-
নতুন মেঘ / সাইফ আলি
আবার নতুন মেঘ এনেছে যে শ্রাবনের ঢল ঘুমন্ত নদীগুলো হঠাৎ জেগেছে তার ডাকে, হে মাঝি আবার তুমি বের হও জিবিকার খোঁজে রুপালী মাছের পেট চিক চিক করে ঝাঁকে ঝাঁকে- মেঘ দেখে ভয় পেলে মাঝির কি সংসার চলে দাঁড় বাও জোরে মাঝি জাল ফেলো দক্ষ্যের মতো ফুলুক নদীর জল দুলুক নৌকা তবু আজ, কান পেতে শোনো…
-
বার্ধক্য / সাইফ আলি
মেঘ ঝির ঝির ঘোলা চশমার কাঁচ ছুঁয়ে দেয় কেউ, ছুঁয়ে দিয়ে যায় শৈশব উতলা উঠোনে ভরা বর্ষার বেঠক বসবেনা আর; বার্ধক্যের বন্ধন বড় নির্মম… ভেজা দৃষ্টি তবুও খুঁজে যায়- চোখ বুজে যায়, কথা পায় না তো হায় কেউ আর; আষাঢ়ের সাথে লেখা হয়ে গেছে সেই কবে উপসংহার।
-
রক্ত-গোলাব / সাইফ আলি
(প্রিয় টিটন ভাইকে স্মরণে) সাজানো বাগান থেকে একে একে ঝরে যায় সবকটি রক্ত-গোলাব হায়েনার চিৎকারে নিভে যায় আমাদের আলোর মশাল। তোমার মৃত্যু যদি হয় জেনে রাখো জননী-স্বদেশ; তোমারি বুকের দুধে হয়েছে লালন ঐ ঘাতকের দল তোমারি বুকের দুধে বেড়ে ওঠা শেয়ালের দল পেয়ালায় ঠোঁট রেখে পান করে রক্ত-সরাব… আর কোনো ব্যাথা নেই এর চেয়ে ব্যাথা…
-
প্রেমিকের চোখ / সাইফ আলি
পাখিরাও কথা কয় তুমি বলো গান, ফুলেরাও সঙ্গমে মাতে তুমি দেখো রঙের বাহার; ভালোবাসো যাকে তার সবটুকু কালো হয় মেঘছেঁড়া জোছনার রাত, আর যাকে ঘৃণা করো- তার হাসি হয়ে যায় চকচকে ধারালো করাত। প্রেমিকের চোখে দেখো হতাশ হবে না কোনোদিন, ভালোবাসা পৃথিবীকে করে তোলে ভীষণ রঙিন।
-
কেউ নয়; হয়তোবা কেউ / সাইফ আলি
দূরে কেউ দাঁড়িয়েছে এসে নীল ঘেঁসে, আকাশের নীল; মেঘে নেই তাল-লয়-সুর নেই কোনো শুদ্ধ অন্তমিল। বৃষ্টি হবে, অনবরত আবার সেই পুরাতন বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাবে সেও… সত্যি বলতে- আমি তাকে ভিজতে দেখিনি পুঁড়তে দেখিনি আজও। অশরীরী ছায়ার মতোই মনে হয় আকাশের নীলে জেগে থাকে, ডাকে… ইশারায়…… শুনছো, তোমাকে বলছি… তুমি কে হে?? হাত নাড়ো; চোখে…
-
বৃষ্টি এবং লাল শাড়ি / সাইফ আলি
চোখের পালক শুকিয়ে যেতেই শুনি আকাশটা ফের কালচে মেঘে ছাওয়া বৃষ্টি হবে, দৃষ্টি হবে ঘোলা; বাড়বে তোমার নিত্য আসা যাওয়া… ধূসর ছাদে একটা রঙিন কামিজ ব্যালকোনিতে আরেকটা লাল শাড়ি কার্নিশে এক কাক বসেছে একা আরেকটা চিল দিচ্ছে আকাশ পাড়ি হঠাৎ করে বাতাস গেলো থেমে বৃষ্টি এলো নেমে, ফোটায় ফোটায় বৃষ্টি পড়ে; বৃষ্টি পড়ে ফোটায়- গাছের…
-
বাঁশরী আমার হারায়ে গিয়েছে / জসীমউদ্দিন
বাঁশরী আমার হারায়ে গিয়েছে বালুর চরে, কেমনে ফিরিব গোধন লইয়া গাঁয়ের ঘরে। কোমল তৃণের পরশ লাগিয়া, পায়ের নুপুর পড়িছে খসিয়া। চলিতে চরণ ওঠে না বাজিয়া তেমন করে। কোথায় খেলার সাথীরা আমার কোথায় ধেনু, সাঝেঁর হিয়ায় রাঙিয়া উঠিছে গোখুর-রেণু। ফোটা সরিষার পাঁপড়ির ভরে চরো মাঠখানি কাঁপে থরে থরে। সাঁঝের শিশির দুচরণ ধরে কাঁদিয়া ঝরে।
-
শতাব্দীর শেষ রশ্মি / আল মাহমুদ
