খাঁচার ভিতর অচিন পাখি / আল মাহমুদ

কিছুকাল যাবত কিছু একটা পঁচে যাওয়া দুর্গন্ধ
আমাকে কেবলি তাড়না করে ফিরছে। গন্ধটা কোথা থেকে আসছে
তা বুঝতে না পারলেও এটা আন্দাজ করতে পারছি কাছেই
কী একটা যেন মরে পচে এ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
আমি প্রতিটি নদীর পানি নাকের কাছে এনে
শুঁকে দেখেছি। না, মেঘনা যমুনা পদ্মা এই সব
স্রোতস্বিনী মাঝে মাঝে শুকিয়ে তলপেট বের করে দিলেও
পচা গন্ধটা নদী থেকে আসছে না।
পাহাড়-পর্বত, বৃক্ষরাজি, নাও-নদী সব কিছু আমি
শুঁকতে শুঁকতে হয়রান।

একদা গাঁয়ের বাড়িতে কোথাও ইঁদুর মরে গেলে
যেমন দুর্গন্ধ ছড়াতো আর তা দ্রুত অপসৃত করার জন্য
যেমন আমরা সবাই সবকিছু ফেলে ওই দুর্গন্ধের কারণ
উৎপাটন করতাম, এখন আমার নাকের কাছে
তীব্র পচা গন্ধটা আমাকে, আমার পরিবারকে, আমার
প্রতিবেশিদের মুহ্যমান করে ফেললেও আমরা নাচার।

খুঁজে পাচ্ছি না। ধরতে পারছি না। দেখতে পারছি না।

অথচ বিনিদ্র রজনী নিঃশব্দে কাটিয়ে দিয়ে
বারবার জেগে উঠছি।
আমি প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করে দেখেছি। তারাও
আমার সাথে একমত। হ্যাঁ, একটা পচা গন্ধ আছে বটে।
কিন্তু তারা তা অসহনীয় মনে করছে না। তাদের ধারণা কত কিছুই তো
সময়ের সংঘাতে মরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তাতে কেউ তো আর
দেশান্তরী হয়ে যাচ্ছে না। প্রাত্যহিক সূর্যের খরতাপে এই
বাসি গন্ধটাও থাকবে না। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু এটা তো আমার জন্য কোন প্রবোধ নয়
শেষ পর্যন্ত আমিও যখন হাল ছেড়ে দিয়েছি
ঠিক সে সময় আমার ভিতরের একটা প্রকোষ্ঠ,
যা হৃদয়ের বাঁ পাশে থাকে, এর অদৃশ্য
ডালা খুলে দিল। বুঝলাম এখানেই হয়ত
কিছু একটা মরে হেজে গেছে। গন্ধটা সেখান থেকেই।
অথচ লালনের গান থেকে আমি এ প্রকোষ্ঠের
নামকরণ করেছিলাম মনুষ্যত্ব। তবে কি আমার
কলজের পাশে সেই অচিন কুঠুরিতে মরে গেছে
কলরব মুখর পাখির ছটফটানি?

১৮ অক্টোবর,২০০৪