রণভেরি / কাজী নজরুল ইসলাম

[গ্রিসের বিরুদ্ধে আঙ্গোরা-তুর্ক-গভর্নমেন্ট যে যুদ্ধ চালাইতেছিলেন, সেই যুদ্ধে কামাল পাশার সাহায্যের জন্য ভারতবর্ষ হইতে দশ হাজার স্বেচ্ছাসৈনিক প্রেরণের প্রস্তাব শুনিয়া লিখিত।]

ওরে আয়!
ওই মহাসিন্ধুর পার হতে ঘন রণভেরি শোনা যায় –
ওরে আয়!
ওই ইসলাম ডুবে যায়!
যত শয়তান
সারা ময়দান
জুড়ি খুন তার পিয়ে হুংকার দিয়ে জয়গান শোনা যায়!
আজ শখ করে জুতি টক্করে
তোড়ে শহিদের খুলি দুশমন পায় পায় –
ওরে আয়!
তোর জান যায় যাক পৌরুষ তোর মান যেন নাহি যায়!
ধরে ঝঞ্ঝার ঝুঁটি দাপটিয়া শুধু মুসলিম পঞ্জায়!
তোর মন যায় প্রাণ যায় –
তবে বাজাও বিষাণ ওড়াও নিশান! বৃথা ভীরু সমঝায়!
রণ দুর্মদ রণ চায়।
ওরে আয়!
ওই মহাসিন্ধুর পার হতে ঘন রণভেরি শোনা যায়!
তোর ভাই ম্লান চোখে চায়,
মরি লজ্জায়,
ওরে সব যায়,
তবু কবজায় তোর শমশের নাহি কাঁপে আপশোশে হায়?
রণ দুন্দুভি শুনি খুন-খুবি
নাহি নাচে কি রে তোর মরদের ওরে দিলিরের গোর্দায়?
ওরে আয়!
মোরা দিলাবার খাঁড়া তলোয়ার হাতে আমাদেরই শোভা পায়!
তারা খিঞ্জির, যারা জিঞ্জির -গলে ভূমি চুমি মুরছায়।
আরে দূর দূর! যত কুক্কুর
আসি শের-বব্বরে লাথি মারে ছি ছি ছাতি চড়ে! হাতি
ঘাল হবে ফেরু -ঘায়?
ওরে আয়!
বোলে দ্রিম দ্রিম তানা দ্রিম দ্রিম ঘন রণ-কাড়া-নাকাড়ায়!
ওই শের-নর হাঁকড়ায়
ওরে আয়!
ছাড় মন-দুখ
ওই বন্দুক তোপ, সন্দুক তোর পড়ে থাক, স্পন্দুক বুক ঘায়!
নাচ তাতা থই থই তাতা থই –
থই তাণ্ডব, আজ পাণ্ডব সম খাণ্ডব-দাহ চাই।
ওরে আয়।
কর কোরবান আজ তোর জান দিল আল্লার নামে ভাই!
ওই দীন দীন-রব আহব বিপুল বসুমতী ব্যোম ছায়!
শেল গর্জন
করি তর্জন
হাঁকে-, ‘বর্জন নয় অর্জন’ আজ শির তোর চায় মা-য়!
সব গৌরব যায় যায়;
ওরে আয়!
বোলে দ্রিম দ্রিম তানা দ্রিম দ্রিম ঘন রণ-কাড়া-নাকাড়ায়!
ওরে আয়!
ওই কড় কড় বাজে রণ-বাজা, সাজ সাজ রণ-সজ্জায়!

ওরে আয়!
মুখ ঢাকিবি কি লজ্জায়?
হুর হুররে!
কত দূর রে
সেই পুর রে
যথা খুন-খোশরোজ খেলে হররোজ দুশমন খুনে ভাই!

সেই বীর-দেশে চল বীর বেশে,
আজ মুক্ত দেশেরে মুক্তি দিতে রে বন্দিরা ওই যায়!
ওরে আয়!
বল্ ‘জয় সত্যম্ পুরুষোত্তম’, ভীরু যারা মার খায়!
নারী আমাদেরই শুনি রণ-ভেরি হাসে খলখল, হাত-তালি দিয়ে রণে ধায়!
মোরা রণ চাই রণ চাই,
তবে বাজহ দামামা, বাঁধহ আমামা, হাথিয়ার পাঞ্জায়,
মোরা সত্য-ন্যায়ের সৈনিক, খুন-গৈরিক বাস গায়।
ওরে আয়!
ওই কড় কড় বাজে রণ-বাজা, সাজ সাজ রণ-সজ্জায়!
ওরে আয়!
অব- রুদ্ধের দ্বারে যুদ্ধের হাঁক নকিব ফুকারি যায়!
তোপ দ্রুম দ্রুম গান গায়!
ওরে আয়!
ওই ঝনন রনন খঞ্জর-ঘাত পঞ্জরে মুরছায়!
হাঁকো হাইদর
নাই নাই ডর,
ওই ভাই তোর ঘুর-চরখির সম খুন খেয়ে ঘুর খায়।
ঝুটা দৈত্যেরে
নাশি, সত্যেরে
দিবি জয়-টীকা তোরা, ভয় নাই ওরে ভয় নাই হত্যায়!
ওরে আয়!
মোরা খুন-জোশি বীর, কঞ্জুসি লেখা আমাদের খুনে নাই।
দিয়ে সত্য ও ন্যায়ের বাদশাহি, মোরা জালিমের খুন খাই।
মোরা দুর্মদ, ভরপুর মদ
খাই ইশ্‌কের, ঘাত শমশের ফের নিই বুক নাঙ্গায়!
লাল পলটন মোরা সাচ্চা
মোরা সৈনিক, মোরা শহিদান বীর বাচ্চা!
মরি জালিমের দাঙ্গায়!
মোরা অসি বুকে বরি হাসি মুখে মরি, ‘জয় স্বাধীনতা’ গাই।
ওরে আয়!
ওই মহাসিন্ধুর পার হতে ঘন রণভেরি শোনা যায়!!

Advertisements

কামাল পাশা / কাজী নজরুল ইসলাম

[তখন শরৎ-সন্ধ্যা। আশমানের আঙিনা তখন কারবালা ময়দানের মতো খুনখারাবির রঙে রঙিন। সেদিনকার মহা-আহবে গ্রিক-সৈন্য সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হইয়া গিয়াছে। তাহাদের অধিকাংশ সৈন্যই রণস্থলে হত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। বাকি সব প্রাণপণে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিতেছে। তুরস্কের জাতীয় সৈন্যদলের কাণ্ডারী বিশ্বত্রাস মহাবাহু কামাল পাশা মহাহর্ষে রণস্থল হইতে তাম্বুতে ফিরিতেছেন। বিজয়োন্মত্ত সৈন্যদল মহাকল্লোলে অম্বর ধরণি কাঁপাইয়া তুলিতেছে। তাহাদের প্রত্যেকের বুকে পিঠে দুইজন করিয়া নিহত সৈনিক বাঁধা। যাহারা ফিরিতেছে তাহাদেরও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গোলাগুলির আঘাতে, বেয়নেটের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত, পোশাক-পরিচ্ছদ ছিন্নভিন্ন, পা হইতে মাথা পর্যন্ত রক্ত-রঞ্জিত। তাহাদের সেদিকে ভ্রূক্ষেপও নাই। উদ্দাম বিজয়োন্মাদনার নেশায় মৃত্যু-কাতর রণক্লান্তি ভুলিয়া গিয়া তাহারা যেন খেপিয়া উঠিয়াছে। ভাঙা সঙিনের আগায় রক্ত-ফেজ উড়াইয়া, ভাঙা খাটিয়া আদি দ্বারা নির্মিত এক অভিনব চৌদোলে কামালকে বসাইয়া বিষম হল্লা করিতে করিতে তাহারা মার্চ করিতেছে। ভূমিকম্পের সময় সাগর-কল্লোলের মতো তাহাদের বিপুল বিজয়ধ্বনি আকাশে-বাতাসে যেন কেমন একটা ভীতি-কম্পনের সৃজন করিতেছে। বহু দূর হইতে সে রণতাণ্ডব নৃত্যের ও প্রবল ভেরিতূরীর ঘন রোল শোনা যাইতেছে। অত্যধিক আনন্দে অনেকেরই ঘন ঘন রোমাঞ্চ হইতেছিল। অনেকেরই চোখ দিয়া অশ্রু গড়াইয়া পড়িতেছিল।]
সৈন্যবাহিনী দাঁড়াইয়া। হাবিলদার-মেজর তাহাদের মার্চ করাইবার জন্য প্রস্তুত হইতেছিল। বিজয়োন্মত্ত সৈন্যগণ গাহিতেছিল,–

ওই খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুরপুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল তাই,
কামাল! তু নে
কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মেজর মার্চের হুকুম করিল : কুইক মার্চ!
লেফট! রাইট! লেফট!!
লেফট! রাইট! লেফট!!
সৈন্যগণ গাহিতে গাহিতে মার্চ করিতে লাগিল]

ওই খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুরপুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল তাই,
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
[হাবিলদার-মেজর : লেফট! রাইট!]

