জেগেছে অঙ্কুর

বাতাস চঞ্চল আকাশে মেঘদল
দু’ঠোঁটে বৃষ্টির ছাট,
ভেজানো দরজাটা কাঁপছে থরথর
বাজছে জানালার নাট।

জানিনা উড়বে কি পুরোনো ইতিহাস
হলুদ পাতাদের ভীড়ে,
তবুও রাতভর হেটে সে ফিরবেই
জীর্ণশীর্ণ এ নীড়ে।

এখানে মায়াজাল বুনেছে কতোরাত
কতো যে স্বচ্ছল ভোর,
হাজার নিশ্বাস করেছে বসবাস
কেটেছে স্বপ্নের ঘোর।

জানি সে বিশ্বাস ফেরাবে নিজেকেই
চেনাবে আপনার পথ,
বুকের অন্দরে জেগেছে অঙ্কুর
শিকড়ে তার হিম্মত।

অথচ এখন পাখিরা মেলেছে ডানা

এক সমুদ্র পিপাশার জল নিয়ে
একাকি হাটবে কোথায় এমন পথ
তুমি কি দেখোনি পিপাশিত আত্মারা
নিখুঁত দৃষ্টি মেলেছে সকল পথে।

তুখোঁড় বণিক ব্যবসা সেরেছো দিনে
রাতের আঁধারে নিজেকে লুকোতে চাও,
এ মিছে বাসনা সত্যি হবে না জেনো
রক্তে তোমার ভেসে যাবে রাজপথ।

মাকড়সা তুমি বিছিয়ে কোমল জাল
আখের গোছালে এখন পালাতে চাও,
অথচ এখন পাখিরা মেলেছে ডানা
তিক্ষ্ণ ঠোটের আঘাতে ছিড়বে জাল।

স্বাধীনতা থাকবে না

পাখিদের নাকি ডানাগুলি থাকবে না
চঞ্চু থাকবে কণ্ঠ থাকবে
পেখম থাকবে পালক থাকবে
শুধু নাকি তারা সুরে সুরে ডাকবে না;
পাখিরা থাকবে শুধু পাখিদের ডানাগুলি থাকবে না।

আগের মতই পূবের আকাশে সূর্যটা দেবে উঁকি
সন্ধ্যায় ঠিক পশ্চিমে যাবে ঝুঁকি;
আগের মতই বাতাসেরা বয়ে যাবে
শুধু নাকি যত মুগ্ধ সূর্যমুখী
সূর্যকে ছেড়ে রাত কাছে পেতে চাবে।
বাতাসে কোমল শীতলতা থাকবে না
পাখিরা থাকবে, পাখিদের নাকি ডানাগুলি থাকবে না।

বাগান থাকবে, বাগানের যত ফুল
সব নাকি ঝরে যাবে;
ভ্রমরেরা এসে বৃন্তে বৃন্তে অসহায় চোখে চাবে
বৃন্ত থাকবে, থাকবে না শুধু ফুল।

গাছেরা থাকবে উলঙ্গ হয়ে ফুল পাতা ঝরে যাবে,
সমুদ্র হবে তরঙ্গহীন নদীরা শুকিয়ে যাবে।
ফুল-পাখি-নদী সকলি থাকবে স্বাধীনতা থাকবে না
পাখিরা থাকবে, পাখিদের নাকি ডানাগুলি থাকবে না।

সূর্যমুখীর স্বকীয়তা থাকবে না
ভ্রমরের সুরে অমিয়তা থাকবে না
বাতাসে কোমল শীতলতা থাকবে না
মানুষের কোনো স্বাধীনতা থাকবে না
পাখিরা থাকবে, পাখিদের নাকি ডানাগুলি থাকবে না।

আমি এক কবি হয়ে / সাইফ আলি

এক ঝাঁক শকুনেরা মানবতা গেয়ে যায় ভাগাড়ে ভাগাড়ে,
যেখানে মরা গরুর মতো করে পড়ে আছে অসংখ্য লাশ;
আমি এক কবি হয়ে খুঁজে ফিরি চাঁদ-তারা-সুনীল আকাশ,
এক ঝাঁক সুখ পাখি আর বুনো ফুল খুঁজি পাহাড়ে পাহাড়ে।

