অন্যদিন / আহসান হাবীব

নির্জন নদীর তীরে অপরাহ্নে ঘাসফুলে
সোনার ফসলে
চোখ রেখে, যে হৃদয় তোমাকে দেবার
কথা ছিল- সে আজ হাটের পণ্য।
হাটে হাটে নগরে বন্দরে
সে হৃদয় বিজ্ঞাপিত আজ।
শ্রমশক্তি আর তার ধৈর্যের পরীক্ষা চলে
হাতে হাতে;
হাত থেকে হাতে তার আসা যাওয়া
নির্বিকার। সে হৃদয় আজ
মদালস সভ্যতার দ্বারে দ্বারে বিশুদ্ধ গণিকা!

কি দেব তোমাকে বলো?
তুমি তার ছিলে দাবিদার
এককালে
যে কালে হৃদয় ছিল
নদীর স্রোতের মত
ইচ্ছামতী। পাখির ডানার মত
ছিল তার অসীম নীলিমা;
যে কালে হৃদয় ছিল
অবিকল হৃদয়ের মত
সে কাল এখন নেই।
এখন তোমার যদি মন চায়
নিতে পারো হৃতরক্ত হৃদয়ের ভস্ম কিছু;
আরো নিতে পারো
এই ঘৃণা আর এই আর্তি থেকে নবজাত শিশুর কাকলি।

এই নিয়ে অন্য কোনো দিনের প্রতীক্ষা
নিয়ে মনে
অন্য এক মধুমাসে নির্জন নদীর তীরে
অপরাহ্নে
প্রতিশ্রুতি আদায়ের আশা নিয়ে
এখন নতুন কোনো স্বপ্ন যদি গড়ে নিতে পারো
খুশী হই।

Advertisements

পারাপার / আহসান হাবীব

এখন নিবেছে আলো মিসরে ও দূর বেবিলনে!
নগ্ন নীল এ নদীর অতল নির্জনে
পাখি তার ক্লান্ত মুখ ধুয়েছে এখন।
মাঝির হৃদয় জুড়ে এখন নতুন পারাপার-
যে নৌকা ফেরেনি ঘাটে
অপেক্ষায় তার।
এখন কর্ডোভা আর গ্রানাডায় অন্ধকার নামে!
হৃতদীপ্তি অথৈ বিশ্রামে
মুক্তি তার।

ইতিহাস-নগরীর নেয়ে
একটি নতুন শিখা বুকে জ্বেলে
অপেক্ষায় আছে পথ চেয়ে-
কখন নতুন পালে হাওয়া লাগে
ঢেউ জাগে-
আবার কখন
এ নদী সমুদ্র হবে;
ঢেউ তার দু’পাখায় মেখে,
আরেক সমুদ্রপাখি
হয়ত বা আসবে গিয়ে রেখে
নতুন ভোরের আলো
কর্ডোভা গ্রানাডা আর মিসরে ও দূর বেবিলনে।
এখন জাগুক ঢেউ এ নদীর অতল নির্জনে।

যৌবনে জীবনে তুমি / আহসান হাবীব

তোমারই আভায় নিত্য নবরূপে তোমাকে দেখার
আকাঙ্ক্ষার দীপ জেলে হৃদয়ে
কৈশর-যৌবনের সারাপথ হেঁটেছি,
জীবন আমার একার নয় জেনেছি
এবং তোমাতেই সমর্পণ করেছি;
রেখেছি একাগ্র দৃষ্টির আলো পথে ফেলে
যে পথের ধূলি মেখেছি সর্বাঙ্গে
আর কারার নির্মম অন্ধকার উপেক্ষা করেছি
মুক্ত বুক সঙনের মুখে পেতেছি নির্ভয়ে
শুধু এক অকৃত্রিম বাসনায়।
পলাশে বকুলে বিকশিত
সোঁদাল মাটির গন্ধে মর্মরিত
হলুদ ফুলের স্বচ্ছন্দ সহজ সমর্পণে
সজ্জিত চিত্রিত এক অকৃত্রিম প্রতিমার কামনায়
এ জীবন সমর্পিত ছিলো।

