একদিন, সে কেমন মৃত্যুকে তুচ্ছ করে বক্ষ উদোম করে দাঁড়িয়ে রইলো নির্ভীক, সীমারের ছুরির সামনে। কোনো সুন্দরীর চোখে চোখ পড়লে ভীতু হরিণের মতো যে কেমন আড়ষ্ট হয়ে যেত লজ্জায়, সমস্ত সুন্দরীর কলিজাগুলো কেটে বস্তায় পুরে সে ডুবিয়ে দিলো কি-নির্বিঘ্নে…
-
স্বপ্নের ভেতর দর্জি মেয়েটি / আল মাহমুদ
রাতভর বৃষ্টি। আর সেলাই কলের শব্দ। কে এই যুবতী? ক্রমাগত সেলাই করে চলেছে ভাসমান মেঘের সাদা থানগুলো সে কি সেলাই করছে আমার জন্য কাফন? তার মুখ আমি বিদ্যুতের ঝলকের মধ্যে একবার মাত্র ঝলসে উঠতে দেখেছি। অচেনা ঘর্মাক্ত চেহারা। নাকের নাকফুলটিতে একটিমাত্র জোনাকি। খাটের উপর উপচে পড়ছে এক প্রবল পুরুষের নগ্নতা। মেয়েটি আমার চেনা নয়। কিন্তু…
-
আণবিক অনিশ্চয়তা / আল মুজাহিদী
এখন শিশুও শান্তি চায় না, অমৃত চায় না অমৃতে অরুচি হয়েছে বড়ো তার পিতা ও মাতার-গুরুজনদের এখন শিশুও শান্তি চায় না অমৃতেও নাস্তি। খোলাপার্ক, ছায়াহ্রদ, ময়দানে বারুদের বিকট গন্ধ এখন পৃথিবীর অন্দরে কন্দরে অগ্নিময় সেলেখানা পা বাড়ালে চোখ খুললেই কেমন ঝলসে যায় সব। দেহ, নাড়ী, অন্ত্রনালী, বিপুল করোটি। আমিও আমার শিশুটির সাথে হাসির হররা বন্ধ…
-
দূর থেকে দেখলাম / সাইফ আলি
দূর থেকে দেখলাম আকাশটা মেঘময় বৃষ্টি বালুচরে জমায় কর্দমা… আলতো কাশফুল বাতাসে কাঁপছিলো মায়াবী রোদ্দুরে হালকা তাপ ছিলো অথচ কাছে যেয়ে হাতটা ছোঁয়াতেই বুঝেছি নদী নয় তা ছিলো নর্দমা বৃষ্টি ডাস্টবিনে জমায় কর্দমা। দূর থেকে দেখলাম আকাশটা পাখিময় সোনালী রোদ্দুরে পালক উড়ছিলো… চোখের পল্লবে মোড়ানো কুঁড়ি তাই ফুটলো ফুল হয়ে অবাক ইশারায় অথচ কাছে যেয়ে…
-
জিদের শহর / আল মাহমুদ
জিদের শহরে আছি। এ শহরে কেউ বুঝি মচকায় না কোনোদিন। হেলে পড়ে না, কাত হয় না, চিৎ হয় না। কেবল আকাশের দিকে মাথা তুলে গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। মৃত্যুর গর্জন কিংবা বিদ্যুতের ঝলসে ওঠা দেখে পাখিরা অন্ধকারেও ঝাঁপ দেয় যেখানে, পশুরা পালায়। ওই তো একটা চিতল হরিণী দিগ্বিদিব জ্ঞানশূন্য হয়ে কেওড়ার কাঁটায় ঝাঁপ দিচ্ছে। ক্ষত-বিক্ষত,…
-
এ এমন এক জীবনকাহিনী / সায়ীদ আবুবকর
বাহির দেখলে মনে হয় পাকা, ভেতরটা খেয়ে গেছে পোকায়, এমনই একটি পেয়ারার মতো আমার দুর্দশা। চমৎকার বাঁশের খুঁটির উপর যেন দাঁড়ানো একটি আটচালা ঘর, সবগুলো খুঁটির পোতাই যার খেয়ে গেছে ঘুণে, ঝড় এসে ধাক্কা দিলেই যা উল্টে পড়বে ধুলোয়। অথবা একটি চোরাবালি যেন আমি, যার বুকে পা দিলে মানুষ তো ডোবেই, আমিও আমাকে নিয়েই ডেবে…
-
কয়েক টুকরো আমি / সাইফ আলি
আয়নাটা হাত থেকে পড়ে যেতেই কয়েক টুকরো আমি ছড়িয়ে পড়লাম এদিক সেদিক, দেখলাম একই সময়ে বাগদাদে একটা বোমার বিকট বিষ্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে ঝরে পড়লো কয়েকটি ফুল… দেখলাম এই সামান্য সময়েই রোহিঙ্গাদের কয়েকটি গ্রাম পুঁড়ে ছাই হয়ে গেলো এবং ইসরাইল জুড়ে জ্বলে উঠলো দাউ দাউ আগুন… পুজিবাজারের দরপতনে চিন্তিত কয়েকটি মুখ নিজেদের মধ্যে সেরে নিল গোপণ…
-
নাফের বুকে হয়তো কিছু ফানুস ভাসে… / সাইফ আলি
কি ভাষায় করবো প্রকাশ, পাইনে ভাষা জমাট বাঁধা কণ্ঠে আমার নীল কুয়াশা স্বপ্ন দেখি গ্রহণকালের পর্ব শেষে নতুম প্রেমের করবে আবাদ প্রেমিক চাষা রোহিঙ্গারা প্রেম জানে না বললে তুমি বাস্তুহারার কান্না তোমার ভাল্লাগে না মাটির ঘরে সবাই করে বসত শেষে; তবুও কেনো অহংকারে বাড়াও দেনা? নাটাইছাড়া ঘুড্ডি হয়ে উড়ছে যারা তাদেরও এক নাটাই ছিলো ভুললে…
-
অলৌকিক কুয়াশা / আল মাহমুদ
আমার এখন এমন একটা অবস্থা, আমি অর্থাৎ আমার চোখ এমন এক কুয়াশাকে কবুল করেছে, কোনো মানুষের চেহারার পার্থক্য, বৈশিষ্ট্য নাক-মুখ-চোখের বর্ণ কিংবা তিলচিহ্ন ইত্যাদি খুঁটিনাটি যাতে একজনকে শনাক্ত করা যায়- তুমি আসমা, তুমি কাজল, তুমি কাওসারী কিংবা তোমাকে চিনি না এই বোধ জন্ম লয়; আমার আর নেই। আমার এখন প্রতিটি মানুষকে মনে হয় মানুষ মাত্র।…
-
ভাঙা কলস / সায়ীদ আবুবকর
অতীতের কতক অংশ মুছে ফেলা যেত যদি, হৃদয়ের পুরোনো প্রাচীরগুলো ভেঙে ফেলা যেতো; যদি গা ঘিনঘিন করা লজ্জা ও অনুশোচনার দিবস ও রাত্রিগুলো কোঁদাল দিয়ে উপড়ে ফেলা যেত জীবনজমিন থেকে, জীবনের ঘড়ি থেকে ভালবাসাহীন সেকেণ্ড, মিনিট ও ঘন্টাগুলো ভস্ম করে দেওয়া যেত, মোবাইলের অস্বস্তিকর কোনো নম্বরের মতো মুহূর্তে ডিলিট করে দেওয়া যেত বিবেককে কেউটে সাপের…