এক ঝাঁক দানবেরা বোমা মেরে উড়ে যায় পৃথিবীর বুকে,
আর্তের চিৎকারে মৃত্যুর দূত যেন হিম-শিম খায়;
লাশের পাহাড় দেখে ধীরে ধীরে কোলাহল থেমে থেমে যায়,
আমি এক কবি হয়ে অনাবিল হাসি খুঁজি লাশেদের মুখে।

আবাদি জমিনগুলো আবারো আবাদ হবে মানুষের খুনে,
লাল পদ্মের মতো অসংখ্য ছোপ ছোপ রক্তের দাগ;
নির্দয় ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিয়ে যাবে শকুনের ভাগ,
আর আমি এক কবি যার দিন কেটে যাবে মায়াজাল বুনে।

আমি আজ বন্দী কারাগারে

এতোদিন      কোথায় ছিলে হাওয়া
বন্ধ             তোমার আসা যাওয়া
আমিতো      ভেবেই হয়রান
কতোদিন      হয়নি শোনা গান।

এতোদিন      কোথায় ছিলে নদী
তুমিতো        বইতে নিরবধি
তবে কে        থমকে দিলো চলা
কতোদিন      হয়নি কথা বলা।

এতোদিন      কোথায় ছিলে চাঁদ
রাত্রি            শুধুই অবসাদ
মেঘলা         সারা আকাশ ভর
খুঁজেছি         তোমায় নিরন্তর।

এতোদিন      কোথায় ছিলে তারা
উদাসী         পথিক দিশেহারা
আকাশে        জ্বলতে মিটিমিটি
হকারে          দেয়নি তোমার চিঠি?

এতোদিন       কোথায় ছিলে পাখি
বাগানে         তোমার ডাকাডাকি
না শুনে         ক্যামনে উঠি জেগে
মধু সুর         ছন্দে দোলা লেগে।

এতোদিন       কোথায় ছিলে আলো
শুধু যে          সঙ্গী আঁধার কালো
এখানে           চার দেয়ালের মাঝে
খুঁজেছি           তোমায় সকাল সাঝে।

আমি আজ      বন্দী কারাগারে
তোমাদের       খুঁজছি বারে বারে…

মিছিল থামেনি তবু

শপথের পথে-
নিঃসঙ্গ ঝড়ের রাত পার করে এসে
ঘুমকাতর আমার দুটি চোখ…
শক্তি দাও ভক্তি দাও প্রভূ ভালোবেসে
যেন আবার চলতে পারি
বলতে পারি শপথের সুরে-
আমার গন্তব্য আজ পৃথিবীর পথ ছেড়ে
আরো বহু দূরে…

বাদামের মৌসুম আমার
শেষ হয়ে গেছে,
নিভে গেছে রাতের জোনাক;
জোছনার মায়া আলো
আজ শুধু শপথের পথে জ্বালো
অসংখ্য মশাল…

লাশের বদলে লাশ
রক্তের বদলে রক্ত
যুদ্ধের বদলে যুদ্ধ…
জীবনের দ্বারে দ্বারে আজ বাস্তবতার জটিল রূপ
বিভ্রান্তির ধূপ তবুও জ্বলছে
আচ্ছন্ন করছে মন-
অকারণ
ঝরে গেল লাশ…
মিছিল থামেনি তবু; চলছেই
জীবনের পথে.. শপথের পথে…
শক্তি দাও ভক্তি দাও প্রভূ
বুদ্ধি দাও শুদ্ধি দাও আজ
ভ্রান্তির ধোঁয়াশা মুক্ত (যেন গড়তে পারি)
সভ্য এক মানব সমাজ।

নগরীর পথ থেকে পথে / সাইফ আলি

নগরীর পথে পথে এখনো সে চাঁদ
ঝলসানো রুটি হয়ে আছে
জীবন্ত ফসিলেরা ইতিহাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়-
অথচ পথের পাশে রাতের হোটেল
গোশতের ঘ্রাণ ভেসে আসে;
নেড়াদের ভুরিভোজে বিদেশী খাবার শোভা পায়।

হাওয়ার বদল হলো বদলালো ঘড়ির ব্যাটারি
চাঁদ তবু ঝলসানো রুটি
শোষকের বুট-জুতো খুঁজে পেলো
শোষিতের টুটি…