সাব্বাস ভাই! সাব্বাস দিই, সাব্বাস তোর শম্‌শেরে।
পাঠিয়ে দিলি দুশমনে সব যম-ঘর একদম-সে রে!
বল দেখি ভাই, বল হাঁ রে,
দুনিয়ায় কে ডর্ করে না তুর্কির তেজ তলোয়ারে?

[লেফট! রাইট! লেফট!]

খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া!
বুজদিল ওই দুশমন সব বিলকুল সাফ হো গিয়া!
খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া!
হুররো হো!
হুররো হো!

দস্যুগুলোয় সামলাতে যে এম্‌নি দামাল কামাল চাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মেজর : সাবাস সিপাই! লেফট! রাইট! লেফট!]

শির হতে এই পাঁও-তক্ ভাই লাল-লালে-লাল খুন মেখে
রণ-ভীতুদের শান্তি-বাণী শুনবে কে?
পিণ্ডারিদের খুন-রঙিন
নখ-ভাঙা এই নীল সঙিন
তৈয়ার হ্যায় হর্দম ভাই ফাড়তে জিগর শত্রুদের।
হিংসুক-দল! জোর তুলেছি শোধ তোদের!
সাবাস জোয়ান! সাবাস!
ক্ষীণজীবী ওই জীবগুলোকে পায়ের তলেই দাবাস্ –
এম্‌নি করে রে–
এম্‌নি জোরে রে–
ক্ষীণজীবী ওই জীবগুলোকে পায়ের তলেই দাবাস্!
সাবাস জোয়ান! সাবাস!

[লেফট! রাইট! লেফট!]

হিংসুটে ওই জীবগুলো ভাই নাম ডুবালে সৈনিকের,
তাই তারা আজ নেস্ত-নাবুদ, আমরা মোটেই হই নি জের!
পরের মুলুক লুট করে খায়, ডাকাত তারা ডাকাত!

তাই তাদের তরে বরাদ্দ ভাই আঘাত শুধু আঘাত!
কি বল ভাই স্যাঙাত ?
হুররো হো!
হুররো হো!
দনুজ-দলে দলতে দাদা এমনি দামাল কামাল চাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
[হাবিলদার-মেজর : রাইট হুইল! লেফট! রাইট! লেফট!
সৈন্যগণ ডানদিকে মোড় ফিরিল!]

আজাদ মানুষ বন্দি করে, অধীন করে স্বাধীন দেশ,
কুল মুলুকের কুষ্ঠি করে জোর দেখালে ক-দিন বেশ,
মোদের হাতে তুর্কি নাচন নাচলে তাধিন তাধিন শেষ!
হুররো হো!
হুররো হো!
বদ-নসিবের বরাত খারাব বরাদ্দ তাই করলে কিনা আল্লায়,
পিশাচগুলো পড়ল এসে পেল্লায় ওই পাগলাদেরই পাল্লায়!
এই পাগলাদেরই পাল্লায়
হুররো হো!
হুররো হো!
ওদের কল্লা দেখে আল্লা ডরায়, হল্লা শুধু হল্লা,
ওদের হল্লা শুধু হল্লা,
এক মুর্গির জোর গায়ে নেই, ধরতে আসেন তুর্কি তাজি,
মর্দ গাজি মোল্লা!–
হাঃ! হাঃ হাঃ!
হেসে নাড়িই ছেঁড়ে বা!
হা হা হাঃ! হাঃ! হাঃ!

[হাবিলদার-মেজর : সাবাস সিপাই! লেফট! রাইট! লেফট!
সাবাস সিপাই। ফের বল ভাই!]

ওই খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল তাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মেজর : লেফট হুইল! য়্যাজ য়ু ওয়্যার! – রাইট হুইল! –
লেফট! রাইট! লেফট!
সৈন্যদের আঁখির সামনে অস্ত-রবির আশ্চর্য রঙের খেলা ভাসিয়া উঠিল।]

দেখচ কী দোস্ত অমন করে? হউ হউ হউ!
সত্যি তো ভাই! সন্ধেটা আজ দেখতে যেন সৈনিকেরই বউ!
শহিদ সেনার টুকটুকে বউ লাল-পিরাহন -পরা,
স্বামীর খুনের ছোপ-দেওয়া, তায় ডগডগে আনকোরা! –
না না না, – কলজে যেন টুকরো-করে কাটা
হাজার তরুণ শহিদ বীরের, – শিউরে ওঠে গা-টা!
আশমানের ওই সিংদরজায় টাঙিয়েছে কোন্ কসাই
দেখতে পেলে একখুনি গ্যে এই ছোরাটা কলজেতে তার বসাই!
মুণ্ডুটা তার খসাই!
গোস্বাতে আর পাই নে ভেবে কী যে করি দশাই!
[হাবিলদার-মেজর : সাবাস সিপাই! লেফট! রাইট! লেফট!
ঢালু পার্বত্য পথ, সৈন্যগণ বুকের পিঠের নিহত সৈন্যদের ধরিয়া সন্তর্পণে নামিল।]

আহা কচি ভাইরা আমার রে!
এমন কাঁচা জানগুলো খান খান করেছে কোন সে চামার রে?
আহা কচি ভাইরা আমার রে!!

[সামনে উপত্যকা। হাবিলদার-মেজর : লেফট ফর্ম।
সৈন্যবাহিনীর মুখ হঠাৎ বামদিকে ফিরিয়া গেল! হাবিলদার-মেজর :ফরওয়ার্ড!
লেফট! রাইট! লেফট!]

আশমানের ওই আংরাখা
খুন-খারাবির রং-মাখা,
কী খুবসুরৎ বাঃ রে বা!
জোর বাজা ভাই কাহার্‌বা!
হোক না ভাই এ কারবালা ময়দান –
আমরা যে গাই সাচ্চারই জয়গান!
হোক না এ তোর কারবালা ময়দান!!
হুররো হো
হুররো হো!!
[সামনে পার্বত্য পথ – হঠাৎ যেন পথ হারাইয়া ফেলিয়াছে। হাবিলদার-মেজর পথ খুঁজিতে লাগিল।
হুকুম দিয়া গেল : ‘মার্ক টাইম!’ সৈন্যগণ এক স্থানেই দাঁড়াইয়া পা আছড়াইতে লাগিল, –
দ্রাম! দ্রাম! দ্রাম!
লেফট! রাইট! লেফট!
দ্রাম! দ্রাম! দ্রাম!]

আশমানে ওই ভাসমান যে মস্ত দুটো রং-এর তাল,
একটা নিবিড় নীল-সীয়া আর একটা খুবই গভীর লাল,–
বুঝলে ভাই! ওই নীল-সিয়াটা শত্রুদের
দেখতে নারে কারুর ভালো,
তাইতে কালো রক্ত-ধারার বইছে শিরায় স্রোত ওদের!
হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল!
গৃধ্নু ওরা, লুব্ধ ওদের লক্ষ অসুর বল –
হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল।
জালিম ওরা অত্যাচারী!
সার জেনেছে সত্য যাহা হত্যা তারই!
জালিম ওরা অত্যাচারী!

সৈনিকের ওই গৈরিকে ভাই –
জোর অপমান করলে ওরাই,
তাই তো ওদের মুখ কালো আজ, খুন যেন নীল-জল!–
ওরা হিংস্র পশুর দল!
ওরা হিংস্র পশুর দল!
[হাবিলদার-মেজর পথ খুঁজিয়া ফিরিয়া অর্ডার দিল : ফরওয়ার্ড! লেফট হুইল –
সৈন্যগণ আবার চলিতে লাগিল – লেফট! রাইট! লেফট!]

সাচ্চা ছিল সৈন্য যারা শহিদ হল মরে।
তোদের মতন পিঠ ফেরেনি প্রাণটা হাতে করে –
ওরা শহিদ হল মরে।
পিটনি খেয়ে পিঠ যে তোদের ঢিট হয়েছে! কেমন!
পৃষ্ঠে তোদের বর্শা বেঁধা, বীর সে তোরা এমন!
আওরত সব যুদ্ধে আসিস! যা যা!
খুন দেখেছিস বীরের? হাঁ, দেখ টকটকে লাল কেমন গরম তাজা!
আওরত সব যা যা!
এরাই বলেন হবেন রাজা!
আরে যা যা! উচিত সাজা
তাই দিয়েছে শক্ত ছেলে কামাল ভাই!

[হাবিলদার-মেজর : সাবাস সিপাই!]

এই তো চাই! এই তো চাই!
থাকলে স্বাধীন সবাই আছি, নেই তো নাই, নেই তো নাই!
এই তো চাই!!

[কতকগুলি লোক অশ্রুপূর্ণ নয়নে এই দৃশ্য দেখিবার জন্য ছুটিয়া আসিতেছিল, তাহাদের
দেখিয়া সৈন্যগণ আরও উত্তেজিত হইয়া উঠিল!]

মার দিয়া ভাই মার দিয়া
দুশমন সব হার গিয়া!
কিল্লা ফতে হো গিয়া!
পরওয়া নেহি, যানে দো ভাই যো গিয়া
কিল্লা ফতে হো গিয়া!
হুররো হো!
হুররো হো!

