-
দেশ / জসীমউদ্দিন
খেতের পরে খেত চলেছে, খেতের নাহি শেষ সবুজ হাওয়ায় দুলছে ও কার এলো মাথার কেশ। সেই কেশেতে গয়না পরায় প্রজাপতির ঝাঁক, চঞ্চুতে জল ছিটায় সেথা কালো কালো কাক। সাদা সাদা বক-কনেরা রচে সেথায় মালা, শরৎকালের শিশির সেথা জ্বালায মানিক আলা। তারি মায়ায় থোকা থোকা দোলে ধানের ছড়া, মার আঁচলের পরশ যেন সকল অভাব-হরা। সেই ফসলে…
-
বাঁশরী আমার হারায়ে গিয়েছে / জসীমউদ্দিন
বাঁশরী আমার হারায়ে গিয়েছে বালুর চরে, কেমনে ফিরিব গোধন লইয়া গাঁয়ের ঘরে। কোমল তৃণের পরশ লাগিয়া, পায়ের নুপুর পড়িছে খসিয়া। চলিতে চরণ ওঠে না বাজিয়া তেমন করে। কোথায় খেলার সাথীরা আমার কোথায় ধেনু, সাঝেঁর হিয়ায় রাঙিয়া উঠিছে গোখুর-রেণু। ফোটা সরিষার পাঁপড়ির ভরে চরো মাঠখানি কাঁপে থরে থরে। সাঁঝের শিশির দুচরণ ধরে কাঁদিয়া ঝরে।
-
পল্লী জননী / জসীমউদ্দিন
রাত থম থম স্তব্ধ, ঘোর-ঘোর-আন্ধার, নিশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার। রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা, করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা। শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে, তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে। ভন্ ভন্ ভন্ জমাট বেঁধেছে বুনো মশকের গান, এঁদো ডোবা…
-
প্রতিদান / জসীমউদ্দিন
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা, আমি বাঁধি তার ঘর, আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর। যে মোরে করিল পথের বিবাগী, – পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি। দীঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর ; আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর। আমার এ কুল ভাঙিয়াছে যেবা আমি তার…
-
নক্সী কাঁথার মাঠ / জসীমউদ্দিন
এক বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী, উইড়া যাওয়ার সাধ ছিল, পাঙ্খা দেয় নাই বিধি | — রাখালী গান এই এক গাঁও, ওই এক গাঁও — মধ্যে ধু ধু মাঠ, ধান কাউনের লিখন লিখি করছে নিতুই পাঠ | এ-গাঁও যেন ফাঁকা ফাঁকা, হেথায় হোথায় গাছ ; গেঁয়ো চাষীর ঘরগুলি সব দাঁড়ায় তারি পাছ |…
-
কবর / জসীমউদ্দিন
এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে। এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ, পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক। এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা, সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা! সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরি লাঙল লইয়া খেতে…