পৃথিবী ২০০৩ / সায়ীদ আবুবকর

এখানে অন্ধকার বৈদ্যুতিক আলোয় মশা ধরে ধরে খাওয়া টিকটিকির মতো
আলো ধরে ধরে খায়।
এখানে সন্ত্রাস মানুষের হাড়গোড় কটমট করে খাওয়া রূপকথার রাক্ষসের মতো
জীবন ধরে ধরে খায়।
এখানে অবিশ্বাস শ্মশানের আপোড়া লাশ চেটেপুটে খেয়ে ফেলা শেয়ালের মতো
হৃদয় ধরে ধরে খায়।

এখানে মহেঞ্জোদারো আর
ব্যবিলনি সভ্যতার
সমস্ত কবর ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে,
এ্যাটোমের দীপ জ্বেলে জ্বেলে
পচা মাংসের জাঁকালো উৎসবে নৃত্য করে ওঠে শ্বেত নেকড়ের পাল;
তৃপ্তির ঢেকুর তুলে, অতঃপর, তামাশায় বুঁদ হয়ে করে যায় চোখ বুজে দন্ত খেলাল।

এখানে মৃতরা বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে বাঁচাও বাঁচাও বলে কাঁদে।
এখানে জীবিতরা দুচোখে মৃত্যু আর দুঃস্বপ্ন মেখে নিয়ে
ঢুকে পড়ে ফিরাউনের মমির ভেতর।
এখানে শিল্পেরা গলায় তাবিজ বেধে জপে ওঠে বারবার ইবলিশের নাম।
এখানে কবিতারা জবাই করা বুনো পায়রার মতো
ডানা ঝাপটায় ছোপছোপ শোণিতের ’পরে।

তবু সূর্য যথারীতি দিগ্বিদিক প্রতিদিন আলোকিত করে;
তবু চন্দ্র যথারীতি জ্যোৎস্নার রোদ্দুরে আদিগন্ত মোহনিয়া করে।

ফৌজদারহাট
২৬.৪.২০০৩

Advertisements

শান্তিবাদ / সায়ীদ আবুবকর

বলো, ভালবাসা ছাড়া মুক্তি নেই আজ কারো। বলো,
প্রণয়শরাব ছাড়া শান্তি কারো নেই পৃথিবীর।
দেশ নয়, জাতি নয়, অর্থ বিত্ত বীরত্বও নয়,
বলো, আজ মুক্তি শুধু, শান্তি শুধু ফুলেল নারীর
বুকে আর ঠোঁটে। বলো, যুদ্ধের খিচুড়ি নয় আর,
নারীর হৃদয়ে আজ রাঁধাবাড়া হবে প্রেমক্ষীর।
বলো, যুদ্ধে জেতা নয়, প্রেমাঙ্গনে নারীর হৃদয়
জয় করে নেবে যে-ই, সে-ই আজ সৌভাগ্যের বীর।

বলো, মিথ্যে দেশপ্রেম, দেশ আজ নারীর শরীর;
নারীর হৃদয়দ্বীপ রাজধানী আজ আমাদের।
মৃত্তিকার জন্যে ছাই, কেন আর মৃত্যুমৃত্যু খেলা-
সোনার শরীর দেশে এসো আজ সবুজ প্রেমের
ফলাবো ফসল। বলো, বোমা নয়, ক্ষেপণাস্ত্র নয়,
শান্তিশৃঙ্খলার জন্যে প্রেমই আজ বড় শমসের।

রাবি
১৯.১০.১৯৯২

মধ্য রাতে / সায়ীদ আবুবকর

মধ্য রাতে যাই ঘুমাতে
ঘুম আসে না ঘুম
পাই বাতাসে শুনতে, কোথাও
কাঁদতেছে মজলুম।

কাঁদতেছে কেউ বোমা হামলায়
কাঁদতেছে কেউ খিদেয়
কী করি, হায়, তাদের জন্যে,
কী দেই তাদের কী দেই?

