-

পাখিরা
ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে বসন্তের রাতে বিছানায় শুয়ে আছি; – এখন সে কত রাত! অই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর, স্কাইলাইট মাথার উপর, আকাশে পাখিরা কয় পরস্পর। তারপর চলে যায় কোথায় আকাশে? তাদের ডানার ঘ্রাণ চারি দিকে ভাসে। শরীরে এসেছে স্বাদ বসন্তের রাতে, চোখ আর চায় না ঘুমাতে; জানালার থেকে অই নক্ষত্রের আলো নেমে…
-

ক্যাম্পে
এখানে বনের কাছে ক্যাম্প্ আমি ফেলিয়াছি; সারারাত দখিনা বাতাসে আকাশের চাঁদের আলোয় এক ঘাইহরিণীর ডাক শুনি, কাহারে সে ডাকে! কোথাও হরিণ আজ হতেছে শিকার; বনের ভিতরে আজ শিকারীরা আসিয়াছে, আমিও তাদের ঘ্রাণ পাই যেন, এইখানে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বসন্তের রাতে। চারি পাশে বনের বিস্ময়, চৈত্রের বাতাস, জ্যোৎস্নায় শরীরের স্বাদ যেন! ঘাইমৃগী সারারাত ডাকে; কোথাও অনেক…
-

অবসরের গান
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে; শাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার-চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ, তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান, দেহের স্বাদের কথা কয়- বিকালের আলো এসে (হয়তো বা) নষ্ট করে দেবে তার সাধের সময়! চারি দিকে এখন সকাল- রোদের নরম রঙ শিশুর গালের মতো লাল! মাঠের…
-
বোধ / জীবনানন্দ দাশ
আলো-অন্ধকারে যাই- মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়,- কোন্ এক বোধ কাজ করে! স্বপ্ন নয়-শান্তি নয়-ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়! আমি তারে পারি না এড়াতে, সে আমার হাত রাখে হাতে; সব কাজ তুচ্ছ হয়, পন্ড মনে হয়, সব চিন্তা- প্রার্থনার সকল সময় শূন্য মনে হয়, শূন্য মনে হয়! সহজ লোকের মতো কে চলিতে…
-

কয়েকটি লাইন
কেউ যাহা জানে নাই-কোনো এক বাণী- আমি বহে আনি; একদিন শুনেছ যে সুর- ফুরায়েছে-পুরানো তা-কোনো এক নতুন-কিছুর আছে প্রয়োজন, তাই আমি আসিয়াছি, আমার মতন আর নাই কেউ! সৃষ্টির সিন্ধুর বুকে আমি ঢেউ আজিকার; মেষ মুহূর্তের আমি এক-সকলের পায়ের শব্দের সুর গেছে অন্ধকারে থেমে; তারপর আসিয়াছি নেমে আমি; আমার পায়ের শব্দ শোনো- নতুন এ, আর সব…
-
পঁচিশ বছর পরে / জীবনানন্দ দাশ
শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে- বলিলাম: ‘একদিন এমন সময় আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়!- পঁচিশ বছর পরে। এই বলে ফিরে আসিলাম ঘরে; তারপর, কতবার চাঁদ আর তারা, মাঠে মাঠে মরে গেল, ইঁদুর-পেঁচারা জ্যোৎস্নায় ধানক্ষেত খুঁজে এল-গেল।- চোখ বুজে কতবার ডানে আর বাঁয়ে পড়িল ঘুমায়ে কত-কেউ!- রহিলাম জেগে আমি একা- নক্ষত্র…
-

নির্জন স্বাক্ষর
তুমি তা জানো না কিছু, না জানিলে- আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে! যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে, পথের পাতার মতো তুমিও তখন আমার বুকের পরে শুয়ে রবে? অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন সেদিন তোমার! তোমার এ জীবনের ধার ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল? আমার বুকের পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল, তুমিও…
-
সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয় / জীবনানন্দ দাশ
চোখ দুটো ঘুমে ভরে ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে! ফুরায়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন-স্বপন কদিন রয়! এসেছে গোধূলি গোলাপীবরন-এ তবু গোধূলী নয়! সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়, আমাদের মুখ সারাটি রাত্রি মাটির বুকের পরে! কেটেছে যে নিশি ঢের- এত দিন তবু অন্ধকারের পাই নি তো কোনো টের! দিনের বেলায়…
-
চাঁদিনীতে / জীবনানন্দ দাশ
বেবিলোন্ কোথা হারায়ে গিয়েছে,- মিশর- অসুর কুয়াশাকালো; চাঁদ জেগে আছে আজও অপলক, মেঘের পালকে ঢালিছে আলো! সে যে জানে কত পাথারের কথা, কত ভাঙা হাট মাঠের স্মৃতি! কত যুগ কত যুগান্তরের সে ছিল জ্যোৎস্না , শুক্লা তিথি! হয়তো সেদিনও আমাদেরই মতো পিলুবারোঁয়ার বাঁশিটি নিয়া ঘাসের ফরাশে বসিত এমনি দূর পরদেশী প্রিয় ও প্রিয়া! হয়তো তাহারা…
-
ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল / জীবনানন্দ দাশ
ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল,- ডালিম ফুলের মতো ঠোঁট যার, রাঙা আপেলের মতো লাল যার গাল, চুল যার শাঙনের মেঘ, আর আঁখি গোধূলির মতো গোলাপী রঙিন, আমি দেখিয়াছি তারে ঘুমপথে, স্বপ্নে- কত দিন! মোর জানালার পাশে তারে দেখিয়াছি রাতের দুপুরে- তখন শকুনবধূ যেতেছিল শ্মশানের পানে উড়ে উড়ে! মেঘের বুরুজ ভেঙে অস্তচাঁদ দিয়েছিল উঁকি, সে কোন্…
-
নীলিমা / জীবনানন্দ দাশ
রৌদ্র ঝিলমিল, ঊষার আকাশ, মধ্য নিশীথের নীল, অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে বারে নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে! -উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুন্ডলি, উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি, আরক্ত কঙ্করগুলো মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা, মরীচিকা-ঢাকা! অগণন যাত্রিকের প্রাণ খুঁজে মরে অনিবার,-পায় নাকো পথের সন্ধান; চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল- হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিদিবিধানের…
-
আমি কবি- সেই কবি- / জীবনানন্দ দাশ
আমি কবি- সেই কবি- আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি! আনুমান আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল মেঘের-পানে! মৌন নীলের ইশারায় কোন্ কামনা জাগিছে প্রাণে! বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন্ কাজরির গানে! দাদুরী- কাঁদানো শাঙন- দরিয়া হৃদয়ে উঠিছে দ্রবি! স্বপন-সুরার ঘোরে আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি দিওয়ানা করে! জনম ভরিয়া সে কোন্ হেঁয়ালি হল…