যে আঁধার লুকিয়ে বেড়ায় / সাইফ আলি

যে আঁধার লুকিয়ে বেড়ায় দিনের আলোয়
তার কপালে রাত এনে দেয় বিষণ্নতা
যে জলের অন্তরালে রুক্ষতারা ভেজায় শরীর
সে কবে বুঝতে পারে নিজের মায়া।

আয়না কবে মুখ দেখেছে নিজের বুকে
বাতাস কবে নিজের সুখে মেললো ডানা
দিগন্তে যে চিল উড়েছে তার চোখে কি
মূল্য রাখে কাটাতারের ছেদ সীমানা?

আগুন পোড়ে আগুন পোড়ায় আগুন বাঁচে
ঠান্ডা জলে ভিজতে কি তার সুখের মরণ;
নিজকে তুমি পর ভেবেছো নিজের মতো,
ঝর্ণা কি আর পাহাড়পুরের রক্তক্ষরণ?

এ আঁধাার বড় কঠিন আঁধার / সাইফ আলি

দুফোটা রক্তে তৃষ্ণা মেটেনি যার
তার হাতে দাও পূর্ণ পেয়ালা
আরও তৃষ্ণা ডাকবে বান
ব্লাকহোল তার হৃদয় কখনো ভরবে না প্রিয়তম
এ আঁধাার বড় কঠিন আঁধার মৃত্যুর প্রতিসম…

একটু বাতাস এবং একটু বাতাস চাই / সাইফ আলি

একটু বাতাস এবং একটু বাতাস চাই
একটু আকাশ এবং একটু আকাশ
একটুখানি মাটির পরশ চাই আমার
একটুখানি আগুন এবং পানির ছল।

পথিক শুনছো? / সাইফ আলি

তুমি কি ফিরেছো? নাকি তুমি আর
ফিরবেনা বলে গুটিয়েছো মেঘ;
পথিক দাঁড়াও; এভাবে পথের সীমানা টেনোনা-
শুনছো?
তুমিকি এখনো ফেলে আসা ছাপ
যাপিত দ্বিধায় গুনছো?

মেঘেরা কখনো পতিত বৃষ্টি মাপেনা
যে পথিকচোখ খুঁজেছে আকাশ
সামান্য ঝড়ে কাপেনা।

তুমি কি ভাবছো?
এভাবে রাততে নিরাশ করোনা;
হতাশ করোনা চাঁদকে-
দু’হাতে ঠেলোনা স্বপ্ন এবং জোছনার অনূবাদকে।

আকাশ তোকে বললো কিছু / সাইফ আলি

সেলাই করা বুকের কাপড় ফেড়ে
বনের পাখি মেললি ভিষণ ডানা
ওড়ার সুখে আনন্দে আটখানা!
আকাশ তোকে বললো কিছু নীলচে আচল নেড়ে?
নাকি কেবল শুধু-
মিথ্যে মেঘের চতুর আনাগোনায়
ভুললি কোমল বুকের এ আর্দ্রতা?

প্রেরণা / সাইফ আলি

এমন কি কবিতার ছবক
আচলের গিট খুলে দিয়েছিলে পায়রার ঝাকে
একসাথে ডানা মেলে উড়ে গেলো
কিছুতেই ফেরানো গেলোনা-

অন্ধকারে মিশে যাও / সাইফ আলি

অন্ধকারে মিশে যাও বন্ধু
তোমার কোনো ছায়া নেই
তোমাকে অনুসরণ করে আর কখনোই ছুঁতে পারবে না কেউ;
তোমাকে পেছন থেকে ডেকে বলতে পারবে না-
মাত্র দু’টো মিনিট…
অন্ধকারে মিশে যাও বন্ধু,
অন্ধকারে মিশে যাও…

তুমি হয়তো জানতেই পারবে না, তোমাকে উৎসর্গ করে কতোগুলো চায়ের কাপ টি এস সির মোড়ে ছুঁয়ে দেবে কম্পিত ঠোঁট,
কতোগুলো দৃষ্টি নিছক ভুলবসত ঘুরে আসবে অপরিচিত মুখের উপর থেকে; আর
কতগুলো গাঢ় দীর্ঘশ্বাস মিশে যাবে নিরবে বাতাসে…

মেধাবী ছেলে তুমি,
কতবার বললাম ওসব ছাড়ো; পড়ালেখা শেষ করে একটা ভালো চাকরি, আর কি চাও!?
তোমার উত্তর আমাকে স্বার্থপর বানিয়ে ছাড়তো, তুমি বলতে-
‘কলিম চাচার শেষ সম্বলটাও হারিয়ে গেলো,
সবাই দেখলো চেয়ে চেয়ে; একটা প্রতিবাদ অন্তত…
শকুনের মতো দৃষ্টি জানিস; কিছু একটা করতে হবে…
কিছু একটা করতে হবে…’
আমি তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতাম,
তোমার চোখের দিকে, নীল; অফুরন্তু নীলের মধ্যে সমুদ্রের ফেনার মত
চিক চিক করছে এক রাশ দ্রোহ; তারপর-
তারপর তোমাকে দেখলাম মিছিলে, ভয় হতো যদি…
এখন আর ওগুলো ভাবি না বন্ধু,
এখন তো আমিও মিছিলে যেতে পারি;
বুলেটের সামনে বুক চেতিয়ে বলতে পারি-
অন্ধকারে যাবো; এটা তো নতুন কিছু নয়!
সে আমার একান্ত ঘর ! বন্ধুর ঘর!!