[হাবিলদার-মেজর : সাবাস জোয়ান! লেফট! রাইট!]

জোর সে চলো পা মিলিয়ে,
গা হেলিয়ে,
এমনি করে হাত দুলিয়ে!
দাদরা তালে ‘এক দুই তিন’ পা মিলিয়ে
ঢেউ-এর মতন যাই!
আজ স্বাধীন এ দেশ! আজাদ মোরা বেহেশ্‌তও না চাই!
আর বেহেশ্‌তও না চাই!

[হাবিলদার-মেজর : সাবাস সিপাই! ফের বল ভাই!]

ওই খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুরপুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল তাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
[সৈন্যদল এক নগরের পার্শ্ব দিয়া চলিতে লাগিল। নগরবাসিনীরা ঝরকা হইতে মুখ বাড়াইয়া এই মহান দৃশ্য দেখিতেছিল; তাহাদের চোখ-মুখ আনন্দাশ্রুতে আপ্লুত। আজ বধূদের মুখের বোরখা খসিয়া পড়িয়াছে। ফুল ছড়াইয়া হাত দুলাইয়া তাহারা বিজয়ী বীরদের অভ্যর্থনা করিতেছিল। সৈন্যগণ চিৎকার করিয়া উঠিল!]

ওই শুনেছিস্? ঝরকাতে সব বলছে ডেকে বউ-দলে –
‘কে বীর তুমি! কে চলেছ চৌদোলে?’
চিনিস নে কি? এমন বোকা বোনগুলি সব? – কামাল এ যে কামাল!
পাগলি মায়ের দামাল ছেলে! ভাই যে তোদের!
তা না হলে কার হবে আর রৌশনএমন জামাল?
কামাল এ যে কামাল!
উড়িয়ে দেব পুড়িয়ে দেব ঘর-বাড়ি সব সামাল।
ঘর-বাড়ি সব সামাল!!
আজ আমাদের খুন ছুটেছে, হোশ টুটেছে,
ডগমগিয়ে জোশ উঠেছে!
সামনে থেকে পালাও।
শোহরত দাও, নওরাতি আজ! হর ঘরে দীপ জ্বালাও!
সামনে থেকে পালাও!
যাও ঘরে দীপ জ্বালাও!!

[হাবিলদার-মেজর : লেফট ফর্ম! লেফট! রাইট! লেফট! ফরোয়ার্ড!]

[বাহিনীর মুখ হঠাৎ বামদিকে ফিরিয়া গেল। পার্শ্বেই পরিখার সারি। পরিখাভর্তি নিহত সৈন্যের দল পচিতেছে।]

ইস! দেখেছিস! ওই কারা ভাই সামলে চলেন পা,
ফসকে মরা আধ-মরাদের মাড়িয়ে ফেলেন বা!

ও তাই শিউরে ওঠে গা!
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!
মরল যে সে মরেই গেছে!
বাঁচল যারা রইল বেঁচে
এই তো জানি সোজা হিসাব! দুঃখ কি তার? আঁ:?
মরায় দেখে ডরায় এরা! ভয় কি মরায়! বাঃ
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!
[সম্মুখে সংকীর্ণ ভগ্ন সেতু! হাবিলদার-মেজর অর্ডার দিল : ‘ফর্ম ইনটু সিঙ্গল লাইন।’ এক একজন করিয়া বুকের পিঠের নিহত ভাইদের চাপিয়া ধরিয়া অতি সন্তর্পণে ‘স্লো মার্চ’ করিয়া পার হইতে লাগিল।]
সত্যি কিন্তু ভাই!
যখন মোদের বক্ষে বাঁধা ভাইগুলির এই মুখের পানে চাই –
কেমন সে এক ব্যথায় তখন প্রাণটা কাঁদে যে সে!
কে যেন দুই বজ্র-হাতে চেপে ধরে কলজেখানা পেষে!
নিজের হাজার ঘায়েল জখম ভুলে তখন ডুকরে কেন কেঁদেও ফেলি শেষে!
কে যেন ভাই কলজেখানা পেষে!!
ঘুমোও পিঠে, ঘুমোও বুকে, ভাইটি আমার, আহা!
বুক যে ভরে হাহাকারে যতই তোরে সাব্বাস দিই,
যতই বলি বাহা!
লক্ষ্মীমণি ভাইটি আমার, আহা!!
ঘুমোও ঘুমোও মরণ-পারের ভাইটি আমার, আহা!!
অস্ত-পারের দেশ পারায়ে বহুৎ সে দূর তোদের ঘরের রাহা,
ঘুমোও এখন ঘুমোও ঘুমোও ভাইটি ছোটো আহা!
মরণ-বধূর লাল রাঙা বর! ঘুমো!
আহা, এমন চাঁদমুখে তোর কেউ দিল না চুমো!
হতভাগা রে!
মরেও যে তুই দিয়ে গেলি বহুৎ দাগা রে
না জানি কোন্ ফুটতে-চাওয়া মানুষ-কুঁড়ির হিয়ায়!
তরুণ জীবন এমনি গেল, একটি রাতও পেলিনে রে বুকে কোনো প্রিয়ায়!
অরুণ খুনের তরুণ শহিদ! হতভাগা রে!
মরেও যে তুই দিয়ে গেলি বহুৎ দাগা রে!
তাই যত আজ লিখনেওয়ালা তোদের মরণ স্ফূর্তি-সে জোর লেখে
এক লাইনে দশ হাজারে মৃত্যু-কথা! হাসি রকম দেখে,
মরলে কুকুর ওদের, ওরা শহিদ-গাথার বই লেখে!
খবর বেরোয় দৈনিকে,
আর একটি কথায় দুঃখ জানান, ‘জোর মরেছে দশটা হাজার সৈনিকে!’
আঁখির পাতা ভিজল কিনা কোনো কালো চোখের
জানল না হায় এ জীবনে ওই সে তরুণ দশটি হাজার লোকের!
পচে মরিস পরিখাতে, মা-বোনেরাও শুনে বলে ‘বাহা’!
সৈনিকেরই সত্যিকারের ব্যথার ব্যথী কেউ কি রে নেই? আহা! –
আয় ভাই তোর বউ এল ওই সন্ধ্যা মেয়ে রক্তচেলি পরে,
আঁধার-শাড়ি পরবে এখন পশবে যে তোর গোরের বাসর-ঘরে! –
ভাবতে নারি, গোরের মাটি করবে মাটি এ মুখ কেমন করে –
সোনা মানিক ভাইটি আমার ওরে!
বিদায়-বেলায় আরেকটি বার দিয়ে যা ভাই চুমো!
অনাদরের ভাইটি আমার! মাটির মায়ের কোলে এবার ঘুমো!

[সেতু পার হইয়া আবার জোরে মার্চ করিতে করিতে তাহাদের রক্ত গরম হইয়া উঠিল।]

ঠিক বলেছ দোস্ত তুমি!
চোস্ত কথা! আয় দেখি তোর হস্ত চুমি!
মৃত্যু এরা জয় করেছে, কান্না কিসের?
আব্-জম্-জম্ আনলে এরা, আপনি পিয়ে কলশি বিষের!
কে মরেছে? কান্না কিসের?
বেশ করেছে!
দেশ বাঁচাতে আপনারই জান শেষ করেছে!
বেশ করেছে!!
শহিদ ওরাই শহিদ!
বীরের মতন প্রাণ দিয়েছে, খুন ওদেরই লোহিত!
শহিদ ওরাই শহিদ!!

[এইবার তাহাদের তাম্বু দেখা গেল। মহাবীর আনোয়ার পাশা বহু সৈন্য-সামন্ত ও সৈনিকের আত্মীয়স্বজন লইয়া বিজয়ী বীরদের অভ্যর্থনা করিতে আসিতেছেন দেখিয়া সৈন্যগণ আনন্দে আত্মহারা হইয়া ডবল মার্চ করিতে লাগিল।]

হুররো হো!
হুররো হো!
ভাই-বেরাদর পালাও এখন দূর রহো! দূর রহো!
হুররো হো! হুররো হো!

[কামাল পাশাকে কোলে লইয়া নাচিতে লাগিল।]

হউ হো হো! কামাল জিতা রও!
কামাল জিতা রও!
ও কে আসে! আনোয়ার ভাই? –
আনোয়ার ভাই! জানোয়ার সব সাফ!
জোর নাচো ভাই! হর্দম দাও লাফ
আজ জানোয়ার সব সাফ
হুররো হো! হুররো হো!!
সব-কুছ আব্ দূর রহো! – হুররো হো!! হুররো হো!
রণ জিতে জোর মন মেতেছে! – সালাম সবায় সালাম! –

নাচনা থামা রে!
জখমি-ঘায়েল ভাইকে আগে আস্তে নামা রে!
নাচনা থামা রে!
কে ভাই? হাঁ, হাঁ, সালাম।
– ওই শোন শোন সিপাহ-সালার কামাল ভাই-এর কালাম!

[সেনাপতির অর্ডার আসিল,
‘সাবাস! থামো! হো! হো!
সাবাস! হল্ট! এক! দো!!’]

