খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (৫) / আল মাহমুদ

নারীর কামিনী দেহ যামিনীর তৃতীয় প্রহরে
আতর-চন্দনে লেপে যে পুরুষ একবার ছোঁয়,
নিখিলের নগ্নতাকে জেনো সে-ই আলিঙ্গনে ধরে
সৃজনের পঞ্চভূত তার সাথে একখাটে শোয়;

নিসর্গের নীতি মেনে এসো পতি, মেঘবৃষ্টি গণি
জগতের উপকার জ্যোতিষের শাস্ত্রে লেখা নাই;
ঋতুর বৈচিত্রে কাঁপে লীলাবতী খনার ধমনী
মাটির মাহাত্ম্য গেয়ে এসো দোঁহে লাঙলে দাঁড়াই।

কিষাণের সোনা জেনো কার্তিকের কর্ষনের কাদা
কোদালে-কুড়ুলে মেঘে যদি ঢাকে আকাশের রং
রবি খন্দ ভরভর্তি, কি করবে রাজার পেয়াদা?
এ জেনো কবির প্রজ্ঞা, নয় কোনো শাস্ত্রের ভড়ং।

কার্তিকে কুয়শা হলে জানো না কি আমার মুকুল
ঝরে মরে পড়ে যায়! দুনো ফলে তাল ও তেঁতুল।

খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (৪) / আল মাহমুদ

পান খাও হে পন্ডিত কথা কও রসভরা ঠারে
না জানো ভেষজবিদ্যা সার কর শাস্ত্রের বচন;
পানের মহিমা বলি শোনো স্বামী, খনার বিচারে
শাওন পানের মাস। এই লতা রাবণের ধন।

এই পান মুখে দিয়ে চার্বাকের বেদের বিরোধী
গুয়ার সোয়াদ চেখে পঞ্চমুখে ভজে ইহকাল;
তির্যক যুক্তিতে কাটে চতুর্বেদ, ব্রাহ্মণের বোধি;
বলে এ জগৎ সত্য অন্য সবি শূন্যের মাকাল।

খান তো অনার্য কন্যা প্রকৃতির ঠোঁটকাটা কবি
জমিনের গন্ধ শুঁকে ফলনের ভবিষ্য বাখানে;
পানের মর্তবা বলি, পানপাতা হৃদয়ের ছবি
দানবের শস্য পান। খনা জানে, পানের কি মানে!

পান খান পন্ডিতেরা কথা কন রসভরা ঠারে
না জেনে পানের মর্ম পান সেবে সব অবতারে।

৩.৫.৯৭

খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (৩) / আল মাহমুদ

নারীর দেহের চেয়ে নম্য কিছু নেই পৃথিবীতে
সব শাস্ত্র ঘেঁটে শেষে হে জ্যোতিষী নারীতে আরাম;
রোহিণী তারার ওম একমাত্র নারী পারে দিতে
মাতাবধূকন্যা কহ, নারী এক রহস্যের নাম।

মেদিনীর সাথে শুধু স্ত্রীদেহের তুলনা সরস
গবংসহা তনুদেহা মানুষের তপস্যার ফল;
কৃষির আরম্ভে নারী, পশুরাও নারীতে বিবশ
নারী শক্তি, নারী স্বাস্থ্য, জ্ঞানীদের পিপাসার জল।

এহেন ধনের বাড়া রাজসভা কি দেবে পন্ডিত?
জ্যোতিষের ছকে ফেলে গুণে দ্যাখো কোন্ ধন সেরা,
স্ত্রীধনের অমঙ্গল ডেকে আনে খনার অহিত,
চারুবাকী রসনার চারিভিতে কাঞ্চনের বেড়া?

তার চেয়ে মাঠে যাও, পড়ে গেছে বোশেখের বাও
আদা শিকড় ঝেড়ে বাঁশ বনে হলুদ লাগাও।

২.৫.৯৭

খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (২) / আল মাহমুদ

প্রকৃতির ছায়া আমি হে রাজন, আমিই সৃজন
মানুষের শুক্র ধরি। বুঝি উষ্ণ বীর্যের বেদনা,
ধানে ও কাউনে বাঁচি, রক্ষা করি চাষীর গোধন,
বরাহের পুত্রবধূ মিহিরের ঠোঁটকাটা খনা।

মাঘের শেষের মেঘে আকাশের কটোরা গড়ায়
তবু কেন বৃষ্টি নেই, নদী শুষ্ক, বলো কার পাপ?
খনার গণনা বলে দেশ জ্বলবে দারুণ খরায়,
ইঁদুরেরা তাজা হবে। রাজ্যে হবে চরের প্রতাপ।

ইঁদুর নিধনযজ্ঞে অঘ্রাণের আগে মহারাজ
প্রতিটি শস্যের গর্তে ছ্যাঁকা দিতে পাঠাও মুনীষ,
তবেই পৌষের রাতে প্যাঁচাদের মসৃণ আওয়াজ
শোনা যাবে শালিখেতে শাখে শাখে দোয়েলের শিস।

টিভির উত্তরে গিয়ে কদলীর কান্ড রুয়ো রাজা
দক্ষিণে মূলার খেত, খোলা থাক ভাগ্যের দরোজা।

১.৫.৯৭

খনার বর্ণনা : সনেট পঞ্চক (১) / আল মাহমুদ

ঋতুর রহস্য গাই, এ দোষে কি কেটে নেবে জিব?
তাহলে হে পুরুষেরা কাটো শত কবির রসনা,
নিয়মের মন্ত্র লিখি। লাক্ষণিক নক্ষত্রের দীপ
নারীর প্রেরণা হয়, তোমরা শোনো খনার বর্ণনা।

যে মাঘে বুকের মাংস গুটি বেঁধে হয়েছে স্তনন
তখন থেকেই জেনো নারী শেখে নিসর্গের ভাষা
আগাম ইশারা হয়ে ঝরে যায় খনার বচন
চাষার ঘামে ও কামে তড়পায় শস্যের পিপাসা।

নাক কান কেটে যদি কবিত্বকে খনা করে কেউ
প্রকৃতির প্রতিশোধ বজ্র হয়ে নামে শালিধানে;
অভাবের বাঘ আসে, ফেউ হাসে, বিড়ালীর মেউ
রাজার ভাঁড়ারে বসে প্রজাদের দুর্ভাগ্য বাখানে।

যে দেশেকবির ঠোঁটে ছুঁচ দ্যায় রাজার সেপাই
সে মাটিতে মেঘবৃষ্টি প্রকৃতির ষড়ঋতু নাই।

২৯.৪.৯৭