তবুও নিছক সখে / সাইফ আলি

তোমারও চোখের দিকে
তাকিয়ে বলবে এ রাত
কি ভারে আলোর জোনাক
নিভে যায় অন্ধকারে-
বলবে, সকল তারা
দেয়না এক ইশারা;
তাতে কিছু ভিন্ন রকম
জ্যামিতিক গল্প থাকে।

কবিতার চাষ করে যে
সে বোঝে রূপক তোমায়
তবুও নিছক সখে
হেরে যায় তোমার কাছে-

বুঝে নাও এক জীবনের
সাবলিল সকল ভাষা,
বুঝে নাও প্রেম ও সুখে
সৌখিন পান্তা ইলিশ;
তবুও দেখবে কিছু
পাখিরা ঝাপটে ডানা
ভাঙবে মধ্যরাতের
রচিত নিষেধ-মানা।

হয়তো বলবে তুমি
ভুলেছি বাস্তবতা,
মজেছি নষ্ট প্রেমে;
কবিতার আদিখ্যেতা-
সে আমার দুঃখ এবং
অনাবিল সুখের খাতা।

অন্ধকারের সান্নিধ্য / সাইফ আলি

বাড়ন্ত কষ্টের ছায়াটাকে মুছে ফেলো; নেভাও প্রদীপ-
কে তুমি প্রদীপ জ্বেলে দেখে নিলে সবটুকু ব্যথা?
পানপাত্রে অধরের নিংড়ানো বীষ
নীল,
সমুদ্র অথৈই;
আকাশের চিরচেনা নীল নয়
লাশের মিছিল
আর শূন্য বাড়িটার পড়ে থাকা দরজার খিল।
সবকিছু বুঝে নিলে, নাও;
তবু প্রদীপ নেভাও।
মাঝে মাঝে অন্ধকার বন্ধু হয় ভালো
শুষে নেয় দুঃখ
আর কষ্টের সমস্ত দাগ;
অন্ধকারে ভয় তবু!?
কেনো?
বাড়ন্ত কষ্টের ছায়াটাকে আর বেশি বাড়তে দিও না,
নেভাও প্রদীপ।
ধারালো বটিতে রেখে ছিড়ে ফেলা
ইলিশের কানকোর শোক আর
বেওয়ারিশ লাশের গন্ধ
মিলেমিশে একাকার রাতের বাতাস
অন্ধকারে মোছা যায়,
মোছা যায় কান্নার সমস্ত দাগ।
আজ প্রদীপ জ্বেলোনা, শোনো মায়া;
অন্ধকার মুছে দিক বাড়ন্ত কষ্টের ছায়া।

সমস্ত সেজদার কসম / সাইফ আলি

আমাদের যতোকথা ধুলোপিঠে পরিত্যক্ত জমে আছে;
জমে আছে রাতের ঘোলাটে অন্ধকারে
রাজপথ ছুঁয়ে, মুখ গুঁজে রক্তের পুরোনো দাগে;
আমাদের যতোকথা আজো ফেলে গরম নিশ্বাস
কামারের হাপড়ের মতো; একদিন জ্বলে উঠে বলবেই-
এ আমার মৃত্যু নয়; পরাজয় নয়; ক্ষয় নয়; জয়।

তোমরা উল্লাস করো, সুখী হও; পান করো রক্তিম শরাব!
নাচো-গাও-ঢেকুর ওঠাও যত খুশি আজ;
তোমাদের সময় এখন।
তোমরা যা জীবনের সবকিছু ভাবো, সেই স্বার্থ
বুঝে নাও, ভরে নাও ঝুলি; তোমাদের উদরের তাপে
যত খুশি ঢালতে থাকো ঘিঁ; মিটবেনা ক্ষুধা।
ক্ষুধার্ত জিভের জল খসাও যতোটা পারো
তোমাদের সময় এখন; তোমাদের রাজ।

আমাদের অক্টোবর কিংবা মে’র শোক
জিয়োল মাছের মতো তড়পায় আজো,
ফিরে ফিরে আসে; আমরা স্মরণ করি
নিষিদ্ধ রাতের অবিরাম বুলেট কথন;
ঝুলে পড়া কপালের সমস্ত সেজদার কসম
ঘুমাতে দেয়না আজো, বার বার ডেকে তোলে-
আজান শুনছো? বাইরে আলোর রেখা; ওঠো…
বের হও, কতো আর ঘুমাবে বলোতো!?