এক নিমেষে সমস্ত কলরোল নিস্তব্ধ হইয়া গেল। তখনও কিন্তু তারায় তারায় যেন ওই বিজয়গীতির হারা-সুর বাজিয়া বাজিয়া ক্রমে ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া মিশিয়া গেল।

ওই খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুরপুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল তাই।
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

আগমনি / কাজী নজরুল ইসলাম

এ কী রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন –
ঝন রনরনরন ঝনঝন!
সে কী দমকি দমকি ধমকি ধমকি
দামা দ্রিমি দ্রিমি গমকি গমকি
ওঠে চোটে, চোটে,
ছোটে লোটে ফোটে!
বহ্নি ফিনিক চমকি চমকি
ঢাল-তলোয়ারে খনখন!
সদা গদা ঘোরে বোঁও বনবন
শোঁও শনশন!
হই হই রব
ওই ভৈরব
হাঁকে লাখে লাখে
ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁকে
লাল গৈরিক-গায় সৈনিক ধায় তালে তালে
ওই পালে পালে,
ধরা কাঁপে কাঁপে।
জাঁকে মহাকাল কাঁপে থরথর!
রণে কড়কড়কাড়া খাঁড়া-ঘাত,
শির পিষে হাঁকে রথ-ঘর্ঘরধ্বনি ঘরঘর!
‘গর গরগর’ বোলে ভেরি তূরী।
‘হর হরহর’
করি চিৎকার ছোটে সুরাসুর-সেনা হনহন!
ওঠে ঝঞ্ঝা ঝাপটি দাপটি সাপটি
 হুহু হুহু হুহু শনশন!
ছোটে সুরাসুর সেনা হনহন।
বোঁও বনবন
শোঁও শনশন
হো-হো ঝনন ননন রনঝনঝন রনননরন ঝনরন!
তাতা থইথই খল খল খল
নাচে রণরঙ্গিণী সঙ্গিনী সাথে,
ধকধক জ্বলে জ্বলজ্বল!
বুকে মুখে চোখে রোষ-হুতাশন!
রোস কথা শোন!
ওই ডম্বরু-ঢোলে ডিমিডিমি বোলে,
ব্যোম মরুৎ স-অম্বর দোলে,
যম বরুণ কী কলকল্লোলে চলে উতরোলে
ধ্বংসে মাতিয়া  তাথিয়া তাথিয়া
নাচিয়া রঙ্গে, চরণ ভঙ্গে
সৃষ্টি সে টলে টলমল!
ও কী বিজয়ধ্বনি সিন্ধু গরজে কলকল কল কলকল!
ওঠে কোলাহল
কূট হলাহল
ছোটে মন্থনে পুন রক্ত-উদধি
ফেনাবিষ ক্ষরে গলগল!
টলে নির্বিকার সে বিধাতৃরও গো
সিংহ-আসন টলমল!
কার আকাশ-জোড়া ও আনত নয়ানে
করুণা-অশ্রু ছলছল!
বাজে মৃত-সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁঝর ঝমঝম,
নাচে ধূর্জটি সাথে প্রমথ ববম বমবম!
লাল লালে লাল ওড়ে ঈশানে নিশান যুদ্ধের,
ওঠে ওংকার, রণ-ডঙ্কার,
নাদে ওম্ ওম্ মহাশঙ্খ-বিষাণ রুদ্রের।
ছোটে রক্ত ফোয়ারা বহ্নির বান রে!
কোটি বীরপ্রাণ
ক্ষণে নির্বাণ
তবু শত সূর্যের জ্বালাময় রোষ
গমকে শিরায় গমগম।
ভয়ে রক্ত-পাগল প্রেত-পিশাচেরও
শিরদাঁড়া করে চনচন !
যত ডাকিনী-যোগিনী বিস্ময়াহতা,
নিশীথিনী ভয়ে থমথম।
বাজে মৃত সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁঝর ঝমঝম!
ওই অট্টহাসিছে রণচামুণ্ডা হাহা হাহা হিহি হিহি,
মাঝে মাঝে হুংকারে বৃংহিত নাদ
হ্রেষারব চিঁহি চিঁহিচিঁহি।
 বজ্রের মার
করকা-পাত!
কর্ আঘাত
কর্ নিপাত,
বহ্নিঘাত
মারের ওপরে মার হানো,
বাঃ সাবাস্!
হাসো! – কাঁপে দেখো ভয়ে? যেন শীতে
 হিহি ইহি ইহি! কটকটকট পটপটপট
গিরা ছিঁড়ে হাহা নড়ে ছটফট!
হুর্‌র্! হুর্‌র্!! হুর্‌র্!!!
হো হো কাটা পাঁঠা যেন ধড়ফড়
করে দূর্‌র্! দূর্‌র্!! দূর্‌র্!!!
ওই ওঠে দানবেরা ঘন চিৎকারি
ধিক্কারি পুন হানে টিটকারি রে!
যেন কোটি নাগ-বিষ-ফুৎকারে
ওঠে মৃত্যুআহত নিশাসে নিশাসে ঘুৎকার।
নর- মুণ্ডমালিনী চণ্ডী হাসিছে হাহা হাহা হাহা হিহিহিহি
হোহো হাহা হাহা হাহা হিহিহিহি।
ওই অসুর-পশুর মিথ্যা দৈত্য সেনা যত
হত আহত করে রে দেবতা সত্য!
স্বর্গ মর্ত্য পাতাল মাতাল রক্ত-সুরায়;
ত্রস্ত বিধাতা, মস্ত পাগল
পিনাকপাণি স-ত্রিশূল প্রলয় হস্ত ঘুরায়!
ক্ষিপ্ত সবাই রক্ত-সুরায়॥
চিতার উপরে চিতা সারি সারি
চারিপাশে তারই
ডাকে কুক্‌কুর গৃধিনি শৃগাল!
প্রলয় দোলায় দুলিছে ত্রিকাল
প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল!!
আজ রণ-রঙ্গিণী জগৎমাতার দেখ্ মহারণ
দশদিকে তাঁর দশহাতে বাজে দশ প্রহরণ!
পদতলে লুটে মহিষাসুর,
মহামাতা ওই সিংহাবাহিনী জানায় আজিকে বিশ্ববাসীকে –
শাশ্বত নহে দানব-শক্তি, পায়ে পিষে যায় শির পশুর!
নাই দানব
নাই অসুর–
চাইনে সুর
চাই মানব!–
বরাভয়-বাণী ওই রে কার
শুনি, নহে হইরই এবার!
ওঠ রে ওঠ
ছোট রে ছোট!
শান্ত মন,
ক্ষান্ত রণ!
খোল তোরণ,
চল বরণ
করব মায়;
ডরব কায়?
ধর্‌ব পায় কার সে আর
বিশ্ব-মা-ই পার্শ্বে যার?
আজ আকাশ-ডোবানো নেহারি তাঁহারই চাওয়া,
ওই শেফালিকা-তলে কে বালিকা চলে?
কেশের গন্ধ আনিছে আশিন হাওয়া।
এসেছে রে সাথে উৎপলাক্ষী চপলা কুমারী কমলা ওই,
সরসিজ-নিভ শুভ্র বালিকা
এল বীণাপাণি অমলা ওই।
এসেছে গণেশ,
এসেছে মহেশ,
বাস্ রে বাস্!
জোর উছাস্!!
এল সুন্দর সুর সেনাপতি,
সব মুখ এ যে চেনা-চেনা অতি
বাস্ রে বাস্ জোর উছাস্!!
হিমালয়! জাগো! ওঠো আজি,
তব সীমা লয় হোক
ভুলে যাও শোক – চোখে জল রোক
শান্তির – আজি শান্তি-নিলয় এ আলয় হোক্!
ঘরে ঘরে আজি দীপ জ্বলুক
মা-র আবাহন-গীত চলুক!
দীপ জ্বলুক!
গীত চলুক!!
আজ কাঁপুক মানব-কলকল্লোলে কিশলয় সম নিখিল ব্যোম!
স্বা-গতম্
স্বা-গতম্!!
মা-তরম্!
মা-তরম্!!
ওই ওই ওই বিশ্বকণ্ঠে
বন্দনা-বাণী লুণ্ঠে – ‘বন্দে
মা-তরম্!!

বিদ্রোহী / কাজী নজরুল ইসলাম

বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর-
আমি চির উন্নত শির!

আমি চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ,আমি সাইক্লোন,আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়,আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি দুর্বার,আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,আমি দ’লে যাই যত বন্ধন,যত নিয়ম কানুনশৃঙ্খল!
আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো,আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটি,আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী,আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল বীর-
চির-উন্নত মম শির!

আমি ঝঞ্ঝা,আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সমুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বার,আমি ছায়ানট,আমি হিন্দোল
আমি চল-চঞ্চল,ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল ;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা
আমি উন্মাদ,আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর;
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর।
বল বীর-
আমি চির-উন্নত শির!