কলম বললো, আমায় ধরো
লেখো এমন লেখা
যে-লেখাতে হয় জালিমের
উচিত শিক্ষা শেখা।

অস্ত্র বললো, আমায় ধরো
যুদ্ধ শুরু হোক
বাঁচতে হলে মরতে হবে,
মারতে কিছু লোক।

কলম ধরি, অস্ত্র ধরি,
রক্ত ওঠে নেচে
সেই নাচনে আহার নিদ্রা
হারাম হয়ে গেছে।

রাবি
৭.৭.১৯৯৩

ঘৃণার কবিতা / সায়ীদ আবুবকর

বিলকিস বললো, ‘হে পারিষদবর্গ, আমাকে একটি সম্মানিত পত্র দেয়া হয়েছে। সেই পত্র সুলায়মানের পক্ষ থেকে এবং তা এই – অসীম দাতা, দয়ালু আল্লার নামে শুরু; আমার মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন কোরো না এবং বশ্যতা স্বীকার করে আমার কাছে উপস্থিত হও।’ বিলকিস বললো, ‘হে পরিষদবর্গ, আমাকে আমার কাজে পরামর্শ দাও। তোমাদের উপস্থিতি ব্যতিরেকে আমি কোনো কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না।’ তারা বললো, ‘আমরা শক্তিশালী এবং কঠোর যোদ্ধা। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনরাই। অতএব আপনি ভেবে দেখুন, আমাদেরকে কী আদেশ করবেন।’ সে বললো, ‘রাজা-বাদশারা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে তখন তাকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গকে অপদস্থ করে। তারাও এরূপই করবে। আমি তাঁর কাছে উপঢৌকন পাঠাচ্ছি; দেখি, প্রেরিত লোকেরা কী জবাব আনে।’- কোরআন ২৭ ॥ ২৯-৩৫

যখন মানুষ যুদ্ধ ও মৃত্যুকে ক্যান্সারের মতো ভয় পায়
বিড়ায় দেখলে ভয় পায় যেমন ইঁদুর;
যখন মানুষ যুদ্ধ ও মৃত্যুকে
মরে বাতাসে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়ানো ইঁদুরের মতো ঘৃণা করে
যেমন জলকে ঘৃণা করে মাতাল কুকুর জলাতঙ্ক হলে;
যখন বন্দুক দেখলেই ভরা নদীর মতো গমগম করা উজ্জ্বল শহর
মুহূর্তে শ্মশান হয়ে ফাঁকা প্রান্তরের মতো খাঁ খাঁ করে ওঠে-
তখন সে জনপদকে কী নামে অভিহিত করা যায়?

যুদ্ধকে এড়িয়ে চলা তো শেবার রানী বিলকিসের স্বভাব, কেননা
রমণী মানেই হলো আত্মসমর্পণ করে
আগ্রাসি পুরুষত্বের নিচে শুয়ে শুয়ে চুলায় চড়ানো হাঁড়ির চালের মতো
সিদ্ধ হতে থাকা; আর পুরুষ তো চিরকালই সলেমান বাদশার মতো,
যাঁর অঙ্গুলি-নির্দেশে বিলকিসসহ বিলকিসের দেশও তাঁর পদতলে চলে যায়।
কিন্তু এ কেমন জনপদ, যেখানে যুদ্ধের নাম শুনলেই কলঙ্কিত পুরুষেরা
ডায়েরিয়ার রুগীর মতোই ছুটে গিয়ে শৌচাগারে ঢোকে?
এ কেমন হতভাগ্য দেশ, যেখানে নারী ও পুরুষেরা সমবেত কণ্ঠে
আকাশে বাতাসে যুদ্ধের কুৎসা রটায়?

পুরাকালে সম্মানিত রমণীরা বীর আর যোদ্ধাদেরই প্রেমদার হতো;
আর তারা সুপুরুষ প্রেমপতিদের জন্যে সাজিয়ে রাখতো ঢাল আর তরবারি,
যুদ্ধের দুন্দুভি বাজলেই যাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে
অতলন্ত যুদ্ধের সৌন্দর্যে; যখন সগর্বে গৃহে প্রত্যাবর্তন করতো তাঁরা,
তাঁদের পায়ের তলে আনন্দাশ্র“ আর হৃদয় বিছিয়ে দিয়ে স্বাগত জানাতো নৈঃশব্দে;
আর যদি তাঁরা শহীদই হয়ে যেতো, সারা জীবন তাঁদের জন্যে অহংকার করতে থাকতো,
পৃথিবীর জন্যে জ্যোৎস্নাকে উৎসর্গ করে যেমন অহংকার করে পূর্ণিমার চাঁদ।

রমণী যখন শরীরসর্বস্ব হয়, জরায়ুর চিন্তা ছাড়া
মহৎ কোনো চিন্তাই ঢুকতে পারে না তার ব্রেনে; কেবল তখনই সে
মিছিলের সুমিষ্ট শ্লোগান শুনলেই সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরে তার শয্যার সঙ্গীকে।

কিন্তু, হে রাসভ পুরষেরা, পুরুষের কী ক্যান্সার হলে
পুরুষরা এরকম কেঁচোর চেয়েও মেরুদণ্ডহীন হয়ে যায়? পুরুষের কোন্
যক্ষা  হলে পুরুষরা এমন গাধার মতো প্রাণপণ বাঁচাও বাঁচাও বলে
আর্তনাদ করে ওঠে, আকাশে বাতাসে মত্ত করা যুদ্ধগান শুনলেই?