অস্তমিত শতব্দীর শেষ রশ্মি তোমার চিবুকে ছায়া ও কায়ার মতো স্পর্শ দিয়ে নামে অন্ধকার; লাফায় নুনের ঢেউ। রক্তাম্বর জলধির বুকে আবার নামের ধ্বনি, কার নাম? সেও কি তোমার? ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নই। কিন্তু জেনো কবির নয়ন ভেদ করে গ্রহান্তর, পার হয় সমস্ত উদ্যম, কেন এত রক্ত তবে, কেন এত মৃত্যুর বয়ন তাঁত বুনে ব্যর্থতার? নক্সাি তোলে…
-
দৃশ্যপটে ছিলেন তিনি এক জনাব কুকুর / সাইফ আলি
দৃশ্যপটে ছিলেন তিনি এক জনাব কুকুর দুপুরের রোদে, ঠাই দাঁড়িয়ে- কোনো এক ইতোরের অপেক্ষায় জনাবের এভাবে বসে থাকা ঠিক নয় ভেবে বললাম- জনাব, কি ব্যপার বলুনতো… ভারি মেজাজি স্বরে তিনি জবাব দিলেন- তোর কি বেটা, ফোট… না, আমার কিছু না- নিরাস হয়ে ফিরে এলাম। জবাবটা আমার জানাই ছিলো; এরকম কতো দেখেছি প্রেসক্লাব পাড়ায়-দলীয় কার্যালয়ের সামনে-…
-
কার্তিক মাঠের চাঁদ (মাঠের গল্প) / জীবনানন্দ দাশ
জেগে ওঠে হৃদয়ে আবেগ ,- পাহাড়ের মতো ওই মেঘ সঙ্গে লয়ে আসে মাঝরাতে কিংবা শেষরাতের আকাশে যখন তোমারে !- মৃত সে পৃথিবী এক আজ রাতে ছেড়ে দিল যারে ! ছেঁড়া- ছেঁড়া শাদা মেঘ ভয় পেয়ে গেছে সব চ’লে তরাসে ছেলের মতো ,- আকাশে নক্ষত্র গেছে জ্ব’লে অনেক সময়,- তারপর তুমি এলে, মাঠের শিয়রে ,-চাঁদ ;-…
-
আলেম / সায়ীদ আবুবকর
আমি তাঁকে বললাম, আলেম বলতে কি এমন সব লোককে বুঝায় যারা লম্বা আলখেল্লা পরে, মাথায় পাগড়ি বেঁধে বুক ফুলিয়ে হাঁটে আর দুয়েকটা আরবি বলে দরাজ গলায়? -বাহির দেখে বিভ্রান্ত হয়ো না, বৎস, যেমন বিভ্রান্ত হয়েছিল মুসা তাঁর হাতের ছড়িটি নিয়ে। ছড়িটি যখন সাপ হয়ে গিয়েছিল তখন তো ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল তাঁর চোখ। আবার স্মরণ করো…
-
পঁচিশ বছর পরে (মাঠের গল্প) / জীবনানন্দ দাশ
শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে— বলিলাম—‘একদিন এমন সময় আবার আসিও তুমি—আসিবার ইচ্ছা যদি হয়— পঁচিশ বছর পরে।’ এই ব’লে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে; তারপর, কতোবার চাঁদ আর তারা মাঠে-মাঠে ম’রে গেল, ইঁদুর-পেঁচারা জ্যোৎস্নায় ধানখেত খুঁজে এলো গেল; চোখ বুজে কতোবার ডানে আর বাঁয়ে পড়িল ঘুমায়ে কতো-কেউ; রহিলাম জেগে আমি একা; নক্ষত্র যে-বেগে…
-
নদীর সাথে / সাইফ আলি
কোথায় তোমার জন্ম তুমি কোথায় গিয়ে উধাও হলে আমিও তোমার সঙ্গে না হয় সেই অজানায় গেলাম চলে আমায় তুমি চলতে শেখাও নিরবধি তোমার মতো ঢেউ টলমল আমার বুকেও থাকতো যদি… তোমার বুকে যখন মাঝি নৌকা ছোটায় বৈঠা ঠেলে তখন তাকে কি গান শোনাও উদোম বালক খেলতে এলে তাকেও বুঝি দুঃসাহসী প্রতিরোধের স্বপ্ন বোনাও। আমায় তুমি…
-
পেঁচা (মাঠের গল্প) / জীবনানন্দ দাশ
