ঘুরে ঘুরে খেলা করে / সায়ীদ আবুবকর

কেবলি কোকিল আর কেবলি কুসুম
যে-বনে; যে-মাঠে
কেবলি শস্যের মেলা;

যে-আকাশে কেবলি ষোড়শী চাঁদ আর তার নিজঝুম
রূপের ঔজ্জ্বল্য; যে-জলে সাঁতার কাটে
কেবলি চিতল মাছ; সেখানে আমার হৃদয়ের হোলি খেলা।

আমার হৃদয় জোছনার মতো ঘুরে ঘুরে খেলা করে
পৃথিবীর সব সুন্দরে সুন্দরে।

১১.৯.২০১৪ মিলন মোড়, সিরাজগঞ্জ

Advertisements

তোমার সুঘ্রাণ / সায়ীদ আবুবকর

হৃদয় ভরে আছে তোমার সুঘ্রাণে,
কী হবে বলো আর ফুল দিয়ে;
মিষ্টি মধুমতী বয়েছে দুই প্রাণে,
কী হবে হেঁটে আর কূল দিয়ে!

কী হবে চৈতালি চকোর পাখি দিয়ে
যখন বুকে তুমি জুড়েছো গান;
রেখেছো বুঁদ করে সজল আঁখি দিয়ে-
কী হবে করে আর অমিয় পান!

কিসের বসন্ত, কিসের মধুমাস
যখন আছো তুমি বুক জুড়ে;
মিথ্যে ফুল আর পাখির উল্লাস
যখন আছো সব সুখ জুড়ে!

২৭.২.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

বসন্ত / সায়ীদ আবুবকর

বাতাস ভিজে গেছে শিমুলসৌরভে,
পলাশ আনন্দে ভাসছে বন;
কৃষ্ণচূড়াগাছে আগুন লাগা দেখে
রাধার মতো নাচে পাখির মন।

পাখিরা গান গায়, নদীর ঢেউ নাচে,
ফুলেরা উল্লাসে ছড়ায় বাস;
নতুন পল্লবে ভরেছে ডালপালা-
পড়েছে তার প্রেমে বুনো বাতাস।

বাতাস ভিজে গেছে শিমুলসৌরভে,
জোছনা তার ’পরে ছড়ায় রঙ;
পড়েছে খসে সব জরা ও জীর্ণতা,
শুকনো পাতা আর পুরনো জং।

২৫.২.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

মৎস্যকন্যাদের কথা / সায়ীদ আবুবকর

জোছনা ডুবে গেছে সমুদ্রের নিচে,
কৃষ্ণ জলরাশি কাঁপছে থরথর-
মৎস্যকন্যারা ঘুমায় সী-বীচে;
আস্তে ফেলো পা, যাবে যে ভেঙে ঘুম।

জোছনা ডুবে গেলে সী-বীচে আসে তারা,
এলিয়ে দেয় দেহ মুক্ত হাওয়ায়;
যখনি উঁকি মারে আকাশে শুকতারা,
পালায় দল বেঁধে জলের হিমঘরে।

আস্তে ফেলো পা, একটু আওয়াজেই
আঁতকে ওঠে তারা, যেন বা ভীত মৃগ;
একটু জোরে বয় বীচের হাওয়া যেই,
পালিয়ে যায় তারা চোখের পলকে।

যায় না দেখা ভালো রাতের এই ভাগে,
আঁধার গাঢ় হয়ে ফেলেছে ঢেকে সব;
দেখতে পাও যদি তুমি আমার আগে,
দিও হে মোবাইলে একটা মিচকল।

জানতো তারা যদি আমরা কি-সভ্য,
কি-আধুনিক আর বিজ্ঞান-মনস্ক!
হবে না মোটে তারা ভোগের কু-দ্রব্য,
থাকবে রানী হয়ে হৃদয়-সাম্রাজ্যে।

বুঝি না কী আরাম সাগরে ডুব দিয়ে,
নষ্ট করে রূপ চোখের আড়ালে,
জগত জানলো না, কী হবে রূপ দিয়ে-
কবিরা লিখলো না সনেট ভালবেসে!

আমরা কি-ভদ্র, বিনয়ী ও প্রেমিক,
বুঝতো তারা, যদি আসতো কাছে, হায়!
পোষা প্রাণীর মতো আপোসে ধরা দিক,
ঘটবে কি-সহজে বংশবিস্তার।

বংশবিস্তারে আমরা বিশ্বাসী,
নইলে হয়ে যাবে জগতে বিলুপ্ত;
আস্তে পা ফ্যালো, ফেলো না নিঃশ্বাসই-
কী নড়ে ওইখানে- পালালো বুঝি ওই-

যায় না দেখা ভালো রাতের এই ভাগে,
হয়তো এসেছিল মৎস্যকন্যারা;
মানুষ দেখলেই পালায় আগে আগে
অথচ বুঝলো না প্রেমের কি-মর্ম!