আমি চিরদুরন্ত দুর্মদ,
আমি দুর্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম্ হ্যায় হর্দম ভরপুর মদ।
আমি হোমশিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি
আমি সৃষ্টি আমি ধ্বংস আমি লোকালয় আমি শ্মশান,
আমি অবসান নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণীসুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য;
আমি কৃষ্ণকন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধির।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর –
চির-উন্নত মম শির!
আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক,
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক।
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমি বজ্র আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার
আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দন্ড
আমি চক্র ও মহা শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচন্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব।
আমি প্রাণ-খোলা হাসি উল্লাস– আমি সৃষ্টিবৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু গ্রাস!
আমি কভূ প্রশান্ত-কভূ অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী!
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহা কল্লোল
আমি উজ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্জ্বল,
আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল-দোল!
আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেণু, তন্বী-নয়নে বহ্ণি
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বন্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারাযত পথিকের
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ–জ্বালা, প্রিয় লান্চিত বুকে গতি ফের
আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
চিত চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর!
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-ক’রে দেখা অনুখন
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা তা’র কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্!
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচড় কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণেগান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি উথ্থান আমি পতন,
আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়া-কেতন।
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ মর্ত্য-করতলে
তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নিয়াদ্রি, বাড়াব-বহ্ণি, কালানল
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সন্চারি ভুবনে সহসা সন্চারি ভূমিকম্প।
ধরি বাসুকির ফণা জাপটি-
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনেরপাখা সাপটি।
আমি দেব শিশু আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব মায়ের অন্চল!
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝঝুম
মম বাঁশরীর তানে পাশরি
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরনীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায় আমি উল্কা আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!
আমি মৃন্ময় আমি চিন্ময়
আমি অজর অমর অক্ষয় আমি অব্যয়।
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য!
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়াগিয়াছে সব বাঁধ!!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার
নিঃক্ষত্রিয়া করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না –
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর-
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির ।।


‘The Rebel’ By Kazi Nazrul Islam – Poem by Sayeed Abubakar

Say, o Hero—
Say, high I hold my head!
Looking at my head, the Himalayas
bow their peaks.
Say, o Hero—
Say, piercing through the great sky of the universe,
reaching above the Moon, the Sun, planets and stars,
breaking through the limits of earth and heavens,
pushing through the Arash, the throne of God,
I have risen as an eternal surprise of the Goddess of earth!
On my forehead shines Shiva, the Destroyer,
as some royal victory’s bright emblem.
Say, o Hero—
I hold my head high ever!
I am ever irrepressible, arrogant and merciless:
I am the dancing Shiva of the great cataclysm,
I am cyclone, I am destruction,
I am great terror, the curse of earth,
I am irresistible,
I grind all to pieces!
I am lawless and reckless.
I trample down all restraints, all rules and disiplines!
I care no law,
I sink vessels laden to the brim,
I am torpedo, I am the terrible floating mine!
I am Durjati, I am the tempest of sudden summer
with dishevelled hair!
I am the rebel,
I am the mutinous child of the Goddess of earth!

Say, o Hero—
Say, high I hold my head!
I am storm, I am cyclone,
I go on destroying whatever comes on my path.
I am the dance-intoxicated rhythm,
I dance at my own pleasure,
I am the unfettered joy of life!
I am Hambir, I am Chhayanat, I am Hindol,
I am ever reckless,
Going my way with quick gestures,
suddenly I leap with wonder,
I am Hindol, the quick lightning in the sky!
O brother, I do whatever my mind wants,
I embrace my enemies and wrestle with death,
I am mad, I am tornado!
I am plague, I am great fear of this earth;
I am terror of the ruler, I am destruction,
I am full of a warm restlessness for ever!
Say, o Hero—
ever high stands my head!

I am ever reckless, ever irresistible,
I am irrepressible, the cup of my life
is always, yes always, full to the brim.
I am the sacrificial fire,
I am Yamadagni keeping the sacred fire ever alive,
I am devotion, I am priest, I am fire.
I am creation, I am destruction,
I am habitation, I am the cremation ground,
I am the termination, the end of night!
I am the son of Indrani with the moon
in my hand and the sun on my forehead.
My one hand holds the curved bamboo flute
and the other the trumpet of war!
My throat is black from drinking poison
churned up from the ocean of pain!
I am Shiva, I catch the waters of Gangotri free from bondage!
Say, o Hero—
ever high stands my head!

I am monk, I am the song-soldier,
I am crown-prince, my royal garment is fade brownish red.
I am bedouin, I am Ghengis,
I salute none but myself.
I am thunder, I am the sound of Om on Shiva’s horn,
I am the mighty roar of Israfil’s trumpet,
I am the tabour and the trident of Pinakpani,
I am the staff of justice of the Great Just.
I am the wheel and the great conch of Vishnu,
I am the fearsome din of the primeval Om!
I am a disciple of the mad sages Durvasa and Viswamitra,
I am the forest fire, I shall burn the universe to ashes!
I am open-hearted laughter and exaltation,
I am enemey to creation, the mighty terror,
I am the eclipse of the twelve suns on the Doomsday!
I am serene sometimes, sometimes restless, ruthlessly self-willed,
I am the youth of dawn,
I crush the vain glory of fate under my feet!
I am the fury of storm,
I am the tumultuous roar of the ocean,
I am bright, shining ever bright,
I am the rippling surge of water and the roll of moving waves!

I am the plaited braid of a smart maiden’s locks,
the spark of fire in her blazing eyes.
I am the wild love that blossoms like lotus
in the sixteen years old’s heart,
I am fortunate!
I am the absent mind of an indifferent girl,
the tearful sigh in a widow’s heart
and the lament of a despairing yearner.
I am the sorrow of deprivation
in the heart of the homeless wanderer living on streets,
I am the heart-pangs of the humiliated,
venomous pain and regeneration in the heart of the offended!
I am the plaintive cry of a sensitive aggrieved heart, its intense pain,
I am the trembling first touch of a virgin
and I am the throbbing tenderness of her first stolen kiss!
I am the fleeting glance of the secret beloved
and her repeated gaze on every pretence,
I am the love of the restless girl and the jingle of her bracelets.
I am the eternal child, the adolescent of all times,
I am the hem of the garment, the breast-cloth and the scarf
of the village maiden timorous of her youth!
I am the north wind, the breezes of spring
and the indifferent air of the east,
I am the deep melody of a wayfaring bard
and the music of a bamboo flute.
I am the raging thirst of summer and the fierce blazing sun,
I am the trilling spring in desert,
I am the cool shadowy greenery!
With an intense joy I rush onward,
What a madness! I am insane!
I have suddenly discovered myself
and all my barriers have fallen off!

I am the rising, I am the fall,
I am the consciousness in the unconscious soul,
I am the banner of victory over the gateway of the world,
I am the flag of human triumph.
I rush, fleet as storm, clapping my hands
that hold heaven and earth,
My carriers, the spirited Borrak and Uchchaisrava,
sprint with challenging neighs!

I am the burning volcano in the bosom of earth,
the forest fire, the holocaust of doom,
and the reverberations of the surging sea of fire
in the bowels of earth!
I climb the lightning and fly, leaping, snapping my fingers,
I cause sudden earthquakes and terrify the world.
I clasp the fangs of Vasuki the snake,
I catch the flaming wings of Gabriel,
I am a heavenly cherub, I am restless,
I am impudent and tear with my teeth
the garment of the mother-earth!

I am Orpheus’s flute,
its music lulls the heaving ocean into drowsy forgetfulness,
and in sleep it kisses the earth and soothes it to complete silence.
I am the flute in the hands of Krishna.
When I rage and rush enveloping the boundless heavens,
the fires of seven hells and Habia flicker
and die in panic!
I am the messenger of revolt all over the earth and the sky!

I am the deluge and floods of Sravan,
Sometimes I make the earth beautiful,
sometimes blessed in destruction—
I shall snatch away the twin girls from Vishnu’s bosom.
I am injustice, I am meteor, I am Saturn,
I am the comet’s terrific heat, the venomous killer asp!
I am Chandi the headless, I am ruinous Warlord,
Sitting in the fires of hell, I smile like flowers!

I am made of clay, I am formed of spirit,
I am ageless, immortal, inexpendible,
I am inexhaustible!
I am the terror of men, demons and gods,
I am ever unconquerable in the universe,
I am the supreme God over all gods of earth,
I am the superman, the truth,
I dance my way madly over heaven, underworld and earth!
I am insane, I am insane!
I have suddenly discovered myself
and all my barriers have fallen off! !

I am Parsurama’s cruel axe,
I shall rid the world of its tribe of warriors
and usher calm, generous peace!
I am the plough on Balaram’s shoulders,
I shall uproot with effortless ease this world in chains,
in the joy of creating it anew.

Weary of struggles, I, the great rebel,
shall rest in quiet only on the day
when the wails of the oppressed will not rend the air and the sky,
the scimitar and the sword of the oppressors
will not clang in the fierce arena of battle—
I, the rebel, weary of fighting,
shall be calm that day.

I am Bhrigu, the rebel,
I stamp footprints on the bosom of God!
I am the destruction of the creator,
I shall cleave the heart of capricious God
who smites with grief and anguish!
I am Bhrigu, the rebel,
I shall stamp footprints on the bosom of God!
I shall cleave the bosom of that capricious destiny!

I am the hero, rebel eternal—
Alone, I tower over the universe with my head unbowed.