তোমাকে পেয়েছি অতঃপর অতি কাছে
বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে।
বহু রক্ত
প্রিয়জন
অতি প্রিয় জীবনের সব সুধা
আর আনন্দের বিনিময়ে।
অথচ আশ্চর্য এই
জননীর সে মহিমা বিলিয়ে পুরনো সেই নাগরের পায়ে
নর্তকীর ভূমিকায় আজো তুমি
মগ্নচেতনার অন্ধকারে আবিষ্ট আত্মার বলি এক।

বলদর্পী বণিকের মানদন্ড আনত।
তোমার সর্বাঙ্গে সে রেখে গেছে পীড়নের বহু ক্ষত
আরো জীবনের উদভ্রান্ত অশ্লীল বহু নিমিষের
ক্লান্ত মত্ততার জ্বালা।
সে জ্বালায় আজো তুমি জ্বলো!
তাই ঘরের সমস্ত মন দূরে বাইরে ছড়িয়ে ছড়িয়ে
নিয়ত কাঞ্চনমূল্যে বেলোয়ারী সম্ভারে
তোমার ঘর ভরে।
হৃততৃপ্তি আত্মার আবেগে কী মত্ততা!
আর সেই মত্ততার স্রোতে
কে নিত্য নতুন ঢেউ রেখে যায় জানো না।
কে নিত্য হরণ করে তোমার শ্যামল দেহলাবণ্য,
তোমার কুন্তলের কৃষ্ণাভ,
তোমার আত্মার উজ্জ্বল ভোর
কে নিত্য রঙিন মেঘে ঢেকে দেয়
তুমি তা জানো না।

তুমি তা জানো না!
আমি জানি।
জানি তাই আকাঙ্ক্ষার দীপে
আত্মার সুধায় জ্বলে একটি শিখা অমর্ত্য আশায়
এবং প্রত্যহ
শিউলি কি বকুল কিম্বা পদ্মকলি ভোরের পাখিরা
যখন ডানার ঘুম ঝেড়ে আসে নিমন্ত্রণে
আমিও তখন
তাকাই
তাকিয়ে দেখি একটি অমর আত্মা!
যদিও বিষণ্ন আর ভীরু
তবু অপার বিশ্বাসে তখন মিনতি রাখি আমিও
এবং বলি:
দেখো দেখো তোমার আত্মার অন্ধকারে
কে যেন হীরের কুচি ছড়িয়ে ছড়িয়ে
ডাকে শোনো!

যখন বিরতি / আহসান হাবীব

নিখুঁত সংলাপে আর অভিনয়ে দু’বেলার কড়ি
কুড়িয়ে, পেছনে রেখে মঞ্চের আলোকসজ্জা আর
সাজঘরের সীমানা পেরিয়ে
পোড়া ইট সাজানো বাগান
দূরে রেখেে
এখানে বিশ্রাম করি
একা বসে
অকৃত্রিম মাটির আসন পেতে।

সব সাজ খুলে ফেলি
রাজা কিম্বা উজীরের অথবা ভাঁড়ের
বিচিত্র টুপিটি খুলে দূরে রাখি।
ঘাসের শিশিরে
মুখের সমস্ত রঙ তুলে ফেল নিপুণ দু’হাতে।

অতঃপর সামনের নদীর ধীর জোয়ারের জলে
চোখ রেখে
আর সেই জলের আর্শিতে
যথন নিজেকে দেখি তখন হঠাৎ
মনে পড়ে অতীতের অন্য এক সম্রাটের কথা।

মনে পড়ে কবে সেই রাজ্যপাট ছেড়ে
দূরের রাজ্যের এক মায়াবিনী কুমারীর তিন
ধাঁধার উত্তর খুঁজে ক্লান্ত আমি
সমস্ত যৌবন বিলিয়েছি
উত্তর মেলেনি।

অতঃপর যথাচুক্তি ভূমিকা এখন
অনুগত কিঙ্করের
এবং খুশির মঞ্চে তার
নিত্য নানা অভিনয়ে দিন যায়-
হঠাৎ কখনো
গোধূলির নিমন্ত্রণে সাজঘরের আলো নিবে যায়।
কখনো সন্ধ্যায়
বকুলশিউলির কুঁড়ি গন্ধ দেয়।
কখনো পাখির
প্রসন্ন কণ্ঠের সুধা ঢেউ তোলে
জানি না কখন
পুরনো নদীর স্রোতে পা ডুবিয়ে বসেছি নির্জনে।

ছহি জঙ্গেনামা / আহসান হাবীব

[তেসরা বাব]

