-
কার্তিক মাঠের চাঁদ (মাঠের গল্প) / জীবনানন্দ দাশ
জেগে ওঠে হৃদয়ে আবেগ ,- পাহাড়ের মতো ওই মেঘ সঙ্গে লয়ে আসে মাঝরাতে কিংবা শেষরাতের আকাশে যখন তোমারে !- মৃত সে পৃথিবী এক আজ রাতে ছেড়ে দিল যারে ! ছেঁড়া- ছেঁড়া শাদা মেঘ ভয় পেয়ে গেছে সব চ’লে তরাসে ছেলের মতো ,- আকাশে নক্ষত্র গেছে জ্ব’লে অনেক সময়,- তারপর তুমি এলে, মাঠের শিয়রে ,-চাঁদ ;-…
-
পঁচিশ বছর পরে (মাঠের গল্প) / জীবনানন্দ দাশ
শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে— বলিলাম—‘একদিন এমন সময় আবার আসিও তুমি—আসিবার ইচ্ছা যদি হয়— পঁচিশ বছর পরে।’ এই ব’লে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে; তারপর, কতোবার চাঁদ আর তারা মাঠে-মাঠে ম’রে গেল, ইঁদুর-পেঁচারা জ্যোৎস্নায় ধানখেত খুঁজে এলো গেল; চোখ বুজে কতোবার ডানে আর বাঁয়ে পড়িল ঘুমায়ে কতো-কেউ; রহিলাম জেগে আমি একা; নক্ষত্র যে-বেগে…
-
পেঁচা (মাঠের গল্প) / জীবনানন্দ দাশ
প্রথম ফসল গেছে ঘরে— হেমন্তের মাঠে-মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল; অঘ্রাণের নদীটির শ্বাসে হিম হ’য়ে আসে বাঁশপাতা—মরা ঘাস—আকাশের তারা; বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা; ধানখেতে—মাঠে জমিছে ধোঁয়াটে ধারালো কুয়াশা; ঘরে গেছে চাষা; ঝিমায়েছে এ-পৃথিবী— তবু পাই টের কার যেন দুটো চোখে নাই এ-ঘুমের কোনো সাধ। হলুদ পাতার ভিড়ে ব’সে, শিশিরে পালক ঘ’ষে-ঘ’ষে, পাখার ছায়ায় শাখা…
-
মেঠো চাঁদ (মাঠের গল্প) / জীবনানন্দ দাশ
মেঠো চাঁদ রয়েছে তাকায়ে আমার মুখের দিকে — ডাইনে আর বাঁয়ে পোড়া জমি — খড়-নাড়া — মাঠের ফাটল, শিশিরের জল! মেঠো চাঁদ — কাস্তের মতো বাঁকা, চোখে– চেয়ে আছে — এমনি সে তাকায়েছে কত রাত — নাই লেখাজোখা। মেঠো চাঁদ বলে: আকাশের তলে ক্ষেতে ক্ষেতে লাঙলের ধার মুছে গেছে, ফসল কাটার সময় আসিয়া গেছে —…
-
নীলিমা / জীবনানন্দ দাশ
রৌদ্র ঝিলমিল, ঊষার আকাশ, মধ্যনিশীথের নীল, অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারেবারে নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে! – উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুন্ডলী, উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি, আরক্ত কঙ্করগুলি মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা, – মরীচিকা-ঢাকা! অগণন যাত্রিকের প্রাণ খুঁজে মরে অনিবার , -পায় নাকো পথের সন্ধান; চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল,- হে নীলিমা নিষ্পলক,…
-
আমি কবি,- সেই কবি / জীবনানন্দ দাশ
আমি কবি,- সেই কবি,- আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি! আনমনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল- মেঘের পানে! মৌন নীলের ইশারায় কোন কামনা জাগিছে প্রাণে! বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন কাজরীর গানে! দাদুরী কাঁদানো শাঙন-দরিয়া হৃদয়ে উঠিছে দ্রবি! স্বপন-সুরার ঘোরে আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি দেওয়ানা করে! জনম ভরিয়া সে কোন হেঁয়ালি হ’ল…
-

