আমার জবানবন্দি-০৩

ওটি থেকে তাকে বের করা হয়েছিলো বেশ কিছুক্ষন আগে। নাকের অপারেশন। অবজারভেশন কক্ষে রাখা হয়েছে। নার্স বলেছে একটু পরেই দেখা করা যাবে।
অপারেশন সাকসেসফুল হলেও ধকলটা একটু বেশিই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। নাক থেকে ক্রমাগত রক্ত ক্ষরণ চলছিলো। এ নিয়ে সবাই খুব চিন্তিত। এতো কিছু মধ্যেও তার মনে একটা পরম আকাঙ্ক্ষা কাজ করছিলো। আর তা হলো একজন ভাইয়ের প্রতি একজন বড়বোনের আকাঙ্ক্ষা। সেই ভাইয়ের প্রতি যেই ভাইয়ের সামান্য জ্বর তার রাতের ঘুম কেড়ে নিতো। যার জীবনের প্রতিটা সাফল্য তার নিজের জীবনের সাফল্য বলে মনে হতো। যার বিভিন্ন সময়ে পাওয়া পদকগুলো সে তার ওড়নায় মুছে যত্ন করে শোকেজে সাজিয়ে রাখতো। যেই ভাইয়ের ছোটোবেলার নানা স্মৃতি সে তার ছেলেমেয়েদের কাছে গল্পচ্ছলে আওড়াতো। সেই ভাইয়ের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা ছিলো অন্তত একবারের জন্য হলেও সে তাকে দেখতে আসবে। কোনো অর্থ সাহায্য নয়, কারো কাছে সুপারিশের দরকার ছিলো না। শুধু মাত্র একবার পাশে বসে বলবে ‘বুবু কেমন আছিস!!’।
আকাঙ্ক্ষাটা খুব বেশি অবাস্তব তো ছিলো না। কিন্ত আফসোস, হয়তো ভাই তার বোনের মর্ম বুঝবে না কখনোই। বোনেরা তাদের কর্তব্যের ব্যপারে একটু বেশিই নিষ্ঠাবান হয়ে থাকে; আর ভাইয়েরা যেনো স্বার্থপরের প্রতিচ্ছবি।

Advertisements

আমার জবানবন্দি-০২

ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম শারীরীকভাবে দূর্বল। একদম ছোটবেলোয়, মাত্র দুই বছর বয়সে আমার ক্যন্সার ধরা পড়েছিল। যাই হোক সেদিকে কথা বাড়ালে বাড়তেই থাকবে, আসল কথাই আসি। যেহেতু আমি অসুস্থ ছিলাম, আমার পড়ালেখার ব্যপারটা ছিল ঐচ্ছিক। যার বাঁচা মরার ঠিক নেই তার উপর কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষই এ ব্যপারে চাপাচাপি করবে না এটাই স্বাভাবিক। আমার মনে আছে, একবার আমি বললাম- আব্বু আমি স্কুলে যাবো। আব্বু স্কুলের শিক্ষক হওয়াই নাম ডাকার খাতায় নাম তোলাটা ছিল সময়ের ব্যপার। আব্বু নাম তুলে দিলেন। কিন্তু আমার ইচ্ছে হলে আমি স্কুলে যাই না হলে যাই না। অংক করতে ভালো লাগতো বলে শুধুমাত্র অংক পরীক্ষা ছাড়া আর কোনো পরীক্ষায় দিইনি সেবার। আর পরীক্ষার খাতা জমা দেয়ার পরপরই অংক স্যার দেখে দিয়েছিলেন। ৭৫ এ পেয়েছিলাম ৭৪। অন্য কোনো সাবজেক্টে রুচি হয়নি পরীক্ষা দিতে। আমার স্কুলে পড়াটা রিয়েলিস্টিক করতে নাম ডাকা খাতায় সবার শেষে আমার নামটাও লেখা হয়েছিল। সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে একটা মৃত্যূ পথযাত্রী শিশুর জন্য ভালবাসার কমতি ছিল না করো কাছেই। আম্মার কাছে শুনেছি আমাকে যে ডাক্তার চিকিৎসা করতেন তিনি তার টেবিলে বসিয়ে আমার কবিতা শুনতেন আর চোখ মুছতেন। তার চেহারা আমার মনে নেই। তিনি আমাকে মনে রেখেছেন কিনা তাও বলতে পারবো না। তবে এই সব স্মৃতি আমাকে চিরদিনই অনুপ্রেরণা যোগায়। স্কুলে পড়েছিলাম ৩য় আর চতুর্থ শ্রেণী। কারণ ততদিনে ডাক্তারদের বেঁধে দেয়া সীমারেখা ছাড়িয়ে আমার বয়স আরো কয়েকধাপ এগিয়ে গেছে এবং পরীক্ষায় দেখা গেছে আমার ক্যন্সার নেই। তারপরও আরেকটা কঠিন রোগ আমার শরীরে বাসা বেধে আছে জন্ম থেকেই আর তা হচ্ছে থ্যালাসমিয়া। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার সাথে সাথে সেও থাকবে এ ব্যপারে চিকিৎসা বিজ্ঞান নিশ্চিত তবে তা গুরুতর বলে আমি মনে করি না। একসময় মনে হতো আমি হয়তো বেশিদিন বাঁচবো না এবং এ ব্যপারটা আমার মানষিকভাবে দূর্বল করে দিতো। কিন্তু যেদিন থেকে বিশ্বাস করতে শিখেছি যে, জন্ম মৃত্যু একমাত্র আল্লার হাতে সেদিন থেকে এ ব্যপারটা আর কখনোই আমাকে দূর্বল করতে পারেনি। এমন কি আমি অনেক ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়েও বেশি আশাবাদি, একটু বেশিই স্বপ্ন দেখি। দোষ কি তাতে? একমাত্র তাদের পক্ষেই হতাশ হওয়া সম্ভব যারা অবিশ্বাসী কারণ তাদের সবকিছুই দুনিয়া কেন্দ্রীক। তাদের পাওয়ার চিন্তা দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ আর এখানেই তারা যদি না পায় তাহলেতো সেটা হতাশারই ব্যপার বটে। মনে করেন আপনি অনেক চেষ্টা করে টিকিট কেটেছেন, কিন্তু টিকিট হাতে পেয়ে জানতে পারলেন যে অনুষ্ঠান ততক্ষণে শেষ তাহলে তো আপনি হতাশ হবেনই, মনে মনে কষ্টও পাবেন। কিন্তু আপনি যদি জানেন যে আপনার অনুষ্ঠানটার চাইতেও আরো বেশি আকর্ষনীয় অনুষ্ঠান ঐ টিকিটেই উপভোগ করা যাবে তখন কি আর আপনার কোনো দুঃখ থাকবে? অর্থাৎ যেদিন থেকে আমি ভাবতে শিখেছি যে এখানেই শেষ নয়, আমার জন্য অপেক্ষা করছে অনন্ত জীবন তখন এ ব্যপারে আর কোনো অভিযোগের প্রশ্নই ওঠে না। বরং পরীক্ষার সময় যতো তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততোই আমি খুশি।