জ্বি হুজুর, আমি সেই হুজ্জত্ সরদার।
জান নিযে বেঁচে আছি পাক-পরওয়ার
খোদাওন্দ করিমের করম ফজলে।
তবে কি না এলাহীর লানতের ফলে
হয়েছে এমন হাল। হাড়-মাংসহীন
আমি সেই খাকছার হুজ্জত্ কমিন।

জ্বি হুজুর একদিন এই দুই হাতে
লড়েছি এগারো হাত কুমীরের সাথে,
গাঙের কুমীর টেনে তুলেছি ডাঙ্গায়
ভেঙ্গেছি বাঘের মাথা এই বাম পায়।
এক হাতে ঠেকিয়েছি পঞ্চাশ লেঠেল
দশখানা লাঠি নিয়ে দেখিয়েছি খেল!

হুজ্জত্ সরদার আমি মানুন একিন।
ফখর করি না কিছু ছিল একদিন
যেদিন নেজার কোপ ফিরেছে এ বুকে
মওতের সামনেতে গেছি তাল ঠুকে,
দু’চার বাঘের বল ছিল কব্জায়
ডর-ভয় বলে কিছু ছিল না ছিনায়।
দেড় হাত চওড়া ছিল ছিনার বহর,
শুনেছি দুচোখ ছিল আগ্ বরাবর,
আর সব লোক ছিল কোমর সমান
ছ’হাত শরীরে ছিল ইস্পাতের বান।
খোদার ফরজন্দ এই হুজ্জত্ সরদার
বেইমানীর কোনোকালে ধারে নাই ধার।
যেখানে দেখেছি কিছু বে-এনসাফির
মওত কবুল করে করেছি ফিকির।
আতশী নজর দেখে কেঁপেছে বেইমান,
সেকান্দর শা’র মত ছিল মোর শান।

তারপর জিন্দিগীর নতুন ছবক
জবর খবর এক শুনি আছানক।
ইংরাজ-জার্মানে নাকি লেগেছে লড়াই
ঢাল-তরোয়ালে কারো কমি কিছু নাই,
দুই পক্ষ তেজিয়ান সমানে সমান
কাতারে কাতারে নাকি কাটিছে গর্দান।
পহেলা পহেলা খুব খুশি হল মন
কারণ বাঁচে না কেহ আখেরে মরণ!
তবে কেন মরিব না লড়িয়া চড়িয়া
মারিয়া অরির বংশ মরি দাদ নিয়া।

জানতো কে এ লড়াই মানুষের নয়
হাওয়ানের হানাহানি। এ পৃথিবীময়
ছড়াবে আগুন এরা, লোভের আগুন।
বেকসুর মানুষেরা হয়ে যাবে খুন।

একদিন দেখাগেল নুন নেই ঘরে
দেখা গেল পরদিন বৌয়ের ছতরে
ইজ্জত বাঁচার মত তেনাটুকু নাই
আচম্বিত শরমেতে নজর নামাই।
ফুরায়েছে কেরাসিন, নিভে গেল আলো
ভাবি এ রাতের মত মন্দের ভালো।
তারপর ক্রমে ক্রমে অনেক দেখেছি
অনেক দুঃখের কথা স্মরণে রেখেছি।

দেখেছি কেমন করে বাঁচাতে ইজ্জত
ঝি-বৌ নিয়েছে বেছে মওতের পথ,
মওতের হাত থেকে বাঁচার আশাতে
দেখেছি কেমন করে নিজেদের হাতে
ইজ্জত করেছে বিক্রি দেশের মা বোন
চতুর্দিক ছেয়ে গেলো সফেদ কাফন।
উপবাসী আওলাদের চোখ পুছে দিয়ে
হুজ্জত্ সরদার আমি উঠানেতে গিয়ে
হঠাৎ পাগলপ্রায় কাঁদি জারেজার
আজদাহা প্রমাণ সেই হুজ্জত্ সরদার।

কোথায় লড়াই হয় রাজায় রাজায়
ধানের মরাই মোর খালি হয়ে যায়,
খালি হয়ে গেল মোর চালভরা জালা
বন্ধক পড়েছে কবে বাটি আর থালা।
সোনার সংসার মোর হল ছারখার
একমাত্র পুত্র গেল, মা-জননী তার
গেল সেই পুত্রশোকে। হুজ্জত্ সরদার
আমি একা বেঁচে আছি গজব খোদার।

(রচনা কাল ১৯৪৬)

মহূর্ত / আহসান হাবীব

কখন ভোরের পাখি সোনা মেখে কোমল পাখায়
সুরের সাহানা রেখে বাতায়নে বকুল শাখায়
উড়ে গেল কোন দূর দিগন্তের দারুচিনি বনে
কখন কি আবেগের ঝড় তার বয়ে গেল মনে!