1-2.7.2017 Sirajganj

Sayeed Abubakar

 

উৎসর্গ / কাজী নজরুল ইসলাম

বাঙলার অগ্নি-যুগের আদি পুরোহিত, সাগ্নিক বীর
শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষ
শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু

অগ্নি-ঋষি! অগ্নিবীণা তোমায় শুধু সাজে।
তাই তো তোমার বহ্নিরাগেও বেদনবেহাগ বাজে।
দহনবনের গহনচারী —
হায় ঋষি — কোন্ বংশীধারী
নিঙড়ে আগুন আনলে বারি
অগ্নিমরুর মাঝে।
সর্বনাশা কোন্ বাঁশি সে বুঝতে পারি না যে।
দুর্বাসা হে! রুদ্র তড়িৎ হানছিলে বৈশাখে,
হঠাৎ সে কার শুনলে বেণু কদম্বের ওই শাখে।
বজ্রে তোমার বাজল বাঁশি,
বহ্নি হল কান্নাহাসি,
সুরের ব্যথায় প্রাণ উদাসী —
মন সরে না কাজে।
তোমার নয়নঝুরা অগ্নিসুরেও রক্তশিখা রাজে।

তোমার অগ্নি-পূজারি
স্নেহ-মহিমান্বিত শিষ্য — কাজী নজরুল ইসলাম

কোরবানী / কাজী নজরুল ইসলাম

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুব্ধ মন!
ধ্বনি উঠে রণি’ দূর বাণীর, –
আজিকার এ খুন কোরবানীর!
দুম্বা-শির রুম্-বাসীর
শহীদের শির সেরা আজি!- রহমান কি রুদ্র নন?
ব্যাস! চুপ খামোশ রোদন!
আজ শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে, শির দে বৎস” শোন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
খন্জর মারো গদ্র্দানেই,
পন্জরে আজি দরদ নেই,
মর্দানী’ই পর্দা নেই,
ডরতা নেই আজ খুন্-খারাবীতে রক্ত-লুব্ধ-মন !
খুনে খেলবো খুন-মাতন!
দুনো উনমাদনাতে সত্য মুক্তি আনতে যুঝবো রণ।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
চ’ড়েছে খুন আজ খুনিয়ারার
মুসলিমে সারা দুনিয়াটার!
‘জুলফেকার’ খুলবে তার
দু’ধারী ধার শেরে-খোদার, রক্তে-পূত-বদন!
খুনে আজকে রুধবো মন
ওরে শক্তি-হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
আস্তানা সিধা রাস্তা নয়,
‘আজাদী মেলে না পস্তানো’য়!
দস্তা নয় সে সস্তা নয়!
হত্যা নয় কি মৃত্যুও ? তবে রক্তে লুব্ধ কোন্
কাঁদে-শক্তি-দুস্থ শোন_
“এয়্ ইবরাহীম্ আজ কোরবানী কর শ্রেষ্ঠ পুত্র ধন!”
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
এ তো নহে লহু তরবারের
ঘাতক জালিম জোরবারের
কোরবানের জোরজানের
খুন এ যে, এতে গোদ্র্দ ঢের রে, এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন!
এতে মা রাখে পুত্র পণ!
তাই জননী হাজেরা বেটারে পরা’লো বলির পূত বসন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
এই দিনই ‘মিনা’-ময়দানে
পুত্র-স্নেহের গর্দানে
ছুড়ি হেনে ‘খুন ক্ষরিয়ে নে’
রেখেছে আব্বা ইবরাহীম সে আপনা রুদ্র পণ!
ছি ছি! কেঁপোনা ক্ষুদ্র মন!
আজ জল্লাদ নয় , প্রহ্লাদ-সম মোল্লা খুন-বদন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
দ্যাখ্ কেঁপেছে ‘আরশ’ আসমানে
মন-খুনী কি রে রাশ মানে?
ত্রাস প্রাণে? তবে রাস্তা নে!
প্রলয় বিষাণ ‘কিয়ামতে’ তবে বাজবে কোন্ বোধন?
সে কি সৃষ্টি-সংশোধন?
ওরে তাথিয়া তাথিয়া নাচে ভৈরব বাজে ডম্বরু শোন্!-
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
মুসলিম-রণ-ডঙ্কা সে,
খুন দেখে করে শঙ্কা কে?
টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে,
ওরে হুঙ্কারে, ভাঙি গড়া ভীম কারা, ল’ড়বো রণ-মরণ!
ঢালে বাজবে ঝন্-ঝনন্!
ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!
জোর চাই, আর যাচনা নয়,
কোরবানী-দিন আজ না ওই?
বাজনা কই? সাজনা কই?
কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্র্ধরণ?
বল্ – “যুঝবো জান ভি পণ!”
ওই খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ,
আজ আল্লার নামে জান্ কোরবানে ঈদের পূত বোধন।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!

শাত্-ইল-আরব / কাজী নজরুল ইসলাম

শাতিল-আরব ! শাতিল আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।
শহিদের লোহু , দিলিরের খুন ঢেলেছে যেখানে আরব-বীর।

যুঝেছে এখানে তুর্ক-সেনানী,
য়ুনানি মিসরি আরবি কেনানি ;–
লুটেছে এখানে মুক্ত আজাদ বেদুইনদের চাঙ্গা-শির!
নাঙ্গা-শির –
শমশের হাতে, আঁশু-আঁখে হেথা মূর্তি দেখেছি বীর-নারীর!
শাতিল-আরব! শাতিল-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।

‘কূত-আমারা র রক্তে ভরিয়া
দজলা এনেছে লোহুর দরিয়া;
উগারি সে খুন তোমাতে দজলা নাচে ভৈরব ‘মস্তানি’র।
ত্রস্তা-নীর
গর্জে রক্ত-গঙ্গা ফোরাত , – ‘শাস্তি দিয়েছি গোস্তাখীর !’
দজলা-ফরাত-বাহিনী শাতিল! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।

বহায়ে তোমার লোহিত বন্যা
ইরাক-আজমে করেছ ধন্যা –
বীরপ্রসূ দেশ হল বরেণ্যা মরিয়া মরণ মর্দমির !
মর্দ বীর
সাহারায় এরা ধুঁকে মরে তবু পরে না শিকল পদ্ধতির।
শাতিল-আরব! শাতিল-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।

দুশমন-লোহু ঈর্ষায় নীল
তব তরঙ্গে করে ঝিল-মিল
বাঁকে বাঁকে রোষে মোচড় খেয়েছে পিয়ে নীল খুন পিণ্ডারির !
জিন্দা বীর
‘জুলফিকার আর ‘হায়দরি’ হাঁক হেথা আজও হজরত আলীর –
শাতিল-আরব! শাতিল-আরব!! জিন্দা রেখেছে তোমার তীর।

ললাটে তোমার ভাস্বর টিকা
বস্‌রা -গুলের বহ্নিতে লিখা;
এ যে বসোরার খুন-খারাবি গো রক্ত-গোলাব-মঞ্জরীর
খঞ্জরির!
খঞ্জরে ঝরে খর্জুর-সম হেথা লাখো দেশ-ভক্ত-শির!
শাতিল-আরব! শাতিল-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।

ইরাক-বাহিনী! এ যে গো কাহিনি,
কে জানিত কবে বঙ্গ-বাহিনী
তোমারও দুঃখে ‘জননী আমার’! বলিয়া ফেলিবে তপ্ত নীর
রক্ত-ক্ষীর –
পরাধীনা ! একই ব্যথায় ব্যথিত ঢালিল দু-ফোঁটা ভক্ত-বীর!
শহিদের দেশ! বিদায়! বিদায়!! এ অভাগা আজ নোয়ায় শির।

আনোয়ার / কাজী নজরুল ইসলাম

স্থান – প্রহরী-বেষ্টিত অন্ধকার কারাগৃহ, কনস্ট্যান্টিনোপল।
কাল – অমাবস্যার নিশীথ রাত্রি।

চারিদিক নিস্তব্ধ নির্বাক। সেই মৌনা নিশীথিনীকে ব্যথা দিতেছিল শুধু কাফ্রি-সান্ত্রির পায়চারির বিশ্রী খটখট শব্দ। ওই জিন্দানখানায় মহাবাহু আনোয়ারের জাতীয় সৈন্যদলের সহকারী এক তরুণ সেনানী বন্দি। তাহার কুঞ্চিত দীর্ঘ কেশ, ডাগর চোখ, সুন্দর গঠন – সমস্ত কিছুতে যেন একটা ব্যথিত-বিদ্রোহের তিক্ত ক্রন্দন ছল-ছল করিতেছিল। তরুণ প্রদীপ্ত মুখমণ্ডলে চিন্তার রেখাপাতে তাহাকে তাহার বয়স অপেক্ষা অনেকটা বেশি বয়স্ক বোধ হইতেছিল।

সেইদিনই ধামা-ধরা সরকারের কোর্ট-মার্শালের বিচারে নির্ধারিত হইয়া গিয়াছে যে পরদিন নিশিভোরে তরুণ সেনানীকে তোপের মুখে উড়াইয়া দেওয়া হইবে।

আজ হতভাগ্যের সেই মুক্তি-নিশীথ জীবনের সেই শেষরাত্রি। তাহার হাতে, পায়ে, কটিদেশে, গর্দানে মস্ত মস্ত লৌহ-শৃঙ্খল। শৃঙ্খল-ভারাতুর তরুণ সেনানী স্বপ্নে তাহার মাকে দেখিতেছিল। সহসা ‘মা’ বলিয়া চিৎকার করিয়া জাগিয়া উঠিল। তাহার পর চারিদিকে কাতর নয়নে একবার চাহিয়া দেখিল, কোথাও কেহ নাই। শুধু হিমানী-সিক্ত বায়ু হা হা স্বরে কাঁদিয়া গেল, ‘হায় মাতৃহারা!’