২৪.২.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

সর্ষেফুলনামা / সায়ীদ আবুবকর

সর্ষে খেতগুলো হলদে শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে থরথর
সর্ষেফুল হয়ে পোহায় রোদ্দুর আমার অন্তর

আমার অন্তর পোহায় রোদ্দুর সর্ষেফুলে ফুলে
যে-ফুল ঝিরঝিরে বাতাস লেগে ওঠে পুলকে দুলে দুলে

মধুপ দল বেঁধে বেড়ায় উড়ে উড়ে, কুড়ায় অমৃত
তার পরশ পেয়ে তনু ও অন্তর মিষ্টি, সুবাসিত

অমরাবতী বুঝি এসেছে নেমে, ঘ্রাণে ভরেছে দশ দিক-
কে গায় গান বনে? তাবৎ পাখি আজ বসন্তের পিক

২১.২.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

কিসের আলো লেগে / সায়ীদ আবুবকর

কিসের আলো লেগে উঠলো জেগে কায়া, উঠলো জেগে মন।
জগত মনে হলো স্বপ্নশতদল, কুহককাঞ্চন।।

দুচোখে লেগে আছে শুধুই সুন্দর, শুধুই অনাবিল।
গদ্যকবিতারা ধরেছে বুকে ফের ছন্দ আর মিল।।

রাত্রি হলো শেষ, প্রভাত চারদিকে এবং শুভ্রতা।
ফুলেরা জেগে উঠে ছড়ায় সৌরভ, পাখিরা সুরকথা।।

যে-আলো চোখে মেখে ত্রিকাল দেখেছিল হোমার-সফোক্লিস।
সজিনাগাছে আজ সে-আলো পান করে দোয়েল দেয় শিশ।।

বাতাস নাচে ডালে, পাতায় বোদ্দুর, রৌদ্রে মহাকাল।
লেগেছে ঘোর চোখে, সবুজ দেখি সব যা ছিলো জঞ্জাল।।

শরীর ওড়ে, সাথে মনও উড়ে যায়, যেন বা বুনো হাঁস।
মিথ্যে নয় এই কাব্যগান আর প্রাণের উল্লাস।।

১৯.১.২০১৬ সিরাজগঞ্জ

জাগিয়া রাত যায় / সায়ীদ আবুবকর

জাগিয়া রাত যায় দেখিয়া চোখ ভরে রূপালি রাত্রিকে।
পরীর পাখনায় উড়িয়া যায় মন উদাস দিকে দিকে।।

বসুন্ধরা আজ ইডেন গার্ডেন, ভিজেছে জোছনায়।
সে-জোছনার ’পরে হরিণ খেলা করে চপল চার পায়।।

হাসনাহেনা আর গন্ধরাজে গেছে ভরিয়া সমীরণ।
সুবাস লাগে নাকে, পুলকে গাহে পিক, কাঁপিয়া ওঠে বন।।

নদীর জল নাচে, জলের ’পরে নাচে জোছনা আর চাঁদ।
দেখিয়া রাত যায়, মেটে না দুচোখের তবু দেখার সাধ।।

নিশুতি নিভৃতে জাগিয়া দুটি চোখ এবং অন্তর।
কেবলি ভালো লাগে রূপালি রাত আর মাটির কুঁড়েঘর।।

১০.১২.২০১৫ সিরাজগঞ্জ

ঘুমাতে ভয় লাগে / সায়ীদ আবুবকর

ঘুমাতে ভয় লাগে, কেবলি মনে হয় এ ঘুম ভাঙবে না পাখির ডাক শুনে
পাখির ডাক শুনে উঠবে জেগে ফুল, হালের বলদেরা, লক্ষ্মী চাষীবউ;
কেবল ভাঙবে না আমারই ঘুম বুঝি, যখন ফুলনদী ফুলেল ফাল্গুনে
ছুটবে যেন ঘোড়া ছলাৎ ছলছল এবং মৌমাছি বেড়াবে খুঁজে মউ।

যে-চোখ দেখলো না শিশিরভেজা ঘাস, রৌদ্রভেজা জল, সুবাসভেজা ফুল-
ব্যর্থ সেই চোখ! যে-কান শুনলো না ঘুঘুর মিহি সুর ও দোয়েলের শিশ-
ব্যর্থ সেই কান! ব্যর্থ সে-হৃদয়, গেলো না ডুবে যার কূল ও উপকূল
রূপের উচ্ছ্বাসে- বিফল সে-জীবন, কেমন পানসে ও কেমন নিরামিষ!

ঘুমাতে ভয় লাগে; আমি এ জনপদে থাকবো জেগে শুধু, যেভাবে জাগে চাঁদ;
যেভাবে জেগে থাকে নদীর বুকে ঢেউ, দিনের বুকে রোদ, মাটির বুকে ঘাস,
থাকবো জেগে আমি সেভাবে এদেশের সবুজ বুক জুড়ে; মেটে না দেখে সাধ
রূপসী এই দেশ, নাকফুলের মতো ধানের খেত আর নিখুঁত নীলাকাশ।

১৬.১১.২০১৫ সিরাজগঞ্জ

হে সুন্দর / সায়ীদ আবুবকর

কুসুম সুন্দর, জোছনা সুন্দর;
তুমি যে সুন্দর তার অধিক।
গোলাপ সুগন্ধী, বকুল সুগন্ধী;
তুমি যে সুগন্ধী তার অধিক।

থমকে যায় চোখ নদীর রূপ দেখে;
তোমাকে দেখে যায় থমকে মন।
কী আছে ধরাধামে তোমার চেয়ে বলো
এমন সুন্দর, খাঁটি এমন!

১০.১০.২০১৫ সিরাজগঞ্জ

পুষ্প ছুঁই হাতে / সায়ীদ আবুবকর

ইচ্ছে করে শুধু পুষ্প ছুঁই হাতে,
মধুতে যেন হাত না-ভেজে কোনোদিন;
কেবল পান করি সুবাস তৃষ্ণাতে,
শরাবে যেন গলা না-ভেজে কোনোদিন

ইচ্ছে করে শুধু তোমাকে ছুঁই মনে,
শরীর দিয়ে যেন না-ছুঁই একদিনও;
তোমাকে তুলে রাখি বুকের এক কোণে,
তেজস্ক্রিয় রোদে না-আনি একদিনও

৩.১০.২০১৫ সিরাজগঞ্জ