একদিন যদি আমি
একদিন যদি আমি কোনো দূর বিদেশের সমুদ্রের জলে ফেনার মতন ভাসি শীত রাতে- আসি নাকো তোমাদের মাঝে ফিরে আর- লিচুর পাতার পরে বহুদিন সাঁঝে যেই পথে আসা-যাওয়া করিয়াছি- একদিন নক্ষত্রের তলে কয়েকটা নাটাফল তুলে নিয়ে আানারসী শাড়ির আঁচলে ফিঙার মতন তুমি লঘু চোখে চলে যাও জীবনের কাজে, এই শুধু…বেজীর পায়ের শব্দ পাতার উপরে যদি বাজে…
-

এখানে আকাশ নীল / জীবনানন্দ দাশ
এখানে আকাশ নীল- নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল ফুটে থাকে হিম শাদা- রং তার আশ্বিনের আলোর মতন; আকন্দফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ রৌদ্রের দুপুর ভরে- বারবার রোদ তার চিকণ সোনালী চুল কাঁঠাল জামের বুকে নিঙরায়- দহে বিলে চঞ্চল আঙুল বুলায়ে বুলায়ে ফেরে এইখানে জাম লিচু কাঁঠালের বন, ধনপতি, শ্রীমন্তের বেহুলার, লহনার ছুঁয়েছে চরণ; মেঠো…
-

এই পৃথিবীতে এক
এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে- সব চেয়ে সুন্দর করুণ: সেখানে সবুজ ডাঙা ভরে আছে মধুকূপী ঘাসে অবিরল; সেখানে গাছের নাম: কাঁঠাল, অশ্বত্থ, বট, জারুর, হিজল; সেখানে ভোরের মেঘে নাটার রঙের মতো জাগিছে অরুণ; সেখানে বারুণী থাকে গঙ্গাসাগরের বুকে- সেখানে বরুণ কর্ণফুলী ধলেশ্বরী পদ্মা জলাঙ্গীরে দেয় অবিরল জল; সেইখানে শঙ্খচিল পানের বনের মতো হাওয়ায় চঞ্চল, সেইখানে…
-
আমি যদি ঝরে যাই / জীবনানন্দ দাশ
আমি যদি ঝরে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়; যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে ক্ষেতে ম্লান চোখ বুজে, যখন চড়াই পাখি কাঁঠালিচাঁপার নীড়ে ঠোঁট আছে গুঁজে, যখন হলুদ পাতা মিশিতেছে উঠানের খয়েরি পাতায়, যখন পুকুরে হাঁস সোঁদা জলে শিশিরের গন্ধ শুধু পায়, শামুক-গুগলিগুলো পড়ে আছে শ্যাওলার মলিন সবুজে- তখন আমারেযদি পাও নাকো লালশাক-ছাওয়া মাঠে খুঁজে, ঠেস্…
-
আবার আসিব ফিরে / জীবনানন্দ দাশ
আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে- এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে কুয়াশার বকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠালছায়ায়; হয়তো বা হাঁস হবো- কিশোরীর- ঘুঙুর রহিবে লাল পায়, সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে; আবার আসিব আমি বাংলায় নদী মাঠ…
-
যেদিন সরিয়া যাব / জীবনানন্দ দাশ
যেদিন সরিয়া যাব তোমাদের কাছ থেকে- দূর কুয়াশায় চলে যাব, সেদিন মরণ এসে অন্ধকারে আমার শরীর ভিক্ষা করে লয়ে যাবে- সেদিন দুদন্ড এই বাংলার তীর- এই নীল বাংলার তীরে শুয়ে একা একা কি ভাবিব, হায়;- সেদিন রবে না কোনো ক্ষোভ মনে-এই সোঁদা ঘাসের ধুলায় জীবন যে কাটিয়াছে বাংলায়- চারি দিকে বাঙালির ভিড় বহু দিন কীর্তন…
-