যখন মানুষ যুদ্ধ ও মৃত্যুকে
মরে বাতাসে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়ানো ইঁদুরের মতো ঘৃণা করে
যেমন জলকে ঘৃণা করে মাতাল কুকুর জলাতঙ্ক হলেÑ
তখন সে জনপদকে বলা যায় অপদার্থদের দেশ, যেখানে কখনও
সূর্যোদয় হওয়া ঠিক না, বৃষ্টিবাদল হওয়া ঠিক না, জমিনে শস্য হওয়া ঠিক না।

হাজারিবাগ
১২.৫.১৯৯৮

হে হুজুর / সায়ীদ আবুবকর

তুমি বুঝি ভেবেছিলে, পৃথিবীর সমস্ত আরাম
জালি দিয়ে পেড়ে পেড়ে, ভরে দেয়া হবে তোমার নফসের ঝুড়ি।
অতঃপর ভীতির সাথেই
গোলামের মতো এসে বলবেন কেউ- ‘শান্তিগাছটার সবগুলো আম
এক বারে পেড়ে এনে, দিয়ে যাওয়া হলো এই
ঝুড়ির ভেতর।
হুজুর এখন জাগ দিয়ে
মজা করে খান একা একা, পাকিয়ে পাকিয়ে।’

তুমি বুঝি ভেবেছিলে, যদি এই মন্ত্র পড়ো তাহলে হঠাৎ করে ক্যালিফোর্নিয়ার
সবচেয়ে বড় বাড়িটার তোমাকে মালিক করে, খাইখাই তোমার দু’হাতে
তুলে দেয়া হবে মহা পৃথিবীর ভার।
অতঃপর নফসের নিঝুম গুহাতে
ফেলে দিয়ে এক সাথে মুম্বাই ও শিকাগোর সমুদয় হুর
সবিনয়ে, সকাতরে বলবেন কেউ- ‘সামান্য এ উপহার নেবেন, হুজুর।’

অথচ, হুজুর, এই মন্ত্র পড়ে যে-ই, এ মন্ত্রের এই ইতিহাসঃ
মুহূর্তেই বিশ্ব তার বিপরীতে গিয়ে, ক্ষয়ে যাওয়া কালের যাঁতায়
সশব্দে শানাতে থাকে গলা কাটা ছুরি; অতঃপর পৃথিবীর অসুস্থ বাতাস
শোণিতের ঘ্রাণে ভরে দিয়ে, রুদ্রঠোঁট শকুনের প্রায়
ভয়ঙ্কর ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে থাকে
মুগ্ধ সেই মন্ত্রওয়ালাকে।

তবু পৃথিবীর প্রেম-অন্ধ হামজারা
কি যে এক অবোধ্য নেশায়, গিলেছে আকণ্ঠ এই মদ্যপ্রায় কলেমার বিষ
কালে কালে, আর এই অনির্বাণ পাপপোড়া শস্যহীনতায় বহাতে পললবাহী প্রেমের ফোয়ারা
বাতিলের বীভৎস বটিতে, হয়েছে স্বেচ্ছায় যেন, ব্যবচ্ছিন্ন রক্তাক্ত ইলিশ।
তুমিও, হুজুর, যদি প্রেম-অন্ধ হতে,
বুঝতে কী সফলতা এ বিষমন্ত্রতে।

তেলঅলাদের গান / সায়ীদ আবুবকর

তেলা মাথায় তেল মাখাতে
শুধুই আমরা চাই ভাই
আতেলাদের তেল মাখানোর
তেল আমাদের নাই ভাই।

তোমরা যারা তেলমহাজন
করো তেলের কারবার
আমরা তাদের আত্মীয় হই,
বলতে চাই তা বারবার।

কিন্তু যারা দীনভিখিরি
মৃত্যু যাদের সামনেই
আমরা তাদের আত্মীয় নই,
তাদের কোনো দাম নেই।

খুলনা
২২.০৮.১৯৮৭

শুধু নষ্টকথা শুনে / সায়ীদ আবুবকর

শুধু নষ্টকথা শুনে, নষ্টকথা বলে- শুনে শুনে- বলে বলে
আমাদের জীবন তাহলে
কেটে যাবে এভাবেই ধ্বজভঙ্গ পদ্মামেঘনার মতো?
জীবন কী তাহলে মূলত
প্রতিদিন অবিরাম
শেয়ালশকুনদের ইতরবক্তৃতা শুনে শুনে কি-সুন্দর কি-সুন্দর বলে বলে ইতরামি করে উঠবার নাম?