প্রিয় পাঠক, আজকে লেখতে চেয়েছিলাম অন্য আরেকটা ব্যপারে কিন্তু কথার মোড় এদিকে ঘুরে যাবে ভাবতে পারি নি। ঘুরে যখন গেছেই ফেরাবো না। ওটা আগামী কোনো একসময় বলবো ইন-শা-আল্লাহ; যদি বেঁচে থাকি।

আমার জবানবন্দি-০১

শেষরাতে ঘুমাতে যাওয়াটা ইদানিং একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। কম্পিউটারের মনিটরে দুই চোখ ঝুলিয়ে রেখে মাঝরাত পার করা রুটিনের মধ্যে পড়ে গেছে। কতোদিন জানালায় নতুন সূর্যের আলো দেখে ঘুম ভাঙে না তা বলতে পারবো না। গতরাতের কথা বলি, ছবি এঁকে আর কবিতা লেখে রাত পার। এরপর নীলক্ষেত মোড়ে চায়ের আড্ডা শেষ করে এসে ঘুমোতে যাওয়া। নয়টা কি দশটার সময় হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভাঙার পর এক আজব ব্যাপার ঘটতে লাগলো। মনে হলো ভূমিকম্প হচ্ছে, ঠিক মতো তাকাতেও পারছি না, নিজের উপর কোনো নিয়ন্ত্রন নেই আমার। হলে থাকার সুবাদে একই রুমে থাকি চারজন। আমরা তিন বন্ধু আর একজন আমাদের সিনিয়র। অনেক চেষ্টা করলাম আমার সামনের বেডের বন্ধুকে ডাকতে। খুব জোরে ডাকলাম। কিন্তু কোনো উত্তর পেলাম না। বুঝলাম ডাকটা আমার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। আওয়াজ হয়নি কোনো। আবারো চেষ্টা করলাম কিন্তু লাভ হলো না। হাল ছেড়ে দিলাম। মনে পড়লো ভূমিকম্প হলে দেয়াল বা পিলার জাতীয় কিছু থাকলে সেটা ঘেঁসে দাড়াতে হয়। বিছানায় শুয়েই একটু একটু করে দেয়ালের দিকে সরে গেলাম অবশ্য সরতে পেরেছিলাম কিনা বলতে পারবো না। সামনে মনে হলো বন্ধুর কম্পিউটারের মনিটরটা অন হয়ে আছে। পরে বুঝেছি ওটা মনিটর ছিলো না জানালা ছিলো। বেশ কিছুক্ষণ অসহায় পড়ে থাকলাম এরপর যখন স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম তখন খুবই ভীত আমি।
কম্পিউটারটা অন করে ফেসবুকে ঢুকলাম। ফেসবুকের ভিডিওগুলো এখন অটো প্লে হওয়ার সুবাদে প্রথম যে ভিডিওটা আমার চোখে সামনে আসলো তাতে অতি পরিচিত একজনকে দেখলাম স্টেজে মাইক্রোফোনের সামনে কিছু বলতে। শোনার জন্য প্লে করলাম। স্টেজের লোকটা আর কেউ নন শিল্পী কাইয়ুম চোধুরী আর ভিডিওটা ছিল তার জীবনের শেষ বক্তব্য। কিছু বলবেন বলেও বলতে পারেননি, সামান্য সময়ও পাননি , একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারেন নি মৃত্যুর ডাককে উপেক্ষা করে।

খুব ভয় পেয়েছি আমি। খুব অসহায় ভেবেছি নিজেকে। ভাবতেও পারছি না এমন আরেকটা সকাল যদি আসে আবার। ঝাপসা-ঘোলা অনুভুতিগুলো। সামান্য একটা শব্দে নিজের অস্তিত্বের জানান দিতেও অক্ষম কোনো সকাল। অপরিচিত দৃষ্টির সীমারেখা।
সাময়িক বিদ্রোহী শরীরের মধ্যে আত্মার সেকি অসহায়ত্ব বোঝানো যাবে না কোনো ভাবেই। সবশেষে একটা কথা বলেই শেষ করবো- মানুষ এমন একটা জীব যে জন্মের সময় থাকে সবচে অসহায়, চলতে শিখলে ভাবে – “আমি কি হনুরে” আর চিপায় পড়লে মনে হয়- “কেউ আমারে বাঁচা…”। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন, আমীন।