একদিন জলসিড়ি
একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে রব- পশমের মতো লাল ফল ঝরিবে বিজন ঘাসে- বাঁকা চাঁদ জেগে রবে- নদীটির জল বাঙালি মেয়ের মতো বিশালাক্ষী মন্দিরের ধূসর কপাটে আঘাত করিয়া যাবে ভয়ে ভয়ে- তারপর যেই ভাঙা ঘাটে রূপসীরা আজ আর আসে নাকো, পাট শুধু পচে অবিরল, সেইখানে কলমির দামে বেঁধে প্রেতিনীর…
-

যতদিন বেঁচে আছি
যতদিন বেঁচে আছি আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে অপরাজিতার মতো নীল হয়ে- আরো নীল- আরো নীল হয়ে আমি যে দেখিতে চাই- সে আকাশ পাখনায় নিঙরায়ে লয়ে কোথায় ভোরের বক মাছরাঙা উড়ে যায় আশ্বিনের মাসে, আমি যে দেখিতে চাই- আমি যে বসিতে চাই বাংলার ঘাসে পৃথিবীর পথ ঘুরে বহুদিন অনেক বেদনা প্রাণে সয়ে ধানসিড়িটির সাথে বাংলার…
-

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড় পাতাটির নীচে বসে আছে ভোরের দোয়েল পাখি- চারি দিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ জাম- বট- কাঁঠালের-হিজলের- অশথের করে আছে চুপ; ফনীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে; মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে…
-
তোমরা যেখানে সাধ / জীবনানন্দ দাশ
তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও- আমি এই বাংলার পারে রয়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে; দেখিব খয়েরি ডানা শালিকের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে, ধবল রোমের নীচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে নেচে চলে- একবার- দুইবার- তারপর হঠাৎ তাহারে বনের হিজল গাছ ডাক দিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের পাশে; দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ- সাদা শাঁখা ধূসর…
-
সেই দিন এই মাঠ / জীবনানন্দ দাশ
সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি- এই নদী নক্ষত্রের তলে সেদিনও দেখিবে স্বপ্ন- সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে! আমি চলে যাব বলে চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে নরম গন্ধের ঢেউয়ে? লক্ষ্মীপেঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে? সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে! চরিদিকে শান্ত বাতি- ভিজে গন্ধ-…
-

স্বপ্নের হাতে
পৃথিবীর বাধা- এই দেহের ব্যাঘাতে হৃদয়ে বেদনা জমে- স্বপনের হাতে আমি তাই আমারে তুলিয়া দিতে চাই! যেই সব ছায়া এসে পড়ে দিনের- রাতের ঢেউয়ে- তাহাদের তরে জেগে আছে আমার জীবন; সব ছেড়ে আমাদের মন ধরা দিত যদি এই স্বপনের হাতে! পৃথিবীর রাত আর দিনের আঘাতে বেদনা পেত না তবে কেউ আর- থাকত না হৃদয়ের জরা-…
-

মৃত্যুর আগে
আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়, দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল কুয়াশার; কবেকার পাড়াগাঁর মেয়েদের মতো যেন হায় তারা সব; আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল জোনাকিতে ভরে গেছে; যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ- কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে; আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীতরাত্রিটিরে…
-

শকুন
মাঠ থেকে মাঠে মাঠে- সমস্ত দুপুর ভরে এশিয়ার আকাশে আকাশে শকুনেরা চরিতেছে; মানুষ দেখেছে হাট ঘাঁটি বস্তি- নিস্তব্ধ প্রন্তর শকুনের; যেখানে মাঠের দৃঢ় নীরবতা দাঁড়ায়েছে আকাশের পাশে আরেক আকাশ যেন- সেইখানে শকুনেরা একবার নামে পরস্পর কঠিন মেঘের থেকে- যেন দূর আলো ছেড়ে ধূম্র ক্লান্ত দিকহস্তিগণ পড়ে গেছে- পড়ে গেছে পৃথিবীতে এশিয়ার ক্ষেত মাঠ প্রান্তরের পর…