বিদ্রোহে বিক্ষোভে আমাদের হৃদয় দাঁড়ায় ঘুরে, আমরা তা পাই টের;
আর তাই নতুন শপথে অসহ্য রাত্রির শেষে প্রতিদিন আমাদের
ভেঙে ভেঙে যায় ঘুম- কবরের মতো হিম, ধূসর ও নীল;
আর তাই দিকে দিকে অনিবার্য হয়ে ওঠে যুদ্ধ খুন রক্তপাত শ্লোগান মিছিল।

ফৌজদারহাট
৬.৬.২০০১

মুখর মূর্খেরা / সায়ীদ আবুবকর

মুখর মূর্খেরা বুনো পায়রার মতো আজ বাকবাকুম বাকুম করে
পৃথিবীর নাচঘরে।

যত কথা উড়ে ফেরে বিরুদ্ধ বাতাসে, কেবলই নষ্টকথা; সে-কথার তোড়ে
সভ্যতার সমুদয় সত্য ও সুন্দর চুরুটের ধোঁয়ার মতন ওড়ে;
ওড়ে স্বপ্ন, ওড়ে স্মৃতি, ওড়ে কবিতাকুসুম, ওড়ে শিল্প ও শুদ্ধতা-
আর তত বানের পানির মতো বেড়ে চলে কথা, বাড়ে মহামূর্খদের মহাপ্রগল্ভতা।

আজ আমাদের স্কন্ধের উপর বসে আছে পা ঝুলিয়ে অসহ্য, অদ্ভুত
অসংস্কৃত যত ভূত;
আজ আমাদের মাথার উপর বসে করে নাচানাচি
দেঁতো যত মাছি;
আজ আমাদের সত্তার ভেতরে বসে করে প্যাংপ্যাং
যত ধেড়ে ব্যাঙ।

আমাদের সব সুখ কেড়ে নিয়ে, স্বস্তি কেড়ে নিয়ে, কেড়ে নিয়ে ভালবাসা, স্বপ্ন আর ঘুম
মুখর মূর্খেরা বুনো পায়রার মতো করে বাকবাকুম বাকবাকুম।

ফৌজদারহাট
২১.১.২০০৩

নরক নিবাস / সায়ীদ আবুবকর

এ এক উচ্ছন্ন নরক নিবাস-
নির্জীব নিস্পন্দ- শিশিরের মতো- লাশের উপর লাশ
জমে জমে, বালির ঢিবির মতো হতে থাকে স্তূপ;
আশপাশে কাঁদবার কেউ নেই- অসুস্থ সন্ধ্যায় কারো ঘরে মাঙ্গলিক ধূপ
জ্বালবারও কেউ নেই; শুধু অফুরন্ত বীভৎস মৃত্যুর ‘পর ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসে
নির্হৃদয় অন্ধ অন্ধকার, বরাহ উল্লাসে।

এ যেন ক্যান্সারাক্রান্ত এক জীবন্ত কবর, ধসে পড়া যার বুকের ভেতরে
মৃত্যুর উপর মৃত্যু, ব্যথার উপর ব্যথা আর পচে ওঠা শতচ্ছিন্ন শব-
যেখানে বুভুক্ষু শেয়ালেরা শকুনেরা মাতাল সুড়ঙ্গ করে
ঢুকে পড়ে দলে দলে- মহা আড়ম্বরে, অতঃপর, করে মহা মাংসের উৎসব;
শেয়ালেরা পিশাচের মতো হো হো করে হেসে উঠে বিনষ্ট বাতাসে দোলায় লাঙ্গুল,
আর নীল বিরল তৃপ্তিতে চেটে খায় শকুনেরা শব ঘাঁটা চতুর আঙ্গুল।

ফৌজদারহাট
২৫.১০.২০০১

দেশ / সায়ীদ আবুবকর

পাখির তো কোনো দেশ নেই, মাছের তো কোনো দেশ
নদীরা মানে না কোনো সৈন্য ও সীমান্ত

উঁচানো বন্দুক আর পরাক্রান্ত রাজাবাদশাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নদীরা
সমুদয় কাঁটাতার ছিুঁড়েখুঁড়ে নিয়ে, ছুটে চলে বেপরওয়া ভালবাসার মতো

ও মানুষ, কোন্খানে পেলে তুমি সীমান্ত ও সীমান্তপ্রহরী?

ফকিরেরপুল
২৫.৮.১৯৯৮