কে আছে অপেক্ষা করে সে পাখির পাখার আওয়াজ,
কোন মুগ্ধ নীলোৎপল ধীরে ধীরে দেয় ভাঁজ
বুকের;
বাসনা কার পার হয়ে বহু অমানিশা
অবাক হৃদয়ে কার আবেগের উজ্জ্বল মনীষা-
আলো দেয়-ভালোবাসে। এখন সহসা মনে হয়
জীবন সুন্দর আর জীবনের এ যাত্রা নির্ভয়!

আষাঢ়ে আশ্বিনে আর পৌষমাঘ ফাল্গুনে এখন
বিচিত্র সুরের স্রোতে একান্তে নির্জনে দুটি মন
এখন বিচিত্র এই পৃথিবীর লোকারণ্য থেকে
সুরের সঞ্চয় তুলে অভীপ্সার আলো দিয়ে এঁকে
অতঃপর জ্বেলে নেবে জীবনের নতুন সবিতা
ফিরেছে নীড়ের পাখি কণ্ঠে তার নতুন কবিতা।

সম্রাট / আহসান হাবীব

দেয়ালে ভার্জিন মেরী, মোনালিসা
তারি মাঝখানে
তোমার কোমল দীপ্তি জয়নুলের তুলিতে অমর।
মাঝে মাঝে অপলক দৃষ্টি মেলে দিয়ে
চেয়ে থাকি
মুগ্ধ হই
মনে মনে ভাবি
ধন্য তুমি,
অসামান্য সম্মানে তোমাকে
রেখেছি এ উচ্চাসানে-
আমি ধন্য;
আর ধন্যবাদ সে মহৎ শিল্পীকে জানাই
তুলি যার রেখায় রেখায়
দিয়েছে অক্ষয় দীপ্তি
তোমাকে;
যেহেতু
আমার দেশের প্রাণ তুমি
আর তোমার বলিষ্ঠ বাহু
এ দেশের সহস্র জনের
প্রাণেমনে ভাস্বর প্রতিভা জ্বেলে রাখে
হৃদয় জাগ্রত রাখে
সভ্যতার দীপশিখা
অনির্বাণ জ্বেলে রাখে পথে পথে;
আশা আর ভাষা দেয় সেই পথে
দাক্ষিণ্য তোমার।

তাই তোমাকে সম্মান করি।
দেয়ালে আমার
তুমি নিত্য দীপ্তিমান।
তোমাকে জানাই
প্রাণের অসীম শ্রদ্ধা-
মনে মনে জানি,
আমার রাত্রি ও দিন সার্থক তোমার মহিমায়।

সোনার সকালে আর সোনামাখা বিকেলে আমার
কবিতার উৎস তুমি
আমার কবিতালোকে মহাকবি তুমি।

তাই তুমি দেয়ালে আমার
সম্রাটের মহিমায় দীপ্তিমান।
যদিও তোমার অমর কবিতালোকে
আমার পায়ের চিহ্ন পড়েনি কখনো,
রোদ বৃষ্টি ঝড়ে আর প্লাবনের দিনে
তুমি আর শত শত কবিকর্মী তোমার মতন
কি আবেগে সৃষ্টি করে পৃথিবীর প্রাণের কবিতা
কি আশ্চর্য ভালোবাসা
কি বিপুল ত্যাগের মহিমা
তোমরা ছড়াও নিত্য
মাঠে মাঠে
আর
দেশের পথে ও ঘাটে
হাটে হাটে বন্দরে বন্দরে
তোমরা ছড়িয়ে দাও কি অমর কবিতাসম্ভার
দেখিনি দুচোখে মেলে-

আমার কবিতা
সে অমর কাব্যলোকে
জীবনের নতুন আশ্রয়
খুঁজে নিতে ভয় পায়।

ভয় হয়
আত্মপরিচয়
অশেষ লজ্জায়
হয়তবা সে আলোকে তুলে দেবে ছলনার ছবি!