স্বদেশবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা স্মরণ করিয়া তরুণ সেনানী ব্যর্থ-রোষে নিজের বামবাহু নিজে দংশন করিয়া ক্ষত-বিক্ষত করিতে লাগিল। কারাগৃহের লৌহ-শলাকায় তাহার শৃঙ্খলিত দেহভার বারে বারে নিপতিত হইয়া কারাগৃহ কাঁপাইয়া তুলিতেছিল।

এখন তাহার অস্ত্র-গুরু আনোয়ারকে মনে পড়িল। তরুণ বন্দি চিৎকার করিয়া উঠিল – ‘আনোয়ার!’

আনোয়ার! আনোয়ার!
দিলওয়ার তুমি, জোর তলওয়ার হানো, আর
নেস্ত-ও-নাবুদ করো, মারো যত জানোয়ার!
আনোয়ার! আপশোশ!
বখতেরই সাফ দোষ,
রক্তেরই নাই ভাই আর সে যে তাপ জোশ,
ভেঙে গেছে শমশের – পড়ে আছে খাপ কোশ!
আনোয়ার! আপশোশ!

আনোয়ার! আনোয়ার!
সব যদি সুনসান, তুমি কেন কাঁদ আর?
দুনিয়াতে মুসলিম আজ পোষা জানোয়ার!
আনোয়ার! আর না! –
দিল কাঁপে কার না?
তলওয়ারে তেজ নাই! তুচ্ছ স্মার্না,
ওই কাঁপে থর থর মদিনার দ্বার না?
আনোয়ার! আর না!

আনোয়ার! আনোয়ার!
বুক ফেড়ে আমাদের কলিজাটা টানো, আর
খুন করো – খুন করো ভীরু যত জানোয়ার!
আনোয়ার! জিঞ্জির
পরা মোর খিঞ্জির
শৃঙ্খলে বাজে শোনো রোনা রিন-ঝিনকির,
নিবু-নিবু ফোয়ারা বহ্নির ফিনকির!
গর্দানে জিঞ্জির!

আনোয়ার! আনোয়ার!
দুর্বল এ গিদ্‌ধরে কেন তড়পানো আর?
জোরওয়ার শের কই?– জেরবার জানোয়ার।
আনোয়ার! মুশকিল
জাগা কঞ্জুস-দিল
ঘিরে আসে দাবানল তবু নাই হুঁশ তিল!
ভাই আজ শয়তান ভাই-এ মারে ঘুষ কিল!
আনোয়ার! মুশকিল!

আনোয়ার! আনোয়ার!
বেইমান মোরা, নাই জান আধ-খানও আর!
কোথা খোঁজ মুসলিম! – শুধু বুনো জানোয়ার!
আনোয়ার! সব শেষ!–
দেহে খুন অবশেষ! –
ঝুটা তেরি তলওয়ার ছিন লিয়া যব দেশ
আওরত সম ছি ছি ক্রন্দন-রব পেশ!!
আনোয়ার! সব শেষ!

আনোয়ার! আনোয়ার!
জনহীন এ বিয়াবানে মিছে পস্তানো আর।
আজও যারা বেঁচে আছে তারা খ্যাপা জানোয়ার।
আনোয়ার! – কেউ নাই।
হাথিয়ার? – সেও নাই!
দরিয়াও থমথম নাই তাতে ঢেউ, ছাই!
জিঞ্জির গলে আজ বেদুইন-দেও ভাই!
আনোয়ার! কেউ নাই!

আনোয়ার! আনোয়ার!
যে বলে সে মুসলিম – জিভ ধরে টানো তার!
বেইমান জানে শুধু জানটা বাঁচানো সার!
আনোয়ার! ধিক্কার!
কাঁধে ঝুলি ভিক্ষার –
তলওয়ারে শুধু যার স্বাধীনতা শিক্ষার!
যারা ছিল দুর্দম আজ তারা দিকদার
আনোয়ার! ধিক্কার!

আনোয়ার! আনোয়ার!
দুনিয়াটা খুনিয়ার, তবে কেন মান আর
রুধিরের লোহু আঁখি! – শয়তানি জান সার!
আনোয়ার! পঞ্জায়
বৃথা লোকে সমঝায়,
ব্যথাহত বিদ্রোহী-দিল নাচে ঝঞ্ঝায়,
খুন-খেকো তলওয়ার আজ শুধু রণ চায়,
আনোয়ার! পঞ্জায়!

আনোয়ার! আনোয়ার!
পাশা তুমি নাশা হও মুসলিম জানোয়ার,
ঘরে যত দুশমন, পরে কেন হান মার?
আনোয়ার! এসো ভাই!
আজ সব শেষও যাই –
ইসলামও ডুবে গেল, মুক্ত স্বদেশও নাই! –
ত্যজি বরিয়াছি ভিখারির বেশও তাই!
আনোয়ার! এসো ভাই!

সহসা কাফ্রি সান্ত্রির ভীম চ্যালেঞ্জ প্রলয়-ডম্বরু-ধ্বনির মতো হুংকার দিয়া উঠিল – ‘এ্যয় নৌজওয়ান, হুঁশিয়ার!’ অধীর ক্ষোভে তিক্তরোষে তরুণের দেহের রক্ত টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠিল। তাহার কটিদেশের, গর্দানের, পায়ের শৃঙ্খল খান খান হইয়া টুটিয়া গেল, শুধু হাতের শৃঙ্খল টুটিল না! সে সিংহ-শাবকের মতো গর্জন করিয়া উঠিল –

এ্যয় খোদা! এ্যয় আলি! লাও মেরি তলওয়ার!

সহসা তাহার ক্লান্ত আঁখির চাওয়ায় তুরস্কের বন্দিনী মাতৃ-মূর্তি ভাসিয়া উঠিল। সেই মাতৃ-মূর্তির পার্শ্বেই তাহার মায়েরও শৃঙ্খলিতা ভিখারিনি বেশ। তাঁহাদের দুইজনেরই চোখের কোণে দুই বিন্দু করিয়া করুণ অশ্রু। অভিমানী পুত্র অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া লইয়া কাঁদিয়া উঠিল –

ও কে? ও কে ছল আর?
না, – মা, মরা জানকে এ মিছে তরসানো আর!
আনোয়ার! আনোয়ার!

কাপুরষ প্রহরীর ভীম প্রহরণ বিনিদ্র বন্দি তরুণ সেনানীর পৃষ্ঠের উপর পড়িল। অন্ধ কারাগারে বন্ধ রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাহারই আর্ত প্রতিধ্বনি গুমরিয়া ফিরিতে লাগিল–’আঃ–আঃ–আঃ–!’

আজ নিখিল বন্দি-গৃহে ওই মাতৃ-মুক্তিকামী তরুণেরই অতৃপ্ত কাঁদন ফরিয়াদ করিয়া ফিরিতেছে। যেদিন এ ক্রন্দন থামিবে, সেদিন সে কোন্ অচিন দেশে থাকিয়া গভীর তৃপ্তির হাসি হাসিবে জানি না। তখন হয়তো হারা-মা আমার আমায় ‘তারার পানে চেয়ে চেয়ে’ ডাকিবেন। আমিও হয়তো আবার আসিব। মা কি আমায় তখন নূতন নামে ডাকিবেন? আমার প্রিয়জন কি আমায় নূতন বাহুর ডোরে বাঁধিবে? আমার চোখ জলে ভরিয়া উঠিতেছে, আর কেন যেন মনে হইতেছে, – ‘আসিবে সেদিন আসিবে।’

ধূমকেতু / কাজী নজরুল ইসলাম

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!

সাত সাত শো নরক-জ্বালা জ্বলে মম ললাটে,
মম ধূম-কুণ্ডলী করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘন ঘোলাটে!
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ,
আমি স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি-পাপের অনুতাপ-তাপ-হাহাকার—
আর মর্ত্তে সাহারা-গোবী ছাপ,
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ!
আমি সর্ব্বনাশের ঝাণ্ডা উড়ায়ে বোঁও বোঁও ঘুরি শূণ্যে,
আমি বিষ-ধূম-বাণ হানি একা ঘিরে ভগবান-অভিমুন্যে।
শোঁও শন-নন-নন শন-নন-নন শাঁই শাঁই,
ঘুর্ পাক্ খাই, ধাই পাঁই পাঁই,
মম পুচ্ছে জড়ায়ে সৃষ্টি;
করি উল্কা-অশনি-বৃষ্টি, —
আমি একটা বিশ্ব গ্রাসিয়াছি, পারি গ্রাসিতে এখনো ত্রিশটি।
আমি অপঘাত দুর্দ্দৈব রে আমি সৃষ্টির অনাসৃষ্টি!
আমি আপনার বিষ-জ্বালা মদ-পিয়া মোচড় খাইয়া খাইয়া
জোর বুঁদ হ’য়ে আমি চ’লেছি ধাইয়া ভাইয়া!
শুনি মম বিষাক্ত, “রিরিরিরি”-নাদ
শোনায় দ্বিরেফ-গুঞ্জন সম বিশ্ব ঘোরার প্রণব নিনাদ!
মম ধূর্জ্জটী-শিখ করাল পুচ্ছে
দশ অবতারে বেঁধে ঝ্যাটা ক’রে ঘোরাই উচ্চে, ঘুরাই—
আমি অগ্নি কেতন উড়াই! —

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!