প্রথম ফসল গেছে ঘরে— হেমন্তের মাঠে-মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল; অঘ্রাণের নদীটির শ্বাসে হিম হ’য়ে আসে বাঁশপাতা—মরা ঘাস—আকাশের তারা; বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা; ধানখেতে—মাঠে জমিছে ধোঁয়াটে ধারালো কুয়াশা; ঘরে গেছে চাষা; ঝিমায়েছে এ-পৃথিবী— তবু পাই টের কার যেন দুটো চোখে নাই এ-ঘুমের কোনো সাধ। হলুদ পাতার ভিড়ে ব’সে, শিশিরে পালক ঘ’ষে-ঘ’ষে, পাখার ছায়ায় শাখা…
-
মেঠো চাঁদ (মাঠের গল্প) / জীবনানন্দ দাশ
মেঠো চাঁদ রয়েছে তাকায়ে আমার মুখের দিকে — ডাইনে আর বাঁয়ে পোড়া জমি — খড়-নাড়া — মাঠের ফাটল, শিশিরের জল! মেঠো চাঁদ — কাস্তের মতো বাঁকা, চোখে– চেয়ে আছে — এমনি সে তাকায়েছে কত রাত — নাই লেখাজোখা। মেঠো চাঁদ বলে: আকাশের তলে ক্ষেতে ক্ষেতে লাঙলের ধার মুছে গেছে, ফসল কাটার সময় আসিয়া গেছে —…
-
ধান ক্ষেত / জসীমউদ্দিন
পথের কেনারে পাতা দোলাইয়া করে সদা সঙ্কেত, সবুজে হদুদে সোহাগ ঢুলায়ে আমার ধানের ক্ষেত। ছড়ায় ছড়ায় জড়াজড়ি করি বাতাসে ঢলিয়া পড়ে, ঝাঁকে আর ঝাঁকে টিয়ে পাখিগুলে শুয়েছে মাঠের পরে। কৃষাণ কনের বিয়ে হবে, তার হলদি কোটার শাড়ী, হলুদে ছোপায় হেমন্ত রোজ কটি রোদ রেখা নাড়ি। কলমী লতার গহনা তাহার গড়ার প্রতীক্ষায়, ভিনদেশী বর আসা যাওয়া…
-
কাল সারারাত / সাইফ আলি
কাল সারারাত চাঁদের আলোতে গোসল- যেনো নির্ঘুম এক পাখি- কাল সারারাত তারার সঙ্গে আলাপ ছিলো জোনাকির মাখামাখি… কাল সারারাত, শুধু স্বপ্নের রাত ছিলো। ছিলো পাহাড়ের ব্যালকোনি আর বৃক্ষের কালো ছায়া, কঠিন নির্জনতায় ছিলো ঝর্ণার মৃদু মায়া… যেনো মেঘরাজ্যের দেশে প্রেমিকের পাশে প্রেমিকা দাঁড়ালো এসে কোনো কথা নেই বলার কোনো পথ নেই চলার; কাল সারারাত, শুধু…
-
বনসাই / সাইফ আলি
আগ্নেয়াস্ত্র নয় এক মুঠো শাদা ভাত চাই- চাই দুইবেলা পেট পুরে শুধু খেতে। পারমানবিক বোমা আমাদের দরকার নেই মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে বলছি। ‘চুলোয় যাদের আগুন জ্বলেনা কুলোয় তাদের স্বপ্নের চাল!!’ বলতেই পারেন। কিন্তু সৃষ্টিজগৎ বিচিত্র বটেই- বাঘের চোখে হরিণ স্বপ্ন, হরিণ চোখে স্বর্ণলতা। বস্তির কুঁড়েতে জন্ম নেয়া এক মানব সন্তান সেদিন নাকি মাঝরাত্রে হঠাৎ চিৎকার…
-
প্রিয়া ও মা / সায়ীদ আবুবকর
যদি প্রিয়া বলো, তার ঠোঁট মুখ্য হয়ে ওঠে, তার চোখ, চোখের ভুরু, চোখের চাহনি, অমাবশ্যা রাত্রির মতো একমাথা চুল আর বক্ষদেশে দাঁড়িয়ে থাকা পাকা ডালিম পর্বতমালা মুখ্য হয়ে ওঠে, মুখ্য হয়ে ওঠে রহস্যাবৃত তার সমস্ত শরীর; তখন হরিণকে নাগালে পাওয়া কোনো ক্ষুধার্ত বাঘের মতো জেগে ওঠে দেহ, জেগে উঠে ছুটতে থাকে, ছুটতে ছুটতে তৃপ্তির কিনারে…
-
একান্ত বাক্যেরা-০২ / সাইফ আলি
হঠাৎ এসেছো মেঘ, পাহাড় মেখেছে সারা গায়- ঝর্না ছুটেছে শুধু আঁকাবাঁকা পথ ধরে কিশোরির মতো খালি পায়… ঝিঝির নুপুর বাজা সারা রাত কেটে গেছে পূর্ণ চাঁদের আলো মেখে মরূচোখ ভিজে গেছে তোমাদের রূপ দেখে দেখে! যেভাবে পাহাড়ি নদী ছুটে যায় পাথরের বুক কেটে কেটে সেভাবে দু’চোখ যদি অবিরাম ছুটে চলে তোমাদের রূপ ঘেঁটে ঘেঁটে-…