তাই
তোমাকে এখানে দেখি
নিত্য দেখি মুগ্ধ হই
মনে মনে জানি,
… সে আমার মন জানে,
আর সরবে ঘোষণা করি
তুমি ধন্য।
আমি নির্ভয় ভাবনাহীন।

দ্বৈত / আহসান হাবীব

১। যখন তমসা
সারা জীবন পুঁথির রাজ্যে হাবুডুবু খেলেন
আমার যে প্রশ্ন ছিলো
তার কি কোনো জবাব কোথাও পেলেন?

বলুন ত’ ভাই শুনি
যখন বলি এসো জীবন, দু’জন এখন
কথারই জাল বুনি,
তখন কেন কারো মুখেই ফোটে না আর কথা;
বলতে পারেন
কি ক’রে যায় অভদ্র এই নিত্য নীরবতা?

যতই বলি জীবন, তোমার বড়ই ভালোবাসি,
মিলেমিশে এসো দু’জন থাকবো পাশাপাশি-
জীবন কেন মারখাওয়া এক বোবা পশুর মত
ছুটে পালায় অনেক দূরে যতই ‍বলি তত!

বলতে পারেন সাহেব
আমার জীবন আমায় ছেড়ে
কোন সাহেবের একান্ত মোসাহেব?

মানুন আর না মানুন সাহেব সত্যি কথা বলি-
আপনি ত’ বেশ বলে বেড়ান,
যা কিছু হোক থাকতে হবে ‘জলি’।

তাইত সদাই ভাবতে থাকি,
খাসা আছি, কিচ্ছু হয়নি যেন-
কিন্তু সাহেব বলতে পারেন,
হাসতে গেলেই হাসি পাচ্ছে কেন?

২। এবং রাজসিক
ঝগড়াটা তোমার সঙ্গে মিটিয়ে ফেলবার
কোনো পথ নেই তি জীবন?
হে জীবন
এসো আজ সন্ধি হোক তোমাতে-আমাতে
মিলেমিশে একই সঙ্গে
পাশাপাশি বাস করার ব্যবস্থা এবার
শুরু করি।

কখনো তোমাকে হতভাগা ব’লে আর
নিন্দে ক’রে দূরে দূরে সরিয়ে রাখার
দুর্বুদ্ধি না হয় যেন
তুমিও অমন
সর্বদা সমস্ত মুখ ভার ক’রে মারখাওয়া
পশুর মতন
বোবা দৃষ্টি মেলে রেখে
স’রে স’রে থেকো না কখনো
যখন যেটুকু পাই
তৃপ্ত হবো তাতেই দু’জনে
যা নেই বা যা কখনো পাওয়ার আশাও নেই
তার তৃষ্ণায় জ্বলবো না আর
দুঃখকে অমন ক’রে
ঘর-দোরে দেব না আসন স্বেচ্ছায়
বরং
দু’জনেই মুখোমুখি এসো বসি
সুখের দুঃখের ঘুটি দুটো
অবিরত বদলাই এবং
তা’হলে একদিন দেখো
দেখা যাবে দুটোই কখন
অনায়াসে একই রঙে দিনেদিনে হয়েছে রঙিন।

প্রেম নারী মানুষ ঘোষণা / আহসান হাবীব

অনিন্দ্যসুন্দর কোনো নারী
আর যদি সেই নারীর হৃদয়
করে থাকি কামনা কখনো;
শপথ সে নারীর আর সে নারীর হৃদয়ের নামে-
যে পৃথিবী প্রেমশূন্য, মরীচিকা প্রেমের কল্পনা;
সেই পৃথিবীর প্রেমে আমি আজ উচ্ছ্বসিতপ্রাণ।

আমার দিনের আর রাত্রির শান্তির নামে
আর সেই বাসনার নামে-
যে বাসনা একদিন দেখেছিল স্বপ্ন
কোনো শান্তির নিলয় রচনার;
শপথ সে শান্তি আর
সে অমর্ত্য বাসনার নামে-
যুদ্ধ-হত্যা-লুণ্ঠনের উল্লাসের মুখে
যে পৃথিবী শঙ্কায় আকুল;
আমি সেই পৃথিবীর সতর্ক সন্তান।