ঐ বামন বিধি সে আমারে ধরিতে বাড়ায়েছিল রে হাত
মম অগ্নি-দাহনে জ্ব’লে পুড়ে তাই ঠুঁটো সে জগন্নাথ!
আমি জানি জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরী,
তাই বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি।
আমি জানি জানি ঐ ভুয়ো ঈশ্বর দিয়ে যা’ হয়নি হবে তা’ও!
তাই বিপ্লব হানি বিদ্রোহ করি, নেচে নেচে দিই গোঁফে তা’ও!
তোর নিযুত নরকে ফুঁ দিয়ে নিবাই, মৃত্যুর মুখে থুতু দি’!
আর যে যত রাগে রে তারে তত কাল্-আগুনের কাতুকুতু দি’!
মম তুরীয় লোকের তির্যক-গতি তূর্য্য-গাজন বাজায়!
মম বিষ-নিঃশ্বাসে মারীভয় হানে অরাজক যত রাজায়!
কচি শিশু-রসনায় ধানী-লঙ্কার পোড়া ঝাল
আর বদ্ধ কারায় গন্ধক ঘোঁয়া, এসিড, পটাস, মোনছাল,
আর কাঁচা কলিজায় পচা ঘা’র সম সৃষ্টিরে আমি দাহ করি
আর স্রষ্টারে আমি চুষে খাই!
পেলে বাহান্ন-শও জাহান্নামেও আধা চুমুকে সে শুষে যাই!

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!

আমি শি শি শি প্রলয়-শিশ্ দিয়ে ঘুরি কৃতিঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি,
আমি ত্রিভুবন তার পোড়ায়ে মারিয়া আমিই করিব মুখাগ্নি!
তাই আমি ঘোর তিক্ত সুখে রে, একপাক ঘু’রে বোঁও করে
ফের দু’পাক নি’!
কৃতিঘ্নী আমি কৃতিঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি!
পঞ্জর মম খর্পরে জ্বলে নিদারুণ যেই বৈশ্বানর—
শোন্ রো মর, শোন্ অমর! —
সে যে তোদের ঐ বিশ্বপিতার চিতা!
এ চিতাগ্নিতে জগদীশ্বর পুড়ে ছাই হবে, হে সৃষ্টি জান কি তা?
কি বলো ? কি বলো ? ফের বল ভাই আমি শয়তান-মিতা!
হো হো ভগবানে আমি পোড়াব বলিয়া জ্বালিয়েছি বুকে চিতা!
ছোট শন শন শন ঘর ঘর ঘর সাঁই সাঁই!
ছোট পাঁই পাঁই|
তুই অভিশাপ তুই শয়তান তোর অনন্তকাল পরমাই!
ওরে ভয় নাই তোর মার নাই!!
তুই প্রলয়ঙ্কর ধূমকেতু!
তুই উগ্র ক্ষিপ্ত তেজ-মরীচিকা, নোস অমরার ঘুম –সেতু
তুই ভৈরব-ভয় ধূমকেতু!

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
ঐ ঈশ্বর-শির উল্লঙ্ঘিতে আমি আগুনের সিড়ি,
আমি বসিব বলিয়া পেতেছি ভবানী ব্রহ্মার বুকে পিঁড়ি!
খ্যাপা মহেশের বিক্ষিপ্ত পিনাক, দেবরাজ-দম্ভোলি
লোকে বলে মোরে, শুনে হাসি আমি আর নাচি বব-বম্ বলি!
এই শিখায় আমার নিযুত ত্রিশূল বাশুলি বজ্র-ছড়ি
ওরে ছড়ানো র’য়েছে, কত যায় গড়াগড়ি!
মহা সিংহাসনে সে কাঁপিছে বিশ্ব-সম্রাট নিরবধি,
তার ললাটে তপ্ত অভিশাপ ছাপ এঁকে দিই আমি যদি!
তাই টিটকিরি দিয়ে হাহা হেসে উঠি,
সে হাসি গুমরি লুটায়ে পরে রে তুফান ঝঞ্ঝা সাইক্লোনে টুটি’!
আমি বাজাই আকাশে তালি দিয়া “তাতা-উর্ তাক্”।
আর সোঁও সোঁও করে প্যাঁচ দিয়ে খাই চিলে-ঘুড়ি সম ঘুরপাক!
মম নিঃশ্বাস আভাসে অগ্নি-গিরির বুক ফেটে উঠে ঘুত্কারপ
আর পুচ্ছে আমার কোটি নাগ-শিশু উদ্গারে বিষ-ফুত্কার!
বাঘিনী যেমন ধরিয়া শিকার
তখনি রক্ত শোষে না রে তার,
দৃষ্টি-সীমায় রাখিয়া তাহারে উগ্রচণ্ড সুখে
পুচ্ছ সাপটি’ খেলা করে আর শিকার মরে সে ধুঁকে!
তেমনি করিয়া ভগবানে আমি
দৃষ্টি-সীমায় রাখি দিবাযামী
ঘিরিয়া ঘিরিয়া খেলিতেছি খেলা, হাসি’ পিশাচের হাসি
ওরে অগ্নি-বাঘিনী আমি সে সর্ব্বনাশী!

আজ রক্ত মাতাল উল্লাসে মাতি রে—
মম পুচ্ছে ঠিকরে দশগুণ ভাতি,
রক্ত-রুদ্র উল্লাসে মাতি রে!
ভগবান্? সে ত হাতের শিকার!— মুখে ফেনা উঠে মরে!
আর কাঁপিছে, কখন পড়ি গিয়া তার আহত বুকের প’রে!
অথবা যেন রে অসহায় এক শিশুরে ঘিরিয়া
চায়, আর ঘোরে শন্ শন্ শন্,
ভয় বিহ্বল শিশু তার মাঝে কাঁপে রে যেমন—
তেমনি করিয়া ভগবানে ঘিরে
আমি ধূমকেতু-কালনাগ অভিশাপ ছুটে চলেছি রে;
আর সাপে-ঘেরা অসহায় শিশু সম
বিধাতা তোদের কাঁপিছে রুদ্র ঘুর্ণীর মাঝে মম!

আজিও ব্যথিত সৃষ্টির বুকে ভগবান কাঁদে ত্রাসে,
স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্ট পাছে বা বড় হ’য়ে তারে গ্রাসে!

রক্তাম্বরধারিণী-মা / কাজী নজরুল ইসলাম

রক্তাম্বর পরো মা এবার
জ্বলে পুড়ে যাক শ্বেত বসন
দেখি ওই করে সাজে মা কেমন
বাজে তরবারি ঝনন ঝন।
সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলো মা গো,
জ্বালো সেথা জ্বালো কাল-চিতা
তোমার খড়্গ-রক্ত হউক
স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা।
এলোকেশে তব দুলুক ঝঞ্ঝা
কালবৈশাখী ভীম তুফান,
চরণ-আঘাতে উদ্‌গারে যেন
আহত বিশ্ব রক্ত-বান।
নিশ্বাসে তব পেঁজা-তুলো সম
উড়ে যাক মা গো এই ভুবন,
অসুরে নাশিতে হউক বিষ্ণু–
চক্র মা তোর হেম-কাঁকন।
টুঁটি টিপে মারো অত্যাচারে মা,
গলহার হোক নীল ফাঁসি,
নয়নে তোমার ধূমকেতু-জ্বালা
উঠুক সরোষে উদ্‌ভাসি।
হাসো খলখল দাও করতালি
বলো হরহর শঙ্কর!
আজ হতে মা গো অসহায়সম
ক্ষীণ ক্রন্দন সম্বরো।
মেখলা ছিঁড়িয়া চাবুক করো মা
সে চাবুক করো নঊ-তড়িৎ,
জালিমের বুক বেয়ে খুন ঝরে
লালে লাল হোক শ্বেত হরিৎ।
নিদ্রিত শিবে লাথি মারো আজ,
ভাঙো মা ভোলার ভাঙ-নেশা,
পিয়াও এবার অ-শিব গরল
নীলের সঙ্গে লাল মেশা।
দেখা মা আবার দনুজ-দলনী
অশিব-নাশিনী চণ্ডী-রূপ;
দেখাও মা ওই কল্যাণ-করই
আনিতে পারে কি বিনাশ-স্তূপ।
শ্বেত শতদলবাসিনী নয় আজ
রক্তাম্বরধারিণী মা,
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।