গাছের পাতায়-
ধুলো জমে জমে কতবার
বর্ষার বৃষ্টিতে ধুঁয়ে গেছে পৃথিবীর বুকে-
আচলের গিট খুলে ফেরারী হয়েছে কত নোট
তবু হায়…
ঝলসানো রুটি এই ভরা জোছনায়
দেখে দেখে কতগুলো জীবন্ত ফসিলের মুখে
লালা ঝরে পড়ে।

অথচ পথের পাশে রাতের হোটেল
গোশতের ঘ্রাণ ভেসে আসে;
মুক্ত বাতাসে-
নগরীর পথ থেকে পথে…

রোদেলা আকাশ আমার / সাইফ আলি

পিস্তল ঠেকালেই ভেবেছিলে হাত দুটো উঁচু হয়ে যাবে,
বিবেকের বেড়াজাল ভেঙে নিভু নিভু জোনাক পালাবে।

মায়া তুমি কোন দেশে বাস করো বলো
সেখানে কি থাকে না মানুষ;
তারাহীন অন্ধকারে সেখানে কি সারি সারি রঙিন ফানুস!

হাত দুটো কেটে দিয়ে যদি ভেবে থাকো মুন্ডুহীন লাশ
শুনে নাও ঝলমলে রোদে সাজবেই আমার আকাশ…

পিস্তল ঠেকালেই যদি থেমে যায় প্রাণের রিদম;
নিষ্প্রাণ শীতল ছোঁয়ায়
জেগে যাবে তোমার পশম।

একদা সে লাশে রোদ চমকায়

কত অভিমানী রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উড়াল
ঘাতক ছোরায় ওষ্ঠো ঠেকিয়ে চোখ ছল ছল
অভাগা বাতাস শরীর না ছুঁয়ে উড়িয়ে শরীর
নীল সাগরের মাঝখানে ফ্যালে বেদনা অতল।

মধ্য দুপুর-একা রাজপথ-কালো কালো পিচ
গন-গন করে নিজেকে পুড়ায়,
শফেদ বরফ চিক চিক করে রোদ চমকায়
পাহাড় চুড়ায়।

অভাগা বাতাস পুড়ে ধোয়া হয় মরিচিকা হয়
শ্রান্ত পথিক আশা-হতাশায় ভেঙে চুড়ে যায়
ঘাতক ছোরায় আঙ্গুল রেখে গোধুলি আঁকায়
লেহ্য গোধুলি
বন্য পশুর সুপেয় গোধুলি…

কত অভিমানী ফেরারী জীবন
ধূপছায়া আঁকে রাত অবসান-সূর্যদয়ের অমর মন্ত্রে…

কত অভিমানী রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উড়াল
তিক্ত ব্যাথার কত ইতিহাস চাপা পড়ে যায়
রাতের আধারে জোনাকির নাচে জোসনা মায়ায়।
অভাগা বাতাস শরীর না ছুঁয়ে উড়িয়ে শরীর
নীল সাগরের মাঝখানে ফ্যালে
একদা সে লাশে রোদ চমকায়।

শিখা অনির্বান

এখানে রাতের কোলে ঝরে পড়ে ঘুম
আড়ষ্ট চোখদুটো স্বপ্নের প্রতিক্ষায়
ঢুকে পড়ে ঘুমের গভীরে…

ভীত চোখে পাখি থাকে চেয়ে
হিরক শিশিরগুলো নেমে আসে
রাত্রির চুল বেয়ে বেয়ে
ওখানে জ্বলতে থাকে
একা এক আগুনের শিখা
শিখা অনির্বান…

মাঝে মাঝে মনে হয় কোনো এক শীতে
কুয়াশার মেঘ এসে
ধীরে ধীরে ছেয়ে গেলো এই নগরিতে
এরপর শুধু
কুয়াশাচ্ছন্ন চোখে বাংলার ষোল কোটি মানুষ
বিষণœ মুরিদের মতো
চেয়ে থাকে রোদের আশায়
দূর উদ্যান মাঝে
একা একা জ্বলে যায় শিখা অনির্বান।

প্রজ্জ্বলিত শিখার চারিধার ঘিরে থাকে ঘুমন্ত চোখ
রাত্রি নিঝুম হয়
শিখা অনির্বান
হারায় আপন পরিচয়
চোখের সামনে শুধু
অপচয় অপচয়…………