পিতামাতা ভাইবোন প্রাণাপেক্ষা প্রিয়জন নিয়ে
যদি কভু করে থাকি শান্তিময় গৃহের কামনা;
শপথ সে মৃত্যুজয়ী কামনার নামে-
গৃহে গৃহে শান্তি যার হয়েছে লুণ্ঠিত,
সেই দুঃস্থ পৃথিবীতে শান্তির ঘোষণা নিয়ে যাবে
আমার কবিতা আর গান।

যে বণিক প্রেম এসে পৃথিবীকে সাজালো গণিকা,
ক্ষত চিহ্ন রেখে গেলো কুৎসিত কুটীল কামনার;
যে প্রেম মরিয়া আজ-
তার মুখোমুখি
আমার সৈনিক প্রেম
শপথের ভাস্বর স্বাক্ষর করে দান।
নীড়হারা শান্তিহারা মানুষের বিশীর্ণ নয়নে,
দেহের কঙ্কালে তার
আর তার মনোরাজ্যে
কে জ্বেলেছে নতুন মশাল;
আর তার হাতে হাতে সংগ্রামের ঘোষণা এবার-
নীড় যদি চেয়ে থাকি,
শান্তি যদি আমারো কামনা;
শপথ সে নীড় আর সেই শান্তি কামনার নামে-
আমার রচনা সেই সংগ্রামের অজেয় বিষাণ।
প্রেম যেথা পলাতক,
হৃদয় হৃদয় নয়-
এমন পৃথিবী যদি করে থাকি ঘৃণা-
সেই পৃথিবীর বুকে প্রেম আর হৃদয়ের
এবং প্রেমিক মানুষের
পত্তনের শপথ এবার।
অনিন্দ্যসুন্দর কোনো নারী আর
সে নারীর হৃদয়ের নামে,
শপথ প্রেমের নামে,
শপথ শান্তির নামে,
পৃথিবীর শান্তিহারা মানুষের নামে।

ঈর্ষার আলোকে আমি / আহসান হাবীব

পাখিরা প্রত্যহ আসে
ভোরে আসে
টুকরো কিছু রুটির ভোজেই তৃপ্ত হয়ে গান গায়
ঘাসের শিশিরে মুখ ধুয়ে উড়ে যায়
ঈর্ষার আগুন কিছু রেখে যায় সকালের রোদে।

পাখির জীবন কভু সংসারে পাবো না
পাখির মতন সুখ-স্বাধীনতা মানুষের ভাগ্যে লেখা নেই
যত ভাবি ততই হৃদয়ে
ঈর্ষার আগুন জ্বলে
মনে হয় সংসারের সীমা
ঈর্ষার প্রাচীরে ঘেরা!

পাখিদের সঙ্গ কভু পাইনি
জানি না
তাদের হৃদয় বলে কোন কিছু আছে কি-না
হৃদয়ে ঈর্ষার
আগুনের মত কিছু জ্বলে কি জ্বলে না!
যে ঈর্ষা আমাকে এই প্রাত্যহিক ভোরর শয্যায়
সব ক্লান্তি মুছে দেয়
যে ঈর্ষার জ্বালা
প্রত্যহ আমার এই মানবিক তৃষ্ণায় কেবল
অতৃপ্তির হাওয়া দিয়ে তৃষ্ণাকে অমর ক’রে রাখে,
আমাকে অমর করে পৃথিবীর তৃপ্তিহীন মানুষের মাঝে:
তেমন ঈর্ষায়
জানি না পাখিরা কভু বিষণ্ন হয়েছে কি না কোনোকালে
আর
তেমন মহৎ কোনো ঈর্ষার শিখায়
পাখিরা সুখের পথ সন্ধানের সুখে সুখী কি না
জানি না।
জানি না ব’লে মাঝে মাঝে পাখিদের সুখে
সহযেই সুখী হই।
তখন হৃদয়ে ঈর্ষার আগুন নেই।
সারাপ্রাণ নম্র হয়ে আসে স্নেহে আর মমতায়।
তখন নিজেকে পাখিদের প্রভু বলে মনে হয়।
দু’হাতে তখন
পারি আমি অনায়াসে ছড়াতে রুটির
সব টুকরো-
তখন নিজের সব রুটি পাখিদের ভোজে
ঢেলে দিতে পারি আমি;
কেননা তখন
পাখিদের মনে হয় আশ্রিত অথবা
কখনো বা নিমন্ত্রিত অতিথির মত।